আইউবের অভিযোগের জবাবে গভর্নর আজম খানের চিঠি

Posted on Posted in 2

<2.23.150>

শিরোনামসূত্রতারিখ
আইয়ুবের অভিযোগের জবাবে আজম খানের চিঠিআজম খানের কাগজপত্র১৬ই জুন,

১৯৬২

 

আরইজিডি/.ডি.

 

(মূল অনুলিপি)

ব্যক্তিগত/গোপনীয়

লাহোর ক্যান্টনমেন্ট

১৬ই জুন, ১৯৬২।

নংঃএমএকে/এক্স/পি.

 

প্রাপক,

          ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান. এন.পিকে., এইচ.জে.,

          রাষ্ট্রপতি-পাকিস্থান,

রাওয়ালপিন্ডি।

 

 

জনাব,

 

আমি আপনার ৭ই জুন, ১৯৬২ তারিখে চিঠি-নং – ৩৭৪-পিএপি/৬২’র বিষয়বস্তু নিয়ে অত্যন্ত বিস্মিত ও ব্যথিত। এই নিয়ে কিছু বলার আগে আমি আপনাকে আপনার ১২ই এপ্রিল, ১৯৬২ সাল তারিখের চিঠির কথা মনে করিয়ে দিতে চাই, যেখানে আপনি উল্লেখ করেছিলেন-

 

          “দুঃখজনকভাবে আমার পদত্যাগ পত্র গ্রহণের সময় আপনি বারংবার আমার চমৎকার কাজের প্রশংসা করেছিলেন এবং বলা হয়েছিল যে কোন বৈধ পদ্ধতিতে আমাকে সহায়তা করার পাশাপাশি তুমি আমার প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা পোষণ কর।“

 

আমি তা আমার কাজের প্রতি আপনার আন্তরিক প্রশংসা মনে করেছিলাম- বুঝতে পারিনি যে আপনি আমার সাথে রাজনীতির চাল দিয়েছেন। আমি এখন বুঝতে পারলাম যে আপনার ৬ই জুন, ১৯৬২ সালের চিঠিতে আপনি যা বলেছিলেন তা আসলে বুঝাতে চাননি এবং আপনার অসন্তোষ প্রকাশ হতে বিরত রেখেছিলে যাতে আমি তৎক্ষণাৎ প্রদেশ না ছাড়ি এবং এইভাবে আমাকে ব্যবহার করেছিলে যাতে আমি আপনাকে আপনার নির্বাচনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার সুযোগ হতে বঞ্চিত না করি। এখন আপনি পূর্ব পাকিস্তানে আমার কাজের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নিয়ে এসেছেন, এই উদ্দেশ্যে আপনি যা বলেছেন  ‘সরাসরি রেকর্ড রেখে, আমি মনে করি, আমি নিজের প্রতি সৎ এবং জনতার প্রতি সরাসরি কিছু কথা বলা এবং  তা সম্পূর্ণ করার জন্য, আপনাকে আমার প্রত্যুত্তর রেকর্ড করতে অনুরোধ জানাচ্ছি।‘

 

আমি সম্পূর্ণরূপে বুঝতে অক্ষম কেন আপনি মনে করেছিলে যে আমার ত্রুটি আছে যা আরোপিত নয়, আপনি আমাকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর হিসেবে নিযুক্ত হতে জোর করেছিলেন, টানা দুই বছর তা করেছিলেন এবং যখন আমি আমার পদত্যাগ করেছিলাম, আমার পদত্যাগ পত্র গ্রহণের পরিবর্তে আমাকে বোঝানোর জন্য জেনারেল বুরকিকে পাঠিয়েছিলেন যাতে আমি থাকি এবং গভর্নর দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া নিয়ে আপনি আপনার সর্বোচ্চটুকু দিয়েই আমাকে বুঝিয়ে নিরস্ত করেছিলেন। এই বিষয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যায় যে আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগে কোন প্রকার বলপ্রয়োগ করা হয়নি এবং ৭ই জুন, ১৯৬২ সাল তারিখে আপনার চিঠিটি নিঃসন্দেহে পরিষ্কার চিন্তার ফসল। যাই হোক,আপনার প্রতিটি বিষয় আমি আলাদাভাবে দেখবো।

<2.23.151>

 

আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রথম বিষয়, যা-

 

          “অর্থনৈতিক নিয়মকানুন ও সম্পদ বন্ঠন সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা নেই, আপনি যখন কোন প্রকল্প হাতে নেন তখন আপনার এমন আকাঙ্খা থাকে যে যদি প্রয়োজন হয় তবে সমস্ত ক্রিয়াকলাপের মূল্য দিয়ে হলেও আপনার প্রকল্পের প্রতি পুরো দেশের সম্পদ অপসারিত হবে”

 

 

“জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে আপনি কোন দাবীতে কখনই ‘না’ না বলার যুক্তি নির্ধারণ করেছেন, উপরন্তু সেই দাবী অসম্ভব বা প্রকাশ্যে  অযৌক্তিক হতে পারে, একইভাবে যা কিছু অর্জিত হয়েছে তার কৃতিত্ব এবং কোন কিছু বাতিল করতে হলে তার জন্য কেন্দ্রকে দায়ী করেন। সহ্য করার নুন্যতম সীমানা আপনি গ্রহণ করেছেন।”

 

পর্যাপ্ত সময় ছাড়াই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আমাকে তাদের অসম্ভব  ও প্রকাশ্যে অযৌক্তিক দাবী মেনে নেওয়ার মধ্যে  নিয়ে যায়, যার জন্য, তোমার বিবৃতানুযায়ী, কেন্দ্রের দিকে সকল দোষ চাপিয়ে দেওয়াকালীন আমি এসবের সকল কৃতিত্ব গ্রহণে থাকবো। তাছাড়া অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও সম্পদের সুষ্ঠু বন্টন বর্জনের এমন কোন পর্যায়ে আমি  নেই যে  একটি নির্দিষ্টি প্রকল্পের জন্য দেশের পুরো সম্পদ অপসারণের আকাঙ্খা পোষণ করবো। কেউ যদি এমনতরো গল্প তোমাকে বিশ্বাস করাতে চেষ্ঠা করে তবে তা নিছক হিংসা এবং তা তোমার যৌক্তিক বিচারবুদ্ধিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করার জন্যই। তুমি নিজেই সকল প্রকল্প ও প্রাদেশিক চাহিদা বাস্তবায়নে তহবিলের সুবিবেচনা, অনুমোদন ও বরাদ্দে অনুসৃতি নীতি ও পদ্ধতি  সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত আছো। কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী আমার দায়িত্ব ছিল প্রাদেশিক শোষন ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনুমোদন সাপেক্ষে সর্বোচ্চ প্রকল্পের বিন্যাস করা তুলে ধরা। কেন্দ্র যদি একবার বার্ষিক বন্টন নির্ধারণ করে তবে প্রদেশ দ্বারা অন্য কোন দাবী তোলার সুযোগ থাকে না এবং একই সাথে কেন্দ্র প্রদেশের জন্য করা বন্টনের অঙ্গীকার পরিবর্তন করতে পারবে না। এখানে সন্দেহ নেই যে গর্ভনরের সম্মেলনে  আমাদের অনুমোদন নিয়ে কেন্দ্রী আর্থিক পরিষদ ও অন্যান্য সংস্তার সাথে  আমাদের কঠিন লড়াই হয় যা ছিল স্বাভাবিক ছিল এবং তা অভিযোগ হিসেবে না এনে সেরা উদ্দীপনা হিসেবে দেখা উচিত ছিল।

 

আমার পদত্যাগ সম্পর্কিত আরেকটি বিষয় উত্থাপিত হয় যখন আমাকে আপনি গভর্ণর হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে যেতে অনুরোধ করেছিলে। এই বিষয়টি পুরোপুরিভাবে বেশ কয়েকবার আলোচনা করা হয়। এছাড়াও আমার চিঠি বা পদত্যাগ পত্রে আপনার চিঠির তৃতীয় অনুচ্ছেদের বক্তব্যের সম্পূর্ণ উত্তর হিসেবে লিখিত আছে যা আলোচনাধীন। আপনার স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে, আমি সেই পদত্যাগপত্রের একটি অনুলিপি এই সাথে সংযুক্ত করছি। আপনার সেই বক্তব্য, পূর্ব পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ উড়োজাহাজে করে চলে যাওয়ার জন্য আমাকে প্রায় বাধ্য করেছিলেন যা আমাকে বিস্মিত করেছে। এটা শুধুমাত্র তারপরেই ছিল যখন আপনি জেনারেল বুরকিকে বলতে পাঠিয়েছিলে, আপনার মেজাজ হারিয়ে ফেলা এবং পূর্ব বাংলায় যাওয়ার ব্যাপারে আমি ভীত এমন অভিযোগের জন্য আপনি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে আসছেন,যদিও আমি আপনার জন্য অপেক্ষা না করেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম। আমি তা করেছিলাম আপনাকে বিব্রতকর অবস্তা হতে বাঁচাতে এবং এটাও প্রমাণ করতে যে আমি পূর্ব পাকিস্তানে যেতে ভীত ছিলাম না যদিও কেন্দ্রে আমার কাজ এবং বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন ছিল অসম্পূর্ণ এবং সেই সময় আমার চলে যাওয়া ছিল মানুষের জন্য ক্ষতিকর যা আমি আমার ১৪ই এপ্রিল’৬০ তারিখের পদত্যাগ পত্রে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছি। চলে যাওয়ার জন্য কেউ আমাকে বাধ্য করেনি। প্রকৃতপক্ষে, আপনি জানতেই না যে ঢাকার উদ্দেশ্যে আমি রওনা দিয়ে ফেলেছি এবং না আপনার মাধ্যমে বিশেষ কোন উড়োজাহাজের ব্যবস্তা করা হয়েছে। যাতে সেখানে সঠিক সময় পৌঁছাতে পারি, এই জন্য সেই কালবৈশাখীর সময়েও একমাত্র উপায় একটি ছোট উড়োজাহাজে করে আমাকে ১২ ঘন্টার মতো রাত্রকালীন  আকাশভ্রমণ করতে হয়েছিল। এটা অত্যন্ত অন্যায় যে আপনি সেই ঘটনাকেই আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করবেন যেখানে আমি আপনার দায়িত্বভার গ্রহণের পর আমার কাজ নিয়ে আমার সম্পর্কে সম্পর্কে সুবিবেচক  হিসেবে মন্তব্য করেছো।

<2.23.152>

 

আমার বিরুদ্ধে আরো একটি বিষয় উত্থাপন, যা-

 

          “আপনি কেন্দ্রের প্রতিনিধি ছিলেন। প্রতিনিধির জনপ্রিয়তা বলতে সদরের প্রতি জনপ্রিয়তাকে বোঝানো উচিত। আপনার পরিচালনা, তৎসত্ত্বেও, প্রায়ই বিপরীত ফলাফল আনছিল। এটা পূর্বপাকিস্তানের জনগণের মধ্যে এমন প্রভাব ফেলেছিল যে, কোন কিছু পেতে অনাগ্রহী ও সমবেদনাহীন কেন্দ্রের প্রতি ক্রমাগত যুদ্ধের দিকে ধাবিত করছিল। একবারের জন্যেও আপনি উল্লেখ করেন নি যে আপনার প্রকৃত আবেগ  পূর্ব পাকিস্তানের উন্নতির মধ্যে এবং তা ত্বরাণ্বিত করার জন্য এবং এর জন্য আপনি গুরুত্ব দিচ্ছেন। একবারের জন্যেও আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে, বৈদেশিক পুঁজি সংগ্রহে আমাদের যে পরিমাণ সংগ্রাম করতে হয়, কোন একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পে বা জাতীয় ভিত্তিক সমন্বিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্যান্য দেশের তাদের  আরোপিত অনুদান ও ঋনের সীমাবদ্ধতা তা তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেননি।আপনি বলেন ‘পরম বিশ্বস্ততা ও একনিষ্ঠতা’র সাথে আপনি কাজ করেছেন। আমি এটা সংশোধন করতে পারি এই বলে যে আপনি ‘চরম শক্তি ও উদ্দীপনা’র সাথে কাজ করেছেন। আমি ভীত যে, ‘পরম বিশ্বস্ততা ও একনিষ্ঠতা’কে মহৎ উদ্দেশ্যের বদলে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কাছে বলি দেওয়া হয়। ফলাফল ছিল অনিবার্য। আপনার এইভাবে অগ্রসর হওয়ার অন্তর্নিহিত বিপদ সম্পর্কে আপনাকে আমি বারংবার সতর্ক করেছিলাম। পাকিস্তান-বিরোধী মতালম্বীরা দ্রুতই এই অবস্তাকে কাজে লাগিয়েছে এবং তাদের কার্যক্রম দ্বারা জাতীয় স্বার্থকে বিপন্ন করে  পূর্ব পাকিস্তানে শাসন মুক্ত করার দাবী গঠন করেছে। এই ঘটনার পরে আপনি আইন শৃঙ্খলার সাথে জড়িত বিতর্কিত বিষয়গুলো এড়ানো শুরু করেন।“

 

          আপনার সকল নীতি আমার দ্বারাই অভিক্ষিপ্ত ও বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু যখনই আপনার চিন্তাধারার সাথে আমি আন্তরিকভাবেই অসম্মত হয়েছি তা অকপটে এবং সম্পূর্ণরূপে জানাতে দ্বিধাগ্রস্ত হইনি। সর্বত্রই আমার প্রচেষ্টা ছিল মানুষের এবং দেশের স্বার্থে এবং নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির জন্য নয়। এটা সন্দেহাতীতভাবে সকলের মনে সম্পূর্ণই স্পষ্ট যে, পাকিস্তানের উভয় স্তানে  আমার করা সকল কাজের কৃতিত্ব সরকার ও আপনার কাছে চলে গিয়েছে। এটা এমন জরুরী ছিলো না যে  আমার পথ থেকে সরে গিয়ে আপনাকে তোষামোদ করতে হবে, সত্যি হচ্ছে, আমি চাটুকারীতায় যাই না যা তুমি ব্যক্তিগতভাবে জানো এবং আপনাকে তা বারংবার বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে। আপনি যদি এই নীতিতে অসন্তুষ্টও হোন,তবে এ নিয়ে আমার মন বিরক্ত হবে না যেখানে আমি তাই করেছি যা সৃষ্টিকর্তা এবং দেশ আমি করবো বলে আশা করে।

 

          আমার ‘পরম বিশ্বস্ততা ও একনিষ্ঠতা’ নিয়ে আপনার তথাকথিত মন্তব্যে আমি  কোন যুক্তি দেখতে পাচ্ছি না। যখন আপনি সি-ইন-সি কমান্ড হিসেবে আপনার মেয়াদ তিন দফায় বাড়িয়েছেন, যদিও এটা সেনাবাহিনীর প্রথা বিরোধী ছিলো এবং  পদোন্নতির সম্ভাবনা যথেষ্ট পক্ষপাতদুষ্ট ছিল, আমি নিস্কৃতির জন্য আবেদন করিনি কিন্তু ব্যক্তিগত সুবিধার বদলে মহৎ উদ্দেশ্যের জন্য পরম বিশ্বস্ততা ও একনিষ্ঠতার সাথে একই রকম উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে সেবা অব্যাহত রেখেছি।

 

          আমি এও আশা করি যে আপনি ভুলে যান নি ১৯৫৮ সালে যখন আমার জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে এবং আমার আর্মি কর্মজীবন জলাঞ্জলী দিয়ে দেশের এবং জাতীর স্বার্থে আমাকে বিপ্লবের মধ্যে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার সশস্ত্র বাহিনীতে আমার স্থায়ী কমিশন বঞ্চিত করে যখন ১৯৬০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমাকে সময়ের আগেই বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠান তখন আর্মি নিয়মকানুনাযায়ী আমি দীর্ঘমেয়াদের জন্য সম্পূর্ণ উপযুক্ত ছিলাম। আপনার কাজে আমি প্রশ্ন করিনি বরং আমরা যখন খুবই দূর্বল সময় পার করছিলাম তখন জাতিকে ভোগ করতে হবে এমন কোন পরিস্থিতি তৈরী না করে ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করে নিয়েছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত আপনি সব সময়ই আপনার কল্পিত আশঙ্কা হতে  পরমার্শ নিতেন বলে মনে হতো। যদিও আমি পদত্যাগ করেছি, তবুও আমার জনপ্রিয়তা আপনাকে তাড়া দেয় বলে মনে হচ্ছে। আপনার চিঠির বিষয়বস্তু বিচারে 

আমি মানতে বাধ্য হয়েছি যে ১৯৬২ সালের ১৪ইমে তারিখে পাকিস্তান টাইমসে ‘ফারুকের উপর টাস্ক’ শিরোনামে সম্পাদকীয়  প্রকাশিত এবং  পরবর্তীতে সম্পাদকের বিকৃত ও বিতর্কিত সকল কথা অনুপ্রাণিত ছিল।

 

          দু’বারই আমার পদত্যাগের মূল বিষয়কে পাল্টে দেওয়াতে আপনি এতোটাই অখেলোয়াড়সুলভ ছিলেন যে যা একজন পুরনো সৈনিক ও কমরেড হিসেবে জানতে পেরে আমার কাছে চরমতম ধাক্কা ছিল। আমার উভয় পদত্যাগপত্র থেকে পরিষ্কারভাবে এই বিষয়গুলোই বাইরে আনা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই আপনি জেনারেল বুরকিকে আপনার হয়ে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পাঠিয়েছেন এবং আমার পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের জন্য ব্যক্তিগতভাবে আপনি পুরনো পারিবারিক বন্ধুত্বতার উপরে আমার অনুভূতি, পেশাগত কমরেড হিসেবে এবং আমি ও আমার কাজের প্রশংসার মাধ্যমে  সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি আমার পুরো কর্মজীবনে আপনার আগের কথোপকথন বা চিঠিপত্রে .এইসব মিথ্যা ও অন্যায় অভিযোগের কোন ইঙ্গিত ছিলো না।

 

আমার অভিযোগের প্রত্যুত্তরে আমার পরামর্শ নেওয়া হয়নি যা, কিছু ব্যাপারে আমার কাজ করায় গুরুতরভাবে প্রভাব বিস্তার করছিল এবং গঠনতন্ত্রসহ বেশ কিছু ব্যাপারে আমার পরামর্শ অগ্রাহ্য করা হয়-যেখানে আপনার বক্তব্য ছিল শুধুমাত্র গঠনতন্ত্র নিয়ে আমার পরামর্শ দিয়েছি-আমি দুঃখের সাথে বলছি, তা বেঠিক এবং ভুল ছিল- যেন তাড়াহুড়ো মধ্যে আপনি গঠনতন্ত্র নিয়ে না আসেন। ১৯৫৯ সালে যখন আপনার চাহিদামত গঠনতন্ত্রের রুপরেখায় প্রাথমিক গণতন্ত্রের পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রথম আমাদেরকে জানান, আমি অভিমত দিয়েছিলাম, আমরা যেন উদ্বাস্তু পুনর্বাসন এবং  জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নের পরিকল্পনায় মনোযোগ দেই এবং বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য প্রতিনিধিদের উপর গঠনতন্ত্র গঠন ছেড়ে দেই যেখানে এই বিষয়ে আমরা কোন রকমের কর্তৃপক্ষ ছিলাম না।

 

আপনি আপনার চিঠিতে এর পরের অনুচ্ছেদেই জানিয়েছেন যে, গঠনতন্ত্রের বিধান সম্পর্কে আমি আমার ধারণা ব্যক্ত করেছি যখন তা গভর্নরের সম্মেলনে আলোচনা করা হচ্ছিল। কিন্তু এখানে আবার, আমি দুঃখের সাথে বলছি,  যে বক্তব্যে সেইসব ধারণাগুলো বিবেচনায় আনা হয় বা আমি যে বিষয় উথাপন করেছিলাম সেইসবের বিষয়ের পক্ষে আমি কোন যুক্তি নিয়ে অগ্রসর হওয়া জন্য আমি কোন পদক্ষেপ নেইনি, তা একেবারেই ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, যখন গঠনতন্ত্রের বিধান সম্পর্কে প্রচন্ড বাক-বিতন্ডার মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে আমি বারংবার মৌলিক অধিকারের স্বপক্ষে সমর্থনযোগ্য, আধিপত্য বিস্তারকারী ও বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা তৈরী করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পুনরুজ্জাগরণ ইত্যাদি নিয়ে যুক্তি দেখাচ্ছিলাম, আপনি আমার দিকে চিৎকার করার পর্যায়ে গিয়ে বলছিলেন আমি এতো চিন্তিত কেন- গঠনতন্ত্র আমাকেই স্বাক্ষর করতে হবে, তোমাকে নয় আজম’। এরপর, গঠন্তন্ত্রের বিধান সম্পর্কে আমাকে পূর্ণ আস্তার সাথে গ্রহণ করা হয়। অতএব, আমি মনে করি, আবারো বলছি যে গঠনতন্ত্রের বিধান সম্পর্কে আমি আপনাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম এবং আপনি তা মেনে নেওয়া বা বিবেচনা করতেও প্রস্তুত ছিলেন না।

 

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গভর্নর হিসেবে আমার সাথে শলাপরামর্শ করা ছাড়াই আপনার নেওয়া সিদ্ধান্তে আমার  তীব্র প্রতিবাদকে উল্লেখ করে, আপনার চিঠিটি নিম্নরূপ-

 

“আমি বিশ্বাস করি তুমি জনাব সোহরওয়ার্দীর গ্রেপ্তারকে উল্লেখ করছো। একই সময়ে জনাব সোহরওয়ার্দী পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলেন। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তার গ্রেপ্তারী ছিল।  তিনি পূর্ব পাকিস্তানে যে কোন প্রকারের গঠনতন্ত্রের বিরোধীতার জন্য পাকিস্তান-বিরোধী কার্যক্রমের সাথে সক্রিয়ভাবেই যুক্ত ছিলেন।  এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব তোমার ছিল। কিন্তু আপনি তা করেননি কারণ আপনি আপনার ব্যক্তি জনপ্রিয়তা নিয়ে অধিকতর মনোযোগী ছিলেন এবং আমার কর্মপন্থা বাস্তবায়নেও তুমি অতোটা মনোযোগী ছিলে না যা উচিত ছিল। যাই হোক, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধকে আমি এড়িয়ে যেতে পারিনি। অতএব, তাকে করাচিতে হেফাজতে নেওয়া হয় 

এবং এই পরিস্থিতি সম্পর্কে তোমাকে একজন মন্ত্রীর মাধ্যমে জানানো যাকে  প্রথমেই পাওয়া উড়োজাহাজে করেই ঢাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমি জানি না এছাড়া আমি আর কি করতে পারতাম।“

 

সরকারী প্রাথমিক নীতিমালা অনুযায়ী আইন ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় ঘটনাস্থলেই কোন ব্যক্তির উপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আগে এ নিয়ে পরামর্শ করা উচিত। যদি জনাব সোহরওয়ার্দীর বিরুদ্ধে কোন তথ্য থেকে থাকে তবে তা কিছু সময়ের জন্যে হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে ছিল। এমন না যে, গ্রেপ্তারের কয়েক ঘন্টা আগে এসব জড়ো করা হয়েছে। যাতে বলা যায় যে আমার সাথে পরামর্শ করার জন্য কোন সময় তোমার ছিল না, এমন পরিস্থিতিতে  গ্রেপ্তারের জন্য তুমি আমাকে নির্দেশ দিতে পারতে বা এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় আমি আমার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তুমি আমাকে বদলি করতে পারতে। যে প্রক্রিয়ায় আপনি এবং আপনার সরকার এই পরিস্থিতি পরিচালনা করেছে তা স্পষ্টতই গভর্নর হিসেবে আমার প্রতি অন্যায্য ছিল। যদি আমার সাথে এ নিয়ে আলোচনা করা হতো অথবা এ নিয়ে সমুচিত নোটিশ দেওয়া হতো তবে হয়তো পরিস্থিতি বিবেচনায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারতাম যা প্রদেশে আপনার উপস্থিতি থাকাকালীন সময়ে গ্রেপ্তারের জন্য উত্থিত হয়েছিল। এ নিয়ে আমি বক্তব্যে আপনাকে মনে করিয়ে দিতে পারতাম যে আপনি যা করেছেন তা আদতে পিঠে ছুরি মারার মতোই এবং এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে  এর বাইরে করা যায় এমন কোন কিছুই ঘটেনি যা খুবই প্রয়োজনের সাথে আমি করতে পারতাম এবং এর স্বাক্ষী আপনি ছিলেন।  আমি কি এমন পরিস্থিতি সামাল দেইনি যা শাসনের মাধ্যমে করেছি, এমন বিপর্যমুলক পরিণতি আমি আপনার কাছে আগেই উল্লেখ করেছি। এমতাবস্থায়, আপনার বিবৃতির পক্ষে কোন যুক্তি নেই যা-

“আমি এমন মনোভাবের আভাস পেয়েছি যে এই বিশ্রী পরিস্থিতি মোকাবেলায় দৃঢ়তার প্রয়োজন ছিল যেখানে তোমার কাছে তা অরুচিকর ঠেকেছে। এ নিয়ে আমার অসন্তোষ প্রকাশ করাই আমার দায়িত্ব ছিল। তাই যখন তুমি পদত্যাগ করলে এবং চলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়োর মধ্যে আছো, তখন আমার কাছে এইটি গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না।“

সেই সময়ে আপনি যদি মনে করতেন যে ঘটনাস্থলেই উপস্থিতি থেকে এ’রকম বিশ্রী পরিস্থিতি দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা আমার কাছে অরুচিকর ঠেকেছে তবে আপনি সেই পুরো পরিস্থিতি আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধারণা করে নিতেন এবং নিজেই পুরো দায়িত্বটি আমার কাঁধে চাপিয়ে দিতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ জারি করতেন। আপনি তা করেন নি। অন্যদিকে যতক্ষণ আপনি ঢাকায় ছিলেন ততক্ষণ এই পদক্ষেপের জন্য আপনি আপনার অসন্তোষ প্রকাশ করেন নি। আমি যে পদ্ধতিতে পূর্ব পাকিস্থানের বিষয়গুলো মোকাবিলা করছিলাম তা নিয়ে আপনি আপনার মনোভাব শুধুমাত্র পশ্চিম পাকিস্থানে ফিরে যাওয়ার পরেই ব্যক্ত করেছেন।

আপনি উল্লেখ করেছেন যে আমার দ্রুত চলে যাওয়া নিতান্তই স্পষ্ট ছিল। ১১ই মার্চ আমি আমার পদত্যাগপত্র লিখেছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত ১০ই মে পর্যন্ত থেকে যেতে সম্মত হই। আপনি যদি সত্যিই এমন মনোভাব পোষণ করতেন যে পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমার অক্ষমতা এবং যেহেতু আমার দ্বারা গৃহীত পদক্ষেপে আপনি অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং প্রদেশ ছেড়ে যেতে আমি উদ্বিঘ্ন ছিলাম তবে কিছুতেই আপনি আমাকে থেকে যেতে বলতেন না। দেশের প্রতি আপনার কর্তব্য হিসেবে প্রতিবারই আমাকে তৎক্ষণাৎ অব্যাহতি দিতে পারতেন এবং থেকে যাওয়ার জন্য আমাকে প্ররোচিত করতেন না। এছাড়া আমার কাজ করা নিয়ে আপনার অসন্তোষ যতটুকু, তাতে গভর্নর হিসেবে আমার কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য আপনার জেদ এটাও পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করে যে সেই সময়ে আপনি বুঝতে পেরেছেন যে, আমি একাই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবো। আমার পদত্যাগ পত্রে উল্লেখিত যুক্তিগুলো ‘বানোয়াট’ ছিল না।

এটা আমাদের সবার কাছে বেশ ভালই করেই জানা আছে যে এই দেশ ব্যক্তি খামখেয়ালীপনা ও মানসিকতা, প্রশাসনে অযৌক্তিক হস্তক্ষেপেরকারণে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক সময় ব্যক্তি উচ্চাভিলাষের জন্যেও দৃঢ় নীতিসমূহে ও শাসনে মূল্য দিতে হয়েছে। আমরা যদি সেইসব নীতির উপর আপোষ করতাম তবে হয়তো বিপ্লবের মূল লক্ষ্যকে দমন করতে পারতাম। 

অতএব, পদত্যাগ করা ছাড়া আমার অন্য কোন পথ খোলা ছিল না যেখানে নির্দিষ্ট মূলনীতিগুলোর অবমাননা করা হয়েছে যা আমি ইতোমধ্যেই ১৯৬২ সালের ১১ই মার্চ তারিখে আমার পদত্যাগ পত্রে উল্লেখ করেছি, যে জন্য আপনার তৎক্ষণাৎ ইশারা ছিল যে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যক্তিগত আলোচনার অবকাশ আছে যা আপনি আপনার পূর্ব পাকিস্তান সফরের সময়ে আলোচনা করার জন্য প্রস্তাব করেছিলেন, যা আপনি করেছিলেনও কিন্তু আমি গভর্নর হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে অসম্মত হয় এবং আমাকে দ্রুত অব্যাহতি দেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে আমার সিদ্ধান্তেই স্থির ছিলাম।

          এক মাস পরে আপনি আমার কাজের প্রশংসা করে একটি চিঠি পাঠান এবং অত্যন্ত দুঃখের সাথে আমার পদত্যাগ গ্রহণ করতঃ আপনি নিম্নলিখিত পরামর্শ দিয়েছিলেনঃ- “ আইনত ১৯দিন বাদ দিয়ে চার মাসের ছুটি দেওয়ার জন্য আমাকে অনুমোদন করতে হলো, যা তোমার লভ্য। অতএব, যদি তুমি তা উপভোগ করতে চাও তবে অনুগ্রহ করে তা আমাকে জানাও। এইটি গুরুত্বপূর্ন, যেহেতু সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসানের জন্য জন্য এইসব পরিবর্তনগুলোর প্রস্তাবনা যতদ্রুত সম্ভব আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে হবে”

আমার তাৎক্ষণিক প্রত্যুত্তর দয়া করে লিপিবদ্ধ করা যেতে পারে-

          “আপনার ১২ই এপ্রিলের চিঠির জন্যে ধন্যবাদ। কার্যালয়ে দায়িত্বকালীন দেশের প্রতি আমার সেবার জন্য আপনা যে সদয় মন্তব্য করেছেন আমি তার প্রশংসা করছি। যোগাযোগ ও আলোচনার মাধ্যমে আমি বারংবার জোর দিয়েছি যে, আমার পদত্যাগ আমার নীতিগত বিষয়ের প্রতি দৃঢ় ধারণার উপর চালিত, যা উর্ধ্বতন কার্যালয়ের প্রতি আকর্ষণকে অগ্রাহ্য করার প্রভাব রেখেছে এবং আমার উদ্বেগ ছিল আমাকে কম সময়ের মধ্যে অব্যাহতি দেওয়ার উপরে, এছাড়াও যদি ১০ই মে’র আগে আমার উত্তরসূরীর যোগদান করা অসম্ভব হয়, ততোদিন পর্যন্ত থেকে যাওয়ার জন্য আপনার অনুরোধের সাথে দ্বিমত রাখছি না। কার্যভার সমর্পণের পরে আমি ছুটিতে থাকতে চাই কি না সম্পর্কে, নীতিমালার মধ্যে আমার অধিকার নিয়ে আমি সম্পূর্ণই অবগত আছি, কিন্তু, যেহেতু আমি নৈতিকতার দিক থেকে পদত্যাগ করছি, তাই আমি আমার লভ্য ছুটি উপভোগ করার প্রকাশ করিনি।“

          আপনার যে বিষয়টি ভুলে গেলে চলবেন না যে আপনার প্রতিনিধি হয়ে আমি পূর্ব পাকিস্তানে গিয়েছিলাম এবং তা সামরিক শাসন চলাকালে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ভেতরেই। প্রতিনিধি হওয়ার পাশপাশি আমাকে গভর্নরের সম্মেলনে অনুষ্ঠিত জনতার দাবী ও নানান সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে। যদি আমি ব্রিটিশ সময়ের আমলাতান্ত্রিক সরকারের একজন গর্বিত এজেন্ট হিসেবে আচরণ করতাম, তবে পূর্ব পাকিস্তান নিজেদেরকে কলোনী হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় তাদের বারংবারের উত্থাপিত অভিযোগের সঠিক বিচার করা হতো।

          আমি আমার সর্বোচ্চটুকু দিয়েই আপনাকে জনতার কাছাকাছি নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। আমি খুব ভালভাবে মনে করতে পারি যে সেই বৃহৎ ঘূর্ণিঝড়ের পরবর্তী অবস্তা মূল্যায়ন করতে আপনি যখন পূর্ব পাকিস্তান সফর করেছিলেন, স্বাভাবিকভাবেই আমি ভেবেছিলাম যে আপনি নিজেই ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শনে আমার চাইতেও বেশী উদ্বিঘ্ন এবং সেইসব এলাকার পুরুষ, নারী ও শিশুদের আত্মবিশ্বাসকে উজ্জ্বীবিত করতে প্রেরণাদায়ক কিছু বলবেন। তাই আমি আপনার জন্য একটি ভ্রমণের ব্যবস্তা করি, কিন্তু এর একমাত্র মানে ছিল যে বিশ্বের এক প্রান্তে এই দ্বীপপুঞ্জে হেলিকপ্টারে করে যাওয়া এবং আপনাকে এইসব এলাকা পরিদর্শন করার  জন্য আমি কখনই দুঃখবোধ করি না কেননা মাসব্যাপী আপনার সামরিক সচিব এবং এয়ার মার্শালকে ব্যাখ্যা করতে হয়েছে কেন আপনাকে ঝুঁকি নিয়ে হেলিকপ্টারে করে তা করতে বলেছি।

          জনপ্রিয়তা অর্জনের অভিপ্রায় আমার ছিল না। আমার একমাত্র উদ্বেগ ছিল পুরো প্রদেশ জুড়ে বয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক দূর্যোগে নিপীড়িত দুঃখীদের সাহায্য করা নিয়ে, সেই সাথে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা। বিশেষ করে জনতা তাদের চরম কষ্ট ও বিপদের মধ্যে আসতে থাকা সাহায্যে আমার ব্যক্তি নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যতাকে অগ্রাহ্য করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে 

তাদের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিল। বলা যায় যে আমি আমার ব্যক্তি জনপ্রিয়তার জন্য বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের বদলে ত্যাগ করার চেষ্টা করেছি  অথবা ‘আর্থিক অনিয়মের’ মাধ্যমে আমি জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা করেছি, আমার প্রতি যা শুধুমাত্র একটি গুরুতর অবিচার করাই নয় বরং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অনুভূতি ও সম্মানের উপর উপর প্রবল ধাক্কা ছিল। ঘুষের বদৌলতে আমার জন্য কান্না করা অথবা  পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ন্ত্রণ কমানোর উদ্দেশ্যে জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করার অভিপ্রায়ে সেই পাকিস্তান-বিরোধী মতবাদকে ছড়িয়ে যেতে দেওয়া বলা হলে তা তাদের উপর চরমতম অপমান আরোপের চাইতে বেশী কিছু হতে পারে না।

          কালক্ষেপণ ছাড়াই আমার দায়িত্বকালীন সময়ে পাকিস্তানের সেই অংশ কেন্দ্রের খুব ঘনিষ্ট হয়েছিল। জাতীয় ঐক্য ও উন্নতির স্বার্থে সেই দুই বছর আমি যেভাবে আন্তরিকতা ও নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছিলাম তা কিছুতেই আপনি অস্বীকার করতে পারেন না অথবা পুরো জাতির যে কেউই এর স্বাক্ষী আছে।

          আমি এই বলে আমার বক্তব্য শেষ করতে চাই যে সৃষ্টিকর্তা এবং আমার জাতি আমার বিচারক হউক, স্বতন্ত্র মতামত কখনই নির্ভরযোগ্য হিসেবে উল্লেখিত হবে না, তা সে যতই উর্ধ্বতন ব্যক্তি হোক না কেন।

এইসব বিষয়ের পুনরাবৃত্তি করা আমার জন্য সুখকর নয়, কিন্তু আপনার চিঠি আমার কাছে এর বিকল্পযোগ্য আর কিছুই রাখেনি এবং ১৯৬২ সালের ৭ই জুন তারিখে আপনার চিঠিতে আনীত গুরুতর অভিযোগে আমি আমার সততার মধ্যে উত্তরহীনভাবে ছেড়ে দিতে পারি না।

(মোহাম্মদ আযম খান)

  লেফট্যানেন্ট জেনারেল।