ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর বক্তৃতা

Posted on Posted in 4

<৪,২২২,৪৯০-৪৯২>

অনুবাদকঃ আইনুল ইসলাম বিশাল

শিরোনামসূত্রতারিখ
২২২। ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর বক্তৃতাছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের দলিলপত্র১৭ জুন, ১৯৭১

 

 

                         ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদ

                             বাংলাদেশ

                                                         ৪২ বলাকা ভবন

                                                                 ঢাকা

বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে দুঃখিনী মায়ের দুরন্ত নির্ভীক ছেলেরা আজ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন, শ্ত্রুর রক্তেস্নাত হয়ে বাংলাকে শত্রুমুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয়বোধে উদ্বুদ্ধ মুক্তি্যোদ্ধা ভাইয়েরা আমার, আপনারা আমার সংগ্রামী অভিনন্দন গ্রহন করুন।আজ হতে তিন মাস আগে রাতের অন্ধকারে অতর্কিতে পশ্চিমা গৃধিনীর দল ধ্বংসের উন্মত্ততায় পাগল হয়ে যখন আমার বাংলার নিরীহ নিরস্ত শান্তিপ্রিয় মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, নারীর করুন আর্তনাদে বাংলার মাটি যখন ডুকরে কেঁদে উঠেছিল, তখন সংগ্রামী ভাইয়েরা আমার, আপনারা প্রতিহিংসার অগ্নিশিখা হাতে নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন, মৃত্যুর নিশ্চিত সম্ভাবনা জেনেও আপনারা দুঃখিনী মায়ের ডাকে সেদিন পাগলের মতো ছুটে আসতে পেরেছিলেন বলেই আজ বাংলার মাটিকে শত্রুর কবলমুক্ত করার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ।গর্বে আমার বুক ভরে ওঠে । স্বাধীনতার এই সংগ্রামে আপনাদের আত্নত্যাগের কথা যখন আমি ভাবি, আর্তের বেদনার মাঝেও সম্ভাবনার বাণী আমাকে উজ্জীবিত করে। বাংলার ছেলেরা স্বাধীনতার প্রশ্নে আপোস নাই, আত্মত্যাগের প্রশ্নে পিছু হটে নাই, নির্যাতনের কাছে মাথা নিচু করে নাই, অত্যাচারীদের ক্ষমা করতে শেখে নাই। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, আমরা মুজিব ভাইকে কথা দিয়েছিলাম ছয়-দফাকে অস্বীকার করা হলে বাংলার শ্যামল মাটিতে রক্ত ঢেলে স্বাধীনতার জয়গান আমরা লিখে দেব।বাংলার বিভিন্ন রনাজ্ঞনের কথা আমি যখন ভাবি তখন আমার বারবার মনে পড়ে মুজিব ভাই, তুমি এসে দেখে যা, তোমার বাংলার ছেলেরা কি অপূর্ব রণসাজে আজ প্রস্তুত হয়েছে। আমার মনে হয় বরকতকে ডাক দিয়ে বলি, ভাই বরকত, জীবনের ওপার হতে তুমি চেয়ে দেখো, তোমার রক্ত আমাদের বুকে কি প্রতিহিংসার আগুন জ্বালিয়েছে। ভাই মনুমিয়া, বুলেট হাতে তোমার সাথীদের আজ তুমি দেখ। তোমার সাথী-সঙ্গীদের হৃদয়ে আজ প্রতিহিংসার প্রচন্ড উন্মত্ততা। সংগ্রামী ভাইয়েরা আমার, মাতৃত্বের ঋণ শোধ করার তাগিদ আজ প্রাণের চেয়ে বড়। তাই জীবণ দিয়ে আমাদের জীবনের সম্ভার সাজাতে হবে। মৃত্যুকে যারা ভয় করে,… ভ্রুকুটি দেখে যারা থমকে দাঁড়ায়, মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ার কব্জায় যাদের জোর নেই, রক্তের বদলে রক্ত নেওয়ার উন্মাদনায় যাদের অভাব-এ তাদের নয়। এ পথ তাদের যারা প্রতিহিংসার আগুনে আজ জ্বলছে, এ পথ তাদের যারা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে শিখেছে, এ পথ তাদের যারা বুকের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার অক্ষর লিখতে পারে। সংগ্রামী বন্ধুরা আমার-এ পথ তাই তোমাদের। শত অভাব-অভিযোগ, অনটনের  প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে তোমাদের এই যুদ্ধ আজ এই কথায় প্রমাণ করে এ যুদ্ধে বিজয়ের মালা তোমরা ছিনিয়ে আনবে। আজ আমাদের শপথ-রক্তে আনো লাল, রাত্রির বৃন্ত হতে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল।

সংগ্রামী ভাইয়েরা আমার, পশ্চিমা শ্ত্রুসেনারা পাশবিকতার জঘন্য প্রবৃত্তিতে উন্মত্ত হয়ে ধ্বংসের যে তান্ডবলীলা চালিয়েছে,তা বর্ণনা করতে আমি পারব না। গতবারেও তা বলেছি। গর্ভবতী মায়ের পেট চিরে তার গর্ভজাত সন্তানকে তারা বের করেছে, কারণ আমাদের উত্তরসূরীদের তারা নির্মমভাবে নিঃশেষ করে দিতে চায়।      

মায়ের কোল থেকে শিশুকে টেনে কেড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে তারা হত্যা করেছে। বাপের সামনে ছেলেকে খুন করে মরা ছেলের লাশ বাপকে টানতে বাধ্য করেছে। স্বামীর কোল থেকে সতী- সাধ্বী স্ত্রীকে ছিনিয়ে নিয়ে তার উপর পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছে। যে মায়ের গর্ভে আমার জন্ম, যে মায়ের স্তন পান করে আমার বয়ঃ বৃদ্ধি, যে মায়ের বুকভরা স্নেহ আমার মনের সম্ভাবনার আলো জ্বালিয়েছে, যে মা আমার গাল ধরে চুমু খেয়েছে- আজ আমাদের চোখের সামনে সে মায়ের সতীত্ব ভুলুন্ঠিত হয়েছে। মায়ের মাতৃত্ব, বোনের সতীত্বের মর্যাদা পশুরা দেয় নাই। একটি ঘটনা তোমাদের বলতে চাই- যশোরের এক ক্যাম্পে এক মা পাগলিনির মত আর্তনাদ করছিল। তার সমস্ত শরীর, সমস্ত কাপড়ের আঁচল রক্তে ভেজা। মায়ের কাছ যখন গিয়ে শুধালাম, মাগো, তোমার কি হয়েছে- আমার মা তখন আঁচল সরালো। দেখি তার কোলে মাস তিনেকের একটি শিশুর লাশ বয়নেটের আঘাতে আঘাতে তার বুক ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে। রক্তে রক্তে তার সমস্ত শরীর লাল হয়ে গেছে। আমরা মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারি নাই। মা আমার ডুকরে কেঁদে উঠে বললো,” আমার তিনমাসের ছেলে তো কোন অপরাধ করে নাই, আমার দুধের বাচ্চা মাসুম কোন অন্যায় করে নাই- কেন তার এই অবস্থা হলো? কেনো আমার চোখের সামনে বিনা অপরাধে এই নির্মমতার শিকার হতে হলো?” আমার দুঃখিনী মা, আমার সন্তান হারা জননী, আমার শোকার্ত জন্মদাত্রী, আমার গর্ভধারিণী ডুকরে কেঁদে উঠে বললো,” আমি তোমাদের কাছে বিচার চাই, আমার সন্তান হত্যার প্রতিশোধ চাই।” সংগ্রামী ভাইয়েরা আমার, মায়ের কোলে শায়িত ঐ কচি ভাইয়ের লাশ ছুয়ে মায়ের কাছে শপথ করেছ, বাংলাদেশের একটি তরুণ যদি বেঁচে থাকে, বাংলাদেশে একটি মুক্তিফৌজ যদি বেঁচে থাকে, দুঃখিনী মায়ের স্তনপান যদি আমরা করে থাকি তবে এর প্রতিশোধ আমরা নেবই। মা, মাগো আমার, ওদেরকে আমরা ক্ষমা করি নাই তুমি বিশ্বাস কর, ওদের রক্তস্নাত না করা পর্যন্ত তোমার ছেলেরা ঘরে ফিরবে না। ওদের নির্মূল না করা পর্যন্ত বুলেট আমরা ছুড়বো। জীবন দিয়ে হলেও ওদের আমরা নির্মূল করবোই।

সংগ্রামী ভাইয়েরা আমার, যে ঘর আমাদের গপুড়ে গেছে, সৃষ্টির আবীর মাখিয়ে সে ঘর আবার আমরা বাঁধব। যে গ্রাম পুড়ে গেছে- সে গ্রাম আবার গড়ে উঠবে। যে ফসল পুড়ে গেছে- মাটির বুক চিরে সে ফসল আবার আমরা ফলাবো। যে বিশ্ব বিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ, ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে,আমার বিশ্বাস, বিদ্যার্থীদের কলগুঞ্জনে আবার সে বিশ্ববিদ্যালয় মুখরিত হয়ে উঠবে। কিন্তু যে মা তার তিন মাসের ছেলেকে বিনা অপরাধে হারিয়েছে, শত্রুর রক্তে হাত না রাঙালে সে মায়ের কোন সান্ত্বনা নাই। যে মা তার সতীত্ব হারিয়েছেন শ্ত্রুকে নিপাত করার আগে সন্তানের দাবী নিয়ে তার সম্মুখে দাঁড়াতে পারব না। যে বোন সতীত্ব হারানোর বেদনায় আজ গুমরে গুমরে কাদছে, পাকিস্তানী শ্ত্রুদের হত্যা করার পূর্বে সে বোনের সম্মুখে যাবার কোন অধিকার আমাদের নাই।

সংগ্রামী ভাইয়েরা আমার, মাতৃত্বের ঋণ পরিশোধের জন্যে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।আমি জানি এই যুদ্ধে মুক্তিফৌজরাই লড়ছেন না, যে কৃষক গ্রীষ্মের খর রোদে দাঁড়িয়ে হালচাষ করতো তারাও আজ এই মুক্তিযুদ্ধের অংশীদার।যে শ্রমিক কারখানায় কাজ করতো, এ যুদ্ধের অনুপ্রেরক আজ তারাও। যারা দিনান্তে অফিস করতো,তারাও এ যুদ্ধের শরীক। যে জ্ঞানতাপস জ্ঞানের নিকুঞ্জে নতুন নতুন সম্ভাবনার ফুল ফুটাতো, সে শিক্ষকও আজ মুক্তিযুদ্ধের বীর সৈনিক। তাই ওদের মারণাস্ত্র থাকতে পারে, আমাদের হিমাচলের মতো অটল জনতা রয়েছে। ওদের কামান থাকতে পারে- কিন্তু আমাদের ঈমান হিমাচলের মতো অটল। ওরা লড়ছে লোভের উদগ্র নেশায় বুঁদ হয়ে- আমরা লড়ছি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে। তাই বিজয় আমাদের অনিবার্য। সাফল্য আমাদের সুনিশ্চিত। রণাঙ্গনের ফলাফল সে কথায় তো প্রমাণ করে। পঁচিশ জনার কাছে তিন’শ জন মার খেয়ে হটে যাবে কেনো? এত মারণাস্ত্রের দাম্ভিকতা থাকা সত্ত্বেও শত্রু সেনারা ২৫ হাজার সৈন্য হারাচ্ছে কেনো- একথা বিশ্ববাসী আজ জানে।

সংগ্রামী ভাইয়েরা আমার, এবার রূপসী বাংলা গণ- সমুদ্রের ফেনিল চূড়ায় পরিণত হয়েছে। বিসুভিয়াসের মতো জ্বলে উঠেছে- তাই তো গর্বে আজ আমাদের বুক ভরে ওঠে। এতো হুমকির কাছেও যে মানুষ মাথা নত করে নাই, যে মানুষ ট্যাক্স দেয় নাই, যে মানুষ অফিসে যায় নাই, যাদের ঐক্য চির ধরে নাই- বিজয় তাদের সুনিশ্চিত, একথা আমি হলফ করে বলতে পারি।

সম্প্রতিকালে মিথ্যার বেসাতী করা যার অভ্যাস, সেই পাকিস্তান বেতারকেন্দ্র হতে বিশ্বাসঘাতক বেঈমান এহিয়া একটি বক্তৃতা করেছেন। তার দৃষ্টতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে, যুদ্ধে মার খেয়ে আজ রক্তপিপাসু শোষক বেসামাল হয়ে গেছে। নইলে আমরা বুঝতে পারি না, বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে মন্তব্য করার দুঃসাহস এহিয়া পেলো কোথা হতে? এহিয়ার জানা উচিত, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম গ্ণ- প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এহিয়ার জানা উচিত, দশ লক্ষ মানুষের লাশের তলায় পাকিস্তানের অস্তিত্ব শেষ হয়ে গেছে। পাকিস্তান আজ একটা মৃত লাশ ছাড়া কিছুই নয়। হানাদারের একথা বোঝা উচিত বাংলাদেশ সম্পর্কে কোন মন্তব্য করার অধিকার তার নাই। বাংলাদেশের মানুষ তার মন্তব্যকে বরদাস্ত করতে আজ প্রস্তুত নয়। বিশবাসঘাতক, বেঈমান, নির্লজ্জ- উপনির্বাচনের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু তার জানা উচিত, বাংলাদেশ থেকে উপনির্বাচনে দাঁড়ানোর চেষ্টা কোন দালাল যদি করে- তবে তার শিকড় সমেত উপড়ে ফেলতে মুক্তিবাহিনী জানে। বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের- এই সত্যকে এহিয়া যদি ভুলতে চাও, বুলেটের তীব্র আঘাতেই ভুল আমরা ভাঙব।

হিংসার উন্মত্ততায় দানবিক ইচ্ছাকে চরিতার্থ করার হীনমন্যতায় শোষণের নেশায় বুঁদ হয়ে এহিয়া খান বাংলার উপর আক্রমণ চালিয়েছিল। শোষক ভেবেছিল দশ লক্ষ মানুষকে খুন করলেই হয়তো বাংলার গণ- আন্দোলন থেমে যাবে। শেখ মুজিবকে বন্দী করলেই স্বাধীনতার কথা বাঙালীরা ভুলে যাবে। পঞ্চাশ লক্ষ লোককে বাংলাদেশ থেকে তাড়িয়ে দিলেই বাংলার গণ- আন্দোলন মোড় হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু এহিয়া, তুমি বাংলাকে চেনো নাই। বাংলাদেশে শুধু গোলাপ, চামেলী, বকুল ফোটে না- এবার দেখো, সেখানে লাল টকটকে রক্তপলাশ ফুটেছে। চব্বিশ বছরের সন্তান হারিয়ে মায়েরা শুধু কাঁদতো, এবার দেখো টাড়া আপন সন্তানের বুকের রক্তে স্বাধীনতার অর্ঘ্য দিতে শিখেছে। বাংলার বুকে শুধু বসন্তের হিল্লোলই বইতো- এবার দেখো সেখানে কালবৈশাখী কুজঝটিকার ঝড় উঠেছে। তোমাদের কাছে আমরা বার বার মার খেয়েছি- এবার দেখো প্রত্যাঘাত হানতে আমরা শিখেছি। তোমাদের ঔদ্ধত্যের জওয়াব আমরা রণাঙ্গনেই দেবো।

সংগ্রামী ভাইয়েরা আমার, আবার আমি বলতে চাই- আপনাদের অসুবিধা অনেক। বাংলাদেশ রাষ্ট্রপ্রধানের চেষ্টার অভাব না থাকা সত্ত্বেও, প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার অভাব না থাকা সত্ত্বেও, আপনাদের প্রয়োজন মেটাতে তারা পারেন না। কিন্তু এবার আমি বলতে চাই, আজ নেওয়ার দিন নয়- আজ বুকের রক্ত উজাড় করে দিতে হবে। বন্ধুরা আমার, কান পেতে শোন, শহীদের আত্মারা আজও হাতছানি দিয়ে ডাক দেয়। চোখ মেলে চেয়ে দেখো, মায়ের চোখের অশ্রু আজও শুকায় নাই, বোনের দীর্ঘশ্বাসে বাংলার মাটি আজও বিষিয়ে আছে। তাই বন্ধুরা আমার, এগিয়ে চলো, আঘাত হানো, তোমাদের আঘাতে আঘাতে তাদের ক্ষতবিক্ষত করে ফেলো। তোমাদের আত্মত্যাগে বাংলার দিগন্তে স্বাধীনতার সূর্য আলো বিচ্ছুরিত করে তুলুক, মায়ের ঋণ তোমরা পরিশোধ করো।……