আমাদের মুক্তি সংগ্রাম ও মহিলা

Posted on Posted in 5
আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও মহিলা

১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

২৩ বছর ধরে নিরপরাধ নিঃসহায় বাঙালীর উপর যে অত্যাচার অবিচার আর নির্যাতন চলে আসছিল সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধেই বাঙালীর দানাবাঁধা ক্ষোভ এবার ফেটে পড়েছে ’৭১-এর ২৫শে মার্চে স্বাধীনতা সংগ্রামের বাঙালীর উপর অস্ত্র ব্যবহার করছে। রক্তপিপাসু নরপিশাচরা বার বার রক্ত পান করছে। কিন্তু এবার বাঙালীর সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেছে, তাই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ স্বাধীনতাকামী বাঙালী তার স্বাধীনতা রক্ষাকল্পে এবার হাতে অস্ত্র নিতে শিখেছে- হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে।

আর তাই বাংলার তরুণ যুবকরা দলে দলে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিচ্ছে। মুক্তিবাহিনীর তরুণ যোদ্ধারা বিভিন্ন রণাঙ্গনে সাহস আর কৃতিত্বের সহিত প্রচুর শক্রসেনা খতম করে অস্ত্রের ভাষায় অস্ত্রের জবাব দিচ্ছে।

আজকের আমাদের মুক্তিসংগ্রাম বাংলার সাড়ে সাত কোটি নরনারীর মুক্তিসংগ্রাম। বাংলার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি আন্দোলনের এ ধারা দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে। মেয়ে-পুরুষ নির্বিশেষে অকাতরে এ সংগ্রামের সাফল্যের জন্য প্রাণ দিচ্ছে। বাংলার সামগ্রিক জনতার অর্ধাংশ যে নারী তারাও আজ পিছিয়ে নেই। তারও স্বাধীনতা-চেতনার পরিস্ফুটন আজ আমরা আমাদের মুক্তসংগ্রামে দেখতে পাই। তাই দেখতে পাই ইতিহাসের পাতায় বীরাঙ্গনা খাওলা, চাঁদ সুলতানা থেকে শুরু করে জামিলা বোখারদ, প্রীতিলতা

ওয়াদেদার আর লায়লা খালেদের পাশে বাংলার বীরঙ্গনা রওশনারা নিজের নাম যোজনা করে নতুন ইতিহাস রচনা করেছে। এ প্রসঙ্গে কবির সেই বৈপ্লবিক চেতনার কথা স্মরণ করতে হয়। কবির ভাষায়-

এ বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।

কিংবা-

জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান

মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।

আজকের আমাদের এ সংগ্রামও বাংলার মাতা, ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে মহীয়ান হয়ে উঠেছে। আজকে দেখি বঙ্গমাতার হীরের টুকরো ছেলে যখন অশ্বধামের বলির মত বর্বর পশুর হাতে স্বাধীনতা শিকারে পরিণত হয়েছে তখনও শোকাকিনী মাতা সগর্বে আর এক সন্তানকে তার প্রতিশোধ নিতে মুক্তিসংগ্রামে পাঠাচ্ছে। আজকে বাংলার ভগ্নীকুল তার নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়েও ভাইকে দেশের স্বাধীনতা মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছে। আজকে বাংলার কুলবধূ স্বামী হারিয়েও রণাঙ্গনের পাশে পাশে বীর সৈন্যদের সেবশুশ্রা করছে।

নরপিশাচরা আবাল বৃদ্ধাবনিতা নির্বিশেষে হত্যা করে, পাইকারি হারে লুটতরাজ করে, মহিলাদের ইজ্জত নষ্ট করে-কামান, মেশিনগান, ট্যাঙ্ক চালিয়ে, নাপাম বোমা ব্যবহার করেও আমাদের মুক্তিসংগ্রামকে নস্যাৎ করতে পারে নাই। কেননা আমাদের ভাইরা যখন রণাঙ্গনে থেকে শক্ৰ খতম করছে, বিভিন্ন জায়গায় রাস্ত, সড়ক, সেতু উড়িয়ে দিচ্ছে তখন বাংলার মহিলারা তাদের অনুপ্রেরণায় শরীরে ডিনামাইট বেঁধে ট্যাঙ্ক ধ্বংস করছে।

তাছাড়া বিভিন্ন জায়গায় মহিলারা তাদের স্বেচ্ছাসেবিদেকা কেন্দ্রে স্থাপন করে যুদ্ধে সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন ট্রেনিং গ্রহণ করছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে মহিল সমাবেশ সৈন্যদের খাবার ও পোশাক তৈয়ার করা হচ্ছে। চিকিৎসালয়ে মায়েরা বোনেরা নার্স হিসাবে তৎপর রয়েছে।

‘কোনকালে একা হয়নিক জয়ী পুরুষের তরবারি

প্রেরণা দিয়াছে শক্তি দিয়াছে বিজয়লক্ষ্মী নারী।’

তাই বাংলার বিজয়লক্ষ্মী নারীরও আজ বঙ্গবন্ধুর ‘রক্ত যখন দিয়েছি আরও রক্ত দেব মন্ত্রে আজ দীক্ষা নিয়েছে। জয় বাংলা।

(মেহের খন্দকার রচিত)