‘আমরা’গোষ্ঠী কর্তৃক প্রচারিত দুটি প্রতিবেদন

Posted on Posted in 4

<৪,১৯৩,৩৮৪-৩৮৮>

অনুবাদকঃ নাজিয়া বিনতে রউফ, সাদ্দিউন জয়, নুরুন নাহার জুঁই

শিরোনামসূত্রতারিখ
১৯৩। ‘আমরা’গোষ্ঠী কর্তৃক প্রচারিত দুটি প্রতিবেদন‘আমরা’২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

জাকার্তা

২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

নিম্নোক্ত সংযুক্তিতে আছে আমাদের তৈরি করা দুটি পত্রিকা যা কাজের প্রেক্ষাপটেই তৈরিঃ

 

       ১. ৩০ আগস্টের সম্পাদকীয় সম্পর্কে কিছু কথা নিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর তারিখে ইন্দোনেশিয়ান অবজারভার পত্রিকার সম্পাদকের নিকট চিঠি।

       ২. ২১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বাংলাদেশ সমস্যা সমাধানের উপায় সম্পর্কে স্বাধীন পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে মতামত
‘আমরা’

জনাব মকসুদ আলী,
৯ সার্কাস অ্যাভিনিউ,
১৭ কলকাতা, ভারত

 

———————
সম্পাদক, ইন্দোনেশিয়ান অবজারভার

১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১
প্রিয় সম্পাদক,

       আমি সাংবাদিকদের জন্য এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ লালন করে থাকি। আমাদের দেশের সাংবাদিকদের জন্য একটি গভীর শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। তারাই সাংবাদিক যারাআমাদের কাছেবিশ্বের খবর নিয়ে আসেন। তারাই সাংবাদিক যারা বিশ্বের যেকোন জায়গায় যেকোন অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হন ।সব কিছুর পরে তারাই সাংবাদিক যার মতামত এবং নির্দেশনা একটি জাতি এবং অবশ্যই জনগণের ভাগ্য নির্ধারনে মূল্যবান ভূমিকা পালন করে। আমি বিশ্বাস করি, সাংবাদিক কোন শাসকশ্রেণীর অন্তর্গত না। তারা মানবতার পক্ষে

 সোচ্চার থাকে।মানুষের জীবনের উপর যেকোনো ধরণের আক্রমণের বিষয়ে তারাই প্রথম উচ্চ কণ্ঠে প্রতিবাদ করে।

       আপনার পত্রিকার মাধ্যমে পাকিস্তানের ভয়াবহ অবস্থাএবং সেখানের মানুষের কষ্টের খবর আমি পড়েছি। ধর্ম,ভূগোল, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়েই ন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের অনেক মাঝে অনেক মিল। পাকিস্তানের জন্য আমারব্যক্তিগত ভালবাসার কারণ হচ্ছে পেশাগত প্রয়োজনে পাকিস্তানে বিভিন্ন সময়ে আমাকে পাকিস্তান পরিদর্শন করতেহয়। আমি দেশের উভয় অংশ নিজেই দেখেছি এবং দুই অংশের জনগণের মধ্যে তিক্ততা ও ঘৃণার কারণ দেখেছি।

       তোমাদের কাছে  আমি আমার মতামত প্রকাশ করারজন্যঅনুমতিচাচ্ছি।

       দুই অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার বৃদ্ধিবর্তমানসংকটেরমূল কারণ বলেআমিমনে করি। বৈষম্য ও অবহেলার পরিষ্কার উদাহরণ পর্যটক এবং পরিদর্শকদের কাছে স্পষ্ট দৃশ্যমান।

       কেন্দ্রীয় সরকারের কেন্দ্র পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত,পূর্ব পাকিস্তানের সহযোগীদের অবহেলার মাধ্যমে প্রশাসন এবং সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে ।ব্যবসার ক্ষেত্রে ,দাপ্তরিক সাহায্য ও স্বজনপ্রীতির ফলে অনেক পশ্চিম পাকিস্তানীদের পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত রূপে পাওয়া গিয়েছে। অর্থনীতি, শিক্ষা, এবং চাকরির বাজারে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে কোণঠাসা করে রাখা হত।

       তাদের চাহিদা উপলব্ধি করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল।তারা কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের থেকে প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছুই পাননি। প্রাদেশিক বিভাজনের দাবী সমর্থনকারীদের প্রায়শই ঘৃণিতভাবে বলা হয় ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ প্রাদেশিকবাদী বা কমিউনিস্ট। পূর্বপাকিস্তানের দেশপ্রেমী জনপ্রিয় বর্ষীয়ান নেতা ফজলুল হক (শের-ই-বাংলা), সোহরাওয়ার্দী এবং ভাসানীকে ডাকা হতো শত্রুদের চর হিসেবে। বর্তমান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

 

              প্রশাসন ও অর্থনীতির লাগাম হারানোর ভয়েই পাকিস্তানে কঠিন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গণতন্ত্র চর্চা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে এই ষড়যন্ত্রকারণেই হত্যা করা হয়। পরবর্তী কালে আইয়ুব খানের মন্ত্রণালয়সমূহ শিথিলকরণ, এবং সামরিক আইনজারি ছিল গণতন্ত্রকে হত্যা করা ও দুর্বল অঞ্চলে নিজেদের শক্ত প্রভাব বজায় রাখা। বর্তমান উদাহরন, ইসলামের নামে এবং ঐক্য এবং জনগণের শুভেচ্ছা এবং উৎসাহকে গণতন্ত্রের মাধ্যমে সম্মানিত করার পরিবর্তে চরম অসম্মান করে সেনা অভিযানের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। অনেক প্রতিবেদন, নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক এবং দশ লক্ষ হত্যার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সত্তর লাখেরও বেশি পালিয়ে গিয়েছে এবং ২০ লাখমানুষ গ্রাম ওবাস্তুচ্যুতহয়েছে। এ ধরণের ঘটনা অভূতপূর্ব এবং ক্ষমার অযোগ্য।

 

এই প্রেক্ষাপটের সাথে প্রাসঙ্গিক অন্য কয়েকটি পয়েন্ট আছে যেগুলো পাকিস্তানের নিজের মূর্খতা, মিথ্যাও নিজস্ব অসঙ্গতি এবং নোংরা রাজনীতির ফলে সবার সামনে উন্মুক্ত হয়েছে। কাশ্মীরি স্বাধীনতা যোদ্ধাদ্বারা ভারতীয় বিমান ছিনতাই করা হয়েছে বলে ঘোষণা করা হলে আলী ভুট্টো তাকে অভিনন্দিত করেন। পরবর্তীতে পাকিস্তানী আদালত ঘোষণা করেএই ঘটনা ছিল পাকিস্তানের দুই অংশের মাঝে চলমান যুদ্ধ মাঝপথে থামিয়ে দিতে ভারতীয় ষড়যন্ত্র। সরকারের পক্ষ থেকে একে পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ফেলার পরিকল্পিত ভারতীয় ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নিজে মুজিবকে ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আবার তিনি নিজেই পরে মুজিবর রহমানকে বিশ্বাসঘাতক বলেন, ছয় দফা দাবির ভিত্তিতে আওয়ামীলিগ নির্বাচনেরজন্য সংগ্রাম ছিল বলে ঘোষণাকরেন।ইয়াহিয়া খান এর আগে কখনও এই দাবির বিরুদ্ধে কথা বলেননি। সেই তিনিই এখন এটিকে বিচ্ছেদের জন্য একটিকারণ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ২৭ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তা সত্ত্বেও, ৫মাস পর এখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্বৃত্তরা যুদ্ধকরে যাচ্ছে। সেনা অভিযানের শিকার দুর্বৃত্ত ছিল অল্প কয়েকজন এবং মানুষ দূরে পালিয়ে ভারতীয় অনুপ্রবেশকর ছিলেন।আশ্চর্যের বিষয়, যদি উদ্বাস্তু বহিঃপ্রবাহ ভর্তি হন।ত্রাণসামগ্রী নিয়ে আসা আন্তর্জাতিক মানবিক সংগঠনের জাহাজকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।এমন ভাবে কাজটা করা হয়েছে যেন এর প্রয়োজন ছিলনা ।আমি পরে সাহায্যের জন্যজাতিসংঘের কাছে আকুল আবেদন শুরু করি। সবকিছু পূর্ব পাকিস্তানে শান্তিপূর্ণ ছিল কিন্তু সর্বশেষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সড়কও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়সমূহ বিদ্রোহের ফলেশোচনীয়ভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে ।

 

 

       30 আগস্ট আপনার সম্পাদকীয়তে আমেরিকান নিক্সন সরকারের প্রতি সিনেটর কেনেডিরকরা পাকিস্তান বয়কট এবং তাদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করারবিষয়টি আপনি অনুমোদনকরেননি।আপনি তার পরিবর্তে দুঃখ প্রকাশ ও নিন্দা করার প্রস্তাব দিয়েছেন।দুঃখ প্রকাশের ব্যাপারে পাকিস্তানের কূটনীতিক তৎপরতা এত সহজে প্রতিক্রিয়াশীল হবে বলে মনে হচ্ছেনা। পাকিস্তানের অহংকারের পাত্র আগে থেকেই ভর্তি হয়ে আছে। নির্লজ্জের মত এরকম আরও কিছু করতে তাদের একটুও হাত কাঁপবে না।

       আপনি সেই একই সম্পাদকীয়তে বলে ছিলেন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অন্য মহাদেশ এবং অন্যান্যদেশে সহযোগী আছে। তাদের দ্বারাই খবর ফলাও করে  ছড়ানো হয়।আমি মনে করি,অসহায় মানুষের দুর্ভোগে মানুষের প্রতিক্রিয়াটাই মূখ্যজিনিসছিল। আমি মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী এবং তাদের ভোগান্তির জন্য জানাচ্ছি। অমানবিকতা বন্ধ করতে হবে এবং তাদের বাহিনী বর্জন করা আবশ্যক।

       কোনো এজেন্ট বা প্রচারণা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া ছাড়াই আমি সুপারিশ করতে চাই, জাতিসংঘতার নামের সার্থকতা প্রমান করে আক্রান্ত এলাকাসমূহে মানুষের জীবন নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বিশ্বের শান্তি সংরক্ষণের জন্য সঠিক তদন্তের মাধ্যমে ঐসব এলাকার জনগণের দাবি এবং আকাঙ্খা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতে হবে। সাড়ে সাত কোটি মানুষকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করানো সম্ভব না। ধর্ম বা যেকোন কিছুই একটি জাতির আর্থিক চাহিদা ও মানসিক তাড়নার বিষয়টি পূরণ করতে পারে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের পক্ষে আছি। আমার মতের পক্ষে আমি অনেক কারণ দেখাতে পারি। কিন্তু যদি এই ঐক্য অন্য মানুষের জন্য শান্তির উপর একটি বোঝা হয়ে যায়, তবে আমি সেই ঐক্যকে ঘৃণা করি।

       আমি আমাদের দুইজনের সম্পর্ক দূর্বল হয়ে যাবার ভয়ে আমার নাম প্রকাশ করতে পারলাম না ।দয়া করে আমাকে এই জন্য ক্ষমা করবেন।
ইতি,
A B C

 

সম্পাদক,
ইন্দোনেশীয় অবজারভার,

জাকার্তা।

 

২১-০৯-৭১ তারিখে প্রচারিত

ইন্ডিপেনডেন্ট অবজারভার

বাংলাদেশের একক সমস্যার নিষ্পত্তি

       পাকিস্তানের শান্তিপ্রিয় মানুষ দীর্ঘদিনের অস্থিরতায় ইদানিং অধীর হয়ে পরেছে। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন যদি কোন মানদণ্ড হয়, তাহলে বলতে হয় পরিস্থিতি খারাপ থেকে অধিকতর খারাপ হচ্ছে। পরিস্থিতি এমনও হতে পারে যে, আশেপাশের সমস্ত এলাকা আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। সংস্কারমুক্ত চিন্তাবিদ ও দার্শনিকরা বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এবং নীতিনির্ধারকদের বিশ্বশান্তির বিপদের আশঙ্কায় সতর্ক করে সতর্কতা ও যত্নের সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে বলেছেন।

       বর্তমানে বিভিন্ন রাজধানীতে পরিস্থিতির রাজনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে আলোচনা চলছে।এছাড়া তাদের কিছু অংশ মদ্ধ্যস্থতার পরিকল্পনা করেছে এবং কেউ কেউ তাদের সেবা দেবার প্রস্তাব ও করেছে। দেরিতে হলেও এটা একটা ভালো পদক্ষেপ।

       ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে কি ঘটেছে আর এসব মর্মান্তিক ঘটনার আসল কারণ নিয়েপুং খানুপুংখ আলোচনা হচ্ছে মদ্ধ্যস্থতাকারিদের পূর্বশর্ত।

       এখন পর্যন্ত যুদ্ধরত দলগুলোর মধ্যে থেকেএই সমস্যা সমাধানের জন্য কোনও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ দেখা যায়নি। প্রত্যেকেই নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিতে অনড়- পাকিস্তান একে প্রতিষ্ঠিত স্বাভাবিকতা বলে সরবে ঘোষণা করছে আর বাঙালি গেরিলারা সগর্বে দাবি করছে তারা বেশিরভাগ এলাকা মুক্ত করেছে।

       যদি সত্যিই মানব সমাজের জন্য দীর্ঘস্থায়ী সুখশান্তি কাম্য হয়ে থাকে, তাহলে নিম্নোক্ত পয়েন্টগুলো এই সমস্যার অর্থবহ সমাধানের জন্য আমলে নেয়া প্রয়োজনঃ

সমস্যার কারণগুলো কী কীঃ

সব রিপোর্ট ও মতামত সর্বসম্মত যে, পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে শিক্ষা, চাকুরি, সেবা, শিল্প ও অর্থনীতির যে বৈষম্য, তা দেশ সৃষ্টির পর প্রকট হয়েছে। এই অসমতা পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি। শাসকগন তাদের ভুল প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিল এবং সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আসলে এগুলো কিছুই করা হয়নি।

       গত সাধারন নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল এটার বিরুদ্ধে লড়েছিল। আওয়ামীলীগ লড়েছিল ১৯৬৬ সালে গৃহীত ছয় দফা দাবীর ভিত্তিতে। ছয় দফা দাবীর লক্ষ্য ছিল প্রদেশের প্রতি অতীত অবিচার ও বৈষম্য দূর করা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের আধিপত্য কমানো। এই সুত্র জনগণকে সন্তুষ্ট করে। পরিষদের ৩১৩টি আসনের ১৬৭টিতে দল জয়লাভ করে। সামরিক আইনের অধীনে নির্বাচন হয়েছিল আর সবার মতেই এটা ছিল শান্তিপূর্ণ সুষ্ঠু নির্বাচন।

 

       ভুট্টোর নেতৃত্বে পিপলস পার্টি পরিষদে ৮১টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। ৩রা মার্চ দেশের তৃতীয় সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে পরিষদ আহবান করা হয়(প্রথম দুটি বাতিল করা হয়েছিল)।

       গণতন্ত্রের নীতি হল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন। ভুট্টো, দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা, ক্ষমতায় তার দলকে অংশ না দিলে আন্দোলন আরম্ভ করার হুমকি দিয়েছে। অধিবেশন মুলতবী করা হয় এবং যার ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগের ডাক দেয় যা শান্তিপূর্ণ এবং সফল ভাবে সম্পন্ন হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবর রহমানের সাথে মধ্যস্থতা করতে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন কিন্তু পরবর্তী ঘটনাগুলো থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে এই মধ্যস্থতা শুধুমাত্র পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পূর্ব পাকিস্তানে এসে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য কিছু সময় বের করার অজুহাত ছিলমাত্র।

       পাকিস্তানী সেনাদের এই আক্রমণে প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা যায়, ৮০ লাখ মানুষ ভারত চলে যেতে বাধ্য হয় এবং প্রায় আড়াই কোটি মানুষ গৃহহারা হয়। সহায়-সম্পত্তি আর ফসলের ক্ষতি ছিল আনুমানিক কয়েক বিলিয়ন। যে ভয়াবহ মানহানি, দূর্দশা, ভোগান্তি মানুষকে পোহাতে হয়েছিল তা ভোলার মত নয় এবং ক্ষমার অযোগ্য। এই ঘটনার ফলশ্রুতিতে বাঙালীদের ভিতর প্রতিরোধের সূত্রপাত ঘটে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা দেওয়া হয়। পূর্ব পাকিস্তানের লুকিয়ে থাকা নেতারা সীমান্তবর্তী এক গ্রামে সমবেত হয়ে খুব সাধারন এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দিলেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্বের দরবারে আহবান জাননোহয় এই গণহত্যা বন্ধের জন্য এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে রূখে দাড়াতে অনুরোধ করা হয়। বিশ্ববাসীর প্রতিক্রিয়া ততটা উৎসাহজনক ছিলনা এবং বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলো এক্ষেত্রে নির্বাক হয়ে আছে। বাঙালী গেরিলা বাহিনী ব্রীজ, রাস্তাঘাট উড়িয়ে দিয়েছে, জলযান থামিয়ে দিয়েছে, পাওয়ার হাউস ধ্বংস করা ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে ওৎ পেতে থেকে পাকিস্তানী সেনাদের জব্দ করেছে। এতে করে পাকিস্তানী বাহিনীকে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তাদেরকে অসহনীয় অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে হচ্ছে।

       পূর্ব পাকিস্তানের বেশীর ভাগ অসামরিক সরকারী কর্মকর্তা তাদের কর্মস্থান ত্যাগ করে চলে এসেছেন। বেশীরভাগ বাঙালী কূটনীতিবিদ দল ত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকারের সমর্থনে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছেন। ফলে সর্ব ক্ষেত্রে বাঙালীদের সন্দেহ ও ঘৃণার চোখে দেখা হচ্ছে। তাদেরকে রাষ্ট্রদ্রোহী আর বিশ্বাসঘাতকের পর্যায়ে ফেলা হচ্ছে। মিশনে তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছে আর তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দাবিও প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। তদের চলাফেরা এমনকি একত্রে মিলিত হওয়াও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়াও তাদের পূর্বের রেকর্ড পুনরায় অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

       সব বাঙালীই কোনো না কোনো ভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধিতা করছিল। তারা ছয় দফা দাবীর সমর্থনে ভোট দেয়, তাদের দাবী-দাওয়া পেশ করে আর তাদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হয়। ফলে তাদের সকলকেই আওয়ামীলীগের সমর্থক ধরে নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সামগ্রী তাদের কে না দিয়ে সেনা কর্মচারী আর কতিপয় সেনা সমর্থকদের মাঝে বিতরণ করে দেওয়া হয়। এভাবে তাদেরকে পদে পদে নত করা হত। এমনকি তাদেরকে অনাহারে রাখা হত।

       সামরিক, পুলিশ, অসামরিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে নতুন করে নিয়মিতভাবে পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিয়োগ দেওয়া হত। বাঙালীদের কাছে এসব কিছুই ছিল বাঙ্গালীদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানীদের বর্বরতা আর নিষ্ঠুরতারপ্রমান।

সমস্যার সমাধানঃ

       এটা একটা রাজনৈতিক সমস্যা ছিল যার সমাধানও রাজনৈতিক হওয়া উচিত ছিল। একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের ভার বাংলাদেশ আর ইসলামাবাদ সরকারের উপর বর্তায়। যদি জাতিসংঘের তত্ত্বাবধায়নে উভয় পক্ষ একসাথে বসে আলোচনা সাপেক্ষে সীদ্ধান্তে আসত এই নীতিতে যে “নিজে বাঁচুন; অন্যকে বাঁচতে দিন”সেটা ছিল সর্বোত্তম। আশা এটাই শান্তির পূজারী হয়তো দুই বিবাদী দলকে অনুপ্রাণিত করতে পারবে যদি তারা সত্যিকার অর্থেই শান্তি চায়।