কাঠগড়ার আসামী

Posted on Posted in 5
কাঠগড়ার আসামী

১৪ নভেম্বর, ১৯৭১

পৃথিবীর ইতিহাসে নৃশংস হত্যাকারীর তালিকায় সংযোজিত হয়েছে দুটি নাম। একটি ইয়াহিয়া খান, অপরটি টিক্কা খান। জঘন্য জালেম হিসেবে সারা বিশ্ব তাদের ধিক্কার দিচ্ছে। টিক্কা খান শুনেছ সেসব কথা? তোমার বক্তব্য আছে কিছু? বিচারের কাঠগড়ায় হলফ করে বলো, কেন এই গণহত্যা অনুষ্ঠিত করলে? বাংলার মাটি মানুষের রক্তে কেন লালে লাল হয়ে গেলো? এ গণহত্যার অন্যতম আসামী টিক্কা খান জবাব দাও।

অদ্ভুত এবং মস্তিষ্কবিকৃত নাদির শাহের যোগ্য প্রতিনিধি, হত্যার নেশায় ভুলে গেছিলে, মরিয়া মানুষের কি প্রচণ্ড শক্তি! বিশাল অতল সমুদ্রও সে শক্তির কাছে হার মানে। তুমি তো আজাজিলের পাণ্ডা, তুমি তো কোন ছার! ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লায় তথা সারা বাংলাদেশে তোমারই নির্দেশে নিতান্ত বর্বরের মতো গুলি করে মারা হয়েছে অগণিত মানুষ। বিভীষিকার রাজত্ব কয়েম করতে চেয়েছ সারা বাংলাদেশে। বলো কুখ্যাত গণহত্যাকারী-কি অধিকার তোমার ছিল এ গণহত্যায়?

জল্লাদ প্রভুর আর জনগণের দুশমন দালালদের মনোরঞ্জনের জন্য, অমিতশালী তুমি- ৭২ ঘণ্টায় স্তিমিত করে দিতে চেয়েছিলে সারা বাংলার সংগ্রামের আগুন। কত শক্তি ধরে তোমার ওই শূকরছানার দল? সাম্রাজ্যবাদী, গণতন্ত্রের শত্রু এ যুগের কলংক টিক্কা খান, তোমারই সেই বীর পুংগবের দল নেড়াকুত্তার মত আজ লেজ গুটিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে গর্তে। দেখেছ? প্রত্যক্ষ করছে বাংলার মানুষের শক্তি? তোমার শক্তির দম্ভ এক নিমিষেই মাটির হাঁড়ির মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। অবশ্যই এ কথা তোমার জানা। তবু, তবু হত্যাকারী, তোমার হত্যার নেশা মেটেনি। গ্রামে-জনপদে-শহরে-নগরে জাতি ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে অত্যাচারের বান ডাকিয়েছ। বাংলার মাটি নিরীহ মানুষের রক্তে হয়ে গেছে লালে লাল। রক্তের সমুদ্রে আজ কার সর্বনাশ দেখছো শয়তান? তোমার? না তোমার মহাপ্রভুর? বলো কুৎসিৎ হত্যাকারী, এ বীভৎস হত্যার জবাব কি? জবাব দাও।

গ্রামে-গ্রামান্তরে-শহরে নগরে কুকুরের মতো লেলিয়ে দিয়েছ তোমার সেনাবাহিনী। ধর্ষণে, লুণ্ঠনে, হত্যায় তারা সারা বাংলাকে করে তুলেছিল মৃত্যুর পুরী এ অত্যাচারে কতটুকু পেলে শয়তান? এক-একটি রক্তবিন্দুতে জন্ম নিয়েছে লাখো লাখো মুক্তিযোদ্ধা। তোমার সেই কুকুরের দল মুক্তিবাহিনীর হাতে মার খেয়ে দিকভ্রান্ত, বিপর্যস্ত, ভীত এবং সন্ত্রস্ত। তবু আজো সাধ মেটেনি, হত্যার নেশায় এখনো খুঁজে ফিরছে অস্ত্রহীন সাধারণ মানুষদের। কিন্তু তারই বদলে কুকুরগুলো নিঃশেষ হচ্ছে একের পর এক। বলো নরকের কীট, গ্রামবাংলাকে তুমি পুড়িয়েছ, লুট করেছ, শ্রীহীন করেছ কেন? জবাব দাও।

বাংলাদেশে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে যে পদলাভে উন্মুখ হয়েছিলে, যে সাম্রাজ্যের বুনিয়াদ পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিলে- চেয়ে দেখা আজ সেই সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। মৃত মানুষের লাশের তলায় চাপা পড়ে গেছে তোমার সাধের পাকিস্তান। হাত-পা কামড়াচ্ছ কেন? সঙ্গীদের মতোই লাঙ্গুল দিয়ে গায়ের মাছি তাড়াও বিভ্রান্তির অতল গহবরে নিহিত আত্মাকে খুঁজে পাচ্ছে না? নির্লজ্জ বিবেকহীন, জবাব দাও, কোন বিভীষিকা তোমার চোখে ভাসছে?

কতো মজার শাসন ব্যবস্থা তোমার দেশের! বেহায়ার পৃষ্ঠপোষক বেহায়াই হয়। তার প্রমাণ তুমি আর তোমার বন্ধু-বিশ্বের ইতিহাসে কলঙ্কিত নায়ক ইয়াহিয়া খান। এত অত্যাচার, এত লুণ্ঠন, এতো হত্যা করার পরেও তোমার পদোন্নতি হলো- পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্তে ‘কোর-কমাণ্ডার’। কিন্তু অর্বাচীন টিক্কা খান, যে আগুন তুমি জ্বালিয়েছে তার জের চলছে, চলবে। বাংলাদেশের মানুষে কোনদিন তোমাদের ক্ষমা করবে না।

তোমাদের

শয়তানের মতো কালো মুখে নিক্ষেপ করবে রাশি রাশি কলঙ্কের কালি। তুমি যেখানেই যাও, যতো পদোন্নতিই তোমার হোক না কেন, শান্তিহীন, স্বস্তিহীন হবে তোমার দিবারাত্রি। বলো হত্যাকারী শয়তান, তোমার জবাব কি?

কালো কলংকের বোঝা মাথায় দিয়ে, নৃশংস জালেম প্রস্তুত হও বলো, তোমার জবাব কি? জবাব দাও শয়তান ইয়াহিয়ার চেলা টিক্কা খান।

(মুস্তাফিজুর রহমান রচিত)