কোণঠাসা

Posted on Posted in 10

কোণঠাসা

 

সেপ্টেম্বর থেকে ভারতে ব্যাপক যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু হয়। ডিভিশনাল এবং কোর হেডকোয়াটারগুলো অগ্রবর্তী স্থানসমূহে অবস্থান গ্রহণ করতে থাকে।সরবরাহ ব্যবস্থাও রণ প্রস্তুতিতে ব্যাপক চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্ভাব্য- সংঘর্ষস্থল অভিমুখী সড়ক নির্মাণ,সেতুগুলোর রক্ষণাবেক্ষণও মেরামতের কাজ পূর্ণ উদ্যমে শুরু করে। কতগুলো ইউনিট সীমান্তবর্তী ঘাঁটিসমূহে অবস্থান নেয়। ভূপ্রকৃতি এবং সম্ভাব্য রণাঙ্গনের অবস্থা বিশ্লেষণ সহ ব্যাপক পর্যবেক্ষণ তৎপরতা চলতে থাকে।

 

এদিকে আমরা প্রতিদিন ট্রেনিংপ্রাপ্ত শত শত মুক্তিযোদ্ধাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠাচ্ছিলাম বটে, কিন্ত তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ফল পাচ্ছিলাম না।সকল স্তরে নেতৃত্বদানের অভাবই ছিল আমাদের প্রধান অন্তরায়। কোন স্থানেই আমাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ স্থাপিত হচ্ছিল না এবং গেরিলা তৎপরতা আশানুরূপ জোরদার করার ক্ষেত্রেও পেছনে পড়ে যাচ্ছিলাম। এ সময়ে বাংলাদেশের নেতৃত্বেও শূন্যতা পূরণের জন্য, বিশেষ করে গেরিলা ঘাঁটিগুলোর জন্যকিছুসংখ্যক এম- সি- এ(গণপরিষদ সদস্য) কে ট্রেনিং দেওয়ার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপস্থিত এম-সি-এ দের যারা উৎসাহী এবং শারীরিক সমর্থ তাদেরকে গেরিলা যুদ্ধের কায়দা কানুন বিশেষতঃ গেরিলাদের নিয়ন্ত্রণও নেতৃত্বে দানের বিষয়ে ট্রেনিং প্রদানই এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য। কথা ছিল ট্রেনিং এর পর তারা বাংলাদেশে যার যার এলাকায় গিয়ে গেরিলা তৎপরতা পরিচালনা করবেন।  আমার সেক্টরে এম-সি-এ জনাব মোশারফ হোসেন এবং আর কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা এব্যাপারে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। গেরিলাদের নেতৃত্বদানের জন্য তাঁদেরকে  বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠানো হয়েছিলো। অন্যান্য সেক্টরের কয়েকজন এম-সি-এ কে পাঠানো হয়। কিন্ত সারাদেশে একাজের জন্য প্রেরিত এম-সি-এদের সংখ্যা ছিল নিতান্তই নগণ্য। অল্প কয়েকজন এম-সি-এ ট্রেনিং করেছিলেন, যুদ্ধ করতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন তস্র চাইতেও কম। ফলে,পরিকল্পনাটি তেমন কোন কাজে আসেনি।

 

সমগ্র উপমহাদেশ জুড়ে একদিকে যখন ব্যাপকতর যুদ্ধ আসন্ন হয়ে আসছিল তখন অন্যদিকে সামরিক আরও জোরদার করার জন্য আমাদের অর্থাৎ সেক্টর কমান্ডারদের উপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। বলা হচ্ছিলো শত্রুকে ছত্রভঙ্গ করেও দুর্বল করে রাখতে হবে। তাহলে সহজে চূড়ান্ত অভিযান চালিয়ে তাদের পরাভূত করা সম্ভব হবে এবং এই লক্ষ্য অর্জন করতে হবে যথাসম্ভব স্বল্প সময়ের মধ্যে, সম্ভব হলে নভেম্বরের মধ্যেই।

 

অথচ অস্ত্রশস্ত্রও অন্যান্য দিক দিয়ে আমাদের যা সামর্থ্য  তাতে করে এই সীমিত সময়ের মধ্যে আরদ্ধ দায়িত্ব পালন করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আমার ১ নম্বর সেক্টরের আওতায় ছিল মহুয়া নদীর সমগ্র পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ পুরো চট্টগ্রাম, ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা। এখানে শত্রুপক্ষের শক্তি ছিল দুই বিগ্রেডের বেশী। এছাড়া পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত আরও দুটি সামরিক ব্যাটালিয়ন এই অঞ্চলে শত্রুপক্ষের শক্তি বৃদ্ধি করছিলো। আমাদের পক্ষে ছিল ইপিআর, পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর লোক নিয়ে তিনটি ব্যাটালিয়ন।সমগ্র সেক্টরে অফিসার পেয়েছিলাম সেনাবাহিনীর চারজন এবং বিমানবাহিনীর দুইজন। পাক সেনাবাহিনীর পক্ষে এখানে অফিসারের সংখ্যা ছিল অন্যূন ১৫০। ১ নম্বর সেক্টরে সাব সেক্টর করেছিলাম পাঁচটি। এর প্রতিটি কমান্ডে ছিল একজন অফিসার কিংবা একজন জেসিও। কমান্ডো সংক্রান্ত জটিল সমস্যাবলীর ব্যাপারে এঁদের অভিজ্ঞতা ছিল নিতান্তই সামান্য। আর আমার এলাকায় সক্রিয় যুদ্ধ চলছিলো অর্ধ শতাধিক মাইলেরও অধিক সীমান্ত এলাকাজুড়ে।

 

সেক্টর হেডকোয়াটারেই সমস্যার চাপ ছিল সবচাইতে বেশী। একজন মাত্র স্টাফ অফিসারকে সকল প্রশাসনিক এবং সরবরাহ ব্যবস্থা দেখতে হতো। কাজের মেয়াদ ছিল দিনরাত ২৪ ঘণ্টা এবং সপ্তাহে সাতদিন। কাজের অসহ্য চাপে স্টাফ অফিসার শেষ পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিন্ত হাসপাতালে কয়েকদিন থাকার পর তাকে আবার কাজ শুরু করতে হয়। এই অবস্থায় কোন বিকল্প খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

 

আমাদের সরবরাহ ঘাঁটি ছিল আগরতলায়।তিন হাজার লোকের জন্য রেশন, জ্বালানী তাঁবুও অন্যান্য সরঞ্জাম,কাপড়চোপড়, অস্ত্রশস্ত্র, ঔষধপত্র সবকিছু সেখান থেকে নিয়ে আসতে হতো। সেই একই গাড়িতে করে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল পাড়ি দিয়ে এগুলো আবার বিভিন্ন সাব- সেক্টরে পৌঁছানো হতো। বৃষ্টি- বাদলের দিনে সরবরাহ ব্যবস্থা চালু রাখতে আমাদের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠছিল। কোন কোন সময় গাড়ি রাস্তার বাইরে গড়িয়ে পড়লে  কিংবা হাঁটু সমান কাদায় চাকা বসে গেলে সেই গাড়ি না তোলা পর্যন্ত কিংবা রসদপত্র মাথায় করে গন্তব্যস্থলে না পৌঁছান পর্যন্ত সেখানে একজন অফিসারকে অপেক্ষা করতে হতো।

 

গেরিলা বাহিনীর প্রশাসনিক এবং অভিযান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত দায়িত্ব ছিল আরও কষ্টকর। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিযুক্ত লাভের আশায় শত শত গেরিলা আমার হেড কোয়াটারে আসতো। তাদেকে এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করতে হতো, তারপর আসতো দায়িত্ব সম্পর্কে তাদেরও ব্রিফিং এর পালা। প্রতিটি গ্রুপকে ব্রিফিং করতে  কম করে হলেও এক ঘণ্টা সময় লাগতো। বিশেষ কাজের জন্য ব্রিফিং এ সময় লাগতো আরও বেশী।প্রত্যেক গ্রুপকেই অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও রাহা খরচ দিতে হতো। ছেলেদের নিরাপদে ভেতরে পাঠানোর জন্য শত্রুবাহিনীর তৎপরতা ও চলাচল সংক্রান্ত সর্বশেষ খবর  সংগ্রহ করতে হতো। টহলদাতা শত্রুসেনারা এক জায়গায় থাকতো না বলে সর্বশেষ খবরেও পরিবর্তন ঘটতো। এদের কাছে গাইড থাকতো। তারা নিরাপদ রাস্তা ধরে নিকটবর্তী ঘাঁটিতে(সাধারনতঃ সীমারেখা থেকে ৮-১০ মাইলের মধ্যে) গেরিলাদের পৌঁছে দিতো। নতুন আগন্তকদের সম্পর্কে আগেই ঘাঁটিতে খবর দেওয়া থাকতো। সেখানে তাদের খাদ্যও আশ্রয়ের ব্যবস্থা হতো। একই পদ্ধতিতে সেখান থেকে তাদের রওয়ানা হতে হতো পরবর্তী ঘাঁটিতে। তাদেরকে অতি সাবধানে আক্রমণস্থলের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য যানবাহনের দরকার হতো। প্রত্যেক গ্রুপ সদস্যের নাম-ঠিকানা, তাদের পরিকল্পিত পথ, ঘাঁটি, অস্ত্র-শস্ত্র, গোলাবারুদের হিসাব, কাপড়চোপড়, রেশন, পথ খরচের টাকা পয়সা সবকিছুর বিস্তারিত রেকর্ড রাখতে হতো। দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর প্রতিটি গ্রুপের সাথে আমাদের যোগাযোগ রাখতে হতো। তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করা এবং নির্ধারিত দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করার ব্যাপারেও আমাদের তৎপর থাকতে হয়। গ্রুপ গুলো নিরাপদ গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাওয়ার পর আমাদের তারা সে খবর  জানিয়ে দিতো। তারা কোন অভিযান চালালে কিংবা শত্রুপক্ষের কোন তথ্য সংগ্রহ করতে পারলে তাও আমাদের জানাতে হতো। আমাদের সেক্টরের ভিন্ন জায়গায়  তিনটি গোপন অয়ারলেস সেট চালু ছিল। এগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে আমরা নিয়মিত খবর সংগ্রহ করতাম। এছাড়া খবর সংগ্রহ করে এক বিরাট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলাম। বিভিন্ন দলের কাছে খবর নিয়ে এরা সেক্টর হেড কোয়াটারে পৌঁছে দিতো। ফেরার পথে আবার তারা বিভিন্ন দলের গাইড হিসেবে কাজ করতো।এইভাবে তাদের আবর্তনমূলক কাজ চলতো দিনের পর দিন। চতুর্দিকে সবসময় সবকিছু চালু রাখাই ছিল আমাদের প্রধান দায়িত্ব।এর যেকোন একটা থামলেই বিপদের সম্ভবনা।

 

স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে জড়িত সকল শ্রেণীর লোকেরই তখন সঙ্গীন অবস্থা।মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দ, আর্মি হেডকোয়াটার নেতৃবৃন্দ কিংবা ফ্রন্ট লাইনে সংগ্রামরত যোদ্ধা সকলেরই অবস্থা অভিন্ন। যুদ্ধরত সৈনিকও গেরিলাদের উপর নির্দেশ আসতে থাকে যুদ্ধ আরো জোরদার করার।মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুকে অনবরত আঘাত হেনে চলেছিল। তাদের হাতে বিপুল সংখ্যক শত্রু নিহত কিংবা আহতও হয়েছে। নিজেরাও হতাহত হয়েছে। কিন্ত কোনদিন এর স্বীকৃতি অথবা প্রশংসা তারা খুব বিশেষ পায়নি। একারণে স্বভাবতই তারা ছিল ক্ষুব্ধ।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের একেবারে উত্তরপ্রান্তে ডেমাগিরিতে কয়েক শত ছেলে ট্রেনিং নেওয়ার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন জ্বরেও রক্ত আমাশয়ে মারাও গেছে। অন্যদেরকে দিনের পর দিন সপ্তাহের পর সপ্তাহ অনাহারে কাটাতে হয়েছে। শত মাইল দুর্গম এবং পার্বত্য অঞ্চলও নিবিড় বনানী পার হয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা এসেছিলো। কিন্ত কেউ তাদের সম্পর্কে সামান্যতম আগ্রহ প্রকাশ করেনি। তারা যে মহৎ উদ্দেশ্য  নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিল তার স্বীকৃতিও কারো কাছ থেকে তারা পায়নি।

 

যুদ্ধে নিয়োজিত গেরিলাদের শতকরা পঞ্চাশ জনের জন্য ভারত অস্ত্রও গোলাবারুদ সরবরাহ করেছিলো(পরে অবশ্য শতকরা৯০ জনকে অস্ত্র সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়।) বাকী ছেলেদের খালি হাতে যুদ্ধে পাঠানো কিংবা অপেক্ষা করতে বলা ছাড়া আমাদের কোন গত্যন্তর ছিলোনা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেডকোয়াটারের নির্দেশ ছিল অস্ত্র ছাড়া কাউকে যাতে গেরিলা যুদ্ধে পাঠানো না হয়। আমাদের সবচাইতে সহজ উপায় ছিল দুই গ্রুপের অস্ত্র দিয়ে তিন গ্রুপকে পাঠানো। ফলে প্রতিটি গ্রুপে শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ছেলেকে সরবরাহের অপ্রতুলতার জন্য বসিয়ে রাখতে হতো। এদের জন্য আবার রেশন পেতাম না, ফলে সমস্যা আরো মারাত্মক আকার ধারণ করতো। আমরা স্থানীয়ভাবে এর কিছুটা সমাধান বের করেছিলাম। সকল অফিসার, জেসিও এবং অন্যান্য রাঙ্কের সৈনিকরা মিলে একটা মাসিক চাঁদার ব্যবস্থা করেছিলাম। এর মাধ্যমে যা আয় হতো তা দিয়ে বাড়তি আহার যোগানোর চেষ্টা চলতো। এই ব্যবস্থা ছিল অনিয়মিত এবং পরিস্থিতির চাপে পড়েই আমাদের এটা করতে হয়েছিলো। অথচ এর জন্যও আমাদের ভুল বোঝা হতো, আমরা হতাম সমালোচনার পাত্র। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাদের সম্পর্কে গোপনে চিঠিতে লিখতেন,’’ বাংলাদেশের সেক্টর কমান্ডাররা পুরো নিয়ম নেনে চলছেন না’’। এবিষয়ে ভারতীয় অফিসারদের এই মতামত সম্ভবত অনেকাংশে সঠিক ছিল। তাদের উপর ভারতীয় আর্মি হেড কোয়াটারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতো, গেরিলাদের ট্রেনিং শেষ হওয়ার তিন চার দিনের মধ্যে সকলকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে তা সে সবাইকে অস্ত্র সরবরাহ করে কিংবা মাত্র কিছু অস্ত্র সরবরাহ করেই হোক। কিন্ত আমাদের উপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেডকোয়াটারের নির্দেশ ছিল সবাইকে অস্ত্র সজ্জিত না করে কোন গ্রুপকেই যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধে পাঠানো না হয়।

 

বাংলাদেশ আর্মি হেডকোয়াটার এবং ভারতীয় আর্মি হেডকোয়াটারের মধ্যে সমন্বয় তখনও পুরো গড়ে উঠেনি বলেই হয়ত আমাদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিলো।