ইয়াহিয়া সরকারের শিক্ষানীতি ও বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনের সমালোচনা করে ছাত্রসমাজের বক্তব্য

Posted on Posted in 2

<02.102.468-469>

 

 

শিরোনাম- ইয়াহিয়া সরকারের শিক্ষানীতি এবং বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনের সমালোচনা করে ছাত্রসমাজের বক্তব্য

সূত্র- ছাত্রসমাজ ( তিনটি বৃহৎ সংগঠন)

তারিখ – আগষ্ট (১৯৬৯)

 

শিক্ষানীতির নামে প্রতিক্রিয়াশীলদের মিথ্যা অপপ্রচার সম্পর্কে ছাত্রসমাজের আবেদন

দ্বিতীয় সামরিক সরকার কর্তৃক প্রস্তাবিত খসড়া শিক্ষানীতি পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ছাত্রসমাজ সমর্থন করিতে পারেনাই । সামরিক সরকারের প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ছাত্রসমাজ সমর্থন করিতে পারেনাই । সামরিক সরকারের প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির সমর্থক ইসলামী ছাত্রসংঘ নামক একটি তথাকথিত ছাত্র প্রতিষ্ঠান ও তাহাদের মুরব্বী জামাতে ইসলাম নামক একটি তথাকথিত ছাত্র প্রতিষ্ঠান এই কারনে ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিয়াছে এবং অযথা “ ইসলাম বিপন্ন” প্রভৃতি শ্লোগান তুলিয়া আইয়ূব- মোনায়েম আমলের মতই পুরাতন কায়দায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও ছাত্রসমাজের বিরুদ্ধে বল্গাহীন অপপ্রচার চালাইতে শুরু করিয়াছেন । এই সকল গোষ্ঠী প্রকাশ্যভাবে উস্কানিমূলক নগ্ন প্রচারণাও চালাইতেছেন এবং জনগনের মধ্যে ধর্মভিত্তিক বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টাও করিতেছেন শিক্ষানীতিকে কেন্দ্র করিয়া ইহাদের সাম্প্রতিক কার্যকলাপ দেশে বর্তমানে বিরাজমান শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে নস্যাৎ করিবার অপচেষ্টা ব্যতীত আর কিছুই নয় । এবং ইহার অর্থ হইতেছে নির্বাচন এবং ১১ দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র প্রভৃতি সম্পর্কে গণতান্ত্রিক মহল ও দেশবাসীর দাবীসমূহ নস্যাৎ করিবার সুযোগ আরো সম্প্রসারিত করা । প্রকৃতপক্ষে বিগত গণঅভ্যুত্থানের সময় হইতেই জামাতে ইসলাম , ইসলামী ছাত্রসংঘ প্রভৃতি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীগুলি পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন , এক ইউনিট বাতিল , পূর্ণ গনতন্ত্র কায়েম ও ছাত্র , শ্রমিক , কৃষক মধ্যবিত্তদের ন্যায্য দাবীসমূহ তথা ১১ দফার বিরোধিতা করিয়াছে । এরই পরিপ্রেক্ষিতেই এই সকল গোষ্ঠী বর্তমান সরকারের প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করিয়া শিক্ষানীতি মতামত প্রদানকারী তথা গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল মহলের বিরুদ্ধে  মিথ্যা অপপ্রচার চালাইতেছে । তাহাদের এই সকল প্রচারণার জন্য দেশের মসজিদসমূহকে তাহারা ব্যবহার করিতেছে । পবিত্র মসজিদকে ইহারা নিজেদের গণবিরোধী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তাহাদের রাজনৈতিক আখড়ায় পরিণত করিয়াছে ।

সকলেই এ কথা জানেন যে , সরকার প্রস্তাবিত খসড়া শিক্ষানীতি সম্পর্কে খোলাখুলি মতামত প্রদানের আহবান জানান । এই অভিমত লিখিতভাবে সরকারের নিকট পেশ করা হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (…) উদ্যোগে বিগত ১২ আগস্ট শিক্ষানীতির উপর একটি আলোচনা সভা (সেমিনার) আহবান করা হয় । এই আলোচনা সভায় যখন ‘ভাষা’ বিষয়ে আলোচনা হইতেছিল , সে সময় ইসলামী ছাত্রসংঘের কতিপয় সদস্য আকস্মিকভাবে গোলযোগ শুরু করে এবং বক্তা ও শ্রোতাদের আক্রমন করে । ফলে সাধারন ছাত্র উদ্যোক্তাদের কেহ আহত হয় । সকলে আলোচনা গৃহ হইতে বাহির হইয়া আসিতে বাধ্য হয় । কিন্তু ইহাতেও ইসলামী ছাত্রসংঘের আক্রমন বন্ধ হয়না । ফলে অনিবারযভাবে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয় । এই সংঘর্ষের অনিবার্য পরিনতি হিসাবে আব্দুল মালেকের জীবনাবসান ঘটে । আমরা মালেকের অকালমৃত্যুতে গভীর  শোক প্রকাশ করিয়াছি এবং শান্তিপূর্ণ আলচনাসভায় গুন্ডাবাজির পশ্চাতে যে একটি সুপরিকল্পিত উদ্দেশ্য রহিয়াছে উহাও উন্মোচন করা প্রয়োজন  মনে করি ।

ইসলামী ছাত্রসংঘ প্রচার করিয়াছে যে , সেমিনারে ইসলাম বিরোধী ভাষন দেয়া হইতেছিল এবং তাদের বক্তৃতাদানের অধিকার দেওয়া হয়নাই । তাহাদের এই প্রচারনা সর্বৈব মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ।

 

প্রকৃত ঘটনা হইল এই যে , পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি জনাব শামসুদ্দোহা যখন খসড়া শিক্ষানীতির বিভিন্ন ত্রুটি বিচ্যুতি চুলচেরা বিশ্লেষন করিয়া ভাষার বিষয়ে বক্তৃতা করিতেছিলাম সে সময়ই তাহারা আক্রমন করিয়া বসে । সেমিনারে বক্তৃতা করিবার জন্য সেমিনারের সভাপতি জনাব তোফায়েল আহমদর অনুমতি চাহিয়া তাহারা নিরাশ হইয়াছে এইরুপ কোন ঘটনা ঘটেনাই । এই সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রসমূহে এমনকি প্রেস ট্রাস্টের পত্রিকাসমূহেও প্রকাশিত হইয়াছে । প্রকৃতপক্ষে গোলযোগ সৃষ্টিকারী ও আক্রমণকারীগণ আত্মপক্ষ সমর্থন ও বালির বাঁধের পশ্চাতে আত্মরক্ষার জন্যই ইসলাম বিপন্ন ও সেমিনারে বক্তৃতা দানের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন উত্থাপন করিয়াছেন । কিন্তু অন্যদের বক্তৃতার সময় লাঠি ও অন্যান্য অস্ত্র দ্বারা আক্রমন করিতে তাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয়নাই । সেমিনারের ঘটনাবলী প্রমান করে যে খসড়া শিক্ষানীতির বিরোধীতা করিবার ফলেই ইসলামী ছাত্রসংঘ তাহাদের রাজনৈতিক মুরব্বীগন গণতান্ত্রিক ছাত্রসমাজের উপর ক্ষিপ্ত হইয়াছে ।

ইহা বর্তমানে সকলেরই জানা আছে যে , পূর্ব  পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ছাত্র সমাজ কেন খসড়া শিক্ষানীতির বিরোধিতা করিতেছে । আমরা মনে করি যে , প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি আমাদের আশা আকাঙ্খার অনুরূপ হয়নাই । এই শিক্ষানীতি কার্যকরী করা হইলে শিক্ষাক্ষেত্রে সংকট বৃদ্ধি পাবে । বর্তমানে যে বৈষম্য রহিয়াছে তা  আরো বৃদ্ধি পাবে । শিক্ষানীতি সম্পর্কে আমাদের অভিমত পত্রিকাসমূহে প্রকাশিত হইয়াছে , ‘ইসলাম’ ও ‘পাকিস্তানের সংহতি’র বিরোধিতা করার জন্যই আমরা শিক্ষানীতির বিরোধিতা করিতেছি ইহা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রচার বরং আমাদের দাবী হইল দেশের সংহতি রক্ষা ও সেজন্য সকল ভাষাভাষি জাতীয়সমূহের জাতিয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে স্বীকারের মাধ্যমে জাতিগত শোষন ও নিপীড়ন বন্ধ করা । ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির অর্থ ইসলাম বিরোধিতা নয় , বরং সকল ধর্মাবলম্বীর ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করা ও প্রয়োজনমত ধর্মীয় শিক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও চালু রাখা । কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠি এই সকল বক্তব্য ইচ্ছাকৃতভাবেই ইসলাম বিরোধী হিসাবে মিথ্যা প্রচার করিতেছে । ইহার উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট ।

এই পরিস্থিতিতে আমরা দেশের ছাত্রসমাজ, শিক্ষক, অভিভাবকমণ্ডলী , গণতান্ত্রিক মহল ও সর্বোপরি শ্রমিক , কৃষক মধ্যবিত্ত তথা আপামর জনগণের নিকট আবেদন জানাইতেছি যে , প্রতিক্রিয়াশীলদের উদ্দেশ্যপুর্ণ প্রচারণা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিহত করিতে আগাইয়া আসুন । ছাত্র , শ্রমিক , কৃষক মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবিদের গণতান্ত্রিক ঐক্য প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর সকল চক্রান্ত ব্যর্থ করিবে ইহাতে কোন সন্দেহ নাই । অতীতের অভিজ্ঞতাই ইহার প্রমাণ । কিন্তু বর্তমানে সকলকে সতর্ক ও হূশিয়ার থাকিবার জন্য আমরা আহবান জানাইতেছি ।

শামসুদ্দোহা (সভাপতি, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন)                              

তোফায়েল আহমদ (সভাপতি, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগ)

মোস্তফা জামাল হায়দার (সভাপতি,পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন)                              

নুরুল ইসলাম (সাধারন সম্পাদক,পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন)                              

আঃসঃমঃ আব্দুর রব ( সাধারন সম্পাদক, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগ )

মাহবুবুল্লাহ ( সাধারনব সম্পাদক, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন)