অধিকৃত বাংলাদেশে ডাঃ মালিক মন্ত্রিসভার সদস্যদের বক্তৃতা-বিবৃতি

Posted on Posted in 7

৭.১৯৩.৫৫৩ ৫৬৫

শিরোনামসূত্রতারিখ
১৯৩। অধিকৃত বাংলাদেশ ডাঃ মালিক মন্ত্রীসভায় সদস্যদের বক্তৃতা-বিবৃতিদৈনিক পাকিস্তান ও পাক সমাচার২০ সেপ্টেম্বর

৩০ নভেম্বর, ১৯৭১

 

দৈনিক পাকিস্তান

২০ সেপ্টেম্বর।

শ্রমমন্ত্রী সোলায়মান –

এ সংকটে ঐক্যবদ্ধ থাকুন

.

        পূর্ব পাকিস্তানের শ্রম, সমাজ কল্যাণ ও পরিবার পরিকল্পনা দফতরের মন্ত্রী জনাব এ, এস সোলায়মান জাতির এ সংকট মুহূর্তে জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। গতকাল রোববার ঢাকা থেকে দশ মেইল দূরবর্তী মিরপুরে এক সভায় তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন। সভায় জনাব সোলায়মান বলেন যে, আমাদের বীর জনসাধারণ শত্রুকে নির্মূল করে দিয়েছে। শত্রুরা পাকিস্তান ভাঙতে চেয়েছিল।

 

তিনি বলেন, সাড়ে সাত কোটি মানুষের ত্যাগ স্বীকারের ফলশ্রুতি হলো পাকিস্তান। তাই বিশ্বের কোন জাতিই পাকিস্তানকে ভাঙতে পারবে না। জনগণের কল্যাণ সাধনে সম্মিলিতভাবে কাজ করার জন্যে তিনি জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান। কৃষক শ্রমিকের অবস্থার উন্নতি সাধনই সরকারের লক্ষ্য বলে তিনি জানান।

 

জনাব সোলায়মান আরো বলেন, প্রথমে আমরা মুসলমান তারপর বাঙালী, পাঞ্জাবী, সিন্ধু ও পাঠান। জনসাধারণকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, আমরা যদি মুসলমান থেকে খারিজ হয়ে যাই তাহলে পাকিস্তানও থাকবে না।

 

বর্তমান পরিস্থিতির উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন যে, এক্ষণে সমগ্র বিশ্বই আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আসল মতলব অনুধাবন করতে পেরেছে। তাই অধিকাংশ দেশই পাকিস্তানকে জানিয়েছে দ্ব্যর্থহীন সমর্থন। আর যে শত্রুরা পাকিস্তানকে দুর্বল করতে চেয়েছিল তারা হয়েছে নির্মূল। পাকিস্তান সঠিক পথেই রয়েছে। কোন দেশই পাকিস্তানের ক্ষতি করতে পারবে না।

 

মন্ত্রী আরো বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান চান যে, দেশে গণতন্ত্র চালু থাকুক। তাই তিনি প্রদেশে বেসামরিক গবর্ণর ও মন্ত্রীদের নিয়োগ করেছেন। প্রদেশের পরিস্থিতি যাতে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে তজ্জন্য কর্তৃপক্ষের সাথে সহযোগিতা করার জন্যে তিনি জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান।

……………

 

দৈনিক পাকিস্তান

২০ সেপ্টেম্বর।

কাসেম

জনগণের মধ্যে আস্থা সৃষ্টিই মন্ত্রীদের

প্রধান কর্তব্য

.

        পিপিআই’র খবরে প্রকাশ, গবর্ণরের মন্ত্রী পরিষদের প্রবীনতম সদস্য জনাব আবুল কাসেম গতকাল রোববার ঢাকায় বলেন যে প্রকৃত ঘটনা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করে জনগণের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করাই হচ্ছে তাঁর ও তাঁর সহকর্মীদের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য। জনগণের জন্যে তাঁর মতে কি কি উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে, জনাব কাসেম সে সম্পর্কে পিপিআই প্রতিনিধির সাথে আলোচনা করছিলেন।

 

        তিনি বলেন যে, আমাদের জনগণের কাছে প্রকৃত ঘটনা ব্যাখ্যা করা হলে তারা তা অনুধাবন করতে পারবে এবং এভাবেই তাদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে। তিনি বলেন যে, শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের জান ও মাল রক্ষা এবং প্রত্যাগতদের সব রকম সাহায্য দিয়ে পুনর্বাসনের ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় সংকল্পের কথা জনগণের কাছে বলার জন্যে মন্ত্রীরা শীঘ্রই প্রদেশে গণসংযোগ সফরে বের হবেন।

 

        জনাব কাসেম বলেন যে, প্রয়োজনের সময় জনগণের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, মন্ত্রীদের প্রচেষ্টা সফল করার জন্য জনগণ এগিয়ে না আসলে তারা (মন্ত্রীরা) কিছুই করতে পারবেন না।

……………

পাক সমাচার

১ অক্টোবর।

শিক্ষামন্ত্রী জনাব আব্বাস আলী খান-

শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন

.

        পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী জনাব আব্বাস আলী খান দেশের বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাবার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

 

        গত ২১শে সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রী বলেন, যুবসমাজ যাতে ইসলামের সত্যিকার শিক্ষা লাভ করতে পারে তার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক ও পুরোপুরি পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, এই প্রশ্নটিকে যদি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দেয়া হয় তবে যুব সমাজ অন্ধকারাচ্ছন্নই রয়ে যাবে এবং তাদের যে লক্ষ্যস্থল সেই পাকিস্তানের আদর্শ থেকে তারা বহুদূরে সরে থাকবে।

 

        জনাব আব্বাস আলী খান বলেন, ইসলামী অনুপ্রেরণামূলক শিক্ষা ছাড়া আমরা আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে পাকিস্তানের পটভূমিকা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে পারবো না।

 

        মন্ত্রী বলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাই আমাদের সকল ক্ষতির কারণ। বর্তমানের ধর্মনিরপেক্ষ ও অর্থহীন শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন না করা হলে আমরা কিছুতেই আমাদের ধ্বংসকে রোধ করতে পারবো না।

 

        শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এই সব ক্ষতি পূরণের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে তিনি খুব শিগগীরই বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভাইস চ্যান্সেলর ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের এক সম্মেলন আহ্বান করতে পারেন। তিনি বলেন দেশের সাধারণ মানুষও এই চায়।

 

        জনাব আব্বাস আলী খান বলেন, অবশ্য এই পরিবর্তন রাতারাতিই সাধিত হবে না। এই পরিবর্তন হবে পর্যায়ক্রমে এবং দ্রুততার সাথে। রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভবপর নয় এবং তাতে করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

        শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন হতে হবে যাতে আমরা বিজ্ঞানী, দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার গড়ে তুলতে পারবো আর সে সাথে গড়ে তুলতে পারবো খাঁটি মুসলমান। তিনি বলেন, ধরম মানে শুধু আচার অনুষ্ঠানই নয়। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। আমাদের রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্যপ্রভৃতি সবই অবশ্যই ইসলামের ভিত্তিতে হতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

        বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষায়তনে ছেলেমেয়েদের যে সহ-শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে সে সম্পর্কে তাঁর মত জানতে চাওয়া হলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এ বয়স্থা অত্যন্ত ক্ষতিকর। তিনি বলেন, এ ব্যবস্থা অবশ্য পরিত্যাজ্য।

……………

পাক সমাচার

১ অক্টোবর।

বাণিজ্য মন্ত্রী জনাব আখতার উদ্দিন আহমদ-

সংহতি রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান

.

        প্রাদেশিক বাণিজ্য ও শিল্প এবং আইন বিষয়ক মন্ত্রী জনাব আখতার উদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের সংহতি, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার জন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

 

        গত ২৬শে সেপ্টেম্বর বিকেলে মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউটে তেজগাঁও ও রমনা থানা সম্বর্ধনা কমিটি কর্তৃক তাঁর সম্মানে আয়োজিত এক সম্বর্ধনা সমাবেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন। পাকিস্তানের আন্দোলনের পটভূমি ব্যাখ্যা করে জনাব আখতার উদ্দিন বলেন, উপমহাদেশের এই অংশের মুসলমানরা হিন্দুদের দ্বারা নিষ্ঠুরভাবে শোষিত হয়েছেন। হিন্দুদের সাথে একত্র বসবাস করা একদম অসম্ভব জেনেই কায়েদে আজমের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয় এরই পরিণতি স্বরুপ মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

        তিনি জনসাধারণ বিশেষ করে তরুণ সমাজকে দেশের বর্তমান সংকট মুহূর্তে তাদের উপর যে গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, তা অনুধাবনের আহ্বান জানান।

 

        তিনি বলেন, আল্লাহ না করুক, পাকিস্তান যদি ধ্বংস হয়ে যায় তা হলে মুসলমানরা তাদের আলাদা বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলবে এবং হিন্দুদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়বে।

 

        পাকিস্তানকে সকল রকম শোষণমুক্ত একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার ব্যাপারে তিনি জনগনকে সরকারের সাথে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

……………

পাক সমাচার

১ অক্টোবর।

 

জাতিসংঘের প্রতি প্রাদেশিক তথ্যমন্ত্রী

জনাব ওবায়দুল্লাহ মজুমদার-

পাকিস্তানী উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা বিধান করুন।

.

        ভারতের তথাকথিত আশ্রয় শিবিরে যে উদ্বাস্তু সীমাহীন দুর্দশায় তাদের দিন কাটাচ্ছে, ভারত যাতে তাদের পাকিস্তান প্রত্যাবর্তনের সুযোগ দেয় তার নিশ্চয়তা বিধান তথা এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী জনাব ওবায়দুল্লাহ মজুমদার ২৮শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের প্রতি আকুল আহ্বান জানান।

 

        বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত এমএএন জনাব মজুমদার দু মাস কাল ভারতীয় শিবিরে কাটিয়ে পাকিস্তান প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি উদ্বাস্তুদের জীবন-যাত্রার এক করুণ চিত্র তুলে ধরেন। তারা দারিদ্র ও ব্যাধির কবলে পড়ে অসহায় হয়ে কাতরাচ্ছেন। মৃত্যু তাদের গ্রাস করছে।

 

        ভারতের তথাকথিত শিবিরের জীবনযাত্রা সম্পর্কে তার তিক্ত অভিজ্ঞতা হতে জনাব মজুমদার বলেন যে, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, কর্মী, নবনির্বাচিত এমএএন ও এমপিএ, ছাত্র ও সাধারণ মানুষসহ সকল পাকিস্তানী উদ্বাস্তুই আজ বিভ্রান্ত ও হতাশাগ্রস্তও। তারা সকলেই ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে। ভারত তার গোপন স্বার্থ উদ্ধারকল্পে এদের ব্যবহার করছে।

 

        তিনি বলেন, কতিপয় উগ্রপন্থী ছাড়া সকলেই আজ অবস্থার স্বীকার হয়েছে। এদের সকলেই নিজের দেশে স্বাধীন ও সম্মানিত নাগরিক হিসাবে পুনরায় নতুন করে জীবন শুরুর নিমিত্ত তাদের ঘরবাড়ীতে ফিরে আসার জন্য খুবই আগ্রহী ও মরিয়া হয়ে উঠেছে কিন্তু ভারতের প্রচারণার মাধ্যমে যে সব বিদ্বেষপূর্ণ হীন প্রচারণা চলছে। তথা আরও নানা রকম বাধা সৃষ্টির দরুন তারা তাদের বাড়ী ঘরে ফিরতে পারছে না।

 

        মন্ত্রী বলেন, তিনি তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারেন যে ভারত সর্বদাই উদ্বাস্তুদের সংখ্যা বাড়িয়ে বলছে। তিনি আরও জানান যে, হিন্দু মুসলমানদের প্রতি দু-রকম ব্যবহার করা হচ্ছে, তাও তিনি দেখেছেন। তিনি নিজে স্ত্রী পুত্রসহ প্রায় দু’মাসকাল যে ক্যাম্পে অবস্থান করেছেন, সেটা ছাড়াও আগরতলা, বেলেনিয়া ও অন্যান্য স্থানের শিবির তিনি পরিদর্শন করে তা প্রত্যক্ষ করেছেন।

 

        এসব ক্যাম্পের সাধারণ অবস্থা সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন যে, এসব ক্যাম্পের অবস্থা খুবই অস্বাস্থ্যকর। লোকজনদের স্বল্প পরিসরে ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়েছে। খাদ্য সরবরাহও খুবই অনিয়মিতও। চিকিৎসার অভাবে পুষ্টিহীনতার দরুন আমি নিজেই প্রতিদিন শিশুদের মরতে দেখেছি। তিনি বলেন, তবে পাকিস্তানী এমএনএদের একটা মাত্র সুবিধা দেয়া হয়, তা হলো একটা ছোট্ট ঘরে তাদের দু-তিনজনকে একটা খাটিয়ার ওপর একত্রে থাকতে দেয়া হয়। অন্যদের নিজেদেরই তাদের ব্যবস্থা করে নিতে হয়।

 

        জনাব মজুমদার বলেন যে, ভারতে অবস্থানকালে কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ঢাকা জেলার প্রায় ৩০ জন এমএএন ও এমপিএ- এর সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তিনি এদের সকলকেই হতদ্যেম ও আতংকগ্রস্ত দেখতে পান। কলকাতাসহ পশ্চিম বঙ্গের অপরাপর অংশে যেসব এমএএন ও এমপিএ অবস্থান করছেন, তাদের অবস্থাও একইরুপ। আমি সেখানে শুনেছি যে, তারাও পাকিস্তানে ফিরে আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সকল বাধা সৃষ্টি করছে বলে তিনি জানান।

 

        জনাব মজুমদার বলেন যে, তিনি নিজে প্রথম সুযোগ গ্রহণ করেই পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসেছেন। তিনি বলেন, আমি সব সময়েই পাকিস্তানী ছিলাম, সর্বদাই পাকিস্তানী এবং কখনই পাকিস্তান বিরোধী নই। তবে গোলযোগের সময় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তথায় আশ্রয়গ্রহণে বাধ্য হই। তবে তথায় থাকাকালে সব সময়ই আমি সীমান্ত অতিক্রমের সুযোগ খুঁজছিলাম এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথা অপরাপর ভারতীও কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি এড়িয়ে পলায়নের প্রথম সুযোগই আমি গ্রহণ করি।

 

ছাত্রদের সম্পর্কে জনাব মজুমদার বলেন, তথায় বহুসংখ্যক ছাত্রের সাথেই তার সাক্ষাৎ হয়েছে। এদের অনেকেই তার ছাত্র। তাদের হত্যা করা হবে এ ধরনের গুজবে আতংকগ্রস্ত হয়ে তারা ভারত গমন করে। ভারতে ছাত্রদের আশ্রয় স্থানও নেই। খাবার ব্যবস্থাও নেই। কোন রকম কাজ না করে শুধু ঘুরে বেড়ানোর কোন অধিকার তাদের নেই এধরণের তিরস্কার ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের অহরহই করছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তাদের সামরিক ট্রেনিং প্রদানের নির্দেশ প্রদান করছে।

 

        তিনি বলেন যে, খাওয়া থাকার ব্যবস্থা না থাকায় তারা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ট্রেনিং গ্রহণের জন্য নাম লিখাচ্ছে। ট্রেনিং ক্যাম্পে তাদের মস্তিষ্ক ধোলাই করা হচ্ছে। অতঃপর পূর্ব পাকিস্তানের ব্রীজ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহ বিনষ্ট করার কাজে নিয়োগ করা হচ্ছে। তাদের কাজের ব্যাপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ করা নজর রাখে। মন্ত্রী বলেন, তিনি জানতে পেরেছেন যে, এদের মধ্যে অনেকেই তাদের মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র পুকুর ও জঙ্গলে ফেলে দিয়ে পাকিস্তান থেকে ফিরে গিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে তাদের সফল অভিযানের কাহিনী শুনায়। এ-ভাবেই অবস্থার শিকারে এসব তরুণরা নিজেদের জান বাঁচাতে চেষ্টা করে।

 

        জনাব মজুমদার পাকিস্তানে ফিরে এসে পুনরায় পড়াশুনা শুরু করার জন্য তরুণ সমাজের প্রতি আবেদন জানায়। তিনি বলেন, এদের জন্য আমার প্রাণ কাঁদছে, কারণ শিক্ষক হিসাবে আমি বহুকাল তাদের মধ্যে অতিবাহিত করেছি। নিজের দেশের সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করে তারা শুধু ভারতের গোপন দুরভিসন্ধি পূরণের পক্ষেই কাজ করছে। মাই নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে একদিন তারা তাদের এ ধরনের কাজের জন্য অনুতপ্ত হবে।

……………

 

 

দৈনিক পাকিস্তান

২ অক্টোবর।

 

আউংশুপ্রু-

প্রদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের

অভিযোগ মিথ্যা

.

        পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী মিঃ আউংশুপ্রু গতকাল শুক্রবার প্রদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের নির্যাতন ও হয়রানি সংক্রান্ত ভারতীয় অভিযোগ খণ্ডন করেন। এপিপির সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে প্রেসিডেন্ট ও গভর্নর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের বারবার পুরোপুরি রক্ষার আশ্বাস এবং সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা দানের নিশ্চয়তা দিয়েছে।

 

তিনি বলেন যে, প্রাদেশিক মন্ত্রীদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে প্রদেশের পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে জনমনে আস্থা সৃষ্টি করা। এ কাজে সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যাপারে আরো গুরুত্ব আরোপ করবেন। পূর্ব পাকিস্তানের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকেরা অনুগত, শান্তিপ্রিয় ও দেশপ্রেমিক এবং তাদের প্রতি সরকারের আচরণ খুবই চমৎকার ও উদার।

 

তাদের কখনো বিরক্ত করা হয়নি। সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর লোকেরা বরং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সহায়ক। মন্ত্রী বলেন, ভারত পাকিস্তানের ঐক্য নষ্ট করার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের জন্য ভারতীয়দের কোন প্রীতি নেই। সে পাকিস্তানকে ধ্বংসের নীতি অনুসরণ করে চলছে। ভারতীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রীর সাথে যৌথ সম্মেলনের ব্যাপারে গভর্নর ডাঃ মালিকের প্রস্তাব সম্পর্কে তাঁর মতামত জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রী বলেন যে এই প্রস্তাব সম্পর্কে ভারতের কাছ থেকে এখনো কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, সংখ্যালঘুই হোক আর যেই হোক পূর্ব পাকিস্তানের কারো জন্য ভারতের ভালবাসা নেই।

 

মিঃ আউংশুপ্রু পূর্ব পাকিস্তানে বৌদ্ধ মন্দির ধ্বংসের ভারতীয় প্রচারণাকে ডাহা মিথ্যা বলে বর্ণনা করেন।

 

…………………

 

 

দৈনিক পাকিস্তান

১৩ অক্টোবর।

 

খুলনায় রাজস্ব মন্ত্রী

রাজাকারদের ভূয়সী প্রশংসা

.

খুলনা, ১১ই অক্টোবর (এপিপি)। পূর্ব পাকিস্তানের রাজস্ব মন্ত্রী মওলানা এ,কে,এম ইউসুফ রাজাকারদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। গতকাল এখানে জেলা স্কুল মিলনায়তনে তিনি রাজাকারদের এক সমাবেশে ভাষণ দান করছিলেন। দুষ্কৃতিকারী ও ভারতীয় সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারীদের কার্যকলাপ দমনের জন্য রাজাকাররা যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে এতে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

 

        তিনি বলেন, রাজাকাররা শুধু অনুপ্রবেশকারীদের হামলাই সাফল্যের সাথে প্রতিহত করেনি, তারা বেশ কিছু সংখ্যক দুষ্কৃতিকারী ও ভারতীও ছাপমারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। মওলানা এ,কে,এম ইউসুফ ভাষণ দানকালে ঘোষণা করেন যে, দেশের সার্বভৌমত্বের উপর হামলার যেকোন অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের পেছনে আমাদের সাহসী জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকবেন।

 

এর পূর্বে সমাবেশে ভাষণ দানকালে খুলনায় ডেপুটি কমিশনার এবং জেলা রাজাকার কমান্ডার খুলনায় রাজাকারদের কার্যকলাপের ভূয়সী প্রশংসা করেন। রাজস্ব মন্ত্রী আজম খান কমার্শিয়াল কলেজ মিলনায়তনে ইসলামী ছাত্রসংঘ আয়োজিত এক সভায়ও ভাষণ দেন।

 

তিনি ছাত্রদের পড়াশুনায় মনোযোগ দানের আহ্বান জানান। তিনি ছাত্রদের নিকট পাকিস্তান আন্দোলন পটভূমি ব্যাখ্যা করেন। সীমান্তের অপর পারে চলে যাওয়া ছাত্রদের দেশে ফিরে এসে জাতি গঠনমূলক কাজে অংশগ্রহণেরও আহবান জানান।

………………

 

 

দৈনিক পাকিস্তান

১৮ অক্টোবর।

অর্থমন্ত্রী আবুল কাসেমের বেতার ভাষণ

উদ্বাস্তুদের প্রতি স্বদেশে ফিরে আসার আহ্বান

.

পূর্ব পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল কাসেম গত শনিবার প্রদেশবাসীর উদ্দেশ্যে রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র থেকে এক ভাষণদান করেন। নিম্নে তার পূর্ণ বিবরণ দেয়া হলোঃ

 

“জাতীয় জীবনের চরম সন্ধিক্ষণে প্রদেশে মন্ত্রীসভা গঠিত হয়েছে। এমন সংকটকালে মন্ত্রীসভায় যোগদান করে যে দায়িত্ব বরণ করে নিয়েছে তা অত্যন্ত গুরুতর ও দুর্বহও। দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেই এ গুরুভার কাঁধে নিয়েছি। কারণ এটিকে জাতীয় ও মানবিক কারণ বলেই মনে করেছি। বহিঃশত্রুর চক্রান্তে যখন দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন, জনজীবন বিপর্যস্ত, প্রতিটি মানুষ দিশেহারা তখন শুধুমাত্র নীরব, নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করাকে জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করারই সামিল বলে গণ্য করেছি।

 

তাই আমাদের ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে আমরা এগিয়ে এসেছি। আমাদের সাফল্য নির্ভর করছে আপনাদের সক্রিয় সহযোগিতার উপর। একটি বিদেশি শক্তির চক্রান্তের ফলে প্রদেশে হত্যা, লুণ্ঠন ও সম্পদ নাশের যে নারকীয় বিভীষিকার সৃষ্টি হয়েছিল তাতে পাকিস্তানের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয় এবং পরিস্থিতি সামরিক হস্তক্ষেপকে অনিবার্য করে তোলে।

 

রাস্ত্রবিরোধী শক্তিগুলোর অশুভ তৎপরতা তখন প্রদেশময় পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়েছিল। সেগুলোকে দমন করার জন্য সৈন্যবাহিনীকে কর্তব্যভার গ্রহণ করতে হয়। রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিগুলো তাদের কৃত পাপের দায়িত্ব নিরপরাধ মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়ে সরে পড়লো। মানুষ তখন একান্ত অসহায়, বিমূঢ়, হতবাক ও দিশেহারা। তাদের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই। তাদের এমন অসহায় অবস্থায় আমরা চুপ থাকতে পারিনি।

 

আমরা এগিয়ে এলাম। শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করলাম। শান্তি কমিটি গঠনের ব্যবস্থা করা হলো। অচিরেই তা সাড়া দেশে সম্প্রসারিত হয়। আতংকগ্রস্ত ভেঙ্গে পড়া মানুষের মনে নিরাপত্তার ভাব ফিরে আসতে লাগলো। ছেড়ে যাওয়া বাড়িঘরে তারা ফিরে এলো। অনেকটা আস্থা ও স্বস্তির ভাব তারা ফিরে পেলো। খোদার দরবারে অশেষ শুকুরিয়া, সমগ্র প্রদেশের মানুষ যখন হাহাকার করছে সেই মহাসংকটের দিনে আমরা এগিয়ে এসে অন্ততঃ কিছু জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে পেরেছি।

 

মাসুম মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার যে সংকল্প গ্রহণ করেছি আল্লাহতা’য়ালা তা রক্ষার জন্য যেন তওফিক দান করেন।

 

প্রিয় ভাই-বোনেরা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ঘৃণ্য কারসাজিতে দেশের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। পাকিস্তানের ভিত্তিমূলে সে মারণ আঘাত হানতে উদ্যতও। সর্বশক্তিতে এবং সর্বস্ব পণ করে প্রতিহত করতে হবে। পাকিস্তান আমাদের সে বাঁচলে আমরা বাঁচবো জাতি হিসাবে অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবো।

 

আমাদের ঈমান-আমান, সুখ-সমৃদ্ধি সবই পাকিস্তানের অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং আজকের সংগ্রাম হবে পাকিস্তানকে রক্ষা করার সংগ্রাম, পাকিস্তানবিরোধী চক্রান্তকে বানচাল করে দেয়ার সংগ্রাম। এ কথা উপলব্ধি করতে হবে যে, এই গরীব দেশের মানুষের শ্রমে, অর্থে ও রক্তে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে তিল তিল করে যে সম্পদ গড়ে উঠেছে তা ধ্বংস করে দেয়ার অর্থ প্রদেশের মানুষকেই বঞ্চিত করা, তাদের এবং ভাবী বংশধরদের চরম সর্বনাশ সাধন করা।

 

পরের উস্কানীতে নিজের ঘরে কি কেউ আগুন লাগায়। নিজেদের ঘরে আগুন দেওয়ার খেলায় যারা মত্ত হয়ে উঠেছে তারা কি এর পরিণাম একবারও ভেবে দেখবে না। দেশের শিল্পবাণিজ্য, রেল, ষ্টীমার, বাস-ট্রাক, ষ্টীমার-লঞ্চ, সড়ক, সেতু ইত্যাদি সম্পদ আপনাদের অর্থে ও কল্যাণেই গড়ে উঠেছে। এগুলো যারা ধ্বংস করে দিচ্ছে তারা আপনাদেরই সর্বনাশ সাধন করছে। আবার এগুলো গড়ে তুলতে কত শ্রম ও সময়ের দরকার হবে। আর সে অর্থ আসবেই না কোথা থেকে। এদেশের কোটি কোটি অনাহারী-অর্ধাহারী মানুষকেই তো সে অর্থ যোগাতে হবে। চক্রান্তপরায়ণ প্রতিবেশীর প্রচারণায় ও মিথ্যা স্তোক বাক্যে বিভ্রান্ত হয়ে যারা আত্মঘাতী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়ে পড়ছে তারা কি একবার ভেবে দেখবে না যে, এসব কার্য দ্বারা তারা কার দুরভিসন্ধি চরিতার্থ করছে আর কাদের ধ্বংস ও বিনাশের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিকল করে দিয়ে প্রদেশের সর্বত্র খাদ্যশস্য পৌঁছানো ব্যাহত করার হীন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, সুতরাং এ কথা নিঃসন্দেহে বলা চলে যে যারা এসব নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত রয়েছে অথবা যারা তাদের কাজে সাহায্য করেছে তারা প্রদেশের জনগণের কল্যাণকারী নয়, তারা তাদের পরম শত্রু। এরা গণদুশমন, এরা মানবতার শত্রু। দেশের অস্তিত্বের মূলে এরা আঘাত হানছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চরম বিপর্যয় দেখা দিবে।

 

প্রদেশে দারিদ্র ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তাতে প্রদেশের গোটা জনসমষ্টিই সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বে। তাই আসুন, সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এই সব গণদুশমনদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। বিভ্রান্ত হয়ে যারা এদেশ ছেড়ে শত্রু দেশে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের আবেদন, আপনারা আপনাদের নিজেদের হাতে গড়া পাকিস্তানের পাক ভূমিতে নির্ভয়ে ফিরে আসুন এবং পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করুন।

 

এদেশ আপনাদেরই এদেশে সসম্মানে বাস করার আপনাদের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। সে অধিকার কেউ হরণ করে নিতে পারবে না। আমি নিশ্চিত আশ্বাস দান করছি। আপনাদের আশংকার কোন কারণ নেই। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাঁদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। যাঁরা গৃহহীন হয়েছেন তাঁদের পুনর্বাসন করা হবে। যারা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তাঁদের জীবন-ধারণের ব্যবস্থা করা হবে। পরভূমে পরপ্রত্যাশী হয়ে বহু দুঃখে, বহু বিড়ম্বনায়আপনারা দিন অতিবাহিত করেছেন। কিন্তু মন আপনাদের পড়ে আছে ফেলে যাওয়া পাকিস্তানের প্রিয়তম বাস্তুভিটার উপর।আপনাদের বাস্তুভূমি আপনাদের গৃহাঙ্গন হাতছানি দিয়ে আপনাদের ডাকছে-আপনার ফিরে আসুন। আপনাদের নিরাপত্তার পূর্ণ দায়িত্ব আমরা গ্রহণ করেছি। আপনার ফিরে এলে সব সমস্যার সমাধান আমরা একত্রে বসে করতে পারবো। দুষ্কৃতিকারীদেররোষানলের শিকার হয়ে আপনাদের অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত, অনেকেই সর্বস্বান্তহয়ে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত নিরাপরাধ ব্যক্তিদের এবং সর্বহারাদের পুনর্বাসনের নানাবিধ ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে।

 

আপনাদের স্বাভাবিকজীবনধারায় পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংকল্প নিয়েই আমরা মন্ত্রিসভায় যোগদান করেছি। পরম নিষ্ঠার সাথে এ সংকল্প আমরা পালন করে যাব। এ ব্যাপারে আমাদের কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আপনাদের সক্রিয় সহযোগিতা একান্ত অপরিহার্য। হতাশা বর্জন করে দৃঢ় মনোবল নিয়ে আপনাদের এগিয়ে আসতে হবে। এ বিশ্বাস আপনাদের রাখতেই হবে যে, দুর্যোগের অবসান ঘটবেই জীবনে আবার প্রতিষ্ঠিত হবেন।

 

সুদিন আবার আসবে। বিধ্বস্ত গৃহের আঙ্গিনা আবার আনন্দে মুখরিত হয়ে উঠবে। এ সবগুলোই নির্ভর করেছে পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তায়। সুখি ও শক্তিশালী পাকিস্তান আপনার সুখ ও শক্তির উৎস। অখন্ড পাকিস্তানই আপনাদের সুখ-সমৃদ্ধি ও মর্যাদাকে সুনিশ্চিত করতে পারে।

 

পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্যে আমরা সবাই যদি অবিচল থাকতে পারি তাহলে দুশমন রাষ্ট্রের শক্র শক্তিগুলো আপনা থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়বে। সকল দুরভিসন্ধি বানচাল হয়ে যাবে। শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে আসবে সকল অচলাবস্থার অবসান ঘটবে। জীবন আবার গতিময় হয়ে উঠবে। আসুন আমরা সকলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানের দুশমনদের মোকাবিলা করি এবং পাকিস্তানকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নতুন শপথ গ্রহণ করি।

 

আল্লাহ আমাদের সহায়ক হবেন”।

……………………….

 

দৈনিক পাকিস্তান

২০ অক্টোবর।

শিক্ষামন্ত্রীর বেতার ভাষণ

ছাত্রদের প্রতি ফিরে আসার আহ্বান

.

প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী জনাব আব্বাস আলী খান গতকাল মঙ্গলবার সীমান্তের ওপারে বা এপারে ছাত্র সমাজের প্রতি নির্ভয়ে দেশে ফিরে এসে তাদের শিক্ষা জীবন শুরুর আকুল আবেদন জানিয়েছেন। এপিপির খবরে প্রকাশ, এক বেতার ভাষণে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট যে সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন তা আমাদের শুভেচ্ছারই প্রমাণ বহন করছে।

 

তিনি বলেন যে, আমাদের মধ্যে যারা শক্রর দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হয়েছে, শিক্ষা জীবনে তাদের পুর্নবাসন করাই আমাদের কর্তব্য। তিনি বলেন যে, তাঁর কাছে সব ছাত্রই নির্দোষ। তাদের সকল অপকর্মের জন্য বিপথগামী নেতৃত্ব ও ভুল শিক্ষানীতিই দায়ী।

 

বর্তমান সরকার এই শিক্ষানীতি পরিবর্তনে বদ্ধপরিকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন যেছাত্রদের যাতে একটা বছর নষ্ট করতে না হয়, তার জন্য কিছু করা যায় কিনা সরকার তা বিবেচনা করে দেখছে।

 

…………………

 

দৈনিক পাকিস্তান

২২ অক্টোবর।

 

সিলেটের গ্রামে আইনমন্ত্রী

দেশকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য

জনগণ ভোট দেয়নি

.

মৌলবী বাজার, ১৯শে অক্টোবর। -আইন ও পার্লামেন্টারী মন্ত্রী জনাব জসীম উদ্দিন আহমেদ রাজনগর থানা ট্রেনিং ও উন্নয়ন কেন্দ্রে এক বিরাট জনসভায় ভাষণদানকালে বলেন, তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস জনগণ বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগের ৬ দফার পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ভোট দিয়েছেন। ভারতের সাহায্যে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নয়।

 

তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট দেশে গণতান্ত্রিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি নয়া শাসনতন্ত্র ও জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের উল্লেখ করেন। মন্ত্রী বলেন নয়া শাসনতন্ত্রে জনগণের আশা-আকাংখার প্রতিফলন ঘটবে।

 

আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনতাঁর দলেরও দাবী এবং দলীয় প্রধান জনাব নূরুল আমিন শাসনতন্ত্রে অন্তর্ভূক্তির জন্যে প্রেসিডেন্টের কাছে আট দফা দাবী পেশ করেছেন। মন্ত্রী বানারাইতে তাঁর গ্রামের বাড়ী যান এবং পারিবারিক গোরস্তানে ফাতেহা পাঠ করেন।

 

তিনি  বলেন, আমাদের জাতীয় সেনাবাহিনীর হাত শক্তিশালী করার জন্য তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।

………………………………

 

দৈনিক পাকিস্তান

২২ অক্টোবর।

 

কুষ্টিয়া গ্রামে নওয়াজেশ আহমেদ

ভারতীয় প্রচারণায় কর্ণপাত না করার আহ্বান

 

আলমডাঙ্গা, (কুষ্টিয়া) ২ মে অক্টোবর। -খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী জনাব নওয়াজেশ আহমেদ যে সকল উদ্বাস্তু এখনো সীমান্তের অপর পারে রয়েছেন তাদের সত্বর এসে পাকিস্তানের প্রকৃত নাগরিকের মতো স্বাভাবিকজীবন শুরু করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

 

মন্ত্রী চার দিনব্যাপী কুষ্টিয়া ও যশোর জেলা সফর উপলক্ষে ঢাকা থেকে এখানে এসে এক সভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। জনাব নওয়াজেশ আহমেদ বলেন যেসরকার ইতিমধ্যেই প্রত্যাবর্তনকারীদের বাড়ী-ঘরে ত্বরিত পুনর্বাসনের উপর্যুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, তারা এখানে পুরোপুরি নিরাপদে থাকবেন। তিনি তাঁদের সীমান্তের ওপারের অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণায় কর্ণপাত না করার উপদেশ দেন।

 

মন্ত্রী ছাত্রদের নিয়মিত ক্লাসে যোগদান এবং পাকিস্তানের খাঁটি দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে ভবিষ্যতের দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তাদের উপকারের জন্যই সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রমজানের ছুটি বাতিল করেছেন।

…………………………

 

 

দৈনিক পাকিস্তান

২৭ অক্টোবর।

 

বুদ্ধিজীবীদের প্রতি তথ্যমন্ত্রী

মাতৃভূমি রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীর

পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়ান

.

কুমিল্লা, ২৬ শে অক্টোবর। -পূর্ব পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী জনাব মুজিবুর রহমান বুদ্ধিজীবীদের বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে জনমত গঠন করে ভারতীয় হামলার মুখে মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীর পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবার আহ্বান জানিয়েছেন।

 

তিনি  স্থানীয় টাউন হলে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ও শিক্ষক সমাবেশে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। মন্ত্রী বর্তমানে সংকটের সঠিক ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরার ক্ষেত্রে শিক্ষাবিদদের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেন।

 

জনাব রহমান আবুল কালাম আজাদ, আবদুল গাফফার খান ও গান্ধীর অভিজ্ঞতা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে ভারতের বর্তমান ভূমিকা পূর্ব পাকিস্তানিদের জনগণের প্রতি সহানুভুতি থেকে উদ্ভূত নয় বরং পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য।

…………………

পাক সমাচার

২৯ অক্টোবর।

 

শ্রমমন্ত্রী জনাব এ,এস,এম সোলায়মানের আহ্বান

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য তৎপর হতে হবে

.

   পূর্ব পাকিস্তানের শ্রম, সমাজকল্যাণ ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী জনাব এ,এস,এম সোলায়মানের সকল রকমের ভারতীয় ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতার বিরুদ্ধে সর্বদা সতর্ক থাকার জন্য শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের প্রতি গত ২৪শে অক্টোবর আবেদন জানিয়েছেন।

 

তিনি বলেন, এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী লোকেরা আমাদের শক্রদের হাতের পুতুল হিসেবে কাজ করছে।

 

টাঙ্গাইলে সমাজের বিভিন্নস্তরের লোক ও শান্তি কমিটি কর্মীদের এক সমাবেশে তিনি ভাষণদানকালে উক্ত মন্তব্য করেন।

 

জনাব সোলায়মানদেশের উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য সবাইকে নিজ নিজ শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

 

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক তৎপরতার গতি অব্যাহত রাখার জন্য পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা যাতে বিঘ্নিত না হয় সে সেদিকে নজর রাখতে হবে এবং জনগণকে স্বাভাবিককাজ কর্ম চালিয়ে যেতে দিতে হবে। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে তাদের অন্তর্ঘাতী কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে দেওয়া হলে তাতে শক্রদের উদ্দেশ্যই হাসিল হবে।

 

 

 

 

 

 

মাতৃভূমি রক্ষার জন্য আত্মত্যাগের প্রয়োজন

 

মন্ত্রী জনাব এ,এস,এম সোলায়মান পাকিস্তানের জন্য বাঁচা ও পাকিস্তানের জন্য মরার জন্য জনগনের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছেন।

 

নারায়নগঞ্জ মহকুমার বৈদ্যের বাজারে এক বিরাট জনসভায় তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন। জনাব সোলায়মান তার ভাষণে বলেন, মাতৃভূমি রক্ষার জন্য আত্মত্যাগের চেয়ে বড় ত্যাগ আর কিছুই হতে পারে না। তিনি ঘোষণা করেন যে, বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাঅক্ষুন্ন রাখার জন্য সকল দেশপ্রেমিক নাগরিক আজ ঐক্যবদ্ধ।

 

জনাব সোলায়মান তার নিজ থানা সফরে গেলে তাকে বিপুলভাবে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, দেশ বিভাগের আগে কিংবা জনাব সোলায়মানই হচ্ছে নারায়নগঞ্জ মহকুমা থেকে নিযুক্ত প্রথম মন্ত্রী

 

……………………….

 

পাক সমাচার

২৯ অক্টোবর।

 

চট্টগ্রামে অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল কাসেম’র আশ্বাস

প্রতি ইউনিয়নে প্রয়োজনীয় সংখ্যক রাজাকার থাকবে

.

প্রদেশে হিংসাত্মককার্যকলাপের যে সকল বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটেছে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিরাশ না হওয়ার জন্য প্রাদেশিক অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল কাসেম জনগনের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। সরকার নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বনকরছে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

 

চট্টগ্রাম মুসলিম ইন্সটিটিউট হলে আয়োজিত বিভিন্ন স্তরের লোকের এক সমাবেশে বক্তৃতাকালে তিনি এ কথা বলেন।

 

মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার রাজারকারকে ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। ট্রেনিং শেষে এদেরকেঅস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে প্রতি ইউনিয়নে নিয়োগ করা হবে। রাজাকারদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে এক লাখে উন্নীত করা হবে। প্রতি ইউনিয়নে প্রয়োজনীয় সংখ্যক রাজাকার থাকবে। এ ছাড়া রয়েছে পুলিশ বাহিনী। ইতিমধ্যে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি পুলিশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসছে। তিনি বলেন, বেসামরিক সরকার গঠনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে জনমনে আস্থার ভাব ফিরিয়ে আনা। ইনশা আল্লাহ শীঘ্রই অবস্থার উন্নতি হবে।

 

সীমান্ত অতিক্রম করে যে সকল যুবক ভারতে চলে গেছে তাদের উদ্দেশ্য করে মন্ত্রী বলেন, ভারতীয় মিথ্যে প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে অপর পারে গিয়ে তারা যে ব্যবহার পেয়েছে এবং যে অশেষ দুর্গতি পুইয়েছে তাতে তাদের ভ্রান্তি কেটে গেছে। এখন উচিত স্বদেশেতাদের প্রত্যাবর্তন করা। তারা আমাদেরই ছেলে। তারা রাগ করে পালিয়ে গেছে। আমরা তাদের মাফ করে দিয়েছি। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, কেন আপনারা আপনাদের ভাইকে হত্যা করবেন?

 

একজন মোহাজের বক্তার প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, মোহাজেরদের প্রতি এখানে যা ঘটে গেল একজন বাঙ্গালী মুসলমান হিসেবে তিনি তার জন্য লজ্জিত ও দুঃখিত। এতিম, বিধবা ও অভিভাবকহীন মোহাজের পরিবারের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সরকার করবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

 

এ ছাড়া গত গোলযোগে স্থানীয় যে সকল লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সরকার তাদের পুনর্বাসন সহায়তা করবেন। মোট কথা ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি লোকের পুনর্বাসনের জন্য এক ব্যাপক পরিকল্পনার তৈরি করা হচ্ছে। এ কাজ সম্পন্ন হলেই এর বাস্তবায়নের হাত দেওয়া হবে।

 

মন্ত্রী বলেন, যখন কোন দুর্যোগ আসে তখন ভাল ও মন্দ সকল লোকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেরুপভাবে গত গোলযোগে পূর্ব পাকিস্তানে এমন কোন লোক নেই যিনি কোন না কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হননি। তিনি বলেন, আমরা অনেক ভুল করেছি। এর জন্য প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে। এখন আমাদের উচিত সবকিছু ভুলে যাওয়া।

 

পাক-ভারত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ভারতীয় রণহুংকারের কাছে পাকিস্তান নতি স্বীকার করবে না। আমরা জানি কি করে যুদ্ধ করতে হয়। শক্র নিশ্চিহৃ করতে আল্লাহ মুসলমানদের সহায় হবেন ইসলামের ইতিহাসে এর বহু নজির রয়েছে।

……………………..

 

 

পাক সমাচার

২৯ অক্টোবর।

 

সাহায্য মন্ত্রী অধ্যাপক শামসুল হকের আবেদন

দেশ সেবায় আত্মনিয়োগ করতে হবে

.

সাহায্য ও পুনর্বাসন মন্ত্রী অধ্যাপক শামসুল হক সম্প্রতি চট্টগ্রাম বলেন যে, রাজনৈতিক গোলযোগ ক্ষতিগ্রস্ত উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য একটি সর্বাত্মক স্কীম তৈরি করা হচ্ছে।

 

জেলা কাউন্সিল হলে চট্টগ্রাম পৌরসভা ও শহর কমিটির সদস্যদের উদ্দেশ্যে ভাষণদানকালে তিনি বলেন যে, জনগনের সুখে-দুঃখে তাদের পাশে যাতে  তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারেন সে জন্য দেশের এই অত্যন্ত সংকটকালে তিনি তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

 

মন্ত্রী মানসিক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে বলেন যে, অতীতের বিরোধ ভুলে গিয়ে আমাদের দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করা উচিত। তিনি বলেন যে, বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে যে আদর্শের উপর পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে তার উপর ভিত্তি করেই আমাদের সমাজব্যবস্থা পুনরায় পুনর্গঠন করা যেতে পারে।

 

 প্রাদেশিক রিলিফ ও পুনর্বাসন দফতরের মন্ত্রী অধ্যাপক শাসসুল হক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অন্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করার ব্যাপারে জাতিসংঘের নীতি কার্যকারী করার জন্য তিনি জাতিসংঘের  প্রতিও আহ্বান জানান।

 

মন্ত্রী বলেন, যদি জাতিসংঘ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারতীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়, তবে এর পরিণতির দায়িত্ব তাদেরও গ্রহণ করতে হবে।

 

বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগ দল হতে নির্বাচিত সদস্য অধ্যাপক হক বলেন যে, জনগন আওয়ামী লীগকে ৬ দফা অথবাস্বায়ত্তশাসনেরদাবীতেই ভোট দিয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় ষড়যন্ত্রকারীরা ভারতের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে বিচ্ছিন্নতার দাবী করছে। এ প্রসঙ্গে তিনি আব্রাহাম লিঙ্কনের সময়কার আমেরিকার অবস্থার উদাহরণ দিয়ে বলেন, বিদ্রোহী কখনই সাফল্য লাভ করতে পারেনি।

 

তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে দেশত্যাগকারীদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। ভারত এই দেশত্যাগীর সংখ্যা অতিরঞ্জিত করে বলছে।

 

মন্ত্রী উপস্থিত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের তাদের ছেলেমেয়েদের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার আহ্বান জানান। তার মতে, জাতীয় আদর্শের প্রতি উদাসীনতাই আজকের সংকটের কারণ।

 

সিটি কলেজের অধ্যক্ষ জনাব রেজাউল করিম সভায় সভাপতিত্ব করেন।

 

…………………

 

 

পাক সমাচার

২৯ অক্টোবর।

 

বরিশালে শান্তি কমিটির সদস্যদের উদ্দেশে

শিল্পমন্ত্রী জনাব আখতারউদ্দিনের আহ্বান

.

প্রাদেশিক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী জনাব আখতারউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের সংহতি ও অখণ্ডতার জন্যে দুষ্কৃতিকারী ও ভারতীয় এজেন্টদের ঘৃণ্য তৎপরতা দৃঢ়তার সাথে প্রতিহত করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তার দলীয় কর্মী ও শান্তি কমিটির সদস্যদের উদ্দেশ্য ভাষণ দিচ্ছিলেন।

 

তিনি বলেন, ইসলাম ও মুসলমানদের নিরাপত্তার জন্যই পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছে।

 

 

 

পরিবহনে সংকট দূরীকরণের ব্যবস্থা

প্রাদেশিক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী জনাব আখতারউদ্দিন আহমদ বলেন যে, প্রদেশের পরিবহন সংকট দূরীকরণের জন্য শিগগিরই ট্রাক ও কোষ্টারের আরো চালান এসে পৌঁছাবে।

 

সম্প্রতি স্থানীয় বণিক সমিতিতে ভাষণদানকালে মন্ত্রী বলেন যে, নতুন চালান ৯০০ ট্রাকও জাপানী কোষ্টারসমূহও এসে পৌঁছাবে। আরও আমেরিকান কোষ্টার ও ক্ষুদ্র নৌযান পূর্ব পাকিস্তানে আসার পথে রয়েছে। এগুলো সরকার চার্টার করেছে বলে তিনি জানান।

 

মন্ত্রী ব্যবসায়ীদের ট্রাক খরিদ করার আহ্বান জানান। এসব ট্রাক কিস্তির ভিত্তিতে খরিদ করা যাবে। ব্যবসায়ীরা কোষ্টারসমূহও খরিদ করতে পারবেন বলে মন্ত্রী জানান।

 

স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য কাঁচামালের উপর ভিত্তি করে ক্ষুদ্র শিল্পকারখানা গড়ে তোলার জন্যও জনাব আহমদ ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দেন। এসব শিল্প প্রদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে বিশেষ সহায়ক হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

 

শিল্প বাণিজ্য খাত বর্তমানে যেসব অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে, তার উল্লেখকরে মন্ত্রী এ মর্মে আশ্বাস প্রদান করেন যে, সেসব অসুবিধা দূরীকরণে সরকার ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

 

দৈনিক পাকিস্তান

১২ নভেম্বর।

 

নান্দাইলে পূর্তমন্ত্রী

ভারতের দ্বিমুখী হামলার বিপদ

সম্পর্কে সচেতন থাকার আহ্বান

 

নান্দাইল (ময়মনসিংহ), ১১ই নভেম্বর (এপিপি)।-পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ত, বিদ্যৎ ও সেচ মন্ত্রী জনাব এ, কে মোশাররফ হোসেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের দ্বিমুখী আক্রমণের বিপদ সম্পর্কে পুরো সচেতন থেকে নিজেদের প্রস্তুত থাকার জন্য জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গত সোমবার এখানে তিন মাইল দূরবর্তী নান্দাইল রেলস্টেশনে এক বিরাট জনসভায় মন্ত্রী ভাষণ দিচ্ছিলেন। মন্ত্রী বলেন, ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ হামলা ছাড়াও আদর্শিক ও সাংস্কৃতিকআক্রমণ চালাচ্ছে। মন্ত্রী জনসাধারণকে প্রত্যক্ষ হামলার চেয়ে বেশী শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আক্রমণের প্রতিক্রিয়া অনুধাবন করার আহ্বান জানান।

 

তিনি বলেন, বর্তমান সংকটে পাকিস্তান আরো শক্তিশালী হয়েছে ও একটি দৃঢ়ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েছে।

 

 

দৈনিক পাকিস্তান

৩০ নভেম্বর।

 

জনগনের উদ্দেশে মাওলানা ইসহাক

সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সংযোগিতার আহ্বান

 

শাহজাদপুর (পাবনা), ২৯শে নভেম্বর (এপিপি)। -পূর্ব পাকিস্তানের মৌলিক গণতন্ত্র বিভাগের মন্ত্রী মওলানা মোহাম্মদ ইসহাক বিচ্ছিন্নতাবাদী ও বৈদেশিক হামলাকারীদের উৎখাতের ব্যাপারে সশস্ত্র বাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সাথে পূর্ণসহযোগিতা করার জন্য জনগনের প্রতি আকুল আবেদন জানান।

 

গতকাল স্থানীয় থানা উন্নয়ন কেন্দ্রে সমাজের বিভিন্ন স্তরে লোক ও সহকারী অফিসারদের এক সমাবেশ ভাষণদানকালে মন্ত্রী বলেন, জনগণকে একদিকে যেমন বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার দিকে তীব্র নজর রাখতে হবে, তেমনি আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শক্রদের উৎখাতের ব্যাপারে সশস্ত্র বাহিনীর সাথে পূর্ণ সহযোগিতাও করতে হবে।

 

তিনি বলেন, ইসলামের অনুশাসন মোতাবেক আমাদের জীবন ধারা গড়ে তুলতে হবে। মন্ত্রী বলেন, আমাদের মধ্যকার আঞ্চলিক সংকীর্ণ মনোভাব পরিত্যাগ ও ভাষার ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মুসলমান হিসেবে আমাদের সংস্কৃতি যে এক, তা অনুবাধন করতে হবে এবং আমরা একত্রে বসবাস করতে চাই-এই দৃঢ় সংকল্পে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।