কঙ্কালের মিছিল এখানে

Posted on Posted in 8

২১। কঙ্কালের মিছিল এখানে (৩৯৩-৩৯৪)

সূত্র – দৈনিক সংবাদ, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২

নরপশু পাকসেনাদের ধ্বংসযজ্ঞের আর এক অধ্যায়ঃ কঙ্কালের মিছিল এখানে

বাংলাদেশের প্রতিটি গৃহাঙ্গন যেন এক একটি বধ্যভূমি। প্রতিটি ভিটা এক একটি শহীদ মিনার। পল্লীর শ্যামল দিগন্ত তাই বেদনায় মলিন। বিস্তৃত মাঠের মাটি ঘাসে লেগে আছে শহীদের রক্ত। নরসিংদী শহরের অদূরে নরসিংদী তারাবো রাস্তার খাটারা পুলটিও হানাদার জল্লাদদের একটি বধ্যভূমি। নরপিশাচরা এই সেতুটিকে পরিণত করেছিল নির্যাতন কেন্দ্রে ও বধ্যভূমিতে।

হায়েনার দল পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে তরুণ, তরুণী, ছেলে, বুড়ো নির্বিচারে সকলকে ধরে নিয়ে আসতো এখানে। ওদের উপর চলত নির্যাতন। নির্যাতনের পর্ব চুকলে তাঁদের হত্যা করে লাশগুলো পুলের আশেপাশে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হতো। হত্যা লীলার নীরব সাক্ষী এই পুলের চারিদিকে বহু নর কঙ্কাল ও মাথার খুলি আজও ছড়িয়ে আছে।

ব্যাপক অনুসন্ধানে পাক বাহিনীর নিষ্ঠুরতা নির্যাতন ও পাইকারী নরহত্যার অনেক মর্মান্তিক কাহিনী প্রকাশ হতে পারে বলে সকলে মনে করেন। স্থানীয় সমাজ কর্মীরা অনুসন্ধান চালিয়ে ইতিমধ্যেই খাটার পুলের আশেপাশে পতিত জমি থেকে বহু নরকঙ্কাল উদ্ধার করেছেন। এসব নর কঙ্কালের মধ্যে একটি কঙ্কাল জনৈক মহিলার বলে অনুমান করা হচ্ছে।

কঙ্কালগুলোর আশেপাশে পাওয়া পোশাক পরিচ্ছদ ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা হতভাগ্য ব্যক্তিকে সনাক্ত করা সম্ভব নয়। তেমনি অনুমানের ভিত্তিতে ঐ কঙ্কালটি কোন যুবতীর বলে ধারণা হচ্ছে। কারণ কঙ্কালটির হাতে কাঁচের চুড়ি রয়েছে। আরও একটি কঙ্কাল সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে সেখানে। এই কঙ্কালটি শিবপুর থানার করার চর গ্রামের জনৈক ব্যক্তির। পোশাক পরিচ্ছদ দেখে আরও দুটি কঙ্কাল সনাক্ত করা হয়েছে। সম্ভব কঙ্কাল দুটি নরসিংদী মহাবিদ্যালয়ের নিখোঁজ দুজন হিন্দু অধ্যাপকের বলে উদ্ধারকারীরা ধারণা করছেন।

তাঁত বস্ত্রের জন্য সমাধিক প্রসিদ্ধ সেখের চরের জনৈক সমাজকর্মী আমাদের প্রতিনিধিকে জানান যে, বিভিন্ন এলাকা থেকে যুবতীদের ধরে এনে হানাদার পাক সেনারা নরসিংদী টেলিফোন এক্সচেঞ্জে নিজেদের পাশবিক প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতো। যারা নরপশুদের কাছে আত্মসমর্পণ করতো না তাঁদের হত্যা করা হত। তারপর সেই মৃতদেহের উপর পাশবিক প্রবৃত্তি চরিতার্থ করে পাশগুলো ফেলে দেওয়া হতো।

এই এক্সচেঞ্জেই নরপশুরা ক্যাম্প খুলেছিল। এখান থেকেই নরপশুরা দালালদের সাহায্যে রাতে গ্রামে হানা দিয়ে বাঙ্গালী নর-নারীদের ধরে আনতো। তারপর তাঁদের উপর চালাত বর্বর অত্যাচার। নির্যাতন শেষে তাঁদের এই খাটারা পুলের কাছে এনে হত্যা করতো। পাচদোলাপুল ও খাটারাপুল ছাড়াও আরও কয়েকটি বধ্যভূমি রয়েছে নরসিংদীতে। সেগুলো হচ্ছে পুটিয়া পুল, সানখোলা পুল, খাসির দিয়া, রায়পুরা থানার হাঁটু ভাঙ্গা, বাদুয়ার চর রেলপুল। এসব বদ্ধভূমিতে কত বাঙ্গালী লাঞ্ছিতা, ধর্ষিতা, মা-বোনের বিদেহী আত্মা আজো হাহাকার করে ফিরছে তার হিসেব কেউ দিতে পারবে না।

বাংলার মানুষদের হত্যা করে, তাঁদের বসতবাটি জ্বালিয়ে, সম্পত্তি লুট করে কৃষকের গবাদি পশু জবাই করে, মাঠের ফসল বিনষ্ট করেই এসব নরপশুরা ক্ষান্ত হয়নি, তাদের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায়নি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, এমনকি মসজিদ মন্দির গির্জাও। স্যার কে, জি, গুপ্ত হাই স্কুলটিও এইসব বর্বর পশুর অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত করে। জিনারদি এলাকার অবিভক্ত বাংলার সন্তান স্যার কে, জি গুপ্ত ১৯১৯ সালে তারাবো রাস্তার পাশে এই স্কুলটি স্থাপন করেন। তার নামানুসারেই স্কুলটির নামকরণ করা হয়। এই স্কুলের সন্নিকটে অবস্থিত পাচদোলা পুল। এখানেই ছিল নরপশুদের একটি ক্যাম্প। নরপশুরা নারী নির্যাতন, নারী ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও গণহত্যা চালাত এখান থেকে। নর পশুদের জবাব দিচ্ছিল মুক্তিবাহিনী। মাঝে মাঝে মুক্তিবাহিনী পাক সেনাদের আক্রমণ করে উপযুক্ত প্রতিশোধ গ্রহণ করত। অতর্কিত আক্রমণের জন্য মুক্তি সেনারা স্কুলটিকে ব্যবহার করতো বর্ম হিসেবে।

তাই পাক সেনারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে অগ্নি সংযোগ করে। বর্তমানে এই স্কুলের কোন চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের প্রায় ২০ হাজার টাকার যন্ত্রপাতি এই সব অক্ষর জ্ঞানহীন পশুরা নষ্ট করে দিয়েছে।