গেরিলা অভিযান

Posted on Posted in 10
গেরিলা অভিযান

৯ নং সেক্টর আমার অধীনে সর্বসাকুল্যে তিনখানা জীপ, একটি বাস ও একটি ট্রাক ছিল। এর ভেতরে মেজর ওসমানের কাছ থেকে নেযা টয়োটা জীপটাও আছে। আমি ভাগ্যবান যে, গেরিলা পদ্ধতি প্রবর্তনের সময় এই যানবাহনগুলো পেয়েছিলাম। গাড়ী ও ট্রাকগুলো বৃষ্টির মধ্যে অনেক সময় চলতে পারতো না। এই গাড়িগুলোর অবস্থা খুবই শোচনীয় ছিল। কোননা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে এই গাড়ীগুলো বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসা হয়। তারপর থেকে এর কোন রক্ষণাবেক্ষণই হয়নি। অবশ্য শেষের দিকে ১৯৭১ সালের অগষ্ট মাসের কোন এক সময়ে ব্যারাকপুরের চার্লি সেক্টর পশ্চিম রণাঙ্গনের ‘জয় বাংলা’ গাড়ীগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়। এ কাহিনীর একটা দিক মাত্র। নৌকায় খালবিল দিয়ে গেরিলা পাঠানোর চেয়ে স্থলপথে পাঠানোর অনেকটা কম সমস্যা- সংকুল। স্থলপথে যারা যাবে তাদের শুধু রেশনের টাকা দিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু যারা জলপথে যাবে, তাদের জন্য চাই পথঘাট ভাল চেনে এইরকম উপযুক্ত মাঝি। এই সময় ওই রকম মাঝি যোগাড় করা খুবই দুষ্কর ছিল। ভাগ্য ভাল, এ ব্যাপারে আদম সন্তান পাচার করে এই রকম একজন চোরাচালানীর সাক্ষাত পেয়ে গেলাম। সারাজীবন সুন্দর বনের খাল বিল দিয়ে সে চোরাকারবার করেছে। সুতরাং মানচিত্রের চাইতেও সুন্দরবনের গোপন পথঘাটের খবর তার কাছে সঠিকভাবে পাওয়া যেত। সে প্রাণ দিয়ে কাজ করছে এবং কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে পথ দেখিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালীতে নিরাপদে পৌঁছে দিয়েছে। তার নাম রইজুদ্দিন। এক সময়ের কোটিপতি। আজ তার সর্বস্ব পাকহানাদাররা কেড়ে নিয়েছে। বয়স পঞ্চাশের মাঝামাঝি, পাতলা, কালো। এই রইজুদ্দিন ভয়ানক ধূর্ত ও চটপটে একদিন সে গর্ব করে বললেঅ, “স্যার, হানাদারদের বাপের সাধ্য নেই আমাকে ধরে। কোননা, এই দীর্ঘ পঁচিশ বৎসর ওদের চোখে ধুলো দিয়ে ‘কাম’ করে আসছি। কিন্তু খোদাকে বিশ্বাস করি। তিনি নারাজ হলে যে কোন মুহূর্তে আমি ধরা পড়তে পারি।

জুলাই মাসে ৬০ জন লোকের একদল মুক্তিযোদ্ধা খুলনার উদ্দেশ্য যাত্রা করেছিল। আরও দল, পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার পথপ্রদর্শকদের আগষ্ট মাসের শেষ সপ্তাহে ফেরত পাঠিয়ে দেবার কথা ছিল। কিন্তু ওরা মাত্র চারজন ফিরে এসে খবর দিল যে, রাজাকারদের জন্য খুলনায় থাকা খুবই কষ্টকর হয়ে উঠেছে। মুসলিম লীগের পান্ডরা বাঙ্গালীদের দিয়ে এই রাজাকার বাহিনী গঠন করেছে। জুন মাস থেকেই রাজাকার বাহিনীতে লোক ভর্তি বেড়ে যায়। কেননা, ওই সময়ে বেশীভাগ জোয়ান ছেলেরা প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত পার হয়ে ভঅরতে চলে আসে। তখন থেকে আগষ্ট মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটা থমথমে ভাব। এই সময়ে রাজাকারদের ঘৃণ্য সহযোগিতায় পাক-বর্বররা নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মাত্রা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। এর উপর এই সময়ে বিহারী মুসলমানদের নিয়ে গঠিত আর একটা বাহিনী দেশব্যাপী লুন্ঠন, ধর্ষণ ও নারকীয় হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠলো। এমনকি, ওদের প্রভুদের পশুপ্রবৃত্তিকে খুশি করার জন্য এই পা-চাটা কুকুরের দল নারী হরণ পর্যন্ত করতে এতটুকু সংকোচ বা দ্বিধা করলো না। এইসব হৃদয়বিদারক খবর শুনে আমরা যে কিরূপ মর্মাহত হয়েছিলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সেই প্রতিহিংসার অনির্বাণ শিখা প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার অন্তরে দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগলো। সারা জুলাই মাস ধরে পুরো বর্ষা। দপ্তরে দপ্তরে প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা, অধিনায়ক এখনই এই মুহুতে শত্রুবাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত। সবাই যুদ্ধংদেহী চিৎকারে ফেটে পড়লো। বর্ষাকালেই শত্রুর বিষদাঁত ভেঙ্গে ফেলে বাংলার পবিত্র মাটিতে যুদ্ধ করার চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দিতে হবে। মোট কথা জুলাই, আগষ্ট-এই দু’মাস মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ উভয়ের কাছেই ভয়ানক উত্তেজনাপূর্ণ। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে সবচেয়ে জরুরী কাজ হলো- বৃত্তাকার যুদ্ধে, শক্তি কেন্দ্রীভূত না করে বেশী সংখ্যায় দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধা পাঠিয়ে রাজাকার ও অন্যান্য গজিয়ে ওঠা সহায্যকারী সংগঠনগুলোর প্রসার এখনই স্তব্ধ করে দেয়া। আমাদের সর্বাধিনায়ক যে পরিকল্পনা অনুযায়ী ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা ও পটুয়াখালী এই চারটি জেলাকে ১৯টি অঞ্চলে বিভক্ত করা হলো। আগের কার্যক্রম অনুযায়ী এক একটি অঞ্চলে দু’একটি থেকে তিনটি থানা থাকবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আগে হতেই যেসব গেরিলা ঘাঁটি ছিল তা সর্বমোট ৮৩টি। প্রতিটি জেলা, প্রতিটি অঞ্চল, প্রতিটি থানার দায়িত্ব যথাক্রমে একজন সামরিক অফিসার, একজন জুনিয়ার কমিশন অফিসার, অথবা অভিজ্ঞ নন-কমিশন অফিসার এবং বাছাই করা একজন ছাত্রের উপর ন্যস্ত থাকবে। সকল পর্যায়ে এদের সাথে থাকবে একজন করে সহ-অধিনায়ক।

আরও স্থির করলাম যে, উপরের সংখ্যানুযায়ী একই অনুপাতে রাজনৈতিক নেতারাও তাদের সহকারীদের নিয়ে এ ঘাঁটিতে থাকবেন-যেন গেরিলারা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় কার্যকারীভাবে আক্রমণের তীব্রতা বৃদ্ধি করতে পারে। কেননা, আমি জানি যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক শক্তি সঞ্চয় ব্যতিরেকে, শুধুমাত্র সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করেই আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবো না। রাজনৈতিক শক্তি এসে যোগ না দিলে যে কোন রকম সামরিক সফলতা, ঐক্যবদ্ধ, সমঝোতা ও সমন্বয়ের অভাবে চরম লক্ষ্যে পৌঁছা যাবে না। যা হোক, আমাদের সর্বাধিনায়ক এবং চার্লি সেক্টরের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার এন.এ. সালিক আমার পরিকল্পনাটা অনুমোদন কররেন এবং তাড়াতাড়ি এর বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশও দিলেন।

বিভিন্ন কেন্দ্রে গেরিলাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। আমি চারটি কেন্দ্রের খবর জানতাম। সেগুলো হলো, চাকুলিয়অ ও মূর্তি বিহার প্রদেশে, একটি মেঘালয়ে ও অপরটি বীরভূম জেলায়। বিভিন্ন কেন্দ্রের ছেলেদের নিকটবর্তী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। বাংলাদেশের সাহায্য ও পুর্নবাসন মন্ত্রী জনাব কামরুজ্জামান ভারতীয় সাহায্য ও পুর্নবাসন মন্ত্রীর সহযোগীতায় এই যুব এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করতেন। বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারের সাথে আলোচনা করে সাধারণ নীতিমালা গ্রহণ করেন যে, পঞ্চশ হাজার লোককে গেরিলা ও বিশ হাজার লোককে নিয়মিত সামরিক ট্রেনিং দিতে হবে। জুলাই মাসে সব সেক্টর কমান্ডারের যে আলোচনা সভা ডাকা হয়, তাতে মিঃ তাজউদ্দীন আহমদ (তখনকার প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী) একথা প্রকাশ করেন। আমাদের কেউ কেউ গেরিলা ও সৈন্য সংখ্যা এই নির্দিষ্ট অংকে সীমাবদ্ধ রাখার কারন জিজ্ঞেস করলেন। কেননা আমরা মনে করতাম যে, নূন্যতম সংখ্যার হয়তো সীমারেখা বেঁধে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ঊর্ধ্বতম সংখ্যা কোন সীমারেখা থাকা উচিত নয়। মনে হল এর কারন তিনি নিজেও জানতেন না। কাজেই অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এর কারন ব্যাখ্যা করতে তিনি ব্যর্থ হলেন। ভাবতে এখনও আশ্চর্য লাগে যে, মাত্র এই দুটো বাহিনীর উপর নির্ভর করে এত তাড়াতাড়ি তিনি বিজয়ের আশা করেছিলেন কোন আশ্বাসের উপর ভর করে?

যাহোক, এ সমস্যাটা গেরিলা যুদ্ধের অগ্রগতিকে কোনক্রমেই ব্যহত করতে পারলো না। একজন বা দু’জন ছাড়া আমার সাথে কোন অভিজ্ঞ গেরিলা নেতা ছিলনা। যে দু’একজন ছিল তারা কাজকর্ম ভালই জানতো। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলারা, যারা সময় সময় আমার ক্যাম্পে আসতো-তাদের ভিতর দিয়ে দলের নেতা হবার যোগ্যতা যাদের আছে- তাদেরকেই বেছে নিতে হলো। আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন জেলার মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় সাধন ও যুদ্ধ পরিচালনার জন্য চারটি জেলায় চারজন সামরিক অফিসার পাঠানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। আগে থেকেই মুক্তিবাহিনীকে নির্দেশ দেবার জন্য খুলনা-বরিশালে ক্যাপ্টেন জিয়া এবং পটুয়াখালীতে লেঃ মেহদী ছিল। কিন্তু ফরিদপুরে কেউ না থাকায় মিঃ নুর মোহাম্মদ নাম একজন অভিজ্ঞ নৌবাহিনীর গেরিলা শিক্ষককে সেখানে পাঠিয়ে দিলাম। চারটি জেলার জন্য চারজন সামরিক অফিসার পাওয়া যাওয়ায় তাদের নির্দেশ দিলাম সৎ লোকদের ভিতর দিয়ে কমান্ডার নির্বাচন করে প্রতিটি অঞ্চল ও থানায় পাঠিয়ে দিতে। পাকিস্তানী সামরিক তৎপরতার পর থেকেই যারা নিজেদের উৎসাহে ও উদ্যোগে বাংলাদেশের ভিতরে শত্রহননের কাজে নিয়জিত আছে-তাদের সাথে যাতে করে কোন মতবিরোধ না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখার জন্য ওদের আমি প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলাম।

জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সর্বাত্মক গেরিলা আক্রমণ চালানো হয়। আক্রমণ পরিচলনার জন্য আমি তিনটি জায়গা ঠিক করেছিলাম, পশ্চিম বঙ্গের উত্তর দিকের বনগাঁর নিকট বাগদাতে একটা হাসনাবাদের দক্ষিনে শমসের নগরে একটা এবং আর একটা টাকিতে। এই তিনটি ঘাঁটির ভিতর বাগদাই সবচেয়ে ব্যস্ততম। এর কারন মুক্তিযোদ্ধারা এই পথেই সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আসতো এবং এই দিকের পথ-ঘাট ওদের ভাল জানা ছিল। শমসেরনগর ঘাঁটি থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলায় গেরিলাদের পরিচালনা ও নির্দেশ দেওয়া হতো। খুলনা জেলার গেরিলারা নদীপথে টাকির সাথে যোগাযোগ রেখে কাজ করত। শত্রুপক্ষের অবস্থানের পরিবর্তনের সাথে আক্রমনের গতিপদ্ধতিও পরিবর্তিত হত। পাঁচ মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সরকারী হিসাবমতে আট হাজার গেরিলা আমার সেক্টর থেকে হাল্কা অস্ত্রপাতি ও বিস্ফোরক দ্রব্যসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠিয়েছিলাম। শতকরা পঞ্চাশজন গেরিলাকে অস্ত্র দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। বাকী সবাই কেউ গোলাবারুদ, কেউ অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে যেত। সেপ্টেম্বর মাসে অবস্থার পরিবর্তন হল। তখন থেকেই সবাই হাতে অস্ত্র পেল। তাছাড়াও রাজাকার, পুলিশ ও পাক হানাদারদের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা অস্ত্রপাতি দিয়ে বেশি সংখ্যায় মুক্তিযোদ্ধা ভেতরে পাঠিয়ে দিলাম। এমন একটা সময় এলো যখন আমার সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাড়ালো প্রায় বিশ হাজার। মুক্তাঞ্চলে স্থানীয় অধিনায়কেরা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা আরো বাড়তে লাগলো। আমার মতে, এতে ছেলেদের কষ্ট অনেকটা লাঘব হতো। কেননা, বিপদসংকুল দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ভারতে আসার কষ্ট থেকে ওরা বেঁচে যেত। মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকলেও সফলতার পরিমাণ আশানুরুপভাবে বৃদ্ধি পায়নি। সময়ে সময়ে বাহকের মারফৎ যেসব খবর পেতা, তা থেকে এটা পরিষ্কার হয়ে উঠলো যে, মুক্তিযোদ্ধারা প্রধানতঃ রাজাকার ও পুলিশদের উপর আক্রশণ চালিয়ে সফলতা অর্জন করছে পাক সৈন্যর বিরুদ্ধে খুব কমসংখ্যক আক্রমণই পরিচালিত হতো। এর কারণ গেরিলারা যে পাক-হানাদারদের ভয় করত তা নয। অল্প সময়ের প্রশিক্ষণে ওরা শুধু আক্রমণ করে শত্রুকে কিভাবে খতম করতে হয়, তাই শিখেছিল। আক্রমণ করে কিবাবে পলায়ন করতে হয়, সে কৌশল ওদের ভাল করে জানা ছিল না। যদিও গেরিলা যুদ্ধের নীতি- ‘আঘাত করো ও পালিয়ে যাও’ এ সম্বন্ধে তাদের একটা মোটামুটি ধারনাও ছিল, তবুও আমার কাছে মনে হল, ওরা যেন কম আঘাত করে বেশী করে পালিয়ে আসতো। আমার এ ধারনা অনেকাংশে সত্যি। তা না হলে যদি গেরিলারা নির্দেশ মোতাবেক তাদের দায়িত্ব পুরাপুরি পালন করতো, তাহলে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর সেক্টর থেকে যে পরিমাণ গেরিলা ভিতরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তাতে পাক সামরিক যন্ত্রটাকে মাত্র দু’মাসের ভেতরেই বিকল করে দেওয়া সম্ভব হতো।

খুলনা জেলার তেরখাদা, মোল্লারহাট, মোড়রগঞ্জ, বাগেরহাট, সুন্দরবন, পাইকগাছা এবং ভোলা, পটুয়াখালী ও বরিশাল শত্রুপক্ষের সাথে অবিরাম সংঘর্ষের ফলে উত্তেজনায় সর্বদা উত্তপ্ত থাকতো। বস্ততপক্ষে গতিশীল নেতৃত্বের জন্যই উপরোক্ত জায়গা গুলি মুক্তিসংগ্রামে ভাল অবদান রাখতে পেরেছিল। দেশের ভিতরের এতসব ঘটনার কথা আমাদের কাছে পৌঁছতো না। কারন বাহকের মাধ্যমে সংবাদ আদান-প্রদান করা ছাড়া আর কোন ব্যবস্থা ছিল না। অনেক বাহক আমারে সদও দফতর পর্যন্ত পৌঁছতে পারতো না। পথেই কঠিন মৃত্যুর কোলে ঘুমিয়ে পড়তো। যখন দেশের আনাচে-কানাচে হানাদারেরা জাল পেতে বসে আছে, তখন বাহকের কাজটা খুব আরামদায়ক নয়। বর্ষাকালে রাত্রের অন্ধকারে বুক পরিমাণ জলের ভিতর দিয়ে হেঁটে সংবাদ নিয়ে আসাটা কতটা কষ্টসাধ্য তা সহজেই অনুমেয়। মনে পড়ছে পনের বছর বয়স্ক পাতলা গড়ন প্রবেশিকা পরিক্ষার্থী আলমের কাছ থেকে শোনা একটা লোমহর্ষক কাহিনীর কথা। বরিশাল জেলার গৌরনদী থানার একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারের ছেলে আলম। শত শত গেরিলাকে পথ দেখিয়ে সে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, বরিশাল থেকে সুদূঢ় পশ্চিম বঙ্গ পর্যন্ত সংবাদ নিয়ে ফিরে আসে। একজন পথপ্রদর্শক ও সংবাদ বাহক হিসাবে আরম নিজেকে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে প্রমানিত করেছিল। দেখতে খুবই বেমানান এই ছেলেছি, জলন্ত দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শত শত গেরিলাকে শুধু পথ দেখিয়েই ভিতরে নিয়ে যায়নি, ভিতর থেকে শত শত অদক্ষ যুবককে ভারতে প্রশিক্ষনের জন্য নিয়ে এসেছে। এই ছেলেটি চতুর ও বুদ্ধিদীপ্ত। অনেকবার সে পাক হানাদারদের হাতে ধরা পড়েছে। তার চেহারার ভিতর একটা সরল মাধুর্য আছে সে এত ভাল উর্দু বলতে পারতো যে, মাথাভারী দেহসর্বস্ব পাকিস্তানী সৈন্যরা তাকে বিহারী মুসলমান বলে ভূল করে ছেড়ে দিয়েছে। জুলাই মাসে সীমান্তবর্তী বাগদা থেকে আলমই সর্বপ্রথম গেরিলাদের বরিশাল ও ফরিদপুরে নিয়ে আসে।

জুলাই ও আগষ্ট মাসের সেই বর্ষণমুখর রাতগুলোর কথা আজো আমার মনে পড়েছে। প্রতি রাত্র বর্ষা মাথায় করে বাংলার অতন্দ্র প্রহরী এই গেরিলার বাগদার সীমান্ত অতিক্রম করে ভিতরে চলে যেত। প্রমত্তা ইছমতি ছুটে চলেছে। দু’কুল তার বহু দুর পর্যন্ত প্লাবিত। এরই ভিতর কত রাত দেখেছি বাংরার এই অগ্নিসন্তান গেরিলার ভয়কে দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে কোন রকম ওজর আপত্তি না করে অন্ধকারে অস্ত্র হাতে নিয়ে পানি কাদার মধ্যে শান্তভাবে হেঁটে যাচ্ছে। শুধু সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কারো মুখে কোন কথা নেই। রাইফেলটায় যাতে পানির স্পর্শ না লাগে, সে জন্য ওটাকে উপর দিকে তুলে ধরতো। কি অভূতপূর্ব দেশপ্রেম। নিজেকে অভিশাপ দিতাম, কেন ওদের সাথী না হয়ে অধিনায়ক হলাম। কেন ওদের পাশে থেকে যুদ্ধ করে ওদের মুখের হাসিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলাম না। ওদের রক্তের সাগরে দাড়িয়ে মুক্তির আনন্দক আজ বড্ড বিস্বাদ লাগলো।

কিছুক্ষণের ‘জয় বাংলা’ তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব-শেখ মুজিব’ এই ধ্বনিই তো ওদের অনুপ্রানিত করেছিল অনিশ্চয়তার আধার ও চরম বিপদের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়তে। কোন পুরষ্কার বা প্রতিশ্রুতির লোভে ওরা এ কাজ করনি। দেশ ও নেতার প্রতি অপরিসীম ভালবাসা ওদের যাদুমন্ত্রে ওদের উদ্দীপ্ত করেছিল এই মৃত্যু ভয় কে জয় করতে। আত্মোৎসর্গের কঠিন ব্রতে দীক্ষা নিয়ে বাংলার এই গেরিলারা স্বাধীনতার জন্য অবিরাম সংগ্রাম করে চলেছে। বর্ষার ঔদ্ধত্যকে সংকল্পের দৃঢ়তায় ছিন্নভিন্ন করে ওরা এগিয়ে চললো। অন্ধকারের মাঝে ওদের এগিয়ে যাওয়া আমি নিরীক্ষণ করতে লাগলাম। দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পেলাম, যুদ্ধ না করেই বজ্রকঠিন শপথের আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে হানাদারদের কাজ থেকে মুক্তির আলো একদিন এই সুর্যসন্তানেরা ছিনিয়ে আনবেই। ঘটেছিলও তাই। পাক-হানাদররা ক্রমাগত থানা ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে যেতে লাগলো। গ্রামে যেখানেই গেরিলাদের সাথে ওদের মোবাবেলা হয়েছে, সেখানেই ওরা পুনর্বার যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর হানাদাররা থাা ছেড়ে জমা হতে থাকে। সামরিক ছাইনতে এবং রাজাকারদের ওরা পুরো সুযোগ দিতে লাগলো গ্রামের উপর প্রভুত্ব চালাতে। দুর্জয় গেলিাদের হাতে চরম মার খেয়ে রাজাকররা তাদের রাজত্ব চালাতে চরম অসুবিায় পড়েছিল। ওদের জঘন্য কার্যকলাপের জন্য গেরিলারা নির্মমভাবে রাজাকারদের নিশ্চিহৃ করে দিত। আমার কাছে খবর আসলো যে, গেরিলারা পুরোদমে আক্রমণ চলিয়ে শত শত রাজাকার খতম করছে। এতে সুফল হলো-যারা একদিন রাজাকারদের বর্বরতার শিকার হয়েছিল, সেই নিঃস্ব গ্রামবাসী আবার মনোবল ফিরে পেল। বাঙ্গালী রাজাকারদের হত্যা করাটা আমি যেন পছন্দ করতে পারলাম না- কারন, আমি জানতাম যে এই হত্যার দ্বারা শুধু অনাথ ও বিধবার সংখ্যাই বেড়ে গিয়ে দেশের সমস্যা আরো জটিল করে তুলবে। একবার আমি নির্দেশও পাঠিয়েছিলাম যে, রাজাকারদের মধ্যে মানসিক পরিবর্তন এনে অস্ত্রশস্ত্রসহ আত্মসমর্পন করতে বাধ্য করতে হবে। এই মর্মে কিছু প্রচারপত্র বিলি করা হলো। দেখা গেছে, এর ফলে অনেক রাজাকার অস্ত্রশস্ত্রসহ স্বেচ্ছায় আত্মসমাপন করেছে। গেরিলা পদ্ধতির প্রবর্তনের ফলে দুটো সুফল পাওয়া গেল। প্রথমতঃ গ্রামবাসী রাজাকার ও পাক-বর্বরদের অত্যাচারের হাত থেকে অনেকটাই রেহাই পেল। দ্বিতীয়তঃ হানাদাররা নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য গোপন আস্তানায় ঢুকে আত্মসমর্পন করতে লাগলো। তাছাড়াও রাজাকারদের ভিতর অর্ন্তদ্বন্ধ, অসন্তোস ও বিভেদ সৃষ্টি করতে সফল হলাম। এর ফলে হানাদরদের পরিকল্পনায় সহজেই ফাটল ধরলো।

আর কোন পথ খোলা না দেখে পাক-বর্বররা গানবোটের সাহয্যে আক্রমনের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। রাজাকার ও পাকিস্তানী সৈন্যরা গানবোটে চেপে নদীর পথ ধরে চলতে থাকলো, আর মেশিনগান ও রকেট দিয়ে নির্বিচারে গোলাবর্ষন করে নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলো জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিতে লাগলো। পাকিস্তানী গানবোট গুলোর এরূপ আকস্মিক হামলায় ক্ষেখামারে কর্মরত শত-শত কৃষক, জেলে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করলো। বাংলাদেশের নদীপথ দিয়ে গান-বোট গুলো চালিয়ে নেওয়ার সময় হানাদারেরা যাদেরই সামনে পেত তাদের উপরই পৈশাচিক উল্লাসে মেশিন গানের গুলি ছুড়তে থাকতো। মনের অবস্থা যখন ভাল থাকতো না তখন হানাদাররা নদীর তীরে কোন গ্রামের কাছে গান-বোট ভিড়িয়ে অসভ্য তাতারের মত গ্রাম থেকে সুন্দরী যুবতী মেয়েদের ছিনিয়ে আনতো। যারা আপত্তি করতো, তাদের খতম করে দিত।

যদিও আমাদের গেরিলারা প্রাণপণ চেষ্টা করছে এই গানবোট গুলো কাবু করার জন্য, কিন্তু ওদের কাছে নিম্নমানের অস্ত্রপাতি থাকায় গানবোটগুলোর মোকাবেলায় পেরে উঠতো না। এভাবে নৃশংস অত্যাচার চালিয়ে গানবোটগুলো গ্রামের লোকদের ভিতরে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলো। গানবোট কাবু করার জন্য ভারী অস্ত্রপাতি চেয়ে গেরিলারা আমার কাছে খবর পাঠালো আমরা যদি জনগণকে এই অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করত না পারি, তাহলে যত রকমের সফলতাই আমরা অর্জন করিনা কেন, জনগন অচিরেই তা ভূলে গিয়ে আমাদের প্রতি সহযোগীতার হাত বন্ধ করে দিবে। বিশেষ করে আমার ৯নং সেক্টর নদীনালায় ভর্তি। পাকবাহিনী গোপালগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী ও খুলনার হাজার হাজার গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে লাগলো। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আসলে যে কি ঘটছে আমি জানতাম। গানবোট ধ্বংস করার উপায়ও আমার জানা ছিল। কিন্তু আমার কাছ থেকে বারবার তাগিদ যাওয়া সত্ত্বেও প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার সেসব নতুন অস্ত্র শস্ত্র যোগাবার জন্য কোন আন্তরীক প্রচেষ্টাই করেনি। গানবোট কাবু করতে সামনে কয়েকটা রকেট লাঞ্চারই যথেষ্ট। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ আমরা সেগুলোও পাইনি। বস্তুতপক্ষেঃ গানবাট কাবু করতে যায় এ সম্বন্ধে আমি একটা রিপোর্ট তদানীন্তন অস্থায়ী রাষ্টপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী মিঃ তাজউদ্দীন আহমদকে দেখিয়েছিলাম। তখন তাঁরা ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাদের আস্বাস সত্ত্বেও এ রকম একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার অর্ধমীমাংসিতই রয়ে গেল। তাদের এই নির্লিপ্ততায় আমি খুব ব্যথা পেলাম; পাগলের মত ছুটে গেলাম চার্লি সেক্টরের অধিনায়কের কাছে। তিনি তাঁর নিজের প্রচেষ্টায় আমাকে গোটা দুয়েক রকেট লাঞ্চার যুগিয়ে দিলেন। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় ও গুলো খুবই অপর্যাপ্ত। যাহোক, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চার্লি সেক্টরের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার এন, এ সালিক মংলা পোর্টের কাছাকাছি একটা গেরিলা। ঘাঁটি স্থাপন করতে ও কিছু পথপ্রদর্শক প্রস্তুত রাখতে বললেন। তার কথামত পঞ্চাশজন মুক্তিযোদ্ধাসহ আফজাল নামক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন হাবিলদারকে সেখানে পাঠিয়ে দিলাম। এ ছাড়াও আগে থেকেই মিঃ খিজিরের অধীনে সেখানে একশ’ গেরিলা ছিল। মিঃ খিজির খুলনার একজন মেকানিক। হাবিলদার আফজালের যোগ্যতা ও শক্তির পরিচয় পেয়ে মিঃ খিজির উদ্দীপনা পেল এবং ‘বানীশান্ত’ নামক একটি জায়গায় আর একটি ঘাঁটি স্থাপন করলো। এখান থেকেই মংলা বন্দরে হানাদারদের গতিবিধি, সামরিক, শক্তি, জাহাজগুলোকে রক্ষা করার জন্য ওর কতটা সতর্কতা অবলম্বন করেছে ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের কাছে খবরাখবর এসে পৌঁছতে লাগলো।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ‘ফ্রগম্যান’ পাঠানো। আগষ্টের শেষ সপ্তাহে লেঃ জিয়া ছ’খানা নৌকা নিয়ে অস্ত্রশস্ত্র- গোলাবারুদ সংগ্রহের আশায় ভারতে এসে পৌঁছালো। সুন্দরবনের একটা বৃহত্তম গেরিলা ঘাঁটির অধিনায়ক লেঃ জিয়া। তার কাছে যেসব অস্ত্রপাতি ও গোলাবারুদ ছিল, তা খুবই অপ্রতুল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরের খবরাখবর সে সবিস্তারে আমার কাছে খুলে বললো। কথার মাঝখানে বারবার সে গানবোট ধবংসকারী অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিতে লাগলো। সে জানালো যে পাকহানাদারদের মনোবল একদম ভেঙ্গে গিয়েছে। এখন একমাত্র গানবোটের সাহয্যেই আক্রমণ অব্যাহত রাখছে। আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে ক্যাপ্টেন শাহাজানকে বরিশাল জেলায় আক্রমণ পরিচালনা করার জন্য পাঠিয়েছিলাম। তার উপর বিশ্বাস রেখে জিয়া জানালো যে, শাজাহান ভাল কাজই করছে। ক্যাপ্টেন ওমর এই ছদ্মনামে শাহজাহনকে ডাকতাম। ক্যাপ্টেন শাজাহান পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর সিগনাল ব্রাঞ্চের একজন অফিসার। সে দুঃসাহস করে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে রাজস্থানের মরুভূমি পার হয়ে একশো মাইল পথ পায়ে হেঁটে বাংলাদেশে আসে। সে আমার সেক্টরে যোগ দেয়ার আগে সে গেরিলা বাহিনীতে দীর্ঘ ছ’মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছে। ভালই হলো। একটা গেরিলা বাহিনী তার অধীনে পাঠিয়ে দিলাম। জিয়ার কাছে থেকে এসব খবর পেয়ে আংশিকভাবে খুশী হলাম। পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য তাকে আমাদের সর্বাধিনায়কের সদর দফতরে নিয়ে গেলাম। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, ওর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার জন্য সর্বাধিনায়ক সাহেব কোন ঔৎসুক্যই দেখালেন না। যা হোক, কোনরকম বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সর্বাধিনায়ক সাহেবকে জিয়ার সাথে একটিবার দেখা করার জন্য কতকটা বাধ্য করলাম।

ভয়ানকভাবে সমস্যা-পীড়িত সর্বাধিনায়ক সাহেব শেষ পর্যন্ত অনেক নিয়ম-কানুন পালনের পর জিয়াকে ডেকে পাঠালেন। অসংখ্য ধন্যবাদ কয়েক মিনিটের মধ্যেই এ সাক্ষাৎ পর্ব শেষ হলো। এরপর ব্রিগেডিয়ার এন, এ, সালিকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য জিয়াকে নিয়ে আমি ব্যারাকপুর গেলাম। এটা সেপ্টম্বরের প্রথম সপ্তাহ। ব্রিগেডিয়ার সাকিল খুব ধৈর্য সহকারে লেঃ জিয়ার কথাবার্তা শুনলেন এবং তাকে আশ্বাস দিলেন যে, ভারতীয় ৯ নং ডিভিশনের অধিনায়কের আলাপ-আলোচনা করে তিনি শিগগিরই যতটা সম্ভব রকেট লাঞ্চার ও অন্যান্য ভারী অস্ত্রপাতি সরবরাহ করার চেষ্টা করবেন। ভয়ানকভাবে সমস্যা-পীড়িত সর্বাধিনায়ক সাহেব শেষ পর্যন্ত অনেক নিয়ম-কানুন পালনের পর জিয়াকে ডেকে পাঠালেন। অসংখ্য ধন্যবাদ কয়েক মিনিটের মধ্যেই এ সাক্ষাৎ পর্ব শেষ হলো। এরপর ব্রিগেডিয়ার এন, এ, সালিকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য জিয়াকে নিয়ে আমি ব্যারাকপুর গেলাম। এটা সেপ্টম্বরের প্রথম সপ্তাহ। ব্রিগেডিয়ার সাকিল খুব ধৈর্য সহকারে লেঃ জিয়ার কথাবার্তা শুনলেন এবং তাকে আশ্বাস দিলেন যে, ভারতীয় ৯ নং ডিভিশনের অধিনায়কের আলাপ-আলোচনা করে তিনি শিগগিরই যতটা সম্ভব রকেট লাঞ্চার ও অন্যান্য ভারী অস্ত্রপাতি সরবরাহ করার চেষ্টা করবেন।

‘ফ্রগম্যানদের সম্বন্ধে একটা কথা বলে রাখছি। এই ফ্রগম্যানদের দেশের বাইরে থেকে আমদানী করা হয়নি। তারা দেশেরই সরল নিরীহ যুব সম্প্রদায়। বেশির ভাগই ছাত্র। জুনের শেষ সপ্তাহে বিভিন্ন যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ওদের যোগাড় করা হয় এবং নবাব সিরাজুদৌল্লার ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদের পলাশী নগরে ভারতীয় নৌ-বাহিনীর তত্ত্বাবধানে এইসব ছেলেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ভারতীয় নৌবাহিনীর লেঃ কমান্ডার মার্টিস ও লেঃ দাসির সহযোগিতায় প্রশংসনীয়ভাবে মাত্র দু’মাসের ভেতর এ সমন্ত কচি গ্রাম্য ছেলেরা দক্ষ ফ্রগম্যানশীপ ট্রেনিং নিয়ে বেরিয়ে আসে। যে কোন মূল্যায়নে মিঃ মার্টিন ও মিঃ দাসের এই আন্তরিক প্রচেষ্টা প্রশংসার যোগ্য।

আর একদল লোক পলাশীতে এই ফ্রগম্যানশীপ প্রশিক্ষণের উন্নতির জন্য যথাসাধ্য সাহায্য করেছিল। তারা পাকিস্তান নৌবাহিনীর সাবমেরিনে কাজ করতো। ফ্রান্সে যখন একটি বিশেষ কাজে ওদের পাঠানো হয়, তখন সেখান থেকে মুক্তিসংগ্রামের প্রাক্কালে ওর পালিয়ে লন্ডনে আসে। সেখান থেকে ভারতীয় হাইকমিশনের সহয়তায় দিল্লী পৌঁছে। সংখ্যায় তারা আটজন। খুলনা জেলার অধিবাসী মিঃ রহমতউল্লাহ ওদের অধিনায়ক হয়ে নিয়ে আসে। সত্যিকারভাবে রহমতউল্লাহ একজন দেশপ্রেমিক। ফ্রগম্যানশীপের কলাকৌশল সম্বন্ধে সে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছে।

৯ই সেপ্টেম্বর। পরিকল্পনা মাফিক বাংলার ফ্রগম্যানরা সবাই যখন, তখন নৌকাগুলো কি আর পিছনে পড়ে থাকতে পারে। ত্রিকোনা আক্রমণ করার জন্য লেঃ জিয়ার আটজন ফ্রগম্যানসহ আগেই যাত্রা করার কথা। তাকে দুটো রকেট লাঞ্চার, কিন্তু এলএমজি এবং অভ্যন্তরের মুক্তিবাহিনীর জন্য প্রচুর পরিমাণ গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র দেয়া হলো। নির্ধারিত তারিখমত লেঃ জিয়া কোলকাতার উত্তর-পশ্চিম দিকে বাসন্তী নামক একটা বন্দরনগরী থেকে রওনা হলো।

বর্ষার মাতামাতি। আবহাওয়া ভয়ানক বিক্ষুব্ধ। নদীগুলো যেন এক-একটা দৈত্যের মত রাগে ফুলছে। বুকে তার প্রচন্ড আক্রোশে ফেটে-পড়া বিদ্রোহী তরংগমালা। ফ্রগম্যানদের গোপ ঘাঁটি থেকে নৌকায় করে শমসেরনগর পৌঁছতে হবে। ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা মিঃ আসাদুল্লাহর নেতৃত্বে তিনটি নৌকায় ত্রিশজন ফ্রগম্যান ‘লিম্পেট মাইন’ নিয়ে ১৫ই সেপ্টেম্বর মংলা এবং চালনা বন্দরের পাকিস্তানী বাণিজ্যিক ও নৌবাহিনীর জাহাজগুলো আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিল। ওদের বিদায় দেবার জন্য ১০ই সেপ্টেম্বর লেঃ কমান্ডার মার্টিস, মেজর রায় চৌধুরী এবং আমি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটা লঞ্চে করে শমসেরনগর পৌঁছে একটা বাঁকের কাছে অপেক্ষা করতে লাগলাম। এখানে হয়েই জিয়ার নৌকাগুলো যাওয়ার কথা।

সকাল বেলা-ভয়ানক ঝড়, উথাল পাতাল ঢেউয়ের বুক চিরে নৌকা চালানো খুবই কষ্টকর। বেলা তিনটা পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করলাম। কিন্তু ওদের আসার কোন হদিস পেলাম না। দেরী হবার অবশ্য অনিবার্য কারণ ছিল, কিন্তু ওদের পৌঁছতে বিলম্ব দেখা আমার খুবই চিন্তিত ও অধৈর্য হয়ে উঠলাম। বিকার প্রায় সাড়ে চারটার সময় প্রথম নৌকা এসে বাঁকের কাছে পৌঁছলো। কেউ তাদের শিক্ষিত বা মুক্তিবাহিনীর লোক বলে চিনতে পারলো না। কেননা, ওরা বুদ্ধিমত্তার সাথে সাধারণ মাঝিও জেলের বেশ ধরে আত্মগোপন করে ছিল। পরনে ছিল লুংগী ও ছেঁড়া শার্ট। বৃষ্টির জলে ওদের জামাকাপড় সব ভিজে গিয়েছিল। কেউ কেউ চা বা অন্যকিছু গরম করার জন্য আগুন জ্বালাতে খুব চেষ্টা করতে লাগলো। যা হোক আমাদের অপেক্ষা করতে দেখে ওরা খুবই উল্লসিত হলো। ইতিমধ্যে দেখা গেল, আরো দুটো নৌকা বিক্ষুব্ধ ঢেউগুলোর সাথে যুদ্ধ করতে করতে আমাদের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে। নৌকাগুলো সব এক জায়গায় হলে, মুক্তিযোদ্ধাদের সবাইকে আমাদের লঞ্চে এনে গরম চায়ে আপ্যায়িত করলাম। ছেলেদের মনোবর খুবই উঁচু বলে মনে হলো।

একজন লিডার নিয়ে চারজনসহ এক একটা দল। লিডারদের আমরা ক্যাবিনের ভিতর ডেকে নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশ ও কিছু টাকা পয়সা দিলাম- যেন পথে ওরা খাদ্যের জন্য কষ্ট না পায়। সবই প্রস্তুত। কিন্তু ঝড়ের দাপট প্রশমিত হবার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। এই ঝড়ের মধ্যে ওদের কে পাঠানো আমি সমীচীন মনে করলাম না। কাজেই কাজটা রাত্রের মত স্থগিত রইল এবং ১১ তারিখের খুব ভোরে ওদের যাত্রা করতে দিলাম। এই মোশাররফ পথ দেখিয়ে আমাকে ভারতে পৌঁছে দেয। সে সুন্দরবন এলাকার মুন্সিগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা। সবার মুখেই হাসি। সবাই খুশী। শেষ বারের মত সবাইকে উপদেশ দিয়ে এবং ওদের মংগল কামনা করে ওই রাত্রেই আমরা হাসনাবাদ রওনা হলাম। আল্লাহকে অসংখ্য ধন্যবাদ, ঠিক তিনদিন পরেই অর্থাৎ ১৪ই সেপ্টেম্বর ভোরে ওরা নিরাপদে ঠিকমত জায়গায় পৌঁছে গেল।

১৫ই সেপ্টেম্বর সামনে। শত্রুর উপর চরম আঘাত হানার মাহেন্দ্রক্ষণ। যে জায়গা থেকে আক্রমণ পরিচালনা করা হবে তার সাথে সংযোগ সাধন, আক্রমণের পর যেখানে গিয়ে সবাই জমা হতে হবে সেখানে গেরিলাদের ঠিকমত জায়গায় রাখা, উদ্দেশ্য সমাধা করার পর সবাইকে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাখা, উদ্দেশ্যে সমাধা করার পর সবাইকে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় সরে পড়া-ইত্যাদি প্রাথমিক কাজকর্ম সম্পন্ন করার জন্য হাতে খুব কম সময়ই আছে ১৪ তারিখ ভোর থেকে ১৫ তারিখ সন্ধ্যা পর্যন্ত ওদের প্রস্তুতি নিতে কেটে গেল। হাবিলদার আফজাল ও খিজিরের স্থল গেরিলারা ওদের যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। মুক্তিযোদ্ধারা লোভাতুর চোখে চেয়ে দেখলো আটটি বানিজ্যিক জাহাজ চালনা বন্দরে দাঁড়িয়ে আছে। পশুর নদীর মাঝখানে সবগুলো নোংগর করা। ঠিক হলো ‘জোড়া পদ্ধতিতে’ আক্রমণ চালাতে হবে- অর্থাৎ দু’জন ফ্রগম্যান এক একটি জাহাজকে আঘাত করার জন্য এক-একজন ফ্রগম্যানের কাছে চারটি করে, দু’জনার কাছে মোট আটটি লিম্পেট মাইন’ থাকবে। লিম্পেট মাইন পানিতে ভাসে। সুতরাং ওদের পক্ষে এতগুলো মাইন এক সংগে বয়ে নিয়ে যাওয়া খুব সহজ হলো। ঘাঁটি থেকে প্রায় পনেরশ’ গজ দূরে জাহাজগুলো এলোমেলো অবস্থায় নোংগর করা। ১৫ সেপ্টেম্বরের সারাটা দিন কেটে গেল ওদের সবকিছু বুঝিয়ে দিতে। এক-একটা জাহাজ আক্রমণ করার ভার এক একটা দলের উপর ন্যস্ত করা হলো।

ষোলজন ফ্রগম্যান নিয়ে আটটি দল। ওরা আক্রমণ করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। প্রথম অভিযান ব্যর্থ হলে বাকী চৌদ্দজনকে পরবর্তী পর্যায়ে আক্রমণ পরিচালনা করার জন্য রিজার্ভ রাখা হলো আঘাত করার সময় নির্ধারিত হলো রাত সাড়ে চারটা। সাধারণতঃ এই সময়েই পাক হানাদাররা বিরক্ত ও ক্লান্তিতে ঝিমিয়ে পড়ে। আর যারা ঘুমিয়ে থাকে, একই সঙ্গে তারা আরও বেঘোরে ঘুমাতে থাকে। স্থির হলো একই সংগে আটটি জাহাজের উপর হামলা চালাতে হবে।

রাত আড়াইটা। খুব অন্ধকার। বাইরে ঝড়ের দাপাদাপি। দমকা বাতাসের চাবুক খেয়ে পিছন দিকের অরণ্যটা আর্তনাদ করে উঠলো। অধিনায়ক মিঃ আসাদুল্লাহ ছেলেদের কানে কানে বললো, আঘাত করার এইতো উপযুক্ত সময়। সতর্কতার সাথে শেষবারের মত আবার সে সবাইকে পরীক্ষা করে নিলো। এখন থেকে মাত্র দু’ঘন্টা পরে সমস্ত নদীর বুক জুড়ে তরংগায়িত হবে বলে টকটকে উত্তপ্ত রক্তস্রোত।  নদীর অপর পাড়ে শত্রুপক্ষ নিশ্চিন্ত। কেননা ওরা ভাবতেই পারেনি অলস বাঙ্গালীরা ওদের পায়ের তলায় কোনদিন আঘাত হানতে পারবে। নদীতে হিংস্র জীবজন্তু আছে জেনেও দুর্যোগময় এই ঝড়ের মাঝরাতে প্রমত্তা নদতীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়া খুব একটা সহজ কাজ নয়। মৃত্যুভয়কে দূরে ঠেলে দেশপ্রেমের জলন্ত বহিৃশিখা বুকে নিয়ে ওরা ষোলজন সবাই একংগে দুটো পঁয়ত্রিশ মিনিটের সময় নদীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। মুখে লেশমাত্র ভীতের চিহৃ নেই। আত্মপ্রত্যয়ের মহান আদর্শে উদ্ভাসিত। বেয়াড়া প্রকৃতির রক্তচক্ষুকে ভয় না করে মুক্তিযোদ্ধারা নদীর বুক চিরে আস্তে আস্তে এগিয়ে চললো লক্ষ্যবস্তুর দিকে। ওদের কোমল ডানাগুলো ক্লান্তিতে ঝিমিয়ে পড়লো। কিন্তু জলের উপর ভেসে ভেসে ঢেউয়ের কোলে মাথা রেখে ওরা লক্ষ্যবস্ততে গিয়ে পৌঁছলো। সাড়ে চারটা বাজতে এখনও পাঁচ মিনিট বাকি।

অর্ধ- আবৃত তারপলিনের নীচে আবছা আলোতে ওরা সন্ত্রাসীদের দেখতে পেলো। হঠাৎ আকাশটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। ভয়ানক বৃষ্টি। আঘাত করার সময় এসে গেল। ঠিক চারটা ত্রিশ মিনিট। যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে ওরা লিম্পেট মাইনগুলো জাহাজের তলায় লাগিয়ে দিল। এই মাইনগুলোর উপরের দিকে চুম্বক লাগানো। লোহার সংস্পর্শে এলে গায়ে লেগে থাকে। তারপর ওরা সাঁতরিয়ে ঘাঁটির দিকে ফিরে চললো। এই সময় ওরা খুব তাড়াতাড়ি সাঁতরাতে লাগলো। ওরা জনতো যে, মাইন লাগানোর এক ঘন্টা পরে, এই সুন্দর জাহাজগুলো বিকট শব্দে বিদীর্ণ হয়ে প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার বহ্যৃৎসবে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকবে। মাইনগুলো বিস্ফোরণের জন্য ‘ফিউজে’ একঘন্টা সময় বেধেঁ দেয়া হয়েছিল- যেন ওরা নিরাপদ ঘাঁটিতে ফিরে আসতে পারে। আবেগ ও উত্তেজনায় উদ্বেলিত হয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে ওরা ষোলজন সবাই তীরে ফিরলো। যারা তীরে সাগ্রহে প্রতিক্ষয়া ছিল, তারা সবাই ওদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে চুমু খেতে লাগলো। শুয়ে পড়ে মুক্ষিযোদ্ধারা অধীর আগ্রহে জাহাজগুলো দিকে চেয়ে রইল- কখন সাড়ে পাঁচটা বাজবে। হ্যাঁ, চরম লগ্নটি এলো। সমস্ত পৃথিবীটাকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দিয়ে বিকট শব্দে মাইনগুলো বিস্ফোরিত হলো। আটটি জাহাজের মধ্যে সাতটি ডুবে গেল। আমাদের উদ্দেশ্য সার্থক ও সফল হলো। এই ঘটনার পর বন্দরের শ্রমিকরা কাজ ছেড়ে দিয়ে যে যেদিকে পারলো পালিয়ে গেল। বেশ কিছুদিনের জন্য চালনা ও মংলা বন্দর জনশূণ্য হয়ে পড়ে রইল।

শমসেরনগরে ফিরে আসার সময় মৃত্যুঞ্জীয় মুক্তিসেনারা একটা ফরেষ্ট অফিসে হামলা চালিয়ে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র অধিকার করে। এর মধ্যে ‘বনবালা; ও ‘বনমৃগী’ এই দুটো লঞ্চও ছিল। এই লঞ্চে চেপে বিজয়ের উত্তেজনায় আত্মহারা মুক্তিযোদ্ধারা শমসেরনগরে ফিরে এলো। পাকিস্তানী ঘাঁটির অবস্থানের অনিশ্চয়তার জন্য লেঃ জিয়ার ত্রিকোণা অভিযান স্থগিত রাখা হলো। তাছাড়া আবহাওয়াও খুব অনুকুলে ছিল না। সব রকমের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও গেরিলাদের ভেতর আসা বন্ধ করতে না পারায় পাক-হানাদাররা ভয়ানকভাবে ক্ষেপে গিয়েছিল। সুতরাং ওরা সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে চালনা পোতাশ্রয়ের বিপরীত দিকে সুন্দরবনে আগুন ধরিয়ে দিল এবং গানবোট নিয়ে পাহারায় বেরিয়ে সুন্দরবনের সমস্ত পথঘাট একদম বন্ধ করে দেয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলো।

সেপ্টেম্বরের শেষদিকে হানাদাররা শ্যামনগর ঘাঁটির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারলো। আমাদের হাতেই কিছুদিন আগে এই ঘাঁটির পতন ঘটে। এবার শ্যামনগর ঘাঁটি পুনরুদ্ধার করার জন্য হানাদাররা গানবোট ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে ভীষণভাবে আমাদেরকে আক্রমণ করলো। তিনদিন তীব্র যুদ্ধ চালাবার পর, হানাদারদের চরম ক্ষতি করে, সমর-কৌশলের দিকে দিয়ে খুঁব গুরুত্বপূর্ণ এরকম অন্য একটা জায়গায় আমরা সরে গেলাম। এই যুদ্ধে আমরা পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধাকে হারিয়েছিলাম। এর মধ্যে সুবেদার মোহাম্মদ ইলিয়াস মেশিনগানের গুলিতে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। আর চারজন নতুন ভর্তি মুক্তিযোদ্ধাকে হানাদাররা বন্দী করে। শ্যামনগর পুনরুদ্ধার করে ও হানাদাররা গেরিলাদের ভেতরে যাওয়া বন্ধ করতে পারলো না।

এক মাস পরে ঠিক একই উপায়ে ফ্রগম্যানরা আবার মংলা ও চালনা বন্দর আক্রমণ করলো। ১৬ই অক্টোবর আলম নামে পাক-নৌবাহিনী থেকে পালিয়ে আসা একজন সৈন্যের অধীন দ্বিতীয় দলটি শ্যামনগরের অনেক দক্ষিণ দিক দিয়ে হেঁটে ভেতরে গেল। এবারেও আমরা সফল হলাম। এই আক্রমণে শত্রুপক্ষে চারটি জাহাজ ডুবে গিয়েছিল। একটি নাম ‘লাইটনিং’ এবং অপরটার নাম ‘আল-মুরতজা’। অন্যগুলো চীনা জাহাজ বলে শনাক্ত করা হয়। আমাদের এই দ্বিতীয়বারের আক্রমণ চালনা ও মংলা বন্দরকে সম্পূর্ণ অকেজো করে দিল। এর উপরও নভেম্বর মাসে রহমতউল্লাহর নেতৃত্বে খুলনায় আক্রমণ চালিয়ে সাফল্য অর্জন করা হয়। বাংলাদেশ সশস্ত্র-বাহিনর অন্যান্য সেক্টরের নির্দেশ অনুযায়ী চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ এবং চাঁদপুরে শত্রু জাহাজের উপর আক্রমণ চালানো হয়।

এই আক্রমণের মোটামুটি ফল হলো- এইসব জায়গায় শ্রমিকরা সবাই পালিয়ে জান বাঁচলো। ডিসেম্বরে দেশ মুক্ত হবার আগ পর্যন্ত ওরা আর ফিরে এলোনা। এই ঘটনার পর এমনকি কোন বিদেশী জাহাজও বন্দরে নোংগর করতে রাজী হতো না। আমরা এটাই চেয়েছিলাম।