ইয়াহিয়া খান কর্তৃক ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা

Posted on Posted in 2

<2.111.498-503>

 

প্রিয় দেশবাসী আসসালামুয়ালাইকুম,

আপনাদের সাথে কথা বলার আমার চার মাস অতিবাহিত হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই চার মাস আমাদের সবার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।  এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন সেক্টরে আমরা কি অর্জন করেছি এবং কি  অর্জন করা বাকি রয়েছে – সেসব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত  বিবরণ আমি ঘোষণা করছি।

যা আমি প্রায়ই বলে থাকি, প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে আমি জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে শান্তিপূর্ণভভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। কিন্তু আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই এটি কখনই সরকারের একমাত্র দায়িত্ব হতে পারে না। সরকার আরও অন্যান্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে থাকে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব আমাদের উপর অর্পিত রয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত  এগুলো যথাযথভাবে পালন করার সদিচ্ছা আমাদের আছে।

রাজনৈতিক দলগুলো অনেক বছর থেকেই তাদের চেতনার প্রসার ও কর্মসূচী পালনের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত ছিল এবং সেই জন্য ১৯৭০ সালের ১জানুয়ারিতে সভা-সমাবেশ ও মিছিলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। তখন এই স্বাধীনতার অতি উৎসাহী ব্যবহার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে জনগণ সুশৃঙ্খলতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

ইতিহাসের এই সংকটময় সময়ের সন্ধিক্ষণে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সর্বোচ্চ শাসন গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে উচ্ছৃঙ্খল ও আইন অমান্যকর আচরণের বিস্তৃত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সুতরাং বিচ্ছৃঙখলতা তৈরির ইচ্ছা কঠোরভাবে দমন করা হবে।তা না হলে, যে গণতন্ত্র অর্জনের ইচ্ছা পোষণ করি,তার প্রতি আমাদের উন্নতি সাংঘাতিকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

আমাদের সত্যের মুখোমুখি হতে হবে এবং প্রশংসা করতে হবে যে, পাকিস্তান অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সামান্যতম উত্তেজনা গুরুতর সমস্যার কারণ হতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত যেকোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত মতামত ও তাদের অংশগ্রহণকৃত রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি পাকিস্তানের অখন্ডতা ও মতাদর্শের সাথে সংগতিপূর্ণ থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত সরকার কোনোরকমের  হস্তক্ষেপ করবে না। সকল প্রকার কার্যক্রম দেশের আইনের সীমার মধ্যে অনুষ্ঠিত করার নিশ্চয়তা দেয়ার অধিকার সরকারের রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমি প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করতে চাই, তারা রাজনৈতিক নেতা-কর্মী,শ্রমিক বা ছাত্র হতে পারে,  তারা কোনো কিছু করার ও বলার আগে নিজেদেরকে  দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করে যেন তাদের বক্তৃতা বা কাজ দেশের জন্য কল্যাণকর অথবা পরোক্ষভাবে হলেও দেশের ক্ষতির কারণ হতে পারে কি না। আমি শুধুমাত্র দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে  না,  পররাষ্ট্র বিষয়েও ইঙ্গিত করছি। অন্য দেশের নেতা ও তাঁদের আদর্শ নিয়ে কঠোর মন্তব্য করা কেবলমাত্র অভদ্রতা নয়, আমাদের সাথে সেসব দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাবও পড়ে।

কোন সভ্য সমাজের আইন- শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনের দায় শুধুমাত্র সরকারের উপর বর্তায়না,  জনমত  ও সাধারণ জনগনের নেতাকেও অবশ্যই ভাগ করে নিতে হবে। সুতরাং আমি অবশ্যই দৃঢ়তার সাথে সকল রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে দায়িত্ববোধের সাথে কাজ করার জন্য আহবান জানাই।

তাদের নিজস্ব কর্মসূচি ও মতাদর্শ প্রচারের সময়, তারা কোনোভাবেই যেন অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে একই কাজ করতে বাধ্য না করে, কেননা তা গণতন্ত্রের মূলনীতির বিরুদ্ধে যায় এবং আমাদের সামনে  যে লক্ষ্য স্থাপন করা আছে তার সাথে সাংঘরষিক। কিছু জনসভা ও মিছিল দুর্ভাগ্যবশত সহিংসভাবে বাধাগ্রস্ত হয় যার ফলে কিছু মানুষ আহত হয় ও মৃত্যুবরণ করে।

এরকম সহিংসতা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হতে পারে অথবা সংকীর্ণতার উপর ভিত্তি করে হতে পারে যা গুরুতর প্রতিকূল প্রভাব ফেলতে পারে। আমি আমার এবং আইন-শৃঙখলার সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অবগত আছি। তবে আমি আপনাদের জিজ্ঞেস করতে চাই, সুনির্দিষ্টভাবে আপনাদের মধ্যে  যারা নেতৃত্বের অবস্থানে রয়েছেন,  আপনারা কি আপনাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সমানভাবে অবগত আছেন ? 

সরকার তার অবস্থান বেশ পরিষ্কার করেছে। সরকার  সহিংসতা ও আইন অমান্যকারীকে সহ্য করবে না এবং যারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সহনশীলতাকে সমুন্নত রাখতে চায় তাদের কাছ থেকে সহযোগীতা কাম্য করার অধিকার সরকারের রয়েছে। আমি এই শেষ বাক্যের মাধ্যমে এই প্রসংগ ত্যাগ করবো যে, আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে চাই – আমি একটি দুঃখজনক প্রবণতা লক্ষ করেছি যে, আমাদের কিছু নেতাও অন্যান্য কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার জন্য শক্তিশালী ইচ্ছা পোষণ করে এবং যখন আইন অমান্যকারীরা একবার ধরা পড়ে ও আইনত ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন সেসব মানুষের মুক্তির জন্য কর্কশভাবে চিৎকার শুরু হয় যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার  জন্য প্রাথমিকভাবে তারাই উচ্চ চিৎকার করে দাবি তুলেছিল।

এটা সুনিশ্চিত যে, গ্যালারীতে প্রদর্শনের জন্য এটি করা হয়েছিল। এটি নায্যও না আবার সঠিকও না।   রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু সামান্যতম  কৌশলগত লাভের জন্য এরকম স্বল্প দূরদর্শীসম্পন্ন কাজকর্ম আমাদের দেশের জীবনের সংকটময় সময়ে সমর্থন করা সম্ভব নয়। এখনি সময় আমরা আমাদের নিজেদের প্রতি সৎ হওয়ার। সহিংসতা ও সহিংসতায় উস্কানির প্রতি নিন্দা করার সাহস থাকতে হবে  এবং এমনকি এটি কোন সম্প্রদায় বা অন্যান্য ক্ষেত্রে অজনপ্রিয়তার কারণ হলেও প্রতিবাদ করার সৎ সাহস থাকতে হবে।

আমি আন্তরিকভাবে আশা করি যে, আমাদের রাজনৈতিক নেতারা এই সুযোগে একসাথে কাজ করবে এবং জাতির সামনে আমি যে লক্ষ্য তৈরি করেছি তা অর্জনের জন্য  প্রশাসনকে সম্পূর্ণভাবে সহযোগীতা করবে। 

অবশেষে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর ব্যাপারে কিছু মানুষ যে সন্দেহ তৈরি করেছে তা পরিষ্কার করতে চাই। কথিত আছে যে আমার সরকার কিছু রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করছে। এটি সঠিক নয় এবং আমি আবার আশ্বস্ত করতে চাই যে, নির্বাচনের প্রচারণার ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে এই সরকার নিরপেক্ষ ছিল, আছে এবং থাকবে। সরকার অবশ্য আশা করে যে,  যে কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি পাকিস্তানের মতাদর্শ ও অখণ্ডতার ব্যাপারে কাজ বা বক্তব্য প্রচার করবে না।

গত ২৮ নভেম্বরে জাতির উদ্দেশ্যের ভাষণে আমি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলাম এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রধান নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা  উল্লেখ করেছিলাম।

এটা আমার কাছে অত্যন্ত ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির ব্যাপার যে, আমি যে পরিকল্পনা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিলাম তা উদ্দীপনার সাথে দেশের প্রতিটি অংশের মানুষের দ্বারা  গৃহীত হয়েছিল। এই সত্য আমার ভাবনাটিকে পুনর্নিশ্চিত করেছে যে আমার দেয়া  রূপকল্প জনপ্রিয় ইচ্ছার উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। পরিকল্পনায় উল্লিখিত বিভিন্ন উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যেসব উন্নতি সাধিত হয়েছে সেসব সম্পর্কে আমি  অবহিত করতে চাই। সাধারণ নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়ার ব্যাপারে নিযুক্ত কমিটির একটি ইউনিট  ইতিমধ্যে অ্যাকশান প্লানের  খসড়া চূড়ান্ত করেছে এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিষয়ে তাদের প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন ।

একটি রাষ্ট্রপতির আদেশে সব প্রাসঙ্গিক বিবরণ খুব শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে।

পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিটি নতুন প্রদেশে প্রাদেশিক প্রশাসন শীঘ্রই  প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ১লা জুন, ১৯৭০ এর মধ্যেই পুরোপুরিভাবে কার্যকর হবে যা নতুন অর্থ বছরের সূচনা।

 অতঃপর, পশ্চিম পাকিস্তান প্রাক একক অবস্থানে যত ঘনিষ্ঠভাবে সম্ভব প্রত্যাবর্তন করবে।

নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা পরিকল্পনা মোতাবেক হচ্ছে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার আপনাদের সময়ে সময়ে উন্নয়ন সম্পর্কে অবগত রাখছেন। আমার শেষ ভাষণে উল্লিখিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান না করার দৃশ্যত কোনো বাঁধা দেখছি না।

 

লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার,১৯৭০ চলতি মাসের ৩০ তারিখে প্রকাশিত হবে। এই অর্ডার জাতীয় পরিষদের  সংবিধান তৈরির ক্রিয়াপ্রণালীর মূলভিত্তি  হিসেবে কাজ করবে। আমি এই পর্যায়ে এ অর্ডারের কিছু লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে চাই যা জনগণের ইচ্ছের প্রতি আমার মূল্যায়ন থেকে তৈরি করা হয়েছে।

জাতীয় পরিষদ ৩১৩ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হবে,  ১৩টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। বিভিন্ন প্রদেশের আসন সংখ্যা ১৯৬১ সালের আদমশুমারি যা সরকারের সর্বশেষ অফিশিয়াল রেকর্ড – এর ভিত্তিতে বিন্যাস করা হবে।

প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন এই অর্ডারের দ্বারা অনুষ্ঠিত হবে।

এক পর্যায়ে যখন ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে আমাদের চিন্তা ছিল যে সংবিধান চূড়ান্ত করার পরে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা হবে। এই প্রশ্নটি আমার সরকার কর্তৃক আরও বেশি বিস্তারিত ভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে এবং আমরা এ উপসংহারে উপনিত হয়েছি যে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের পরে অতি শীঘ্রই দেশের স্বার্থে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে।

এর প্রধান কারণ হচ্ছে এটি সংবিধান চূড়ান্ত হওয়ার সাথে সাথে  ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সহজতর করবে। উপরন্তু এটি রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের সংবিধান তৈরির পরপরেই নতুন নির্বাচনী প্রচারণা থেকে মুক্তি দিবে। আমি বিবেচনা করি যে, একবার সাংবিধানিক বিষয়গুলো নিষ্পত্তি হওয়ার পর আমাদের নেতারা ভোটভিক্ষার রাজনীতি  না করে নিজেদেরকে প্রধান জাতি-গঠনমূলক কাজে নিয়োজিত করবে।

সকল বিষয় বিবেচনা করে আমি এই সিধান্ত নিয়েছি যে, ২২ অক্টোবর, ১৯৭০ এর মধ্যেই প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যদিও  প্রাদেশিক পরিষদ আমার দ্বারা সংবিধান প্রণীত ও নিরীক্ষণের পরে যখন যথাযথভাবে সমনের মাধ্যমে কাজ শুরু করবে।

লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক  অর্ডার, ১৯৭০ প্রকাশিত হলে লক্ষ করবেন যে কার্যপ্রণালী বিধির সময়সূচীতে জাতীয় পরিষদের ভোটিং পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। এটি এমন একটি ব্যাপার যা পরিষদের দ্বারাই সমাধান হওয়া শ্রেয় এবং আমার আন্তরিক আশা যে এ ব্যাপারে খুব বেশি মতানৈক্য হবে না। এই বিষয়ে সর্বসম্মতিই হবে সবচেয়ে ভালো এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে শতাংশের ভিত্তিতে এ বিষয়ের উপর কথা বলতে চাই না।

আমি আগে যা বলেছি এবং আমি আবার বলছি একটি সংবিধান আইনসমূহের একটি সাধারণ টুকরা নয়, কিন্তু একসাথে থাকার চুক্তি। সুতরাং এটি অপরিহার্য যে, ভোটিং পদ্ধতি যা আইনসভা থেকে প্রকাশিত হতে পারে তা নিয়ে সকল অঞ্চলকে যুক্তিসংগতভাবে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। কারণ তারা সন্তুষ্ট না হলে বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রদেশে সত্যিকার ও আসলভাবে সংবিধান যে  দলিল হিসেবে  গ্রহণযোগ্যতা পাবার দরকার তা পারবে না। আমি নিশ্চিত যে কোন উপযুক্ত ব্যবস্থায় পৌঁছানো সম্ভব। লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক শুধুমাত্র কিভাবে পরিষদ গঠিত হবে, তার শক্তি কি হবে ও পরিষদ গঠনের জন্য অন্যান্য বিষয়ের ব্যাপারগুলো নির্দেশ করে না, এটি পাকিস্তানের সংবিধানের মৌলিক নীতিমালারও ভিত্তি গঠন করে। বেশিরভাগ মূলনীতিগুলো পূর্বেকার সংবিধানের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, কিন্তু আমি চিন্তা করেছি যে অর্ডারে কিছু হাইলাইট করা জরুরি  যাতে আইনসভার তৈরিকৃত সংবিধান সমগ্র পাকিস্তানের জনগণের কাছে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণযোগ্যতা পায়।

প্রথমত,   অর্ডারটি পাকিস্তানের সংবিধানে ইসলামিক আদর্শ সংরক্ষণ করার ভিত্তি স্থাপন করে যা আমরা সবাই জানি  পাকিস্তান সৃষ্টির মূলভিত্তি ছিল।

দ্বিতীয়ত, সংবিধানটিকে পাকিস্তানের স্বাধীনতা, অখন্ডতা ও পাকিস্তানের জাতীয় সংহিত অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এসব উদ্দেশ্য অর্জন করার জন্য লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারে বলা হয়েছে যে, যেসব অঞ্চল এখন ও ভবিষ্যতে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হবে সেসব অঞ্চল ফেডারেল ইউনিয়নের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে যা পাকিস্তান রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করবে যার নাম হবে ইসলামিক  রিপাবলিক অফ পাকিস্তান বা পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্র।

ভবিষ্যৎ সংবিধানের তৃতীয় মূলনীতি হল এটিকে অবশ্যই গণতান্ত্রিক হতে হবে যার মধ্যে জনসংখ্যা ও সরাসরি প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অবাধ ও মেয়াদী নির্বাচনের মত গণতান্ত্রিক উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকবে।  উপরন্তু সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নাগরিকদের মৌলিক অধিকার অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক।

নতুন সংবিধানের চতুর্থ মূলনীতি হচ্ছে এটি অবশ্যই সত্যিকারের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হতে হবে যেখানে  বিধানিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাগুলো ফেডারেল সরকার ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বন্টিত হবে যেন প্রদেশগুলো সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। বলতে গেলে প্রদেশগুলোর সর্বোচ্চ  বিধানিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা থাকবে এবং  বহিরাগত ও  অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ফেডারেল সরকারের যথেষ্ট  বিধানিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা থাকবে।

সংবিধানের পঞ্চম নীতি হল এটা জাতীয় বিষয়াবলীতে অংশগ্রহণের জন্য পাকিস্তানের সকল অঞ্চলের মানুষকে পূর্ণ সুযোগ প্রদান করে যাতে তারা সমান অধিকার ও সম্মানজনক অংশীদাররূপে একসংগে বসবাস করতে পারেন এবং সবাই একীভূত হয়ে  শক্তিশালী জাতি গঠন করবে-যা  আমাদের জাতির পিতা কায়েদ-ই-আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দেখেছিলেন।

 

তাই লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারে পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণকে জাতীয় কর্মকান্ডের সকল শাখায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়া এবং এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশগুলোর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশেষ অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরোধ মেটানোর জন্য বিধিবদ্ধ-বিধানের ব্যবস্থা করা রয়েছে।

 

অর্থনৈতিক উন্নয়নের বৈষম্যের ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে তা আমাদের উঠতি জাতীয়তাবাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং আমাদের মনোযোগ ও শক্তি খরচ করে এই ধরনের অসন্তোষের কারণ দূর করার প্রতি মনোনিবেশ করতে হবে।

আমি আশা করি আপনারা আমার সাথে একমত হবেন যে, ভবিষ্যতে যখন  প্রত্যেক অঞ্চলের জাতীয় সরকারের লোকজন জাতীয় ব্যাপারে কাজ করার সম্পূর্ণ সুযোগ পাবে, তখন পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও ঐক্য অবশ্যই রক্ষা করতে হবে এবং সংকীর্ণতা ও আঞ্চলিক কারণে এর উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে দেয়া যাবে না।

পাকিস্তান এই উপমহাদেশে মুসলমানদের জন্য স্বদেশ হবে – এই ধারণার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি লক্ষাধিক মুসলমানের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত হয়। আমরা তাদের বিসর্জন বৃথা যেতে দিতে পারি না। কায়েদ-ই-আজম বলেন, যে পাকিস্তান এসেছে তা যেকোনো মূল্যে সমুন্নত রাখতে হবে। এটি এমন একটি অনুমান যেতা নিয়ে কখনই বিতর্ক হতে পারে না।

 

পরবর্তী বিষয়ে যাওয়ার আগে একটি ভয়ের ব্যাপারে মন্তব্য করতে চাই যা বিশেষ মহলে বলা হচ্ছে যে, জাতীয় পরিষদ ১২০ দিনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান তৈরি করতে পারবে না। আমি এই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে সম্পূর্ণ মতানৈক্য প্রকাশ করি। আমি বিশ্বাস করি যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজটি শেষ করতে জাতীয় পরিষদের কোনো অসুবিধা হবে না এবং যে পরিমাণ ইচ্ছা ও উদ্দীপনা রয়েছে তাতে দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে জাতির আশা করার অধিকার রয়েছে ।

 

আমরা সবাই জানি যে, সদস্যরা পূর্ববর্তী সংবিধানের আকারে তাদের বিবেচনার জন্য দুই বা তিনটি ড্রাফট উপলব্ধ থাকবে। তাই এটি এটা নয় যে, পরিষদকে গোড়া থেকে শুরু করতে হবে।

প্রস্তাবনার মৌলিক বিষয়, নির্দেশমূলক নীতি ও অন্যান্য বিষয়াদি পূর্বের সংবিধানে করা হয়েছে এবং এর বেশিরভাগ অংশের ব্যবহার এখনও অব্যাহত রয়েছে। আমি আরও যোগ করতে চাই যে আমি পরিষদের কাজ সহজতর ও গতি বাড়াতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি।প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার প্রাপ্ত জনসংখ্যার ভিত্তিতে এক ইউনিট বিভাজন ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। পদ্ধতিগত দিকে, লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারে একটি সম্পূর্ণ আইনি কাঠামো কর্মপরিকল্পনা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এটা এই পটভূমির বিরুদ্ধে ছিল যে  আমার সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংবিধান প্রণয়নের একটি যুক্তিসঙ্গত সময় নির্ধারণ করেছিল এবং আমরা মনে করি ১২০ দিন যথেষ্ট পর্যাপ্ত সময়।

সবার শেষে আমার প্রিয় দেশবাসী আবার বলতে চাই যে আমি এবং আমার সরকার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ।আমার খুব কমই বলা প্রয়োজন যে  এই উদ্দেশ্য  অর্জনের জন্য আমরা আপনাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে পরিপূর্ণ সহযোগীতা ও অটল সমর্থন আশা করি। আপনাদের সমর্থন ও সহযোগীতা ছাড়া আমাদের কাজ সীমাহীনরূপে কঠিন হয়ে যাবে।

আমাদের মানুষ অত্যন্ত দেশপ্রেমিক। তাই তারা পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাত বাদে বেশিরভাগ জিনিস সহ্য করবে। কেউ যদি মনে করে আমাদের ঐক্য ধ্বংস করবে তাহলে সে বড় বেশি ভুল করবে। জনগণ এর জন্য পাশে দাঁড়াবে না।

 আমি আগেই বলেছি প্রত্যেকেরই দেশের সাংবিধানিক, রাজনৈতিক,  অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান দেয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের জনগণের সংহতির উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে এমন কোনো সমাধানের বিরোধিতা করার অধিকার কারো নেই। জাতি হিসেবে পাকিস্তানেত উপর যেকোনো আক্রমণে আমরা নীরব দর্শক হয়ে থাকবো না।

দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ পদমর্যাদার অধিকারীদের সাহস ও দেশপ্রেম ছাড়া বড় পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। দেশ একটি এমন একটি ধাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে ব্যক্তিগত ও অন্যান্য কারণগুলো সবচেয়ে বড় কারণ – পাকিস্তানের কারণে বিসর্জন দিতে হবে।

আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্’র রহমতে আমরা আমাদের বর্তমান সমস্যাগুলোর সমাধান করবো।

আল্লাহ্ আপনাদের সকলের মঙ্গল করুক, পাকিস্তান জিন্দাবাদ।