ওয়ার্ল্ড প্রেস রিভিউ অন বাংলাদেশ

Posted on Posted in 5
শিরোনামসূত্রতারিখ
২১। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

প্রচারিত ইংরেজী অনুষ্ঠানঃ ওয়ার্ড

প্রেস রিভিউ অন বাংলাদেশ

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দলিলপত্রজুলাই-ডিসেম্বর, ১৯৭১

২৫ জুলাই, ১৯৭১

পূর্ব বাংলার জনগণকে দমন করে রাখার জন্য সহিংসতা ও হত্যার যে নীতি ইসলামাবাদভিত্তিক সামরিক শাসকরা বেছে গ্রহণ করেছিল, সেটি উল্টো তাদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শান্তিপূর্ণ সমঝোতার পথ পরিহার করে, বন্দুকধারী পশ্চিম পাকিস্তানি জেনারেলরা নিরীহস্বভাবের, পরিশীলিত এবং শান্তিপ্রিয় পূর্ব বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কেন? কারণ, দশকব্যাপী পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাতান্ত্রিক এবং আমলাতান্ত্রিক শাসকদের হাতে চলতে থাকা ঔপনিবেশিক শোষণের সমাপ্তি ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে জনগণ নিজেদের প্রদেশ তাদের ইচ্ছানুযায়ী চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পূর্ব বাংলার মিলিটারি গভর্নর, জেনারেল টিক্কা খান বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন, তিনি ছয় দিনে বাংলাদেশের জনগণকে দমন করবেন। সে ছয়টি দিন শেষ হয়ে আরও ৩ মাস পেরিয়ে গিয়েছে, জনগণকে দাবিয়ে রাখা যায় নি। ইসলামাবাদের ‘সাহসী’ জেনারেলরা যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সেটি শুধুমাত্র সশস্ত্র বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধেই ছিল না, তা ছিল সমগ্র পূর্ব বাংলার জনগণের বিরুদ্ধে। নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে নিরস্ত্র বেসামরিক জনতার ওপর চালানো বর্বরতা সারা বিশ্বের কাছে প্রকাশিত হয়েছে, সামরিক জান্তার তৈরি করা ধূম্রজাল পুরোপুরি উবে গেছে। এখন সবাই জানে কীভাবে লক্ষাধিক শরণার্থী বাস্তুহারা হয়েছে। তারপরেও, বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা রয়েছে বলে পাকিস্তানি প্রচারমাধ্যমের বারবার উল্লেখ করা এটাই দেখায় যে ইসলামাবাদ এখনও সারা বিশ্বকে এবং বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণকে মুক্তি ফৌজের তীব্র আক্রমণ সম্পর্কে জানাতে চাচ্ছে না। পশ্চিম জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড: আর্নেস্ট হাইনসেন এবং ব্রিটিশ লেবার পার্টির সংসদসদস্য জনাব জন স্টোরহাউজ মুক্তাঞ্চলের বেশ কিছু অংশ ঘুরে এসেছেন। তাঁরা জানাচ্ছেন, সেখানে মুক্তিবাহিনীর কার্যক্রমে তাঁরা মুগ্ধ। ইতোমধ্যে মুক্তিবাহিনী তাদের কৌশল পুরোপুরি পালটে ফেলেছে, তাদের সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলো থেকে বোঝা যায় যে তারা গেরিলাযুদ্ধের উন্নততর কলাকৌশলে দক্ষতা অর্জন করেছে। তারা তাদের পছন্দমত জায়গায় শত্রুদের অ্যামবুশ করে এবং হামলা করে। ব্রিজ, কালভার্ট, রেলওয়ে লাইন এবং অন্যান্য কৌশলগত স্থাপনাসমূহ ব্যাপকহারে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কমান্ডাররা আর্টিলারি এবং মর্টারের ব্যবহার করছেন। মুক্তিবাহিনীর কার্যক্রম শুধুমাত্র গ্রামাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি ঢাকা নগরের ভেতরে বেশ কয়েকটি গ্রেনেড হামলা হয়েছে। নগরে এবং এর উপকণ্ঠে সেনা ক্যাম্পে এবং সৈন্যদের অন্যান্য অবস্থানে দৈনিক অন্তত বিশটি হামলা হচ্ছে। গেরিলা আক্রমণে উদ্ভুত ক্ষয়ক্ষতির ফলে ঢাকার নিকটে গাজীপুর অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন আবারও বন্ধ হয়ে গেছে। দু’দিন ধরে ঢাকায় পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কয়েকদিন আগে ঢাকার প্রধান পাওয়ার প্ল্যান্ট বিদ্রোহীদের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গেছে। নগরে আবার কারফিউ জারি হয়েছে মর্মে খবর পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম নগর এবং শহরের অন্যান্য এলাকায়, বাড়ির ছাদে ছাদে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। আরও অনেকগুলো শহরে আক্রমণ হয়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের বহিস্কৃত প্রতিনিধি সিডনি শনবার্গ প্রতিবেদন করেছেন যে গেরিলা প্রতিরোধ আরও বিস্তৃত ও কার্যকরী হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। বিবিসির মার্ক টালি সম্প্রতি প্রতিবেদন করেছেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজগুলোতে এবং যেসব এলাকা মুক্তিবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি হতে পারে সেসব স্থানে লোকবল নিয়োগ করার মত অবস্থানে নেই।

সংক্ষেপে, সেনাবাহিনী বড়সড় আঘাতের মুখোমুখি হয়েছে, এবং আঘাতের প্রচণ্ডতা তারা অনুভব করছে। সাম্প্রতিক ইতিহাস এটাই দেখায় যে, যত শক্তিশালীই হোক না কেন, সেনাবাহিনী কখনও জনগণকে দাবিয়ে রাখতে পারে না। বাংলাদেশে স্বাধীনতার মশাল জ্বলে উঠেছে। পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা পূর্ব বাংলার জনগণের হৃদয়কে তিক্ত করেছে। মুক্তিবাহিনী অভিজ্ঞতায়, শক্তিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সময় তাদের পক্ষে রয়েছে। সত্যি বলতে, এ সহিংসতার পথ ইসলামাবাদেরই সিদ্ধান্ত ধরেই এসেছে।

২৮ জুলাই, ১৯৭১

পূর্ব বাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের চালানো গণহত্যার ব্যাপারে অনেকটাই জানা গেছে। তাদের কার্যক্রম এতোই নিখুঁত ছিল যে, হিটলার বেঁচে থাকলে তাঁর আধুনিক শিষ্যদের পদ্ধতিতে কোন কিছুর কমতি খুঁজে পেতেন না। সবচেয়ে রক্ষণশীল হিসেব অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা পৌনে এক লক্ষের মত। জীবন-সম্ভ্রম বাঁচাতে সত্তর লক্ষ পূর্ব বাঙ্গালিকে ভারতে পালিয়ে যেতে হয়েছে। সারা বিশ্বের সামনে ইসলামাবাদের সামরিকজান্তা এক কলংকের নাম। এর পরেও, জনগণকে ধোঁকা দিতে, পূর্ব বাংলায় সব কিছু স্বাভাবিক আছে, এমন দাবি করছে পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা, তারা উদ্বাস্তুদের ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছে। এমনকি, ফিরে আসা শরণার্থীদের জন্য অভ্যর্থনাকেন্দ্রও খোলা হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র সানডে টাইমস এর একজন প্রতিনিধি সম্প্রতি এরকম একটি কেন্দ্র থেকে ঘুরে এসে জানাচ্ছেন, পাঁচটি বেওয়ারিশ কুকুর ছাড়া কেন্দ্রটিতে আর কেউ নেই। গত কয়েক সপ্তাহে, ব্রিটেন, কানাডা, আয়ারল্যান্ড থেকে সংসদীয় প্রতিনিধিদল পূর্ব বাংলা সফর করেন। সেখানে আতংকের পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলেই তাঁদের সবার মনে হয়েছে। নাৎসীদের কাছ থেকে ইসলামাবাদের শাসকরা গণহত্যার পদ্ধতি ছাড়া আরও অনেক কিছুই শিখেছে বলে দেখা যাচ্ছে। সেন্সরশিপ থাকা সত্ত্বেও যতটুকু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বোঝা যায়, পূর্ব বাংলায় পুলিশী রাজ কায়েম হয়েছে। পূর্ব বাংলা এখন এক আতংকের উপত্যকা, যেখানে জার্মান গেস্টাপো কায়দায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। সরকারী অফিসে এখনও যেসব কর্মকর্তা আসছেন তাঁদের উদ্দেশ্যে সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রশ্নমালা জারি করা হয়েছে। যেসব প্রশ্নের উত্তর বাধ্যতামূলকভাবে দিতে হবে, সেগুলোর মধ্যে একটি : আপনি কি আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন? আরেকটি : আপনি কি বাঙালি? এ কী ধরণের অন্যায়!

লস অ্যাঞ্জেলস টাইমসের প্রতিনিধি জ্যাক ফয়সির (Jack Foisie) কাছ থেকে পূর্ব বাংলায় পরিস্থিতির একটা স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। তিনি জানাচ্ছেন, ঢাকা এখন এক ভয়ের নগরী। রাতের বেলায় রাস্তায় রাস্তায় ভূতুড়ে শূন্যতা বিরাজ করছে। সন্ধ্যা নামলেই লোকজন বাড়িতে ঢুকে যাচ্ছে; যদি আত্মীয়স্বজনের বাড়ির দরজা-জানালা-দেয়াল শক্তপোক্ত হয়ে থাকে, তাহলে তারা সেখানে আশ্রয় নিচ্ছে। ফয়সি জানাচ্ছেন, “কোনমতে শাকসবজি, অথবা একটু মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খেয়েই তাড়াতাড়ি তেলের বাতি নিভিয়ে দেয়া হয়, দরজা আটকে দেয়া হয়। এরকম একটা ধারণা বিরাজ করছে যে, অন্ধকার বাড়িঘরে কর্তৃপক্ষ আসার সম্ভাবনা কম।” গোপন আলোচনায় এ আতংকের কারণ হিসেবে বেশ কয়েকজনই “তল্লাশি”কে চিহ্নিত করেছেন। প্রতিনিধি আরও বলেন, “রাতের বেলায় ঘরে ঘরে দরজায় কড়া নেড়ে একই কাজ করা হয়। কোথায় বিদ্রোহীরা রয়েছে সে তথ্য জানা, পিঠ বাঁচাতে ইচ্ছুক লোকদেরকে চর হিসেবে দলে নেয়া, অথবা বাড়ির নারীদের শ্লীলতাহানি করা; অথবা ভয় দেখানোর জন্যই আসা; অথবা মুচলেকা আদায় করা”। তিনি একজন বাঙালি ব্যাঙ্কারের ঘটনা বলেন, যাঁকে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে সামরিক কর্মকর্তাদের থেকে নিজের ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। ফয়সি লিখেছেন, “কখনও কখনও পুরুষদের অস্ত্রের মুখে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, আর নারীরা আহাজারি করতে থাকে। কেউ কেউ আহত অবস্থায় ফেরে, কেউ কেউ ফেরে না।”

সেনা কর্তৃপক্ষ ও তাদের পোষ্য স্থানীয় মিলিশিয়াদের সহায়তায় গঠিত তথাকথিত শান্তি কমিটিও জনগণকে আতংকিত করার আরেকটি উপায়। বিবিসি লন্ডন টাইমসের মার্ক টালি বলেন, স্থানীয় মিলিশিয়ারা মূলত মাস্তান, যারা এ সুযোগে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে বেড়াচ্ছে।

৩০ জুলাই, ১৯৭১

পূর্ব বাংলায় সেনা নিপীড়ন, যার ফলে পাকিস্তানে গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন স্থগিত হয়েছে, সেটির প্রভাব শেষ পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানেও প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করেছে, এবং যাঁর কারণে এ সব কিছু শুরু হয়েছে, তিনি আর কেউ নন, জনাব ভুট্টো, যাঁকে সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবেই মনে করা হয়। ভুলে যাওয়া উচিৎ হবে না যে, সেনাবাহিনী আর জনাব ভুট্টো মিলিতভাবে এ বছরের শুরুতে ১৯৭০ এর নির্বাচন-পরবর্তী গণতান্ত্রিক কাঠামোতে পাকিস্তানের ফিরে আসা ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। সে সময় এটা বোঝাই যাচ্ছিল, জনাব ভুট্টো যাদের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাদের ইচ্ছা সেনাবাহিনীর ইচ্ছার অনুরূপ ছিল। তাদের যৌথ লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতার কার্যকরী হস্তান্তর অগ্রাহ্য করা। এ পদক্ষেপের পেছনে অনেকগুলো মূল কারণ ছিল; এর মধ্যে ছিল এ ভয় যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ক্ষমতার সমীকরণে ব্যাপক রদবদল ঘটবে, সেনাবাহিনী তার অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন হারাবে, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এতোদিন টিকে ছিল যে ভারতবিদ্বেষী প্রচারণার ওপর, সেটি তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়বে। তদুপরি, পাকিস্তানের ক্ষমতার গঠনের বড় কোন অংশ থেকে ব্যক্তিগতভাবে বঞ্চিত হবার সম্ভাবনা থাকে এমন কোন পরিস্থিতি ক্ষমতালোভী ভুট্টো মেনে নেবেন না। আওয়ামী লীগকে সমীকরণের বাইরে রাখলে দু’টো ঘটনার মধ্যে একটি হবে, হয় জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল, তারই পিপলস পার্টির হাতে ক্ষমতা আসবে, অথবা পূর্ব বাংলা সামরিক শাসনে চলবে আর পশ্চিম পাকিস্তানের অন্তত চারটি প্রদেশে প্রতিনিধি সরকার পুনর্বহাল হবে, ভুট্টো খুব সম্ভবত এই ভরসায় ছিলেন। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তাঁর পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল দুটো প্রদেশ, পাঞ্জাব ও সিন্ধুর ক্ষমতা পেত। কিন্তু কার্যত হিসাবে ভুল হল। যতদিন জেনারেল ইয়াহিয়ার হিসেব অনুযায়ী পূর্ব বাংলায় “স্বাভাবিক অবস্থা” ফেরত না আসবে ততদিন পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে তিনি অস্বীকৃতি জানালেন। এরকম কোন “স্বাভাবিক” অবস্থার আশু সম্ভাবনা না থাকায় জনাব ভুট্টোর হতাশা বাড়লো। তাছাড়াও, ক্ষমতার হস্তান্তরে দেরির ফলে তাঁর দলের ভেতরে অস্থিরতার লক্ষণ দেখা যেতে লাগলো। সব কিছু মিলিয়ে, জনাব ভুট্টো ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে আরও উচ্চকণ্ঠ হলেন, যা সামরিক শাসকগোষ্ঠীর জন্য বিব্রতকর হয়ে উঠতে লাগল। সম্ভবত এ দু’পক্ষের মধ্যে মতানৈক্য আরও তীব্র হয়ে উঠবে, এ আশংকায়ই সম্ভবত বাংলাদেশ প্রসঙ্গে পাকিস্তানের বক্তব্য উপস্থাপন করার জন্য শাসকগোষ্ঠী জনাব ভুট্টোকে বিদেশে প্রেরণ করেছে।

প্রতিবেদনে প্রকাশ, তেহরানে এক ইরানি পত্রিকার সাথে সাক্ষাৎকারে, জনাব ভুট্টো বলেছেন যে, পাকিস্তানের সমস্যার অবশ্যই রাজনৈতিক সুরাহা হতে হবে, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে নির্বাচিত দল আওয়ামী লীগকে এতে অংশ নিতে হবে। তিনি বেসামরিক শাসনের আশু প্রত্যাবর্তনও দাবি করেছেন। জনাব ভুট্টোর সফর সামরিক জান্তার আয়োজিত ছিল। তাঁকে তৎক্ষণাৎ পশ্চিম পাকিস্তানে ডেকে পাঠানো হয়। ইয়াহিয়ার সাথে তার পরবর্তী সাক্ষাৎ থেকে আঁচ করা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে বনিবনার অভাব দেখা দিয়েছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ দল, এই বিষয়ে স্থিতিশীলতা আনার জন্য শুধুমাত্র তার দায়িত্ব পালন করবে। তিনি দ্রুত বেসামরিক শাসনে ফিরে যাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। জনাব ভুট্টোর এই সফরটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী  এবং এর পরে  তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তানে ডাকা হয়। ইয়াহিয়া খানের সাথে তাঁর পরবর্তী বৈঠক নির্দেশ করছে যে, তাঁরা একে অন্যের চোখের উপর উপর চোখ রাখতে পারছে না।

৬ নভেম্বর ১৯৭১

হংকং থেকে প্রকাশিত “দি এশিয়ান” নামক এক আন্তর্জাতিক সাপ্তাহিক পত্রিকা, বাংলাদেশের দখলকৃত এলাকাসমূহতে মুক্তিবাহিনীর ক্রমবর্ধমান  তৎপরতার কথা প্রচার করেছে।

রিপোর্টটির শিরোনাম ছিলো-“বাংলাদেশি যোদ্ধারা পাকিস্তানী বাহিনীকে নতুন নতুন উপায়ে পর্যুদস্ত করছে।” রিপোর্টটির শুরুতেই,  পাকিস্তানিদের দ্বারা গঠিত  “রাজাকার” নামক এক ভাড়াটে বাহিনীর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এর বর্ণনামতে-  বাংলাদেশের এখনকার দখলীকৃত অপরিচিত জায়গাগুলোতে,  রাজাকাররাই মূল ভূমিকা পালন করছে। তাদের এই নামের পেছনে ঐতিহাসিক বিষয় জড়িয়ে আছে। সাধারণত, এই শব্দটার অর্থটা হল- “রাজার অনুগত সেবক। ” প্রকৃতপক্ষে,  রাজাকার হল- পাকিস্তানি বাহিনীর ভাড়াটে  সৈনিক। তাদের প্রধান কর্মকাণ্ড হল- যথেচ্ছভাবে মানুষের উপর অত্যাচার করা।

বিপক্ষ শক্তির উপর নির্যাতন চালানোর জন্য- পাকিস্তানি নিরাপত্তাবাহিনী তাঁদের এই সাহায্যকারী বাহিনীর জন্য একটা নির্দিষ্ট ফি বরাদ্দ করেছে। বাঙালিদের নিজেদের দলে আনার জন্য- তারা জনপ্রতি তিন রূপী ( যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রায় ৪০ সেন্ট) পুরষ্কার ঘোষণা করেছে।

এমন ধোঁয়াশাময় ক্ষেত্রে, যেখানে সুরক্ষাই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ, এই অবস্থায় সেখানে কার স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। যেমন,  উদাহরণস্বরূপ, পাকিস্তানি আর্মি রাজাকারদের হাতে উদ্বাস্তুদের হস্তান্তর করার সর্পিল পথ থেকে সরে আসতে পারে এই বিবেচনায় যে এটি কেবলই অতিরিক্ত আতঙ্ক ও গোলমালের সৃষ্টি করছে।

 এই ভাড়াটে সৈনিকদের বিষয়ে দুটি ব্যাপার নিশ্চিতভাবে বলা যায়। প্রথমত, টাকা তাদের পক্ষে অনবরত কথা বলছে। দ্বিতীয়ত, তারা খুবই হঠকারী ও পাশবিক হতে পারে।

যেহেতু, আমাদের সাহসী সামরিক যোদ্ধারা,  সুগঠিত দখলদার বাহিনী ও রাজাকার বাহিনীর বিরুদ্ধে যে আক্রমণ  চালিয়েছে, সেটা সফল হয়েছে, যখন কোন দখলদার বাহিনীর  সেনা স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছাবশত আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে,তাদেরকে আমাদের যোদ্ধারা ক্ষমা প্রদর্শন করছে। দি এশিয়ান আরো বলেছে- বাংলাদেশের বিহারী অভিবাসী, যারা ভারত ভাগের পর থেকে এখানে অবস্থান করছে, তাদের  মধ্য থেকে রাজাকার গঠন করা হচ্ছে। যেহেতু গেরিলা আক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই তাদের কর্মকাণ্ড ও বৃদ্ধি পেয়েছে। শরণার্থীদের সাহায্য করার পাশাপাশি, তাদের মধ্যে কেউ কেউ – বিচ্ছিন্ন সামরিক শিবিরে আকস্মিক আক্রমণ করার  সময় পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করার কথাও শোনা গেছে।

পাকিস্তানি বাহিনী খুব সম্ভবত রাজাকারদের দক্ষতা বিষয়ে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে, যারা এখন তাদের  অস্বীকৃত উপাধি  “গৃহরক্ষক” হিসেবে বাস করছে না- এই ধরনের কিছু চিহ্ন পরিলক্ষিত  হচ্ছে।  তাদের মধ্যে কিছু বাঙ্গালী, অস্ত্রসহ বাংলাদেশি গেরিলাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এটাও সবাই জানে যে,  রাজাকারে যোগ দেওয়া মানুষদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে যে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছিলো, সেটা এখন বন্ধ রয়েছে।

রাজাকারদের প্রতিবাদের চিত্র বাংলাদেশের সর্বত্র একই এবং সেটা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়ে গেছে। কিছু বিষয় এখন প্রায় সমাপ্তির পথে, বাংলাদেশি যোদ্ধারা এখন আরো বেশি যুদ্ধংদেহী এবং এযাবতকালে সংঘটিত যেকোন আক্রমনের চেয়ে আরো বড় মাত্রায় আক্রমণ চালাতে তারা সদা প্রস্তুত আছে।

দি এশিয়ান পাকিস্তানি বাহিনীর হতাহত, মুক্তিবাহিনীর দক্ষতা ও আমাদের সামরিক বাহিনীর দ্রুত  সংঘটিত  হওয়ার ব্যাপারে মন্তব্য করেছে, তারা বলেছে- ” জানা হতাহতের সংখ্যা বিবেচনা করে বলা যায়- মুক্তিযোদ্ধারা এখন আক্রমণ ও পালিয়ে যাওয়া এই নীতিতে কাজ করছে। প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন আহত পাকিস্তানী সৈন্য কে  প্রতিদিন ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালে আনা হচ্ছে।

সে তুলনায় গেরিলাদের হতাহত হওয়ার সংখ্যা অনেক কম, এটা সম্ভব কারণ তারা খুব আকস্মিকভাবে আক্রমণ করে।

গেরিলারা বিভিন্ন গ্রামের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময়, গ্রামবাসীদদের কাছ থেকে অনেক সুবিধা লাভ করে। যেখানে আগে,  গ্রামবাসীরা নির্যাতিত হতে পারে এই ভয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দূরে পালিয়ে থাকতে বলতো, সেখানে  এখন তারা নির্ভয়ে  মুক্তিযোদ্ধাদের  খাবার ও আশ্রয় প্রদান করছে।

এছাড়া , অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ পাচ্ছে বলে যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, সেটা এটা প্রকাশ করছে, বাংলাদেশী বাহিনী, ছড়িয়ে পড়া বাহিনীর উপর আরো ব্যপক মাত্রায় আক্রমণ চালানোর দ্বারপ্রান্তে!!

৮ নভেম্বর,  ১৯৭১

সারাবিশ্বের সংবাদপত্রসমূহ বাংলাদেশে ইয়াহিয়া  খানের সেনাদলের নৃশংসতার কথা প্রচার অব্যাহত রেখেছে। এই নৃশংসতা, অনেক নিরীহ মানুষকে সীমান্ত পারি দিতে এবং সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য করছে। জাতিসংঘের ত্রাণ কমিশনার ৯.৫ মিলিয়ন মানুষ শরনার্থী হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু ইয়াহিয়া খান গত চার মাস ধরে,  এই সংখ্যা ২ মিলিয়ন বলে দাবি করে আসছেন। যাইহোক, জেনারেল সাহেব আবার দাবি করেছেন, প্রতিদিন বিপুক সংখ্যক শরণার্থী দেশে ফেরত আসছে। যদি ব্যাপারটা এরকম হয়ে থাকে, তাহলে কিভাবে চার মাস ধরে এই সংখ্যাটি একই থাকছে?

যুক্তরাষ্ট্রের “টাইম ম্যাগাজিন” ২৫ অক্টোবর তারিখে লিখেছে যে- ” যদিও ইসলামাবাদ তার সেনাবাহিনীকে দমনপীড়নমূলক নীতি পরিবর্তনের দিয়েছে,  তখন থেকে আর ঘরবাড়ি পোড়ানো, সাধারণ মানুষের উপর গুলি করা, গণ্যমান্য ব্যক্তিকে তুলে নেওয়ার কথা শোনা না গেলেও,  এখনো প্রতিদিন  ৩০,০০০ জন শরণার্থী ভারতে পারি জমাচ্ছে।” এটার মানে দাঁড়ায়- প্রতিমাসে প্রায় ১ মিলিয়ন মানুষ, সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে – সেখানে ইয়াহিয়া খান হয়তো সামনের চার মাসেও দুই মিলিয়ন শরণার্থীর কথা বলে যাবেন। কিন্তু বাস্তবতা হল- ফেব্রুয়ারি মাস শেষ হওয়ার পূর্বেই আরো ৪ মিলিয়ন শরণার্থী  সীমান্ত পাড়ি দিতে পারে।

সেনাবাহিনীর নৃশংসতার কথা উল্লেখ করে, ২৬ অক্টোবর “ফিনান্সিয়াল টাইমস” লিখেছে- সামরিক শাসক রাষ্ট্রপতির নির্দেশ উপেক্ষা করে, বাঙ্গালি বিদ্রোহীদের অপারেশনের স্থানগুলোতে পাকিস্তানি পুলিশ ও সেনাবাহিনী  নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের উপর তাদের দমনপীড়ন অব্যাহত  রেখেছে, এমনকি ঢাকাস্থ নতুন বেসামরিক গভর্নরের বাসভবনের আশেপাশেও তাদের অভিযান চালিয়েছে। মার্টিন উয়ালাকর্ট,  ১ নভেম্বর এর   “গার্ডিয়ান” পত্রিকায় লিখেছেন- অবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ইসলামাবাদ কিছু অনৈতিক ও অপবিত্র পন্থা অবলম্বন করলেও,  পূর্ব বাংলার পাকিস্তানি সরকার এখন দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে।

মুক্তিবাহিনীর সাফল্যের খবরও বিশ্বের নানা সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের “নিউজউইক” সাময়িকী ১ নভেম্বর তারিখে লিখেছে-” যদিও ইয়াহিয়া খান মার্চের শেষ থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে  ভয়ানক অভিযান চালানো শুরু করেছে এবং  ৯ মিলিয়নের ও বেশি শরণার্থীকে  ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে আসছে তবুও প্রায় ৫০ হাজার বাঙালি মিলে গেরিলা বাহিনী গঠন করেছে। স্বভাবসুলভভাবে ” নিউজউইক” সংবাদদাতা গেরিলার সংখ্যা কম দেখিয়েছে। পত্রিকাটি আরো বলেছে- “গেরিলারা সফলতার সাথে সরকারী বাহিনীকে হেনস্থা করতে সক্ষম হয়েছে এবং অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক মনে করছেন, বিদ্রোহীদের সফলতা অব্যাহত থাকবে। গেরিলাদের দমনে, ইয়াহিয়া খানের যে পরিমাণ সৈন্য দরকার, সে পরিমাণ সৈন্য এখন সেখানে নেই।

লন্ডনের “গার্ডিয়ান” পত্রিকা লিখেছে- “সম্প্রতি, মুক্তিবাহিনী বেশ ক’বার ঢাকার কেন্দ্রস্থলে  আক্রমণ চালিয়েছে, সাধারণত বোমা মেরে অথবা মাঝে মাঝে সাধারণ নিয়মে আক্রমণ চালিয়েছে। ”  পত্রিকাটি আরো লিখেছে – “ফরিদপুরের দক্ষিণে অবস্থিত, গোপালগঞ্জ এলাকাতে, যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা অত্যন্ত সুসংঘটিত, সেখানে তাঁরা এমন কিছু  রাজনৈতিক কর্মচারী নিযুক্ত করেছে- যারা সামরিক সশস্ত্র হলেও তাঁরা তাঁদের বেশিরভাগ সময়,  ঢাকায় কি কি ঘটছে তা সাধারণ মানুষকে জানানোর কাজে ব্যস্ত থাকে।”

১৫ নভেম্বর, ১৯৭১

“বাংলাদেশি গেরিলারা বোমা নিক্ষেপ ও হত্যার সংখ্যা বাড়িয়েছে” এটাই ছিলো ৯ নভেম্বরের লন্ডন টাইমস পত্রিকার শিরোনাম।” পূর্ব বাংলায় অবস্থিত, পাকিস্তান বাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো,   গেরিলারা বন্ধ করে দিতে চাইছে। ” এটি আরো লিখেছে- “গত কয়েকদিনে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পরিমাণ ও অনেক বেড়েছে। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিযুক্ত,ভবিষ্যতে প্রাদেশিক আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করার মতো এক ডানপন্থী নেতাকে গতোকাল সাব- মেশিনগান এর হামলায় হত্যা করে হয়েছে।” মুক্তিবাহিনী যে, দখলদার বাহিনীকে সহযোগিতাকারী  মানুষদের পক্ষ পরিবর্তন ও শোধরানোর পর্যাপ্ত সময় দিয়ে – যে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে,  সেই খবরও পত্রিকাটির রিপোর্টে গুরুত্ব পেয়েছে। পত্রিকাটি লিখেছে, “গেরিলারা শান্তি কমিটির সদস্য, সামরিক জান্তা কর্তৃক নিযুক্ত কর্মকর্তা এবং বিপক্ষ শক্তিকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্যকারী ব্যক্তিদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। ” এটি আরো লিখেছে, “যেসব বাঙালি সরকারী চাকুরে এখনো কর্মস্থলে আছেন, তাঁরাও গেরিলাদের নজরদারীতে আছেন জানিয়ে , গেরিলারা তাঁদের সতর্ক করেছেন; সরকারের সাথে কাগুজে সম্পর্ক ছাড়া অন্য কোন ধরণের সম্পর্ক থাকলে তাঁদেরকেও হত্যা করার হুমকি দেওয়া হয়েছে।” ১১ জন দখলদার বাহিনী যে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে, সেই সংবাদ ও পত্রিকাটিতে স্থান পেয়েছে। এটি লিখেছে- ” সামরিক নীতি ভেঙে পড়েছে,  সেটা ঠিকভাবে মানা যাচ্ছে না এবং পূর্বে নিহত পাকিস্তানী সৈন্যদের, পাকিস্তানে নিয়ে সমাহিত করার যে প্রথা ছিলো, বর্তমানে ক্রমবর্ধমান হতাহত সৈনিক সংখ্যার কারণে পূর্বের নিয়ম বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। “

…. এ সপ্তাহের যুক্তরাষ্ট্রের “নিউজউইক” সাময়িকী টি মনে করছে যে,  পাকিস্তানীরা একটি পরাজিত হওয়ার যুদ্ধে  লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ইয়াহিয়া খান এক অজেয় যুদ্ধে অবতীর্ণ  হয়েছেন। এটি আরো লিখেছে- “পাকিস্তানী বাহিনীর শুধুমাত্র গেরিলাদের যুদ্ধাবস্থা নিয়ে গভীর জ্ঞান রয়েছে। সীমান্তে যেখানে সৈন্যরা অবরুদ্ধ অবস্থায় আছে, সেখানে গেরিলারা পূর্ব পাকিস্তানের দিকে দৌঁড় শুরু করতে উদগ্রীব। পাকিস্তান সরকার রাজাকারদের সাথে নিয়ে বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধ করতে চেয়েছে কিন্তু রাজাকাররা সরকারকে সাহায্য করতে গিয়ে, আরো ক্ষতি করেছে।” রাজাকার নিযুক্ত করার প্রক্রিয়া এখন প্রায় নেই বললেই চলে এবং এর ফলে অনেক মানুষ মুক্তি বাহিনীর পক্ষাবলম্বন করেছে। নিউজউইক পত্রিকাটি লিখেছে- ” রাজাকারদের এসব দমনপীড়নমূলক নীতি সাধারণ মানুষের উপর প্রয়োগ করার ফলে, সাধারণ বাঙালিদের মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে যেতে বাধ্য করেছে। ” নিউজউইক পত্রিকার সিনিয়র সম্পাদক আর্নউড ডি বর্ছগ্রেভ সাধারণ মানুষকে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলেন,  তারা কি পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে থাকতে চায়, নাকি বাংলাদেশ নামের নতুন রাষ্ট্র চায়,  তিনি লিখেছেন,  সেসব লোকদের প্রত্যেকেই বাংলাদেশের কথা বলেছেন। সাময়িকীটি আবারো নিশ্চিত করেছে যে,  বাংলাদেশের সকল মানুষ এখন একটি স্বাধীন দেশের ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। নিউজউইকের সিনিয়র সাংবাদিক লিখেছেন- ” কিছু মানুষ আমাকে ফিসফিসিয়ে বলেছে যে, “বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া উচিত, আমরা সকলেই এটা ভাবছি।”

সাময়িকীটি আরো উল্লেখ করেছে যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী  অবস্থার নিয়ন্ত্রণ হারাতে চলেছে। পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রশাসক, জেনারেল নিয়াজী, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবনতি ও মুক্তিবাহিনীর সংঘটিত হওয়ার মাত্রা দেখে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। গত সপ্তাহেই সরকার পূর্ব পাকিস্তানের ২৫ শতাংশ পুলিশ স্টেশনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

ইয়াহিয়া খানের কয়েকজন প্রতিনিধি যে মুক্তিবাহিনীর সাথে সমঝোতার চেষ্টা করেছে,  সেটা ১৫ তারিখের নিউজউইক সাময়িকী থেকে জানা যায়, সাময়িকীটি লিখেছে, কয়েকজন কমিশনার গেরিলাদের সাথে  কৌশলে সমঝোতা করতে চাচ্ছে এবং শুধুমাত্র ঢাকার উত্তরভাগের বেশিরভাগ অংশ এখনো মুক্তিবাহিনীর আওতামুক্ত আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘটিত হওয়া ও দক্ষতার বিষয়ে সিনিয়র সম্পাদক শ্রদ্ধার সাথে লিখেছেন, ” কড়া পুলিশি পাহাড়ার মধ্যে,  ঢাকায় হোটেলে পৌঁছানোর ৩০ মিনিটের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের একজন প্রতিনিধির সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছিলো। ” তিনি আরো লিখেন- বিদ্রোহীরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংঘটিত হয়েছে এবং তাঁরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়েছে- তাঁদের কেউ চাঁদা সংগ্রহের ও ব্যাংকে লুট করার কাজ সুসংহত করার কাজে নিযুক্ত হয়েছে, কেউবা অন্তর্ঘাতক আর কেউবা হামলাকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে।

১৬ নভেম্বর ১৯৭১

যুক্তরাষ্ট্রের নিউজউইক সাময়িকী ১৫ নভেম্বর তারিখে প্রকাশ করে যে, ইয়াহিয়া খান বা অন্যান্য জেনারেল রা  বাংলাদেশের আসল অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। তার বেসামরিক রাজ্যপাল ও জানে না,  সাধারণ মানুষের মনে কি বিরাজমান।  সাময়িকীটি লিখেছে, “বাঙালির কঠোর প্রতিরোধের মতো, কঠিন সত্য কথা- শুধুমাত্র রাজ্যপাল এ. এম. মল্লিকের র কাছ থেকে গোপণ করা হয়নি, এমনকি রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের কাছ থেকেও গোপন করা হয়েছে।”

অতি সম্প্রতি, সাময়িকীটি পাকিস্তান আর্মি কর্তৃক সংঘটিত  নৃশংসতা   এমনকি আজও যে নৃশংসতা ঘটিয়েছে, সেটা নিশ্চিত করেছে। এটি লিখেছে, ” একজন প্রবাসী অতি জ্ঞানী ব্যক্তি নৃশংসতার জন্য সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছেন। ”  সাম্প্রতিককালে পাকিস্থানী বাহিনী ডেমরার একটি গ্রামে অভিযান চালিয়েছে, যেখানে কখনই  মুক্তিযোদ্ধারা ছিলো না,  এবং সেখানে ১২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সকল মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ১২ বছরের অধিক সকল মানুষের উপর গুলি চালানো হয়েছে। “

এটি আরো লিখেছে- “এর একদিন পড়েই পাকিস্তানি গানবোট “চালনা”  নদীতে মাছ ধরার নৌকাগুলোর উপর হামলা চালায় এবং নিরাপত্তার সন্ধানে সাঁতারাতে থাকা জেলেদের উপর গুলিবর্ষণ করেছে। ” কিন্তু, সাময়িকীটির সিনিয়র সম্পাদক একটি বিষয়ে ইঙ্গিত করেছেন যে,  পাকিস্তানি বাহিনী  যত বেশি অত্যাচারী হবে ও যত বেশি নৃশংসতা চালাবে, সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ তত বেশি হবে। এটা সাধারণ মানুষকে বশে আনার পরিবর্তে, তাঁদের প্রতিরোধের মাত্রা আরো বাড়াবে । সাময়িকীটি লিখেছে, ” এই সকল কর্মকাণ্ড পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিবাদকে আগের যেকোন সময়ের চেয়ে আরো বেশি শক্তিশালী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলবে। বেশিরভাগ মানুষ পাকিস্তানের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার চিন্তা এখন থেকে শুরু করে দিয়েছে এবং অনেক পাকিস্তানি সেনাপতিও ভাবতে শুরু করেছেন, তারা একটি অনিবার্য গেরিলাযুদ্ধের ফাঁদে আটকা পড়েছেন।”

“ইয়াহিয়ার সাহায্যের হাত ছোট হয়ে আসছে” – এটিই ছিলো ৯ নভেম্বরের লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার শিরোনাম। এটি উল্লেখ করেছে কিভাবে পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এবং ইয়াহিয়া খানের সবচেয়ে বড় মিত্র চীন ও ধীরে ধীরে তার সাহায্য প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। সম্পাদকীয়  তে লেখা হয়েছে, ” বর্তমানের ঘটনাপ্রবাহ ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে যাচ্ছে, অনবরতভাবে আসতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য গতকাল হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেছে এবং চীন হালকা বন্ধুত্ত্বের ভাব বজায় রেখে পেকিং থেকে  ইয়াহিয়া খানের গোয়েন্দাদের বাড়িতে কিছু সাহায্য পাঠিয়েছে।” পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে,  সম্পাদকীয়  তে লিখেছে ” এটি  ইয়াহিয়া খানকে  পশ্চিমা-মিত্র শূণ্য করেছে।পশ্চিম পাকিস্তানের জেনারেলরা অতি দ্রুত অনৈতিক ভাবে অত্যাচার চালানোর ইচ্ছে থেকে সরে এসেছে। ” পেকিং এ ইয়াহিয়া খানের প্রতিনিধিদের সাথে চীনাদের শীতল ব্যবহারের  কথাও সম্পাদকীয় তে প্রতিফলিত হয়েছে, সেখানে তারা লিখেছে, “এই আলোচনার মাধ্যমে একটি অস্পষ্ট বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। যদি ভারতের সাথে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে চীনের কোন সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। যদি সত্যিকারেই এই যুদ্ধ হয় ; পাকিস্তানকে এককভাবে আক্রমণ চালাতে হবে  এবং এককভাবে এর ফল ভোগ করতে হবে। “

” রিফিউজিরা  বলেছে – পাকিস্তানি সেনারা এখনো হত্যা ও লুণ্ঠণ চালিয়ে যাচ্ছে।” এটিই ছিলো লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার শিরোনাম। পত্রিকাটি রিপোর্ট করেছে, ” প্রথমে মনে করা হতো শুধুমাত্র  মুসলিম সদস্য নিয়ে গঠিত পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মূল উদ্দেশ্য ছিলো হিন্দু গ্রামগুলোতে হামলা চালানো কিন্তু আমাদের সংবাদকর্মীরা বিগত কিছু ঘটনা থেকে প্রমাণ পেয়েছে যে বর্তমানে অভিযানটি তাঁদের বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে  যারা স্বাধীন বাংলাদেশ জাতির চিন্তাচেতনা ধারণ করছে। “

১৭ ই নভেম্বর, ১৯৭১

যতই দিন যাচ্ছে, মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ ততই তীব্র হচ্ছে। “সীমান্তে চাপ বাড়ার সাথে সাথে পূর্ব বাংলায় অন্তর্ঘাত এর ঢেউ লেগেছে।” এটিই ছিলো এ সপ্তাহের লন্ডন টাইমস পত্রিকার শিরোনাম। এটি লিখেছে -“গেরিলাদের দ্বারা সংঘটিত সবচেয়ে  সেরা হামলার ঘটনা ছিলো- চট্টগ্রামে, একটি বড় একটি  তেলবাহী ট্যাংকার  ডুবিয়ে দেওয়া,  যেটি ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার অপেক্ষায় ছিলো। ৭ জনের মতো জাহাজের কর্মী নিখোঁজ ছিলো।” নিউজপেপার পত্রিকার ঢাকা প্রতিনিধি ম্যালকম ব্রাউন আরো বলেছেন, গেরিলারা অতি সম্প্রতি পাকিস্তানী বাহিনীর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার জন্য   জ্বালানী পেট্রোলের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে এবং এখনো পর্যন্ত কমপক্ষে ১ ডজন জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে অথবা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি আরো লিখেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় গেরিলারা ঢাকার একজন প্রখ্যাত আইনজীবীর কক্ষে হামলা চালিয়েছে এবং একটি পাওয়ার স্টেশনে ৩ টি বড় বোমা হামলা চালিয়ে,  ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী  ২ শহরকে  দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন করে রেখে গেছে। বিদ্যুতের অভাবে গতকাল ঢাকা শহরে পানির অভাব দেখা দিয়েছে। তিনি আরো লিখেছেন- ঢাকা ও পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও কোথাও নাশকতার কারণে  বিদ্যুৎবিভ্রাট দিন দিন বাড়ছে, এই বিষয়ে বলা যায়, দিনে প্রায় অর্ধ ডজনবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

১২ নভেম্বর এর লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার শিরোনাম ছিল-“বোমা হামলার কারণে, ঢাকার ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র কেঁপে উঠেছে।”  এটি লিখেছে – গতকাল যখন মূল ডাকঘরের প্রবেশমুখের কয়েকগজ দূরে গাড়ি থাকা বোমা বিস্ফোরিত হয়, ঢাকার বাণিজ্য কেন্দ্র তখন কেঁপে উঠে। একজন বিশ্বাসযোগ্য ব্রিটিশ প্রত্যক্ষদর্শী একজন মানুষকে মারা যেতে দেখেছেন এবং পরবর্তীতে জানা গেছে ৩ জন মানুষ নিহত হয়েছে।” এই পত্রিকাটি লিখেছে – মার্চে প্রায় ৬,০০০ এর মতো পুলিশকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আনা হয়েছিল,যেটাকে এখন খুব কম মনে হচ্ছে।

এটি বলে, “তারা তীব্র উত্তেজনা প্রদর্শন করছে। গত সপ্তাহ থেকে কিছু ইউনিটকে ব্যরাকে রাখা হচ্ছে।” এই পত্রিকার প্রতিবেদক আরও লিখেন, “আমি বুঝতে পারছি যে সকল পুলিশ পূর্ব পাকিস্তানী বাহিনীর স্থলাভিষিক্ত হতে ঢাকা এসেছে তাদের বলা হয়েছে যে তারা সেপ্টেম্বরে দেশে ফিরে যাবে। যেহেতু বাহিনীকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে না, তাই তারা তাদের চাওয়া পূরণ করে পশ্চিমে ফিরে যাওয়ার জন্য একটি তারিখ পেতে ধীরে ধীরে নিষ্ঠুর হচ্ছে।”

সৈন্য বাহিনী তাদের মরিয়া অবস্থান থেকে সরে এসে জাহাজ রক্ষণাবেক্ষকদের পণ্যের জন্য বল প্রয়োগ করতে শুরু করেছে বলে প্রতিবেদক লিখেন, “পশ্চিম পাকিস্তানী যোদ্ধাদের দলগুলোকে পণ্যের জন্য জাহাজ রক্ষকদের উপর বল প্রয়োগ করতেও আমি দেখেছি। দুই মাস আগের চেয়ে তাদের আচরণ কিছুটা ভীতিজনক ছিল।”

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর ১২ নভেম্বরের শিরোনাম ছিল, “পাকিস্তানের কাঁচা পাট গেরিলারা বিনষ্ট করছে।” এটি বলে, “পূর্ব পাকিস্তানে গেরিলা কার্যক্রম ওয়ার্ল্ড স্পিনিং ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে কাঁচা পাট রপ্তানিতে প্রভাব ফেলছে। কিছু ক্রেতা কোম্পানির মতে রপ্তানির জন্য পাটের পরিমাণ ক্রমাগত কমছে।” ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদক গটফ্রে ব্রাউন, লন্ডন-এর একটি রিপোর্ট থেকে লিখেন, “অনিয়মিত এবং বিলম্বিত স্থানান্তর ইউরোপিয়ান ক্রেতাদের পাট কেনা থেকে বিরত রাখছে। ফলশ্রুতিতে পাটের দাম বাড়ছে এবং রাতারাতি টন প্রতি ৭ থেকে ১০ পাউন্ড বৃদ্ধি পেয়েছে।”

১৮ নভেম্বর, ১৯৭১

লন্ডনের দ্যা টেলিগ্রাফের আরও একটি শিরোনাম ছিল, “গেরিলারা পূর্ব পাকিস্তানের বিশাল এলাকা দখল করেছে।” এটি বলে, “বাংলাদেশী গেরিলারা পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান ৭ টি এলাকা স্বাধীন ঘোষণা করেছে। দুই সপ্তাহ আগে থেকে এমন একটি যুদ্ধংদেহী অবস্থা বিরাজ করছে যে গেরিলা কমান্ডাররা আরও সাফল্য প্রত্যাশা করছেন।”

সংবাদপত্রের প্রতিবেদক মুক্তি বাহিনী কর্তৃক মুক্তাঞ্চল সম্পর্কে বিস্তারিত দেয়। প্রতিবেদক ভারতীয় সীমান্ত থেকে ৭০ মাইল ভেতরে বাংলাদেশের স্বাধীন এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। মধুপুর বন ও সুন্দরবন বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনীর প্রধান গেরিলা ঘাঁটি বলে এটি উল্লেখ্য করে। পত্রিকাটি বলে, “বিচ্ছিন্ন প্রধান শহরগুলো এবং সেগুলোর মধ্যবর্তী ভূমির রাস্তাগুলো উত্তর-পশ্চিম ব্যতিত সম্পূর্ণ বাংলাদেশে গেরিলারা সন্ত্রাস ঘটিয়েছে।” রাজাকারেরা নিরাপত্তা দেয়ার কারণে ফেরি পারাপার ব্রীজ, প্রশাসনিক ভবন এবং সেনা ক্যাম্পগুলোতে বেশি সাফল্য পাওয়া যায় নি।

আরেকটি প্রতিবেদনে লন্ডনের দৈনিক টেলিগ্রাফে ক্লার্ক হলিংওর্থ লিখেন, “শহরের প্রধান ৪টি পাওয়ার স্টেশনের ৩টি বাংলাদেশের গেরিলারা ধ্বংস করে দেয়ার পর ঢাকার ৩০ মাইলের ভেতরকার ইন্ডাস্ট্রি সম্পূর্ণরূপে স্থবির হয়ে পড়েছে।”

“গেরিলারা ঢাকার পাওয়ার স্টেশন ধ্বংস করেছে” প্রতিবেদনে ক্লেয়ার হলিংওর্থ আবার লিখেন, “সিদ্ধিরগঞ্জের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত পাওয়ার স্টেশনের কম্পাউন্ডের ভেতর ৩টি বিস্ফোরণ সঙ্ঘটিত হয়। তারা সহসা বিদ্যুৎ পরিবহন বিচ্ছিন্ন করে এমনকি জরুরী গ্রাহক যেমন শ্রমিকদের কর্মস্থল, পুলিশ এবং সেনা ব্যারাকে।” তিনি আরও লিখেন, “সবচেয়ে সঙ্গিন ফলাফল হল এই যে ঢাকা অঞ্চলের পাট কল এবং লাইট ইন্ডাস্ট্রিগুলোর অন্তত পক্ষে এক হাজার শ্রমিক তাদের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে, যেখানে ৬০% এর মত কর্মজীবী ইতিমধ্যে বেকার।”

লন্ডনের দ্যা টাইমস এই পরিস্থিতি সম্পর্কে লিখে, তারা এখন বাংলাদেশের ভেতর নিয়ন্ত্রণ করছে এবং দখলকৃত অঞ্চল শাসন করার চেষ্টায় পাকিস্তানী সরকার পরম ব্যর্থ। আইন এবং আদেশের অবস্থা সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রনের বাইরে। পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা এবং বাংলাদেশের অধিবাসীরা অনিরাপদবোধ করছে এবং ব্যবসায়ীরা তাদের সকল সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। লন্ডনের দ্যা টাইমস লিখে, “পূর্ব পাকিস্তানে বেশীর ভাগ পশ্চিম পাকিস্তানী অধিবাসীরা নিজেদের অনিরাপদ বোধ করছেন এবং অনেকেই আগে দেশান্তরী হত্তয়ার সুযোগ পেয়েছে কিন্তু এখন অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে।” মুক্তি বাহিনী সম্পর্কে এটি লিখে, “আর্মি কর্তৃক সন্দেহপূর্ণ গেরিলা অবস্থানে হামলা করা সত্ত্বেও গেরিলারা কম বেশি তাদের আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে।” এটি আবার লিখে, “সামরিক বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে পড়েছে। পুলিশের মনোবলও ভুগছে।” পত্রিকাটি আবারও নিশ্চিত করে যে পুলিশ ও রাজাকারেরা যৌথভাবে মুক্তি বাহিনীর সাথে লড়াই করছে। এটি বলে, “সরকার জুনে পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ অফিসারদের একটি বাহিনী প্রেরণ করে আহতদের প্রতিস্থাপন করতে।” বাহিনীকে বলা হয় যে তাদের কাজ কেবল স্বল্প পরিসরের জরুরী অবস্থায় কিন্তু তারা এখনও অবস্থান করছে এবং জরুরী অবস্থা যেকোনো সময়ের চেয়ে গুরুতর আকার ধারণ করছে।

২৪ নভেম্বর ১৯৭১

ইয়াহিয়া খানের নিয়োজিত আর্মিরা ধ্বংস হতে শুরু করেছে। প্রতিদিনকার বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতিতে ভুগে তারা পতনের একদম শেষ প্রান্তে। তারা যতই তাদের নিপীড়ন ও নৃশংসতার মাত্রা বাড়াচ্ছে, ততই সাধারণ মানুষও মুক্তি বাহিনীকে সমর্থন বাড়াচ্ছে। বোকা, গর্দভ এবং সাধারণ মানের যোদ্ধা, ইয়াহিয়া খান, বদ্ধ ব্যাংকারে চলে গেছে। লন্ডনের দ্যা ডেইলি এক্সপ্রেস ১৭ নভেম্বর তাকে বর্ণনা করে, “সে খর্ব-স্থূলকায় কিছুটা বোঝাসম লোক। তার সবচেয়ে গাফিলতি সে ২৫ মার্চের কঠিন অবস্থার পর থেকে বাংলাদেশ যায় নি।” এটি আবার বলতে যায়, “সে তার তথ্যরে জন্য তার কমান্ডারদের প্রতিবেদনের উপর নির্ভরশীল এবং যে কেউ ধরে নিবে, এই কারণেই, উদ্বাস্তু এবং গেরিলা যোদ্ধারা দুর্বৃত্ত এবং ভারতের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে তার হাতে প্রাণ হারাচ্ছে।”

ইয়ান ব্রডি, দ্যা ডেইলি এক্সপ্রেসের বিদেশী প্রতিবেদক আবারও ইয়াহিয়া খানকে অভিযুক্ত করে বলেন, “তিনি সংকট ত্বরান্বিত করেন যখন পাকিস্তান নির্বাচনের ফলাফল শেখ মুজিবের জন্য একটি বড় বিজয় এনে দেয়, যা তার অনুসারে হয় নি।” ইয়াহিয়া খান সম্পর্কে তিনি আবার লিখেন, “ইয়াহিয়া খান, মাথামোটা লোক এমন কাজ করেন যেন জঘন্য কিছু দিয়েই গড়া।” তিনি আবার বলতে যান, “যখন জেনারেল ইয়াহিয়া বলেন সে কেবল একজন সামান্য সৈনিক, তার উচিৎ তার কথা ফিরিয়ে নেয়া। তার অযাচিত প্রদক্ষেপ তাকে জেনারেলের চেয়ে সার্জেন্ট-মেজরেই বেশি মানায়।”

১৬ নভেম্বরের ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস রিপোর্ট করে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেস পার্টি কার্যনির্বাহীকে বলেছেন, “বাংলাদেশ থাকতে এসেছে। পৃথিবীর এমন কোন শক্তি নেই যে এই বাস্তব অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে।”

“মিসেস গান্ধী বাংলাদেশের ব্যপারে চূড়ান্ত অবস্থান দিয়েছেন” ছিল ১৭ নভেম্বরে লন্ডনের দ্যা টাইমসের শিরোনাম। এর প্রতিবেদক পিটার হ্যাজেলহার্স্ট লিখেন, “প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের সংকট নিরসনে দুই সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন।”

“মিসেস গান্ধী স্রোতের পরিবর্তন দেখছেন” ছিল ১৬ নভেম্বরে লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফের শিরোনাম। পত্রিকাটির নয়া দিল্লীর প্রতিবেদক ডেভিড লোসাক লিখেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী সংসদে গতকাল বলেন যে আন্তর্জাতিক প্রবাহ পাকিস্তানের প্রতিকূলে যাচ্ছে।”

১৭ নভেম্বরে লন্ডনের দ্যা টেলিগ্রাফের রিপোর্ট থেকে মাত্রই নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশের অধিকৃত এলাকায় প্রতিদিন ধীরে ধীরে আরও মরিয়া হয়ে উঠছে। শিরোনাম ছিল, “পাকিস্তানীরা যাজক হত্যা করেছে।” প্রতিবেদক লিখেন, “আমেরিকান রোমান ক্যাথলিক ফাদার উইলিয়াম পি ইভান্সকে গেল সপ্তাহে ঢাকা থেকে ১৭ মাইল উত্তর-পশ্চিমে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি ২৩ বছর ধরে পাকিস্তানে বসবাস ও কাজ করছিলেন।” ক্লেয়ার হলিংওর্থ আবার লিখেন, “আমি তার বক্সনগর মিশন চার্চের যাওয়ার পথেই ছিলাম যখন তিনি খুন হয়েছেন একটি সুনসান এলাকায়, যেখানে নেই কোন রাস্তা কিংবা টেলিফোন।” মিশনে অবস্থান করা ঢাকার আর্চবিশপের কি হয়েছিল তা গলা থেকে মিশনে নিয়ে যাওয়া মাঝি তাকে বর্ণনা করেন। মাঝি ক্লেয়ার হলিংওর্থকে বলেছিল, “আমরা নদীর নিম্নাংশ দিয়ে নৌকায় যাচ্ছিলাম যখন সৈন্য প্রহরীরা স্থানীয় কমান্ডিং অফিসারকে নৌকা তল্লাশি করে জানানোর জন্য আদেশ করে। ফাদার ইভান্সকে কিছু জিজ্ঞাসা করা হয় এবং নৌকায় ফেরত যাওয়ার অনুমতি দেয়। কিন্তু কিছু অজানা কারণে তারা ফাদার এবং আমাকে নৌকা থেকে বের করে এবং আমাদের একটি পরিখায় বসতে জোর করে।”

দ্যা ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রতিবেদক ক্লেয়ার হলিংওর্থ আবার বর্ণনা করেন, বাংলাদেশে প্রসিদ্ধ আমেরিকান রোমান ক্যাথলিক যাজক ফাদার ইভান্স হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানী আর্মির অন্যতম অপরাধমূলক এবং বিশ্বাসঘাতক কাজ। তিনি লিখেন, “যদিও কমান্ডিং অফিসার সুনির্দিষ্টভাবে ফাদার ইভান্সের ব্যপারে নিশ্চিত হতে পেরেছিল, আর্মি খুব কাছ থেকে গুলি করেছিল।” মাঝি প্রতিবেদককে বলেছিল, “আমি আমার প্রাণ হারানোর ভয়ে বিমূঢ় হয়েছিলাম এবং তারা আমাকেও দুইবার গুলি করেছিল কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল। পরবর্তীতে আমি প্রতিবেশী আরেক মাঝির থেকে জানতে পারি যে ফাদারকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল এবং তার দেহ নদীতে ফেলে দিয়েছিল।”

২৫ নভেম্বর ১৯৭১

দখলদার আর্মির উপর প্রতিদিনকার মুক্তিবাহিনীর বিশাল আক্রমণের সংবাদ প্রতিনিয়ত বড় বড় সাফল্য বহন করছিল। এখন তারা যেখানে ইয়াহিয়া খানের বাহিনী রয়েছে সকল দিক দিয়ে এবং সকল ক্ষেত্রে জোরালোভাবে তাদের আক্রমণগুলো চালাচ্ছে। বিশ্ব গণমাধ্যমের প্রায় সকল প্রধান প্রধান অঞ্চলগুলো মুক্তিবাহিনীর সাফল্যের প্রতিবেদন করে।

যুক্তরাষ্ট্রে নিউ ইয়র্ক টাইমসের শিরোনাম ছিল, “বাঙালি গেরিলাদের আশা উঁচু।” বাংলাদেশী মুখপাত্র ম্যালকম ব্রাউন লিখেন, “এশিয়ান রণ কৌশলী মাও-সে-তুং এর সমর নীতি অনুসরণ করে, বাংলাদেশের বেশীর ভাগ অংশ মুক্তি বাহিনীর যোদ্ধা গেরিলাদের স্বর্গ।” তিনি মুক্তিবাহিনীর নেতা বলেছেন বলে উল্লেখ্য করে আবার লিখেন, “যদি আপনারা বিদেশীরা আমাদেরকে অস্ত্র এবং গুলি সরবরাহ করেন, যা আমাদের প্রয়োজন, আমরা পাকিস্তানী আর্মিকে ৭ দিনের মধ্যে বের করে দিতে পারব।” প্রতিবেদক আবার লিখেন, “মোটর লঞ্চ ও সাম্পান দিয়ে যাওয়ার সময় আমি ঢাকার দক্ষিণে এক ছোট গ্রামকে গেরিলারা পাহারা দিতে দেখেছি। গেরিলাদের এই গ্রামটিতে বন্যা প্রবণ বাংলাদেশের অনেক গুলি গ্রামীণ সম্প্রদায়ের অবস্থান, যা কাছের রাস্তা বা পায়ে হাঁটা পথের থেকে ২০ মাইল দূরে। বিভিন্ন দিক হতে অনুপ্রবেশ করে এম্বুশ করতে এতে কেবল পানি ভরা গভীর খাল দিয়ে যেতে হয়।” “এর মত মুক্তাঞ্চলগুলোর গেরিলারা আর্মি আক্রমণ থেকে সম্পূর্ণরূপে নিরাপদ বোধ করছেন এবং বাড়ি গুলোতে বাংলাদেশী পোস্টার ও দেশপ্রেমী বন্দী বাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি শোভা পাচ্ছে।” প্রতিবেদক মুক্তিবাহিনী সংঘটনকে আবারও সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, “গেরিলারা যখন ঢাকা কিংবা অন্য জায়গায় যান, তখন একটি সম্প্রসারিত সংকেত এবং গোপনীয় ব্যবস্থার মাঝে যেকোনো শক্তিশালী মিলিটারি বাঁধা অতিক্রম করেন।” তিনি আবার লিখেন “কোথায় জয় করা স্বাধীন অঞ্চল শেষ এবং অন্যগুলো শুরু এর একটি সম্পূর্ণ ধারণা রাখা বাংলাদেশে অবস্থান করা প্রত্যেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাহ্যিকভাবে, বিদেশী কূটনৈতিকগণ এবং সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে চার ভাগের এক ভাগ অঞ্চল গেরিলারা নিয়ন্ত্রণ করছে যারা কমপক্ষে ১০০০০০ জনের একটি বাহিনী বলে দাবী করে। কিন্তু পাকিস্তানী আর্মি কর্তৃক দখলকৃত অঞ্চলেও তাদের কর্তৃত্ব খুবই কম।”

ম্যালকম ব্রাউন আবারও লিখেন যে গেরিলা কমান্ডার আমাকে বলেছে, “সকল গেরিলা আক্রমণের মূল যেটা থাকে যে, আমরা শত্রুর থেকে আমাদের অস্ত্র চিনিয়ে নেই।” তিনি আবার উল্লেখ করেন, “গেরিলাদের দুটি আলাদা অঞ্চলের সাথের যোগাযোগ দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য বলা যায়।” আমার অবস্থানের সময় দূরবর্তী এলাকা থেকে একটি প্লাস্টিকের বাক্স এবং নির্দেশনামূলক প্রচারনা পোস্টার ও হাতে লেখা মুক্তিবাহিনী পত্রিকার কপি বহন করে একজন গেরিলা আসে।

“বাংলাদেশী বাহিনীরা অত্যাবশ্যক যোগাযোগগুলোর উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করছে।” ছিল ১৮ নভেম্বর টাইমস অব লন্ডনের শিরোনাম। এটি বলে, বাংলাদেশের গেরিলারা দর্শনা শহর আয়ত্তে নিয়েছে। চালনা বন্দরের সাথে দক্ষিণ ও পূর্বের জেলা গুলোর মধ্যবর্তী প্রধান সংযোগ সড়কগুলোর উপর কর্তৃত্ব নেয়ার জন্য মুক্তি বাহিনীর উদ্দেশ্য এই সেক্টরকে আরও পূর্বে বিস্তৃত করা। কুষ্টিয়া, যশোর এবং খুলনার মত গুরুত্বপূর্ণ শহরের কর্তৃত্ব নেয়ার জন্যও এই সড়কের কর্তৃত্ব নেয়া অত্যাবশ্যক।

১৮ নভেম্বরে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এক বিতর্কে জন স্টনহাউজ আবারও ব্রিটিশ সরকারকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বলে। হাউজ অফ কমেন্সের এই বিতর্কে লেবার সরকারের সাবেক ক্যাবিনেট মন্ত্রী বলেন বাংলাদেশে সংঘটিত ধর্ষণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রর নিস্ক্রিয়তা কোন কিছু করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে এবং কিছু উদ্যোগ নেয়া জরুরী যেমন, পূর্ব বাংলা থেকে ইয়াহিয়া খানকে তার সৈন্য বাহিনীকে এসব বন্ধ করতে বলা, শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বলা এবং পূর্ব বাংলার মানুষকে তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা দেয়া।

তিনি বলেন, “আওয়ামীলীগ নেতারা যারা হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাচ্ছে ও পালাচ্ছে, তারা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র ঘোষণা করেছে এবং অস্তিত্বে আসা এই রাষ্ট্রকে আমাদের জানা উচিৎ।”

২৯ নভেম্বর, ১৯৭১

মুক্তি বাহিনীরা এখন সপ্তাহ বাংলাদেশের সকল সেক্টর জুড়ে দখলদার বাহিনীর সাথে হিংস্র যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার শপথ নেয়। “বাংলাদেশের গেরিলাদের দ্বারা শহর মুক্তি” ছিল ২৩ নভেম্বরে মর্নিং স্টার অব লন্ডনের শিরোনাম। এটি বলে, “ইয়াহিয়া খানের বাহিনীর সাথে তুমুল যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশের যশোর জেলার চৌগাছা শহর বাংলাদেশী বাহিনী স্বাধীন করেছে।” এটি আবারও উল্লেখ করে, “চৌগাছা আয়ত্তে আনার পর, যশোর শহরের ১৪ মাইল উত্তর-পূর্বে, ইয়াহিয়া খানের বাহিনী নাভারণ শহরে স্থগিত করে যেখান থেকে তারা বাংলাদেশী মুক্তি বাহিনীর উপর পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছিল।” এটি আবারও বলে, “মুক্তি বাহিনী সপ্তাহান্তে পূর্ব বাংলার সীমান্তে কুষ্টিয়া, খুলনা এবং যশোর জেলায় আক্রমণ করে এবং চৌগাছা দখলের আগে যশোর জেলার ২৩ মাইল উত্তর-পশ্চিমের মহেশপুর অধিকৃত করে।” পত্রিকাটি আবারও লিখে, “পাকিস্তানী সেনা বাহিনী যশোর ও কুষ্টিয়া সেক্টরে ক্রাক কমান্ডোর সাথে সংঘর্ষের পর বিপুল পরিমানে ট্যাঙ্ক প্লেন ও লোকবল হারানোর ফলে সংকটে ভুগছে। কমান্ডোরা এই দুই সেক্টরে অনেক অঞ্চল স্বাধীন করছে।”

এটি আবারও নিশ্চিত করে, “মুক্তিবাহিনী একটি ভয়ানক এবং দুর্দান্ত যুদ্ধের পর খুলনা জেলার সীমান্তবর্তী দেভালা স্বাধীন করে।” বাহিনীটি কালীগঞ্জও দখল করে এবং সেখানে থেকে সামনে অগ্রসর হয়। পত্রিকাটি আবারও বলে, “বাহিনীটি কুষ্টিয়া থেকে ভারতীয় সীমান্ত শহর বানপুর ও গিদি এর কাছের কামান বেষ্টিত শহর জীবননগর ও দামুরহুদা স্বাধীন করতে অগ্রসর হয়। ইয়াহিয়ার বাহিনীর অনেক হতাহত হয় এবং মুক্তিবাহিনীর ২৫ পাউন্ড ওজন কামানের সেলের বিস্ফোরণের শব্দ কৃষ্ণনগরের ২০ মাইলেরও দূর থেকে শুনতে পাওয়া যায়।”

“গেরিলারা বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন করেছে” ছিল ২৩ নভেম্বরের দ্যা টেলিগ্রাফের শিরোনাম। দিল্লি থেকে পত্রিকাটির প্রতিবেদক ডেভিড লোসাকের রিপোর্টে বলেন, “বাংলাদেশে বাংলাদেশ সরকারী গেরিলারা পাকিস্তানী আর্মিদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন করেছে। গেরিলারা কুষ্টিয়া, খুলনা এবং যশোর জেলায় পুনরায় দেখা করার কথা বলেছিল এবং চৌগাছা শহর দখল করেছে।”

লন্ডনের দ্যা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ২৩ নভেম্বরে প্রতিবেদন করে, “মুক্তি বাহিনী বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা যেমন দক্ষিণ থেকে রংপুর এবং উত্তরে সিলেটে পাকিস্তানী ১০টি অবস্থান একযোগে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। শেষ শুক্রবার থেকে চলা যুদ্ধে গেরিলারা পাকিস্তানী বাহিনীর বহু হতাহত করে।” এটি আবারও বলে, “মুক্তিযোদ্ধারা একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর কুষ্টিয়া এবং যশোর জেলার ১৪টি গ্রাম স্বাধীন করে।”

“ফিনান্সিয়াল টাইমের মুল শিরোনাম  ছিল “বাঙালি গেরিলারা চাপ প্রয়োগ করছে।“। করাচি থেকে এদের প্রতিনিধিদের পাঠানো কাগজপত্রের ভিত্তিতে এই সংবাদপত্র লিখেছে, “ মুক্তিবাহিনী গেরিলারা সামরিক প্রশাসনের উপর চাপ বৃদ্ধি অব্যাহত রাখছে…… সামরিক শাসনতন্ত্রের গেরিলাদের তাদের কার্যাবলির বৃদ্ধি রোধ করার জন্য বিগত কয়েক সপ্তাহে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া সত্ত্বেও  প্রতিনিয়ত অন্তর্ঘাতী কার্যাবলির তীব্রতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে এবং কঠিন  করা হচ্ছে। এখানে আরও বলা হয়েছে যে, “ গেরিলাদের বেছে নেয়া লক্ষ্যের মধ্যে শিল্প স্থাপনা, যোগাযোগ ব্যহত করা এবং সরকারের সাথে সহায়তা করা শান্তি কমিটির সদস্যদের গুলি করে হত্যা করা এই উদ্দেশ্যে যে, চারিদিকে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং এই মাত্রা  পর্যন্ত নাগরিক জীবন ও প্রশাসনকে অচল করে দেয়া যাতে তারা স্বাভাবিক পরিস্থিতে ফেরার আশা পরিত্যাগ করে।

নভেম্বর ২২ এ ব্রিটেন এর স্কটসম্যান পত্রিকার শিরোনাম ছিল, “ রাজাকারেরা বাংলাদেশী শক্তিকে সহায়তা করছে”। এখানে বলা হয়, বাংলাদেশে রাজাকারেরা পুর্বের মত বর্তমানে সেই গোষ্ঠী নয়। তারা অন্ততপক্ষে গেরিলাদের কিছু অংশের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য নতুন পন্থা অবলম্বন করেছে। সূত্রমতে, সম্প্রতি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়োগ দেয়া রাজাকারেরা গেরিলাদের সেনাবাহিনীর ব্যাপারে গুরুত্ত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। রাজাকারেরা মুক্তিবাহিনীর কমান্ডোদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমনের পরিকল্পনার পুর্বেই স্থান ত্যাগ অথবা প্রতিরক্ষামুলক অবস্থান নেয়ার জন্য খবর প্রদান করছে। এখানে আরও উল্লেখ করা হয় যে, মুক্তিবাহিনীর সাম্প্রতিক অনেক সাফল্যের পেছনে রাজাকারদের প্রাথমিকভাবে দেয়া তথ্যের ভুমিকা রয়েছে। রাজাকারেরা মুক্তিবাহিনীকে প্রতিরক্ষামুলক সুরক্ষাও প্রদান করছে।

১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১

ব্রিটেনের সমস্ত অংশে এবং অন্যান্য জায়গায় বাঙালিরা বাংলাদেশ সরকারকে ভারত কর্তৃক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। ইয়ান রোডী, ডেইলি এক্সপ্রেসের বিশেষ সংবাদদাতা, প্রথম পৃষ্ঠার বিশেষ সংবাদে বলেন যে, সুদিঘের বিষণ্ণ ও নিশ্চুপ গ্রামবাসীরা আনন্দে অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত।

জন পিলগার, ডেইলি মিরর যার এক দিনে প্রায় পনের কোটি কপি প্রকাশিত হয় তার প্রধান আন্তর্জাতিক প্রতিবেদক ছিলেন প্রথম একজন আগন্তুক যিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ১৯৬৭ এর ইসরায়েল এর ছয় দিন ব্যাপী যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় এবং কর্মক্ষম একটি সফল ঘটনা।  একজন বাংলাদেশী বৃদ্ধ পিলগারকে বলেন যে, “ আমার বন্ধু, তুমি দেরি করে ফেলেছ। তারা আমাদের অনেক নারী এবং মেয়েদের এবং অনেক তরুণকেও মেরে ফেলেছে। কিন্তু  তবুও আমরা আনন্দিত যে আমরা জয় বাংলা পেয়েছি”।

এখানে এবং পশ্চিমের বিভিন্ন অংশে যে প্রতিক্রিয়া পুর্ব বাংলার বিভিন্ন অংশে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনার কারণে সৃষ্টি হয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান হয় যে, এটিকে যুদ্ধের কার্যক্রমের প্রচেষ্টার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। দ্য টাইমস অফ লন্ডনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাস্তবসম্মত নীতিমালা অনুসরণ করার জন্য এবং এই পরিক্ষায় শক্তি প্রদর্শনের জন্য ভারতকে দোষারোপ করা ভুল হবে। দীর্ঘ ৮ মাস যাবত পাকিস্তানী সরকার পুর্ব অংশের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এখানে আরও বলা হয়েছে যে,  তারা এখন নিজেদেরকে বিনা উস্কানিমূলক আক্রমনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করে আন্তর্জাতিক সাহায্য নিজেদের দিকে  আনতে পারার আশা করতে পারে না। এবং ইন্ডিয়া যদি হিসেব করে দেখে যে তাদের নেয়া সত্ত্বর পদক্ষেপের কারণে মানব দুর্দশা কমে আসবে, তবে তাদেরকে কেউ ঢালাওভাবে ভুল বিবেচনার দোষ সহজে দিতে পারবে না। টাইমস অফ লন্ডন একই অনুচ্ছেদে বলেছে যে, যাইহোক, সেই মুহুর্তের জন্য পাকিস্তান সরকার তীব্রভাবে তার আরোপের প্রাপ্তি স্বীকারের  ইচ্ছা প্রকাশ করেছে এবং বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

অপরপক্ষে, পশ্চিম জার্মানি এবং ফ্রান্সের পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত মন্তব্য সাধারনত একই সংবাদের প্রতি ইঙ্গিত করে। লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়ার সম্ভাব্য লক্ষ্য ছিল ইন্ডিয়াকে রণকৌশলে হারানোর জন্য বাঙালিদের সাথে নিয়ে একটি বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছে।

ডিসেম্বর ৬ এর টাইমস অফ লন্ডনে বলা হয়েছে, “যেহেতু পাকিস্তান বিশ্ব নেতাদের করা সকল আবেদনের সতর্কবানীকে প্রত্যাখান করেছে, ইন্ডিয়া বিশ্বাস করে যে বাংলাদেশের জন্য সমাধান জারি করার জন্য তার আওয়াজ তোলা ব্যতীত ভিন্ন রাস্তা নেই। এখানে আরও বলা হয়েছে যে, পূর্বে ২৫ মার্চ থেকে পাকিস্তানী ব্যবহারের নির্মমতা বিবেচনা করে, শত কোটি শরনার্থীর উপর চাপিয়ে দেয়া দুর্দশা বিবেচনা করে এবং বাংলাদেশের প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের পেছনে শক্ত যুক্তির কথা চিন্তা করে পাকিস্তান দুর্বল এবং কলঙ্কিত দলিলের মাধ্যমে এই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছে। ডিসেম্বর ৬ এ টাইমস অফ লন্ডনের পরামর্শ অনুযায়ী, “ এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উত্তম পন্থা হতে পারে বাংলাদেশে ইন্ডিয়ার একটি আশু বিজয় যাতে ইন্ডিয়া পশ্চিম পাকিস্তানী আক্রমনকে প্রতিহত করতে পারে।

স্যার এলেক ডগলাস হিউম, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব, হাউস অফ কমন্সে দেয়া বক্তব্যে ভারতীয় উপমহাদেশের উপর কোন প্রকার মূল্যবিচার থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন। বিরোধীদলীয় নেতা মি হ্যারল্ড স্যার এলেকের মনোভাবের মত নিজেকে যুদ্ধের উপর উত্থিত কোন সমস্যার চটজলদি বিচারে না পৌঁছনয় নিজেকে যুক্ত করেছেন।

মি জন স্টোরহাউস, পার্লামেন্টের নেতৃ সদস্য এবং সাবেক  মন্ত্রীপরিষদ সদস্য স্যার আলেককে ইউ এন প্রস্তাবনে সমর্থন না করার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অধিকারকে স্বীকৃতি না দেয়ার জন্য বিশ্ব নেতৃবৃন্দ দোষারোপের যোগ্য।

১১ ডিসেম্বর, ১৯৭১

পূর্ব জার্মানির সংবাদ সংস্থা এডিএনের মাধ্যমে প্রচার হওয়া একটি বক্তব্যে পুর্ব জার্মানির সরকার সোভিয়েতের স্থানকে সমর্থন দিয়ে বলে যে ভারতীয় উপমহাদেশে এই রক্তপাত অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। এই বক্তব্য বলা হয় যে, “ পূর্ব জার্মানি ভারতীয় উপমহাদেশের পরিস্থিতির উপর উদাসীন ছিলনা এবং এখনও নয়”। এখানে বলা হয়, “ বিশ্ব শান্তি রক্ষার্থে নিয়োজিত দায়িত্ববান সরকার প্রধানেরা বাংলাদেশে একটি শান্তিপূর্ন সমঝোতা নিশ্চিত করার জন্য পাকিস্তানের কাছে অনেকবার আবেদন করেছেন কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া খান এটির পক্ষে সাড়া দেননি।

প্যারিসে ফ্রেঞ্চ কমিউনিস্ট পার্টি একটি বক্তব্যে বলেছে “ ইন্ডিয়ার সাথে পাকিস্তানের যুদ্ধাবস্থায় যাওয়ার ঘোষণা এশিয়ায় একটি অত্যন্ত ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে”। এই বক্তব্যে আরও বলা হয় যে, “ এই দ্বন্দ্ব গত বছর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্যাপক সাফল্যকে ইয়াহিয়া খানের সরকার স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করায় আরও ত্বরান্বিত হয়েছে” ।

কমিউনিস্ট পার্টির সংবাদপত্র লা হিউমানিতে তে  একজন ভাষ্যকার বলেন যে, “ এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপুর্ন ব্যাপার যে এখনও তারা তাদের মুল লক্ষ্যকে হারিয়ে যেতে দেয়নি। এবং এই ৮ মাসব্যাপী এই কার্যপরম্পরা এখন শুধুমাত্র একটি ইন্দো-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব নয়, একটি যুদ্ধ যা বাংলাদেশের উপর পাকিস্তানী সামরিক সরকার ছেড়ে দিয়েছে।

ডিসেম্বর ৭ এর টাইমস অফ লন্ডন লেখে, “ ইন্ডিয়া এখন বাংলাদেশে যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাপ্তি নিশ্চিত করতে চাইছে এই আশায় যে এটি করলে সামরিক শক্তির পতন শীঘ্রই ঘটবে। সমঝোতার কোন স্থান নেই, কোন অংশ থেকে কোন প্রতিবাদের জায়গা নেই, জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবনা হবে না এবং পর্যবেক্ষকদের যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে অবস্থান ইন্ডিয়ার সংকল্পকে পরিবর্তন করবে না।লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ বলেছে, “ ইন্ডিয়ার নীতি এবং পরিস্থিতি যা বাংলাদেশ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পৌঁছানর কথা বিবেচনায় আনলে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবিকপক্ষে যুক্তিযুক্ত হয়েছে।

 দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, “ বাংলাদেশ যা সংকল্প ও রক্তের মাধ্যমে জন্মেছে এখন হার স্বীকার করবে না। এমনকি যদি শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা  মিসেস গান্ধীর আওয়ামী লীগ সরকারের স্বীকৃতি সফল হয় তবে এই সরকার বাস্তবিক আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রন দ্বারা সমর্থিত হবে। রয়টার্স প্রতিবেদন দিয়েছে যে, “ রেডিও মস্কো আজ বর্তমান পরিস্থিতে জাতিসংঘে ইন্দো-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে শান্তিপুর্ন সমাধান খুজে বের করার জন্য চীনের আন্তরিকতার অভাবকে দায়ী করেছে”। এখানে আরও বলা হয় যে, “ চীন পুজিবাদীদের সাথে মিলিত হয়ে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে”।

ডিসেম্বর ৭ এর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস রাষ্ট্রপতি নিক্সনকে ইন্দো- পাকিস্তান দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষতার আড়ালে পাকিস্তানকে সমর্থন দেয়ার জন্য দায়ী করেছে। সকল সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশে নিপীড়ন বন্ধ করার জন্য অথবা আসল রাজনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগে সবকিছু ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে স্পষ্টভাবে ইন্ডিয়াকে এই চলমান আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব এর পেছনে প্রধান দায়ী বলে অভিহিত করেছে যা কয়েক মাস অপেক্ষা করেছে পাকিস্তানে অস্ত্র সাহায্য পাঠানো বন্ধের পেছনে। প্রশাসন এখন তাৎক্ষণিকভাবে ইন্ডিয়ায় অস্ত্র সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছে। এটিকে কোনভাবেই পুরোদস্তর নিরপেক্ষতা বলা যায় না। এই সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয় যে, “  জাতিসংঘে প্রথমে নিরাপত্তা পরিষদ এবং এখন সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্য প্রচেষ্টা হল একটি সাধারণ অস্ত্রবিরতি চুক্তি তৈরি এবং সৈন্য প্রত্যাহার”।এই ধরনের কার্যক্রম নিশ্চিতভাবেই জরুরি এবং প্রয়োজনীয়, কিন্তু কার্যগতভাবে এটি সফল হতে পারবে না যতক্ষণ না জাতিসংঘ এবং এর প্রধান সদস্য দেশগুলো বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্র একই সময়ে স্বীকৃতি দেয়া এবং পাকিস্তানের সাথে এই সমস্যার মূল কারণ নিয়ে কাজ করার প্রচেষ্টার জন্য তৈরি হচ্ছে।

রাষ্ট্রপতি নিক্সনের সম্মান বাচানোর জন্য শেষ মরিয়া চেষ্টা হিসেবে তিনি বলেন যে দক্ষিণ এশিয়া দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে আমেরিকা একদম নিরপেক্ষ থাকবে। সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয় যে, “ ইন্দো-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে রাষ্ট্রপতি নিক্সনের পুর্ন নিরপেক্ষতার ঘোষণা প্রশাসনিক রাজনিতিকে লুকোতে ব্যর্থ হয়েছে,  যেটি আসলে ইসলামাবাদে ইয়াহিয়া খানের সরকারের পক্ষে নিশ্চিতভাবেই পক্ষপাতদুষ্ট”।