আমেরিকার প্রবাসী বাঙালীদের প্রতি সর্বাত্মক সহযোগীতার আহবান

Posted on Posted in 4

<৪,১৩৮,২৫৩-২৫৪>

অনুবাদকঃ সমীরণ কুমার বর্মন

    শিরোনাম       সূত্র      তারিখ
১৩৮। আমেরিকার প্রবাসী বাঙালীদের প্রতি সর্বাত্মক সহযোগীতার আহবানবাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকার দলিলপত্র  ১৩ মে, ১৯৭১

 

 

ওয়াশিংটন অধ্যায়

    সুধী,

    আমাদের সোনার বাংলা আজ জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে বর্বর পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যের ট্যাংকের আঘাতে। আমাদের ভায়েরা আজ বিকৃতদেহ বোমার আগুনে, আমাদেস মা-বোন ধর্ষিত হচ্ছে নৃশংস, পশুসম পাঞ্জাবী সৈন্যের হাতে। আমার সোনার দেশের মানুষ আজ হীনতম পশুর চেয়েও জঘন্য অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছে- কুকুর-বেড়ালের মত তাদের রাস্তায় গুলি করে মারছে। শকুন-চিল তাদের মাংস ছিড়ে খাচ্ছে বাংলাদেশের পথে ঘাটে।

    আমাদের কি অপরাধ? আমাদের অপরাধ বিদেশী শোষকদের শোষণে অত্যাচারিত মাতৃভূমিকে আমরা মুক্ত করতে চেয়েছি। আমরা চেয়েছি বাংলাদেশের নিবন্ন চাষী-মজুরদের মুখে খাবার দিতে, আমরা চেয়েছি শিক্ষাবঞ্চিত, চিকিৎসাবঞ্চিত বাংলাদেশের মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি। আমাদের যা নায্য পাওনা, আমাদের রক্ত জল করা সেই পাটের পয়সা- আমরা চেয়েছি আমার দেশের মানুষের উন্নয়নে তা ব্যয় হোক। আমরা চেয়েছি গত তেইশ বছর ধরে ধর্মের নামে, ইসলামের নামে পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থ আমাদের আর্থিক জীবনকে পঙ্গু করে দেয়ার যে চক্রান্ত চালিয়েছে তার অবসান।

    আমাদের এই গণতান্ত্রিক অধিকারের জবাবে আজ তারা। পূর্ব বাংলায় ধ্বংসের তান্ডবলীলা চালিয়েছে। গ্রাম, শহর, গঞ্জ আজ ধ্বংসস্তূপ। সাধারণ মানুষ, শ্রমিক, চাষী, সরকারী কর্মচারী, ছাত্র, শিল্পী, অধ্যাপক- সমস্ত বাঙালীকে হত্যা, করে বাঙালীকে একটা জাতি হিসাবে পৃথিবীতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না দেয়া হচ্ছে ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্রের পরিকল্পনা। পৃথিবীর ইতিহাসে নৃসংশতার, বর্বরতার এমন দৃষ্টান্ত মেলা ভার।

    কিন্তু ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্র একথা জানে না যে এই বাংলাদেশ একদিন খুদিরামের জন্ম দিয়েছিল, এই বাংলাদেশ জন্ম দিয়েছিল সূর্যসেনের, এই বাংলাদেশ জন্ম দিয়েছে বরকত-সালামের। আজ বাংলার ঘরে ঘরে ক্ষুদিরাম, ঘরে ঘরে বরকত-সালাম। যদি প্রয়োজন হয় সাতকোটি বাঙালীর জীবন দিয়ে হলেও আমরা স্বাধীনতা অর্জন করবো। আজ আমাদের দেশ যদি স্বাধীনতা লাভ না করে, আমাদের জন্মভূমিতে যদি আমরা মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারি, পৃথিবীর বুক হতে বাঙালী জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তাহলে আমাদের বেঁচে থাকার কি প্রয়োজন, কি প্রয়োজন আমাদের সম্পদে, পরদেশের জৌলুসে? আমাদের ব্যক্তিগত বৈভব, আমাদের শিক্ষা কোন স্বর্গ উদ্ধার করবে, আমাদের মাতৃভূমি যদি দলিত-মথিত হয় শত্রুর পদতলে?

    বাংলার মানুষের আজ চরম পরীক্ষার দিন। আমরা যারা বিদেশে আছি, যারা বাংলাদেশের সংগ্রামী মানুষের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে পারছি না, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে জীবন দিতে পারছি না মাতৃভূমির কলঙ্ক মোচনের জন্য, আসুন আমরা সংঘবদ্ধ হয়ে আমাদের জীবনপণ করি এই স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়ী হওয়ার জন্য। আজ প্রয়োজন আমাদের সমগ্র প্রচেষ্টা একত্রিত করা- যারা শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছে তাদের সর্বাত্মক সাহায্য দেওয়ার জন্য।

    বাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকা (যা পূর্ব পূর্ব পাকিস্তান লীগ অব আমেরিকা নামে পরিচিত ছিল) অত্তর আমেরিকার বাঙালীদের প্রতিষ্ঠান হিসামে সুবিদিত। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠান পূর্ব বাংলার স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এই সংগঠন কোন বিশেষ রাজনৈতিক মুখপত্র নয়। যে কোন বাঙালী তার দেশকে ভালবাসে, যে কোন বাঙালী স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে চায়, এই প্রতিষ্ঠান তার জন্য। আমাদের একান্ত অনুরোধ, এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দিন এবং বিদেশ থেকেও কিভাবে আমরা আমাদের আজকের জীবণ-মরণ সংগ্রামে সাহায্য করতে পারি, সে বিষয়ে আপনাদের অভিমত অন্য সবাইকে জানান।

    আজ বাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকার একটাই মাত্র লক্ষ্য- মাতৃভূমির স্বাধীনতা।

 

জয় বাংলা।

    মে ১০, ১৯৭১।

মহসীন রেজা সিদ্দীক

সম্পাদক, বাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকা,

ওয়াশিংটন ডিসি শাখা।