এখন অনেক কাজ

Posted on Posted in 5
এখন অনেক কাজ

২২ ডিসেম্বর, ১০৭১

বাংলাদেশ এখন মুক্ত, কিন্তু আসলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এই সবে শুরু। মুক্ত বাংলার আকাশে নতুন সূর্যের প্রভাতী আবিরে সদ্য স্নান করে উঠেছি আমরা একটা জাতি। তাই নতুন জাতির জন্ম হোল-এখনই না বলে-একটি বাস্তব সত্য মিথ্যার কারামুক্ত হোল একথাই ঠিক। সত্য বনাম মিথ্যার চূড়ান্ত এই মুখোমুখি সংঘর্ষে পতন হয়েছে মিথ্যার, কিন্তু এ রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে সত্যও হয়েছে মারাত্মক ক্ষতবিক্ষত। সে জন্যেই এখন বিজয়ের উল্লাসে বুদ হয়ে আমাদের খুখীর তুফানে ভেসে যাওয়া চলবে না। এখন অনেক কাজ।

কারামুক্ত হলেই মুক্তি নয়, মুক্তির জন্য দরকার বেশুমার ত্যাগের-অনাবিল একতার। দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে আমরা শোষিত, ধর্মের নামে ভণ্ডের অত্যাচারে জর্জরিত। আমাদের আকাশে এখন নতুন সূর্য- কিন্তু মাটিতে ২৪ বছরের ভাগাড়ের ধ্বংসাবশেষ। শকুনেরা চব্বিশ বছর ধরে- আমাদের মরা আত্মাকে নখ দিয়ে ছিঁড়েছে, গায়ের

জোরে এই ভাগাড়েই কামড়াকামড়ি করেছে একে অন্যে। এই চব্বিশ বছরের নৃশংস ভাগাড়কে, শকুনের উচ্ছিষ্ট এই হাড়গোড়ের পাহাড়কে অপসারণ করে যদি সজীব করতে পারি তাহলে হবে আমাদের সত্যিকারের মুক্তি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- “জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক।” নজরুল বলেছেন, “সজীব করিব মহাশ্মশান”। এই শপথই আমাদের সত্যিকারের মুক্তির শপথ।

আমাদের অনেক ক্ষত-জাতায় দেহ আজ ক্ষত ত। এই মুক্তির প্রভাতে আমরা হয়তো মনের ক্ষতই উপলব্ধি করছি গভীরভাবে ।

আমাদের এখনই ফিরে যেতে হবে ১৯৫২-র সেই ভাষা আন্দোলনে, আমাদের এখনই ফিরে যেতে হবে ১৯৪৮-এর মোহাম্মদ আলী জিন্না সেই সমাবর্তন বক্তৃতায়, সে বক্তৃতায় জিন্না বলেছিলেন,- “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হবে।”

আমাদের মনে রাখতে হবে ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ বরকত, সালামের মায়ের কথা- আজকের খসরু ড্রাইভারের মায়ের মতই। এ স্বাধীনতাকে তাদেরও ভাগ আছে সমান সমান। স্বাধীনতার প্রত্যেকটি শহীদকে আমাদের জানতে হবে। এ যুগের দধীচির মতই। এবং সেখান থেকে শুরু করতে হবে এই নতুন জাতির পুনর্গঠন।

শত্রুরা আমাদের অর্থনীতিকে যেনম তছনছ করেছে তেমন তছনছ করেছে সংস্কৃতি ও জাতীয় সম্রমকে। একটা জাতির বিকাশে অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা যেমন বাধ্যস্বরূপ, তেমনই সমান প্রতিবন্ধক হল সাংস্কৃতিক সংকট। আমাদের সামনে এখন দুটোরই সংকট অতিমাত্রায়। জাতির অর্থভাণ্ডার আজু মুক্তির উষালগ্নে যেমনই শূন্য, সংস্কৃতিও একইভাবে শূন্য। শত্রুরা জাতীয় তহবিলের অর্থের মতোই শেষবেলায় রাইফেল দিয়ে লুটিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিজীবী তথা শিল্পী গোষ্ঠীকে।

সব খুইয়ে মুক্তি পেয়েছি বলে আমাদের হতাশায় ভেঙ্গে পড়া ভুল- শূন্যতা আমাদেরই পূর্ণ করতে হবে। মোড়লী করেছে এতকাল। আমাদের মাটিতে ফসল ফলে- আমাদের ভেতর থেকেই এসছিলেন জাতীয় সংস্কৃতিক বা বুদ্ধিজীবীরা। সুরের ইন্দ্রজাল বা মধুকণ্ঠ আমাদেরই ঘরের ফসল। তাই শূন্য দেখে ভেঙ্গে যাওয়া মানেই পূর্ণতার পথে কাটা দেওয়া। শত্রু র শিবিরে নির্যাতিতা বোনদের দেখে আমাদের শিউরে ওঠার প্রয়োজন নেই। তাদের সামনে আমরা মুখ তুলেই দাঁড়াবো। আমাদের ছেলেরাই দেবে তাদের এই চরম ত্যাগের বখশীস। তাদের ত্যাগের মর্যাদা দিতে যদি আমরা না পারি তাহলে অসংখ্য-শহীদকেও আমরা অপমানিত করবো- কারণ শহীদের আত্মার সঙ্গে এই নির্যাতিত আত্মার যোগ খুবই নিবিড়।

আমরা জীবন দিয়েই নতুন জীবন লাভ করেছি। ত্যাগের মধ্যে দিয়ে এসেছে আমাদের এই মুক্তির প্রভাত, তাই সেই ত্যাগ দিয়েই এই মুক্তিকে আমাদের বরণ করতে হবে- ভোগ দিয়ে শুরু করে নয়। আমরাই প্রমাণ করেছি- ভোগের জগৎ মিথ্যা এবং মিথ্যা বলেই আজ চব্বিশ বছর পরে ভোগের চিরনিবৃত্তি হোল।

আজ নতুন দিনের এই প্রভাতবেলায় আমাদের আরো ত্যাগের জন্য শপথ নিতে হবে। কারণ, কোন মতেই আবার যেন আমাদের এই মুক্ত আকাশ কালো মেঘে না ঢেকে যায়, কোনোমতেই যেন আজকের এই মুক্ত বাতাস আবার বিষিয়ে না যায়।

অর্থ নাই- তাতে কী? আমাদের মাটিতে সোনা ফলে। যে সোনার বাংলাকে কবি ভালবেসে গেছেন, কবি যে বাংলার মুখ দেখে আশান্বিত হয়েছেন- সে বাংলাকে আমরা সাড়ে সাত কোটি বাঙলী আবার ভরিয়ে তুলতে পারবো।

শকুনেরা চলে গেছে, ফেলে গছে অজস্র হাড়গোড়। তাই আমরা এখনও মুক্ত নই, শকুনমুক্ত মাত্র। এই জন্যেই আনন্দ মিছিলে আমাদের উল্লাস করার মত সময় নেই- এখন ত্যাগের মুহুর্ত। ঝটিকাবিধ্বস্ত জাতির ভাঙ্গা কাঠামোকে পূর্ণ উদ্যম গড়ে তোলার কাজে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে আমাদেরই। মনে রাখতে হবে, ব্যথা আমাদের এবং তা আমাদেরই দেহে। তাই এখন শুধু উল্লাস নয়, এখন অনেক কাজ।

(হাফেজ আলি রচিত)