ইসলামের দৃষ্টিতে জেহাদ

Posted on Posted in Uncategorized

ইসলামের দৃষ্টিতে জেহাদ

 ৮ অক্টোবর, ১৯৭১

।। দ্বিতীয় অংশ ।।

 আল্লাহ রাবুল আলামীন কোরান শরীফের সুরা তওবাতে মুনাফেকদের সম্পর্কে হুজুর (ছঃ)কে নির্দেশ করে বলেছেনঃ

 يا ايها النبي جاهد الكفار والمنافقين واغلظ عليهم وماوهم بجهنم. وبئس المصير. يحلفون بالله ما قالوا. ولقد قالوا كلمة الكفر وكفروا بعد اسلامهم وهمو بما لم ينالوا.

অর্থাৎ, হে নবী, অবিশ্বাসী ও মুনাফেকদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করুন এবং তাদেরকে দমন করুন। এদের বাসস্থান হয়েছে দোযখ। এবং তা অত্যন্ত নিকৃষ্ট ঠিকানা। ঐ সমস্ত মুনাফেকগণ কথায় কথায়ই আল্লাহর নামে কছম খায়, পক্ষান্তরে তারা গৰ্হিত কথাবার্তা বলে ও মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও কুফুরী কাজ করে এবং লোকসম্মুখে ঐ সমস্ত ইচ্ছা প্রকাশ করে যেগুলির সাথে তাদের অন্তরের কোন মিল নেই। অর্থাৎ, মানুষকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে নিজেদের কুমতলব হাসেল করার জন্য ঐ সমস্ত অলীক ও ভিত্তিহীন কথাবার্তা বলে বেড়ায়, যেগুলো প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ মিথ্যা। প্রকৃতপক্ষে ওরা হচ্ছে মুসলমান নামধারী বেঈমান। এজন্য ঐ সমস্ত বেঈমানদের কথায় কর্ণপাত করে ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ওদের ভাওতাবাজির উপযুক্ত জওয়াব দেওয়ার জন্য আল্লাহতালা মুসলমানদের উপর নির্দেশ জারি করেছেন।

আল্লাহতালা সুরা নেছা-তে আরো বলেছেনঃ

 الذين امنو يقاتلون في سبيل الله . والذين كفروا يقاتلون في سبيل الطاغوت فقاتلوا اولیاء الشیطان.

অর্থাৎ, যাঁরা বিশ্বাসী ও সৎ তাঁরা আল্লাহর রাস্তায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, আর যাঁরা অবিশ্বাসী এবং অসৎ তারা মিথ্যা নির্দেশক বা শয়তানের পথে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য যুদ্ধ করে। তাই হে বিশ্বাসী ও সৎ

লোকগণ, তোমরা শয়তানের বন্ধু- অর্থাৎ অশান্তি সৃষ্টিকারী, বেঈমান, মুনাফেক ও বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্ৰধারণ করতে গিয়ে যাঁরা মারা যাবেন, তাঁরা শহীদ ও অমর হয়ে থাকবেন এবং পরকালে অসীম সুখের অধিকারী হবেন। যেমন কোরান শরীফে আছেঃ ولا تقولوا لمن يقتل في سبيل الله اموات بل احياء ولكن لا تشعرون

 অর্থাৎ, আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করে যাঁরা মৃত্যুমুখে পতিত হবেন; হে মানুষ, তোমরা তাঁদেরকে মৃতব্যক্তি বলে অভিহিত করো না, বরং প্রকৃতপক্ষে তারা জীবিত। কারণ তারা হলেন শহীদ এবং শহীদকে কখনো মৃত বলে অভিহিত করা ঠিক নয়।

আল্লাহ রাব্দুল আলামীন আরও বলেছেন, আমার নির্দেশিত জেহাদে দৃঢ় মনোবল নিয়ে অংশগ্রহণ জেহাদের সম্মুখীন হতে বাধ্য করব এবং কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখব, আমার নির্দেশের আজ্ঞাবহ হয়ে আমার এ সমস্ত অগ্নিপরীক্ষায় তোমরা কতটুকু উত্তীর্ণ হতে পারো। তোমাদের মধ্যে যাঁরা এ সমস্ত কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় ধৈর্য ও বীরত্বের সাথে উত্তীর্ণ হতে পারবে, একমাত্র তাঁদের জন্যই রয়েছে অসীম সুখময় বেহেস্তের শুভ সংবাদ। যেমন নাকি আল্লাহতালা কোরানে উল্লেখ করেছেনঃ

ولنبلونكم بشى من الخوف والجوع ونقص من الاموال

والانفس والثمرات. وبشر

অর্থাৎ, আমি কতগুলি জিনিস দ্বারা তোমাদেরকে পরীক্ষা করব। সেগুলো হল এইঃ

(১) আমি তোমাদেরকে এমন এক পরিবেশে ফেলে দিয়ে ভীতি প্রদর্শন করব, যেখানে চতুর্দিক থেকে ভয় ও আতঙ্ক তোমাদেরকে গ্রাস করতে চাইবে।

(২) তোমাদেরআেনাহারে ফেলে ক্ষিধের জালায় কষ্ট দেব কিন্তু আবার কোন জিনিস থেকে বঞ্চিত রাখব, অর্থাৎ তখন কোন খাবার দ্রব্য তোমরা খুঁজে পাবে না।

(৩) তোমাদের ধনসম্পত্তি বিনষ্ট করে দেব; অর্থাৎ অত্যাচারীরা তোমাদের ধনদৌলত লুট করে নেবে ও বিনষ্ট করে দেবে, অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে তা বিনষ্ট হয়ে যাবে।

(৪) আমি তোমাদের স্ত্রী-পুত্র, আত্মীয়-স্বজন এবং অত্যন্ত আপনজনকে তোমাদের কাছ থেকে সরিয়ে নেব, অর্থাৎ মেরে ফেলব।

(৫) তোমাদের ফলে সুসজ্জিত বৃক্ষ এবং শস্য-সামগ্রীতে ভরা ক্ষেতের ফসল প্রাকৃতিক দুর্যোগ-যথা ঝড়তুফান, বন্যা ইত্যাদির মাধ্যমে বিনষ্ট করে দেব।

আমি তোমাদেরকে ঐ সমস্ত বিপদে ফেরে পরীক্ষা করে দেখব- যাতে তোমরা ভয় ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে, ক্ষিধের জ্বালায় জর্জরিত হয়ে, ধন-সম্পত্তির প্রাচুর্য হতে বঞ্চিত হয়ে, স্ত্রী-পুত্র ও আত্মীয়-স্বজনহারা হয়ে, ফলে সুসজ্জিত বৃক্ষ ও সুফলা জমির ফসল থেকে বঞ্চিত হয়ে আমার উপর থেকে ভরসা ছেড়ে দিয়ে একেবারেই হা-হুতাশে পড়ো এবং ন্যায় পথ থেকে সরে দাঁড়াও ঐ সমস্ত বিপদে ধৈর্য ধারণ করে আমার নাম স্মরণ করে দৃঢ় মনোবল ও ধৈর্য নিয়ে এবং সৎপথে থেকে ঐ সমস্ত চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে জেহাদ করে যাও, অর্থাৎ ন্যায়নীতির

ভিতর দিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিপদ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করো। মনে রাখবা, সৎপথ ও ন্যায়নীতির ভিতর থেকে ধৈর্য সহকারে ঐ সমস্ত বিপদের মোকাবিলা করা এবং এ সমস্ত দুর্যোগ যদি কোন অত্যাচারী লোকের দ্বারা সংগঠিত হয়ে থাকে, তবে তাদের ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রাণপণে রুখে দাঁড়ানোর নামও আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ৷

অতঃপর আল্লাহতালা বলেছেনঃ যে সমস্ত লোক ঐ সমস্ত বিপদে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর এই সমাধানের উপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে এবং কোন অন্যায় কাজে লিপ্ত না হয়ে সৎ ও ন্যায়নীতির ভিতর থেকে জেহাদের মাধ্যমে ঐ সমস্ত বিপদের মোকাবিলা করে, আর ঐ কথা বলে- আমরা আল্লাহরই সিদ্ধান্তের উপর রাজী রয়েছি এবং তাঁরই কাছে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে, তাদেরকে আমার বেহেস্তের শুভ সংবাদ জানিয়ে দাও।

কোরান শরীফের এই আয়াতের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত ২৫শে মার্চ থেকে নরঘাতক জল্লাদ ইয়াহিয়া খান বাংলাদেশে যে গণহত্যা ও পাশবিকতা চালিয়েছে এবং এর মাধ্যমে এদেশের জনগণের উপর যে ভয়াবহ ও দুর্বিষহ বিপদ নেমে এসেছে, এগুলোও মানুষের উপর আল্লাহতালার বিরাট পরীক্ষা। এই কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় অবশ্যই আমাদেরকে উত্তীর্ণ হতে হবে। এবং সেজন্য প্রয়োজন হচ্ছে অসীম সহনশীলতা ও ধৈর্যের সাথে জেহাদ করে যাওয়া। এই বিপদের দিনে অবশ্যই আমাদেরকে ন্যায়-নীতি মেনে চলতে হবে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিপদ কাটিয়ে ওঠার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। অক্টোবর, ১৯৭১।

তৃতীয় ও শেষ অংশ।

পশ্চিম পাকিস্তানের জঙ্গী শাসকগোষ্ঠী বিগত ২৪ বৎসর যাবৎ শুধু বাংলাদেশের জনগণকে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকেই বঞ্চিত করে নাই, উপরন্তু এদেশের জনগণের সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা ও তাদের ন্যায্য অধিকার চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার হীন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে বিগত ২৫শে মার্চ থেকে আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আমাদের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। তারা হিংস্র পশুর ন্যায় বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে, ঘর-বাড়ি, ধন-দৌলত, দোকান-পাট লুট করছে ও জ্বালিয়ে দিচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত নষ্ট করেছে, প্রায় এক কোটি লোককে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে ও তিন কোটি লোককে নিজেদের ভিটেমাটি ছাড়া করেছে এবং বলপূর্বক এদেশের মানুষকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে ও তাদের আনুগত্য স্বীকারে বাধ্য করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। ওরা আমাদের সাথে যে ধরনের যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, তা হচ্ছে ন্যায়ের বিরুদ্ধে অন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করার যুদ্ধ। কোরানের দৃষ্টিতে ওরা শয়তানের বন্ধু এবং দোযখী। অতএব আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য।

আল্লাহতালা আরও বলেছেনঃ                 ومن يقتل مؤمنا متعمدا فجزائه جهنم ه

অর্থাৎ, সুপরিকল্পিতভাবে যদি কোন মুসলমান অন্য মুসলমানকে হত্যা করে তবে এর একমাত্র বদলা হচ্ছে দোযখ। এমনকি কোন অমুসলমানকেও যদি অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয় তবে তার জন্যেও একই শাস্তির কথা হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে। দোযখীদের সাহায্য করাও দোযখের কাজের মধ্যে গণ্য। আল্লাহতালা বলেছেন, আমার বান্দা যত বড় গোনাহ বা অন্যায়ই করুক না কেন, সে তার অন্যায়ের জন্য অনুতপ্ত হয়ে যদি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে তা আমি মার্জনা করে দেব। কিন্তু কেউ যদি কাউকে হত্যা করে, অন্যায়ভাবে অন্যের অধিকার নষ্ট করে, অন্যের অধিকারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে, অপরের মনে কষ্ট দেয় ও নারীর অমর্যাদা করে সে আমার যত এবাদত বন্দেগীই করুক না কেন আর যত ক্ষমাই চাক না কেন, তাকে ক্ষমা করার কোন অধিকার আমার নেই। তাকে একমাত্র ক্ষমা সে-ই করতে পারে, যার সঙ্গে সে এহেন আচরণ করলো। রাসূলুল্লাহ  (সঃ) বলেছেন, এ ধরনের আচরণ করে যে ইহলীলা ত্যাগ করবে, সে সবচেয়ে নিম্নস্তরের হতভাগ্য ব্যক্তি। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের লোক হীনতর ইতর প্রাণী শূকর ও কুকুরের চেয়েও বেশী নিকৃষ্টতর। যেমন আল্লাহতালা তাকে কোরানে বলেছেনঃ        اولائك كالانعام بل هم اضل সুতরাং, চিন্তা করুন ওরা ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে বাংলাদেশে যেভাবে অন্যের অধিকার নষ্টের কাজে লিপ্ত রয়েছে, ইসলামের দৃষ্টিতে তারা কত বড় অপরাধী! নারীদের উপর বলাৎকার করা ইসলামের কঠোর ভাষায় নিষেধ আছে। হুজুর (ছঃ) বলেছেন

 الزني لايزني حين يزني وهو مؤمن

অর্থাৎ, কোন ব্যক্তি মুসলমান থাকা অবস্থায় কোন নারীর সাথে জেনা বা অবৈধভাবে পাশবিক লালসা চরিতার্থে মিলিত হতে পারে না। সুতরাং পাক হানাদার পশুরা যেভাবে বাংলাদেশে নারীধর্ষণ চালাচ্ছে, তাদেরকে আমরা ইসলামের নামে সংহতির ধ্বজাধারী মুসলমান বলে মেনে নিতে পারি না। তারা হল মুসলমান নামধারী বেঈমান ও মুনাফেক। অতএব, এদের বিরুদ্ধে অস্ত্ৰধারণ করে ও সার্বিক অসহযোগিতা প্রদান করে ওদের বেঈমানীর সমুচিত জবাব দেওয়া আমাদের প্রত্যেকের ইসলামিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমরা যদি আমাদের এই দায়িত্বের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করি, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে আমরাও ওদের সমঅপরাধী বলে গণ্য হব। কারণ, ইসলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করতে প্রতিটি বিশ্বমানবকে নিদেশ দিয়েছেন ।

ইসলামের দৃষ্টিতে জেহাদের অর্থ শুধু অস্ত্ৰধারণ করে জেহাদই নয়- অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক সাহায্য প্রদান, অন্যায়কারী ও তাদের সহযোগীদের সাথে সার্বিকভাবে অসহযোগিতা করা, এর বিরুদ্ধে অস্ত্ৰধারণকারীদের নানাভাবে সাহায্য প্রদান করা, এর বিরুদ্ধে মানুষকে বুঝিয়ে গণসমর্থন গড়ে তোলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজেদের বিজয়ের উপর দৃঢ়বিশ্বাস ও আশা পোষণ করা এবং পুরোপুরি ধৈর্য সহকারে সৎ ও ন্যায়নীতির মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে বিপদ কাটিয়ে উজ্জ্বল ও স্বর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রাখাও ইসলামের দৃষ্টিতে জেহাদের অন্তর্ভুক্ত।

অতএব, হে বাঙালী ভাইবোনেরা, আসুন আমরা অন্যায়কারী পশ্চিমা হানাদার পশু ও এদের পদলেহী দালাল কুকুরদের বিরুদ্ধে সার্বিকভাবে জেহাদ চালিয়ে আমরা আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হই। জয় আমাদের সুনিশ্চিত।

نصر من الله وفتح قريب.

(আবু রাহাত মোঃ হাবিবুর রহমান রচিত)