গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণঃ বিদেশী পত্র-পত্রিকা

Posted on Posted in 8

৮৭। গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণঃ বিদেশী পত্র-পত্রিকা (৫২১-৫৪০)

দা টাইমস

মার্চ ৩০, ১৯৭১

( ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের পুড়ে যাওয়া লাশ এখনো তাদের হলের বিছানার উপর পরে আছে। এক বিশাল গনকবর খুব দ্রুতই ভর্তি করা হয়েছে……)

(মিশেল লরেন্ট, এসোসিয়েটেড প্রেসের একজন ফটোগ্রাফারের বরাতে, উনি পাকিস্তান আর্মিদের লুকিয়ে ঢাকায় চলাচল করেছিলেন)

ঢাকা,মার্চের ২৯ তারিখ। প্রায় দুইদিন ধরে উপর্যুপরি গোলাবর্ষনে শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই মারা যায় ৭,০০০ এর বেশি মানুষ।

বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমেরিকার সরবরাহকৃত M24 ট্যাংক,মেশিনগান ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে শহরের প্রায়

বেশিরভাগ অংশে ধ্বংসলীলা চালায়।

এই আক্রমনের লক্ষবস্তু ছিল বিশ্ববিদ্যালয়, শহরের পুরাতন অংশে যেখানে আওয়ামীলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের তুমুল জনপ্রিয়তা ছিল,এবং শহরের উপকণ্ঠে শিল্পাঞ্চলে, যেখানে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের আবাস ছিল।

শনি ও রবিবার জ্বলন্ত শহরে ঘুরে দেখা গেল, বিনা নোটিশে শহর দখল করে নেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে পুড়ে যাওয়া লাশগুলো তখনো বিছানার উপর পরে ছিল। হলগুলোতে সরাসরি ট্যাংক ব্যবহার করা হয়।

খুব দ্রুতই জগন্নাথ হলের সামনে একটি গণকবর ঢেকে দেয়া হয়। ইকবাল হলে প্রায় ২০০-র মত মারা গিয়েছে বলে জানা যায়। প্রায় ২০ টার মত লাশ তখনো মাঠে ও হলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, সৈন্যরা ঢাকা মেডিকেল কলেজে বাজুকা নিক্ষেপ করেছিল। যদিও হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা জানা যায় নি।

এত কিছুর পরেও পশ্চিম পাকিস্তান প্রশাসন থেকে বলা হয়,ঢাকা শহরের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। যদিও হাজারো মানুষ নূন্যতম জিনিসপত্র নিয়ে শহর ছাড়ছিল। কেউ কেউ ঠেলাগাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলো। সেগুলো ছিল খাদ্য আর বস্ত্র সামগ্রীতে পরিপূর্ণ। সামরিক সরকারের আদেশে খুব অল্প সংখ্যক মানুষই সরকারি চাকুরিতে ফেরত আসে।

পাক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছিল নূন্যতম। পাকিস্তানিরা মিলিটারি অর্ডারে অস্ত্র জমা দিয়ে দিয়েছিলো।

আবারো বেশিরভাগ সরকারি অফিসগুলোতে পাকিস্তানের পতাকা উড়তে দেখা গেল। যদিও মাত্র দশদিন আগেও সেখানে হলুদ ও সবুজে রাঙ্গা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা শোভা পেত।

পুরান ঢাকার বেশিরভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তবুও বয়স্ক পুরুষ এবং মহিলারা তাঁদের ধ্বংসপ্রাপ্ত জিনিসপত্রের মাঝে খোঁজাখুঁজি করছিলেন।

ফাঁকা সড়কগুলোতে সেনারা অস্ত্রে সজ্জিত সাজোয়া গাড়িসহ টহল দিত। লোকজন ওপেন ফায়ার থেকে রক্ষা পাবার জন্য গাড়িতে পাকিস্তানের পতকা টানিয়ে রাখতো। যত্রতত্র লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেল,যারা কিনা পাক সেনাবাহিনীর ক্রসফায়ারে পড়ে মারা যায়। রেলস্টেশনের পাশের বস্তি পুড়িয়ে দেয়া হল। লোকজন এখন হতবিহবল।

বিদেশি সাংবাদিকদের চলাফেরার ক্ষেত্রে সরকার হার্ডলাইনে চলে গেল। যাতে করে তাদের কর্মকান্ড বিশ্ব দরবারে উঠে না আসে।

প্রায় ৩৫ জনের মত বিদেশি সাংবাদিককে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। শুধু আমি এবং একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক সেনাবলয় থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হই। পরবর্তীতে সেনারা এয়ারপোর্টে আমাকে তল্লাশী করে ছবি ও রিপোর্ট জব্দ করে।

পরবর্তীতে করাচি বিমানবন্দরে পুলিশ আমাকে আবার তল্লাশী করে, এবং বাকি ছবিগুলোও জব্দ করে।

 

 দা টাইমস (লন্ডন)

২ এপ্রিল, ১৯৭১

 

গনহত্যার এই যুদ্ধে রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হচ্ছে

– লুইস হেরেন

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে গনহত্যার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবিদের সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। এর অনেকটাই অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল।

পূর্বের সাম্প্রদায়িক বৈরিতাও প্রকাশ্যে এসেছিল। পাকিস্তানি মুসলিম সেনারা হাজারো হিন্দুকে হত্যা করে ।

একজন আস্থাভাজন ব্যক্তি মারফত আরো কিছু তথ্য আমাদের হাতে আসে। তিনি গত গত দুই বছর যাবত ঢাকায় ছিলেন এবং গত সপ্তাহে ঢাকা ছেড়ে লন্ডনে আসেন। অনিবার্য কারনবশতঃ তার নাম আমরা প্রকাশ করতে পারছি না।

তিনি নিশ্চিত করেন, পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবর রহমান হত্যাকান্ড এড়াতে পেরেছেন। কিন্ত তার এগার জন দেহরক্ষীর মৃত্যু হয়েছে।

শেখ মুজিবুর রহমানকে গত বৃহষ্পতিবারে গ্রেফতার করা হয়। তাকে দুইদিন আদমজী স্কুলে বন্দি করে রাখা হয় এবং পরে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। তথ্যদাতা বিশ্বাস করেন যে তিনি এখন মুলতানে অবস্থান করছেন।

এই তথ্যদাতার মতে, ২৫ শে মার্চ থেকে শুরু হওয়া আক্রমনের মধ্যে কিছু ভৌত ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো লক্ষ করা যায়। আর এই পর্যায়ে এসে এটা পরিষ্কার, সুনির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করেই এই অবর্ননীয় অত্যাচার চালানো হচ্ছে।

এদের মধ্যে আছে আওয়ামিলীগ এর নেতা, ছাত্র (লীগের বেশিরভাগ কার্যকর সদস্য ছিল তারাই), ভার্সিটির অধ্যাপক ও তাদের পরিবার-পরিজন এবং যে সকল হিন্দুকে পাওয়া যাচ্ছে, তাঁরাই।

পাক সেনাবাহিনী বুঝতে পেরেছিল, ছাত্ররাই হল ভবিষ্যত স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্র। আর অধ্যাপকেরা হলেন বুদ্ধিবৃত্তিক সম্প্রদায়, যারা ভবিষ্যত স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রশাসনের জন্য হবেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী নেতাদের হত্যার কারণ সহজেই অনুমান করা যায়। আর তথ্যদাতাদের মতে, হিন্দুদের হত্যা করার কারণ হিসেবে মনে করা হতো যে তারাই ছিল এই আন্দোলনের পিছনের মূল অপশক্তি!

সাংবাদিকদের বাইরে কাভারেজ করার অনুমতি ছিল না। কিন্ত বাস্তবে নিচের ঘটনাগুলো ঘটেছিলঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল হিন্দু ছাত্রদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। পাক সেনারা ট্যাংক চালিয়ে হলের দেয়াল ধসিয়ে দেয়।

হলের বাইরে ছিল তাজা গণকবর। প্রতিটি রুম রক্তে ভেসে গিয়েছিল এবং সেখানে লুটতরাজ চলেছিল। কর্মচারী ভবনের পাশে নৃশংসভাবে হত্যাকৃত ছয়টি লাশ পাওয়া যায়।

শিক্ষকদের এপার্টমেন্টগুলোয় শিশুদের বিছানার মধ্যেই গুলি করে হত্যা করা হয়। একজন সিনিয়র অধ্যাপকের পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়, যাদের মৃতদেহগুলি পাশের আরেকটা ফ্ল্যাটে পাওয়া যায়।

বাইরে ছাত্রদের লাশ দেখা যায়। হাতে ধরা লাঠি কিংবা বাঁশ। কেন্দ্রীয় সিঁড়িঘরে দেখা যায় রক্তাক্ত পায়ের ছাপ। রক্তের দাগ নেমেছিল ভবনের বাইরের দেয়াল ধরে।

পুরান ঢাকার শুরুতেই দু’টি বড় বাজার ছিল। একটি ছিল হিন্দু বাজার। সেখানকার লাশগুলোর পাশ দিয়ে যাবার সময় লোকদের নাকে কাপড় চাপা দিয়ে যেতে হতো। ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনে এবং আস্তাকুরে কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ টি লাশ দেখা গিয়েছিল।

আমাদের সেই তথ্যদাতা এমন একটি বাড়ি দেখেছেন, যেখানে এক লোকের স্ত্রীকে ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখা যায়। তাঁর স্বামীকে একটু আগেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।

মূলত এগুলোই হলো সেই পাঁচদিনের যুদ্ধের প্রকৃত দৃশ্যপট। এই রিপোর্টের বাকি তথ্যগুলো আমাদের সংবাদদাতা ঢাকা ছেড়ে আসার পূর্বে তার বন্ধুমারফত পেয়েছিলেন।

২৫ মার্চের মধ্যরাতের আগেই পাক সেনাবাহিনী ঢাকা শহরের গুরুতবপূর্ণ সব পয়েন্ট দখল করে নেয়। এর কয়েক ঘন্টা আগেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান করাচির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ধারনা করা হয়, এই সেনা অভিযান তাঁর নির্দেশেই হয়েছে।

দাপ্তরিক মুখপাত্রের ভাষ্যমতে, প্রেসিডেন্টের যাবার পরপরই সতর্কতাবশতঃ সেনা ক্যান্টনমেন্টে আসার পথে ব্যারিকেড স্থাপনের জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়। পুরো শহরে মধ্যরাত থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত ব্যারিকেড দেয়া হয়। ভারী মেশিনগান, আর্টিলারি আর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ধ্বনিতে পুরো ঢাকা প্রকম্পিত হতে থাকে।

পুরো রাতজুড়ে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যায় ও গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।

পরদিন সকালে পুরো শহর হালকা ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে, যা ক্রমান্বয়ে ঢাকার উত্তর দিকের অভিজাত এলাকা গুলশানের দিকে ছড়িয়ে যায়। বিহারি এলাকাগুলোতেও আগুন দেখা যায়। সেখানে এই মাসের শুরুতেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখা গিয়েছিল।

পরদিন, ২৬ শে মার্চ পুরো শহরে কারফিউ জারি করা হয় এবং দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হয়। সৈনিকদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সাহায্যে প্রাক্তন সেনা কর্ককর্তা কর্নেল ওসমানির বাসায় গুলি চালাতে দেখা যায়।

সারারাত ধরেই গুলাগুলি চলতে থাকে। তবে তুলনামূলকভাবে কম। যদিও ২৭ তারিখ সকালে ৫ ঘণ্টার জন্য কারফিউ কিছুটা শিথিল করা হয়।

শহরের নতুন অংশেও ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যারিকেড লক্ষ্য করা গিয়েছিল।

শহরের পুরাতন অংশে, বিশেষ করে পুলিশ লাইন্সের দিকে ভয়াবহ ধবংসযজ্ঞের চিহ্ন দেখা যায়। ধরে নেয়া যায় যে পুলিশ সদস্য ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের সাথে নিয়ে পাকবাহিনীকে বিরুদ্ধে এখানে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছিল।

শরণার্থীরা শহর ছাড়ছিল। তাঁদের বেশিরভাগের সাথে শুধু অল্প কিছু কাপড়চোপড় ছিল।

রবিবার কারফিউ তুলে দেখা হয়েছিল যেন লোকেরা তাঁদের পরিবারের জন্য খাবার কিনতে পারে। তবে নিউমার্কেট প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল।

রমনা রেসকোর্সে দুটি ছোট হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম এবং মন্দির পুরোপুরি ধবংস করে দেয়া হয়। ধবংসস্তুপের নিচে অনেক লাশ চাপা পড়ে থাকতে দেখা যায়। বাকি জীবিত গ্রামবাসী ভয়ে ভয়ে ছিল।

শেষ কথা হিসেবে বলা যায়, পূর্ব পাকিস্তান কমপক্ষে এক দশক রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবি সংকটে পড়তে যাচ্ছে। হয়তো বা তা এক প্রজন্ম পর্যন্তও হতে পারে।।

 

দা নিউ নেশন

সিঙ্গাপুর, ৬ এপ্রিল, ১৯৭১

 

সম্পাদকীয়

পূর্ব পাকিস্তানে চলমান এই হত্যাজ্ঞ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে

 

বিদেশি নাগরিকদের থেকে প্রাপ্ত কিছু চাক্ষুষ তথ্যপ্রমান পূর্ব পাকিস্তানের উপর ঘটে যাওয়া কিছু নৃশংস দৃশপট উন্মুক্ত করে, যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইয়াহিয়া খান তার সেনাবাহিনী কর্তৃক ঘটিয়েছিলেন।

যা ঘটছিল, তা মূলত গনহত্যার সমতুল্য। পাকিস্তানি আর্মি অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় ও শোচনীয় হত্যাকান্ডের মাধ্যমে একটি বিদ্রোহ দমন করতে চাইছিল, যা পরবর্তীতে লাগামহীন হয়ে পড়ে।

এবং পাক সেনাবাহিনীর আচরণ থেকে এটা স্পষ্ট হয়,তাদেরকে যেকোন কিছু দমনের জন্য আইনসিদ্ধ ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। নির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক শিশু ও মহিলাসহ অন্যান্য নাগরিকদের ইচ্ছেমতো হত্যা করারও অনুমতি দেয়া হয়, যাতে জনমনে পূর্ণ ত্রাসের সৃষ্টি করা যায়।

তবে পাক সেনাবাহিনী পুরোপুরি সফল ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরোধ যদিও বিশৃঙ্খল ও লক্ষ্যহীন ছিল, তথাপি তা প্রতিনিয়ত অদম্য ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছিল। বড় শহরগুলোর বাইরে পাক সেনাবাহিনীর শাসন চলছিল না।

পূর্ব পাকিস্তানের সহজাত যাতায়াতের সমস্যার কারনে ৭০,০০০ পাকিস্তানি সেনাসদস্যের জনবল অপ্রতুল ছিল। মোট জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আর্মির সংখ্যা আরও কয়েকগুণ করা দরকার ছিল। এবং আজ থেকে ছয় সপ্তাহ পরে, বর্ষা ঋতুর আগমনের সাথে সাথে সেনাবাহিনীর অগ্রগতি যে চরমভাবে বাধাগ্রস্থ হবে, তা বলাই বাহুল্য।

অফিশিয়ালভাবে পাকিস্তানি সেনারা এটা আর লুকাতে পারছিলো না যে, তাঁরা যেই স্বভাবিক অবস্থার কথা বলছেন, তা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। তাছাড়া শিল্পকারখানাগুলোতে অচলাবস্থা বিরাজ করছে এবং প্রচুর পরিমানে সরকারি কর্মকর্তা কাজ থেকে বিরত আছেন।

যদি না প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দ্রুতই তার সেনাবাহিনী অপসারন করেন, তাহলে বিশ্ববাসী এটাকে আর পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দিতে পারেন না।

পূর্ব পাকিস্তানে ঘটতে থাকা গনহত্যা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। ইতোমধ্যে ভারত, রাশিয়া ও ব্রিটেন আওয়ালপিণ্ডির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। সার্বভৌমত্যের দোহাই দিয়ে আর মানবতার হত্যা করা যাবে না মর্মে আরো দেশকে একত্রিত হয়ে আওয়াজ তোলা উচিৎ।

 

দা টাইমসলন্ডন

মে ১৯, ১৯৭১

 

রোড টু ডেথ (মৃত্যুর পথে যাত্রা)

পিটার হ্যাজেলহার্স্ট

সাব্রুম, মে ১৮

গত দু সপ্তাহ ধরে হাজারও আতংকগ্রস্ত দুঃস্থ বাঙ্গালী ভারত পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তারা অকৃতকার্য হয়েছেন এবং পথে অনেকে ক্লান্তি-ক্ষুধা-জরায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

শরণার্থীরা আমাকে জানালেন যে, ৭৫ মাইলের ভয়ানক পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ভারত বর্ডার পার হয়ে ছোট্ট ত্রিপুরা রাজ্যে আসা অনেকেই একই পরিণতি মেনে নেবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।

প্রায় ৫ লক্ষ মুসলিম এবং হিন্দু শরণার্থী ইতোমধ্যে ত্রিপুরা রাজ্যে প্রবেশ করেছে, এবং তাদের মধ্যে অধিকাংশই সাব্রুম পাড়ি দিয়ে এসেছে, যেখানে ভারত ও পাকিস্তানের বর্ডারের সীমানির্দেশ করেছে ফেনী নদী।

অবসাদ্গ্রস্ত, নিশ্চল শরণার্থীগণ এখান থেকে প্রায় ৬০ মাইল দক্ষিনে অবস্থিত চট্টগ্রাম থেকে তাদের বাড়ি ঘর রেখে কি মর্মান্তিকভাবে এখানে এসেছেন, তার বর্ণনা দিচ্ছিলেন।

শামসুদ্দিন আহমেদ ৪০ বছর বয়স্ক একজন কৃষক। পশ্চিম পাকিস্তানী সেনারা তাদের গ্রামে আক্রমন শুরু করলে, তিনি তার স্ত্রী ও তার পাঁচ সন্তানকে হারান। মাত্র ৩ বছর বয়েসি কনিষ্ঠতম কন্যা রুহিনাকে নিয়ে তিনি চট্টগ্রাম থেকে এখানে পালিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, তার পরিবার পালিয়ে যাওয়ায় তার স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

একজন বাঙ্গালী দোভাষীর মাধ্যমে তিনি জানান, “পালিয়ে যাবার কারণে আমরা পরিবারের অন্যদের থেকে আলাদা ছিলাম। তাই আমি জানি না যে তাদের সাথে কি হয়েছে। তাদেরকে অনেক খোঁজাখুজি করেও না পেয়ে আমি রুহিনাকে ভারতের সীমান্তেরর দিকে হাঁটা দেই।” “আমাদের সাথে কোন খাবার কিংবা পয়সা ছিলো না। রুহিনা ছয় দিন হাঁটবার পর একদম ঢলে পরে। আমি তাকে কোলে নিয়ে লম্বা পথ হেটে আসলেও কাজ হয়নি। এক সময় সে আমার কোলে মারা যায়। পথের ধারে আমি তাকে কবর দেই। আমার এখন আর কেউ নেই।”

শোকে হতভম্ভ হয়ে যাওয়া এই কৃষক জানান যে তিনি আসার পথে শত শত লাশ দেখে এসেছেন। ভীড়ের মাঝে পরিবারের অধিক শক্তিশালী সদস্যরা কোনমতে টিকে আছে। অন্যরা মারা গেলে তাদেরকে আশে-পাশের মাঠে, ক্ষেতে কবর দিয়ে ভারতের দিকে তাঁরা আবার হাটতে থাকেন।

দুঃখজনক ঘটনাগুলো সবার ক্ষেত্রে প্রায় একই রকমের। ৪৮ বছর বয়েসি জনাব এ জেড বি রাহা চট্টগ্রাম বন্দরের একজন সুপারভাইজার। গতমাসে চট্টগ্রাম শহর থেকে ৪ মাইল দূরে তার গ্রামে পাকিস্তানী ট্যাংক প্রবেশ করলে তিনি পালিয়ে আসেন।

“আমরা উত্তরে ভারতের সীমান্ত বরাবর হাঁটা শুরু করেছিলাম। রাস্তায় আমরা প্রচুর মৃত মানুষের দেহ পরে থাকতে দেখেছি। বাকিরা পথের উপর নিথর হয়ে পরেছিলো। প্রথমে শিশুরা মারা যেত। এরপর ধীরে ধীরে বৃদ্ধ আর শিশুরা। আর শেষমেশ মেয়েরা।

ত্রিপুরার দক্ষিনাঞ্চলের দিকে অগ্রসরমান ২ লক্ষ আশ্রয়হীনাদের মধ্যে আমরা চট্টগ্রামের শুলতীপুরে বসবাসরত ডাক্তার চৌধুরীকেও দেখতে পেয়েছিলাম। তিনি প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ছিলেন।

তিনি বলেন যে, তিনি হতবিহবল হয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কারণ গত মাসে পাকিস্তানী সেনারা তাদের গ্রাম ঘিরে ফেলে তার পরিবারের ১৯ জনকে হত্যা করে। তিনি বলেন, “আর কিছুই অবশিষ্ট নেই”।

সাবরুমের উত্তরে আগরতলা সীমান্তস্থিত শহরের জেনারেল হাসপাতালের সুপারভাইজার ডাক্তার রথীন দত্ত এখন পর্যন্ত বুলেট আর গোলার আঘাতে আঘাত প্রাপ্ত প্রায় ৩০০ জনকে চিকিতসা করেছেন।

“এরা খুবই ভাগ্যবান”, তিনি বলেন। “কারণ, এদের বেশীরভাগই সীমান্তের কাছে বাস করতেন বলে দ্রুত আমাদের কাছে আসতে পেরেছেন আর আমরাও চিকিৎসা দিতে পেরেছি। কিন্তু, গোলা-বুলেটের আঘাতে আঘাতপ্রাপ্ত, ক্ষুধায় জর্জরিত, ক্লান্ত-শ্রান্ত কতো হাজার মানুষ যে চট্টগ্রাম থেকে আসবার পথে মারা গিয়েছে এবং মারা যাচ্ছে, ভাবতেই আমার ভয় হচ্ছে।”

২৬৭ শয্যাবিশিষ্ট তার এই হাসপাতাল এখন অতিরিক্ত ৩০০ জন আহত শরণার্থী নিয়ে জনাকীর্ণ। আহত সকলের দাবি, পাকিস্তানী সেনারা বিনা কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের গুলি করেছে।

১৬ বছর বয়সী রোহিনা বেগম ও পাঁচ বছর বয়সী জিনাত বেগম দুই বোন। তাঁরা তাদের পায়ে আর হাতে গুলির আঘাত নিয়ে এখানে এসেছে। রোহিনা বলে, গত সপ্তাহে তারা যখন ভারতের উদ্দেশ্যে ফেনী নদী পাড়ি দিচ্ছিলেন, তখন পাকিস্তানী সৈন্যরা তাদের ছোট্ট নৌকা লক্ষ্য করে গুলি করলে তার সমগ্র পরিবার সেখানেই নিহত হয়।

ডাক্তার দত্ত জিজ্ঞেস করেন, “এই বাচ্চাগুলোকে যখন আমি ডিসচার্জ দেবো, তখন আমি এদের নিয়ে কি করবো? তাদের তো কেউ নেই”।

আখাউড়ার নিকটবর্তী জাংশনের একজন রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ার, তার মাথায় বুলেটের আঘাত নিয়ে এখানে আসেন। তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে এসব বাস্তবে ঘটছে।“

“তারা কেনো আমাকে গুলি করবে? আমি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ন পদে চাকরি করি। তারা যখন আমার অফিসে, বাড়িতে লুটতরাজ চালাচ্ছিলো, তখন আমি তাদেরকে আমার পরিচয় জানালাম”। কিন্তু তাদের একজন সৈন্য বললো, “এই বাস্টার্ডটাকে মেরে ফেলো” এবং তারা গুলি করলে আমি সাথে সাথে মাটিতে পরে যাই এবং মৃতের ভান করে পরে থাকি।

“আমার ঘরসহ যা কিছু আছে, সব তারা জ্বালিয়ে দিয়েছে। এখন আমার কী করার আছে? আমার বয়স ৫৫, সংসারে দশজন মানুষ। আমার আর কিছুই রইলো না।”

আগরতলা থেকে আসবার পথটিও জনাকীর্ণ শরনার্থী শিবিরগুলোর মতোই দুঃখ দুর্দশাগ্রস্ত। সামান্য কিছু খাবার আর মাথা গোজার ঠাই এর আশায় শুণ্য চাহনী আর চরম হতাশাগ্রস মুখের জরাগ্রস্ত এই বাঙ্গালীরা উত্তরের দিকে যাত্রা করছিলো। এ জনপ্রবাহ যেন কখনওই থামবার নয়।

স্কুল আর সরকারি অফিসগুলোকে ডর্মিটরিতে রুপান্তরিত করা হলেও সীমিত জায়গার কারণে অধিকাংশেরই জায়গা হলো খোলা আকাশের নিচে। অনেক নারী ও শিশু জরাজীর্ণ ঘাসের কুটির তৈরী করলো।

পয়ঃনিষ্কাশনের কোন ব্যবস্থা ছিলো না। ছিল প্রচন্ড গরম। সাথে দুর্গন্ধ ছিলো অসহনীয়। যেখানে সেখানে বদ্ধ পানি দেখা যাচ্ছিলো এবং মহামারীর প্রাদুর্ভাব ছিলো শুধু সময়ের ব্যাপার।

 

দা সানডে টাইমস

২০ জুন, ১৯৭১

 

পাকিস্তানে গণহত্যা

শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক হত্যা

গুলিবিদ্ধ ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক গুম

গেস্টাপো ধারার আক্রমণ, ধর্ষণ, অত্যাচার।

গত সপ্তাহে সানডে টাইমস এন্থনি মাসকারেনহাস এর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানে সেনা বাহিনীর প্রবেশাধিক্যের কথা বলা হয়। এখন আমাদের কাছে পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া আরো সাম্প্রতিক কিছু বিস্তারিত ঘটনার রিপোর্ট আছে, যা পুর্বের তুলনায় আরো ভয়াবহ। এই রিপোর্ট যদিও এন্থনি মাসকারেনহাস এর নয়, তথাপি এটি এমন প্রফেশনাল সোর্সগুলো থেকে এসেছে, যার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নাতীত।

পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে একটি নতুন সন্ত্রাসী অভিযান চালানো হয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল যেকোন ধরনের রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি যেন দানা বেধে না উঠতে পারে, সেই ব্যাপারটি নিশ্চিত করা ।

ঢাকায় সেনা প্রশাসন বাংলাদেশি শক্তিকে পরাজিত করার জন্য দ্বিমুখী আক্রমনের পরিকল্পনা গ্রহন করে। প্রথমত সব সরকারি চাকুরে, শিক্ষক, লেখক ও সাংবাদিক চিহ্নিত করা।

দ্বিতীয়ত, যেকোন ব্যক্তি, যে কিনা কার্যত বিপদজনক, তাকে সরিয়ে ফেলা। আর্মি গোয়েন্দা বাহিনী ইতোমধ্যে শিক্ষক, সাংবাদিক ও অন্যান্য প্রভাবশালী বাঙ্গালিদের গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু করেছে। একটি তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছিল, যেখানে ছিল মূলত আওয়ামিলীগ বিচ্ছিন্নতাবাদী ও তাদের সহযোগিতাকারী হিসেবে সন্দেহভাজনদের নাম।

তাঁদেরকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছি। সাদা, ধূসর ও কালো। সাদাদের ছেড়ে দেয়া হতো। ধূসর ট্যাগের লোকজনদের কাউকে চাকুরীচ্যুত এবং কাউকে কারাবন্দী করে রাখা হতো। আর কালোদের হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

সিভিল সার্ভিসের উপর আক্রমন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ৩৬ টি জেলার ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট ও সাব-ডিভিশনাল অফিসারের সবাইকে হয় হত্যা করা হয়েছিল, নতুবা তারা ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল।

যখন আর্মি বাহিনী কুমিল্লা, রংপুর, নোয়াখালি, কুষ্টিয়া, নোয়াখালি, ফরিদপুর ও সিরাজগঞ্জে প্রবেশ করতে লাগলো, প্রথমেই সেখানকার ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপারকে হত্যা করা হতো।

ধূসর তালিকাভুক্ত সিভিল সার্ভিসের অনেক অফিসারদের পশ্চিম পাকিস্তানে ট্রান্সফার করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন পুলিশের আইজিপি তসলিম আহমেদ। ২৫ শে মার্চ রাতে পাক সেনাবাহিনী যখন ঢাকা আক্রমন করে, তখন পুলিশ বাহিনী বিদ্রোহ করে এবং প্রায় ১৮ ঘন্টা যাবত প্রতিরোধ বজায় রাখে।

গেস্টাপো স্টাইলের আরেক ধরনের অভিযান চালানো হয়। কিছু লোকদের খোলাখুলি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গ্রেফতার করা হয়। কিছু লোকদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টে ডেকে নিয়ে যাওয়া হতো। এই কাজটি করত সেনাবাহিনীর কিছু গোপন এজেন্ট যারা “রাজাকার” নামে পরিচিত ছিল। এই টার্মটি মূলত ব্যবহার করা হত ১৯৪৮ সালে দেশভাগের সময় হায়দ্রাবাদের নিজাম এর স্বেচ্ছাসেবকদের ক্ষেত্রে। রাজাকারের শাব্দিক অর্থ ছিল ‘দেশের বা রাজার সাহায্যকারী’।

দিনে এমনকি রাতের বেলায় ঢাকা শহরের কিছু এলাকা ঘিরে ফেলা হত এবং হিন্দু, ছাত্র ও আওয়ামিলীগ এর কর্মীদের খোঁজা হত। সকলকে একটি বাধ্যতামূলক পরিচয়পত্র বহন করতে হত। গাড়ি থামিয়ে চেক করা হতো এবং শহরের প্রতিটি প্রবেশমুখে চেকপোস্ট বসানো হয়েছিল।

যদি জাওয়ান (চেকপোস্টের রক্ষী) কাউকে আইডি কার্ড ছাড়া পেত তবে তাকে সরাসরি সেনানিবাসে পাঠিয়ে দেয়া হত।

ঢাকা শহরে কয়েকবার বোমা হামলার পরে নিরাপত্তা আরো বাড়িয়ে দেয়া হয় এবং সেনাবাহিনী “আততায়ীদের” ধরার জন্য অভিযান শুরু করে। এদেরকে মুক্তিফৌজ নামে ডাকা হত।

সেনাবাহিনীর পর আততায়ীদের নিধনের কাজের দায়িত্ব দেয়া হয় মিলিশিয়া বাহিনীর উপর। তারা ছিল রেগুলার সেনা বাহিনীর তুলনায় আরো বেশি নির্মম ও কম শৃঙ্খল। তাদেরকে দৈনিক তিন রূপি করে দেয়া হত এবং পূর্ব পাকিস্তানে লুটতরাজ করার অনুমতিও দেয়া হয়।

পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু সম্প্রদায় ও মুক্তিকামী বাংলাদেশিদের জন্য এটি ছিল আরো ভয়ের সংবাদ।

জগন্নাথ কলেজের শঙ্কর নামের একজন ছাত্র ২৭ মার্চ পাশের একটি গ্রামে পালিয়ে যায়। দুইমাস পর সে একা ঠাঠারিবাজারে তাঁর বাড়ির অবস্থা দেখতে আসে। দুই অবাঙ্গালি লোক তাকে চিনতে পারে এবং “হিন্দু” হিন্দু বলে চিৎকার করতে থাকে। পরে তাকে পাশের মসজিদে ধরে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

আবু আওয়াল ছিলেন ভোলা জেলার জেলা প্রশাসক। সরকারের প্রতি আনুগত্যের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। তিনি অবাঙ্গালিদের রক্ষা করছিলেন এবং পুলিশ স্টেশনের অস্ত্রাগার আওয়ামিলীগ এর সদস্যদের লুটের  হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।

পহেলা মে যখন তারা আক্রমণ করে, তিনি তাদের বরণ করতে গিয়েছিলেন। যখন ওই অপারেশনের বিগ্রেডিয়ার তাকে তার চাকুরী ছেড়ে দিতে বলেন। তিনি চলে আসতে চাইছিলেন। কিন্ত একজন সিপাই তাকে পেছন থেকে রাইফেল দিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

প্রায় এক ডজন বাঙ্গালি আর্মি অফিসারকে পশ্চিম পাকিস্তানে ট্রান্সফার করা হয়েছিল। ঢাকা বিমানবন্দরে তাদের স্বজনেরা বিদায় জানাতে এসেছিলেন। তাঁরা পিআইএ-র ফ্লাইটে করাচির উদ্দেশ্যে রওনা করেন।

তাঁদের পরিবার তাঁদের সম্পর্কে খুব বেশি জানতে পারতো না। যখন তারা আর্মি হেডকোয়ারটারে খোঁজ নিতে যেত, তাদের বলা হতো যে তাঁরা পালিয়েছিলেন। একজন মেজরের ক্ষতবিক্ষত লাশ তাঁর পরিবারের কাছে প্রেরণ করা হয় এবং বলা হয় তিনি নাকি আত্মহত্যা করেছিলেন।

বিগ্রেডিয়ার মজুমদার নামক সুপরিচিত বাঙ্গালি সেনা অফিসারের অবস্থান অজ্ঞাত ছিল। যখন তাঁরা বাঙ্গালি সেনারা চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করেছিল, তিনি তখন তাঁর পাকিস্তানি সহকর্মীদের সাথে ছিলেন। তাঁর পরিবার তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁরা জানায়, এত আগ্রহ সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

জুনের ২ তারিখ একটি আর্মি জীপ ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করে। হক নামের একজন সরকারি অফিসারকে তাঁর বাসা থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করা হয় এবং তাকে কুর্মিটোলা সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।

তাঁর স্ত্রী পূর্ব পাকিস্তানের সিভিলিয়ান প্রধান শফিউল আলমকে টেলিফোন করেন। উনি সেনাবাহিনী হেডকোয়ার্টারে যোগাযোগ করেন। তাকে বলা হয়, হক নামের কাউকে এখানে আনা হয় নি।

একজন শিল্পপতি, রনদা সাহাকে আর্মি অফিসারদের জন্য তার গ্রামের বাড়ি মির্জাপুরে একটি সন্ধ্যাকালীন উৎসবের আয়োজন করতে বলা হয়। তিনি উৎসব নিয়ে আলোচনা করতে যান এবং আর ফিরে আসেন নি।

পাকিস্তানি সেনারা আমিন নামক একজন সরকারি চাকুরিজীবীকে বাসা থেকে নিয়ে আসে। তাঁকে তাঁর স্ত্রী, তিন সন্তান এবং বৃদ্ধ পিতামাতা সহ আর্মি ট্রাকে তুলা হয়। তার ভাই বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন অফিসার ছিলেন এবং তিনি বর্তমানে কুমিল্লার কাছাকাছি বাংলাদেশের প্রতিরোধ যুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ২ দিন পর আমিনের পরিবার জনাব আমিনকে ছাড়াই ফিরে আসে।

১৫ মে একজন ক্যাপ্টেন দুইজন সেনা সহ মিটফোর্ড হাসপাতালে প্রবেশ করে এবং দুই নং ওয়ার্ড থেকে ডাঃ রহমান ও তার কলিগদের নিয়ে যায়। তাঁদের বলা হয় যে তাঁদের ময়মনসিংহে  কাজ করতে হবে। তাঁদের খোজ আর কখনো পাওয়া যায় নি।

পরবর্তীতে সেনারা আমেরিকা পরিচালিত হলিফ্যামিলি হাসপাতালে আক্রমন চালায়। কিন্ত সেখানে কোন সার্জন ছিলেন না। হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে যাবার অপেক্ষায়, কারণ এর অধিকাংশ ডাক্তার পালিয়ে গিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ এম এন হক।

সিলেটে জেনারেল সার্জন ডাঃ শামসুদ্দিন ছাড়া সবাই বর্ডার পার করে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। যখন সেনাবাহিনী শহরে প্রবেশ করে, তখন তারা ডাঃ শামসুদ্দিন কে হাসপাতালের ভেতর পায়। একজন মেজর তাঁকে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে গুলি করে হত্যা করে।

পিআইএ-র অধিকাংশ সিনিয়র অফিসারেরা উঠিয়ে নেবার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন জনাব ফজলুল হক, পূর্ব পাকিস্তানের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং চিফ সেক্টর পাইলট ক্যাপ্টেন সেকান্দার আলী। মিলিটারি দখলাদারিত্বের পর প্রায় ২,০০০ বাঙালিকে চাকুরিচ্যুত করা হয়।

রাজাকারেরা বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর খালেদ মোশাররফ এর দুই সন্তানকে বন্দি করে। কারন তিনি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। চার ও ছয় বছরের দুই শিশুকে সেনা কাস্টডিতে নেয়া হয়। তাঁদের মা ভারতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। প্রথমে সন্তানদের ছেড়ে দেয়া হলেও পরে আবার বন্দি করা হয়।

আত্ময়ীরা মনে করতেন, রাজাকারেরা হচ্ছে জুনিয়র সেনা সদস্য যারা স্বাধীনভাবে অবাঙ্গালিদের সাথে কাজ করছে। তাঁরা মুক্তিপণ দাবি করতো এবং একটি ক্ষেত্রে জানা যায় যে রাজাকারদের টাকাও দেয়া হয়েছিল। যদিও কোন ফলাফল আসে নি।

রাজাকারেরা খুন ও ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি তাদের কাজকে পতিতাবৃত্তি পর্যন্ত বিস্তৃত করে। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে তারা একটি ক্যাম্প খুলে, যেখানে সিনিয়র অফিসারদের মনোরঞ্জনের জন্য যুবতী মেয়েদের রাখা হত। তারা নিজদের পার্টির জন্য মেয়েদের অপহরণ করত। ফেরদৌসি, একজন প্রতিষ্ঠিত বাঙ্গালি গায়িকা ভাগ্যগুণে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। যখন একজন সেনা অফিসার তার বাসায় প্রবেশ করছিল, তার মা তার উদ্ধারে জন্য একজন জেনারেলকে ফোন করেন যাকে তিনি চিনতেন।  তাঁকে উদ্ধারের জন্য মিলিটারি পুলিস প্রেরণ করা হয়।

কিছু উল্লেখযোগ্য পরিমানে অফিসার, বিশেষ করে গোয়ান্দা বিভাগের অফিসারেরা কাজে ফিরতে শুরু করে। যাদের অনেকেই মার্চে শেখ মুজিবরের ডাকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ থেকে অব্যহতি নিয়েছিলেন।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের ‘অবাঞ্চিত’ বলে ঘোষনা দেয় এবং ভুল ব্যাক্তিকে প্রবেশের আগে বাড়তি সতর্কতার ব্যবস্থা নেয়, যারা কিনা ২৫ ও ২৬ শে মার্চ রাতে চিহ্নিত হয়েছিল।

ঐ ২ রাতে আর্মিরা ২০ জনের অধিক অধ্যাপককে হত্যা করে। নামের কারণে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ডঃ মনিরুজ্জামানকে হত্যা করা হয়। একইভাবে বাংলা বিভাগের মিঃ মনিরের পরিবর্তে ইংরেজি বিভাগের মিঃ মোনায়েমকে হত্যা করা হয়।

জেনারেল টিক্কা খানের প্ররোচনায় কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ১ জুন থেকে কাজে যোগদান করেছিলেন। যদিও তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন।

রাজাকারদের কাজ জানাই ছিল। যদিও তা ছিল সেনা প্রশাসনের আওতায়। মূলত, তারা ছিল তথ্যদাতা। সম্পতি প্রশাসন প্রায় শতাধিক পাট শ্রমিককে ঢাকায় পুনরায় কাজ শুরু করার জন্য রাজি করিয়েছিল। ২৯ মে তারিখে তাদের তিনজন ট্রেড ইউনিয়নের লিডারকে আর্মি জীপে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরের দিন থেকে শ্রমিকেরা আবার পালিয়ে যায়।

৬ মিলিয়ন শরনার্থীর পুনরায় ফিরে আসাতে সমস্যা প্রকট আকার ধারন করে। ঢাকা, যশোর, রংপুর, ঈশ্বরদী, খুলনা ও চট্টগ্রামে তাদের বাড়িঘর অবাঙ্গালিদের দ্বারা বেদখল হয়ে গিয়েছিল।

২৮ এপ্রিল সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাঁরা ঢাকার প্রায় ১৫ বর্গমাইল এরিয়া জুড়ে থাকা মিরপুর ও মোহাম্মদপুর আবাসিক এলাকা দখল করে ফেলে। বাঙ্গালিদের মধ্যে যারা চলে যাওয়ার আদেশ অমান্য করেছিলেন, তাঁদের প্রত্যেককে হত্যা করা হয়।

সেনারা যশোরে মশিউর রহমান নামের একজন আওয়ামিলীগ সদস্যের বাসা ঘেরাও করে। উনি জাতীয় পরিষদের সদস্যও ছিলেন। অবাঙ্গালিরা তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। ১০ বছরের এক বালক দোতলা তলা থেকে লাফ দিলে বাতাসে থাকা অবস্থাতেই এক সিপাই তাকে গুলি করে।

দেশভাগের সময় যারা পুর্ব পাকিস্থানে এসেছিলেন গ্রহন করেছিলেন এবং রাজাকারদের সমর্থনে থাকা শান্তি কমিটি নামে একটি কমিটি বাঙ্গালিদের ফেলে যাওয়া বাসা ও দোকান ‘বরাদ্দ’ দেওয়ার জন্য প্রেস নোটিশ প্রচার করতে থাকে।

চিটাগাংয়ে আর্মিরা লালদিঘী ও রিয়াজুদ্দিনবাজারের সকল বন্ধ দোকানের তালা খুলে ফেলে এবং তা অবাঙ্গালিদের হাতে হস্তান্তর করে। এসব বেদখলকৃত সব দোকানে উর্দু  লিখিত সাইনবোর্ড লাগানো হয়।

গ্রামের বাড়িঘরগুলো ডানপন্থি জামাত-ই-ইসলামি এবং মুসলিম লীগের সদস্যদের মধ্যে ভাগ-বটয়ারা করে দেয়া হয়েছিল। এরা শেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল।

সকল হিন্দুর ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা হয়, সাথে যারা আওয়ামিলীগ এর সমর্থন করতো বলে সন্দেহ করা হয়েছিল, তাদেরগুলোও। একমাত্র ঢাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ ন্যাশনাল এন্ড গ্রিনডলে ব্যাংকের ম্যানেজার এই নির্দেশের আওতামুক্ত ছিলেন।

বাঙ্গালিদের গুরুত্বপূর্ন রেল, পোর্ট ও ডকের কাছে যাওয়া থেকে বাঁধা দেয়া হয়েছিল। যখন ৫,০০০ শ্রমিক চট্টগ্রাম ডকে কাজ করতে ফিরে এসেছিলেন, তাঁদের তাড়িয়ে দেয়া হয়। এইসব প্রতিষ্ঠান এখন মিলিটারি, নেভাল ও অবাঙ্গালি দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

চট্টগ্রামে রেলের সিনিয়র অফিসারদের হত্যা করা হয়। ঢাকা, ঈশ্বরদি ও সৈয়দপুরে কোন বাঙ্গালি সাহ করে কোন রেল জংশনের কাছে ভিড়ে নি।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে বাঙ্গালিদের স্থালাভিষিক্ত হবার জন্য প্রায় ২৫০ জন শ্রমিক পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আকাশ পথে এসেছিল ।

প্রায় তিন হাজার পাঞ্জাবি পুলিশ ঢাকা শহরে টহল দিতে থাকে। এরা মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকার রেঞ্জার এবং উত্তর-পশ্চিম খায়বার যুদ্ধমঞ্চ থেকে এখানে এসেছে।

পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় দশ হাজার মিলিশিয়া বাহিনী বিদ্রোহ করে। যাদের অনেকে সীমান্ত পার করে পালিয়ে যায় এবং অনেকে গ্রামে গঞ্জে লুকিয়ে থাকে। তাঁদের মধ্যে যারা প্রশাসনের ১৫ তারিখের মধ্যে সারেন্ডার করার ডাকে সাড়া দেয়, তাঁদেরকে হাত পেছন দিকে বাধা অবস্থায় ট্রাকের মাধ্যমে নিয়ে যেতে যায়।

কিছুদিন বাদে প্রায় শতাধিক নগ্ন মৃতদেহ বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষা নদীতে ভাসতে দেখা যায়।

পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের নাম বদল করে পাকিস্তান ডিফেন্স ফোর্স করা হয় এবং শতাধিক বিহারীকে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদেরকে পিলখানায় রাইফেল ও মেশিনগানের প্রশিক্ষন দেয়া হয়।

ঢাকার খিলগাঁয়ে ২৮ শে মে একটি অবাঙালি দোকানে বোমা বিস্ফোরণের পর সন্দেহভাজন হিসেবে ১০০ জনকে ধরা হয়।

মতিঝিলে একজন অবাঙ্গালি তার প্রতিবেশি থেকে প্রায় ১০,০০০ রুপি (প্রায় ৬০০ পাউন্ড) দাবি করে এবং শাসায় যে ২৪ ঘন্টার মাঝে টাকা না দিলে তাদেরকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিবে।

স্টেডিয়াম মার্কেটের একজন রেডিও ও ক্যামেরা দোকানদার দেখেন যে তার মালামাল সব গায়েব। সে মার্শাল ল’ হেডকোয়ার্টারে এই অভিযোগ দাখিল করে। ঐদিন রাতেই কারফিউ চলাকালীন সময়ে তার দোকানটি পুড়িয়ে দেয়া হয়।

মাজেদা বেগম একজন গৃহিনী। যিনি রাস্তার নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করছিলেন। দুইজন পাঞ্জাবি পুলিশ তাকে জোরপুর্বক জীপে তুলে নিতে চেষ্টা করে। তার চিৎকারে লোকজন এগিয়ে আসে এবং লাঠি ও পাথর দিয়ে তাঁদের মেরে তাড়িয়ে দেয়। ঐদিন রাতে পুরো বাসাবো এলাকায় অগ্নিসংযোগ করা হয়।

ঢাকার রাস্তাঘাটে ঘড়ি পড়ে বের হওয়াও বিপদজনক ছিল। টিভি, রেডিও ও ট্রান্সমিটার বাসায় লুকিয়ে রাখতে হত। সেনারা রাস্তার মোড়ে লুট করা রেডিও ঘড়ি ৩ থেকে ৬ পাউন্ড দামে বিক্রি করত।

কর্ণেল আবদুল বারী নামক একজন অফিসার পাকিস্তান স্টেট ব্যাঙ্কে ১ কোটি রুপি বা ৮,৩৩,০০০ পাউন্ড জমা করেছিলেন।

মে মাসে কিছু বিদেশি সাংবাদিকদের ভ্রমনের পূর্বে শহর পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ নেয়া হয়। জগন্নাথ হল ও ইকবাল হল থেকে ছাত্রদের মৃতদেহগুলো অপসারন করা হয়। তাঁতিবাজার, শান্তিনগর, শাখড়িপট্টি এবং রাজারবাগের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করা হয়।

স্কুল কলেজ যদিও খোলা ছিল কিন্ত উপস্থিতির হার ছিল অত্যন্ত নিম্ন। একটি স্কুলে যুদ্ধ শুরুর আগে ৮০০ জন ছাত্র ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে স্কুল খুললে সেখানে উপস্থিত হয় মাত্র ১০ জন।

১৬ থেকে ২৫ বছর বয়েসি বেশিরভাগ তরুণ সীমান্ত অতিক্রম করে মুক্তিফৌজ ট্রেইনিং ক্যাম্পে যোগদান করার জন্য রওনা হয়েছিল।

যুবকদের ধরে ধরে হত্যা করা হবে-এই ভয় চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও এই আশা তাঁদের বুকে ছিল যে, একদিন না একদিন তারা স্বাধীন বাংলাদেশে বসবাস করতে পারবে।

 

দা হংকং স্ট্যান্ডার্ড

২৫ জুন, ১৯৭১

 

আরেক চেঙ্গিস

প্রায় চারশত বছর ধরে চেঙ্গিস খান নামটি ইতিহাসে নিষ্ঠুরতা আর হত্যার প্রতিশব্দ ছিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

এই বিংশ শতাব্দিতে, মনে হচ্ছে একজন পাকিস্তানি চেঙ্গিস খানকে অতিক্রম করে ফেলবে।

‘শান্তিদাতা’ নামে পরিচিত পাকিস্তানি জেনারেল টিক্কা খান পাঞ্জাবি ও পাঠান সৈন্যদলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যারা তার নির্দেশে নৃশংস রক্তস্নানে মত্ত হয়ে পড়েছে।

খুন, ধর্ষন, অবুঝ শিশুকে হত্যার অসংখ্য অকাট্য প্রমান রয়েছে। এগুলো বড় অফিসারেরা করতেন কিংবা তাঁদের জন্যেই করা হতো।

চেঙ্গিস খান তার রক্তক্ষয়ী ভুলের মাধ্যমে নিজের একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। অপরদিকে টিক্কা খান ও তার গলাকাটা সহযোগীদের একটি দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার হত্যার জন্য চিরকাল স্মরণ করা হবে।

 

সানডে টেলিগ্রাফ

লন্ডন, ১ আগস্ট, ১৯৭১

 

খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপর পাকিস্তান আর্মির অত্যাচার

-ক্লের হোলিংওর্থ

প্রধানমন্ত্রী ইয়াহিয়া খান আগামীকাল অথবা পরবর্তী মঙ্গলবার পূর্ব পাকিস্তান ভ্রমণ করতে পারেন। তিনি সেই মুহূর্তে ঢাকায় অবতরন করবেন যখন বাংলাদেশি গেরিলা তৎপরতা তুঙ্গে উঠেছে।

এই পরিকল্পনা পশ্চিম পাকিস্তানী সরকার অথবা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ছিল না। বরং বাঙালি জণগণকে ভবিষ্যতের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ভীত করে তোলার একটি প্রকৃয়া ছিল।

গেরিলারা ঘোষণা দেয় তারা অতি সত্ত্বর ‘নাটকীয় একশানে’ যাচ্ছে। বাঙ্গালিদের এয়ারপোর্টের কাছে যেতে সাবধান করে দেয়া হয়।

শুক্রবার রাতে ফার্মগেটে (এয়ারপোর্ট ও শহরের মাঝের একটি শিল্পপল্লী এলাকায়) সেনাবাহিনী ও গেরিলাদের মাঝে একটি সংঘর্ষ হয়।

ভারী মেশিনগান দিয়ে পাল্টাপাল্টি গোলাগুলি চলে। বোমার তীব্র শব্দে পুরো শহর প্রকম্পিত হয়ে উঠে। ছয়জন গেরিলার মৃত্যু হয়েছে বলে রিপোর্ট পাওয়া যায়।

সেনাবাহিনী এর চেয়েও বড় ধ্বংসলীলা চালায় ঢাকা শহরের অদূরে অবস্থিত লুডারিয়া, নালচাটা, লারিপাড়া নামের তিনটি খ্রিস্টান অধ্যুষিত গ্রামে। গ্রামগুলো টঙ্গি থেকে আরিকহোল্ড পর্যন্ত চলে যাওয়া রেল লাইনের পাশের উঁচু বাঁধের উপর অবস্থিত ছিল।

কোন সম্পূর্ন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের উপর সেনা অভিযানের এটিই ছিল প্রথম ঘটনা। তারা গ্রামের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গেরিলারা গ্রামগুলো থেকে কয়েক মাইল দূরে একটি রেলগাড়িকে লাইনচ্যুত করে দেয়। আমি এই ঘটনার ফলাফল দেখছি।

এই মুহূর্তে গ্রামগুলো সম্পূর্ণভাবে পানি দ্বারা বেস্টিত। সেই গ্রামগুলোর অনেকেই ঢাকার বিভিন্ন হোটেলে কিংবা প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করতো। তারা জানায় কমপক্ষে ৩ থেকে চার হাজার খ্রিস্টান গৃহহারা হয়েছে এবং শতাধিক লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

যদিও এই ঘটনাগুলো বুধবারে ঘটে, তথাপি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র থেকে এই বিষয়ে আমি কোন মন্তব্য জানতে পারি নি। অবশ্য এর পর থেকে তাকে দেখাও যায় নি। এলাকার পাদ্রীগন তাদের সম্প্রদায়ের উপর এই প্রথম হামলার ব্যাপারে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

 

আল হাওয়াইদ

লেবানন, ২০ অগাস্ট, ১৯৭১

 

পূর্ণ ধ্বংসের যুদ্ধ

একজন পাকিস্তানি অফিসার একটি গ্রামে যান এবং সেখানকার দরিদ্র ও অনাহারী গ্রামবাসীকে তারা পাশে জড়ো হতে বলেন। তিনি বলেন, “আমার কিছু সৈনিক আহত হয়েছে। তাই আমার রক্তের দরকার এবং আমার কিছু স্বেচ্ছাসেবী প্রয়োজন।“

কোন প্রতিউত্তর গ্রহনের পূর্বেই সেনারা ভিড়ের মধ্য থেকে কিছু যুবককে ধরে নিয়ে এসে মাটিতে শুইয়ে দেয় এবং তাদের শিরা ফুটো করে দেয়। তাদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রক্ত বের হতে থাকে।

পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার মধ্যে এটি ছিল কেবল একটি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানের বিরোধী ‘মানুষের উপর’ পশ্চিম পাকিস্তানের এই অত্যাচার নিয়মিতভাবেই চলতে থাকে।

লাখ লাখ লোকের ভারত অভিবাসন কোন আশ্চর্যের কিছু ছিল না। লোকজন প্রাণভয়ে ও ক্ষুধার তাড়নায় তাড়িত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলো।

 

এল কমার্শিও

ইকুয়েডর, ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

 

দুই লাখ বাঙ্গালির হত্যা  – (আলফানসো রোমাজো গঞ্জালেস)                

পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় ২ লাখ বাঙ্গালির  হত্যাকান্ডকে কেবলমাত্র একটি শব্দ দিয়েই সঠিকভাবে চিত্রিত করা যায়ঃ গনহত্যা। এই অপরাধটি জেনারেল ইয়াহিয়ার নির্দেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত হয়েছিল। এই ২ লাখের হিসাবটি দেন লিওন এফ হেসার Leon F. Hesser, Director of (USAid agency)। ব্রিটিশ ক্যালকুলেশন অনুযায়ী এই সংখ্যাটি তিন লাখের চাইতেও বেশি। “এটা অনেকটা গ্রীক ট্র্যাজেডির মতো”, বলেন একজন ব্রিটিশ এক্সপার্ট। উনি সেখানে সাহায্য নিয়ে গিয়েছিলেন।

পূর্ব পাকিস্তানের চাহিদা আসলে কি ছিল? স্বায়ত্ত্বশাসন। দেশটির পশ্চিম অংশ পূর্ব অংশ থেকে ১,৬০০ কিলোমিটারব্যাপী বিশাল ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা পৃথকীকৃত ছিল। এইভাবে কি কোন দেশের অস্তিত্ব রক্ষা সম্ভব? দুইটি দেশের দুইটি ভাগ বিশাল সীমারেখা দ্বারা পৃথক হয়েও কিভাবে টিকে থাকে? এই প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত গত মার্চে অস্ত্র ও যুদ্ধের মাধ্যমে দেয়া হয়েছিল। আমেরিকান এক কর্মকর্তা বলেন যে, কেবলমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধই এই মাত্রার অপরাধের সাথে তুলনীয়।

প্রচুর মানুষ মারা যাবার পরেও ইতোমধ্যেই ৮০ লাখেরও বেশি শরনার্থী প্রাণ বাচাতে ভারতে আশ্রয় গ্রহন করেছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজে শরনার্থীদের দায়ভার গ্রহন করেছেন এবং ইউএসএ,ইউকে প্রভৃতি দেশ থেকেও ত্রান সামগ্রী আসা শুরু হয়েছে। এই অসহায় শরনার্থীদের বাচিয়ে রাখতে সামনের ছয় মাসে আরো মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন।

অবস্থা আরো করুন হতে লাগল। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান দুর্ভিক্ষের দিকে ধাবিত হতে লাগলো। নভেম্বরের শেষ নাগাদ খাদ্যভাব দেখা দেবে। মোট উৎপাদন ও চাহিদার মাঝে ঘাটতি ছিল প্রায় ৪০ লাখ মেট্রিক টন ধান ও গম। যদিও বা খাদ্য ঘাটতি সামাল দেয়া হয়, যুদ্ধবিধস্ত দেশে যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ন ভেঙ্গে পড়েছে, কিভাবে তা সরবরাহ করা হবে? মুক্তিকামী সেনারা প্রতিটি পয়েন্টে যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার চেষ্টা করছে যাতে ইয়াহিয়ার পাকিস্তানি সেনারা তাদের তৎপরতা না চালাতে পারে। এই ধবংসলীলা তাঁদের নিজেদের জীবনেই দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা আরো বাড়িয়ে তুলছে।

কিন্ত এই নৃশংস যুদ্ধের মূল কেন্দ্রবিন্দুঃ মানুষকে অবহেলা করা হচ্ছে। কিন্ত এই দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থায় অসহায়দের জন্য সাহায্য দেয়া একটি দেশও এই গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় নি। কিন্ত পুরো বিশ্বের এই নির্মম গনহত্যার বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে সোচ্চার হওয়া উচিৎ।  কিন্ত কেউই আওয়াজ তোলেনি, মানবাধিকারের নামে বলা কথাগুলি ছিল কেবলই ‘তত্ত্বকথা’। এই জন্যেই রাসেল বলেছিলেন, বিংশ শতাব্দির মানুষ হচ্ছে অন্য যে কোন শতাব্দির মানুষের তুলনায় নির্দয় ও সন্দেহবাতিকগ্রস্ত।

 

দা এজ

অস্ট্রেলিয়া, ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

 

হারানো মিলিয়নস -ম্যাক্স বেটি

 পূর্ব পাকিস্তানে যংসযজ্ঞের ১৬০ দিন পরেও, অসহায় বাঙ্গালি কৃষকেরা তাদের নগ্ন সন্তানদের নিয়ে ভারতের পোতাশ্রয়ে আসতে লাগলো।

অবাক করার বিষয়, প্রতিদিন ৪০ হাজারের বেশি মানুষ ভারতে পাড়ি দিচ্ছে। এরকম অভিবাসন পৃথিবীবাসী খুব বেশি দেখেনি। ভারত সরকারের মতে, ইতোমধ্যে আট মিলিয়নের মত শরনার্থী এসেছে এবং বছর শেষে এই সংখ্যা ১০ মিলিয়নে পৌছাবে।

এই সেপ্টেম্বরেও শরণার্থীরা ৫ মাস আগের শরণার্থীদের মতোই গুলাগুলি ও ধর্ষণের বর্ণনা দিতে লাগলো।

 

সুম্মা ম্যাগাজিন

কারাকাস, অক্টোবর, ১৯৭১

 

লাশ দিয়ে পরিপূর্ন একটি দেশ

নাজি বাহিনী কর্তৃক ইহুদি নিধন, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমানবিক বোমা হামলা, বায়াফ্রার ম্যাসাকার, ভিয়েতনাম যুদ্ধ – মানব ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সকল বৃহৎ গণহত্যার ঘটনা আরেকটি নতুন উদাহরন পেতে যাচ্ছে বিশ্ববাসী- ‘পূর্ব পাকিস্তান’।

বিদেশি গনমাধ্যম প্রকৃত ঘটনাটি সামনে নিয়ে আসার পরেও লোকজন এর প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারছিল না। এটাও জানতে পারছিল না যে, ঠিক এই মুহূর্তে এশিয়ার লাখ লাখ মানুষ তাদের জীবন ও মাতৃভূমির ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করছে।

পুরো ঘটনার সারমর্ম এরকম- প্রায় পাঁচ মাস আগে আপাত ভাতৃপ্রতীম পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানে আগ্রাসন চলে।  হাজারো জনগনকে হত্যা করা হয়, নারীদের ধর্ষন করা হয়, শিশু ও বৃদ্ধরা খাদ্যভাব ও কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মাইগ্রেশনের ইতিহাস সৃষ্টি করে প্রায় আট মিলিয়ন অধিবাসী ভারতে চলে যায়। যা কিনা একসময় পাকিস্তানের সাথে একত্রে ছিল।

এই ট্রাজেডির সবচেয়ে লোমহর্ষক দিকটি হল, ঢাকা শহরে এক রাতের মধ্যেই প্রায় ৫০,০০০ লোককে হত্যা করা হয়। ২৬ মার্চের মধ্যরাত থেকে যার শুরু হয়, এবং এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাড়িয়েছে প্রায় ১ মিলিয়নে। প্রতিদিন ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ ভারতে শরণার্থী হিসেবে চলে যাচ্ছে।

 

দা নিউ ইয়র্ক টাইমস

১৭ নভেম্বর, ১৯৭১

 

আর্মির আক্রমণের পর পূর্ব পাকিস্তানের শহরের অবস্থা

অক্টোবরের ২৭ তারিখ, বেলা ৮ টার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি টাস্ক ফোর্স শেখেরনগরে আসে এবং পুরো শহর ধবংস করে দেয়।

মূলত গ্রামে গেরিলা বাহিনী অবস্থান করছে, এইরকম একটি ভুল সংবাদের ভিত্তিতে তাঁরা গ্রামটিতে আক্রমন করে। কোন ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই মোটরে লঞ্চে তাঁরা আসে। যদিও ঢাকা থেকে বিশ মাইল দূরে অবস্থিত শেখেরনগরের অনেক গ্রামবাসীই লঞ্চের ইঞ্জিনের আওয়াজ শুনে পুকুর, ডোবা ও শস্যক্ষেতে লুকিয়ে যায়।

গ্রামে ঢোকামাত্র বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁরা গুলি করে মানুষ হত্যা করে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। বেঁচে যাওয়া অধিবাসীরা একটি গণকবর দেখালো যেখানে প্রায় ১৯ জনের লাশ ছিল।

গ্রামের পাকা স্কুল ঘরের আসবাবপত্র এবং দরজাগুলো পাক সেনারা রান্নার জন্য চিড়ে ফেলে। একটি রাইস মিল পুড়িয়ে ফেলা হয়। গ্রামের কৃষকদের সদ্য মজুদ করা পাকা ধানের গোলা পুড়িয়ে দেয়া হয়। গ্রামের প্রায় ৩০০ গরু ও ছাগল জবাই করা হয়।

ইউনাইডেট স্টেট এইড প্রোগ্রামের আওতায় গ্রামবাসীর প্রাপ্ত বিশাল পরিমানের গম লুট করে পাক সেনাবাহিনীদের নৌকায় ভরা হয়।

ফসফেট সার দিয়ে বোঝাই একটি গুদাম পুড়িয়ে ফেলা হয়। বেশিরভাগ সারের বস্তা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

মসজিদ সংলগ্ন অনেক বাড়িতেও আগুন লাগানো হয়। হিন্দু মন্দির,যেখানে প্রায় ৪০০ হিন্দু পরিবারের বাস ছিল তা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং হিন্দু দেব-দেবীদের মূর্তিগুলিকে গুলি করে নষ্ট করা হয়।

এমনকি গ্রাম্য পোস্ট অফিসেও লুট করা হয়। পোস্ট অফিসের স্ট্যাম্প ও জমাকৃত টাকা তারা নিয়ে যায়।

একজন গ্রামবাসী জানায়, “এখানে দেখুন, তারা এমনকি আমাদের ফলের গাছগুলোও ধবংস করেছে। কলাগাছ সহ আরো কিছু গাছ বড় হতে অনেক সময় নেয়। সেগুলোও তাঁরা ধ্বংস করেছে। তারা গাছের গোড়ায় শুকনো খড় দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়।“

 

নিউজউইক ম্যাগাজিন, ইউএসএ

নভেম্বর ২২, ১৯৭১

 

বাংলাদেশঃ প্রতিশোধের সময়

কিছু আগুনে পুড়ে ধবংস হয়ে যাওয়া গ্রাম জনমনে ভূতের মতো আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। জলে ভেসে যাওয়া লাশগুলো নদীর সাদা ও হাল্কা বেগুনি রঙা এর কচুরীপানার সাথে মিশে যেন শোকের এক দৃশ্যপট সৃষ্টি করেছে। আমি (লেখক) এবং ডেইলি টেলিগ্রাফের ক্লারা হলিংওর্থ (Clare Hollingrowth) রাজধানী ঢাকার বাইরে প্রায় ৪৫ মাইল জায়গা ভ্রমন করেছি। মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের ‘স্বাধীনকৃত’ একটি এলাকায় গিয়েছিলাম। জীবিত এবং মৃত সব কিছুই জনযুদ্ধের স্বাক্ষ্য বয়ে বেড়াচ্ছিল। ৩ ঘণ্টাব্যাপী আমাদের জলাভূমির পথে শতাধিক কৃষক আমাদের জলযানটি দেখে। কিন্তু রাখাল ছেলেমেয়েরা, জাল মেরামত করা জেলে কিংবা মাটির ডেরা মেরামত করার জন্য মাটি বহন করা গৃহবধুরা পর্যন্ত আমাদের হাত নাড়া দেখে জবাবে কোন হাত নাড়ে নি। পরে মুক্তিবাহিনীর একজন আমাকে বলে, তাদের এই অবসাদের কারন তাদের মনে বড় কষ্ট।

এমন কোন বাঙালি পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা তাঁদের পরিবারের কোন নাম কোন সদস্যকে হারায় নি…

ছোট ও জীর্ণ গ্রামগুলোতে গেলে, লোকজন আমাদের পাক সেনাবাহিনীর বর্বরতার দিনলিপি বলতে লাগল। একটি ছোট গ্রামের প্রায় সকলেই একটি ১৪ বছরের মেয়ের কথা জানে, যাকে ১২ জন পাক সেনা উপর্যুপুরি ধর্ষন করে এবং পরে তার একদিন বয়সী বাচ্চাসহ হত্যা করে। পাশের আরেকটি গ্রামের অধিবাসীরা জানায় যে দুইজন সৈনিকে কুমারী মেয়ে দাবী করছিলো। গ্রামবাসী তাঁদের পাকড়াও করে মার্শাল ল’ এডোমিনিস্ট্রেটরের হাতে তুলে দেয়। ঠিক এর পরদিনই পাক সেনাবাহিনী পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং ৩৮ জন মানুষ হত্যা করে।

পাক সেনাবাহিনী দোকানসহ যা ইচ্ছা তাই লুট করত। তবে বাঙ্গালিদের মতে, পাক বাহিনীর এই অত্যাচারই তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পিছের প্রেরণা। সব জায়গায় মুক্তিযোদ্ধাদের গুণগাণ শোনা যেতে লাগল। শোনা গেল এই অত্যাচারের বিচারের আসছে।

একবার নদী পার হবার সময় দেখলাম, একজন আর্মি সার্জেন্ট বড় একটা লাঠি দিয়ে এক বাঙ্গালিকে পিটাচ্ছে। আমাকে দেখে সে থেমে যায়। পরে আমার সাথে থাকা বাঙালিটি আমাকে বলে, “এটা প্রায় রোজকার ঘটনা। কিন্ত যখন প্রতিশোধের দিন আসবে, তখন তা হবে খুবই ভয়াবহ।“

 

দা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

ডিসেম্বর ২০, ১৯৭১

 

ডাক্তার, সাংবাদিক, লেখক ও অধ্যাপকদের মৃতদেহ গর্ত খুঁড়ে পুঁতে ফেলা হয়

-সিএস পণ্ডিতের ভাষ্য অনুযায়ী, অবরুদ্ধ ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯, ১৯৭১

আত্মসমর্পনের এক সপ্তাহ আগে প্রায় ১২০ জনের মত দেশের শীর্ষ স্থানীয় ডাক্তার, লেখক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করা হয়। কারফিউ চলাকালীন সময়ে নারী পুরুষ নির্বিশেষে তাঁদের বাড়ি থেকে তুলে নেয়া হয়। তাঁদের সম্পর্কে কিছুই জানা যায় নি যতক্ষন না পর্যন্ত ৩৫ জনের লাশ পেছনে হাত বাধা অবস্থায় একটি ইটের ভাটায় পাওয়া যায়।

এই খবর দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। মৃতদের মধ্যে একজন ছিলেন ডাঃ ফজলে রাব্বি, ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন স্বনামধন্য হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। আরো ছিলেন ডাঃ আলীম চৌধুরী, চক্ষু বিশেষজ্ঞ; জনাব নিজামুদ্দিন, বিবিসির সংবাদদাতা এবং পাকিস্তানের ২ টি সংবাদ এজেন্সির একটি, পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি; মোঃ শহীদুল্লাহ কায়সার, বিখ্যাত লেখক এবং একটি পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক; মিসেস আখতার ইমাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর একটি মহিলা হলের প্রভোস্ট; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী। ডঃ সন্তোষ ভট্টাচার্য, ইতিহাসের অধ্যাপক; জনাব সিরাজ উদ্দিন, দৈনিক ইত্তেফাক এর সম্পাদক সহ আরো অনেক।

 

অমৃতবাজার পত্রিকা

ডিসেম্বর ২০, ১৯৭১

 

আত্মসমর্পনের পূর্বে বুদ্ধিজীবি হত্যা ছিল পূর্বের পরিকল্পনা

(ঢাকা সচিবালয় থেকে অরুণ ভট্টাচার্যের ভাষ্যমতে, ডিসেম্বর ১৯, ১৯৭১)

জনাব রুহুল কুদ্দুস, বাংলাদেশ সরকারের মহাসচিব, আত্মসমর্পনের পূর্বে এইরকম বুদ্ধিজীবি নিধনের জন্য পাকিস্তানি জেনারেলদের তীব্র ভাষায় নিন্দা জানান।

জনাব রুহুল কুদ্দুস কান্নায় ভেঙে পরে জানান, বাংলাদেশকে পঙ্গু করে দেয়ার জন্য দেশের সেরা ডাক্তার, অধ্যাপক, প্রশাসক এবং বুদ্ধীজীবিদের হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, যখন আমি এই ঘটনার জন্য পাকিস্তানি আর্মি জেনারেল রাও ফরমান আলী ও তার সদস্যদের দিকে আংগুল তুলি, তখন তারা বলে, এই কাজ আধা সামরিক ফোর্স ও রাজাকারেরা করেছে। “কিন্ত আমি জানি, মূল পরিকল্পনা করা হয়েছিল ঢাকা সেনানিবাসে। এই জেনারেলদের সুস্পষ্ট নির্দেশে আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বন্দিদের ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই হত্যা করত। “

 

দা টাইমস, লন্ডন

ডিসেম্বর ৩০, ১৯৭১

 

আত্মসমর্পনের পূর্বেই বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করা হয় -পিটার হেজেলহার্টস

কেউই জানে না, কোন প্রকার সক্রিয় রাজনীতির সাথে না থাকা ঠিক কতজন বুদ্ধিজীবি, ডাক্তার, সাংবাদিক এবং যুবককে চিরদিনের জন্য গুম করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আনোয়ার পাশার স্ত্রী মিসেস মহসিনা পাশা তাঁর স্বামীকে খোঁজার জন্য সম্প্রতি একের পর এক গণকবরে যান। সেখানে অনেক বুদ্ধিজীবির লাশ পাওয়া যায়।

অনেকের মতোই ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে আত্মসমর্পনের মাত্র দুই দিন আগে প্রফেসর পাশাকে গ্রেফতার করা হয় এবং রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেই একই সকালে, দুজন সহকর্মী জনাব রাশিদুল হাসান, ইংরেজী বিভাগের লেকচারার এবং প্রফেসর সন্তোষ ভট্টাচার্য, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপককে একই রাজাকার গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা তুলে নেয়।

পাকিস্তানি প্রিজনার-অব-ওয়ার জানায় যে তাঁরা এই বিষয়ে কিছুই জানত না। কিন্ত প্রমাণ পাওয়া যায় যে একজন সিনিয়র অফিসারের সরাসরি নির্দেশেই রাজাকারেরা এই কাজ চালায়।

মোঃ নিজামউদ্দিন নামের একজনের নাম তাঁর ডেস্কে পাওয়া যায়। পাশে একটি মন্তব্য লেখা ছিল, “অনুপ্রাণিত করা বক্তব্য”। তাঁর নামটিকে টিক চিহ্ন দেখা হয়েছিল।

এই অভিযানের একমাত্র বেঁচে যাওয়া ব্যাক্তি, জনাব দেলোয়ার হোসেন, গ্রীনল্যান্ড মার্কেন্টাইল কোম্পানির প্রধান হিসাবরক্ষক জানান যে, ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে একদল রাজাকার তাঁকে তাঁর বাসা থেকে তাকে টেনে হিচড়ে নিচে নামায় এবং একটি বাসে করে কালো কাপড়ে চোখ বেধে ঢাকার শহরতলীর এক রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যায়।

পরে তাকে একটি রুমে ঢোকানো হয়। কিছুক্ষন পর তার চোখের কাপড়টি খোলা হয়। তিনি দেখতে পান তার সাথে আরো অনেক বন্দি রয়েছেন। যাদের অনেককে টর্চার করা হয়েছে, অনেকের হাত ও পায়ের নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে।

এক ঘন্টা পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। বন্দিদের বেশিরভাগ ছিলেন ডাক্তার, সাংবাদিক, আইনজীবি ও শিক্ষক। পরে তাদের বাসে করে ঢাকার পাশের একটা জলাভূমিতে নিয়ে আসা হয়।

রাজাকারেরা একটি বড় গাছের নিচে বন্দিদের একত্রিত করে, যেখানে প্রায় ১৩০ জনের মত লোক ছিল। কয়েকজন বন্দি তাদের জিজ্ঞেস করে, কেন তাদের হত্যা করা হচ্ছে। একজন রাজাকার তাদের চুপ করতে বলে এবং আদেশ দেয়, “এই বেজন্মাদের শেষ করে দাও!”

জনাব হুসাইন বলেন, “তারা রাইফেল দিয়ে বন্দিদের উপর গুলি করা শুরু করে, এবং বাকিদের বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে হত্যা করা হয়। আমি কোনমতে আমার হাতের বাধন খুলতে সক্ষম হই এবং নদীর দিকে দৌড় দিয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাই।