ওয়েস্ট কোস্টে বসবাসকারী বাঙালী দের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতা ও তৎপরতার উপর প্রতিবেদন

Posted on Posted in 4

<৪,১৪৭,২৭৩-২৭৮>

অনুবাদকঃ আরিফ রায়হান, সজীব কুমার সাহা, মোঃ মোসাব্বিরুল হক

    শিরোনাম       সূত্র      তারিখ
১৪৭। ওয়েস্ট কোস্টে বসবাসকারী বাঙালী দের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতা ও তৎপরতার উপর প্রতিবেদন “ওয়েস্ট কোস্ট নিউজ বুলেটিন”-আমেরিকা লীগ অব বাংলাদেশ ১ জুন, ১৯৭১

 

আমেরিকা লীগ অব বাংলাদেশ

ওয়েস্ট কোস্ট নিউজ বুলেটিন

প্রিয় দেশপ্রেমিকগণ  

শুভেচ্ছা জানবেন!

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আট সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট কোর্টে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য  নিজেদের মধ্যে সাহায্য, সহযোগিতা এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল । সেই উদ্দেশ্য ২২ মে ১৯৭১ সালে সান ফ্রান্সিসকোতে পারস্পারিক সহযোগিতা এবং যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য একটি মিটিং ডাকা হয়েছিল, যেখানে লস এঞ্জেলস, ব্রেকলি, স্ট্যানফোর্ড এবং সান ফ্রান্সিসকোতে থাকা বাঙালিরা অংশ নেয় ।

যেহেতু বাঙালিরা সবাই বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিল,  তাই একটি শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থার দরকার হয়েছিল, যাতে করে সবার প্রচেষ্টা আর উদ্যম একত্র করা যায়। এর মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় রোধ করা সম্ভব হবে, যেমন দূরবর্তী ফোন কল ইত্যাদি এবং অপ্রয়োজনীয় শারীরিক শক্তির ব্যয়। এই খবরটি ছিল বাঙালিদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রথম প্রচেষ্টা।

২২ মে এর মিটিং এ ব্রেকলি, লস এঞ্জেলস, স্ট্যানফোর্ড আর সানফ্রানসিসকো প্রবাসীরা কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

১. প্রধান সমন্বয়ক থাকবেন লস এঞ্জেলসে এবং সেখান থেকেই সবার সাথে যোগাযোগ করবেন, যারা ব্রাকলির ওয়েস্ট কোর্ট, সসানফ্রানসিসকো, স্ট্যানফোর্ড, সানডিয়াগো, সান্তা বারবারা, ডেনভার (কলরাডো) এবং টাকসান(এরিজোনা)-তে আছেন।  এটি আরো কয়েকটি রাজ্যের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবে যেমন হাওয়াই, ডালাস আর পিটসবার্গ (কানসাস)।

২. সক্রিয় যোগাযোগব্যবস্থা থাকবে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো এবং মিশিগান এর সাথে যা প্রধান নির্বাহীগণ পরিচালনা  করবেন  এবং তারা সকল নির্দেশনা  গ্রহণ করবেন, যা বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে প্রেরণ করা হবে আর সেগুলো পৌছে দেয়া হবে সকল ওয়েস্ট কোর্ট ইউনিটে।

৩. সকল ইউনিটের মধ্যে তথ্য আদান প্রদান করতে হবে। আর সেই তথ্য পৌছে দিতে হবে সকল সদস্যের কাছে।

৪. বৈদেশিক মুদ্রার ৫% শতাংশ, যার পুরোটা সংগ্রহ করা হবে ওয়েস্টকোর্ট প্রবাসীদদের কাছ থেকে, তা লস এঞ্জেলস থাকা সদস্যরা খরচ করবেন প্রচারণা আর নির্দেশনার কাজে ।

৫.  সাধারণত প্রত্যেক  ইউনিটই  প্রকাশ  করবে  পাকিস্তানি  সেনারা  কি পরিমাণ  নৃশংসতা  আর  বর্বরতা চালিয়েছে  আমাদের  দেশে  এবং  ছড়িয়ে  দেবে  পুরো  আমেরিকার  জনগণের  মাঝে আমাদের  স্বাধীনতার  বৈধতা দেয়ার জন্য ।

 ৬.  তহবিল সংগ্রহের  সকল  বিবৃতি  লস  এঞ্জেলসে জমা  দিতে  হবে।

 ৭.  একটি প্রধান  তালিকা  থাকবে,  যেটি  প্রস্তুত  করা  হবে  সকল  অধিবাসী এবং সহানুভূতিশীলদেরকে সাথে  নিয়ে,  যারা  সাহায্য  করতে  ইচ্ছুক,  তাদের  নাম  প্রত্যেক  ইউনিট  থেকে  লস এঞ্জেলসের সমন্বয়কের কাছে  পাঠা তে  হবে ।

৮.  বার্কলিতে থাকা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের  অধ্যাপক ড. জ্যোতি দাস গুপ্তকে  রাজনৈতিক তথ্য ও রাজনৈতিক চিঠিপত্র লিখতে আগ্রহী যে কাউকে পরামর্শ প্রদান করবেন।

ওয়েস্ট কোস্ট ইউনিটে থাকা কয়েকজন সমন্বয়কের নাম-ঠিকানা নিচে উল্লেখ করা হল। অন্যান্য ইউনিতকে তাদের নাম-ঠিকানা লস এঞ্জেলসে তাদের সমন্বয়কদেরকে পাঠানোর অনুরোধ জানানো হল।

লস এঞ্জেলস :

১.  জনাব  আবুল  হাই  সাদ্দুদ্দিন  ৫০৫,  গ্যালে  অ্যাভিনিউ  ৪০১,  লস এঞ্জেলস,  ক্যালিফোর্নিয়া,  ৯০০২৪,  টেলি : (২১৩) ৪৭৮ – ৩১৬৬

২.  জনাব  চন্দন  দাস,  ১৬২১  গেলডন  অ্যাভিনিউ  ৭,  লস এঞ্জেলস,  ক্যালিফোর্নিয়া,  ৯০০২৪,  টেলি : (২১৩) ৪৭৫ – ২৯৪৬

বার্কলি :

১.  জনাব জামাল  মুন্সী,  ১২১৫  কাইন্স  বার্কলি,  ক্যালিফোর্নিয়া,  টেলি : (৪১৫) ৫২৪ – ৮৫৩৩

২.  ড.  জ্যোতি  দাস  গুপ্ত,  টেলি : (৪১৫) ৫২৪ – ৮৫৩৩

সানফ্রানসিসকো :

১.  মিস আমিনা পান্নি,  ৭৭০  লেক  মার্সিড  বেলভিউ,  সানফ্রানসিসকো,  ক্যালিফোর্নিয়া,  ৯১৪৩২,  টেলি : (৪১৫) ৪৬৯ – ৩১৭৯

২.  জনাব  এ বি এম  ফারুকী,  টেলি : (৪১৫) ৪৬৯ – ৩১৭৯

স্ট্যানফোর্ড :

১.  ডা.  রফিক  রহমান,  ৬১০  সার্কেল  ড্রাইভ,  এপার্টমেন্ট – ১

পোল  এল্টো

ক্যালিফোর্নিয়া।  ৯৪৩০৩

টেলি : (৪১৫) ৩২৫ – ৫৭৯৬

সান্তা  বারবারা

১.  মিস  পারমিতা  ঘোষ,  ৬৫২০  সারভেন্টিস  রোড।   ২২ গোলেটা,  ক্যালিফোর্নিয়া  ৯৩০১৭

টেলি : (৮০৫) ৯৬৮ – ১৩৭২

সান ডিয়াগো :

 ১.  জনাব  রনধীর  মিত্র  ৩৯০৩-এ  মিরা মের  স্ট্রিট,   লা  জোলা,  ক্যালিফোর্নিয়া – ৯২০৩৭

ডেনভার(কলোরাডো)

১. ডাঃ জনাব শের আলি

৬৪০১ ওয়েস্ট কলফেক্স

ডেনভার, কলো ৮০২১৪

টেলি: (৩০৩) ২৩৭-৭৩৭৫

টুস্কান, অ্যারিজোনা

২. ডাঃ এম. শফিকুল্লাহ

১৭৩৬ই, ব্রডওয়ে

টুস্কান, অ্যারিজোনা ৮৫৭১৯

টেলি: (৬০২) ৬২৪-৫৪৫৮

 

………………..

প্রতিরোধ সংবাদ

(১৭ মে, ১৯৭১ সালে শিকাগো থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ নিউজলেটারের উদ্ধৃতাংশ)

 

পাকিস্তান সরকার নানা রকম মিথ্যার মাধ্যমে এদেশে অবস্থিত বাঙালিদের বোঝাতে চেষ্টা করছে যে , দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে এবং পুরো স্বাধীনতা আন্দোলনটি আসলে ভারতের মদদপুষ্ট একদল দুষ্কৃতিকারির পরিকল্পনা মাত্র। এই সবকিছুই অর্থহীন। এসব চিঠি আসা বন্ধ করতে না পারলে সব ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিন।

 

আজকাল এই দেশে সংবাদপত্র কোন প্রতিরোধ খবর বহন না করার প্রধান কারণ হল, পাকিস্তান সেনাবাহিনী সফলভাবে কলকাতা এবং বাংলাদেশের পশিমাঞ্চলের মাঝের একমাত্র সড়কপথটি বন্ধ করে দিয়েছে। এটি এই অঞ্চলের কলকাতাভিত্তিক বিদেশী সাংবাদিকদের যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহের সংবাদ সংগ্রহের প্রধান পথ ছিল। যাই হোক না কেন, ভারতের সাথে বাংলাদেশের ১৩০০ মাইলের সীমানা খোলা রয়েছে। ভারতীয় সাংবাদিক এবং আমাদের জনগণ সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিরোধ সংবাদ নিয়ে সীমানা অতিক্রম করছে।

 

একজন বাংলাদেশী প্রতিনিধি, যিনি মাত্রই দেশে এসেছেন, লিখেছেন: “সিলেটের চা বাগান এলাকা, যা প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রদান করে এখনও বাঙালি সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে”। একটি বাহিনী এখনও পার্বত্য চট্টগ্রামের বাহিরে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সমগ্র বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সশস্ত্র বাঙালিদেরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং গেরিলা আক্রমণের মাধ্যমে সেনা ইউনিটকে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। এ ধরণের ঘটনার, যেমন প্রতিরোধের যুদ্ধবিগ্রহের পুনরাবৃত্তি এবং প্রবলতা বৃ্দ্ধির জন্য প্রয়োজন হয় ভাল দক্ষতার, অস্ত্রসম্ভারের অতিরিক্ত সরবরাহ, যার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিকট হতে উদ্ধার করা হয়েছে এবং মৌসুমী বায়ু সেনাবাহিনীর নিরাপত্তার যৌক্তিক সমস্যা সৃষ্টি করবে। রাজনৈতিক প্রেরণা এবং সেনাবাহিনী কর্তৃক জনগণের ওপর পরিচালিত নির্বিচার অত্যাচার জনগণের দীর্ঘ যুদ্ধে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। তাদের কামানের আয়ত্তে থাকা গ্রামগুলোকে ধ্বংস করে এবং আগুন হতে নিরাপদ অঞ্চল ঘোষণা করে ৭ কোটি ৫০ লক্ষ বাঙালির নিরাপত্তা বিঘ্ন করা পাকিস্তানি বাহিনীকে ঘৃ্ণার বস্তুতে পরিণত করেছে এবং সরাসরি হুমকি প্রদান করেছে ।

আরও একজন বাঙালি, যিনি এক মাস আগেই এ দেশ ছেড়েছেন, আগরতলা থেকে তিনি লিখেছেন: “প্রতিদিন শয়ে শয়ে তরুণকে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ওরা এত দ্রুত কীভাবে সব শিখে নিচ্ছে, সেটি খুবই আশ্চর্যের। এখানে আসতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। তা নাহলে আমি বাঙালিদের এই আত্মত্যাগ, দেশের জন্য তাঁদের ভালবাসা এবং তার স্বাধীনতা ও সম্মানের জন্য তাঁদের জীবন দিয়ে দেয়ার ইচ্ছা সম্পর্কে আমি জানতেই পারতাম না”।

উল্লেখযোগ্য সংবাদ

বার্কলে: ২৮ মে, ১৯৭১ তারিখে ভারতে বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে উস্তাদ আলি আকবর খান (প্রখ্যাত সারোদশিল্পী), জনাব জন হ্যান্ডি (মার্কিন জ্যাজশিল্পী) ও জনাব জাকির হুসেইন (ল্যাবিয়া) এর একটি কন্সার্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। টিকেট বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ৩০০০ ডলার এবং অত্র স্থানে সরাসরি দানকৃত অর্থ থেকে প্রায় ৫০০ ডলার সাহায্য উঠেছিল।  

স্যান ফ্রান্সিস্কো: ২ জুন, ১৯৭১ তারিখে একটি ডেমোন্সট্রেশনের আয়োজন হতে যাচ্ছে।

লস এঞ্জেলস: সকল সদস্য প্রতি মাসে সংস্থায় ১০ ডলার করে দিতে রাজি হয়েছেন এবং আমরা আশা করি, অন্যান্য ইউনিটের সদস্যরাও এতে রাজি হবে। অর্থসাহায্য আসছে এবং আরও আসার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ১১ জুন, ১৯৭১ তারিখে একটি ডেমোন্সট্রেশনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

টুস্কোন (অ্যারিজোনা) অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে প্রচারণা চলছে এবং অর্থসাহায্য আসছে।

ডেনভার (কলরাডো): স্থানীয় সভা গঠিত হয়েছে এবং অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা বর্ণনা করে এই পুস্তিকাটির সাথে একটি সংযুক্তি দেয়া হল। বাংলাদেশে একটি অথর্ব সরকার গঠনের জন্য পাকিস্তানি সেনা শাসকরা যাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছে, তাদেরকে নিয়ে একটি মূল্যায়নও এতে দেয়া হয়েছে।

একটি আবেদন

লস এঞ্জেলসের সদস্যদের জন্য প্রতি মাসে কমপক্ষে ১০ ডলার করে চাঁদা নির্ধারিত হয়েছিল। চাকুরিজীবী ও এর থেকে বেশি দান করার সামর্থ্য যাদের আছে, তাদেরকে যেন এটি বাধা দান না করে। ইতিহাসের এই সংকটময় মুহূর্তে যখন কোটি কোটি মানুষ দুঃখ-দুর্দশায় দিনাতিপাত করছে, তখন আমাদের উচিত নিজেদের আয়েশ আর ধন-দৌলত থেকে তাদের জন্য কিছু করা। যারা চাকুরিজীবী এবং সামর্থ্যবান, তাদেরকে সাধ্যমত, বিশেষ করে নিজেদের মাসিক নীট আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ দান করার জন্য আহ্বান জানানো হল। স্ট্যানফোর্ডের ড. রকিকুর রহমান মাসিক নীট আয়ের ৫% দান এবং স্থানীয় হেড অফিসে হস্তান্তর করার পরামর্শ জানিয়েছেন।   

 

অ্যামেরিকান লিগ অভ বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত

সভাপতি জনাব এস এম এস দোহা

৪১৬ সিনক্লেয়ার অ্যাভিন্যু, গ্লেনডেল, ক্যালিফ, ৯১২০৬

জেনারেল ইয়াহিয়ার পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছে কারা?

জাতীয় নির্বাচনে ১৬৯ টির মধ্যে ১৬৭টি আসন এবং প্রাদেশিক নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে ৩১০ টির মধ্যে ২৬৯ টি আসন নিশ্চিত করার পর ইয়াহিয়া আওয়ামি লীগকে নিষিদ্ধ করে এবং পুর্ব পাকিস্তানের ‘যুক্তিসংগত’ ও ‘প্রতিনিধিত্বমূলক’ ব্যক্তিবর্গের সাথে আলোচনা করে ‘গণতান্ত্রিক উপায়’-কেই তিনি মঞ্জুর করবেন বলে জানান। 

ব্যাপক অনুসন্ধান আর নিগ্রহের পর আওয়ামি লীগ থেকে মাত্র দু’জন সংসদ সদস্যের খোঁজ পাওয়া গেছে, যারা সেনাদেরকে সমর্থন করে। কিন্তু উন্নয়নের আগেই ইয়াহিয়া বক্তব্য দেন এবং তাতে সেইসব রাজনীতিকদেরকেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যারা একটি “নাগরিক কমিটি” গঠন করেছে এবং সামরিক শাসক সরকারকে পূর্ণ সমর্থন প্রদান করেছে। চলুন দেখা যাক, কারা এই প্রতিনিধিরা:

নূরুল আমিন: জনাব আমিনকে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতা হিসেবে প্রাদেশিক এম এলের বিরুদ্ধে নিযুক্ত (নির্বাচিত নয়) করা হয়েছিল। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্য মন্ত্রী হওয়ার পরপরই তিনি এবং তার মন্ত্রীসভা ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন। আইয়ূব শাসনের বিরোধিতার জন্য জনাব আমিন হারানো সম্মান ফিরে পান এবং গত নির্বাচনে ময়মনসিংহে একটি আসন লাভ করেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে তার অন্যান্য দলের আশিজন প্রার্থীর প্রত্যেকেই হেরে যান। জনাব আমিন তাই একটির বেশি নির্বাচন কেন্দ্রের প্রতিনিধিত্ব করেন না এবং বাঙালিরাও তাকে নেতা হিসেবে বিবেচনা করে না।

ফজলুল কাদের চৌধুরী: রুক্ষ আচরণের জন্য বিখ্যাত। জনাব চৌধুরী আয়ূব খানের দালাল হিসেবে বিশেষ কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এমনকি তিনি, সবুর খান ও মোনেম খান ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্নকরণে আয়ূব শাসনের প্রধান হাতিয়ার। গত নির্বাচনে তিনি প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসনের বিরোধিতা করেন এবং চট্টগ্রামে ২৫,০০০ এরও বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। তিনি এমনকি নিজের পরাজয় মেনে নেয়ার সৌজন্যও দেখান নি এবং ৭ ডিসেম্বরকে “পূর্ব পাকিস্তানের বাচ্চাদের দিন” হিসেবে ঘোষণা দেন। (ডন, ১৪ দিসেম্বর, ১৯৭০) 

খান এ. সবুর: জনাব চৌধুরীর মত জনাব সবুরও আয়ূব সরকারের সাথে হাত মেলান এবং পূর্ব বঙ্গে সবচেয়ে ঘৃণিত তিনজন ব্যক্তির মধ্যে একজনের পরিণত হন। প্রতারণার মাধ্যমে নির্বাচনের জেতার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জনাব সবুর গত নির্বাচনের সময় সাহায্য পান এবং প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি আসলে সর্বশেষ খুলনা-৬ আসনে ৮৪,০৫৪ ভোটের বিপরীতে ৬.২৮৮ ভোটে হেরে যান।

মৌলভি ফরিদ আহমেদ: মৌলভি ফরিদ, তিনি স্বভাবতই পূর্ব পাকিস্তানে আয়ূব শাসনামলে বিখ্যাত ছিলেন, প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসনের বিরোধিতা করতে গিয়েই তিনি জনগণের বিশ্বাস হারান। গত নির্বাচনে চট্টগ্রামে নিজ কেন্দ্রে মোট ভোটের মাত্র ৩০ শতাংশ পেয়ে পরাজিত হন।

মালিমুদ আলি: বামদের একসময়ের “প্রাণ” জনাব আলি মাওলানা ভাসানির ওপর আক্রমণ করে এবং পশ্চিম পাকিস্তানি নওয়াব, যেমন পিডিপির নবাবজাদা নাসরুল্লাহর সাথে হাত মেলাতে গিয়ে সিলেটে নিজ কেন্দ্রের সমর্থন হারান। গত নির্বাচনে বিজয়ীর ৫৩,৭৪৯ ভোটের বিপরীতে ১৫,৬২৮ ভোট পেয়ে করুণভাবে চতুর্থ হন।

খাজা খাইরুদ্দিন: পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ পরিষদের নেতা জনাব খাইরুদ্দিন ঢাকা গত জাতীয় নির্বাচনে শেখ মুজিবুরের কাছে ১,৬৪,০০০ ভোটের বিপরীতে ৪০,০০০ হাজার ভোট পেয়ে পরাজিত হন।

গোলাম আযম: গত নির্বাচনে জামায়াত এ-ইসলামির অধ্যাপক গোলাম আজম জহিরুদ্দিনের ১,১৬,২()৪ ভোটের বিপরীতে ৩৫,৫২৭ ভোট পেয়ে ঢাকার ভোটারদের সমর্থন হারান।

সামরিক শাসকদের “প্রতিনিধি” হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে আরও অনেকেই আছেন, যাদের জনগণের সাথে যোগাযোগের পরিস্থিতি উপরিউল্লিখিতদের চেয়েও খারাপ।

আমরা কি তাহলে এদেরকে এর পরেও পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি বলব? এদেরকে নিয়ে কি কোন রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব? ইতিহাস থেকে কি আমরা এটি শিক্ষা পাইনি যে বিভীষণ, ডিয়েম, থিউস, কিস এবং লন নোলসদের মত মানুষদেরকে নিয়ে রাজনীতি হয় না? এটা যে নিজের সাথেই প্রতারণা, তা কি আমরা বুঝতে পারছি না?

চলুন নিজেদেরকে আমরা আর না ঠকাই। চলুন নিজেদেরকে এই নিষ্ঠুর খেলার বলি না বানাই।

 

চলুন কারণগুলোকে খতিয়ে দেখি।

আওয়ামি লীগ ও তাদের প্রোগ্রামে আমাদের জন্য কী বলা আছে, তা কোন বিষয় নয়। কিন্তু বাঙালি জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন সমঝোতা চলবে না।

পূর্ব বঙ্গ ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয়ের জনগণের আত্ম-নির্ধারণের অধিকারের মধ্যেই রয়েছে মুক্তি। আর তখনই রক্তপাত ও ঘৃণা হ্রাস পাবে।

চলুন সবাইকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিই।

বাঙালিদের সাথে সংহতি রেখে পশ্চিম পাকিস্তানি নাগরিকবৃন্দ কর্তৃক প্রকাশিত।