আবদুল খালেকসারদা পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল,গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইজিপি

Posted on Posted in 15

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্রের ১৫তম খণ্ডের ২৫ নং পৃষ্ঠায় মুদ্রিত ০৫ নং দলিল থেকে বলছি…

আবদুল খালেক

 

ঊনিশশত সত্তুরের মার্চ মাসে আমি সারদা পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল ছিলাম। অনেক আগে থেকেই দেশের রাজনৈতিক ঘটনা-প্রবাহের প্রতি আমার বিশেষ আকর্ষণ ছিল। সামাজিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক দিক থেকে পূর্ববঙ্গ/পূর্ব পাকিস্তানকে কোনঠাসা করে রাখার ঘটনাবলী আমার চেতনায় আঘাত দিয়েছিল। লিয়াকত আলী খান, সরদার আবদুর রব নিশতার প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করবেন তা আমি মেনে নিতে পারিনি। রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও খাজা নাজিম উদ্দিন যে সকল কথা বলেছেন, তাতে উর্দুভাষার প্রতি আমার বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে পাকিস্তান পুলিশ সার্ভিসে যোগদান করেও আমার মনোভঙ্গির কোন পরিবর্ত ঘটাইনি, উর্দুভাষা শেখার চেষ্টা করিনি যদিও পুলিশ বিভাগের উর্দুভাষার প্রচলন উর্দুভাষা শেখার চেষ্টা করিনি যদিও পুলিশ বিভাগের উর্দুভাষার প্রচলন ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।

১৯৫৬ সালের সংবিধানের সংখ্যাসাম্য নীতি এবং ১৯৫৮ সালের সামরিকবাদকে আমি মোটেও সমর্থন করিনি। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা দখল করাকে আমি নিছক বর্বরতা বলে গণ্য করেছি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে যারা অবদান রেখেছেন তাদেরকে আমি আজও শ্রদ্ধা করি, ২১শে ফেব্রুয়ারী-রক্তস্নাত পূর্ববঙ্গে যারা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন, তারা আমার পরম শ্রদ্ধাস্পদ।

১৯৬৯ সালের সামরিক কর্তাদের আদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে পুলিশি তল্রাশি চালানো হয়। উক্ত তল্লাশির বিরোধিতা করে কিছু কথা বলার জন্য সামরিক কর্তৃপক্ষ আমার উপর ক্ষেপে যায়। ঐ বছর ঢাকা বিভাগের ডিআইজি থাকাকালে প্রায় সময় সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার মতবিরোধ ঘটতো। প্রশাসনের সঙ্গে মতবিরোধ অনেক আগেও হয়েছিল। ১৯৫৪ ও ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে আমি নিরপেক্ষ থেকে মহাবিপদের সম্মুখীন হয়েছিলাম। সে সময় আমার উপর কড়া নজর রাখা হতো। ১৯৬৯-এরশেষ ভাগে ঢাকার জনসাধারণ মওলানা মওদুদীকে পল্টন ময়দানে বক্তৃতা দিতে দেয়নি। গোলমালের দায়ে ঢাকার পুলিশ সুপার মামুন মাহমুদ (শহীদ) কে ময়মনসিংহে বদলি করা হয় এবং তার পদোন্নতি ছয় মাস পিছিয়ে দেয়া হয়। এই প্রসঙ্গে ঘোরতর আপত্তি জানালে মাস তিনেক পরে আমাকে ঢাকা থেকে সারদায় বদলি করা হয়। কিন্ত ঢাকার ঝামেলা থেকে সরে গিয়ে আমি খুব খুশী হই।

১৯৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল আমি লন্ডনে বসে শুনতে পাই। পাকিস্তান হাইকমিশনের কর্মকর্তারা হতবাক। দু’চার জনের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি যে, ফলাফল কার্যকর হতে দেয়া হবে না। দেশে ফিরে মুজিবুর রহমান সাহেবকে এ কথা বলতে তিনি তা হেসে উড়িয়ে দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ ১৯৭১-‌এর জানুয়ারী মাস থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার কথা উত্থাপন করতে শুরু করেছিল। ৭ ই মার্চের ঘোষণা ও অসহযোগ আন্দোলনের ফলে আসন্ন সামরিক আঘাতের মোকাবেলা করার কোন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রস্তুতি আমাদের ছিল কি না জানি না। আওয়ামী লীগ নেতারা ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সংলাপের রাজনীতিতে উঠেপড়ে লেগেছিল। সামরিক কর্মকর্তারা বহু দেশে সংলাপের নামে রাজনীতিবিদদেরকে বোকা সাজিয়েছে এ খবর হয়ত বা তাদের জানা ছিল না। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে সারদা একাডেমিতে কর্মরত ও প্রশিক্ষণরত কয়েকশত পুলিশ খুব অস্থির হয়ে উঠে। দেশে আসন্ন সামরিক পরিস্থিতে তারা জীবন দিবে-এই প্রতিশ্রুতি রেখে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ দল নিজ নিজ কর্মস্থলে চলে যায়। একাডেমির স্টাফকে সে সময় স্থানীয় লোকজনদেরকে গুলিবন্দুক বিষয়ক প্রশিক্ষণের কাজে নিয়োজিত করা হয়। সারদা একাডেমির খবর পেয়ে রাজশাহীতে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মামুন মাহমুদ (শহীদ)-এর কথা আগেই বলেছি তিনি তখন ময়মনসিংহ থেকে বদলী হয়ে রাজশাহীর ডিআইজি। পুলিশ সুপার শাহ আবদুল মজিদ (শহীদ) মাত্র মাস দু’এক আগে সারদা থেকে রাজশাহীতে বদলী হন। সারদা ও রাজশাহী পুলিশ লাইনে তখন পরিখা তৈরী করা হয় এবং পুলিশের নেতৃত্বে বিবিধ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। রাস্তাঘাট কেটে সামরিক যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।

২৩শে মার্চ সারদা একাডেমীতে পাকিস্তানের পতাকা ওঠানো হয় নি। এ খবর পেয়ে রাজশাহী গ্যারিসনের লোকজন এমনকি জেলা প্রশাসনের কেউ কেউ সারদা এসেছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কর্মসূচির সঙ্গে সংগতি রেখে সারদায় কালো পতাকা ওঠানো হয় এবং পাকিস্তানি পতাকা নিশ্চিহ্ন করা হয়। গ্যারিসনের ধারেকাছেই আমরা এতোকিছু করে যাচ্ছি অথচ তখন আমাদের কোনো ভয়ভীতি ছিল না।

২৬শে মার্চের সকালে খবর পেলাম যে ইয়াহিয়া খানের সামরিক অভিযানে রাজারবাগ পুলিশলাইন, পিলখানা ইপিআর হেড কোয়ার্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরের অনেক অংশ বিধ্বস্ত হয়েছে। হাজার হাজার পুলিশ ও ইপিআর লড়াই করে প্রাণ দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে। এসব খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অস্ত্রাগারের তালা খুলে দেওয়া হয়। সারদা একাডেমীর পুলিশ পরিবারগুলো কোনো দিকে সরে যেতে পারে নি। কেননা স্থানীয় লোকজন কাউকে সেই অঞ্চল ছেড়ে যেতে দিচ্ছিলো না। সামরিক যানবাহন চলাচলের প্রতিবন্ধকতা আগে থেকে তৈরি করা হয়েছিলো। সরকারি আদেশে পদ্মায় নৌকা চলাচল বন্ধ। কাজেই সারদায় বসেই প্রতিরক্ষা/প্রতিরোধের জন্য তৈরি হওয়াই ছিল আমাদের একমাত্র উপায় ও লক্ষ্য।

৩১ মার্চের শেষ রাতে খবর পেলাম যে একাডেমীর পাশ দিয়ে রাতের অন্ধকারে কিছুসংখ্যক সৈন্য চলাচল করেছে। মিনিটকাল বিলম্ব না করে পরিবারসহ সেই অন্ধকারে আমার নিজস্ব গাড়িতে করে একাডেমীর বাইরে চলে আসি। সঙ্গে ব্যবহারের জন্য কাপড়-চোড় ও টাকা-পয়সা কিছুই নিয়ে আসার সময় পাই নি। একাডেমীতে এই নির্দেশ রেখে আসি যে এবার যেন প্রত্যেকে নিজ নিজ নিরাপত্তার পথ বেছে নিতে বিলম্ব না করে। বেলা ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পুটিয়া থানায় এসেও সেনাবাহিনীর গতিবিধির খবর পেলাম। থানার প্রাঙ্গণে আমার গাড়িটি ফেলে টমটম নিয়ে নওগাঁ-র দিকে এগুতে থাকি। আমার স্ত্রী (সেলিনা), মেয়ে (সামিনা) এবং ছেলে (ইনান) আর বাবুর্চি রহিমুদ্দিনকে টমটমে দেখে কে বা কারা গুজব রটিয়ে দেয় যে, সারদার একজন পাঞ্জাবী অফিসার পালিয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যার প্রাক্কালে একটি স্কুলের পাশে উপস্থিত হই এবং স্থানীয় একজন প্রিন্সিপালের বাসায় উঠি। সেখানে হাজার হাজার লোক এসে উপস্থিত। তারা বিশ্বাস করতে চায় না যে আমি বাঙালী। প্রিন্সিপাল আমাদের স্কুলের প্রাঙ্গণে নিয়ে আসেন। এমন সময় পার্লামেন্ট সদস্য সরদার আমজাদ হোসেন সেই পথে যাচ্ছিলেন। আমাদের বিপদের কথা শুনে তিনি লোকজনকে বুঝালেন যে আমি বাঙালী। কিন্তু কিছু সংখ্যক লোক দাবি করে যে, আমাকে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে আমি বাঙালী। আমজাদ হোসেনের পরামর্শে অগত্যা বক্তৃতা দিয়ে রেহাই পেলাম। কিন্তু সেখানে রাত কাটাতে সাহস হলো না। অন্ধকারে গরুর গাড়িতে নওগাঁর দিকে এগুতে শুরু করি। রাত এগারোটায় পথিমধ্যে বাগমারা থানাঘরে উঠে দেখি সেখানে কেউ নেই। কিছুক্ষণ পর একজন সিপাহীর দেখা পেলাম। ওসি ও অন্যান্য পুলিশ কোথায় সে জানে না। ওসির পরিবারের কাছে পরিচয় দিয়ে বৈঠকখানায় বসি। গভীর রাতে তিনি আমাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সিপাহীটি খবর দিলো যে, ওই জায়গায় আমাদের থাকা নিরাপদ হবে না। সিপাহী বহু কষ্টে একটি গরুর গাড়ির বন্দোবস্ত করে দেন এবং আমরা এ রাতেই নওগাঁর দিকে এগিয়ে চলি। ভোর হতে না হতেই দা,লাঠি,বল্লম ইত্যাদি হাতিয়ার সজ্জিত হাজার হাজার লোকের বেড়াজাল ভেদ করে চলতে হয়। বেলা নয়টার দিকে একটি বাজারে এসে পৌঁছি। সেখানেও আমাকে পাঞ্জাবী বলে সন্দেহ করা হয় এবং আমার বাঙালিত্বের পরিচয় দিতে হয়। পরিবারসহ আমাদের আত্মীয় পুলিশ ইন্সপেক্টর লোদীর বাসায় যাচ্ছিলাম। লোদীকে ডেকে আনার জন্য তিনি লোক পাঠালেন এবং আমাদের জন্য খাবারের বন্দোবস্ত করলেন। ঘণ্টা চারেক পর লোদী সাহেব এসে আমাদের নওগাঁয় নিয়ে গেলেন। কোত্থেকে কীভাবে এখানে এসেছি এ খবর শুনে লোদী পরিবার মর্মাহত। কিন্তু আমরা এতোদিন পর নিরাপত্তাবোধ ফিরে পেলাম।

এই সময় সান্তাহারে বাঙালি-অবাঙালিদের মধ্যে হিংসাত্মক কার্যকলাপ বন্ধ করার কাজে লোদী ব্যতিব্যস্ত। ম্যাজিস্ট্রেট আজিজুর রহমান ও মেজর নাজমুল হক মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। রাজশাহী জেলার জন্য প্ল্যান বানানো হলো। আমি সারদা অঞ্চলের ভার নেই। সঙ্গে থাকেন সারদা ক্যাডেট কলেজের ক্যাপ্টেন রশীদ এবং অধ্যাপক আজিমদ্দিন। ব্যবস্থা করা হলো যে, পাক-সেনাবাহিনীর আক্রমণে নওগাঁর নিরাপত্তা বিপন্ন হলে ইন্সপেকটর লোদীর পরিবার আমার স্ত্রী, মেয়ে এবং ছেলেকে নিয়ে ধামুরহাট বর্ডার দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেবে। ১২ই এপ্রিল আমি সারদায় ফিরে আসি। তখন একাডেমী প্রায় জনশূন্য। ভাইস প্রিন্সিপাল শৈলেন্দ্র কিশোর চৌধুরীর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন বলে নিরুপায় হয়ে তারা সারদায় রয়ে গেছেন। পিএসপি ট্রেইনি অফিসারদের মধ্যে মধ্যে বাঙালিরা নিজ নিজ বুদ্ধি খাটিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছুবার আশায় বের হয়ে গিয়েছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানিদের পদ্মার অপর পাড়ে ভারতে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করেছে। আরো জানতে পারলাম যে, তারা ভারতীয় বর্ডার নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে রিপোর্ট করেছে। জনশূন্য একাডেমীতে থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই দেখে রশীদ ও আমি ঠিক করি যে, ১৪ই এপ্রিল সন্ধ্যায় চারঘাট হয়ে কুষ্টিয়ার পথে ভারতে প্রবেশ করবো। এদিকে ঢাকা থেকে মাঠঘাট জ্বালিয়ে পুড়িয়ে পাক বাহিনী নাটোরে এসে পৌঁছেছে। গুপ্তচরেরা আমাদের অবস্থান ওদের জানিয়ে দেবে এই বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ ছিল না। দুটি রাত সারদার বাইরে চারঘাট থানাঘরে কাটাই। থানায় কেউ ছিল না। শুধু আমি এবং সারদার একজন বাঙালি সিপাহী। ১৪ই এপ্রিল বিকাল চারটায়, সঙ্গে কিছু কাপড়চোপড় নিয়ে সারদা থেকে বেরিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হচ্ছি ঠিক এমন সময় মেশিনগানের বিকট শব্দ শুনতে পেলাম। মিনিটখানেকের মধ্যে খবর পেলাম যে পাকবাহিনী তিন দিক থেকে একাডেমী ঘেরাও করেছে এবং অফিসার্স মেসে পৌঁছেছে। মুহূর্তকাল বিলম্ব না করে সবকিছু ফেলে পদ্মার দিকে দৌঁড়ে পালাই। পানির ধারে কিছুসংখ্যক স্থানীয় লোক সামরিক বাহিনীর দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে আছে। নদী পার হবার কোনো যানবাহন অনেকদিন আগে থেকেই সেখানে নেই। সাঁতরিয়ে পার হবার জন্য পানিতে নেমেছি, পিছনে তাকিয়ে দেখতে পাই নিকটবর্তী চরের নালায় একটি ছোট ঘাসের নৌকায় কয়েকজন লোক উঠবার চেষ্টা করছে। কিন্তু ওই সময় নদীতে এগোলেই মাঝি গুলি খেয়ে মরবে এই ভয়ে বুড়ো মাঝি কাউকে নৌকায় উঠতে দিচ্ছে না। ঘাস ভর্তি ছোট নৌকাটিতে বড়জোর দুজন উঠতে পারে। আমি চরে ফিরে আসি এবং নৌকার কাছে গিয়ে মাঝিকে অনুরোধ জানাই আমাকে ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে চরের ধার বেয়ে কিছুদূর নিয়ে যাবার জন্য। সৈন্যদের চোখে ধুলি দিয়ে পালাবার আর কোনো বুদ্ধি সেসময় মাথায় আসে নি। আমাকে ঘাসের নিচে লুকিয়ে নৌকাটি ধীর গতিতে নদীর চরের ধার বেয়ে চলেছে তাতে কারো সন্দেহ হয় নি যে নৌকাটিতে আমি পালাচ্ছি। এভাবে একাডেমীর গণ্ডির বাইরে এসে নৌকাটি সরাসরি নদী পার হবার পথে এগিয়ে চলে এবং দ্রুত বেগে অনেক দূরে এসে পৌঁছে। এসময় সামরিক হেলিকপ্টার থেকে আগুন ছেড়ে গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। দিশেহারা হাজার হাজার লোক পালিয়ে পদ্মা নদীর চরে এসেছে কিন্তু নদী পার হতে পারছে না। এদের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার লোককে নদীর ধারে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে মাত্র চার/পাঁচ শত গজ দূরে উক্ত ঘাসের নৌকা ও আমি। সৈন্যরা ভাবতে পারে নি যে, আমি সেই নৌকায় লুকিয়ে আছি। ঘণ্টাখানেক পর পদ্মার অপর পাড়ে পৌঁছি। সঙ্গে কিছু নেই। ভেজা প্যান্ট ও শার্ট। নওগাঁয় ফেলে আসা পরিবারের কী অবস্থা ভাবতেই পারছিলাম না। হাজারো দুশ্চিন্তায় একেবারে ভেঙে পড়ি। অত্যন্ত দুঃখের সাথে আজো স্মরণ করছি যে, সারদায় গিয়ে আমি একটি ৬০০ পৃষ্ঠাব্যাপী বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলাম। এই পাণ্ডুলিপি সারদা একাডেমীর স্টেনোগ্রাফার শহীদ মোস্তফার হাতেই তৈরি হয়। আমি যেদিন সারদা ছেড়ে পালিয়ে যাই সেদিনই মোস্তফাকে পাক সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করে। আমার বাড়িঘর, পাণ্ডুলিপি সবকিছু লুণ্ঠিত হয়।

১৪ই এপ্রিল সকালবেলা সারদা একাডেমীর ভাইস প্রিন্সিপাল শৈলেন্দ্র কিশোর চৌধুরীকে পরিবারসহ পদ্মার ওপারে পৌঁছাবার ব্যবস্থা করা হয়। অনেক অনুরোধের পর স্থানীয় লোকজন তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর প্রতি সদয় হয়ে কোনোক্রমে একটি নৌকা জোগাড় করে দেয়। নদীর ওপারে পৌঁছে চৌধুরী চরেই পরিবারসহ বসে থাকে। তার স্ত্রীকে নিয়ে এগোতে সাহস পায় না। সন্ধ্যার পরক্ষণেই আমরা ভারত সীমান্তে ডাক্তার নরেন্দ্রনাথের বাড়িতে আশ্রয় নেই। সেই বাড়িতে কয়েকশত লোক ইতিমধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলো। ডাক্তার আমাদেরকে যথাসম্ভব যত্নসহকারে রাখেন। পরের দিন ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার আমাকে বহরমপুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠাবার ব্যবস্থা করেন। আমার পরিবারের পরিস্থিতি সম্বন্ধে তাকে জানাই। তিনি আমার বালুরঘাট যাবার ব্যবস্থা করেন। সেখানে নাটোরের এসডিও কামালউদ্দিনের সাথে দেখা হয়। কয়েকদিন আগে তিনি এখানে পালিয়ে আসেন।

বহরমপুরে সারদা একাডেমীর পুলিশ ইন্সপেক্টর ক্ষিতিশের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়। তাকে সঙ্গে করে বালুরঘাট নিয়ে যাই। বহরমপুরে মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপারের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করি। বালুরঘাট বাস টার্মিনালে কংগ্রেস কর্মী উৎপল আমাকে খুঁজে বের করে এবং তাদের বাসায় নিয়ে যায়। জানতে পারলাম বহরমপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আমার খবর বালুরঘাটে পাঠিয়েছেন। উৎপলদের পরিবার দেশ বিভাগের পূর্বে ঢাকা শহরের বাসিন্দা ছিল। উৎপলদের সঙ্গে পরামর্শ করে পর দিন ভোরে ক্ষিতিশ ও আরো কয়েকজনকে ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত করে আমার পরিবারের তল্লাশে সীমান্তের এপারে পাঠানো হয়। প্রত্যেক দলের সঙ্গে আমার হাতে লেখা একটি চিঠি আমার পরিবারের জন্য দিয়ে দেই। নওগাঁয়ে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতে সেখানকার লোকজন ভারত সীমান্তের দিকে পালিয়ে যায় এবং বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় নেয় – এ খবর বালুরঘাটে পৌঁছে। বর্ডারের মেইল পাঁচেক ভিতরে ধামুরহাট থানা অঞ্চলে এক হাজীর বাড়িতে অনেক লোকে আশ্রয় নিয়েছিলো। তাদের সঙ্গে লোদী পরিবার ও আমার পরিবার সে বাড়িতে পৌঁছে। কিন্তু তারা নিরুপায়। সীমান্তের অপর পাড়েই বা কোথায় যাবে। এদিকে আমার কোনো খোঁজ-খবর তাদের জানা নেই। ক্ষিতিশ কয়েকটি আশ্রয়স্থল খুঁজে হাজী বাড়িতে গিয়ে তাদের সন্ধান পায়। অতঃপর আমার পরিবার জীবনের চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার পথ বেছে নিয়ে ক্ষিতিশদের সঙ্গে উৎপলদের বাড়িতে এসে পৌঁছে। এখানেই আমার পরিবার জীবনের আরেক অধ্যায়ের সূচনা। উৎপলের বাবা-মা-ভাই-বোন সবাই আমাদেরকে আপন বলে গ্রহণ করে। পশ্চিম দিনাজপুরের পুলিশ সুপার ঢাকা জেলার দোহার-নবাবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। আমার শ্বশুরালয়ের এলাকায় খ্রিস্টান পরিবারের এই অফিসার ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের সদস্য। তিনি অভাবনীয় সৌজন্য দেখিয়ে আমাদেরকে একটি জীপে কলকাতা পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এবং পথে আমাদের সকলের খরচ বাবদ একশত টাকা হাতে তুলে দেন।

১৮ই এপ্রিল সন্ধ্যার প্রাক্কালে কলকাতায় কীড স্ট্রিটের এমপি হোস্টেলে কলকাতার কংগ্রেস দলীয় এমপি জয়নাল আবেদীনের অতিথি হিসেবে আশ্রয় নিই। খাওয়াদাওয়ার খরচ আমাদের নিজেদেরকে বহন করতে হয়েছিলো। আমার বা আমার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো টাকাপয়সা ছিল না। সামান্য গহনা ছিল মাত্র। আমাদের ছোট ছেলে ইনান তার জন্মদিনে পাওয়া চারশত টাকা সঙ্গে নিয়েই সারদা থেকে বেরিয়েছিলো। পালাবার দিন রাতে ওই টাকা তার সঙ্গে ছিল। এখন তার টাকা খরচ করতে চায় না। তার হিসাব হলো এতজন লোক মিলে এই টাকা খেয়ে শেষ করার পর আমাদের অবস্থা কী হবে। এমপি হোস্টেলের কোণে পান-বিড়ির দোকানের বেচাকেনা দেখে সে নিজে একটি পান বিড়ির দোকান করতে চায়। তার হিসাব অনুযায়ী দৈনিক ৭/৮ টাকা লাভ হবে এবং তাতে আমাদের খাওয়ার খরচ কোনোক্রমে হয়ে যাবে। ঐ সময় আমাদের পাঁচজনের (বাবুর্চিসহ) জন্য দৈনিক ৫/৬ টাকার বেশি খাওয়া খরচ করতে পারি নি।

কীড স্ট্রিটে ১৭ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার আমবাগানে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সনদ পাঠের কথা শুনতে পাই। সোহরাব হোসেন, মমিনউদ্দিন প্রমুখ কয়েকজন কলকাতার এমপি হোস্টেলেই ছিলেন। কামরুজ্জামানের সঙ্গে দুমিনিটের জন্য দেখা হলো। আমাদের বড় বড় নেতারা কে কোথায় আছেন জানতে চাইলে তিনি কানে কানে বললেন যে, আগামী দিন সে খবর আমাকে দেওয়া হবে। সে মুহূর্তে আমাদের নেতাদের অবস্থান সম্বন্ধে কেউ কিছু বলতে চায় নি।

পরদিন হাইকমিশনে গিয়ে ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলী ও পদস্থ অফিসার রফিকুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। রফিকের ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী তখন ঢাকায়। তাদের জন্য দুশ্চিন্তায় এবং কিছু পেশাগত দুর্বিপাকে রফিক দিশেহারা। হাইকমিশনে খন্দকার আসাদুজ্জামান, নূরুল কাদের খান ও আরো কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হলো। তাদের কাছে শুনতে পেলাম যে, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবদুল মান্নান ও কর্নেল ওসমানীকে বালিগঞ্জের একটি বাসায় থাকতে দেওয়া হয়েছে। সেখানে কয়েকজন ভারতীয় তাদের দেখাশোনা করছেন। কামরুজ্জামান অন্যত্র থাকেন। তাদের সঙ্গে দেখা করে অনেক কথা জানতে চেয়েছি। সকলের মুখে একই কথা যে, তারা নিজ নিজ সিদ্ধান্তে ভিন্ন ভিন্ন পথে কলকাতায় এসেছেন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দেখতে চেয়েছি। কিন্তু কেউ দেখান নি। বালিগঞ্জের সেই বাসস্থানে তাদের আর্থিক অনটন ও দুরবস্থা দেখে খুবই খারাপ লেগেছে। পাশেই মহিষের বাথান, দুর্গন্ধে টিকা যায় না। নিরাপত্তার অভাবে তারা ঘরের বাইরে যাচ্ছেন না। শুধু কামরুজ্জামান ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছেন। কলকাতায় লেখাপড়া করেছেন বলে তার জানাশোনা অনেক লোক ছিল। নজরুল ইসলাম ও মনসুর আলীর পরিবারের কোনো খবর নেই। পরিবার উদ্ধারের চিন্তায় তারা দিশেহারা। সারদার ইন্সপেক্টর গাজী গোলাম রহমানকে মনসুর আলীর পরিবার পাবনা জেলার কাজীপুর অঞ্চলে খুঁজে বের করে কলকাতায় আনার জন্য ঠিক করা হলো। পথের খরচ বাবদ একশত টাকা চাওয়া হলো। কিন্তু সে টাকা ১০/১২ দিনেও জোগাড় হয় নি।

খন্দকার আসাদুজ্জামান, নূরুল কাদের ও আমি একসঙ্গে নেতাদের সঙ্গে দেখা করে প্রবাসী প্রশাসন গড়ে তোলার উপদেশ দেই। আমাদের মতে স্বাধীনতার ঘোষণা করে ঘরে বসে দিশেহারা হয়ে থাকলে চলবে না। আমাদেরকে সংঘবদ্ধ হতে হবে এবং যুদ্ধের জন্য সম্ভাব্য প্রস্তুতি নিতে হবে এবং সে জন্য চাই একটি প্রশাসন যন্ত্র। আমাদের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে আমাদেরকেই যথোচিত বিধিব্যবস্থা তৈরি করার ভার দেওয়া হলো। ইতিপূর্বে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট পদে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে খন্দকার মোশতাক আহমদ, অর্থমন্ত্রী পদে মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্র ও রিলিফ মন্ত্রী পদে কামরুজ্জামান অধিষ্ঠিত হন। ১৭ই এপ্রিলের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। কিন্তু সরকারের কোনো প্রশাসনিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয় নি। শুধু কর্নেল ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়েছিলো। মুজিব নগর সরকারের খসড়া প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তলার ভার আমাদেরকে দেওয়া হয়। পাবনার ডেপুটি কমিশনার নূরুল কাদের খান এককালে বিমান বাহিনীর অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন। তাছাড়া পাবনায় তিনি পাকবাহিনীর মুখোমুখি যুদ্ধ করেছেন। প্রশাসনিক খসড়া তৈরিতে নূরুল কাদেরের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি।

আসাদুজ্জামান, নূরুল কাদের ও আমি অফিসার ইনচার্জ পদবীতে প্রশাসনের দায়িত্বভার গ্রহণ করি। আমাদের কোনো সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং ছিল না। কয়েকটি চেয়ার-টেবিলেই আমরা সকলে মিলেমিশে বসে কাজ করেছি। আর আমাদের সঙ্গে যারা কাজ করেছেন তারাও একই সঙ্গে বসেছেন। কয়েক মাস পর যখন অন্যান্য অফিসার এসে যোগ দেন তখন আমরা সচিব, উপসচিব ইত্যাদি পদের সৃষ্টি করি। আমি স্বরাষ্ট্র সচিব এবং উপরন্তু আইজি পুলিশের দায়িত্বে ছিলাম। নূরুল কাদের খান পাবনা ট্রেজারির যে কয়েক কোটি টাকা নিয়ে এসেছিলেন সেই টাকাই ছিল মূলত মুজিবনগর সরকারের আর্থিক সম্বল। আগরতলা অঞ্চলেও আমাদের কিছু টাকাপয়সার কড়াক্রান্তি হিসাব-নিকাশ দেওয়া হয়। আসাদুজ্জামান অর্থ সচিব, নূরুল কাদের খান সংস্থাপন সচিবের কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে নূরুল কাদের খান অভাবনীয় প্রতিভার পরিচয় দেন। সেক্টর, সাব-সেক্টর ইত্যাদি বেসামরিক প্রতিষ্ঠান মুখ্যত তারই ধ্যান-ধারণা। ১৭০০ মেইল বর্ডারে এই সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ কীরূপ কঠিন হতে পারে তা হয়তো অনেকের ধারণায় আসবে না।

বিভিন্ন সেক্টর থেকে মুক্তিযুদ্ধের অভিযান পরিচালনা করেছেন আমাদের সেক্টর কমান্ডারগণ। তাদের মধ্যে মেজর জিয়াউর রহমান ছিলেন সবচেয়ে সিনিয়র। কমান্ডারদের অধীন অফিসার, জোয়ান, ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর সমস্ত পেশার বাঙালী বীর সন্তানেরা কাজ করেছেন। তাঁরা পাকবাহিনীর ওপর হানা চালিয়েছেন। তাদের অস্ত্র কেড়ে নিয়েছেন। ঘাঁটি থেকে বিতাড়িত করে সেখানে মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন করেছেন। ১৭০০ মাইল স্থল সীমান্তে এই অভিযান একাধারে চালানো হয়। তাতে পাকিস্তানের সামরিক ব্যবস্থাপনা চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত লোকদের মধ্যে অগণিত মুক্তিবাহিনী মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রতিরোধ ও আক্রমণে পাকবাহিনী কোথাও দাঁড়াতে পারে নি বলে অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালাতে বাধ্য হয়। পলায়নরত পাকবাহিনীকে ধাওয়া করেছে বাঙালি কৃষক, শ্রমিক, যুবক, ছাত্র, শিক্ষক সবাই মিলে। এই দৃশ্য সবাই দেখেছে। প্রচার মাধ্যমের অভাবে তা অধিকাংশ সময় প্রচার করা সম্ভবপর হয় নি।

২৫শে মার্চের পর থেকে বাংলাদেশের মানুষ নিরাপত্তা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু যাবে কোথায়? যারা সামরিক সরকারের চিহ্নিত শত্রু তাদের বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। এই সাধারণ বিষয়টি অনেকে চিন্তা করতে পারেনি। বাংলাদেশের লোকালয়ে আমার পক্ষে পালিয়ে থাকা সম্ভবপর ছিল না সারদার এতো সব কর্মকাণ্ডের পর আমি দেশত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিই। ভারতীয় ক্যাম্পে লক্ষ লক্ষ মানুষ হতাশা ও দুর্দশা বোঝা নিয়ে প্রতিদিন এসেছে। তাদের মধ্যে প্রথম দিকে অমুসলমান বাঙালির সংখ্যাই ছিল বেশি। কিন্তু পরবর্তীকালে পরিস্থিতি হয়েছে ভিন্নতর। ক্যাম্পে সকলেই মিলে দিন কাটিয়েছে। ধর্মীয় ভেদাভেদ আমাদের নজরে পড়েনি।

পাকিস্তানের বর্বর অভিযানের মোকাবেলা করার মতো অস্ত্রবল আমাদের ছিল না। এপ্রিল-মে-জুন মাসগুলোয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভারতীয় মনোভাব আশাব্যঞ্জক ছিল না। প্রত্যক্ষ সংগ্রামের জন্য আমাদেরকে সামরিক সাহায্য দেবে এ কথা আমরা ভাবতে পারি নি। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মনোভাব যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে – যদিও এটা ছিল স্বাভাবিক কিন্তু আমাদের কাছে সেটা ছিল বেদনাদায়ক ও হতাশাব্যঞ্জক। প্রায় এক কোটি বাঙালি ভারতে যেভাবে আশ্রয় নিয়েছিলো তাতে ভারতবাসীরা শঙ্কিত হয়ে ওঠে। তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলাম বৈকি।

ওই দুর্দিনে আমরা ছিলাম নকশালপন্থীদের ভয়ে ভীত। চলাফেরায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা ছাড়া উপায় ছিল না। বিশেষ করে আমাদের নেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা খুব বিব্রত ছিলাম। সেজন্য তাঁদের আবাসস্থলে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। সিআইটি রোডে একটি তৃতীয় শ্রেণীর হোটেলে এক রুমে আমাদের মন্ত্রী ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে পরিবারসহ বসবাস করতে হয়েছে। এই হোটেলকে নিয়েই আমাদের শত্রুরা অপপ্রচারের ডামাডোল বাজিয়েছিলো। পশ্চিমবঙ্গে আমাদের দু’চারজন আত্মীয়স্বজন ছিলেন। তাঁদের কাছে আশ্রয় চেয়ে হতাশ হয়েছি। তারা বড়জোর একদিন দুদিন থাকতে দেবার পর অন্যত্র চলে যাবার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা মনেপ্রাণে চান নি যে পাকিস্তান দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে যাক। হাইকমিশনের পদস্থ কর্মচারী রফিকুল ইসলাম চৌধুরী আমাদেরকে তাঁর বাসায় রাখেন। তাঁর বাসায় আরো তিরিশজন লোক ছিলেন। এতোজনকে প্রায় তিন মাস খাইয়ে-দাইয়ে তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তবু তিনি ও তার স্ত্রী আমাদের বাড়ি ছাড়তে দিবেন না। বহু বুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদেরকে রাজি করেছি। অতঃপর গোবরা কবরখানার নিকটবর্তী একটি বাড়িতে বসবাসের ব্যবস্থা করি।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মেঘালয়, মিজোরাম এবং আসামের কোনো কোনো অঞ্চলে আমাদের লোকজন যখনই প্রবেশ করতে চেষ্টা করেছে তখনই বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এমনকি স্থানবিশেষে বন্দী জীবন কাটিয়েছে। তাদেরকে উদ্ধার করার কাজে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিছুসংখ্যক লোককে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও উদ্ধার করতে হয়েছে। কংগ্রেসবিরোধী ভারতীয় রাজনৈতিক মহল আমাদের সহায়তায় খুব বেশি আগ্রহ দেখায় নি। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৪৭ সালের পর থেকে বহু পূর্ববঙ্গবাসী বসবাস করছে বলে সেখানে স্বভাবত আমরা এককালীন প্রতিবেশীসুলভ ব্যবহার পেয়েছি।

পাকিস্তান সরকার রাজাকার, আল-বদর ,আল-শামস ইত্যাদি বাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে যে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিলো তার কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা আমরা ভারত থেকে গ্রহণ করতে পারিনি। এই বাহিনীগুলোর সহায়তায় গণহত্যা, নারী নির্যাতন অভিযান চালানো হয়েছে। এই বর্বরতার খবরাখবর আমাদেরকে মরিয়া হয়ে ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমাদের মতো যারা দেশের বাইরে যেতে পারেননি তারাই সবচেয়ে বেশি ত্রাস ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়েছেন – এ কথা অস্বীকার করার জো নেই। যুদ্ধের সেই ভয়াল মাসগুলোয় অহরহ খবর পেয়েছি যে যশোর, নোয়াখালী, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং আরো কোন কোন অঞ্চলে আমাদের বিপ্লবধর্মী সুযোগ পেলেই মুক্তিযুদ্ধ সমর্থক জোতদার শ্রেনীর মানুষকে হত্যা করেছে । সে সময় খবর পেতাম যে, যেহেতু রাশিয়া জাতিসংঘে আমাদের মুক্তি সংগ্রামকে সমর্থন দিয়েছে সেহেতু রাশিয়াবিরোধী রাজনৈতিক মহল মুক্তি সংগ্রামকে রাশিয়ার চক্রান্ত বলতেও দ্বিধাবোধ করেনি । অভ্যন্তরে সংগ্রামরত মুক্তিযোদ্ধারা মাদের এই অভ্যন্তরিন চক্রকে দাবিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলো । নিয়মিত , অনিয়মিত এবং নিয়মবহির্ভূত মুক্তিযোদ্ধারা বাংলার আপামর জনসাধারণকে সংগে নিয়ে পাকিস্তান বাহিনীকে রুখে দিয়েছিলো বলেই ভারতীয় সাহায্য সহানুভূতিকে সম্বল করে আমরা এত অল্প সময়ে এত বড় বিজয় লাভে সমর্থ হয়েছি । কাজেই চিহ্নিত শত্রুদেরকে বাদ দিতে বাকী প্রতিটি বাঙালি ছিল আমাদের মুক্তিযোদ্ধা এবং বিজয় গৌরবের অংশীদার । এত অগণিত মানুষের ‘লিস্ট’ বানাবে আজ কে বা কারা ?

মুক্তিযুদ্ধের কতক দিক রয়েছে যে সম্বন্ধে কিছু মন্তব্য রাখার লোভ সংবরণ করতে পারছি না । একাত্তরের ৭ই মার্চের ঘোষণায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার শর্তসম্পৃক্ত মর্মবানী খুঁজে পেয়েছি কিন্তু ঘোষণাটি স্বাধীনতার ভাষায় লিপিবদ্ধ বলে মেনে নিতে পারিনি । অসহযোগ আন্দোলোন ও আওয়ামি লীগের নির্দেশে প্রশাসনিক পরিস্থিতি যে পর্যায়ে এসেছিল তাতে আমি ভাবতে পারিনি যে সামরিক পরাজয় ছাড়া পাকিস্তান বাংলাদেশ কে স্বাধীন হতে দেবে। বেসামরিক জনগোষ্ঠিকে একটি সুস্পষ্ট আসন্ন সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্রশস্ত্রে সংঘবদ্ধ করার কোন রাজনৈতিক কর্মসূচী না থাকায় ২৫শে মার্চের হত্যাকান্ডের পর দিশেহারা ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক্, শ্রমিক,পুলিশ, ইপিয়ার ও বাঙালি কারো আদেশ ছাড়াই পাকিস্তানের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। ২৫শে মার্চের অব্যবহিত পরেই আমাদের প্রতিটা গ্রামগঞ্জের শহরে বন্দরে ‘পশ্চিমা হটাও’ অভি্যান গড়ে উঠে । ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির পর থেকেই আওয়ামি লীগ কেন্দ্রিয় সরকার মুসলিম লীগের বিরোধিতা করে যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল আইয়ুব আমলের মাঝামাঝি সময়ে নেতৃত্বের অভাবে তা প্রায় নিষ্প্রাণ হয়ে এসেছিল। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, আগরতলা ষরযন্ত্র মামলা ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান শেখ সাহেবকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শীর্ষমণি হিসেবে চিহ্নিত করে । তার অসাধারণ ত্যাগ,তিতিক্ষা ও জনদরদী মানসিকতার জন্য ১৯৭০ সালের ইলেকশানে আওয়ামি লীগের যে বিজয় সূচিত হয়েছিল তাতে আওয়ামি লীগ ছাড়া অন্য কোন রাজনৈতিক দলের কথা কেউ ভাবতে পারেনি । এ কারণেই স্বাধীনতা যুদ্ধের শীর্ষমণি হিসেবে রাজনৈতিক দিক থেকে আওয়ামি লীগ কেই মেনে নিতে হবে ।

আওয়ামি লীগের নেতৃ স্থানীয় ব্যাক্তিবর্গ এবং আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্যবৃন্দ কোন কেন্দ্রীয় আদেশে দেশ ত্যাগ করেছেন বলে জানা নাই। ২৫শে মার্চের পর তারা যখন কলকাতা বা আগরতলায় সমবেত হন তখন তাদের মধ্যে যে শূন্যতা পরিলক্ষিত হয় তাতে বুঝা গিয়েছে যে কোন পরিকল্পনা মোতাবেক তারা দেশ ত্যাগ করেছেন। কর্নেল ওসমানিও তাই করেছেন। এই পূর্ব পরিকল্পনাহীনতার জন্য আমরাও বুঝতে পারিনি যে, আমাদেরকে কখন কী করতে হবে । এমনকি আগরতলায় যাঁরা পৌঁছেছিলেন তাদের কার্যকলাপের সঙ্গে কলকাতায় অবস্থানরত নেতৃবর্গের কোন সংযোগ ছিল না অনেক দিন । এজন্য ভিনদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের দুটি ধারা সূচিত হয়েছিল । মুজিব নগরে সরকারের প্রশাসন সংগঠিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধকে একটি কেন্দ্রিয় প্রশাসনের আওতায় না হয় এবং যথারীতি প্রশাসনিক বিধি নিষেধের অন্তর্ভূক্ত করা হয় । এসকল জটিল কাজ আমরা গুটিকতক কর্মচারীরা সম্পন্ন করেছি , মাহবুব আলম চাষী (মরহুম), হাসান তৌফিক ইমাম, জহুর আহমদ চৌধুরী (মরহুম), মোস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ আগরতলায় মুক্তিযুদ্ধের প্রশাসনিক কাঠামো বানাবার সূচনা করেন । পরে তারা কলকাতা কেন্দ্রিয় প্রশাসনের অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়েন ।

মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃবিন্দের মধ্যে পাস্পরিক সমঝোতার কিছুটা অভাব ছিল । কিন্তু এই অভাব কে কোনক্রমে ঢেকে রাখার চেষ্টা প্রশাসন থেকে অতি সতর্কতার সাথে করা হয় । আপামর মুক্তিযোদ্ধারা যে অসীম সাহসিকতা, দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় ও মনোবল নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাতে কোন মহলের অন্তর্দ্বন্দ্ব ঠাঁই পায়নি । পার্লামেন্টের প্রায় সকল সদস্য ভারতে আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন । দেশবাসীর তাঁদের দায় দায়িত্ব পালনে তারা সবসময় সতর্ক ছিলেন । কিন্তু এমন এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ চালাতে হয়েছিলো যে শুধু তাঁদের প্রজ্ঞার ওপর সব ছেড়ে দেয়ে সম্ভবপর ছিলো না । সে জন্য্য আমাদের সামরিক অফিসারদের প্রজ্ঞাকেই সম্বল করে আমাদের এগুতে হয়েছে । আমাদের প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর পক্ষে এত বিশাল এবং বিস্তৃত মুক্তিবাহিনীর সব কিছু দেখাশোনা করা সম্ভবপর ছিল না। কাজেই সেক্টর কমান্ডারদেরকে নিজ নিজ পরিকল্পনানুসারে অনেকাংশে যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়েছে । পার্লামেন্টের সদস্যবৃন্দ প্রশাসনে অতি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন । কিন্তু যুদ্ধ পরিচালনায় তাঁদেরকে অনেক সময় পাশ কাটিয়ে এগুতে হয়েছে । তাতে কেউ কেউ অস্বস্তি বোধ করেছেন। এই পরিস্থিতি এড়াবার জন্য তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে আমরা বিভিন্ন অঞ্চলে বেসামরিক কমান্ড কাউন্সিল গঠন করেছিলাম। কার্যতঃ এই সকল কাউন্সিল যুদ্ধ চালানোর কাজে উল্লেখযোগ্য ভাবে জড়িত ছিল না। যুদ্ধ সেক্টর কমান্ডারদের কলাকৌশল ও পরিকল্পনানুসারে পরিচালিত হয়েছে।

জুলাই মাসের দিকে পার্লামেন্টের সদস্যবৃন্দকে একত্রিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় । পারষ্পারক সমালোচনা , অভিযোগ ইত্যাদি যেন দাঁনা বেঁধে উঠতে না পারে সেজন্য রাষ্ট্রপতির কাছে এক প্রস্তাব পেশ করি । তিনি তাতে সম্মতি দেন । কিন্তু কোথায় কিভাবে এই সমাবেশ ঘটানো সম্ভবপর হবে তা ছিলো ভাবনার বিষয় । ভারতীয় সরকারের সহায়তায় ও সৌজন্যে মেঘালয় ও দার্জিলিং-এর মধ্যবর্তী বাগডোগড়া নামক এক নির্জন স্থানে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয় । সমাবেশে পার্লামেন্টের সদস্যবৃন্দ ও মন্ত্রী মহোদয়গণ দু’দিন বহু তর্ক-বিতর্কের সম্মুখীন হন। ফলে তাঁদের মধ্যে পারষ্পারিক বোঝাপড়ার পথ সুগম হয় । বাগডোগরা সমাবেশকে মুজিবনগর পার্লামেন্টারী অধিবেশন বলা যেতে পারে । এই সমাবেশের খবর আমরা প্রচার করি নি।

স্বাধীনতা যুদ্ধের দিনগুলোয় আমরা যখন আমাদের লোকজনদের সাথে কথা বলেছি তখন তাঁদেরকে সমাজতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। যে অন্যায়, অবিচার ও শোষণকে মুক্তিকামী বাঙালিরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবর্তীন হয়েছিল তার অবসান ঘটাতে হলে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাই যে আদর্শস্থানীয় তার ব্যতিক্রমকিছু বলার ছিল না । ধনতন্ত্রের কাঠামো ও ভিতকে দূর্বল করতে হলে জনসাধারণকে সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিতে হবে-এই ছিল আমাদের বাণী । এই দুর্গম পথের পাথেয় যে ত্যাগতিতিক্ষা তার নাম ছিলো স্বাধীনতাযুদ্ধ । ত্রিশ লক্ষ লোকের জীবন দান আর মা-বোনদের ইজ্জত হানি-এই আমাদের ত্যাগ তিতিক্ষা। ফসল হলো বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ স্বাধীন করব এ বিষয়ে আমাদের দৃঢ়প্রত্যয় ছিল। ’৭১-এর নভেম্বর মাসে আমরা ভাবতে শুরু করেছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো বা নীতিমালা এখান এখান থেকেই তৈরী করে নিতে হবে। যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক ধ্বংসাবশেষের ওপর বিজয়ের গৌরব নিয়ে প্রশাসন চালাতে হলে যে প্রজ্ঞা,ধৈর্য, ও দূরদর্শিতার তা হয়তো রাজনৈতিক মহলে একক ভাবে আশা করা সম্ভবপর হবে না এই ভেবে আমাদের উদ্যোগেই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক মৌল কাঠামো তৈরী করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত সরকারী,আধাসরকারী বা সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থাসমূহ এবং কলকারখানার শ্রমিক কর্মচারীদের ব্যাপারে এটা ধরে নিতে হবে যে তারাও ছিলেন আমাদের মতো মুক্তিযোদ্ধা। এই ছিল আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত ।

শুধু ব্যাতিক্রম ছিলো এটুকু যে, যারা প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতা দেশবাসির কাছে জঘন্য শত্রুবলে চিহ্নিত হয়েছেন তাদের জন্য একটি স্ক্রীনিং কমিটি গঠন করা হয়। একজন বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য এবং সরকারের একজন সচিবকে নিয়ে এই কমিটি গঠিত হয় । এই কমিটির রায় কে সরকার চুড়ান্ত বলে মেনে নেবে। তারপর আরো কিছুসংখ্যক চিহ্নিত কর্মচারীর কাছ থেকে আনুগত্যের একতা শপথ নেয়া হবে। এর বেশী কিছু নয়। আমাদের মতে এতেই দেশবাসী সন্তুষ্ট থাকবেন এবং প্রচলিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা তেমন কোন ওলট পালট হবে না ।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য বিবরণীর অভাবে কোন ব্যাবস্থা গ্রহণ করা সুবিবেচিত না হলেও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের একটা ধারা প্রবাহ আমরা নির্ধারণ করেছিলাম। অবাঙালি মালিকানা শিল্প বা ব্যাবসায় প্রতিষ্ঠান পরিত্যক্ত হয়ে যাবে এই ভেবে পরিত্যক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারী নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা করা হবে। দেশি মালিকানায় শিল্প বা ব্যাবসায় প্রতিষ্ঠান যেগুলো দীর্ঘদিন যাবত বৈষম্যের শিকার হয়েছিল তাদেরকে সকল সুযোগ সুবিধা দিয়ে চাঙ্গা ও তেজী করে তুলতে হবে। এই ছিলো আমাদের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া বিরাট মুক্তিবাহিনীকে যথাশীঘ্র কি করে কৃষি বা অনযান্য ক্ষেত্রে ফিরিয়ে নেয়া যায় তারও ব্যবস্থা করা হবে । অগণিত ছাত্র শিক্ষক যারা মুক্তিযুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়েছে তাদেরকে শান্তিময় জীবনের অভিষ্ঠ মন-মানসিকতায় কিভাবে রূপান্তরিত করা যায় সে দায়িত্ব শিক্ষকদের হাতেই ছেড়ে দেয়া হবে। স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ হিসেবে ছাত্র-জীবন থেকে একটি বছর দেবার কথাও চিন্তা করা হয়েছিল যাতে শিক্ষা ব্যবস্থা কোন মহা সংকটের উদ্ভব না ঘটে।

অর্থনৈতিক পুনর্বাসন এবং সামাজিক শৃঙ্খলার বিধানকল্পে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা আইন সংগত উপায়ে গৃহীত হবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিককোন নতুন সংস্কারে সঙ্গে সঙ্গে হাত দেয়া যাবে না। মুজিব নগর সরকার একটি পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেছিল। এই কমিশনে যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক মোশারফ হোসেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী ও তাদের নির্বাচিত আরো কয়েকজন। যতটুকু মনে পড়ে একটা যুদ্ধোত্তর গরীব দেশের জনসাধারণের খাদ্য-গৃহ ও বস্ত্রসংস্থান ছিল এই পরিকল্পনার মৌল বিষয়।

স্বাধীনতা যুদ্ধের মাসগুলোয় পাকিস্তানী একশত টাকার বিনিময়ে একশত চুয়াল্লিশ ভারতীয় টাকা পাওয়া যায় নি । সমান সমান মূল্যে মুদ্রা বিনিময় হতো । মুজিব নগর সরকারের কর্মকর্তাদের সর্বচ্চ বেতন ছিলো চারশত পাকিস্তানী টাকা। এই টাকা দিয়ে বাড়ী ভাড়া, খাওয়া, অফিসে সাতায়াত,ঔষধ ইত্যাদি বাবদ যাবতীয় খরচ মেটানো হতো। অর্থ ছিল না বলে ব্যায়বহুল নিয়মিত বাহিনী বড় আকারে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। রিফিউজি ক্যাম্পে খেয়ে দেয়ে অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন সেক্টরে অভিযান চালিয়েছে। কি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দিন কাটিয়েছি তা ভাবলে অবাক হতে হয়। ঢাকা থেকে লোক মারফত কিছু টকা পয়সা নেবার ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত করতে হয়েছে । আমার শশুর মরহুম হাফিজুদ্দিন সাহেব এই টাকা দেন। আমার বন্ধু অধ্যাপক মোস্তফা নুরুল ইসলাম বিলেতে ছিলেন তিনিও কিছু পাউন্ড দিয়ে সাহায্য করেন। তাঁদেরকে এই টাকা ফেরত দিতে হয়নি। লক্ষ লক্ষ মানুষ কি অভাবনীয় কষ্টে দিন কাটিয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না।

কামরুজ্জামান স্বরাষ্ট্র ও রিলিফের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে সীমান্তের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রস্নত ভ্রমণ করেন। অধিকাংশ সময়ে আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম। আমি বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে সেক্টর কমান্ডারদের সঙ্গে আলাপ করে তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছি। ভারতীয় প্রশাসনের কাছে ক্যাম্পের বিবিধ সমস্যা তুলে ধরেছি। মুক্তিযোদ্ধা বেশে পাকিস্তানি চরদের অনুপ্রবেশ প্রতিহত করার কাজে আমাদের পুলিশ ও অন্যান্য কর্মচারীদের স্থানে স্থানে খবর সংগ্রহ করতে হয়েছে । মুক্তিযুদ্ধের বিশাল আবর্তে আমার কাজের কোন ধরাবাঁধা পরিধি ছিল না বলা চলে। স্থানে স্থানে জোরালো বক্তৃতা দিয়েছি। সমাজতন্ত্রের মর্মবানী ব্যাখ্যা করে মুক্তিবাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করার কাজে কামরুজ্জামান ও তাজউদ্দিন ছিলেন সেচ্চার। স্বদেশী গান গেয়ে দেশপ্রেমিক শিল্পীরা স্বাধীনতা যুদ্ধকে দেশ-বিদেশে প্রচার করেছেন। মাত্র কয়েকজন শিল্পী,সাহিত্যিক,সাংবাদিক,বেতারকর্মী যে প্রচারকার্য চালিয়েছেন তা অভাবনীয়। মুকুলের ‘’’ঠেটা মালিক্কা’’’ (গভর্নর ডঃ আব্দুল মোতাল্লিব মালিক) নামক প্রোগ্রাম ও ‘’’চরম পত্র’’’ ছিল সে সময়ের বেতার জগতের অবিস্মরনীয় আলেখ্য। কামরুল হাসান, জহীর রায়হান, হসান ইমাম, আব্দুল জব্বার, মুকুল এবং আরো অনেককে আমি আগে থেকে খুব ভালভাবে জানতাম। তাঁদেরকে অনেক খবর দিয়েছি যা নিজনিজ পদ্ধতিতে তাঁরা ব্যবহার করেছেন। যুদ্ধের বিভিন্ন অঙ্গনের দৈনিক খবর সংগ্রহের ব্যবস্থা আমরা করেছিলাম। আমাদের লোকজন ঢাকা প্রশাসনের সব গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সেক্রেটারিয়েট থেকে সংগ্রহ করে কলকাতায় আমাদের কাছে পৌঁছে দিত। রিলে সিস্টেমে এইসব খবর পাঠানো হত। সপ্তাহকালের মধ্যে কলকাতা থেকে আমাদের গোয়েন্দারা ঢাকা ও অন্যান্য শহরের অফিসের গোপনীয় কাগজপত্র, পাকিস্তান সরকারের আদেশ নির্দেশ ইত্যাদি সংগ্রহ করে ফিরে আসতো। অফিসের লোকজন গোপনে গুরুত্বপূর্ণ খবর সরবরাহ করে আমাদের সাহায্য করেছে। মুক্তিকামী ছিল বলেই তারা একাজ করেছে। আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলে দেশপ্রেমিক মানুষের বাড়িতে লুকিয়ে পালিয়ে রাত কাটিয়েছে। যারা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিল তারাও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছে। আর যারা আমাদের গোয়েন্দাদেরকে খবর দিয়ে সাহায্য করেছিল তাদেরকে কি আমরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বলবো না ? স্টেট ব্যাংকের যেসব সিরিজের নোট খোয়া গিয়েছিল সেসব সিরিজের তালিকাও আমাদের লোকজন সংগ্রহ করেছিল। এই সুদক্ষ গোয়েন্দাদের কাজে প্রধাণতঃ পুলিশ, ছাত্র ও বেসামরিক সরকারী কর্মচারীরা নিয়োজিত ছিল।

দেশত্যাগী প্রায় সাত হাজার পুলিশ, এবং পাঁচ হাজার ই পি আর স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদান রেখেছে। পুলিশদেরকে ১৭০০ মাইল সীমান্তের আশ্রয় ক্যাম্প ও অন্যান্য জায়গা থেকে খুঁজে বের করে সংঘবদ্ধ করার কাজ আমাকে করতে হয়েছে। ই পি আর-এর প্রায় সকলেই নিয়মিত বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত ছিল। পুলিশের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রত্যক্ষ যুদ্ধে নিয়োজিত ছিল। সীমান্তের সংগে বিশেষ ভাবে পরিচিত ছিল বলে ই পি আর ছিল আমাদের অভিযানের সেরা সৈনিক। ই পি আর ও পুলিশ অকাতারে যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন দিয়েছে। প্রায় ষোলশত পুলিশ এবং এক হাজার ই পি আর মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে। পংঙ্গু হয়েছে অনেকে। পরিবারের ওপর বহু রকম নির্যাতন চালিয়েছে পাকবাহিনী। বাংগালী সৈনিক ও অফিসারদের অনেককেই পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল বলে মুক্তি্যুদ্ধে পেশাগত সৈনিকের সংখ্যা খুব বেশী ছিল না । পশ্চিম পাকিস্তানে যারা আটক ছিলেন বন্দি শিবির থেকে কেউ কেউ পালিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় ভূমিকা কারো কার কাছে ছিল বিতর্কিত। নিজস্ব শক্তিতে শুধু ত্যাগ, দঢ়প্রতিজ্ঞা ও মনোবলকে সম্বল করে সুদক্ষ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে পরাজিত করা সম্ভব হবে কিনা এই প্রশ্নে আমাদের সামরিক মহলে মতভেদ ছিল। কর্নেল ওসমানীর ধ্যান-ধারণার সঙ্গে আমাদের তরুন সামরিক অফিসারদের কিছুটা গরমিল ছিল। বাইরের কারো নেতৃত্বের গুরুভারে মুক্তিবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ণ হবে এ ধারণা অনস্বীকার্য হলেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে দীর্ঘকালীন করার বিপক্ষে প্রশাসনিক মতামত ছিল সুস্পষ্ট। পাক বাহিনীর দীর্ঘকালীন নির্যাতনে দেশবাসী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এই ভয়ে যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করার বিপদকে দেখা হয়েছে বাস্তবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রকে আমরা ভয় করেছি। মুজিব বাহিনীর সৃষ্টিতে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিভেদ দানা গড়ে উঠেছিল প্রায়। ছাত্র নেতারাও ইতিমধ্যে মতবিরোধের শিকার হয়েছিল। তাই সংক্ষিপ্ত তম সময়ের মধ্যে বিজয় অর্জন করতে হবে এই ছিল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে ভারত আমাদেরকে সাহায্য করেছে। মুক্তিবাহিনীকে যথাসম্ভব সঙ্গে নিয়ে চূড়ান্ত অভি্যান চালানো হয়। পশ্চিম রণাঙ্গনের পাক-ভারত যুদ্ধে আমাদের তেমন আকর্ষণ ছিল না । পাকিস্তান পরাজিত হবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের রণাংঙ্গনে কত শীঘ্র পাকিস্তানকে পরাজিত করা যাবে এটাই ছিল আমাদের কাম্য।

ভারতীয় যুদ্ধবিশারদরা ‘বাইপাস’ সিস্টেম-এ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি যথাসম্ভব ন্যূন্যতম সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। ‘বাইপাস’ সিস্টেম-এ পাকবাহিনীকে কোন সম্মুখযুদ্ধের সুযোগ দেয়া হয়নি। লক্ষ লক্ষ মুক্তিবাহিনী ভারতীয় নেতৃত্বে পাকবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে। দিশেহারা পাকবাহিনী অস্ত্রশস্ত্র যেখানে-সেখানে ফেলে ঢাকায় এসে আত্মসমর্পনের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়। বাংলাদেশের কোথাও লুকিয়ে জীবন বাঁচাবার পরিস্থিতি তাদের ছিল না । সপ্তম নৌ-বহরের পাঁয়তারা সত্বেও প্রায় এক লক্ষ পাক বাহিনীর এত নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ !

বিজয় যখন দিবালোকের মত স্পষ্ট,তখন আত্মসমর্পণ উৎসবে আমাদের যোগদান সম্পর্কে যে কর্মসূচী গ্রহণ করা হয় তাতে স্থির করা হয়েছিল ১৬ই ডিসেম্বর কর্নেল ওসমানী, রুহুল কুদ্দুস ও আমি হেলিকপ্টারে ভারতীয় কমান্ডারকে নিয়ে ঢাকায় পৌঁছুব। দমদম এয়ারপোর্টে পৌঁছুবার জন্য আমাদের যে সময় দেয়া হয়েছিল তার ঘন্টাখানেক পূর্বে আমাদের প্রশাসনে কি যেন একটা হাস হাস পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। আমি তার কিছুই আঁচ করতে পারিনি।
করতে পারিনি। রুহুল কুদ্দুস শুধু জানালেন যে, কর্নেল ওসমানীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কাজেই ডেপুটি কমান্ডার ইন-চীফ এ.কে. খন্দকারকে খুঁজে বের করা হয়েছে। শুধু তিনি ঢাকায় যাবেন। আমরা দুজন যাবো না। কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে কার কী মতভেদ ঘটেছিলো তা আর জানতে পারিনি। ঠিক করা হলো ১৭ই ডিসেম্বর শেখ সাহেবের ছেলে জামালকে ঢাকা রেডিও চালাবার মতো যন্ত্রপাতি দিয়ে পাঠানো হবে। ১৮ তারিখ রুহুল কুদ্দুস, নূরুল কাদের, আসাদুজ্জামান ও আমি ঢাকায় আসবো। পরিবারকে সঙ্গে আনা যাবে না। কাজেই আমার পরিবার ও ছেলেমেয়েকে কলকাতায় রেখে আসি। প্রায় ১২ দিন পর তাদের ঢাকায় নিয়ে আসি। ঢাকার মাটিতে পা দিয়ে সেদিন জীবনের সবকিছু পেলাম। হেলিকপ্টার থেকে নামার আগে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করি। এয়ারপোর্টে হাজার হাজার লোকের ভীড়ে কারো সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি নি। জানি না তারা কী ভেবেছিলো। শুধু হাত উঠিয়ে সালাম জানিয়েছি। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব কে কোথায় কীভাবে আছেন – জীবিত কি শহীদ, এ চিন্তায় সে মুহূর্তে এতোই অভিভূত হয়েছিলাম যে, স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার আনন্দে যুগপৎ নেমে আসে অব্যক্ত বিষাদের ছায়া। এই বিষাদ থেকে আজো মুক্ত হতে পারি নি।

– আব্দুল খালেক,
সেপ্টেম্বর, ১৯৮৪।