কিশোরগঞ্জের হত্যাকাণ্ড

Posted on Posted in 8

২৮। কিশোরগঞ্জের হত্যাকাণ্ড (৪০৩-৪০৪)

সূত্র – দৈনিক বাংলা, ৫ ফেব্রুয়ারি,১৯৭২

সেই রাতে ধুলদিয়া রেলওয়ে পুলের ওপর সবাইকে লাইন করে গুলি করা হলো।
(নিজস্ব সংবাদদাতা প্রেরিত)

কিশোরগঞ্জ বর্বর হানাদার বাহিনীর অধিনায়ক নরপশু মেজর ইফতেখার সম্পর্কে দু’একটি তথ্য দৈনিক বাংলা এর ২৪শে জানুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। এই জঘন্য পশুর পাশবিকতা কিশোরগঞ্জ এ যে বিভীষিকা ও ভয়াবহতার সৃষ্টি করেছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব হবে না।

১৯৭১ সনের জুলাই মাসের শেষের দিকে এই নরাকৃতি পিশাচ কিশোরগঞ্জ আসে। সে এখানে এসেই শুরু করলো তার নরমেধ যজ্ঞ। প্রত্যহ ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ এমনকি আরো বেশি করে লোক ধরে ধরে এনে মারতে শুরু করলো। বলা বাহুল্য যার অধিকাংশই ছিলো হিন্দু। কাজেই হিন্দু অধিবাসীরা যারা কিছুটা নির্ভয় হয়েছিলেন, তারা শহর ছেড়ে পালাতে শুরু করেন। অনেকে প্রাণ ভয়ে মুসলমান হতেও শুরু করলেন।

ইফতেখার দেখল হিন্দু আর পাওয়া যাচ্ছে না। কাজেই তার গণহত্যার পরিধি বিস্তৃততর করার জন্য এই নর শয়তান তথাকথিত শান্তি কমিটির মাধ্যমে হিন্দুদের আহবান করল এই বলে যে, নির্দোষ কোনো লোককে কোনো রকম হয়রানি করা হবে না, হিন্দুরা যেনো নির্বিঘ্নে নিজ নিজ কাজ শুরু করে। শয়তান দলের এই কপটতায় অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে ফিরে এলেন।

ভয়ে ভয়ে শহরে নিজ নিজ কাজ শুরু করলেন। ইফতেখার আর এক ফরমান জারী করল যে, সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কাউকে ধর্মান্তরিত করা চলবে না আর হিন্দুদের ধুতি পরে থাকতে হবে। এই ভাবে নরপিশাচ তার হত্যাযজ্ঞ বিস্তৃত করার প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করলো। শয়তানের কপ্টতায় বিশ্বাস করায় প্রথম বলি হলেন বাবু গিরিজা মোহন চক্রবর্তী। এছাড়া কত অসংখ্য মানুষ যে নরপিশাচের হাতে প্রান দিয়েছে, তার সঠিক তথ্য বের করা অত্যন্ত দুরুহ ব্যাপার।

খগেন্দ্র নাথ লৌহ নামক এক ভদ্রলোক অত্যন্ত নিরীহ মানুষ। কারো সাতেও নেই, পাচেও নেই। একটা ক্ষুদ্র চায়ের দোকান চালাচ্ছিলেন তিনি, পরিবারের অন্ন সংস্থানের একমাত্র অবলম্বন রুপে। নরপিশাচ ইফতেখার হটাত এক রাতে হানা দিয়ে এই পরিবারের সবাইকে ধরে নিয়ে গেলো। এই সংগে ধরা পড়ল হরিমোহন নামে বৃদ্ধ একজন মেইন রানার। শয়তান কাউকে রেহাই দেয় নি। নৃশংসভাবে এদের সকলকে হত্যা করে। এদের মধ্যে খগেন বাবুর জ্যেষ্ঠ পুত্র কাজল লৌহ অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়ে গেলেও।

কাহিনীটা তার কাছেই শোনা। গচিহাটা রেলস্টেশনের সন্নিকটে ধুলাদিয়া রেলওয়ে পুলের ওপর সকলকে লাইন করে দাড় করিয়ে জল্লাদ্রা গুলি করে হত্যা করেছে সকলকে। গুলি করার সময় কাজল লাফ দিয়ে নীচে পানিতে পড়ে যায়। অবশ্য সংগে সংগে পিশাচরা পানিতে অসংখ্যবার গুলি ছুড়েছে।কিন্তু রাখে আল্লহ মারে কে? কাজল রাতের অন্ধকারে দুব সাতার দিয়ে দিয়ে অনেকদূর গিয়ে ডাঙায় উঠে পাড়ি জমায় সীমান্তের ওপারে। কাজল ফিরে এসেছে। কিন্তু গোটা পরিবারটা যেন ছত্রখান হয়ে গেছে।

অশ্বিনী বাবু একজন গোবেচারা বৃদ্ধ আইনজীবী। স্বামী,স্ত্রী ছিলেন কিশোরগঞ্জের বাসায়, দুই ছেলে প্রবীর ও সুবীর। প্রবীর বি এস সি পাশ করে শিক্ষকতা করছিলেন করিমগঞ্জ স্কুলে, আর তার ছোট ভাই সুবীর কলেজে পড়তো। পিশাচ ইফতেখার এক রাতে অশ্বিনী বাবুকে বাড়ী থেকে ধরে নিয়ে আসে। তারপর বন্দুকের নলের মুখে অশ্বিনী বাবুকে দিয়ে দুই ছেলের কাছে চিঠি লেখায় ওদের কিশোরগঞ্জ আসার জন্য।

পিতৃভক্ত দুই ভাই এসেই জল্লাদের ফাদে পা দেয়। দুটো ছেলেকেই এই নরঘাতক হত্যা করে, অশ্বিনী বাবুকে ছেড়ে দেয়। অশ্বিনী বাবু আজও বেঁচে আছেন, তবে সে বাচা বাচা নয়, জীবন্মৃত অবস্থা শোনা যায় অশ্বিনী বাবুর দেশের বাড়ি ও সম্পত্তির লোভে জনৈক দালাল ইন্ধন যুগিয়ে ইফতেখারের মত নর রাক্ষসকে দিয়ে বৃদ্ধের দুটো ছেলেকেই খুন করিয়েছে।

পাকুন্দিয়া থানার মেডিকেল অফিসার সংস্কৃতিবান একজন হিন্দু ভদ্রলোক। দুই ছেলেসহ নিহত হলেন নরপিশাচ ইফতেখারের হাতে।তার তিন মেয়ে। দু’জন গ্রাজুয়েট আর একজন ম্যাট্রিকুলেট। ভাইপো, জামাইরা সব কাঠের মিস্ত্রী ছিলো। তথাকথিত শান্তি কমিটির আহবানে ওরা ফিরে এলো শহরে, শুরু করল কাজ কর্ম। হঠাত একদিন সবগুলো সক্ষম পুরুষকে ধরে নিয়ে গেলো জল্লাদরা। ওদের কেউ বাচতে পারেনি ঘাতক ইফতেখারের হাত থেকে।

এই জাতীয় অসংখ্য নরহত্যা করেছে ইফতেখার তার পিশাচ সহচরদের সহায়তায়।এই তো গেলো তার রক্ত লোলুপ পিশাচ মনোবৃত্তির কথা। এছাড়া তার মত লম্পট, ঘৃন্য নরপশু, নৈতিকতা বিহীন পিশাচ পৃথিবীর আর কোথাও কোনো দেশে কোনো কালে ছিলো কিনা, কেউ বলতে পারবে না। এই নরাধম কত মেয়ের যে সর্বনাশ করেছে, কত নারী যে নিধন করেছে, কত হতভাগিনীকে উন্মাদে পর্যবসিত করেছে তার কোনো সীমা নেই। তার কবল থেকে কেউ রক্ষা পায়নি। ব্রাক্ষণ, পুরোহিতদের হত্যা করে তাদের ছেলে মেয়ে দের যেমন করেছে নির্যাতন, ঠিক তেমনি হিন্দু, মুসলমান কাউকে সে রেয়াত করেনি। তার পাশব প্রবৃত্তির লেলিহান শিখায় যে সকল সদ্য স্বামী হারা, পিতৃহারা, মাতৃহারা, হতভাগিনী পুড়ে ছাই হয়ে হয়ে গেছে, আদেরকে এরপর স্থানান্তরিত করা হয়েছে মহকুমার বিভিন্ন কেন্দ্রে নরাকৃতি পশু পশ্চিমা হানাদার আর কুখ্যাত রাজাকার, মুজাহিদ, আল-বদর বাহিনীর কমান্ডার এবং স্বঘোষিত অফিসার ইন চার্জদের হাতে।

ইফতেখার লুন্ঠন চালিয়েছে নির্বিচারে। নিজে গ্রহন করেছে স্বর্ন, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার প্রভৃতি মূল্যবান জিনিস, আর তার অনুচরদের দিয়েছে বাকী সব মালামাল। এছাড়া তথাকথিত শান্তি কমিটির যোগসাজশে যাকে তাকে ধরে আটক করে, শান্তি কমিটির মাধ্যমে মোটা অংকের নগদ অর্থের বিনিময়ে দু- একজনকে ছেড়ে দিয়েছে। অনেক সময় টাকা গ্রহণ করেও সে ব্যাক্তিকে হত্যা করা হয়েছে।

বলা বাহুল্য তথাকথিত শান্তি কমিটি টাকা আদায়ের সময় নিজেদের অংশ আলাদা করে আদায় করত। হিন্দু প্রানভয়ে মুসলমান হয়েও এই নরপিশাচ এর হাত থেকে রেহাই পায়নি।তাদের ও হত্যা করা হয়েছে।

বল্লভ সাহা নামক একজন হিন্দু ব্যাবসায়ী প্রানভয়ে সপরিবারে মুসলমান হয়। তাকেও হত্যা করেছে। নরপিশাচ দীর্ঘকাল এক ত্রাস ও বিভীষিকার রাজত্ব চালিয়ে কিশোরগঞ্জকে শ্মশানে পরিণত করে।