ইয়াহিয়া খানকে প্রতিশ্রুতি অস্ত্র সাহায্য না দেয়ায় আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনজণের উদ্দেশ্যে প্রচারিত চিঠি

Posted on Posted in 4

<৪,১২৪,২২৮-২২৯>

অনুবাদকঃ সজীব কুমার সাহা

শিরোনামসূত্রতারিখ
১২৪। ইয়াহিয়া খানকে প্রতিশ্রুতি অস্ত্র সাহায্য না দেয়ায় আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনজণের উদ্দেশ্যে প্রচারিত চিঠিআমেরিকাস্থ ইস্ট পাকিস্তান লীগের দলিল১২ মার্চ , ১৯৭১

 

 

আমেরিকাস্থ পূর্ব পাকিস্তান লীগ

                                                    ২৬৬৭ ব্রডওয়ে ,নিউইয়র্ক  এন ওয়াই ১০০২৫

তাং – ১২ইমার্চ , ১৯৭১

জনাব,

 

আমি যে সংগঠনের পক্ষে চিঠি লিখছি সেই সংগঠন প্রতিনিধিত্ব করে সেই সব মানুষদের যারা উৎপত্তি গত ভাবে পূর্ব পাকিস্তানী এবং যারা তাদের  আমেরিকাস্থ বন্ধু। আমি এই চিঠি লিখছি বাধ্য হয়ে কারণ এই সময়ে পাকিস্তানে কি ঘটছে এইটা জানানোর জন্য।

 

পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাকৃতিক দূর্যোগে পতিত হওয়ার স্মৃতি এখনো আমেরিকার জনগনের স্মৃতিতে জীবন্ত রয়েছে । তাদের মধ্যে কয়েকজন বিপদের মাত্রা সম্পর্কে সচেতন যেটির মুখোমুখি আজ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ । এই দূর্যোগ মনুষ্যসৃষ্ট ,গত বছরের নভেম্বরের মত নয় । এটি প্রতিরোধযোগ্য । সাড়ে সাত কোটি অসহায় নিরস্ত্র বাঙালি পাকিস্তানি দখলদার  বাহিনীর মেশিনগান ও গ্রেনেড বোমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে । পাকিস্তান গত ২৩ বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষের অস্তিত্বে রয়েছে । কিন্তু পূর্ব অংশের মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানের অভিজাতদের দ্বারা শোষিত হচ্ছে । আমলাতন্ত্র এবং সেনাবাহিনীতে নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে তারা পূর্ব পাকিস্তানকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রন করছে যাতে পশ্চিম পাকিস্তানিরা উপকৃত হয় । পূর্ব পাকিস্তানিরা সরকারের এরুপ গনতান্ত্রিক পন্থায় হতাশ হয়েছে কারন এখানে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সামান্য অংশ পায় । যদিও মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ পূর্ব অংশে বাস করে , কিন্তু তারপরও তারা দুটি অংশকে এক রাখতে উল্লেখযোগ্য ছাড় ও ত্যাগস্বীকার করছে নিরর্থকভাবে । ১৯৫৬ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার রক্ষা করতে সম্মত হয় । এবং তারা অন্য অংশে রাজধানী স্থাপনে আপত্তি করে নাই । সব কিছু করার পরেও এই নিয়ম গুলি কোন কাজে আসে নাই । একটি জোট গঠিত হলো যারা পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যাবসায়ী , আমলা এবং সেনাবাহিনীর স্বার্থ রক্ষার জন্য ১৯৫৬ এবং ১৯৫৮ সালের নিয়ম গুলি পুনরাবৃত্তি করে । গত দুই দশক ধরে পাকিস্তানের রাজনীতি প্রভাবশালী সহনশীল হচ্ছে যার ফলে পাকিস্তানের রাজনীতির নিয়ন্ত্রন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কাছে চলে যাচ্ছে । একটি ধারাবাহিক সেনা অভ্যুত্থান এর মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকার দমনের জন্য । ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আরো হতাশ হয়েছে । সারা বিশ্বের জনগণ একটি আভাস পেয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের অবহেলা ঘূর্ণিঝড়ের সময়।  একটি ছোট এলাকার মধ্যে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ এবং দারিদ্রতার কারণে মার্শাল আইয়ুব ১০ বছরে শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে পূর্বাংশের মানুষ ।

 

আজ সংবিধান খসড়া তৈরী করার সময় এসেছে কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যেতে হবে যার ফলে জনগণের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে । জাতীয় পরিষদে মুজিব ও ভুট্টোর মধ্যে একটি চুক্তির অনির্দিষ্ট স্থগিতাদেশ এবং ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধের প্রচার চালিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে বোকা বানানো হয়েছে । বাঙালিরা তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে জানত পশ্চিম পাকিস্তানের বিশ্বাসভঙ্গতা ও তাদের স্বার্থান্বেষী মনোভাব ।

 

পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসনের প্রতিবাদ জানাতে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ যে সঙ্গহতি দেখিয়েছেন তা সারা বিশ্বে অতুলনীয় । শিক্ষার্থী , পেশাজীবি , সরকারি চাকরিজীবি সবাই একসাথে অংশগ্রহন করেছে এই প্রতিবাদে । পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম নয় পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার । এটাই কি উপযুক্ত সময় নয় আমেরিকার জনগনের এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করার ? কতজন আমেরিকান জানে যে তাদের রক্ষার্থে যে অস্ত্র সজ্জিত ছিল , আজ সেই অস্ত্র পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র জনগণকে দমনের উদ্দেশ্যে ব্যাবহৃত হচ্ছে ?

পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ চিরকাল মনে রাখবে কয়েক মাস আগের ঘূর্নিঝড়ের পরে আমেরিকার সাহায্য সহযোগিতার কথা । আমেরিকা সাইক্লোনের সময় যে ভাবে তাদেরকে যুক্ত করেছে , জনগনের প্রত্যাশা এখন তারা পাকিস্তানের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এতটা নির্লিপ্ত থাকতে পারে না ।

ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান চিন্তা পাকিস্তানকে প্রতিরক্ষা নয় , তাদের চিন্তার বিষয় পাকিস্তানের জনগণের বৈধ আকাঙ্খা কে দমন করা যায় । পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্লজ্জ ভূমিকা এখন সারা বিশ্বের কাছে ভুল্ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে ।

অত এব আমেরিকার জনগণের আমাদের আকুল আবেদন যাতে তাদের জনপ্রতিনিধি , তাদের কংগ্রেসম্যান রা যাতে ইয়াহিয়া খানের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ি পাকিস্তান কে অস্ত্র সহায়তা না দেয় ।

পূর্ব পাকিস্তানের আজকের অবস্থা আপনাদের গৌরবময় সংগ্রামের সময় থেকে আলাদা ছিল না । ব্রিটিশদের মত আমেরিকা যেমন নির্যাতিত পাকিস্তানও তেমনি পূর্ব পাকিস্তান হাজার মেইল দূরে বসে নির্যাতন করছে । আপনাদের মত আমরাও আমাদের কল্যানের জন্য আমরা খাজনা দেয় । কিন্তু তারা আমাদের কল্যানের ব্যাপারে উদাসীন ।

আপনারা যদি আমাদেরকে সাহায্য না করতে পারেন , অনুরোধ করছি অন্তত  হানাদার পাকিস্তানিদের সাহায্য করবেন না যাতে তারা আমাদের ঔপনিবেশিক শাসন চালিয়ে যেতে না পারে ।

 

                                                                                                              কাজী এস  আহমেদ

                                                                                                               প্রেসিডেন্ট