গ্রাম বাংলা

Posted on Posted in 5
গ্রামবাংলা

 ১৬ নভেম্বর, ১৯৭১

মাষ্টার ভাই ঃ  সবাই এসে গেছে? ময়না বুতো এখনো এলো না? রাত হয়ে যাচ্ছে, তাছাড়া শীতের মধ্যে লোকজনকে বেশীক্ষণ আটকে

রাখাও যাবে না। তুমি ওদের খবর দিয়েছিলে তো?

বনি     ঃ    হ্যা, ভাল করে বলে দিয়েছি, কাজের কথা আছে, লোকজন আসবে, সাঁঝ লাগতেই ইদলপুরের স্কুলে চলে এসো।

মাষ্টার ভাই ঃ         তাহলে ওরা আসবে। যাক এবার আমরা কথাবার্তা শুরু করি। দেখ তো বাইরে কার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

বনি      ঃ   ভালই হয়েছে, ময়না বু এসে গেছে। এসো বুবু এসো।

ময়না বু         ঃ    আঁধার রাত, আসতে একটু কষ্ট হলো বাপু হারিকেন জ্বলিয়ে আসতে পারিনি।

মাস্টার ভাই ঃ       ভয়ের কি আছে? ভয়কে জয় করে চলতে হবে।

ময়না    ঃ ভয় নয়, তবে, সাবধানের মার নাই। শয়তান জল্লাদ বাহিনীর চেলাগুলো কোথায় কখন কিভাবে আসে কেউ জানে?

মাস্টার ভাই ঃ       ময়না বু’র কথাটা ঠিকই “সাবধানের মার নাই।’ শয়তানগুলো তো নিয়ম-কানুনের ধার ধারে  না, মারলেই হলো। তাছাড়া

মনুষ্যত্ব বলতে ওদের নাই কিছুই। ওদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে বাঙালী মারো, বাংলার শক্তিকে নিঃশেষ করে দাও।

বনি    ঃ     আমরাও কিন্তু কসম করেছি, ওই জানোয়ারগুলোকে না তাড়াতে পারলে, আমরাও আরাম করব না। দেখ না, দিনে মাঠে

                কাজ করি, রাতের বেলায় মুক্তিবাহিনীর সাথে দুশমনকে মারতে যাই।

ময়না বু        ঃ     এটা আমাদের করতেই হবে। দেশ যখন শত্রুমুক্ত হবে, তখন বসে বসে গল্পগুজব হৈ-হল্লা ঠাট্টা-তামাসা করা যাবে, কি

                বলো?

বনি    ঃ     আমার কথাটাও তাই। যারা আমাদের জানের দুশমন তাদের আমরা শেষ করবই।

মাষ্টার ভাই    ঃ     আজকে এই শপথ নিয়েছে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ, প্রতিটি স্তরের মানুষ আজ ঝাঁপিয়ে পড়েছে সংগ্রামে।

বনি    ঃ     কিন্তু একটা কাজ খুব ভাল হয়েছে মাস্টার ভাই, কথায় আছে না, সাপের লেজ আর শত্রুর এই দালালগুলোকে মেরে শেষ

                করছে।

ময়না বু        ঃ     পাকিস্তানের দালালগুলোই তো পথ চিনিয়ে নিয়ে আসছে ঐ জল্লাদ বাহিনীকে, ওরা কাকে চেনে বলো তো? ওরা এদেশের

                মানুষ, না, কাউকে চেনে? দালালারাই তো লোকজনকে চিনিয়ে দিচ্ছে, ধরিয়ে দিচ্ছে।

বনি    ঃ     এ জন্যেই তো আমরাও একটা একটা করে দালাল শেষ করছি। আমাদের সংগ্রামের বিরুদ্ধে যে এতটুকু কাজ করবে, তাকে

                আমরা কিছুতেই রেহাই দিব না। আমরাও দালালদের চিনে চিনে মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরিয়ে দিব।

মাস্টার ভাই ঃ       হ্যাঁ, দেশের এই মারাত্মক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সুবিধাবাদী এবং সুযোগসন্ধানী সেইসব জ্বালাতন করছে, তাদেরকে

                আমাদের খতম করতে হবে। তাছাড়া আরও একটা কারণ আছেএইসব দালালদের শেষ না করলে গেরিলা বাহিনীর গোপন

                আস্তানাও গোপন থাকবে না। অতএব আমাদের সংগ্রামের নিরাপত্তার জন্য, সাফল্যের জন্য আমাদের ঘরের দুশমনের চিহ্ন

                রাখব না। এরাই হচ্ছে জাতির কলংক, এদের ঠাঁই নেই বাংলার মাটিতে।

ময়না বু        ঃ     ওদিকে আবার মুক্তিবাহিনীর লড়াইয়ের খবর ভাল। চট্টগ্রাম, চালনা-দুটো বন্দরেই বিদেশী জাহাজ আসতে চাচ্ছে না।

বনি    ঃ     কেন ময়না বু?

ময়না বু        ঃ     আমাদের গেরিলারা কড়া পাহারার মধ্যেও হরদম জাহাজ ডুবাতেই আছে। অস্ত্রশস্ত্র বোঝাই জাহাজ এরই মধ্যে অনেকটা

                ডুবেছে। তাছাড়া দিন কয়েক আগে একটা তেলবাহী জাহাজও ডুবিয়ে দিয়েছে। এত কড়া পাহারার মধ্যেও এ দুর্ঘটনা ঘটাতে

                শয়তান পাকবাহিনী তো, হকচকিয়ে গেছে।

বনি    ঃ  শুধু জাহাজই না ময়না বু, লঞ্চ, নৌকা কিছুই নিরাপদ না। নৌকা করে শয়তানগুলো যাচ্ছে, মুক্তিবাহিনী গুলি করে ডুবিয়ে দিচ্ছে।

ওদের এখন তরাস ধরে গেছে, ডাঙাতেও ভয়, পানিতেও ভয়।

ময়না বু        ঃ জুলুম করার আগেই একথা ভাবা উচিত ছিল। অন্যায় করলে তার প্রতিফল পেতেই হবে। আমাদেরই টাকায় গুলি কিনে আমাদেরই

খুন করবে, এতো হতে পারে না। এ জন্যেই দিন কয়েক আগে দুটো জাহাজ বাংলাদেশ থেকে পাট নেবে বলে এসেছিল, গেরিলারা ও-দুটোও ডুবিয়েছে।

মাষ্টার ভাই ঃ বঙ্গবন্ধু পল্টন ময়দানে বলেছিলেন ‘আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো’।সে কথাটা কতখানি সত্য। শয়তানদের

অর্থনৈতিক বুনিয়াদ ভেঙে পড়েছে। এখন পাগলা কুকুরের মতো দিশেহারা হয়ে ছুটছে। বিদেশ থেকে সাহায্যও বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলার

সম্পদ নিয়ে যে শক্তিমত্ততা দেখাতো আজ তার সেসব জারিজুরি ভেঙে গেছে।

বনি    ঃ এবারে তো বাংলাদেশের মানুষ পাট ভেঙে ফেলে ধান বুনে দিয়েছিল, যার জন্য পাটের উৎপাদনও কমে গেছে অনেক।

মাস্টার ভাই ঃ শুধু পাটই না-চা তামাক এগুলোরও কোন উৎপাদন নাই। চায়ের বাগানগুলো এখন মুক্তিবাহিনীর কব্জায়, যার জন্য জল্লাদ সৈন্যদের

ভাগ্যে আর চা জুটছে না, এখন নিষিদ্ধ পদার্থের মতো চা খাওয়াও নিষিদ্ধ হয়ে গেছে জল্লাদবাহিনীর। যে অন্যায় তারা করেছে তার তিল

তিল করে শোধ তুলে দিবো আমরা।

বনি    ঃ একটা কথা জিজ্ঞেস করছিলাম মাস্টার ভাই, সেদিন তুমি বললে না, কতগুলো খানসেনা খতম হয়েছে?

মাষ্টার ভাই ঃ গত এক মাসের হিসেব ২৪৭০ জন জল্লাদ সেনা, আর তাদের অফিসার খতম হয়েছে এবং রাজাকার পুলিশ মিলিয়ে খতম হয়েছে

২২০০ জন। ২৪টা সামরিক গাড়ী বিধ্বস্ত হয়েছে, ৫টা মিলিটারী স্পেশাল ট্রেন নষ্ট হয়েছে।

ময়না বু        ঃ  খুব ভাল হয়েছে-‘যেমন কর্ম তেমন ফল। বাংলাকে দেখেছে, বাংলার মানুষকে দেখেছি। বাংলার মানুষও যে প্রয়োজনে অস্ত্র হতে লড়াই করতে পারে, জুলুমের প্রতিকার করতে পারে, এবার বুঝেছে।

মাষ্টার ভাই ঃ আমাদের মুক্তিবাহিনী একটা গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অধিকাংশ স্থানই দখল করে নিয়েছে, সড়কটা হচ্ছে দিনাজপুর-ফুলবাড়ির মধ্যে।

এই সড়কের পার্শ্বে দুশমনদের যেসব রাজাকার ছিল, এখন সেগুলো মুক্তিবাহিনীর দখলে, মুক্তিবাহিনীর কাজে লেগেছে। এখানের

লড়াইয়ে ৪৫ জন পাকসেনা খতম এবং তিনজন আহত হয়েছে। তাছাড়া প্রতিটি সেক্টরেই তুমুল লড়াই চলছে।

বনি    ঃ লড়াই আরো জোরদার হয়েছে। দুশমনরা পিছু হপতে শুরু করেছে। টাঙ্গাইল তো মুক্তই হয়ে গেছে মাষ্টার ভাই।

ময়না বু        ঃ আস্তে আস্তে সবই মুক্ত হবে বনি। ধৈর্য ধরতে হবে, মনের বল রাখতে হবে। তাই না মাস্টার ভাই?

মাষ্টার ভাই ঃ ঠিকই। লড়াই তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে। মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের চোটে জল্লাদবাহিনীর পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা লড়াই

করছি স্বতঃস্ফৰ্তভাবে, নিজের দেশকে উদ্ধার করার জন্য, আর ওদের সৈন্যরা বেতনভোগী পেশাদার সৈন্য-দুটোর মধ্যে তফাৎ

অনেক। দেশের জন্য যার দরদ আছে তার শক্তি ওই ভাড়াটিয়া সৈন্যদের চেয়ে দশগুণ বেশী।

বনি    ঃ এটা একেবারে খাঁটি সত্য কথা। দেশকে ভালবেসে দেশের জন্য জন্য জান দিতে যাওয়া কি কম কথা মাস্টার ভাই? এর থেকে বড়

গৌরব আর কি আছে? কিন্তু এই দালালগুলো বুঝতে পারেনি সে কথা। তাই মরছেও দমাদম।

ময়না বু        ঃ লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’।

বনি    ঃ ঠিক বলেছ-ময়না বু, লোভের খেসারত দিচ্ছে। ইসাহাকের ঠ্যাং খোঁড়া হলো, সুলতানউদ্দিন মরলো, মোনেম খাঁ, একে একে সব

মরবে।

মাস্টার ভাই ঃ ফসলের জমিতে যেমন আগাছা রাখতে নাই, ঠিক তেমন একটা সমাজে বা জাতির মধ্যে বেঈমান, বিশ্বাসঘাতক রাখতে নাই।

যাক শোন, তোমাদের একটা কথা বলি, সবাই খেয়াল রাখবে কে আমাদের মধ্যে মোনাফেকী করার সুযোগ নিচ্ছে-তার নাম চাই, নাম দিতে হবে মুক্তিবাহিনীকে। গ্রামে গ্রামে লোক লাগাও, ময়না বু তোমার পক্ষে এ কাজটা করা অনেক সহজ, তুমি অন্দরমহলের মারফত খবর পাবে। খবরগুলো পৌছে দিও।

ময়না বু        ঃ আচ্ছা মাষ্টার ভাই। তা মাস্টার ভাই বলছিলাম কি, রাত তো অনেক হলো, আমি উঠি।

বনি    ঃ তুমি একলাই যাবে না, আমরাও যাবো।

মাষ্টার ভাই ঃ হ্যাঁ চলো, কথায় কথায় অনেক রাত হয়ে গেছে, চলো আমরাও যাই।

বনি    ঃ কাল সকালে তুমি একবার আমার সাথে দেখা করো, কথা আছে।

মাস্টার ভাই ঃ চলো, যাই।

সবাই    ঃ চলো।

৩০ নভেম্বর, ১৯৭১

মাষ্টার ভাই ঃ         যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন মারাত্মক। মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে আর পাকিস্তানী শয়তানগুলো প্রাণের ভয়ে

পিছে হটে যাচ্ছে বনি, আমাদের আরো সজাগ আরো সতর্ক হতে হবে।

বনি    ঃ     আমরা সতর্ক আছি মাষ্টার ভাই। মানুষের মনের শক্তি কেমন বেড়ে গেছে শুনেছ। মুক্তিবাহিনী যতোই এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ

ততই যেন নতুন শক্তি অর্জন করেছে।

মাস্টার ভাই ঃ       এটা তো খুবই স্বাভাবিক বনি। বাংলার মানুষ যেমন আমাদের গেরিলাদের আশ্রয়স্থল, আমাদের গেরিলারা এবং মুক্তিবাহিনী

ঠিক তেমনি বাংলার মানুষের ভরসাস্থল।

বনি    ঃ     পরশু কালিগঞ্জ গেছিলাম। মুক্তিবাহিনীর গানবোটে চড়ে। গায়ের লোক আমাদের বোট দেখে ‘জয় বাংলা ধ্বনি দিতে দিতে

নদীর পাড়ে এসে হাজির, আর আমাদের দেখে কতো খুশী!…কে যায়? কে?

বসির ভাই ঃ         আমি বসির। কে, বনি নাকি? …আরে মাস্টার ভাই দেখছি। আসসালামু আলায়কুম।

মাষ্টার ভাই ঃ         ওয়ালায়কুম আসসালাম। এসো বসির ভাই। কোথায় যাচ্ছিলে?

বসির ভাই ঃ         ময়নাবুবুর কাছে যাচ্ছিলাম। কাল কিছু কাপড়-চোপড় ময়নাবুবু জোগাড় করেছে, মুক্তাঞ্চলের গরীব-দুঃখীকে দেওয়ার

জন্য, ওগুলো নিয়ে আসি।

বনি    ঃ     আমিও কিছু জোগাড় করেছি, তাহলে তুমি সেগুলোও নিয়ে যেয়ো, আমি আবার অন্য কাজে আটকা পড়ে গেছি, সময়

পাচ্ছি না।

বসির ভাই ঃ         ঠিক আছে নিয়ে যাবো। তারপর কি গল্প করছিলে তোমরা।

বনি    ঃ     গল্প না, বসির ভাই। সত্যি ঘটনা।

মাষ্টার ভাই ঃ         বনি পরশুদিন কালিগঞ্জে গেছিল তারি গল্প করছে।

বসির ভাই ঃ         কও শুনি। আমিও যাবো একদিন!

বনি    ঃ     যা বলছিলাম, মাস্টার ভাই, ঘাটে যখন বোট ভিড়ল, লোকে কি খুশী। এর মধ্যে এক বুড়ো মানুষ হঠাৎ বলে উঠল “বাপুরে,

আজ তোমাদের গানবোট দেখে আমরা ছুটে আসছি তোমাদের দেখার জন্য। আর দুদিন আগে ওই শয়তানের বাচ্চারা যখন

আসত, নদীর দুই পাড়ে গাঁয়ের লোক কে যে কোথা পালাবে, তার হিসাব পেতো না। মেশিনগান ফিট করে রাখতো। সমানে

গুলি চালাতো পাড়ে, কে মরবে, কে বাঁচবে, বলা মুস্কিল ছিলো।

মাষ্টার ভাই ঃ         মানুষের মনে ভয় এবং সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য এবং মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচানোর জন্য এলাপাতাড়ি গুলি

চালাতো, সাধারণ মানুষের মৃত্যুতে কিছু যেতো আসতো না- কিন্তু আজ শয়তানরা বুঝতে পেরেছে, বাংলার মানুষ তাদের চরম ঘৃণা করে। মুক্তিবাহিনীকে পরম আদরে তারা ডেকে নেয়, কিন্তু জল্লাদদের দেখলে ঘৃণায় মরে যায়।

বসির ভাই ঃ         কথাটা কিন্তু ঠিক। অত্যাচার করে যে মানুষের মুক্তির ইচ্ছাকে দমানো যায় না সেটা শয়তানগুলো বুঝেছে।

মাস্টার ভাই ঃ       আর আজ বেঈমানের জাতগুলো তাই পোড়া মাটি নীতি’ অবলম্বন করেছে। তারা যে অঞ্চল ছেড়ে পিছু হটে যাচ্ছে সে

অঞ্চলটা সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে দিচ্ছে। ধান-চাল লুটপাট করে দিয়ে যাচ্ছে, বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিচ্ছে।

বনি    ঃ     তাতেই কি মানুষকে কোনদিন দাবিয়ে রাখতে পারবে?

মাস্টার ভাই ঃ       না, মোটেই না। এ জন্যই তো আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু বলেছেন, “আমাদের আ দাবিয়ে রাখা যাবে না।

মাষ্টার ভাই ঃ         চলো না হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতে করতে যাই, ময়না বুবুর ওখানে।

বনি    ঃ     কথাটা ঠিকই বলেছ বসির ভাই। চলো মাস্টার ভাই ময়না বুবুর ওখানেই যাই, কাজের কথাও হবে, একটু গল্প করাও যাবে ।

বনি    ঃ     ময়না বু….ও ময়না বু।

ময়না বু        ঃ     কে? বনি নাকিরে- আরে ভাই, কাজ করছি।

বসির ভাই ঃ         আমরাও এসে গেছি ময়না বু,

ময়না বু        ঃ     এসো এসো, মাস্টার ভাইও দেখছি, বসো।

মাষ্টার ভাই ঃ         কাপড়-চোপড় তো অনেক জোগাড় হয়েছে দেখছি ময়নাবুবু ভালই করেছ। অধিকৃত অঞ্চলে মানুষের জীবন তো ভীষণ

কষ্টের মধ্য দিয়ে কাটছে, মুক্ত হওয়ার পর মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। অধিকৃত অঞ্চলে মানুষের জীবন কাটছে একটা

বিভীষিকাময় ঘোরের মধ্যে। স্বস্তি নাই, শান্তি নাই, ঘুম নাই, আরাম নাই। এদিকে শয়তানগুলো আর রাজাকার- বদর বাহিনীর

জানোয়ারগুলো মানুষের ঘর থেকে তাদের শেষ সম্বলটুকু হবে। ময়না বু আমি কিছু জিনিস, ঔষধপত্র আর কাপড়-চোপড়

জোগাড় করে দেবো।

ময়না বু        ঃ     আমরা তো মানুষের সেবা করতে পারি। তাই এই সেবার ভারটা আমি হাতে তুলে নিয়েছি।

মাষ্টার ভাই ঃ         আজ বাংলা মা-বোনেরা এভাবেই তো দেশের সেবা করছে, সেবা করার জন্য এগিয়ে এসেছে ময়নাবুবু আজ স্বতঃস্ফৰ্তভাবে

মানুষ যে যা কাজ করতে পারে, সে তাই করবে। যেকোন কাজ দ্বারাই মুক্তিসংগ্রামকে সাহায্য করা যায়। যে মুক্তিবাহিনীর

জন্য মরচা খোঁড়ে, তাদের শত্রুর অবস্থানের খবর এনে দেয় অথবা মুক্তিবাহিনীর গুলির বাক্স বয়ে নিয়ে যায়, সেও

মুক্তিসংগ্রামের সামিল, সেও মুক্তসংগ্রামকে সাহায্য করছে।

ময়না বু        ঃ     যুদ্ধের খবর-টবর কিছু বলো মাষ্টার ভাই ।

বনি    ঃ     তাহলে আমিই বলি- যশোর ক্যান্টনমেন্টের কাছে তুমুল লড়াই চলছে। ক্যান্টনমেন্টের উপর চরম আঘাত হানছে। এদিকে

আবার জল্লাদবাহিনী মসজিদে মসজিদে ওদের জন্য দোওয়া করতে বলেছে। বেটারা মরে মরে ভূত হচ্ছে আর আতংক

বাড়ছে।

বসির ভাই ঃ         নোয়াখালীর কথা শুনেছ? মুক্তিবাহিনী বিলোনিয়া দখল করে এখন ফেনীর দিকে এগিয়ে চলেছে। পথে ছাগলনাইয়া দখল

করে নিয়েছে। ছাগলনাইয়া ফেনী থেকে মাত্র চার মাইল দূরে।

ময়না বু        ঃ     এদিকে তো আমি শুনলাম, পচাগড়া মুক্তিবাহিনীর দখলে আর সেটা দখল করার জন্য পাক ফৌজ খুবই চেষ্টা চালাচ্ছে। বসির ভাই ঃ     চেষ্টা তো করবেই, কিন্তু পারলে হয়। মুক্তিবাহিনী যেখানে মুক্ত করছে, তাদের ঘাঁটি শক্ত করছে।

ময়না বু        ঃ     ঢাকা শহরে তো হরদম বোমা বিস্ফোরণ হচ্ছে। কয়েকটি পেট্রোল বোমার আগুনে রেলসেতুগুলোর চরম ক্ষতি হয়েছে। মাস্টার ভাই ঃ মুক্তিবাহিনী এখন প্রতিটি সেক্টরে তৎপর। রাস্তা-রেল-নদীপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম-

অধিকৃত অঞ্চলে পঞ্চাশ থেকে একশ ভাগ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।

সমস্ত শহরের চারিদিকে পরিখা খোঁড়া হয়েছে। দোকানপাট সন্ধ্যার আগেই বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকায় তো জোর গুজব

দু’হাজার মুক্তিসেনা প্রস্তুত, যেকোন মুহুর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। তুলেছে।

বসির ভাই ঃ         মুক্তিবাহিনী এদিকে ঝিনাইদহ পাঁচমাথার মোড় দখল করে নিয়ে শক্ত ঘাটি গড়ে তুলেছে ।

বনি    ঃ     এদিকে তো আর দু’চারদিনের মধ্যেই রাজশাহী-নবাবগঞ্জ দখল হওয়ার উপক্রম। মুক্তিবাহিনী ১৭ জন রাজাকার, তিনজন

পাকসেনা বন্দী করে এনেছে। আর বহু রাইফেল আর গুলি উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে।

ময়না বু        ঃ     এর জন্যই তো শয়তানগুলো এখন পালাবার পথ খুঁজছে।

মাষ্টার ভাই ঃ         পালাবে আর কোথায়? এখন ওরা সবাই আশ্রয় নিতে চাচ্ছে ক্যান্টনমেন্টগুলোয়। আর মুক্তিবাহিনী তাদের সে পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। এখন শয়তানগুলো ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় বাংলাদেশের পথে-ঘাটে মুক্তিবাহিনীর হাতে কুকুরের মতো গুলি খেয়ে মরছে। পাকিস্তানী ৬০টা ট্যাংকের মধ্যে ১৭টাই তো মারা পড়েছে। বিমান বহরের ১৮টা বিমানের মধ্যে পাঁচটা নেই। নদী-আকাশপথ আর সড়কে কোথাও নিস্তার নেই শয়তানদের।

ময়না বু        ঃ     সংঘবদ্ধ মুক্তিকামী মানুষের শক্তি যে কি প্রচণ্ড তার প্রমাণ পাচ্ছে শয়তানরা এখন।

বনি    ঃ     আরো পাবে বুবু, কিন্তু সেদিন আর বেশী দূরে নয়।

বসির ভাই     ঃ     যাক ময়না বুবু, কথাবার্তা তো হলো, এবার কাপড়-চোপড়গুলো দাও, আমাদের আবার দেরী হয়ে যাচ্ছে, চলে যাবো।

ময়না বু        ঃ     এই যে দিচ্ছি ভাই।-নাও, কাল আরো কিছু পাবো, পরশু এসে নিয়ে যেয়ো।

বসির ভাই     ঃ     আচ্ছা।

মাষ্টার ভাই    ঃ     চলো, আমরা তাহলে যাই। বুবু চলি।

৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১

মাস্টার ভাই ঃ       এখন আমাদের দুর্যোগময় রাতের অন্ধকার শেষ হয়ে আসছে। এখন আমাদের মুক্তিবাহিনী দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে।

শত্রুশিবির একের পর এক মুক্তিবাহিনীর পদদলিত হচ্ছে মুক্তাঞ্চলের বিস্তৃতি ঘটছে দিনের পর দিন। অত্যাচারে জর্জরিত

মানুষ এখন ফেলছে স্বস্তির নিঃশ্বাস। মুক্তাঞ্চল দিয়েছে তাদের নতুন জীবনের আশ্বাস। আজ আমরা জমায়েত হয়েছি দুটো

কারণে। একটা হলো- আমরা মুক্তিবাহিনীকে কিভাবে আরো সাহায্য করতে পারি তারই পরিকল্পনা নিতে হবে এবং দ্বিতীয়টা

হলো- সদ্য মুক্তাঞ্চলের বিপর্যস্ত জীবনধারা আমরা আবার স্বাভাবিক এবং সুন্দর করে গড়ে তুলতে পারি। এ কাজ নিঃসন্দেহে

খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য তার জন্য চিন্তা আমরা করি না, কেননা মুক্তিসংগ্রামে নিয়োজিত প্রতিটি ব্যক্তি আপন আপন দায়িত্ব

এবং কর্তব্য পালনে নিষ্ঠাবান, সচেষ্ট এবং উন্মুখ। আমরা গভীরভাবে আমাদের কর্মদক্ষতায় বিশ্বাসী।…কি ব্যাপার বসির ভাই

কিছু বলবে নাকি?

বসির ভাই ঃ         পাকিস্তানী জল্লাদগুলো নিজের ঘাঁটি ছেড়ে পালাবার সময় আশেপাশের গ্রাম-বাড়িঘর জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে দিচ্ছে।

এর জন্য আমরা কি করব? আমরা কিভাবে সাহায্য করতে পারি, আমাদের বলো।

বনি    ঃ     হ্যাঁ মাস্টার ভাই, বসির ভাই ঠিকই বলেছে। প্রত্যেকটা জায়গায় একই রকম অন্যায় করছে ওরা। আমাদের বুদ্ধি দাও

কিভাবে সাহায্য করব আমরা।

মাষ্টার ভাই ঃ         নানাভাবে সাহায্য করতে পারি আমরা। প্রথমতঃ যেসব অঞ্চলে ওরা এমন অত্যাচার করছে, বা করেছে সেখানের খুঁটিনাটি

খবরাখবর আর ক্ষতির পরিমাণ জানতে হবে। তারপর স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর অত্যাচারিত মানুষকে আশু সাহায্য করতে হবে।

অসুস্থআহত লোকদের চিকিৎসার জন্য ওষুধপত্র নিয়ে যেতে হবে।

ময়না বু        ঃ     আমি কিন্তু আরো কিছু ওষুধপত্র , কাপড়-চোপড় জোগাড় করে রেখেছি। আমাকে খবর দিলেই আমি লোকজন নিয়ে সংগে

সংগে চলে যাবো।

মাষ্টার ভাই ঃ         তাহলে সবাই প্রস্তুত। প্রতিটি মানুষকে খবর দিয়ে রাখো যে ছোট ছোট দল ভাগ করে কাজের ভার দেয়া হয়েছে, তাদের

সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ প্রতিমুহুর্তে প্রস্তুত থাকবে।

বসির ভাই ঃ         সে কথা বলে দিয়েছি মাস্টার ভাই। ইতিমধ্যেই কয়েকটা সাহায্যকারীদল চলে গেছে। ওষুধপত্র, কাপোড়-চোপড়ও পাঠিয়ে

দেওয়া হয়েছে। আরো কিছু জোগার করে রেখেছি।

মাস্টার ভাই ঃ       খুব ভালো করেছ। লড়াই যে ভাবে তীব্রতর হচ্ছে, তাতে বিজয়ের দিন আমাদের সুদূর নয়। জল্লাদবাহিনীর বিষদাঁতগুলো

একের পর এক ভেঙে আমরা মুক্ত করব বাংলাদেশ।

বনি    ঃ     এদিকে তো মুক্তিবাহিনী যশোর, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর জেলার আরো কয়েকটি থানা দখল করে নিয়েছে।

বসির ভাই ঃ         শুধু তাই নাকি? গেরিলা আক্রমণে হেরে গিয়ে পাকফৌজ যশোর শহর থেকে পাকবাহিনীর সদর দফতর সরিয়ে নিয়ে মাগুরা

শহরে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

ময়না বু        ঃ     মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে পাকফৌজ এখন চেচাচ্ছে ‘পালাও, পালাও এখন ওরা যাযাবরের মতো আজ এ শহরে কাল ও শহরে

পালাবে, শেষে পালাবার যখন আর পথ থাকবে না তখন কি করবে?

বনি    ঃ     তখন বঙ্গোপসাগরে-পদ্মা-মেঘনা-যমুনা ধলেশ্বরী-মহানন্দা-আত্রাই আর পুনর্ভবায় ইদুরের মতো ডুবে মরবে। আর তা না হলে

এখন যেমন মাঝে মাঝেই ধরা দিচ্ছে, তখন মুক্তিবাহিনীর কাছে দলে দলে ধরা দেবে।

ময়না বু        ঃ     সাহায্যের সব রাস্তাগুলোই তো বন্ধ হয়ে গেছে। নদীপথ, সড়ক আর রেলপথে যোগাযোগ তো বন্ধ, এদিকে আবার

বিমানপথও বন্ধ হবার উপক্রম। গেরিলারা লালমনিরহাট বিমানবন্দর বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

মাষ্টার ভাই ঃ         যোগাযোগের সমস্ত ব্যবস্থাগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে শয়তানগুলোর এখন আর অন্য কোন পথ খোলা থাকবে না, তখন হবে

হয় মৃত্যু, নয় আত্মসমর্পণ। এ ঘটতেই হবে, হতে বাধ্য। ইতিহাসের লিখন মর্মান্তিকভাবে ওদের যে পরাজয় লিখে রেখেছে,

তাতে হানাদারদের নিঃশেষ হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

বনি    ঃ     এদিকে শুনেছ গেরিলা বাহিনী নাগেশ্বরী থানাটা দখল করে নিয়ে লালমনিরহাট বিমানবন্দরটা ঘিরে ফেলেছেন, এখান থেকে

হানাদারদের জন্য বিমান চলাচল বা বিমানের সাহায্যে কোন সাহায্যদ্রব্য পাঠানো একেবারে বন্ধ-

বসির ভাই ঃ         গত বুধবার মুক্তিবাহিনী সিলেটের শমসেরনগর বিমানঘাঁটিটি দখল করে নিয়েছেন। রংপুরের ধরলা নদীর উপরে তারা

শক্তি সঞ্চার করে হানাদারদের আঘাত হানার জন্য দক্ষিণে এগিয়ে যাচ্ছে।

মাষ্টার ভাই ঃ         মুক্তিবাহিনী খুলনার সাতক্ষীরা শহর সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলেছে এবং ফেনীর কমলপুরে প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়ে

মুক্তিবাহিনীর বীর যোদ্ধারা যশোর জেলার সাদিপুর, ঝিনাইকুণ্ড এবং জামিরা এলাকা থেকে দখলদার সৈন্যদের বিতাড়িত

করেছে।

ময়না বু        ঃ     মুক্তিবাহিনী দিনাজপুর জেলার বোদা থানা সদর দখল করে নিয়েছে। পচাগড় থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে এই বোদা থানা।

এখন মুক্তিবাহিনী তীব্রগতিতে ঠাকুরগাঁয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে দখল করে নিয়েছে। এদিকে আবার ময়দানদীঘি এলাকাটা

হানাদার বাহিনীর হাতে থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে গেছে।

বনি    ঃ     মুক্তিবাহিনী এখন যেখানে আঘাত হানছে সেখান থেকেই শয়তানরা পিছু হটছে। সময় হয়ে গেছে, বাছাধনরা খাওয়া-দাওয়া

ভুলে এখন ইয়া নফসী, ইয়া নফসী শুরু করেছে।

বসির ভাই ঃ         বনি, একটা সুন্দর আলোচনা হচ্ছে। তার মধ্যে শুরু করেছ ফাজলামি, তোমাকে কতবার বলা হয়েছে, এখন ঐসব হালকা

কথাবার্তা বলবে না।

মাস্টার ভাই ঃ       যাক তোমরা দুজনেই থামো, মুক্তিবাহিনী কুমিল্লা জেলার তিনটে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে নিয়েছে। শয়তানদের বাইরের

সংগে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এই এলাকাগুলো হলো গংগাসাগর এবং রাজারকোট।

বসির ভাই ঃ         যশোর সেক্টরে মুক্তিবাহিনী প্রচণ্ড আক্রমণ করে নাভারন-সাতক্ষীরা রোডটি থেকে পাক সাতক্ষীরা রোডে হানাদারদের সংগে

মুক্তিবাহিনীর জোর লড়াই চলছে।

বনি    ঃ     কুষ্টিয়া জেলার কথাও শোন তাহলে। জীবননগর তো মুক্তিবাহিনীর দখলে; এদিকে আবার জীবননগর থানার উত্তর-পূর্বে

আন্দুবাড়িয়া এখন মুক্তিবাহিনীর দখলে। চুয়াডাঙ্গা দখলের ব্যাপার নিয়ে মুক্তিবাহিনীর সংগে-প্রচণ্ড লড়াই চলছে।

মাষ্টার ভাই ঃ         মারো আর তাড়ো। কথাটা ঠিকই। বগুড়া জেলায় মুক্তিবাহিনী আরিয়াকান্দি থানায় ২২ জন পাক দস্যকে খতম করেছে। আর

বেঁচেছিল দুজন, তারা আবার পালাতে না পেরে মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

ময়না বু        ঃ     পাক জানোয়ারগুলো যেখানে না পারছে, সেখানেই বিমান আক্রমণ চালিয়ে সাধারণ নিরীহ মানুষদের মারছে, তাদের বাড়িঘর

নষ্ট করে ফেলছে ।

মাস্টার ভাই ঃ       কিন্তু তাতেই কি বাংলাদেশের মানুষের মনোবল ভাঙতে পারবে? পারবে না। কোনদিন ওরা সক্ষম হবে না। বাংলার মানুষের

মন আরো সবল, আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। শত দুঃখ কষ্টেও বাংলার মানুষ ভেঙে পড়বে না।

বনি    ঃ     বাংলার মানুষ এবং মুক্তাঞ্চলে নতুন উৎসাহে কাজ শুরু করেছে; চাষবাস করছে, ফসল কাটছে, ফসল তুলছে ঘরে।

মাস্টার ভাই ঃ       এদিকে আরেক খবর শুনেছ? ঢাকার বেতার কেন্দ্র, পাকিস্তানের প্রলাপের ভাণ্ডার একদম বন্ধ হয়ে গেছে। গেরিলাবাহিনীর

আক্রমণে শেষ পর্যন্ত ওদের দালালী কণ্ঠস্বরও স্তব্ধ হয়ে গেছে।

বসির ভাই ঃ         ওদের হাত ভাঙবে, পা ভাঙবে, গলার স্বরও বন্ধ হয়ে আসবে। হতেই হবে।

মাস্টার ভাই ঃ       যাক, যুদ্ধের আলোচনা হলো, আমরা খবরাখবর তো শুনলাম, এবার আমরা আমাদের অন্য আলোচনায় আসি।

ময়না বু        ঃ     বলো মাষ্টার ভাই। আমরাও কাজের কথা শুনি।

মাষ্টার ভাই ঃ         ময়না বু শোন, মেয়েদের কাজ প্রচুর আছে। তোমরা দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত মানুষকে সান্তনা দেবে। নতুন করে গেরস্থালী

যারা গুছিয়ে নিচ্ছে, তাদের সাহায্য করবে। মানুষকে সান্তুনা দেওয়া বা তার ভাঙা সংসার গড়ে তোলার কাজে তোমরা

সাহায্য করতে পারবে সবচেয়ে বেশী। এ কাজের ভারটা তোমাদেরই নিতে হবে। তা ছাড়া শয়তানদের বোমায় আহত বা

যুদ্ধে আহত মানুষের সেবা করার দায়িত্বও তোমাদের নিতে হবে। আশা করি এ কাজটা ভালই পারবে তোমরা, তাই না?

ময়না বু        ঃ     হ্যাঁ, মাষ্টার ভাই। খুব ভালভাবে পারব। আমি আমার দলবল নিয়ে এই কাজই করছি, দরকার হলে আরো কয়েকজনকে

নিয়ে নিবো।

মাস্টার ভাই ঃ       বসির ভাই, বনি- তোমাদের কাজ হবে আহত অসুস্থ মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসা, মানুষের ঘরবাড়ি তোলার

ব্যাপারে সাহায্য করা এবং খাদ্য এবং আশ্রয়হীন মানুষের জন্য খাদ্য এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা।

বসির ভাই ঃ         বনি, তাহলে আমি উত্তর পাড়ায় যাচ্ছি, ওখানেই কাজ করব, আর তুমি তোমার ছেলেদের নিয়ে পূর্বপাড়ায় চলে যাও।

বনি    ঃ     হ্যাঁ, আমি পূর্বপাড়ায় থাকবো, মাষ্টার ভাই তুমি আসবে তো? আমাদের মাঝে মাঝে বুদ্ধি-সুদ্ধি দিবে, কিভাবে কাজ করলে

সুবিধা হবে একটু দেখিয়ে শুনিয়ে দিবে।

মাষ্টার ভাই ঃ         নিশ্চয় আমি সব জায়গায় যাবো, আমি সবসময় তোমাদের সংগে সংগে থাকবো, আর শোন, কাল আবার এ সময় এসো,

কতগুলো নির্দেশ আছে, সেগুলো জানিয়ে দেবো। আর একটা কাজ করো, মানুষের মনোবল অটুট রাখার জন্য তাদের

সংগে গল্পগুজব করবে, যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করবে। আর হ্যাঁ, শয়তানদের ঘাঁটির খবরাখবর,

ওদের চলাফেরার খবরগুলো কিন্তু অবশ্যই জোগাড় করবে।

বনি     ঃ    ঠিক আছে, তাহলে আমরা যাই। ময়না বু চলো যাই, তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আমি যাবো।

ময়না বু         ঃ    চলো উঠি, মাস্টার ভাই তাহলে গেলাম।

মাষ্টার ভাই ঃ         আচ্ছা।

বসির ভাই  ঃ        তাহলে মাস্টার ভাই, চলো আমরাও যাই।

মাস্টার ভাই ঃ       চলো।

(রচনা ও পরিচালনাঃ মুস্তাফিজুর রহমান)