অনিশ্চিত আশ্রয়

Posted on Posted in 14
শিরোনাম সূত্র তারিখ
৪৭। অনিশ্চিত আশ্রয়নিউজউইক১৪ই জুন, ১৯৭১

 

Ashik Uz Zaman

<১৪, ৪৭, ১০২-১০৩>

 

নিউজউইক, ১৪ই জুন, ১৯৭১

অনিশ্চিত আশ্রয়

 

লাখে লাখে, বাঙালী শরণার্থীরা স্রোতের মতো পূর্ব পাকিস্তান থেকে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যাচ্ছে। তাদের অঞ্চলকে স্বাধীন ঘোষণা করার চেষ্টার ফলশ্রুতিতে শুরু হওয়া পাশবিক দমননীতি থেকে পালিয়ে, ব্যাধি এবং অপরিচ্ছন্নতার মাঝে তারা এক অনিশ্চিত আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। গতসপ্তাহে, নিউজউইকের টনি ক্লিফটন কয়েকটি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন এবং এই প্রতিবেদনটি পেশ করেনঃ

 

ইতিমধ্যেই, ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের আকাশ ভারী এবং ধূসর হয়ে উঠে আসন্ন বর্ষাকালের পূর্বাভাস দিচ্ছে, যা কিনা যে কোনো সময়ে ফেটে পরতে পারে। সবসময়ই ধ্বংসাত্মক, এবছরের বর্ষা অবধারিত ভাবেই অতিরিক্ত প্রলয় ঘটাবে, বহুগুনে বাড়িয়ে দেবে প্রায় ৪০ লক্ষ পাকিস্তানীর আতঙ্ক এবং দুর্দশা যারা এখন গাদাগাদি করে আশ্রয় নিয়েছে জরাজীর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোতে তাদের প্রাক্তন স্বদেশের সীমান্তের ঠিক এপারেই। ভারতীয় সরকারী কর্মচারীরা অত্যাশ্চর্যভাবে শরণার্থীদের জন্য খাদ্য এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা করে আসছে, কিন্তু তাদের সব প্রচেষ্টা ধুয়েমুছে যাবে যদি এমনকি বর্ষার “স্বাভাবিক” বৃষ্টিও হয়। আর যদি ভারী বর্ষণ হয়, তাহলে আসন্ন বন্যা এমন এক বিপর্যয় ঘটাতে পারে যার তুলনা করা যেতে পারে সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের সাথে যেটি মাত্র গত বছরই পূর্ব পাকিস্তানে ৫ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে।

 

বর্ষার বৃষ্টি, অবশ্য, শরণার্থীদের দুর্দশা শুধু কিছুটা বাড়িয়ে দেবে মাত্র যারা, বিগত সামান্য কয়েক সপ্তাহে, তাদের সম্পূর্ণ জীবনধারাকে ভেঙে পরতে দেখেছে। তারা যেন এক করুণ দৃশ্য পথে হাঁটছে দলভ্রষ্ট হয়ে, কাপড়ের পুঁটলি আঁকড়ে ধরে এবং মাঝেমধ্যে একটা কালো ছাতা প্রখর সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা পেতে। আছে হাজার হাজার ছোট্ট শিশু এবং অসমঞ্জস্যসংখ্যক তরুণী, যারা লুটেরা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিশেষ লক্ষ্যবস্তু। দল বেঁধে লোকেরা গাছের নিচে বসে আছে অভাগার মতো তাদের দীর্ঘ পদযাত্রা এবং খাদ্যের অভাবে অবসন্ন হয়ে। “এখানকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে”, জানালেন কে. কে. নস্কর, যিনি কোলকাতা থেকে প্রায় ৬০ মাইল দুরের বনগাঁ নামক এলাকার সরকারী প্রশাসক। “ আর ১ জনকেও থাকার জায়গা বা খাবার দেবার ক্ষমতা আমার নেই, আর ওরা আসছে প্রতিদিন ১,০০,০০০ জন করে। আমি এইটুকুই করতে পারি যে ওদেরকে সামান্য কিছু খাবার দিয়ে এবং অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে”।

 

 

দুর্গন্ধঃ ঘিঞ্জি শিবিরগুলোর ভেতরে, দৃশ্য একইরকম বিষণ্ণ। অসংখ্য শরণার্থী – যাদের অনেকের পায়েই ফোস্কা পড়েছে, পা ফুলে গেছে, আমাশয় এবং অন্যান্য পৈটিক অসুখে আক্রান্ত – কে প্রায়শই শুধুমাত্র বাঁশের খুঁটি এবং তেরপলের ছাদের তৈরি দায়সারা আশ্রয়ের নিচে গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে। এই আশ্রয়গুলোর কোনো দেয়াল নেই, নেই কোনো বিছানা এবং আলোর ব্যবস্থা। যত্রতত্র আবর্জনা ফেলার কারণে এবং পুরো শিবিরের পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা খোলা হওয়ার কারণে, দুর্গন্ধ প্রায়শই অসহ্য হয়ে ওঠে, এবং মহামারী দেখা দেয়ার সম্ভাবনাও ব্যাপক। হয়তো এই অন্ধকার ছবিতে একমাত্র আলোর ছটা এই যে শরণার্থীরা তুলনামুলকভাবে ভালো খাবার পাচ্ছে – অন্তত ভারত এবং পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির মাত্রার তুলনায়।

 

তাদের বর্তমান অস্তিত্বের অপরিচ্ছন্নতা সত্ত্বেও, বাঙালীরা সহ্য করে যাচ্ছে নুন্যতম অভিযোগ নিয়ে। কিন্তু তারা একইসাথে হতবুদ্ধি এবং অপমানিত বোধ করছে যে উৎপীড়ন এবং আতঙ্ক তাদের ভোগ করতে হয়েছে দীর্ঘদিনের শত্রুর হাতে, পাকিস্তানের শাসক পাঞ্জাবীরা। আমি এক বৃদ্ধার সাথে কথা বলেছি, রসিমন বিবি নামক এক বিধবা যিনি আমাকে বলেন, “আমি এখানে এসেছি কারণ ওরা আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। ও তখন বীজের দোকান থেকে বাড়ি ফিরে আসছিলো যখন পাঞ্জাবীরা ওর কাছে আসে এবং ওকে গুলি করে হত্যা করে। আমি জানিনা কেন। সে তার জীবনে কখন কোনো খারাপ কাজ করেনি।” আরেকজন শরণার্থী আমাকে তার দুই ছেলেকে দেখান, যাদের বয়স ৬ এবং ৭, তাদের উভয়ের শরীরেই পাঞ্জাবী সৈন্যদের শারীরিক নির্যাতনের থেঁতলানো দাগ এখনো আছে। কয়েকজন শরণার্থী বলেন পাঞ্জাবীরা বাচ্চাদের অপহরণ করা শুরু করে এবং মুক্তিপণ আদায়ের জন্য আটকে রাখে। মেথোডিষ্ট মিশনারি জন হেসটিংস যোগ করেন, “আমি একজনের সাথে কথা বলেছি যে তার বাচ্চার মুক্তিপণের জন্য যতটুকু সম্ভব টাকা জোগাড় করে, কিন্তু ২০০ টাকা প্রায় ২৬ মার্কিন ডলার কম হয়। তখন সে বলে, বাকি টাকা উশুল করার জন্য আমাকে পেটাও। এবং তারা তখন তাকে পেটায়, তার একটা চোখ উপড়ে নেয় এবং তারপর তার বাচ্চাকে ফিরিয়ে দেয়”।

 

ব্যাধি. এমনকি যখন তারা পালিয়ে ভারতে চলে আসে, তখনও শরণার্থীরা নানাবিধ বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কলেরা। যখন প্রথম দলগুলো, সীমান্ত পার হয়ে আসে, চিকিৎসকেরা তাদেরকে কলেরার প্রতিষেধক দেন, কিন্তু এখন বাঙালীরা এমন সংখ্যায় ঝাঁকে ঝাঁকে ভারতে আসছে যে তাদের সবাইকে প্রতিষেধক দেয়া সম্ভব নয়। “সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে এতো বেশি সময় লাগে”, একজন চিকিৎসক বলেন, “আর আমাদের কাছে প্রতিষেধক টীকা দেয়ার যন্ত্র কেনার মতো টাকাও নেই”। ইতিমধ্যেই কলেরার প্রকোপ মহামারীর আকার ধারন করতে যাচ্ছে। গতসপ্তাহে, প্রায় ২,০০০ শরণার্থী মারা গেছে, এবং সমানসংখ্যক মৃতপ্রায় হয়ে হাসপাতালে বা রাস্তার পাশে পড়ে আছে। ভবিষ্যতের চেহারা আরো অন্ধকারাচ্ছন্ন, কেনোনা বর্ষা মৌসুমের বন্যা অবধারিতভাবেই এই পানিবাহিত রোগটি ছড়াতে সাহায্য করবে।

 

সকল ভোগান্তি সত্ত্বেও, শরণার্থীরাই শুধু খারাপ সময়ের সম্মুখীন হচ্ছে না। পাকিস্তানীদের সমাগমের প্রাচুর্যের ফলশ্রুতিতে, পশ্চিমবঙ্গের সব্জি এবং ভোজ্য তেলের দাম আকাশে উঠে গেছে। একইসাথে, স্থানীয় অধিবাসীরা দেখতে পাচ্ছে যে তাদের মজুরী প্রচলিত দরের চেয়ে কমে যাচ্ছে কেননা শরণার্থীরা কম মজুরীতে কাজ করতে রাজি হচ্ছে। “শরণার্থীরা সরকারের কাছ থেকে বিনামূল্যে খাবার পাচ্ছে তাই তারা যাদেরকে খাবার কিনতে হয় তাদের চেয়ে কম মজুরীতে কাজ করতে পারে”, মিঃ নস্কর ব্যাখ্যা করেন। “একজন ক্ষেতমজুরের দৈনিক মজুরী কমে অর্ধেক হয়ে গেছে”। অবধারিতভাবে, এই ধরণের পরিস্থিতি ক্রোধের জন্ম দেয়। “এখানকার মানুষেরা শরণার্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল,” মিঃ নস্কর বলেন, “কিন্তু তাদের সহানুভূতি শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। দুই মাসের মধ্যে, পাকিস্তানীদের প্রতি অসন্তোষ ছাড়া আর কিছুই থাকবে না”।

শরণার্থীদের সমস্যা ইতোমধ্যে ভারতের রুগ্ন বাজেটের উপরও প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। সরকার আগামী তিন মাসে শরণার্থীদের দেখভাল করার খরচ ধরে রেখেছে নুন্যতম ৩ কোটি মার্কিন ডলার, এবং এটা অনেক বেড়ে যেতে পারে। আজ পর্যন্ত, অন্যান্য দেশের কাছ থেকে ভারত যে আর্থিক সাহায্য পেয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অল্প। যদিও যুক্তরাষ্ট্র শরণার্থীদের সাহায্যে ১ কোটি ৪০ লক্ষ মার্কিন ডলার দেয়ার পরিকল্পনা করছে যা তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, অন্যান্য দেশগুলো এখন উদাসীন রয়েছে এব্যাপারে। “একটি বিশাল বিপর্যয় এড়াতে হলে প্রচুর পরিমানে বৈদেশিক সাহায্য প্রয়োজন হবে”, মিঃ হেসটিংস সাবধান করেন, “তারপরেও কেউই নাড়াচাড়া করছে বলে মনে হচ্ছেনা”। পশ্চিম জার্মানি ১,৪০,০০০ মার্কিন ডলার দিয়েছে এবং এথেকে বলতে ইচ্ছে করবে, “অসংখ্য ধন্যবাদ। তোমরা মাত্র আধাবেলা চালিয়ে নেয়ার মতো খাবার কিনে এনেছো”। কর্নেল পি. এন. লুথরা, যিনি শরণার্থী কার্যক্রমের দায়িত্বে রয়েছেন, একইভাবে অবসাদগ্রস্তঃ “আমরা কোনোভাবে চালিয়ে নিচ্ছিলাম, কিন্তু পরিস্থিতি আরো অনেক খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমরা আগামী দশ দিনের জন্য পরিকল্পনা করি এবং তিন দিন পর দেখতে পাই যে আমাদের আবার পরিকল্পনা করতে হচ্ছে কেননা শরণার্থীদের সংখ্যা হঠাৎ করে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো করছি, আমাদের একার পক্ষে এটা করে যাওয়া সম্ভব নয়”।