গাজীপুর অস্ত্র কারখানায় কয়েকজন কর্মচারীর হত্যাকাণ্ড

Posted on Posted in 8

৬৯। গাজীপুর অস্ত্র কারখানায় কয়েকজন কর্মচারীর হত্যাকাণ্ড (৪৭০-৪৭১)

গাজীপুর অস্ত্র কারখানায় কয়েকজন কর্মচারীর হত্যাকাণ্ড
সুত্র –দৈনিক পূর্বদেশ, ১০ মে, ১৯৭২।

অস্ত্র কারখানার কর্মচারীদের এম,এন হোস্টেলে এনে হত্যা করা হতো

গাজীপুর অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর থেকে পাক বাহিনী বাঙ্গালী অফিসারদের সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। তাই প্রথমে অফিসারদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে মেশিনগানের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। কিন্তু এই সমস্ত অফিসারদের পরিবারের লোকজনদের কান্নাকাটি ও অনুরোধে তাদের সেই সময়ের জন্য ক্ষমা করে দেয়া হয়।

এই সময় গাজীপুর অস্ত্রাগারের আবাসিক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার করিমুল্লাহ কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্ট থেকে হেলিকপ্টার যোগে সেখানে আসে এবং পাক বাহিনীর সেনাদের সাথে গোপন আলোচনা করে। সেই সময় বাঙ্গালী অফিসারদের নিজ নিজ কোয়ার্টারে চলে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়। পরের দিন ৩০শে মার্চ (১৯৭১) পাক বাহিনী বাঙ্গালী অফিসারদের কোয়ার্টারে খানাতল্লাশি করার অজুহাতে তাদের মালপত্র লুট করে নেয়।

পরে ২রা এপ্রিল পর্যন্ত প্রত্যেক দিন সিপাহীরা বাঙ্গালী অফিসারদের কোয়ার্টারগুলিতে হানা দিয়ে নানারুপ অত্যাচার করতো। হানাদার পাকবাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক বাঙ্গালী অফিসার তাদের পরিবারসহ গাজীপুর ছেড়ে নানাদিকে পালিয়ে যেতে থাকেন।

৩রা এপ্রিল মধ্যাহ্নে ব্রিগেডিয়ার করিমুল্লাহ ৬ জন অফিসারকে পাকবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ঢাকা চলে যাবার নির্দেশ দেয়। এই ৬ জন অফিসার ছিলেন ওয়ার্কস ম্যানেজার জনাব এ, কে মাহবুব চৌধুরী, ডাঃ মেজর নঈমুল ইসলাম, হেডমাষ্টার কুদ্দুস সাহেব, ওয়েলফেয়ার অফিসার মাহবুবুর রহমান ও আরো দু’জন অফিসার।

এই সমস্ত অফিসার ও তাঁদের পরিবারদের একটি বাসে করে এবং দু’টি গাড়ীতে করে নিয়ে আসা হয়। বাসে বিহারী এবং পাঞ্জাবীদের সাথে পাকবাহিনী বাঙ্গালীদের পাহারা দিচ্ছিল। গাড়ীগুলো যখন কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছে তখন ব্রিগেডিয়ার করিমুল্লাহ, ওয়াহেদ নামক একটি পাঞ্জাবী অফিসারকে বাস থেকে নামিয়ে নিজের গাড়ীতে তুলে নেয়।

জনাব মাহবুব চৌধুরী তখন ব্রিগেডিয়ারকে বাঙ্গালী অফিসারদের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নামিয়ে দেবার অনুরোধ করেন। কিন্তু ব্রিগেডিয়ার কোন জবাব না দিয়ে গাড়ী নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট কোয়ার্টারের দিকে চলে যায়। আর বাসটি তখন পাক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে আবার ঢাকার দিকে চলতে থাকে।

বাস ঢাকার এম, এন, এ হোষ্টেলে এসে থামলে পাকবাহিনী সকলকে নিচে নামবার আদেশ দেয়। বাসের বিহারীরা মোহাম্মদপুর চলে যায়। অন্য অবাঙ্গালীরা পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য একটি ট্রাকে চড়ে বিমানবন্দরের দিকে যায়। নিরুপায় হয়ে বাঙ্গালী অফিসারগণ নিজ নিজ গন্তব্যস্থলে যাবার জন্য রিকশা ডাকবার উদ্যোগ নিলে বর্বর সেনারা অফিসারদের হোষ্টেলের ভেতর যেতে নির্দেশ দেয়।

এই সব অফিসারের পরিবারবর্গ তখন হোষ্টেলের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকে। একটি নির্জন কক্ষে অফিসারদের নিয়ে আসা হলো। জোহরের নামাজের সময় শেষ হয়ে আসছে দেখে তারা পানির অভাবে বিনা অজুতেই হেডমাষ্টারের ইমামতিতে নামাজ আদায় করে নেন। নামাজ শেষ হতেই একজন সিপাই হেডমাষ্টার সাহেবের পেন দিয়ে প্রত্যেক অফিসারের পরিচয় লিখে নেয়।

দেরী হচ্ছে দেখে অফিসারগণ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। সিপাইকে তাঁদের পরিবারের লোকেরা বাইরে অপেক্ষা করছেন- এ কথা জানালে পরিবারবর্গকে ভেতরে নিয়ে আসার জন্য আদেশ দেয়। কিন্তু কেউ রাজি হলেন না এ প্রস্তাবে। তখন সকলে হেডমাষ্টার সাহেবকে বাইরে গিয়ে অপেক্ষারত পরিবারের লোকজনদের সান্ত্বনা দেবার জন্য পাঠালেন।

হেডমাষ্টার সাহেব সিপাইর সাথে তখন বাইরে এলেন। সকলকে সান্ত্বনা দিয়ে তিনি আবার চলে গেলেন। কতক্ষণ পরে বর্বর সেনারা শুধু হেডমাষ্টার সাহেবকে বাইরে চলে যেতে অনুমতি দেয়। মাষ্টার সাহেব যখন চলে আসছিলেন, তিনি দেখতে পান যে সিপাহীরা বাঙ্গালী অফিসারদের কাছ থেকে সমস্ত জুতা, মোজা, ঘড়ি ও টাকা-পয়সা কেড়ে নিচ্ছে। তারপর হায়েনার দল বাঙ্গালী অফিসারদের উপর পরপর চারটি গুলি করে।

একই সময়ে বাইরে অপেক্ষারত বাঙ্গালী অফিসারদের পরিবারের লোকজনও এই গুলির শব্দ শুনতে পান। কিন্তু তখনও তারা জানতেন না যে তাদের আপনজনদের পৃথিবীর মায়া ছেড়ে বাঙ্গালী হয়ে জন্মলাভ করার অপরাধে বর্বর পশুশক্তি গুলি করে হত্যা করেছে। এম, এন, এ হোষ্টেলে গুলির শব্দের পরেই মেজর মাহবুব চৌধুরী এবং মেজর নঈমুল ইসলাম তাদের ছেলেমেয়ে নিয়ে হেডমাষ্টারের পরিবারবর্গের সাথে চলে যান।