অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নির্দেশাবলী

Posted on Posted in 2

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্রের ২য় খণ্ডের ৭৩১-৩৩ নম্বর পৃষ্ঠায় মুদ্রিত ১৯৩ নম্বর দলিল থেকে বলছি…

শিরোনামসূত্রতারিখ
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নির্দেশাবলীদ্য ডন১১ মার্চ, ১৯৭১

 

বাংলাদেশের নামে অর্থনীতিকে পুরোপুরি সচল রাখুন: তাজউদ্দীন

বিবৃতি জারির তারিখ, ১১ই মার্চ, ১৯৭১

গত রাতে এক বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব তাজউদ্দীন আহমেদ বলেন, “জনতার আন্দোলন অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে।“

এটা সম্ভব হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের জনগণের নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জারি করা সকল নির্দেশনা প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ বলয়ের মধ্যে থেকে ধারণ ও পালন করাকে পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছে।”

জনাব তাজউদ্দীন যোগ করেন, “সর্বস্তরের জনগণ কর্তৃক প্রদর্শিত উচ্চ দায়িত্ববোধই হল সকল প্রেরণার উৎস। সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, অর্থনীতি পুরোদমে সচল রাখার জন্য উৎপাদন সর্বোচ্চকরণের লক্ষ্যে আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে।”

“ক্ষুধার্ত জনগনের দুর্ভোগ আনয়ন এবং আমাদের অর্থনীতি ধ্বংসের চেষ্টারত কায়েমী স্বার্থ ও গণবিরোধী ষড়যন্ত্রকে বানচাল করতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আর তা করার জন্য আমাদের জনগণকে সকল প্রকার উৎপাদনে তাঁদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে।“

“একই সময়ে তাঁদের কঠোর নীতিনিষ্ঠা অনুশীলনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত সকলকে জনগণের কল্যানে বিজয়ের জন্য কঠোর শৃঙ্খলা প্রদর্শন করতে হবে।”

 

অধিকতর দায়মুক্তিসমূহ

তিনি বলেন, উপর্যুক্ত উদ্দেশ্যসমূহ পালনের নিমিত্ত নিন্মলিখিত অধিকতর দায়মুক্তিসমূহ এবং স্পষ্টীকরণ জারি করা হল:

 

ব্যাংকঃ  পূর্বের সকল প্রকার দায়মুক্তি ও ব্যাখ্যাসমূহ বিলোপ করে ব্যাংক সংক্রান্ত আদেশসমূহ নিম্নে দেয়া হল:

১) ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যাংকসমূহ সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এবং প্রশাসনিক কাজের জন্য বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকবে (স্বাভাবিক ছুটিকাল সহ)। কিন্তু শুক্র ও শনিবার ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যাংকসমূহ সকাল ৯টা থেকে সকাল ১১টা পর্যন্ত এবং প্রশাসনিক কাজের জন্য দুপুর ১২.৩০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। অনুমোদিত লেনদেনের ক্ষেত্রে বুক ব্যালেন্সিং এবং সকল প্রকার স্বাভাবিক কর্মচর্চা অবশ্যই পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

২) যে কোন পরিমাণ আমানত গ্রহণ, বাংলাদেশে সীমাবিহীন আন্তঃব্যাংক ছাড়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আন্তঃব্যাংক স্থানান্তর, পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে টিটি-র মাধ্যমে উত্তোলন অথবা চিঠির মাধ্যমে স্থানান্তরসহ নিম্নলিখিত সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে ব্যাংকসমূহ তাদের সকল প্রকার কার্যক্রম চালু রাখবে:

ক) মজুরী এবং বেতন দেবার ক্ষেত্রে পে বিল সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি কর্তৃক যথাযথভাবে প্রত্যায়িত হতে হবে নতুবা চেকের সাথে মজুরি রেজিস্টার উপস্থাপন করতে হবে।

খ) বৈধ ব্যাক্তিগত উত্তোলন সপ্তাহে ১০০০ রুপিতে সীমাবদ্ধ থাকবে।

গ) শিল্পের কাঁচামাল ক্রয়ের জন্য অর্থ প্রদান করতে হবে, যার মধ্যে চিনিকলের জন্য আঁখ, পাটকলের জন্য পাট প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত।

    বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের ভোক্তাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য সকল প্রকার জিনিসপত্র কেনাসহ প্রকৃত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১০,০০০ রুপি প্রদান করা যাবে। এই পরিমাণ অর্থ নগদ বা নগদ খসড়া দ্বারা উত্তোলন করা যাবে। কিন্তু অর্থ প্রদান করার আগে ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই অতীতের রেকর্ড অনুযায়ী উত্তোলনকারী প্রকৃত শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী কিনা এবং গত এক বছরে তার স্বাভাবিক সাপ্তাহিক উত্তোলনের চেয়ে বর্তমান উত্তোলন অতিরিক্ত কিনা, তা নিয়ে খতিয়ে দেখতে হবে।

 

৩) ক্রসড চেক এবং ক্রসড ডিমান্ড ড্রাফ্ট বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যে কোন একাউন্টে ইস্যু এবং জমা করা যেতে পারে।

৪) বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ব্যাংকিং ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত টেলিপ্রিন্টার সেবা পুনরায় সচল থাকবে।

৫) ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান বাংলাদেশে তাদের সমস্ত ডিসকাউন্টিং কার্যক্রম চালু রাখবে যাতে অন্যান্য ব্যাংকগুলো তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারে।

৬) বিদেশি পর্যটকদের চেক যে কোন অনুমোদিত ডিলারের কাছ ভাঙ্গানো যাবে।

৭) কূটনীতিকরা অবাধে তাদের অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারবেন এবং বিদেশী নাগরিকগণ তাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারবেন।

৮) লকারের কোন কার্যক্রম থাকবে না।

৯) স্টেট ব্যাংক অথবা অন্য কোন মাধ্যমে বাংলাদেশের বাহিরে কোন রেমিটেন্স যাবে না।

তিনি বলেন, উপর্যুক্ত শর্তকাঠামোর মধ্যে থেকে অন্যান্য ব্যাংকের মতো নিয়মাবলী এবং দাপ্তরিক সময়সূচি মেনে স্টেট ব্যাংক প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং খোলা থাকবে যেন বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়।

 

খামার কার্যক্রম

১) “পি” ফরম বরাদ্দ দেয়া যেতে পারে।

কৃষি কার্যক্রম: পাটের বীজ, ধান, সার ও কীটনাশক সংগ্রহ, চলাচল এবং বণ্টন চলমান রাখতে হবে এবং কৃষি খামার এবং ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট ও তার সকল প্রকল্প চালু থাকবে।

২) পাওয়ার পাম্প ও অন্যান্য কার্যকর যন্ত্রচালিত সরঞ্জামাদি এবং প্রয়োজনীয় তেল, জ্বালানী, টুলস ও প্ল্যান্টের স্থানান্তর, বণ্টন, ফিল্ডিং ও অন্যান্য কার্যকলাপ চলমান থাকবে।

৩) টিউবওয়েলের স্থাপন ও কার্যক্রম এবং খাল খননসহ সেচ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। 

৪) পূর্ব পাকিস্তান সমব্যয় ব্যাংক, কেন্দ্রিয় সমব্যয় ব্যাংক এবং তাদের অধিভুক্ত সংস্থা ও থানা কেন্দ্রিয় সমব্যয় সমিতির কৃষিঋণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

৫) পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংক কর্তৃক ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত এলাকায় কৃষকদের সুদমুক্ত ঋণ বিতরণ এবং অন্যান্য অপরিহার্য উপাদান বিতরণ কার্যকর করা হবে।

বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও শহর রক্ষা: ইপিওয়াপদা এবং অন্যান্য সংস্থা কর্তৃক বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়ন, শহর রক্ষা, পানি উন্নয়নের কাজ, ড্রেজার মেরামত, যান্ত্রিক সরঞ্জাম ও উপকরণের স্থানান্তর এবং সংযুক্ত জরুরি কাজগুলো চলমান থাকবে।

অভ্যন্তরীণ বন্দরসহ সকল বন্দর, জাহাজ পরিচালনসহ সকল ক্ষেত্রের কর্তৃপক্ষ: সৈন্যসমাবেশ বা জনতাকে দাবিয়ে রাখার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে এমন কিছু ব্যতীত বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখাসমূহ অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী জাহাজের মসৃণ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করবে।

ইপিআইডিসি কার্যাবলী: সকল ইপিআইডিসি কারখানা কার্যকর থাকবে এবং উৎপাদন সর্বোচ্চকরণের চেষ্টা করবে। কারখানা পরিচালনার জন্য যে সকল ইপিআইডিসি শাখা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও কেনাকাটা করে থাকে, তারা চালু থাকবে।

ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালু থাকবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জড়িত দিনমজুরগণ সমাপ্ত কাজের বিপরীতে বকেয়া পারিশ্রমিক পেতে থাকবেন।

মজুরী প্রদান: কর্মচারী এবং সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান যাদের বেতন দৈনিক, সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক ভিত্তিতে দেওয়া হয়, তাদের বেতন বকেয়া হবার সাথে সাথে পরিশোধ করতে হবে। ইতোমধ্যে বরাদ্দকৃত আগাম বন্যাত্রাণ ও সব সরকারি, আধা-সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে। বেতন প্রদানের জন্য সকল সরকারী ও আধা-সরকারি অফিসের সংশ্লিষ্ট শাখা কার্যকর থাকবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন সময় মতো দিতে হবে। পূর্বে এবং বর্তমানে জারীকৃত নির্দেশনাসমূহ দ্বারা লেনদেন সম্পন্ন করার জন্য অফিসের প্রয়োজনীয় শাখায় পে বিল ক্লিয়ারেন্সের জন্য কর্মী কাঠামো থাকবে। জেলার, জেল ওয়ার্ড এবং জেল অফিস খোলা থাকবে। আনসারগণ তাঁদের কাজ চালিয়ে যাবেন। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ শাখা চালু থাকবে। সকল বিমা কোম্পানি চালু থাকবে।