ইংরেজী সংবাদ

Posted on Posted in 5
ইংরেজী সংবাদ

২৬-০৫-১৯৭১

১। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি ও স্বার্বভৌমত্ত নির্ভর করছে বিশ্ব মানচিত্রে অত্র অঞ্চলের স্বাভাবিকতা পুনরুদ্ধারের উপর।

২। War on Want (লন্ডন ভিত্তিক একটি দারিদ্র বিমোচন সংক্রান্ত চ্যারিটি সংস্থা) এর চেয়ারম্যান ও লেবার পার্টির একজন এম পি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ কে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

৩. বুদাপেষ্ট পীস কনফারেন্স বাংলাদেশে পাকিস্তানী নৃশংসতার নিন্দা জানায়

৪. আজ বাংলাদেশ জুড়ে কবি নজরুলের ইসলামের ৭২তম জন্মদিন উদযাপন করা হয়।

৫. মুক্তিসেনারা একটা গানবোট দখল করে নেয়। একটা কালভার্ট ধ্বংস এবং একটি পাকিস্তানী চেকপোষ্ট পুড়িয়ে দেয়।

৬. “পাকিস্তান বৌদ্ধ কৃষ্টি সংঘের” প্রধান এক তার বার্তায় উ থান্টকে বাংলাদেশের বৌদ্ধদের দুর্দশাপূর্ণ অবস্থার কথা জানান।

৭. জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

৮। “লন্ডন টাইমস” সংবাদ ছাপায়- পূর্ব বাংলায় সর্বত্র সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে।

৯. সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিস্টার পোডগোর্নি গতকাল কায়রো পৌঁছান।

বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব স্বীকার করার মাধ্যমেই কেবলমাত্র এখান স্বাভাবিকতা পুনঃস্থাপন সম্ভব। তিনি আশা প্রকাশ করেন বাংলাদেশে থেকে পাকিস্তানী শক্তি সরিয়ে নিতে পাকিস্তানকে চাপ দিতে সমর্থ হবে জাতিসংঘ।

ইউনাইডেট প্রেস ইন্টারন্যাশনাল এর এক বিশেষ প্রতিনিধিকে তিনি সব কথা বলেন।

ভারতে বাংলাদেশী শরনার্থীদের জন্য সেক্রেটারী জেনারেল উ থান্টের ত্রাণ সংগ্রহের আহ্বানের সময় তিনি বলেন উ থান্টের এই আহ্বান প্রমাণ করে, বিপুল সংখ্যক বাঙালী তাদের ঘর গৃহস্থালী ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। পাকিস্তান মিলিটারী জান্তার সংগঠিত ভয়াবহতায় তারা তাদের সর্বস্ব ছেড়ে যায়। সেক্রেটারী জেনারেলের আহ্বানে এটাও স্পষ্টত প্রমাণিত হয় কী অসহনীয় পরিস্থিতিতে লোকজন তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

ইউ.পি.আই প্রতিনিধিকে নজরুল ইসলাম বলেন যে, তিনি আশা করেন জাতি সংঘের মহাসচিব বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এমন পরিস্থিতি তৈরি করবেন যেন উদ্বাস্তুরা দেশে ফিরে আসতে পারে। এর মাধ্যমে তিনি বোঝান জাতিসংঘ পাকিস্তান সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করবে যেন তারা পাকিস্তানী দখলদার আর্মিকে বাংলাদেশ থেকে তুলে নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৈৗমত্ব স্বীকার করে নেয়। তাহলেই কেবলমাত্র শান্তি পুনঃ স্থাপিত হতে পারে।

ইংল্যান্ডের সংগঠন “ওয়ার অন ওয়ান্ট” এর চেয়ারম্যান মিঃ ডোনাল্ড চেশওয়ার্থ এবং একজন লেবার পার্টির সংসদ সদস্য মিঃ মিশেল বার্নস গতকাল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদকে ডেকে নেন। ব্রিটিশ নেতৃদ্বয় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাথে অন্তত তিন ঘন্টা সময় কাটান এবং পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় বাংলাদেশের স্বীকৃতির প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী দুই ব্রিটিশ নেতার কাছে জানতে চান তারা বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমাধান বলতে তারা কি বোঝাতে চান। জবাবে তারা বলেন এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু জনসংখ্যার আশা আকাঙ্খার বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। যে বিপুল সংখ্যক বাঙালী দেশের বাইরে রয়েছেন তাদের উপর কোন রাজনৈতিক সমাধান চাপিয়ে দেওয়া হবে না কোন অবস্থাতেই।

বুদাপেষ্টে অনুষ্ঠিত “বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে” ৫৫টি অংশগ্রহণকারী দেশের ১২৫ জন প্রতিনিধি বিশ্বের সকল সরকারকে ইন্ডিয়ায় বাংলাদেশী উদ্বাস্তুদের জন্য আরো বেশি ত্রাণ এবং সাহায্য পাঠানোর জন্য সম্মিলিতভাবে আহ্বান জানান। সম্মেলনে উদ্বাস্তুদের দেশে ফিরে যাওয়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করিতে বিশেষভাবে সাহায্যের কথা বলা হয়। এই আহ্বানে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আইনজীবী ডাক্তার এবং আফ্রো-এশিয়ান স্বাধীনতা কামী যোদ্ধা এবং নিরপেক্ষ শক্তি।

তারা পাকিস্তান সরকারকে বাংলাদেশে নজিরবিহীন খুন এবং গণহত্যার জন্য দায়ী করে এবং তাদের নির্দেশনায় সংগঠিত সকল কর্মকান্ডের নিন্দা জানানো হয়। তারা পাকিস্তানী মিলিটারী জান্তাকে বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আশা আকাঙ্খার প্রতি সশ্রদ্ধ হবার আহ্বান জানায়। জাতিসংঘের অন্তর্ভূক্ত SEATO এবং CENTO এর মত সংগঠনগুলোকে শাসক পাকিস্তান সামরিক জান্তাকে সাহায্য বন্ধের আহ্বান জানায়। জনাব এম.এ সামাদ এম.এন.এ বুদাপেষ্টে এই শান্তি সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি এখন ইংল্যান্ডে যাবার পথে রয়েছেন।

একজন আওয়ামীলীগ কার্যনির্বাহী সদস্য জনাব মোল্লা জালাল উদ্দিন এম.এন.এ এখন পাটনা সফর রয়েছেন। তিনি প্রাদেশিক সরকারের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করেছেন এবং সেখানে অবস্থান কালে এই আলোচনা অব্যাহত রাখবেন

আপনারা শুনছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদঃ

দক্ষিণ অঞ্চলের মুক্তিসেনারা জানান, উত্তেজনা পূর্ণ এক সংঘর্ষের পর মুক্তিসেনারা বরিশালের উপকূলীয় এলাকায় টহলরত শত্রুদের একটি গানবোট দখল করেছে। গানবোটে অবস্থানরত পাকিস্তানী সেনারা পানিতে ডুবে ইহলীলা …… করে। বরিশালে স্বাধীনতা কামী জওয়ানরা এক পুলিশ ষ্টেশনে তীব্র আক্রমণ করে দখল করে নেয় এবং স্থানীয় পাকিস্তান সহযোগীদের পরাজিত করে।

রংপুরে পাকিস্তানী বাহিনী যখন ধরলা নদী অতিক্রম করে, রাজশাহী কাছে তখন মাইন বিস্ফোরণ করে একটি কালভার্ট উড়িয়ে দেওয়া হয় এবং শত্রুদের একটি জিপ ধ্বংস করা হয়েছে। সিলেটে শত্রুদের এক কনভয়ে গেরিলা আক্রমণ করে সাতটি ট্রাক ধ্বংস করা হয়।

মুক্তিফৌজ কসবায় যুদ্ধসরঞ্জাম এবং খাদ্যভর্তি এক লরিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বল্লবপুরের পাকিস্তান ফাঁড়িতে অতর্কিত আক্রমণ করে মুক্তিফৌজ দুই পাহারাদারকে হত্যা করে। কাঁঠালাবাড়িয়াতে এক পাস্তিান আর্মি ক্যাপ্টেন এবং তার কিছু সহযোগীকে খুন করা হয়। শ্রীবর্দিতে মুক্তিফৌজ সফলভাবে একটি কংক্রিটের ব্রিজ উড়িয়ে দিতে সমর্থ হয়। জামকান্দি এবং লালাপুঞ্জিতে দুইটি পাকিস্তান ফাঁড়ি পুড়িয়ে দেয় মুক্তিফৌজের সদস্যরা এবং কুমিল্লার বিবির বাজারে মাইন অপারেশনে শত্রুর লরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

পাকিস্তান বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ এবং পাকিস্তান সেন্টার ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ফেলোশিপ অফ বুড্ডিষ্ট এর সভাপতি মিস্টার জ্যোতিপাল মহাথেরো জাতিসংঘ মহা সচিবের কাছে এক বার্তায় বাংলাদেশে বৌদ্ধদের দুরবস্থার কথা জানিয়ে বিশ্ব সংস্থার কাছে তিনি বৌদ্ধদের রক্ষায় জরুরী নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান। তার বার্তায় তিনি আরো বলেন, ভিক্ষুসহ অনেক বৌদ্ধকে নৃশংসভাবে পাকিস্তানী বাহিনী হত্যা করে, নন্দির ধ্বংস করে দিয়ে বৌদ্ধ গ্রাম পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানী সেনাদের সহযোগী দুর্বৃত্তরা সম্পত্তি লুট করে। দয়া করে তাদের নিরাপত্তা দিন।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক যান তার দায়িত্ব গ্রহণ করতে। জাতিসংঘে তিনি বাংলাদেশের ঘটনাবলী উপস্থাপন করবেন। বিচারপতি চৌধুরী আমেরিকার জনগণ এবং সংবাদ মাধ্যমেও বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্থানী বাহিনীর পূর্ব পরিকল্পিত গণহত্যা, তারুন এবং বুদ্ধিজীবীদের হত্যার কথা উপস্থাপন করবেন।

আজ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৭২তম জন্মদিন পালিত হয় সারা বাংলাদেশে। এই উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন সেমিনার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মতো নানাবিধ কর্মসূচীর আয়োজন করে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সন্ধ্যাকালীন প্রচারের নজরুল জয়ন্তী উপলক্ষ্যে এক বিশেষ আয়োজন প্রচার করবে।

দি টাইমস অফ লন্ডন “বাংলাদেশ সার্বিক ভয়ানক সামাজিক অবস্থা তুলে ধরে। টাইমস প্রতিনিধি পিটার হ্যাজেল হার্স্ট বলেন, “পূর্ব বাংলার আনাচে-কানাচে সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে। হাজার হাজার লোক বাস্তুচ্যুত, সর্বত্র দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া রোগের সাথে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত ডাক্তারও নেই।”

সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পোডগোর্নি দু’দিনের সফরে গতকাল কায়রো এসেছন সর্বশেষ মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাতের সাথে কথা বলতে।

বাংলাদেশে গত নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় আক্রান্তদের জন্য ব্রিটিশ জনগণের দেওয়া এক মিলিয়নের বেশি ইউরো লন্ডন ব্যাংকে অলস পড়ে আছে বিপর্যয়ের ছয় মাস পরেও। বৃটেনের অন্যতম বৃহৎ ত্রাণ সংস্থা অক্সফামের মতে, টাকাটা অলস পড়ে আছে কারণ, পাকিস্তান সরকার ত্রাণকর্মীদের ঐ অঞ্চলে ঢোকার অনুমতি দেয়নি।

২৭-৫-৭১

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন “আমরা পাকিস্তানের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম এবং সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।

যখন আমাদের সকল শান্তিপূর্ণ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং ২৫ মার্চের কালরাতে ইয়াহিয়ার আর্মি নিলর্জ্জভাবে অস্ত্রহীন বাঙালীর উপর আকস্মিকভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা ছাড়া আমাদের কোন বিকল্প ছিল না। ১৫ মিলিয়ন বাঙালীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এটি ছিল রক্ষাকবচ।

টাইমস অফ লন্ডনের এক প্রতিনিধির সাথে আমাদের প্রধানমন্ত্রী কথা বলেন। তিনি বলেন “আমি বুঝতে পারিনা বিশ্বের গণতান্ত্রিক সরকার সমূহ সামরিক জান্তা পরিচালিত একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাকে কি করে সমর্থন করে। যেখানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য একটি জাতির আশা আকাঙ্খা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

পাকিস্তানের প্রধান অর্থনীতিবিদের মতে, “পশ্চিম পাকিস্তান গ্রীষ্মের শেষে দেউলিয়া হয়ে যাবে এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হবে।” হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ বরার্ট ডফম্যান গতকাল বলেন “বাইরের সাহায্য ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তান বাংলাদেশে পরিচালিত মিলিটারী কার্যক্রম চলমান রাখতে পারবেনা। তিনি আরো বলেন “মনে হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান এ মাসে বাকি থাকা কিস্তি সমূহ স্থগিতের পথ খুঁজছে। তাছাড়া আমেরিকার চলমান অনুদান এবং ঋণ কোন সামরিক অভিযানের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানী কৌশলের জরুরী পরবর্তী লক্ষ্য। তিনি বলেন আমেরিকার উচিত কোন সেনা অভিযানের জন্য টাকা না দেওয়া।

বাংলাদেশে ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য সেক্রেটারি জেনারেল উ-থান্টের প্রতিনিধিকে এদেশে আসতে দিয়ে পাকিস্তানীরা নিজেদের ঔদ্ধত্য নিজেরাই গলধঃকরণ করতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধি মি. আগা সাদীর চিঠিতেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যায়। গতকাল জাতিসংঘের সদরদপ্তর থেকে চিঠিটি প্রকাশিত হয়। এর আগে জাতিসংঘ পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে বিলুপ্ত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছাড়া কেউই তাকে স্বীকার করেননি।

সোভিয়েট কমুনিস্ট পার্টির পত্রিকা “প্রাভদা” সোমবারে আসামে পাকিস্তানী বাহিনীর অগ্নি সংযোগের খবর প্রকাশ করে। এতে এই অঞ্চলে বেড়ে যাওয়া উত্তেজনা সোভিয়েত রাশিয়ার চিন্তার কারণ বলে প্রতীয়মান হয়। এই রিপোর্টে পূর্ববাংলায় দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীর কার্যক্রম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করে।

জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট জানিয়ে দেন পরবর্তী মেয়াদের জন্য তিনি আর প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন না।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশে শান্তি এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মধ্যস্ততা করার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান। গতকাল তিনি ভারতীয় লোকসভায় আট ঘন্টা ব্যাপী এক বিতর্কে উত্তর দিচ্ছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন বাংলাদেশে পাকিস্তানের পরিকল্পিত গণহত্যা এবং উদ্বাস্তু প্রবেশ ভারতের এমনকি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার শান্তি এবং নিরাপত্তার জন্য হুমকি

সেনা, অর্থ এবং রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের নিয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রপতি পোডগোর্নি তার মিশরীয় সহযোগী প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সাথে আলোচনা শুরু করেন। পোডগোর্নি গত সোমবার কায়রো পৌঁছে রাতে মিশরের রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করেন। গতকাল পর্যন্ত আলাপ আলোচনা চলছিলো।

ইয়াহিয়ার দখলদার সরকার সরকারী চাকুরীজীবীদের মে মাসের বেতন ভাতার বিষয়টি আজকে পর্যন্ত পরিস্কার করেনি। নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় সরকারী ভাতা থেকে বরাদ্দ হিসেবে থাকলেও তা এখনো পৌঁছায়নি।

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ নিয়ে যে কোন সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছে যে, এই চেষ্টা যেই করুক, বাংলাদেশের জনগণ শেষ পর্যন্ত তা নাকচ করে দেবে। আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক মুখপাত্র দাবী করেন, ইয়াহিয়ার এক গুপ্তচর আপোষমূলক সমাধানের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ জোর দিয়ে বলেছে বাংলাদেশ একটি যুক্ত এবং সার্বভৌম দেশ এবং আলাপ আলোচনার জন্য নতুন কোন সুযোগ নেই।

কলকাতার বাংলাদেশ মিশনের প্রধান মিঃ হোসেন আলী কবি নজরুল ইসলামের ৭২ তম জন্মদিনে বাংলাদেশের ৭৫ মিলিয়ন লোকের পক্ষে সম্মান জানান। গতকাল সস্ত্রীক কবিকে দেখতে গিয়ে তিনি তাঁকে ফুলের মালা পড়িয়ে দেন।

কবির বাড়িতে এক বিশেষ আলোচনায় হোসেন আলী বলেন “নজরুল ইসলামের ভালোবাসার দেশ বাংলাদেশে এখন এক ভয়াবহ হত্যাকান্ড চলছে। বাংলাদেশের জনগন দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে। ইনশাআল্লাহ আমরা জয়ী হবো।”

২.৬.৭১

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে খবর পড়ছি পারভীন হোসেন।

১. পাকিস্তানে বিদেশী ব্যাংকগুলো পাকিস্তানের ব্যাংকগুলোর এল.সি. গ্রহন করছে না।

২. তিন সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দল ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে নতুন দিল্লীতে সাক্ষাৎ করেছেন।

৩. খান আব্দুল গাফফার খান বাংলাদেশের সংকটের জন্য ক্ষমতালোভী পশ্চিম পাকিস্তানী দের দায়ী করেন।

৪. গত সোমবার চার তরুণ মুক্তিযোদ্ধা শিকড়গাছায় তিন পাকিস্তানী এজেন্টকে হত্যা করে।

৫. মাওলানা ভাসানী বলেন “স্বাধীনতাই বাংলাদেশের মানুষের একমাত্র লক্ষ্য।“

বিশ্বের আর্থিক সংস্থাগুলো পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সতর্কতা জারি করে এবং পাকিস্তানে কোন ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

ব্যাংক কর্মকর্তারা পাকিস্তানের ব্যবসায়ীদের জানান, পাকিস্তান অর্থনীতির ভয়াবহ সংকটের কারণেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।

একজন প্রধান এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট ব্যবসায়ী পাকিস্তানী এক সংবাদকর্মীকে গতকাল বলেন আমদানির জন্য একটি আমেরিকান ব্যাংক ১০০% ডিপোজিটের শর্তারোপ করেছ।

সুইস এবং জাপানী ব্যাংগুলোও এল.সি. গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে।

জনাব ফনী মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দল নতুন দিল্লীতে ভারতের রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত করেছেন। বেগম নূর জাহান মোর্শেদ এবং শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন সহ বাংলাদেশী আইন প্রণেতারা গতকাল পার্লামেন্ট ভারতীয় ভবনে সংসদ সদস্যদের সাথে দেখা করেন। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র আমাদের জানান ৪৫ মিনিট ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মুখপাত্র আমাদের জানান ৪৫ মিনিট ধর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আলোচনায় প্রধানত পশ্চিম পাকিস্তানী বর্বরতায় ভারতে যে সকল বাংলাদেশী উদ্বাস্তু অবস্থান করছে, এই সম্পর্কিত সমস্যা প্রাধান্য পায়।

তারা বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতির প্রশ্ন নিয়েও আলোচনা করেন।

ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রপতি ভি.ভি গিরি প্রায় বিশ মিনিট ধরে তাদের কথা শোনেন এবং বাংলাদেশ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

বাংলাদেশের তিন আইন প্রণেতা ভারতীয় সংসদে কথা বলার সময় ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে আবেকঘন আবেদন জানায় তারা বাংলাদেশের পটভূমি, পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা প্রতারিত এবং শোষিত হবার কথা এবং সবশেষে পশ্চিম পাকিস্তানী আর্মিদের নিরীহ বাংলাদেশীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার বর্ণনা দেন।

ইন্ডিয়ার সংসদ সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জনাব ফনী মজুমদার বলেন বাংলাদেশ গণতন্ত্র ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের পক্ষে। তিনি ভার সরকারকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেবার আহ্বান জানান। জনাব ফনী মজুমদার প্রতিটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির কথা বলতেও আহ্বান জানান।

রাজনৈতিক স্থিরতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মিসেস নূর জাহান মোর্শেদ বলেন, রাজনৈতিক স্থিরতা হতে হবে আমাদের শর্ত মেনে। এবং তা হলো, পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের পুরোপুরি প্রত্যাহার করা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

এর আগে ভারতের সংসদ সদস্যদের বাংলাদেশের জনগণের বৈষম্যের কথা তুলে ধরেন। পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই যারা দুর্দশার স্বীকার হচ্ছে অথচ আমরাই পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু অংশ। তিনি বলেন পাকিস্তানী শাসকরাই পাকিস্তানকে বিভক্ত করেছে। তারা পাকিস্তানকে হত্যা করেছে আমরা শুধু সমাহিত করছি। পাকিস্তান এর দুই অংশ নিয়ে বিভক্ত এবং দুই অংশের জনগনের মধ্যে একমাত্র ধর্ম ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে কোন মিল নেই। জনগণের ইচ্ছে পাকিস্তান এক থাকতে পারেনা। এবং সে ইচ্ছে তৈরি হতে পারতো চাকরের মতো নয় বরং সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখলে।

জনাব মোয়াজ্জেম হোসেন ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনীল হত্যাযজ্ঞ বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ লাখ লোক খুন হয়েছে বাংলাদেশে। তাঁর বক্তৃতায় মোয়াজ্জেম হোসেন বাংলাদেশ সরকারকে কুটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়ে সনির্বদ্ধ আহ্বান জানান।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে খবর প্রচারিত হচ্ছে:

পাখতুন নেতা খান আব্দুল গাফফার খান, বাংলাদেশের বর্তমান সঙ্কটের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানী আগ্রাসী, ক্ষমতালোভী, ধনী বা শ্রেণীকে দায়ী করেন।

কাবুলের দৈনিক “কারাভান” রিপোর্ট করে “খান আব্দুল গাফফার খান আওয়ামী লীগ এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সাথে মধ্যস্থতা বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।

এই পাখতুন নেতা আরও বলেন, জালালাবাদের পাকিস্তান পরিষদ তাকে পাকিস্তান সফর করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে সাক্ষাত করার আমন্ত্রন জানায়। কিন্তু তিনি পাকিস্তানের এক মিলিটারী স্বৈরশাসকের সাথে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী দেশের পূর্বাঞ্চলে যাত্রা করছেন। সেখানে অবস্থান কালে তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন।

রংপুর, কুমিল্লা এবং ঢাকা সেক্টরে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা তীব্র গেরিলা যুদ্ধ করছে। লালমনিরহাট এবং কেকনিয়া রেললাইনের মাঝে অনেক ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানী সেনাদের জন্য রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। লালমনিরহাট ও কুঁড়িগ্রামে উপর্যুপরি কমান্ডো আক্রমণ করে পাকিস্তানি বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করা চলছেই। রিপোর্টে বলা  হয়, সম্প্রতি এক আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা লালমনিরহাটে একটি শত্রু জীপ ধ্বংস করে এবং ৬ পাকিস্তানী সৈন্যকে হত্যা করা হয়।

ময়মনসিংহের উত্ত-পূর্বে, ঢাকা সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধারা সম্প্রতি একটা পাকিস্তানী আর্মি টহলদারীতে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুক্তিসেনারা সফলতার সাথে পাক বাহিনীর ধরলা নদী অতিক্রম ঠেকিয়ে দেয়। শত্রু সেনারা প্রতিশোধ স্বরূপ গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং বেসামরিক লোকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

কুমিল্লা সেক্টরে পাকিস্তানী আর্মির চলাচল বিঘ্নিত করতে মুক্তিবাহিনী আখাউড়ার কাছে দুইটা রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বসিয়ে দেয়। কুমিল্লায় পাকিস্তানী সেনারা অসংখ্য লোকজন হত্যা করে মেয়েদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। চাঁদপুরের দক্ষিণে পাকিস্তানী সেনারা ৩০০ লোককে গুলি করে হত্যা করে। সম্প্রতি যশোরে স্থানীয় লোকজন দুই পাকিস্তানী সৈন্যকে মেরে ফেলে।

ঢাকা এবং চট্টগ্রামের মধ্যে রাস্তা এবং রেল যোগাযোগ এখনো পুনরায় শুরু হয়নি। আমাদের ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানায়, মুক্তিযোদ্ধারা ময়মনসিংহের তাওয়াকুচা বর্ডারে ফাঁড়ি থেকে পাকিস্তানী সৈন্যদের বিতাড়িত করে।

গত সোমবার ঝিকরগাছা থানার গঙ্গারামপুরে চার তরুন মুক্তিযোদ্ধা তিনজন পাকিস্তানী এজেন্ট কে খুন করে। এর মধ্যে ছিলো স্থানীয় আঞ্জুমান-এ-মুহাজারিন সভাপতি এ সামাদ এবং ঝিকরগাছা থানার দুই সাব ইন্সপেক্টর।

এই পাকিস্তানী এজেন্টরা স্থানীয় দুর্বৃত্তদের সহায়তায় বেসামরিক লোকজনের লুট করা দ্রব্য সামগ্রী জীপে তুলছিলো, তখন চার তরুণ মুক্তিযোদ্ধা হঠাৎ আক্রমণ করে তাদের তিনজনকে হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধারা কিছু রাইফেল এবং একটি হালকা মেশিন গান কেড়ে নেয়। শত্রুদের জীপটা দখল করা হয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা মৃত এজেন্টদের একজনের মৃতদেহ নিয়ে আসে।

আপনারা শুনছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদঃ

ন্যাশনাল আওয়ামী পাটি নেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী বাংলাদেশ বিষয়ে যেকোন রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। মৌলানা পরিস্কার ভাবে ঘোষণা করেছেন: পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আপনাদের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত চলবে। আমরা জিতবো অথবা মরবো।

তিনি বলেন, দেশ অথবা দেশের বাইরে যদি কোন রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করা হয়, বাংলাদেশের ৭৫ মিলিয়ন লোক তা সাথে সাথে প্রত্যাখ্যান করবে। কারণ লোকজন পাকিস্তানী সরকারের উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। তাছাড়াও সম্প্রতি বাংলাদেশে তারা বর্বরতা চালায় তা মানব জাতির ইতিহাসে আগে কখনো শোনা যায়নি।

মৌলানা বলেন, জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় যদি কোন গণভোট অনুষ্ঠিত হয় তাহলে তিনি আপত্তি করবেন না। তিনি নিশ্চিত যে, এক ভাগ লোক ও স্বাধীনতার বিপক্ষে ভোট দিবেনা।

মৌলানা আমেরিকা, রাশিয়া, বৃটেন চীনের মতো দেশগুলোকে বাংলাদেশে পাকিস্তান আর্মির বর্বরতার চিত্র তুলে ধরতে এখানে তাদের সাংবাদিকদের পাঠানোর আহ্বান জানান আওয়ামীলীগ নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন বাংলাদেশের জনগনকে আলাদা করে শাসন করার কোন সুযোগ পাকিস্তান সরকারকে দেওয়া হবে না।

আপনারা শুনছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদঃ

বাংলাদেশের দূত জনাব আব্দুল সামাদ এখন মস্কো সফরের পথে। তিনি বলেন ইয়াহিয়ার বাংলাদেশ শরনার্থীদের ভারত থেকে দেশে ফিরে যাওয়ার আহ্বান শুধুমাত্র বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দেবার জন্য। যখন পাকিস্তানী সেনারা বাংলাদেশে তাদের গণহত্যা এবং বর্বরোচিত নৃশংসতা করে চলেছে সেখানে ইয়াহিয়ার এই আহ্বান একটি নিষ্ঠুরতার ইংগিত মাত্র।

মিঃ সামাদ গত তিন সপ্তাহ ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে ইউরোপের নেতাদেরকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার একটি পরিস্কার ধারণা দিতে চেষ্টা করছেন।

খবর এখানে শেষ হলোঃ

৫-৬-৭১

আপনারা শুনছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রঃ

খরব পড়ছি পারভীন হোসাইন।

১. বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাংলাদেশের নিরীহ জনগনের উপর পাকিস্তানী বাহিনীর অমানবিক বর্বরতার ব্যাপক নিন্দা জানানো হচ্ছে।

২. পাকিস্তান সরকার অনেক দেরিতে হলেও অবশেষে বিভিন্ন দাতা দেশের কাছে স্বীকার করেছে বাংলাদেশীরা শোষন বঞ্চনার শিকার হয়েছে।

৩. ‘ডেইলী টেলিগ্রাফের’ প্রতিনিধি রিপোর্ট কার যে, পাকিস্তানী আর্মি বাংলাদেশে ভিয়েতনাম ধরনের গেরিলা যুদ্ধের আশংকা করছে

৪. সকল সেক্টরে পাকিস্তানী আগ্রাসনকারীদের উপর মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক আক্রমণ শুরু করেছে।

৫. রেডিও অস্ট্রেলিয়ার রিপোর্টে বলা হয়, কলকাতার এক রোমান ক্যাথলিক আর্চবিশপ নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশে গত দুই মাসে অন্তত তিনজন যাজক খুন হয়েছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাংলাদেশের নিরীহ জনগনের উপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অমানবিক বর্বরতার খবর প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের জনগনের জন্য বিশ্বের আরও অনেক দেশের জনগন সহানুভুতি প্রকাশ করে এবং সমর্থন জানায়।

জাতি সংঘর বিভিন্ন সহায়ক সংস্থা পশ্চিম পাকিস্তানের সৈনিকদের নৃশংস গণহত্যায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে লুক্সেমবার্গে অনুষ্ঠিত ফেডারেশন অফ দ্য ইউনাইটেড নেশনস্ অ্যাসোসিয়েশনের ২৩ম সাধারণ সভায় বাংলাদেশ গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়। বেলজিয়ামের পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে এই সভায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

এই সভায় আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, পোল্যান্ড, ইটালী অস্ট্রেলিয়াসহ ৫২টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহন করে। ফেডারেশনের একজন মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশে দুর্ভাগ্য জনক হাজার হাজার হত্যাকান্ডে নিন্দা জানানোর সময় সকল প্রতিনিধিরা সরব ছিলেন।

ভেনেজুয়েলার আইন সভার সদস্যরা জাতিসংঘ সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে বাংলাদেশের জনগনের মানবাধিকারের দিকে দৃষ্টি দিতে পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানাতে বলেন। পাকিস্তানী আর্মির যে ভয়াবহ দমনের কারণে বাংলাদেশের উদ্বাস্তুরা দেশ ছেড়েছে, পাকিস্তান যেন তাদের দেশে ফিরিয়ে নেবার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই চাপ সৃষ্টির অনুরোধও তারা জানায়।

যে সীমাহীন অন্যায় অত্যাচার বাংলাদেশে সংগঠিত হয়েছ বিশেষ করে গণহত্যার মতো ঘৃণ্য কর্মকান্ডের জন্য ভেনেজুয়েলার আইন সভার ২১৪ জন সদস্যে একমত হয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন।

পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে গণহত্যা চালায় তার প্রতিবাদ স্বরূপ থাইল্যান্ড পাকিস্তান বিমানের জ্বালানীর যোগান বন্ধ করে দেয়। থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে ৭৫ মিলিয়ন নিরীহ লোকের উপর মিলিটারী অপারেশন চালানোর জন্য কোন বিমানের জ্বালানী তাঁদের কাছে নেই। তাই নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের অবহিত করানোর কথা বলেন।

ভ্যাটিকানের দৈনিক “অবজারভেটরি রোমানো” প্রকাশ করে যে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা বাংলাদেশকে যে যুদ্ধের ভিতর টেনে এনেছে তা একটি অসম যুদ্ধ। প্রথম পাতার মন্তব্যে পত্রিকাটি বলে, এই সংকট সমাধানের জন্য পাকিস্তানের উচিত এই মুহূর্তে যুদ্ধ বন্ধ করা। এবং বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতাকে মেনে নেওয়া। অন্যথায় গেরিলা যুদ্ধের কারণে পূর্ব বাংলা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে যেটা পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতিতে আঘাত হানবে।

পাকিস্তান সরকার অনেক পরে অবশেষে দাতা দেশগুলোর কাছে স্বীকার করেছে বাংলাদেশের জনগন বঞ্চনার স্বীকার হয়েছে যার ফলেই এই যুদ্ধ। লজ্জাহীনভাবে পাকিস্তানী মিলিটারী শাসকরা এর প্রতিনিধিদের ঋণ এবং সহায়তা চাইবার কথা বলে দেয়।

বিশ্বস্ত সূত্র মতে পাকিস্তান বর্তমানে প্রতি মাসে ১২০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। প্রত্যেকটা দেশে পাকিস্তানী মিশনে ঋণ এবং ত্রাণ সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া

“ডেইলী টেলিগ্রাফের” প্রতিনিধি মে মাসের ২০ তারিখ রিপোর্ট করে, বাংলাদেশে পাকিস্তানী আর্মি দাবী করে সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কিন্তু তারা এখন আশংকা প্রকাশ করছে বাংলাদেশে ভিয়েতনামের মতো গেরিলা যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে। সাংবাদিক বলেন, প্রতি রাতেই মুক্তি যোদ্ধারা শত্রুদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে অন্তত ৩০ রকম ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। পাকিস্তানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুমান করছে আরও নিবিড় রকম গেরিলা যুদ্ধ সামনের বর্ষাকালে উপস্থিত হবে।

মুক্তিযোদ্ধারা সকল সেক্টরে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। শত্রুদের ধ্বংস করার সংকল্প নিয়ে তারা অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম করছে, মুক্তিযোদ্ধারা রেললাইন উপড়ে ফেলে এবং পথঘাট বন্ধ করে দিয়ে পাকিস্তানীদের কৌশলগত ভাবে ভোগান্তি দিয়ে যাচ্ছে। সকল সেক্টরেই পাকিস্তানী বাহিনী চলাচলের ক্ষেত্রে বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছে।

পাকিস্তানী বাহিনীর চলাচল বন্ধ করতে মুক্তিসেনারা বিরল এবং কাঞ্চনকে সংযোগকারী ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছে।

আমাদের রংপুর প্রতিনিধি জানায়, লালমনিরহাট এবং বড়বাড়ির মাঝামাঝিতে টহলরত অবস্থায় পাকিস্তানী বাহিনীর উপর মুক্তিযোদ্ধারা আকস্মিক আক্রমণ চালায় এই অপারেশনে ১৬ জন শত্রু নিহত হয়।

মুক্তিযোদ্ধারা স্বরমাটি রেলওয়ে ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানী সেনাদের বহনকারী একটা ট্রেন মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করে এবং তাদের দশ জনকে হত্যা করে।

তিস্তার ভটমারি ঘাটে মুক্তিযোদ্ধারা দুইটা ফেরী বোট ডুবিয়ে দেয়। এই ফেরি দুইটা পাকিস্তানীরা তাদের সৈন্যদের চলাচলের কাজে ব্যবহার করতো। রেল এবং রাস্তার যোগাযোগ বাঁধাগ্রস্থ হওয়ায় পাকিস্তানীরা চলাচলের ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখীন হয়।

উত্তরের সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তানী হানাদার সৈনিকদের সাথে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।

গত শুক্রবার ভুরুঙ্গামারিতে পাকিস্তানী সেনাদের ভারী গোলাগুলি বিনিময় করে এবং শত্রুদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ ঘটায়। এখানে অনেক পাকিস্তানী সৈন্য নিহত হয়। দিনাজপুরে বিভিন্ন জায়গায় মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী সৈনিকদের উপর ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে।

রেডিও অস্ট্রেলিয়া রিপোর্ট করে, কলকাতার এরা রোমান ক্যাথলিক আর্চবিশপ নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশে গত দুই মাসে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে তিনজন যাজক নিহত হয়েছেন। আর্চবিশপ বলেছেন শেষ হত্যাকান্ডটি সংগঠিত হয় ৮ মে, চার্চ বন্ধ করে যাজক বের হলেই তার গায়ে পাকিস্তানীরা আগুন ধরি