উপমহাদেশীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে কমন্স সভায় পররাষ্ট্র সচিবের মন্তব্য

Posted on Posted in 13
শিরোনামসূত্রতারিখ
উপমহাদেশীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে কমনস সভায় পররাষ্ট্র সচিবের মন্তব্যকমনস সভার কার্যবিবরণী৪ ডিসেম্বর ১৯৭১

 

ব্রিটিশ হাউয অভ কমনস-এ যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়ক সচিব, স্যার অ্যালেক ডগলাস-হোম এর বিবৃতি

নভেম্বর ৪, ১৯৭১

 

ভারতীয় উপমহাদেশ প্রসঙ্গে, কমনওয়েলথ এর সদস্য বৃহৎ দু’টি দেশ, যাদের সাথে বন্ধুত্বকে আমরা মূল্যবান মনে করি, বর্তমানে যেন কোনো এক গ্রিক ট্রাজেডির মত, তাদের নিজেদেরকে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কুণ্ডলির দিকে ধাবিত হতে দেখছে যাতে কীনা যুদ্ধের ঝুঁকিও বিদ্যমান। মানুষের দুর্দশা, যা কীনা এখানে ব্যাপক মাত্রায় বিদ্যমান, স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে মানব সভ্যতার এই শিক্ষা লাভে ব্যর্থতার কথা যে, মানুষ রাজনীতির চেয়ে বরং খাদ্য চায়, এবং যুদ্ধের চেয়ে শান্তি চায়। গত সপ্তাহে মিসেস গান্ধী যখন লন্ডনে ছিলেন তখন তাঁর সাথে প্রধানমন্ত্রী এবং আমার আলোচনা হয়েছে। আমি আশা করি যে হাউয বুঝবে যে, যে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি তা গোপনীয় এবং আমি সে আলোচনার পূর্ণ বিবরণ পেশ করতে অপারগ। এ বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের মনোভাব সম্পর্কেও আমাদের অবগত রাখা হয়েছে।

ভারতে শরণার্থীরদের বন্যার দ্বারা সৃষ্ট এই জরুরী অবস্থায়, আমাদের বুঝতে হবে এই পরিস্থিতিটি বিভিন্নভাবে ভারতের জীবনযাত্রায় যে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে তাকে, যা সরকারের এ সংক্রান্ত নীতিকে দু’টি লক্ষ্য অভিমুখে পরিচালিত করেছে। প্রথমত, দুর্দশা, যা মর্মান্তিক এবং ব্যাপক, তা লাঘবের চেষ্টা। আমরা ১৫ মিলিয়ন পাউন্ড সহযোগিতা পাঠিয়েছি ভারতে শরণার্থীদের এবং ২ মিলিয়ন পাউন্ড পাঠিয়েছি পূর্ব পাকিস্তানে। এটি করার পর, আমি মনে করি যে আমরা অন্য দেশগুলোকেও আহ্বান জানাতে পারি এই পর্যন্ত যতটুকু তারা করেছেন তার চেয়ে আরও ব্যাপকভাবে আমাদের সাথে মানবিক উদ্যোগে অংশগ্রহণের জন্য।

দ্বিতীয় হচ্ছে এই পরিস্থিতির রাজনীতি। এই দু’টি রাষ্ট্রের যুদ্ধের মতো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বিপদটি গুরুতর এবং বাস্তব।এই পরিস্থিতিতে, আমাদের প্রথম দায়িত্ব আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সকলের সংযম কামনা করা। আমি অব্যাহতভাবে আমার দৃষ্টিভঙ্গী ব্যক্ত করেছি যে, উত্তেজনা প্রশমন এবং শরণার্থী প্রত্যাবর্তনে সত্যিকারের উন্নয়ন তখনি আসবে যখন অখণ্ড পাকিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে।

কিন্তু এটা বলে আমাকে এটাও যোগ করতে হবে যে, পাকিস্তানিরা ছাড়া অন্য কেউ পাকিস্তানের ভবিষ্যতের জন্য সাংবিধানিক আদর্শ কি হবে তা নির্ধারণ করতে পারবে না। পাকিস্তানিদের দ্বারা নির্ধারিত না হলে কোনো সমাধানই টিকবে না।

গৃহযুদ্ধের দুর্বিপাকের পর, ঐক্য ফিরিয়ে আনা দুষ্কর। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান একজন বেসামরিক গভর্নর নিযুক্ত করেছেন। তিনি ডিসেম্বরে উপনির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছেন, এবং ২৭ ডিসেম্বরকে ঘোষণা দিয়েছেন নতুন জাতীয় সংসদের বৈঠক এর তারিখ হিসেবে। তিনি সাধারণ ক্ষমার ব্যবস্থা করেছেন। ভারত থেকে ফেরত আসা শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের অভ্যর্থনা কেন্দ্র তিনি মেনে নিয়েছেন। আমি তথ্য হিসেবে এগুলো ঘোষণা করছি। শরণার্থীরা ভারত থেকে পাকিস্তানে ফেরত আসার মত পরিস্থিতি তৈরিতে এই পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট হবে কীনা তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না। কিন্তু এরকম একটি সমাপ্তি টানার জন্য আমাদের সকলকে কাজ করে যেতে হবে। শরণার্থীদের ফেরত যাওয়া ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। আপাতত আমরা পাকিস্তান ও ভারত উভয়কে আহ্বান জানাতে থাকবো উপমহাদেশের শান্তির প্রতি হুমকি সৃষ্টি করে এমন যেকোনো পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকতে। ইতোমধ্যে বিদ্যমান দুর্বিপাকের সাথে যুদ্ধ যুক্ত করা হবে চূড়ান্ত দুর্যোগ।

পরিস্থিতির উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাকিস্তান দিয়েছে। তার মধ্যে প্রথম হলো সীমান্তে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার। দ্বিতীয় হলো, ঘটনাস্থলে জাতিসংঘের প্রতিনিধি গ্রহণের সদিচ্ছা প্রকাশ, প্রথমত, পর্যবেক্ষণের জন্য, এবং দ্বিতীয়ত, ফেরত আসা শরণার্থীদের গ্রহণ এবং তাদেরকে তাদের বাসস্থান পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার জন্য। আমি নিশ্চিত নই এই বিষয়টি ভারতে অবস্থানরত শরণার্থীরা বুঝতে পারছে কীনা। কিন্তু, ভারত মনে করে এই ধরণের যে পদক্ষেপগুলো আমি উল্লেখ করেছি তা ততক্ষণ পর্যন্ত কার্যকর হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীর ধারা অব্যাহত আছে। পাকিস্তান থেকে কী পরিমাণ শরণার্থী এখনও ভারতে প্রবেশ করছে সে সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে। আমি জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে জানতে চেয়েছি, এ বিষয়ে সত্যটি তিনি উদ্ঘাটন করতে পারবেন কীনা, কারণ, এই পর্যায়ে অন্য রাষ্ট্রগুলো কোনো সুসংহত কৌশল উদ্ভাবনের পূর্বে এটি জানা জরুরী যে এই স্রোত বন্ধ হয়েছে না কি চালু আছে।

আরও একবার বলছি, এখানে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলো পশ্চিম পাকিস্তান এর শাসক গোষ্ঠী এবং পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম এমন পক্ষের মধ্যে আলোচনা, এবং ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেও আলোচনা।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনা সংঘটনে আমাদের যদি কিছু করার থাকে আমরা তা আনন্দের সাথে করবো।