আওয়ামী লীগের সাথে তিন দিনের আলোচনা শেষে ভুট্টোর বিবৃতি

Posted on Posted in 2

<2.147.624>

একটি কার্যকর সংবিধানের জন্য পাকিস্তান পিপলস পার্টি সংগ্রাম করবে

আলোচনায় কোন অচলাবস্থা নেই

 

জানুয়ারি ৩০,১৯৭১

শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তিন দিনের আলোচনা শেষে ঢাকায় জনতার উদ্দেশ্যে জনাব ভুট্টো।

 

পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রেসিডেন্ট, জনাব জেড.এ. ভুট্টো বলেছেন যে, আজ এই জাতীয় ঐক্যের সামনে একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য সংবিধান প্রণয়নের স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করার লক্ষ্যে তিনি ও তার দল যতদূর সম্ভব সচেষ্ট থাকবেন।

 

জনাব ভুট্টো আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তিনদিন ব্যাপী বৈঠক শেষে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন যে, একটি মতৈক্য ও সমঝোতার খোঁজে এবং পারস্পরিক ভাতৃত্ববোধ,বোঝাপড়া ও সহযোগিতার চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তার এ সফর।

 

জনাব ভুট্টো বলেন, “আমরা আসলেই সমস্যার মধ্যে আছি এবং এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করার জন্য আমাদের কমপক্ষে ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত সময় প্রয়োজন”।

 

তিনি জানান যে, শেখ মুজিবের সাথে আলোচনায় তিনি সন্তুষ্ট নন আবার তিনি একে ব্যর্থ বলতেও রাজি নন। তিনি বলেন-“সংলাপ চলবে” এবং “আলোচনায় কোন অচলাবস্থা নেই”।

 

তিনি বলেন-“ আমরা একে অপরের ভাবনা বুঝতে পেরেছি এবং এরপর যখন আমাদের দেখা হবে তখন আমাদের ভাবনাগুলো আমাদের জনগন ও তাদের প্রতিনিধিদের বোঝাতে হবে। আমাদের কাজটি খুবই কঠিন এবং গত ২৩ বছরের পরম্পরায় বেশীরভাগ সমস্যাগুলো আমাদের সমাধান করতে হবে”।

 

তিনি প্রশ্ন করেন, “আপনারা কি করে আশা করেন ২৩ বছরের সমস্যা ৩ দিনে সমাধান হয়ে যাবে?”

 

* * * * * * *

 

জাতির সামনে একটি অশনি সঙ্কেত তিনি দেখতে পাচ্ছেন বলে মন্তব্য করে তার ভাষায় “একটি জাতীয় সঙ্কট” থেকে উত্তরনের লক্ষ্যে তিনি সংলাপ আলোচনার পক্ষপাতি বলে জানান।

 

তিনি বলেন-“আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে এ ধরনের আলোচনার জন্য আমি যখনই প্রয়োজন পড়বে পূর্ব পাকিস্তানে আসব”।

 

জনাব ভুট্টো আওয়ামী লীগের ৬ দফা কর্মসূচি এবং প্রাদেশিক ছাত্র পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচি নিয়ে ধারাবাহিক আলোকপাত করেন।  

<2.147.625>

 

__________ _____ ___ _______ _____ __

জনমতের উপর ভিত্তি করে সংবিধান প্রনীত হওয়া উচিত

 

উভয় কর্মসূচী মিলিয়ে তিনি স্বায়ত্তশাসন বিষয়ক “লাহোর প্রস্তাবের” ৫টি এবং সংবিধান বিষয়ে “ছয় দফার” একটি বাদ দিয়ে ১৭ টি’র মধ্যে ১৫ টি দাবীর বিষয়ে তার অনুমোদন ঘোষণা করেন।

তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি কারন তার ভাষায়- “আমরা একটি সত্যিকার সংকটের মুখোমুখি এবং একটি ঐক্যমতে পৌঁছানোর জন্য কি করা যায় সে বিষয়ে আলোচনার জন্য আমাদের সময় প্রয়োজন”।

তবে তিনি ছয় দফার ১ নং প্রস্তাবটি আপাতদৃষ্টিতে একটি আদর্শ প্রস্তাব হিসেবে মন্তব্য করেন যাতে সত্যিকার অর্থেই একটি প্রকৃত “ফেডারেশনের” সুপারিশ করা হয়েছে।তিনি বলেন, তিনি অখণ্ড পাকিস্তানে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন এবং এটি তার রাজনৈতিক দর্শনের মুল ভিত্তি। প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় বিষয়াবলী, মুদ্রা, বৈদেশিক বাণিজ্য, রাজ্যসমুহ ও সেগুলোর নিয়ন্ত্রন –এসব হস্তান্তর বিষয়ে আওয়ামী লীগের চার দফার ব্যাপারে জনাব ভুট্টো কোন মন্তব্য করেননি।

ছাত্রদের দাবীর দ্বিতীয় দফাটি “ছয় দফার” সাথে সম্পর্কিত।

 

জাতীয় সংসদ অধিবেশন

শেখ মুজিব প্রস্তাবিত ১৫ই ফেব্রুয়ারি প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে পিপিপি সভাপতি মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন, তবে বলেন যে, “আমরা যদি কমপক্ষে ফেব্রুয়ারির শেষভাগ পর্যন্ত সময় নেই” তাতে কোন সমস্যা হবে না।

তিনি রাষ্ট্রপতিকে অধিবেশন পেছানোর পরামর্শ দিচ্ছেন কিনা –এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি নেতিবাচক সাড়া দেন।

তিনি বলেন- “আমরা অধিবেশনে যোগদানের পূর্বে কিছু জরুরী বিষয় সুরাহা করতে হবে।পরাজিত দলগুলো সহ পশ্চিম পাকিস্তানের সব ধরনের মতের নেতাদের সাথে আমাদের বসতে হবে। একটি রাষ্ট্রের সংবিধান একটি প্রদেশের নয়, জাতীয় সংবিধান হওয়া উচিত, এবং এর জন্য ঐক্যমত ও ভারসাম্য থাকা উচিত”।

তিনি বলেন যে, প্রতিদিন নতুন সমস্যা নিয়ে আবির্ভূত হওয়া এই ক্রান্তিকাল থেকে উত্তরনের ব্যাপারে শেখ মুজিবের উদ্বেগের তিনিও অংশীদার। তিনি আরও বলেন, “তবে, জাতির, এর সংহতি, অখন্ডতা ও ধর্মের বৃহত্তর স্বার্থে, এই সাংবিধানিক সংকটের একটি স্থায়ী এবং টেকসই সমাধান খুঁজে বের করার এই সুকঠিন কর্মটি সম্পাদনে ১৫ দিন চাওয়া কোন ভুল কিছু নয়”।

 

জনাব ভুট্টো বলেন যে, একটি সমঝোতা নিয়ে জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগ দিতে হবে তা জরুরী নয় কারন অধিবেশন চলাকালীনও আলোচনা চলতে পারে।

আওয়ামী লীগ বর্তমান পরিষদে  নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে একটি সংবিধান প্রনয়নে সক্ষম –এ ব্যাপারে তার মতামত জানতে চাইলে জনাব ভুট্টো বলেন, “আইনগত দিক থেকে তারা পারে, কিন্তু প্রশ্ন হলো পরিষদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে কোনরকম একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না কি দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংবিধান প্রণয়ন করা হবে। যেহেতু প্রশ্ন হচ্ছে একটি সংবিধান প্রণয়ন নিয়ে, আর আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান অদ্ভুত ধরনের, সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে সঙ্গে ঐক্যমতের মাধ্যমে সংবিধান প্রণয়ন হওয়া বাঞ্ছনীয়।

 

<2.147.626>

 

__________ _____ ___ _______ _____ __

এই প্রসঙ্গে তিনি একটি দলের উদাহরন টেনে বলেন, এটা টিকতে পারে নি কারণ এই ধারনার ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের ঐকমত্য ছিলনা। সমতার প্রশ্নটিও ছিল কারণ পূর্ব পাকিস্তানও এটি পছন্দ করেনি– তিনি আরও যোগ করেন।

 

যখন একজন সংবাদ প্রতিনিধি “আসল সংকট”-যার কথা জনাব ভুট্টো সাংবাদিক সম্মেলনের সময় বারবার উল্লেখ করছিলেন সে বিষয়ে জানতে চান, পিপিপি নেতা তাকে পশ্চিম পাকিস্তান সফরের আহ্বান জানান এবং তাকে নিজে এই সমস্যাগুলো দেখে যেতে বলেন। তিনি বলেন, “আমাদের হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের মত ছয় দফা নেই, কিন্তু আমাদেরকেও পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে অনেক কিছু বোঝাতে হয়েছে নির্বাচনে জেতার লক্ষ্যে। কাজেই আমাদের অবস্থান অনেকটাই ভিন্ন এবং এ জন্য আলোচনা প্রয়োজন”।

 

পিপলস পার্টির প্রধান সেইসব কায়েমী স্বার্থবাদীদের উদ্দ্যেশ্যে পুনরায় হুঁশিয়ারি উচ্চারন করেন যারা তার ভাষায় “জনগনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে অতিদ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন”।

 

তিনি বলেন যে, যেহেতু দুটি বিজয়ী দলই জনগনের কাছে জাতীয়করণে অঙ্গীকারাবদ্ধ, শিল্পপতিরাও এই দিকে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।তিনি আরও যোগ করেন, সমাজতন্ত্র বিরোধী এবং শোষকশ্রেণির অনেকেই তাঁদের লক্ষ্য পূরণে প্রায়শই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান সফর করছেন।