চাঁদপুরে পাকবাহিনীর হত্যালীলার আরো কাহিনী

Posted on Posted in 8

৪৩। চাঁদপুরে পাকবাহিনীর হত্যালীলার আরো কাহিনী (৪৩৩-৪৩৪)

সূত্র – পূর্বদেশ, ১৩ই ফেব্রুয়ারী
চাঁদপুরে পাকবাহিনীর হত্যালীলার চাঞ্চল্যকর কাহিনী
।। পূর্বদেশ সংবাদদাতা ।।

কুমিল্লা ১০ই ফেব্রুয়ারী। কুমিল্লা জেলার নদীবন্দর চাঁদপুর ও তার আশপাশের বর্বর বাহিনীর নৃশংসতার বহু তথ্য ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। কেবল মাত্র চাঁদপুরেই দখলদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকার, মোজাহিদ বাহিনীর হায়েনাগুলো প্রায় ৫ হাজার নিরীহ বাঙ্গালীকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দিয়েছে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

উপরন্ত এই ছোট বন্দর শহরটিতে আল-বদর দখলদার বাহিনীর আত্মসমপর্ণের অনতিপূর্বে (৭-১২-৭১ইং) সুপরিকল্পিত উপায়ে বহু বুদ্ধিজীবী, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হত্যা করার চাঞ্চল্যকর খবর পায়া যাচ্ছে।

জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরীর বড় ভাই ডাঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী এক সংবাদদাতাকে বলেন, চাঁদপুর পুরান বাজারস্থিত নুরিয়া হাইস্কুলে আল- বদর বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে তাদের প্রধান এর নির্দেশে অত্র এলাকায় এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। লুটতরাজ ও নির্বিচারে হত্যা তখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়ায় বলে তিনি জানান। একদিন আল বদর বাহিনীর কয়েকটি হায়েনা গ্রাম অঞ্চল থেকে আগত চারজন নিরীহ বাঙ্গালীকে অচেনার অজুহাতে প্রকাশ্য বাজারে গুলি করে হত্যা করে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পেলেই তারা ধরে নিয়ে যেত এবং এদের কাউকেই ফিরতে দেখা যায়নি বলে জানা যায়। একদিন তার অনুপস্থিতিতে তার ছেলে বাবুলকে বদর বাহিনীর কয়েকটি হায়েনা বড় ষ্টেশন ও তাদের নির্যাতন কক্ষে নিয়ে আরো প্রায় ২০-২৫টি ছেলের সাথে অকথ্য নির্যাতন করে। বহু চেষ্টা তদবিরের পর জনৈক আর্মি অফিসারের মারফতে বাবুলকে তিনি ফিরিয়ে আনলেন সত্য কিন্তু তারপর সে প্রায় এক মাস অচল হয়ে পড়েছিল। তার সঙ্গের হতভাগ্যদের কি হয়েছিল তা তিনি বলতে পারেন নি।

দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের পূর্ব মুহূর্তে ফেসিস্ট আল বদর বাহিনী সুপরিকল্পিত উপায়ে বুদ্ধিজীবী নিধন শুরু করে। চাঁদপুর টেলিফোনের সহকারী ইঞ্জিনিয়ার জনাব সায়েদুল হক আল বদর বাহিনীর তৎপরতার কোথা বলতে গিয়ে তারা কি করে তার দুজন কর্মীকে হত্যা করেছে এবং তিনি কেমন করে তাদের মৃত্যু ফাঁদ থেকে বেঁচে গেছেন তা এই সংবাদদাতাকে জানান।

৭ই ডিসেম্বর তার একজন সুপারভাইজার জনাব আব্দুল খালেক ও অপারেটর জনাব মোরশেদুর রহমান শহরের উপকণ্ঠের এক গ্রাম থেকে ফেরার পথে বদর বাহিনী তাদের ধরে নিয়ে যায়। এর নুরিয়া হাইস্কুলস্থিত ক্যাম্পে আটকিয়ে রাখে। উক্ত খবর পাওয়ার পর তিনি বদর বাহিনীর সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করলে উল্লিখিত ব্যক্তিদেরকে সকালে মুক্তি দেয়া হবে বলে আশ্বাস দেয়া হয়। সান্ধা আইন থাকায় নিজে গিয়ে তাদের খবর নেয়া নিরাপদ কিংবা সম্ভবও ছিল না। সকাল বেলা এক বেনামী টেলিফোন থেকে জানতে পেরে তাদের খোঁজ করতে গিয়ে নুরীয়া স্কুলের নিকটবর্তী রাস্তায় তাদের মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সেদিনই কিছু একটা বিপদের আশংকা মনে জাগলে জনাব সায়েদুল হক শহর ছেড়ে পালাতে সচেষ্ট হয়ে উঠেন এবং ঝুঁকি নিয়ে সপরিবারে নৌকা করে সরে পড়তে সক্ষম হন। পরে তিনি জানতে পারেন যে, তিনি বাসা ত্যাগ করার মাত্র কয়েক মিনিট পরেই আল বদর বাহিনীর হায়েনাগুলো তার বাসায় পৌঁছে হতাশ হয়। সেই মানবতার শত্রু হায়েনাগুলো অনেক বুদ্ধিজীবীকে তাদের নিজ নিজ বাসা থেকে ধরে এনে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ম্যালেরিয়া উচ্ছেদ বিভাগের এসিস্টেন্ট ম্যালেরিয়া সুপারিটেনডেন্ট জনাব জোয়রদার মতিউর রহমান, স্টোরকিপার জনাব মাকসুদুর রহমান, মেকানিক জনাব কবির আহমদ, ম্যালেরিয়া ইন্সপেক্টর জনাব সফিউদ্দিন আহমেদ, ও দুজন সুপারভাইজার বজলুল রহমান ও ইদ্রিস মিয়া। কৃষি বিভাগের একজন প্রোজেক্ট অফিসার জনাব ফয়েজ আহমেদ ও আল বদর বাহিনী কর্তৃক নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ওয়াপদার দু’জন মেকানিকা ছিলেন, তারা হচ্ছেন নাজিমুদ্দিন ও মাহফুজুল হক।

দখলদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী এদেশের জারজ সন্তানগুলো নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালায় তার চাক্ষুস সাক্ষী রেলওয়ে হাসপাতালের সেনিটারি এসিস্টেন্ট জনাব ফজলুল বারী। এপ্রিল মাসে চাঁদপুর দখলদার বাহিনীর কবলে পতিত হওয়ার পরও তিনি হাসপাতালের কাজে নিযুক্ত থাকার বর্বর বাহিনীর নৃশংসতার সাক্ষী হয়ে আছেন তিনি এবং তার ডোম বাহিনীর অনেকেই। রেলষ্টেশনের অফিস সমুহে রেস্টহাউজে দখলদার ও রাজাকার বাহিনীর ক্যাম্প করা হয়। শান্তি বাহিনীর সহযোগিতায় এই সমস্ত নরপশু চাঁদপুর পুরান বাজার ও পার্শ্ববর্তী এলাকা সমুহে হত্যা, লুট, নারী নির্যাতন, ও অগ্নিসংযোগ এক নারকীয় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। নির্বিচারে গণহত্যা ও বহু নারীর সতীত্ব নষ্ট করার বিবৃতি দান করেন জনাব ফজলুল বারী। রেল, লাঞ্চ, রাস্তা ঘাট, নৌকা সমূহ ও বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলের হানা দিয়ে নিরীহ নিরপরাধ বাঙ্গালীদের ধরে এনে তাদের ক্যাম্প সংলগ্ন নির্যাতনকক্ষে আমানুসিক নির্যাতন করে হত্যা করা হতো। একটি আম গাছ নির্দেশ করে তিনি বললেন এই আম গাছটি হাজারো নরহত্যার নীরব দর্শক। আম গাছটির নীচে ফিশিং কর্পোরেশনের গুদামের পিছনেই দুর্ভাগাদের হত্যা করে ২০-২৫ জনকে একই তারে গ্রথিত করে নদীতে ফেলে দিত। যেদিন মৃত্যুর সংখ্যা বেশী হত সেদিন ডোমদের তলব করা হতো।

-দুজন ডোমের বর্ণনা-

রেলের ডোম ছুনুয়া ও গয়া প্রসাদ এই সংবাদাতাকে বলে যে, গভীর রাত্রে এসে পাকবাহিনীর লোক তাদের কোয়ার্টার থেকে ধরে নিয়ে যেত। ষ্টেশনের ওয়েটিং রুমে জিঃ আরঃ পিঃ হাজতে অথবা আক্কাস আলী হাইস্কুলে রক্তাক্ত মৃতের স্তুপ দেখিয়ে বলতো, ভাঙ্গি ইয়ে জলদি সাফ করো। মৃত দেহ বয়ে নদীতে ফেলতে হতো এবং ভোর না হতে উল্লেখিত নির্যাতন কক্ষের স্থান পরিষ্কার করে ফেলতে হতো। “কত আদমিকে যে এই লোক মেরেছে, কত মা বোহিনের ইজ্জত নষ্ট করেছে তা বলতে পারুম না বাবু’। আক্ষেপের সাথে বলে ছুনুয়া। অনেক সময় দু’এক কথা বলতে গিয়ে নরপশুদের হাতে ওরা মারও খেয়েছে বলে জানায়।