গণহত্যার কিছু দলিল

Posted on Posted in 8

৭। গণহত্যার কিছু দলিল (৩৫৩-৩৫৫)

সূত্র -দৈনিক বাংলা, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ১৯৭২

নরঘাতকদের সংলাপঃ ওদের খতম কর
গণহত্যার কিছু দলিল
ডঃ মোজাম্মেল হোসেন

 

(লেখক ডঃ মোজাম্মেল হোসেন একজন বিজ্ঞানী। ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকায় বর্বর পাকিস্তানী সেনারা যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল তখন পাক সেনাদের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে কথোপকথন তিনি রেডিওতে শুনেন ও তার অংশবিশেষ টেপ রেকর্ডারে ধরে রাখেন। ঐ টেপের বিশেষ অংশ কপি করে বন্ধুর সাহায্যে কলকাতায় প্রেরণ করেন। মে, ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি ‘আকাশবাণী’ কোলকাতা থেকে ‘সংবাদ বিচিত্রায়’ তা শোনানো হয়।

এছাড়াও কথোপকথনের সময় পাক সেনারা যে সব সাংকেতিক শব্দ করেছিল সেগুলিও যথাসাধ্য অনুবাদ করে অপর এক ব্যাক্তির মাধ্যমে প্রেরণ করেন। মে মাসে আকাশবাণী কোলকাতা থেকে ‘সংবাদ পরিক্রমায়’ তা শোনানো হয়। ২৩ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ অবজার্ভারে’-এ এই বার্তা ছাপা হয়েছিল।)

“২৫শে মার্চ ১৯৭১ সালের কালরাত। সোয়া একটার দিকে গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। জেগে উঠার প্রথম মুহুর্ত থেকেই মন বলেছিল এ আর কিছু নয় পাকিস্তানী সেনারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পুরো মার্চ ধরে অপেক্ষা করেছি, কি হয় হয়। আমরা কি স্বায়ত্ত্বশাসন পাবো, না দেশে নামবে রক্তপাত? বিদেশীরা যখন ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছিল তখন মন বলছিলো, ওরাতো ওদের দেশে ফিরছে বিপদের সংকেত পেয়ে।

কিন্তু বিপদ এলে আমরা এদেশেই থাকবো, আমাদের নিজের দেশ। কি হবে সেই বিপদ, কি হবে তার রুপ-তা কল্পনা করতে পারিনি। কি সেই ভয়ংকর রাতে ঘুম ভাংতেই বুঝলাম, বিপদ এসে গেছে। শুরু হলো আমাদের ভাগ্যে অমাবশ্যা। মনে প্রশ্ন জেগেছিল কবে সেই অন্ধকার কাটিয়ে আসবে আলো, আসবে স্বাধীনতা? হঠাৎ ভেঙ্গে যাওয়া ঘুমের ভাব কেটে গেল। উপলব্ধি করার চেষ্টা করলাম কি হচ্ছে? মনে তখন সবার আগে একটা প্রশ্ন, বঙ্গবন্ধু নিরাপদে আছেন তো? কিন্তু কিভাবে সে খবর? হঠাৎ মনে এলো, পাক সেনাদের বিভিন্ন ইউনিটগুলো নিশ্চয় একে অপরের সাথে রেডিও মারফত যোগাযোগ রাখবে।.

রেডিও তুলে নিয়ে ডায়াল ঘুরাতে আরম্ভ করলাম। ৯০ মিটারে পেয়ে গেলাম যা খুঁজেছিলাম। হানাদার বাহিনীর দল গুলোর একে অপরের সাথে কথাবার্তা। জোরে শোনার উপায় নেই, তাই এয়ারফোন লাগিয়ে নিলাম কানে। ভেসে আসতে লাগলো বর্বর পশুদের গলা। ইতিমধ্যে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে। পাক সেনাদের আগমনের গোড়াতেই কেউ সাইরেন বাজিয়ে বিপদ সংকেত জানাবার চেষ্টা করেছিল। আমাদের বাসা থেকে মাইলখানেক দূরে রাজারবাগ।

সেকি প্রচন্ড গুলি, তালা লেগে যায়। মাঝে মাঝে পাক সেনারা আকাশে ফানুশ ছোড়ে। দিনের মত আলো হয়ে যায় চারদিকে। তারপর আবার বৃষ্টির মত গুলি। মাঝে মাঝে ভেসে আসে ভারী গোলার শব্দ। একটু পরে গুলির তীব্রতা কমে এল। বুঝলাম আমাদের বীর পুলিশ জন্মভূমির জন্য চরম আত্মোৎসর্গ করে শহীদ হয়েছেন। আরো একটু পরে দেখা গেল আগুনের লেলিহান শিখা- রাজারবাগ পুলিশ লাইন পুড়ছে। সে রাত্রের কথা জীবনে ভুলবো না। কখনো ছুটে যাই জানালায় আগুন দেখার জন্য। আবার ছুটে আসি রেডিও শুনার জন্য।

ইতিমধ্যে রেডিওতে শুনেছি পাক কমাণ্ডারের গলা। জানাচ্ছে, “দ্যা বিগ ফিস হ্যাজ বিন কট।“ কার কথা বলেছে তা বুঝতে এক মুহূর্তও দেরী হয় নি। কিন্তু মন কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় নি যে বঙ্গবন্ধু বন্দী হয়েছেন। রেডিও শুনে চলেছি আর ঢেকে রাখা অস্তমিত আলোতে প্রধান তথ্যগুলো টুকে রাখছি। হঠাৎ কানে এলো কন্ট্রোলের গলা “দেয়ার ইজ নো কোয়েশ্চেন অব টেকিং প্রিজনার। দে আর শুটিং এট ইউ। সো ওয়াইপ দেম অফ। কাউকে বন্দী করার প্রশ্ন উঠেনা, ওরা তোমাদের গুলি করেছে। সুতরাং ওদের খতম কর। কথাগুলোয় মনে প্রচন্ড আঘাত লাগলো। তাহলে এই করছে পাক বর্বররা?

এর প্রমাণ রাখতেই হবে। সঙ্গে সঙ্গে উঠে গিয়ে টেপরেকর্ডার এনে সোজাসুজি তার দিয়ে রেডিওর সাথে লাগিয়ে দিলাম। এয়ারফোনের মাধ্যমে শুনতে লাগলাম। বাবা, মা, বাড়ীর সবাই তখন চারপাশে জড়ো হয়েছেন। মাঝে মাঝে জানালায় গিয়ে বাইরের দিকে খোঁজ নেয়া হয়-কেউ ও দিকে আসছে কি না। এরপর দুইদিন ধরে প্রায় সারাটা সময়ই বাড়ীর কেউ না কেউ এয়ারফোন কানে ধরে বসে রয়েছে কি শোনা যায়। সব কিছু টেপ করা সম্ভব হয় নি। টেপ আছে ২৫শে মার্চ রাত আর ২৬শে মার্চ সকালের পাক সেনাদের নিজেদের মধ্যে কথাবার্তার অংশ।

অন্য তথ্য টেপে নেই, তবু যা আছে তা আজ এতদিন পরে শুনলেও মনে যে অনুভূতি জাগে, তা বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। বর্বরদের সে কি উল্লাস! বাংলাদেশের পতাকা ও কালো পতাকা নামাতে হবে। রাস্তায় ব্যারিকেড সরাতে হবে। এ কথা লাউড স্পীকারের মাধ্যমে প্রচার হুকুম দিল পাক কমাণ্ডার নেটিভ টাং এজ ওয়েল এজ ইংলিশ এণ্ড উর্দুতে। নেটিভ হচ্ছি আমরা অর্থাৎ বাঙ্গালীরা।

আদেশ না মানলে কি করতে হবে তারও বিশদ হুকুম শুনলাম। আশেপাশের লোক ধরে এনে তাদের মধ্যের কয়েকজনকে পুরস্কৃত করতে হবে (কমাণ্ডারের ভাষায়)। সে পুরস্কার হবে মৃত্যুদন্ড। অন্যদের ফিরে যেতে দেয়া হবে যাতে ব্যাপারটা সবাই ভালো করে বুঝতে পারে। তাই সেই রাতে ঐ মূহুর্তেই নামিয়ে ছিলাম স্বাধীন বাংলার পতাকা ও কালো পতাকা। নামাতে বলেছিলাম প্রতিবেশীদের। সে পতাকা ফেলে দেয় নি, নষ্ট করিনি। লুকিয়ে রেখেছিলাম ঘরে।

পাক কমান্ডার আরো হুকুম দিল কিভাবে বাড়ী গুলি তল্লাশি করতে হবে। বাড়ীর সবাইকে বাইরে এনে দাঁড় করিয়ে ভেতরে খুঁজে দেখতে হবে ভালো করে। স্থানীয় সহযোগীদের দ্বারা সনাক্ত করতে হবে সেই সব ব্যক্তিদের যাদের আটক করার প্রয়োজন ইত্যাদি।

ধীরস্থির গলায় হুকুম দিচ্ছিল কমান্ডার-এতটুকু উত্তেজনা ছিলনা কণ্ঠস্বরে। পরে জেনেছিলাম ঐ গলা বিগ্রেডিয়ার আরবীর খানের। ঐ গলায় বিভিন্ন টার্গেট দখলের খবর দিচ্ছিলেন, সবাইকে জানাচ্ছিলেন যে দৈনিক পিপল পত্রিকার অফিস উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কি সাংঘাতিক ক্রোধ ছিল পিপল- এর উপর, ট্যাংক বিধ্বংসী কামান ব্যবহার করেছে পিপল অফিসের উপর পাক সেনারা। এটি ছিল ২৬ নম্বর ইউনিট। পরে জেনেছি এর ইমাম ছিল কর্ণেল তাজ। যার হেডকোর্টার প্রেসিডেন্ট হাউস।

এই ২৬ নম্বর ইউনিট হত্যা করেছে লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম কে। বলেছে,তাকে ধরতে যাওয়া হয়েছিল, বাধা দেওয়ায় নিহত হয়েছে। ঠাণ্ডা মাথায় তাকে হত্যা করে জীপের পেছনে দড়িতে বেঁধে রাস্তায় টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তার মৃতদেহ। এই ২৬ নম্বর ইউনিট আক্রমণ করেছে রাজারকার পুলিস লাইন। সবচেয়ে উল্লাস ছিল এই ২৬ নং ইউনিটেরই। তার বীরত্বের পুরষ্কার হিসেবে কর্ণেল তাজকে করা হয়েছিল- ডি, এস, এ, এম, এল-ডেপুটি সাব এডমিনিষ্ট্রেটর মার্শাল ল। মাঝে মাঝেই শোনা যাচ্ছিল। কন্ট্রোল বলছে ‘দ্যাট ইজ রিয়েলি গুড। দ্যাট ইজ একসেলেন্ট। বা হি ইজ ইউজিং এভরিথিং হি হ্যাজ গট’।

সেই এভ্রিথিং এ ছিল ট্যাংক, রিকয়েললেস রাইফেল, রকেট ল্যান্সার ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘিরে ছিল পশ্চিম দিক থেকে রেল লাইন জুড়ে ৪১ নং ইউনিট। দক্ষিণ দিক থেকে ৮৮ নং ইউনিট ও উত্তর দিক থেকে ২৬ নং ইউনিট। বাধা এসেছিল জগন্নাথ হল, ইকবাল হল ও লিয়াকত হল থেকে। সবচেয়ে বেশি বাধা এসেছিল জগন্নাথ হল থেকে। ২৬শে মার্চ সকালের দিকে কন্ট্রোল ও ৮৮ নং ইউনিটের মধ্যে যে কথপোকথন হল তা মোটামুটি এই রুপঃ

কন্ট্রোলঃ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আনুমানিক কতজন হতাহত হয়েছে?আমাকে মোটামুটি সংখ্যাটা বললেই হবে। উত্তর এলো তিনশয়ের মত।

কন্ট্রোলঃ চমৎকার। তিনশই মারা গেছে না কেউ আহত বা বন্দী হয়েছে?

উত্তরঃ আমি একটাই পছন্দ করি। তিনশ মারা গেছে।

কন্ট্রোলঃ ৮৮। আমিও তোমার একমত। ঐ কাজটিই সহজ। কিছু জানতে চাইবে না। আবার বলছি চমৎকার।

ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই উপরের কথা গুলোর। ওরা যে কোন ‘বন্দী’ নেয় নি, সবাইকে হত্যা করেছে, সে কথা এর চেয়ে স্পষ্টভাবে জানাতে পারতো না। শুনতে পেয়েছিলাম শহিদ মিনারের কথাঃ ঐ রাতেই ডিনামাই দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। মিনারের নিচের ঘরে ওদের কথায় ৪ জন ছাত্র লুকিয়েছিল, ৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এক জন পালিয়ে গেছে। ২৭শে মার্চ সকালে দেখতে গিয়েছিলাম শহীদ মিনার। মাঝখানের মিনারটির সামান্য ক্ষতি হয়েছে।

শুনলাম যারা মিনারের নিচের ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল তারা ছাত্র ছিল না। কিন্তু ছিল তো আমাদের দেশেরই মানুষ। দেখলাম ভাঙ্গা কাঁচ, দেয়ালে রক্ত। শনিবার রাতে প্রচন্ড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অবশেষে শহীদ মিনার ধ্বংশ করেছিল পাক বর্বরেরা। ২৫শে মার্চের সেই কালরাত্রি যখন শেষ হয়ে আসছিল, হুকুম এলো কন্ট্রোলের যেখানে যত মৃতদেহ আছে সব সরিয়ে ফেলতে। সরিয়ে ফেলতে হবে দিন শুরু হওয়ার আগে। লোকচক্ষুর অন্তরালে। মৃতদেহ সরাতে ব্যবহার করা হয়েছিল বাঙ্গালিদের। যে হতভাগ্যদের ব্যবহার করা হয়েছিল এই কাজে, কাজ শেষে তাদেরও হত্যা করেছিল নরপশুরা। মৃতদেহের হিসেব রেখেছিল ২৬ নম্বর ইউনিট।

কন্ট্রোল জিজ্ঞেস করেছিল ২৬ নং ইউনিটকে, রাজারবাগে পুলিশের মৃতদেহের সংখ্যা। উত্তর এসেছিল গোণা শেষ হয় নি। কিন্তু সংখ্যায় অনেক। ক্যাম্পাসের মৃতদেহ কিন্তু ঐ সময় সরানো হয় নি। ২৬শে মার্চ সারাদিন রেখে দেয়া হয়েছে। রেডিওতে শুনেছি, কমাণ্ডার গিয়ে দেখবেন ছাত্রনেতা কেউ আছেন কিনা। সেটা দেখার পরই সরানো হবে। তাই হয়েছিল।

২৭শে মার্চ সকালে দেখছিলাম, ইকবাল হলের পেছনের পুকুর পাড়ে সারি দিয়ে রাখা দশটি মৃতদেহ। যাতে বাঙ্গালীরা ভয় পায়, নতি স্বীকার করে। দেখেছিলা জগন্নাথ হলের সামনের মাঠে বুলডোজার দিয়ে তৈরী গর্ত করে দেয়া গণকবর। মাসখানেক পরে যখন দু’একজন বিদেশী সাংবাদিককে য়াসার অনুমতি দিয়েছিল পাক সরকার, তখন একদিন রাতে সেই গলিত দেহের অবশিষ্টও তুলে নিয়ে যায় পাক সেনারা।

জিঞ্জিরায় যে হত্যাকাণ্ড চালায় পাক সেনারা কদিন পরে তার পূর্বাভাসও পেয়েছিলাম ঐ রাতে। কন্ট্রোল বলেছিল ৮৮ নং ইউনিটকে যে ওখানে অস্ত্র জমা করা হয়েছে, তাই ঐ জায়গায় সেনাদের যেতে হবে আস্তে আস্তে। রাত ফুরিয়ে এলো দিনের আলো জেগে উঠলো। সারারাত ধরে যা দেখেছি, যা শুনেছি কোন কিছুই যেন বিশ্বাস করতে মন চাইছিল না।

মন চাইছিল না যে স্বীকার করতে যে এত বড় বিপদ নেমে এসেছ। মনে হয়েছিল, কবে এই অমাবশ্যা কাটবে, কবে আবার সন্মানের সাথে মানুষের মত বাঁচার সুযোগ পাবো? সে দিন একদিন আসবেই, কিন্তু ২৫শে মার্চের সেই রাতে একথাও মনে জেগেছিল, যখন সেদিন আসবে আমিও যেন থাকি তখন।