চার রাত্রির কাহিনী

Posted on Posted in 10
চার রাত্রির কাহিনী

 

কজন জানেন যে, আমাদের ৩১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ৪ দিন আটকা পরে শুধু বিস্কিট আর পানি খেয়ে বেঁচে ছিল? ৬ নং এইচ কিউ তে বসে সেক্টর কমান্ডার খাদেমুল বাশার সাহেব পর্যন্ত প্রায় ধরে নিয়েছিলেন তারা মারা গেছে।

 

সেই ‘দুঃখের চার রাত’ ছিল ৩ রা সেপ্টেম্বর থেকে ৭ ই সেপ্টেম্বরের রাত। এই রাতের শুরু হয়েছিল আরো আগে তিস্তার গা বেয়ে শঠিবাড়ি বন্দরের বুকে।

 

মুক্তিবাহিনীর পজিশন ছিল শঠিবাড়ির উত্তর ও পূর্ব দিকে। তাদের এক মাইল পেছনে তিস্তা নদী বয়ে চলেছে। তিস্তা নদীর অপর পারে পশ্চিম ও দক্ষিন দিকে এফ এফ কোম্পানি নং ৭ এর কমান্ডার হারেসউদ্দিন সরকার ৩৫০ জন এফ এফ নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছেন। হানাদার পাকিস্তানিদের ডিফেন্স হচ্ছে শঠিবাড়ি বন্দরের দক্ষিন ও পশ্চিম সাইডে। এক কোম্পানি ফোরস নিয়ে সিমেন্টের মজবুত বাঙ্কারে মেজর হায়াত শক্তিশালী ডিফেন্স নিয়ে দীর্ঘ ৬ মাস বসে আছে। তাদের সাথে আছে ই পি কাফ এর এক কোম্পানী রাজাকার ছিল শ তিনেক। তার ওপর এছনে ছিল আরটিলারি। হেভি মেশিনগান, ছয় ইঞ্চি মর্টার, এল এম জি ১ টা তিন ইঞ্চি মর্টার কিছু স্টেনগান আর বাকি সব থ্রি নট থ্রি।

 

সেক্টর কমান্দার খাদেমুল বাশার সাহেবের নিকট থেকে ৭ নং কোম্পানী কমান্ডার নির্দেশ পান শঠিবাড়ির হানাদারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য। প্রথম দিকে মুক্তিযোদ্ধারা ‘হিট এন্ড রান’ পদ্ধতি অনুসরন করে পুরা আগস্ট মাস। সেপ্টেম্বর মাসের ২ তারিখ পর্যন্ত তাদেরকে ব্যস্ত রাখে। ইতিমধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা গড়ে তোলে পাকা বাঙ্কার। শঠিবাড়ি বন্দরের পূর্ব ও উত্তর দিকে পাক হানাদারদের এক হাজার গজ দূরে এই সব বাঙ্কার তৈরী করে মুক্তিযোদ্ধারা মনোবল বাড়িয়ে তোলে। এবং এই সময় মুক্তিযোদ্ধা ও পাক হানাদাররা যার যার পজিশন থেকে গোলাগুলি বিনিময় করত।

 

সেপ্টেম্বরের ২ তারিখ। কম্পানী কমান্দার হারেসউদ্দিন সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদারদের ৬০০ গজ দূরত্বের মধ্যে চলে আসে। ২ রা সেপ্তেম্বর রাত ৩ টায় কমান্ডার নিচে এস এল আর নিয়ে হানাদার পজিশনে ফায়ার ওপেন করে দেন। শুরু হয় মরনযুদ্ধ। হারেসের ছেলেরা প্রতিজ্ঞা করে শথিবারি বন্দর দখল না করে তারা পিছু ফিরবে না।

 

শঠিবারি হাইস্কুলের ভেতরে নির্মিত দুর্ভেদ্য ঘাঁটি থেকে শেল বর্ষণ করে খান সেনারা। শুরু হল তুমুল যুদ্ধ। খান সৈন্যদের মুহুর্মুহু শেল ও রকেটের আঘাত এসে পরছে মুক্তিবাহিনীর ওপর। ভাংছে বাঙ্কার আহত হচ্ছে মুক্তিসেনা। ধরাধরি করে তাকে নিয়ে যাওয়া হছে পেছনে। সামনে এগুচ্ছে আরেকজন মুক্তিসেনানী, করছে আঘাত শত্রুর বাঙ্কারে, পজিশনে গোলাগুলি আর আর্তনাদে ভরে উঠল ডিমলা থানার শঠিবাড়ি বন্দর। সমান গতিতে যুদ্ধ চলছে। ঘন্তার পর ঘন্টা। কেউ এক ইঞ্চি পিছু হঠছে না। সমানে সয়ানে যুঝে যাচ্ছে একে অপরকে একদিকে কমান্ড করছেন হানাদার বাহিনীর দুর্ধর্ষ মেজর হায়াত অন্যদিকে শ্যামল বাংলার এক তরুন বীর হারেসউদ্দিন সরকার। এক বাহিনী ছুড়ছে কামানের গোলা, রকেট ও শেল। অন্য বাহিনী দু একটি এল এম জি আর থ্রি নট থ্রি দিয়ে তার জবাব দিচ্ছে।

 

ঘন্টার পর ঘন্টা হয়ে যাচ্ছে। ৪ তারিখ সকাল থেকে যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে গেল। হারেস উদ্দিন সরকার কয়েকজন সাহসী সাথীকে নিয়ে পর পর কয়েকটি সম্মুখের বাঙ্কার পার হয়ে এডভান্স করে গেল সম্মুখপানে। হানল এ এম জির নিখুঁত আঘাত হানাদার বাহিনীর মেইন পজিশন শঠিবাড়ি স্কুলের ভেতরের বাঙ্কারে। দুপুর ১২ টার দিকে চাঞ্চল্য দেখা গেল হানাদারদের বাঙ্কারে ও ডিফেন্স পজিশনে। দ্বিগুন শক্তিতে হারেসের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ছুটে যেতে লাগল সম্মুখপানে। সে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। শঠিবাড়ি বন্দর আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধাদের করায়ত্ব হবে। প্রতিটি বাঙ্কারের মুক্তিযোদ্ধারা বৃষ্টির ঝাঁকের মত গুলি ছুড়ছে। হানাদার বাহিনী তাদের ডিফেন্স লাইন ছেড়ে পিছনে হটে যাচ্ছে বীর হারেস, বীর তার বাহিনি বুকে থ্রি নত থ্রি চেপে ধরে সম্মুখপানে গড়িয়ে গড়িয়ে দখল করছে সামনের ভুমি। মরিয়া হয়ে টিপে যাচ্ছে থ্রি নট থ্রি ট্রিগার। জয় তারা ছিনিয়ে আনবেই। হানাদারকে পালাতে হবে শঠিবাড়ি থেকে। ট্রেন্ড পাকিস্তানী বাহিনি তাজ্জব বনে গেল। এক তরুন মুক্তিযোদ্ধার কমান্দে এগিয়ে আসছে থ্রি নত থ্রি হাতে বাঙালি তরুন বালক। অব্যর্থ গুলি ছুড়ছে তাদের বাঙ্কারে। ছেড়ে যেতে হচ্ছে তাদের ডিফেন্স পজিশন।

 

কোম্পানী কমান্ডার হারেসউদিন ঘোষনা করে দিল ৪ ঠা সেপ্টেম্বর সূর্য ডোবার আগেই শঠিবাড়ি বন্দর মুক্ত হয়ে যাবে। তিনশ মুক্তিযোদ্ধা দম ধরে গুলি চালিয়ে যাচ্ছে হানাদারদের প্রত্যেকটা বাঙ্কারে। শঠিবারি বন্দরের জয় অত্যাসন্ন। আক্রমনের মুখে আর দাঁড়াতে পারছে না হানাদারেরা। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই পতন হয়ে যাবে। মুক্তিযোদ্ধারা পতাকা তুলে জয় বাংলা বলে চিৎকার করছে। এমন সময় হানাদার এলো আকাশ পথে। ৪ ঠা সেপ্তেম্বরের শঠিবাড়ি বন্দরে যখন মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতা পতাকা উত্তোলনের জন্য উদ্যোগ নিচ্ছে পশ্চিম গগনে সূর্য যখন ঢলে পরেছে ঠিক তেমন সময় গর্জন করতে করতে এলো দুটি হেলিকপ্টার। হারেসউদ্দিন ও তার বাহিনীর বাঙ্কারের পজিশনে বৃষ্টির মত বোমা ফেলল তারা। আক্রোশে ক্ষোভে মুক্তিযোদ্ধারা এল এম জির ফায়ার করল। হেলিকপ্টার দুটো চলে গেল প্রায় ২০ মিনিট ধরে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন পজিশনে বোমা বর্ষণ করে। ডান পায়ে ডান হাতে এবং কপালে বোমার আঘাতে আহত হলেন সেই বীর তরুন যিনি ছিলেন সেই তিনশ মুক্তিযোদ্ধার বীর নায়ক। আহত হল আরো অনেকেই। এক নিমেষেই নিভে গেল সেই মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ের আশা। রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত আহতদের ব্যান্ডেজ ও ফার্স্ট এইড শুরু হল। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল ৬ নং এইচ কিউ এর সাথে সকল যোগাযোগ। খাবার ও অন্যান্য সামগ্রীর উপর বোমা পরায় সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেল যদিও অস্ত্র ও গোলাবারুদের তেমন কোন ক্ষতি হয়নি মুক্তিযোদ্ধাদের বাঙ্কার এবং ডিফেন্স থেকে গুলি বন্ধ হওয়ায় হানাদার বাহিনী শুরু করল নতুন উদ্যমে গুলি-গোলা বর্ষণ।

 

সেই অসহায় অবস্থায় ৪ ঠা সেপ্টেম্বর রাত্রে অনেক মুক্তিযোদ্ধা যখন হতাশ হয়ে পরেছিল তখন রক্তাপ্লুত কোম্পানী কমান্ডার চিৎকার করে বললেন “যুদ্ধ চলবে মৃত্যু পর্যন্ত, যুদ্ধ চলবে, কেউ এক ইঞ্চি পিছু হটবে না। কাউকে যদি পিছনে তাকাতে দেখি, এই আহত অবস্থায় তার উপর আমি গুলি চালাব। জন্মভূমির বুকে বীরের মত লড়ে প্রাণ দাও সবাই। হেডকোয়ার্টার থেকে আমরা তিনশ জন বিচ্ছিন্ন, বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। ধরে নাও আমরা সবাই মরে গেছি”। তিনি সবাইকে অনুরোধ করে বললেন “ মৃত্যুর আগে একবার শেষ লড়াই করে যাও”।

 

মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ ফিরে পেল। আবার ফিরে গেল বাঙ্কারে। হাতে তুলে নিল থ্রি নট থ্রি। এমনভাবে পার হয়ে গেল ৪ তারিখ রাত। ৫ তারিখ সারাদিন যুদ্ধ চলল সন্ধ্যায় দু পক্ষেই ফায়ার বন্ধ হল। সারারাত আহতদের সেবা শুশ্রুষা হল। ছয় তারিখ ভোরে হানাদার বাহিনি ছয় ইঞ্চি মর্টার ও রকেট লঞ্চার দিয়ে তুমুল আক্রমন শুরু করল।

 

একদিকে খাবার নেই। আড়াই দিন পার হয়ে যাচ্ছে। বিস্কুট এবং পানি খেয়ে বেঁচে আছে তিনশ মুক্তিযদ্ধা। শুধু ব্যান্ডেজ বেঁধে আহতরা পরে আছে বাঙ্কারে। সামনের দিক থেকে ছুটে আসছে কামানের গোলা মেশিনগানের গুলি। সবকিছু অনিশ্চিত। সব দিক দিয়ে বিচ্ছিন্ন। তবু মুক্তিযোদ্ধারা লড়াই চালিয়ে গেল। সঙ্কিছু অনিশ্চিত জেনেও দাঁত দাঁতে কামড়ে জীবন বাজি ধরে লড়ে গেল শঠিবাড়ি বন্দরে। ছয় তারিখ রাত আটটায় শঠিবাড়ির ডানদিকে মুক্তিযোদ্ধারা আকস্মিকভাবে তিনশ গজ ছুটে গিয়ে হানাদারদের কয়েকটি ডিফেন্স পজিশন দখল করে নেয়। এটা ছিল একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ। সেই ডিফেন্স লাইনে ছিল প্রায় দেড়শ রাজাকার। তারা অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। আহত কোম্পানী কমান্ডারের নির্দেশ মোতাবেক মুক্তিযোদ্ধাদের ফ্রন্ট লাইনে বসিয়ে হানাদারদের বিরুদ্ধে গুলি চালাবার আদেশ দেয়া হয়। ধৃত রাজাকাররা সে আদেশ পালন করে। এর ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বেড়ে যায়। চাঙ্গা হয়ে ওঠে তারা। ৬ ই সেপ্তেম্বর সারারাত গুলি আর পালটা গুলি চলতে থাকে। ৭ ই সেপ্টেম্বর ভোর বেলা পাকবাহিনী অবস্থান ত্যাগ করে নিলফামারির দিকে পালিয়ে যায়। ৭ ই সেপ্টেম্বর সকাল ৭ টা ২০ মিনিটে শঠিবাড়ি বন্দরের বুকে উড়ল মুক্তির পতাকা।

 

*দৈনিক ‘সংবাদ’- এর ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৮১ সংখ্যায় প্রকাশিত মুসা সাদিক রচিত প্রতিবেদন থেকে সংকলিত।