কে ক’টা হত্যা করলো তার ওপর নির্ভর করতো খান সেনাদের পদোন্নতি

Posted on Posted in 8

৩৯। কে ক’টা হত্যা করলো তার ওপর নির্ভর করতো খান সেনাদের পদোন্নতি (৪২৪-৪২৫)

সূত্র – দৈনিক বাংলা, ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২
কে ক’টা হত্যা করলো তার ওপর নির্ভর করতো খান সেনাদের পদোন্নতি
।। আমিনুল ইসলাম প্রেরিত ।।

গাইবান্ধাঃ একদিকটা প্রায় ৬ ফুট সমান দেয়াল ঘেরা। খোলা ফটক। ঢুকতে এক ঝলক দমকা বাতাসে রাজ্যের ধুলো উড়িয়ে নিয়ে চোখে মুখে এসে পড়ল। না বাতাস নয় যেনো এক সাথে অনেকগুলো মাংসহীন কংকালের দীর্ঘশ্বাস। এই সে স্থান- যা এক ক্রীড়ারসিক সিভিলিয়ান বৈকালিক বিহার, শরীর চর্চা ও খেলাধুলার জন্য নির্মাণ করেছিলেন। যদিও তিনি জানতেন না যে ভবিষ্যৎ এক দিন সেখানে নরমুণ্ডের গেণ্ডুয়া খেলা হবে। হবে মানুষ মারার নৃশংস খেলা।
কোনো কংকাল? হাত- পায়ের অস্থি ? চোয়ালের হাড় ? মাথার খুলি কিংবা ঠুলি?
না কিছুই পাইনি। অত কাঁচা কাজ তারা করেনি। সব পুঁতে ফেলেছে, খুঁড়লে পাওয়া যাবে।
দশ, বিশ, তিরিশ, শ, দুশ, তিনশ?
কত জানি না।

গাইবান্ধা হেলাল পার্ক এর কথা বলছি। এস, ডিও-র অনুপস্থিতিতে তার স্থলে ভারপ্রাপ্ত অফিসার জনাব আজিজুল হোক আমার প্রশ্নের জবাবে বললেন, সেখানে কত লোকের প্রাণ হনণ করা হয়েছে তা তিনি বলতে পারবেণ না। জনাব হক বললেন একদিন মেজর ডেকেছেন। একটু দূরে পাশের রুমে বসে আছি। একজন সুবেদার মেজরের ঘরে ঢুকল। মেজর প্রমাণ করলো কিতনা। সুবেদারের জবাব তেরা। মেজর সব মিলকর আবতক কিতনা। সুবেদার, তিনশ চুরানব্বই অর্থাৎ খুব কম করে হলেও পাঁচশ’ লোককে সেখানে হত্যা করা হয়েছে। জনাব হক আরো বললেন, আলাপের ধরন- ধারন দেখে মনে হলো কে কত লোককে হত্যা করতে পারল তার উপরই নির্ভর করতো ওদের পদোন্নতি।

১৮ এপ্রিল গাইবান্ধা শহর থেকে সাইকেলে চড়ে ফিরছেন বাদিয়াখালির খোকা মিয়া। হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখেন দুটো ছেলে একপাল ছাগল নিয়ে প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। পেছনে তাকিয়েই দেখলেন দুটো জীপ। রাস্তার পার্শে একটি বাড়ীতে ঢুকে পড়লেন তিনি। শুধু কয়েকটি মুরগীর বাচ্চা ছাড়া বাড়ীতে জনমানবের কোন চিহ্ন নেই। পাটকাঠির বেড়ার শুয়ে পড়লেন। ঠিক বাড়ীর সামনেই জীপ দুখানি থামলো। খান সেনারা পেছনের দিকে হাত বাঁধা সাদা কাপড় পড়া তিনজনকে জীপ থেকে নামালো। দুজন যুবক। একজনের বয়স কত তা লক্ষ্য করেননি। ওরা যুবক দুটিকে মুখ ফিরিয়ে ওদের দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড় করালো। তারপর কোমরে লাথি মারলো। লাথির ধাক্কায় দুজনে দৌড় দিতে শুরু করলো। অমনি প্রথমজনকে গুলিকরলো। হঠাৎ একটা লাফ দিয়ে সে পড়ে গেল। আর উঠলো না। দ্বিতীয়জন যেই ফিরে তাকিয়েছে অমনি তাকে গুলি করলো। একটা আলোর পাশে সে এলিয়ে পড়লো। ততখনে ওরা চলে গেছে। দেখে শুনে বের হলাম। আমার মতই কোথাও লুকিয়ে থাকা আর একটি ছেলে বেরিয়ে এলো। আলোর আশে রক্ষিত গুলি খাওয়া যুবকের কাছে গেলাম। পানি দিলাম। ঢোক গিললে কিন্তু পরক্ষনেই গলগল করে তারা লাল রক্ত বমি করলো। তারপর সব শেষ হয়ে গেল।

খোকা মিয়া আরো বললেন জুন মাসের প্রথম দিক। কারফিউ। রাস্তার পাশে দোকান ঘর। হরদম সামরিক গাড়ি আসা যাওয়া করছে। জ্যোৎস্না প্লাবিত রাত। তখন হবে দুটো। ঠিক আমার ঘরের কাছে দুটো জীপ থামল। গাড়ীতে চার পাঁচটি মেয়ে। চিৎকার করছে প্রাণের ভয়ে। কিন্তু গলা দিয়ে যেনো স্বর বের হচ্ছে না। জীপ চলে গেল। ওদের ভাগ্যে কি ঘটেছে জানি না। স্বাধীনতার পর হিলাল পার্কের বিপরীতে একটি দেয়াল ঘেরা স্থানের এক কোণে একটি গর্তের মাটি তাজা দেখে খনন করা হলে তার মধ্যে থেকে অনেকগুলো মেয়ের লাশও পাওয়া যায়। এরা কোন বাবা, মায়ের স্নেহের দুলালী তা জানা যাবে না কোন দিন। লাশ দেখে সনাক্ত করা সম্ভব নয়। তাদের মুখ গাল ক্ষতবিক্ষত করে বিকৃত করে ফেলা হয়েছে, স্তন ফেলা হয়েছে কেটে।