আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের ওপর ডঃ মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী

Posted on Posted in 2

<2.131.572>

 

প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন

মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী

দেশের সব কয়টি রাজনৈতিক দল প্রাদেশিক/আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দাবী করে যদিও তাদের মধ্যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রকৃতি ও পরিসর নিয়ে বস্তুগত মতভেদ রয়েছে। সহজ অর্থে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন বলতে বুঝায় যে প্রদেশগুলোই তাদের নিজেদের সকল ব্যাপারের নিয়ন্ত্রক হবে। এটি বুঝায় যে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতা বিভাজিত হবে এবং কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রাদেশিক সরকার তাদের নিজেদের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও পরস্পরের সহযোগী হবে। প্রত্যেক সরকারই তাদের নিজেদের কর্তৃত্ব ক্ষেত্রে স্বাধীন। সংবিধান কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে দেয়। কেউ কারোর ঊর্ধ্বস্থ নয়; প্রজাতন্ত্রে তারা একে অপরের অংশীদার। কোন সরকারই অন্য সরকারের অধি ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। দুই সরকারের মাঝে ক্ষমতার প্রকৃত বিভাজন কেউই একা পরিবর্তন করতে পারবে না। এটিই প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের মানে।

প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যেক কে সঠিক কী পরিমানে ক্ষমতা প্রদান করা হবে তা কতগুলো উপাদানের উপর নির্ভর করে, যেমন ভূগোল, রাজনৈতিক অবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যাপারসমূহ, ইতিহাস এবং পরিস্থিতির সংকট। এগুলো সব যুক্ত সরকার ব্যবস্থায় এক হয় না। এটা অদ্ভুত কোন ব্যাপার নয়। যুক্তরাষ্ট্রের যা সত্যি কানাডার তা সত্যি নয়। পাকিস্তানের অবস্থাও অন্যান্য অনেক দেশ থেকে ভিন্ন। 

কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মাঝে ক্ষমতা বণ্টনের অনেক পদ্ধতি আছে। প্রথম পদ্ধতি, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা নিরুপিত হওয়ার পর অবশিষ্টাংশ প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করা। দ্বিতীয় পদ্ধতি, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক উভয় সরকারের ক্ষমতা নিরুপিত করা। তৃতীয় পদ্ধতি, ক্ষমতার তিন স্তর বিশিষ্ট তালিকা থাকতে পারে, যেমন একটি কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার তালিকা, একটি প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতার তালিকা এবং একটি সমবর্তী ক্ষমতার তালিকা। উভয় সরকারই সমবর্তী তালিকার অন্তর্ভুক্ত বিষয় নিয়ে আইন বানাতে পারে, তবে বিরুদ্ধ বিষয়ে কেন্দ্রীয় আইনই প্রাধান্য পাবে।

অনুযায়ী আমি আলোচনার প্রস্তাব করছি পাকিস্তানকে সঠিক যে পরিমান ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ এর অধীনে, যা ভারত স্বাধীনতা আইন, ১৯৪৭ এর আলোকে অভিযোজিত ও সংশোধিত হয়েছিল এবং ১৯৫৬ ও ১৯৬২ সালের সংবিধান অনুযায়ী। উপরে উল্লিখিত সাংবিধানিক আয়োজন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের মূল ক্ষমতা প্রায় একই, যদিও প্রথম দুটি  সংবিধানের চেয়ে ১৯৬২ সালের সংবিধানে কেন্দ্রীয় সরকারকে বেশি ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার বর্ণনার পর আমি আলোচনা করব কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক এইসব ক্ষমতার চর্চা এবং এর ফলে যে পরিণাম হয় তার। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবীর পটভূমি ও বর্তমানে যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন চাওয়া হচ্ছে তার প্রকৃতি ও পরিসর ব্যাখ্যায় ব্যাপক আলোচনার প্রয়োজন।

<2.131.573>

কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাসমূহ ছিলঃ

১. প্রতিরক্ষাঃ সেনাবাহিনী, নৌ ও বিমান বাহিনী; নৌ, সেনা ও বিমান বাহিনীর কাজসমূহ, প্রতিরক্ষার সাথে সংযুক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান সমূহ, এবং সকল ধরনের অস্ত্র তৈরী।

২. পররাষ্ট্র সংক্রান্ত ব্যাপারঃ পাকিস্তানকে অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক আনয়ন করে এমন ব্যাপারসমূহ, চুক্তি সমূহ, কুটনৈতিক, রাষ্ট্রদূত ও বাণিজ্য সংক্রান্ত প্রতিনিধিত্ব, আন্তর্জাতিক সংগঠন সমূহ, যুদ্ধ-শান্তি, বহিঃসমর্পন, বৈদেশিক ও বহির্গত অধিক্ষেত্র।

৩. ব্যবসায় ও বাণিজ্যঃ প্রদেশগুলোর মাঝে ও অন্য রাষ্ট্রের সাথে ব্যবসায় ও বাণিজ্য, শুল্ক বিভাগের মাধ্যমে আমদানি ও রপ্তানি।

৪. মুদ্রা প্রচলন, মুদ্রা তৈরী ও বৈধ দরপত্র, বৈদেশিক বিনিময়, বিক্রয়যোগ্য উপকরণ, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এক প্রদেশে সীমাবদ্ধ নয় এমন ব্যাংক সংক্রান্ত কাজ ও ব্যবসায়।

৫. কেন্দ্রীয় সরকারী ঋণ, অর্থ ঋণ নেওয়া, কেন্দ্রীয় সরকারের একীকৃত তহবিলের নিরাপত্তা, বৈদেশিক ঋণ।

৬. বিমা ও প্রতিষ্ঠান সমূহ।

৭. শেয়ার বাজার সমূহ।

৮. নৌ পথ, শিপিং, বিমান পথ, বিমানবন্দর, বিমান, লাইট হাউজেস।

৯. প্রধান বন্দর সমূহ।

১০. কেন্দ্রীয় সরকারি সেবাসমূহ, সর্ব পাকিস্তানি সেবাসমূহ, কেন্দ্রীয় সরকারি কর্ম কমিশন, কেন্দ্রীয় অবসর ভাতা,

১১. রেডিও ও টেলিভশনসহ ডাক ও সকল প্রকার দূর যোগাযোগ ব্যবস্থা।

১২. কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বা মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠান।

১৩. খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস।

১৪. আদমশুমারী, পাকিস্তান জরিপ, পাকিস্তানের ভৌগোলিক জরিপ।

১৫. কেন্দ্রীয় সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান সমূহ।

১৬. আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক।

১৭. মদ, আফিম ইত্যাদি বাদে পাকিস্তানে উৎপাদিত তামাকজাত ও সকল প্রকার দ্রব্যের শুল্ক।

১৮. কো-অপারেটিভ ট্যাক্স।

১৯. লবন।

২০. আয়কর ও কৃষি আয়কর।

২১. দ্রব্য বিক্রির উপর শুল্ক।

২২. সম্পদের মোট মূল্য ও কোম্পানির মূলধনের উপর শুল্ক।

২৩. উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির উপর শুল্ক।

২৪. জমিদারীর সম্পত্তি অনুযায়ী শুল্ক।
<2.131.574>

 

২৫. বিনিময় রশিদ, চেক, কর্জ পত্র ইত্যাদি স্ট্যাম্পের করের হার।

২৬. পণ্য ও যাত্রীদের উপর টার্মিনাল ট্যাক্স।

২৭. খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর কর।       

১৯৫৬ সালের সংবিধানে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিকল্পনা সমবর্তী তালিকায় রাখা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে পরিকল্পনা বোর্ড রয়েছে এবং এই বোর্ড অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিকল্পনা সংক্রান্ত কাজ করে থাকে। ১৯৬২ সালের সংবিধানে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার তালিকায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও জাতীয় অর্থনৈতিক সমন্বয়সাধন আছে। উপরন্তু, ১৯৬২ সালের সংবিধান অনুসারে জাতীয় আইন সভা নিম্নোক্ত যেসব বিষয়ের সাথে জাতীয় স্বার্থের সম্পর্ক আছে সেসব বিষয়ে আইন তৈরীর ক্ষমতার অধিকারীঃ

(ক) পাকিস্তানের নিরাপত্তা, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা এর অন্তর্ভুক্ত।

(খ)  পরিকল্পনা ও সমন্বয়

(গ)  পাকিস্তানের যেকোন অংশে সাম্যাবস্থা অর্জন।

এই থেকে এইটি পরিষ্কার যে সকল প্রয়োজনীয় ক্ষমতা যেমন প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র সংক্রান্ত বিষয়সমূহ, বৈদেশিক ব্যবসায় ও বাণিজ্য, আন্তঃপ্রাদেশিক ব্যবসায় ও বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিময়, বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও জাতীয় অর্থনৈতিক সমন্বয়, মুদ্রা, মুদ্রা প্রচলন ও বৈধ দরপত্র, রাজস্বের প্রায় সকল প্রকার নমনীয় উৎস সমূহ, এবং দুটি মূল সর্ব পাকিস্তানি সেবা ১৯৪৭ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারে হাতে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মূল ক্ষমতাগুলো পুঞ্জীভূত হওয়ার ফলাফল নিচে আলোচনা করা হল।

এটি সকল অপরিহার্য ব্যাপার যেমন অর্থনীতি, আর্থিক মাথাপিছু আয়, বিনিয়োগ, বৈদেশিক বিনিময়ের ব্যবহার, উৎপাদন, রাজস্ব, মূলধন ও উন্নয়ন হিসাব, বৈদেশিক সহায়তা ও ঋণ, অর্ধ-পরিচিত ক্ষেত্রে বিনিয়োগ, পরিবহন ও যোগাযোগ, উর্ধস্থ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা, জীবন মান, আঞ্চলিক সঞ্চয় ও বিনিয়োগ, সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের ব্যয়, প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ও তাদের ব্যয় নিয়ে পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। এই বৈষম্যের আয়তন, বৈচিত্রতা এবং ব্যাপ্তি বেড়েছে কেন্দ্রীয় সরকারে গত বিশ-ত্রিশ বছরের কর্মপন্থার কারনে যার অস্ত্র ছিল উপরে উল্লিখিত ক্ষমতা সমূহ। এইসব বৈষম্যের ফলস্বরূপ পাকিস্তানের দুই অংশের মাঝে মারাত্মক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি করেছে যার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদ ও ক্ষমতা পুঞ্জীভূত হয়েছে। এই বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতার বিশ্লেষণ ও আলোচনা দরকার। প্রকৃত জাতীয় অখণ্ডতা মুখে-মুখে নয় বাস্তবে করার জন্য এইসব ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হওয়ার কারণ ও তার শাখা প্রশাখা সমূলে উৎপাটিত হওয়ার উপর নির্ভর করে।

বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিময় এবং তার ব্যবহারঃ

 আমরা পূর্ব পাকিস্তানের ১৯৪৭-৪৮ থেকে ১৯৬৭-৬৮ সালের মোট রপ্তানি ও আমদানি পর্যালোচনা করি এবং দেখি কিভাবে বৈদেশিক বিনিময়ের উপার্জন ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তার ফলাফল কী।       
 

 

 

<2.131.575>

 

এই সময়কালে পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানি করেছে ২,২৩৯.৫ কোটি রুপি যেখানে আমদানি করেছে ১,৬৩০.৮৯ কোটি রুপি। এই বছরগুলোতে পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বৃত্ত ছিল ৬০৮.৭ কোটি রুপি। একই সময়কালে পশ্চিম পাকিস্তান রপ্তানি করেছে ১৭৫৯.৭ কোটি রুপি এবং আমদানি করেছে ৩১১০.৫ কোটি রুপি। পশ্চিম পাকিস্তানের ঘাটতি ছিল ২০৩৯.৮ কোটি রুপি।

এই সংখ্যাগুলো দেখায় যে পূর্ব পাকিস্তানের বৈদেশিক জমাখরচ ছিল খুবই অনুকূল যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের ছিল খুবই প্রতিকুল। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের বৈদেশিক বাণিজ্যের এই অনুকূল সংখ্যা তার নিজের জনগণের জন্য ব্যবহার করার অনুমোদন ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য এটির অনেকগুলো মারাত্মক প্রভাব ছিল। প্রথম, শেষ একুশ বছর ধরে  ৬০৮.৭ কোটি রুপি মূল্যের পণ্য আমদানি করার অনুমোদন ছিলনা পূর্ব পাকিস্তানের। বৈদেশিক বাণিজ্যের উপার্জনের বার্ষিক ৩০ কোটি রুপি গড়ে তার জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করতে পারেনি। এরপর ২১ বছরে ৬০৮.৭ কোটি রুপি বিনিয়োগের সুফল থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। দ্বিতীয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বলতে বুঝায় পণ্যের আদান-প্রদান বা পণ্যের রপ্তানি ও আমদানি। যেহেতু পূর্ব পাকিস্তান পণ্য আমদানি করতে পারছে না সেহেতু সেখানে এটি শূন্যস্থান সৃষ্টি করেছে। এই শূন্যস্থান পূরণে সেখানে কৃত্রিম মুদ্রার ছাড়া হয়েছিল যা উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির সৃষ্টি করেছিল যেটা সাধারন মানুষের ব্যাপক দুর্ভোগের কারন হয়েছিল। তৃতীয়, পূর্ব পাকিস্তানের বৈদেশিক বাণিজ্যের উদ্বৃত পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রধান দ্রব্য আমদানিতে ব্যবহার হয়েছিল।  এই সংখ্যাগুলো শুধুমাত্র পাকিস্তানের দুই অংশের শিল্প উন্নয়ন বৈষম্যের বর্ণনাই করে না, ব্যাখ্যাও করে।  

পূর্ব পাকিস্তানের বৈদেশিক বাণিজ্যের উপার্জন আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও লিবারেল ব্যাংক ক্রেডিটের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানি আমদানিকারকদের সুবিধার জন্য ব্যয় হওয়াই আন্তঃপ্রদেশে বৈষম্য হওয়ার প্রত্যক্ষ কারণ।  

চতুর্থ, পূর্ব পাকিস্তান তার বৈদেশিক বাণিজ্য আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পণ্য ও সেবা ক্রয়ে ব্যয় সমর্পণ করে। নিঃসন্দেহে বৈদেশিক বাণিজ্যের মান খুব উঁচু এবং যা অভ্যন্তরীন রুপিতে ক্রয়ে সমান করা যায় না। পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা আরও ভাল হত যদি না তার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পণ্য ক্রয় করতে হত, এটি তার বৈদেশিক উপার্জন বিদেশ থেকে পণ্য ক্রয়ে ব্যয় করতে পারত যেখানে পণ্যের মূল্য তাত্পর্যপূর্ণ ভাবে কম। এটি সত্য যে আন্তর্জাতিক বাজারে পাওয়া যায়, এরপর দুর্লভ বৈদেশিক আয় সমর্পণের কারণে পূর্ব পাকিস্তান প্রধান পণ্য আমদানি হ্রাসের মাধ্যমে দুর্যোগপূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষতিতে পরে।

পঞ্চম, বৈদেশিক আয় সমর্পণের কারণে কাচা মাল বৈদেশিক সহায়তা ও ঋণের দ্বারা আমদানি করতে হয়, এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয় কেননা পূর্ব পাকিস্তানকে বৈদেশিক ঋণের সুদও প্রদান করতে হয়, এবং আমদানিতে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়েও বেশি মূল্য প্রদান করতে হয়।

এটা সর্বজনীন বিষয় যে, প্রধান পণ্যের দুষ্প্রাপ্যতাই পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নের গতিকে সবচেয়ে মারাত্মক ভাবে বাধাগ্রস্থ করেছে।

এটি সন্দেহের ঊর্ধ্বে যে গত ২১ বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক আয় বণ্টনের নীতিই এই অবস্থার সৃষ্টি করেছে। 

 

<2.131.576>

 

পরিশেষে, পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশও প্রকাশ করে তার মোট কত সঞ্চয় ও বিনিয়োগ পশ্চিম পাকিস্তানে অপসারণ করা হয়।

একই সময়কালে পশ্চিম পাকিস্তান তার আয়ের চেয়ে ২,০১৯ কোটি রুপি বেশি ব্যয় করেছে। তার বৈদেশিক আয় হয় ১,৭৫৯.৭ কোটি রুপি এবং আমদানি হয় ৩।,৭৭৯.৫ কোটি রুপি। এভাবে বিস্ময়কর ২,০১৯.৮ কোটি রুপির ঘাটতি সৃষ্টি করে। এতে বুঝা যায় যে সে পূর্ব পাকিস্তানের বৈদেশিক আয়ের উদ্বৃত ও বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা এই স্তর পর্যন্ত ব্যবহার করেছে।

এটাই অপরিহার্য কারণ যে কেন পূর্ব পাকিস্তান তার বৈদেশিক বিনিময় আয়ের উপর পূর্ণ ও বিধিনিষেধ হীন নিয়ন্ত্রণ চায়। এটি পূর্ব পাকিস্তানকে এসব সম্পদ সমূহ তার জনগনের কল্যাণে ব্যয় করতে সক্ষম করবে। কেন্দ্রীয় সরকারে বাণিজ্য আয় বণ্টনের নীতি সাংবিধানিকভাবে গৃহীত মূলনীতির স্থুল লঙ্ঘন করেছে। পূর্ব পাকিস্তান দালিলিক অঙ্গীকারের উপর তার বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। সে তার পূর্ন ভাগ চায়। নিঃসন্দেহে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্ম নীতি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সর্বনাশা। পূর্ব পাকিস্তান এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে উলটে দিতে চায়। সে বৈদেশিক বাণিজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারে আবশ্যিক শর্ত পূরণ ও অনুমোদিত ভাগ প্রদানে সম্পূর্ণ ইচ্ছুক। এটাই ঠিক ও যৌক্তিক। এই কারণেই পূর্ব পাকিস্তান চায় যে স্থানে ঋণ ও মূলধন ব্যবহার করা হয়েছে তার উপর ভিত্তি করেই পরিশোধ নীতি ঠিক করা হোক। বৈদেশিক বাণিজ্য আয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য জরুরী, গুরুত্বপূর্ণ এবং তার বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয়। কোন যৌক্তিক মানুষই এই দাবির যথার্থতা বুঝতে ও মর্ম উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হবে না। পূর্ব পাকিস্তান চায় আগামী সংবিধানে যেন বৈদেশিক বাণিজ্যের উপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রদান করা হয়। এই স্বচ্ছ পরিষ্কার  বিষয়টিই প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনের জন্য অপরিহার্য।