ইস্ট বেঙ্গলের গর্বঃ চিলমারী যুদ্ধ (প্রতিবেদন)

Posted on Posted in 10

<১০, ২১.১০, ৫০৮-৫০৯>

ইস্ট বেঙলের গর্বঃ চিলমারী যুদ্ধ

১৫ই আগস্ট ১৯৭১। আর্টিলারীসহ এক ব্যাটালিয়ন পাক হানাদার ও তিন শতাধিক রাজাকার চিলমারীতে বীর ইস্ট বেঙলের মুখোমুখি হয়।

ইস্ট বেঙল ছিল কম্বাইন্ড ফোর্স। এখানে ছিলেন সি-ও জামিল (থার্ড বেঙল), সি-ও মেজর জিয়াউদ্দীন (ফার্স্ট বেঙল) ও সি-ও মেজর আমিনুল হক (৮ম বেঙল), আর ছিল মুক্তিবাহিনীর দুটি কলাম। মূল কমান্ডে ছিলেন ‘জেড’ফোর্সের অধিনায়ক মেজ জিয়া।

 ১৫ই ও ১৬ই আগস্ট হানাদার পাকবাহিনী নেক-টু-নেক ফাইট করেছে তাদের মোস্ট লেটেস্ট ও মোস্ট সফিস্টিকেটেড আর্মস নিয়ে। কখনো বা মনে হয়েছে পাক হানাদার ইস্ট বেঙলে ডিফেন্সে ফাটল ধরাতে সমর্থ হবে। কিন্তু না, বাংলার বীর ইস্ট বেঙল রেজিমেন্ট দাঁতে দাঁতে কামড়ে পজিশন আগলে রেখে দু’দিন ধরে তাদের আক্রমণ রেসিস্ট করে গেছে। দুদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধা রা জঙল ও বনের ফাঁক দিয়ে সংগ্রহ করে হানাদার বাহিনীর ডিফেন্সের ফাঁক-ফোকর। ১৭ইই আগস্ট চিলমারীর পূর্বদিক দিয়ে এগিয়ে গেল ৮ম বেঙল। নাশ হয়ে গেল দুটি হানাদার পজিশন। নিহত হল ৪ জন পাক হানাদার বাহিনী। জায়গা বদল করে এগুচ্ছে ফার্স্ট বেঙল, থার্ড বেঙল। রক্তক্ষয়ী চিলমারীর বুকে অসীম বীরবিক্রমে তিনদিন তিনরাত ধরে চলে যাচ্ছে বীরের বাহিনী ইস্ট বেঙল শত্রুর লেটেস্ট আর্টিলারি ও সফিস্টিকেটেড আর্মস-এর সামনে ক’টা এস-এস-এর আর থ্রি-নটথ্রি নিয়ে। অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা হানাদারদের ইঞ্চি ইঞ্চি করে পিছু হটাচ্ছে চিলমারীর বুক থেকে, আর গ্রামের কৃষক-জনতা সবাই তাদের পিছনে ভলান্টিয়ারের কাজ করছে। জনগনের শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় উদ্দীপ্ত ইস্ট বেঙ্গল এর জোয়ানরা পাক বাহিনীর মরণ আঘাত উপেক্ষা করে প্রতি প্রহরে সামনে এগিয়েছে, নিখুঁত নিশানায় হানাদার বাংকারে গুলি ছুড়েছে।

এলো ১৯শে আগস্ট। সারাদিনের পর সন্ধ্যায় হঠাৎ যেন দুলে উঠলো হানাদার পজিশন, বাংকার। ইস্ট বেঙ্গল ও মুক্তিবাহিনী আক্রমণ শানিয়ে তুললো। বীরদর্পে অসীম দু:সাহসে সন্ধ্যায় আঁধার নামার সাথে সাথে থার্ড বেঙ্গল মেজর জামিলের সাথে আরও কয়েক গজ এগিয়ে সামনের একটা হানাদার বাংকার দখল করে নিল। বাংকারেই হত্যা করল ৪ জন হানাদারকে।

রাতের আঁধারে যুদ্ধ আরও রক্তক্ষয়ী ও হিংস্র হয়ে উঠলো। পাকিস্তানি স্ট্রং আর্টিলারির কভারিং থাকা সত্বেও চিলমারীর বুক থেকে পালাতে চায় ১ ব্যাটালিয়ন হানাদার। ‘জেড’ফোর্সের অধিনায়ক জিয়ার অর্ডার- ‘ওদেরকে রিট্রিট করতে দেয়া হবে না। চিলমারীর বুকে ওদের কবর হবে।’মুক্তিযোদ্ধারা সন্তপর্ণে ক্ষিপ্ত গতিতে গিয়ে পজিশন নেয় হানাদারদের পেছনে। ভোর রাতে জোর কদমে ইস্ট বেঙ্গল ঢুকে পড়ে পাকিস্তানি বাংকারে, পজিশনে, ডিফেন্স লাইনে।

ইস্ট বেঙ্গলের নির্ভীক যোদ্ধারা নিশ্চিত আঘাতে ভেঙে পড়তে লাগল লাগল ওদের বাংকার, গুড়ো গুড়ো হয়ে গেল পাকিস্তানি ডিফেন্স। প্রাণভয়ে চিলমারী ডিফেন্স ছেড়ে পালাচ্ছে ৭০০ পাকসেনার হেড-বডি ও আহত নিয়ে ৭/৮ মাইল দূরে, চিলমারী রেলওয়ের দিকে। পালাবার পথে প্রাণ দিচ্ছে ওঁৎ পেতে থাকা মুক্তিযোদ্ধা দের গুলির ঘায়ে।

২০শে আগস্ট মুক্ত হয়ে গেল চিলমারী। রক্তক্ষয়ী পাঁচদিন পাঁচরাত যুদ্ধের পর শত প্রাণশক্তিতে ভরপুর ইস্ট বেঙ্গলের বীর জোয়ানরা এগিয়ে চললো পলাতক পাক হানাদারদের পরবর্তী ডিফেন্স লাইন চিলমারী রেলওয়ে তে আঘাত হানার জন্যে। পশ্চাতে পড়ে থাকল রক্তস্নাত চিলমারী। আনন্দে উদ্বেলিত জনগন চিলমারী রণক্ষেত্রে এসে দেখতে পেলো বাংকারে বাংকারে পড়ে আছে শতাধিক হানাদার ও রাজাকারের লাশ। পাক হানাদারদের ডিফেন্স লাইন রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা নিহত হানাদার চিলমারীতে কবর দেয়ার ব্যবস্থা করে। পাকিস্তানি দের ২ টি লঞ্চ ধরা পড়ে ও ২ টি শপীডবোট ধ্বংস হয়। ধ্বংস হয় কয়েকটি সাঁজোয়া গাড়ী। ইস্ট বেঙ্গলের ৩ জন সামান্য আহত হয়।

 [‘দৈনিক ইত্তেফাক’১৯৮২ বিজয় দিবস সংখ্যায় প্রকাশিত মুসা সাদিক রচিত প্রতিবেদন থেকে সংকলিত ]