জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন

Posted on Posted in 2

<2.126.553-555>

শিরোনামসূত্রতারিখ
জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহবান জানিয়ে পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নপূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন২ অক্টোবর, ১৯৭০

 

।। মেহনতি জনতার সাথে একাত্ম হও ।।

২রা অক্টোবরের গণসমাবেশে উপস্থিত কৃষকশ্রমিক মেহনতি জনতার প্রতি পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন

 

সংগ্রামী বন্ধুগন,

          কৃষক সমিতির সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ডাকা আপনারা গ্রাম-বাংলার অগণিত ভুখা-নাঙ্গা কৃষক, শহরের বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষ ও সমাজের অন্যান্য নিপীড়িত নিগৃহীত জনতা আজ আজ রাজধানী ঢাকা শহরের এই সমাবেশে ও গন মিছিলে যোগ দিয়াছেন। আপনাদের জীবন আজ যে সর্বগ্রাসী সংকট অনাহার, ক্ষুধা, মৃত্যু, ও জ্বরার মত যা নির্মম অভিশাপ, ট্যাক্স, খাজনা, ঋণ ও সুদের যে দুর্বিসহ বোঝা, জোতদার, মহাজন-মালিক শ্রেণীর যে নিষ্ঠুর শোষণ, সাম্বাৎসরিক বন্যার যে ভয়াবহ তাণ্ডবলীলা, সর্বোপরি পূর্ব বাংলার মানুষের উপর যে নিষ্ঠুর জাতিগত নিপীড়ন, তাহা আজ আপনাদের করিয়া তুলিয়াছে বিদ্রোহী ও মুক্তিপাগল। আর তখন যখন যেখানেই কোন সংগ্রামের প্রতিশ্রুতি আপনারা শুনতে পান, সংগ্রামের বলিষ্ঠ প্রত্যয় ও মুক্তির দুর্বার আকাঙ্খা লইয়া সেখানেই আপনারা যোগদান করেন। আজও আপনারা ঢাকা মহানগরীর এই সমাবেশে হাজির হইয়াছেন আপনাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ও শোষণ মুক্তির বুকভরা আশা লইয়া। আপনাদের সংগ্রামী চেতনার প্রতি পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ হইতে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। আপনারা আমাদের অভিনন্দন গ্রহন করুন।

 

          আপনাদের জীবনে এই যে সংকট, ইহার মূল কারন কি? সাম্রাজ্যবাদ বিশেষ কর‍্যা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সামন্ত বাদ ও আমলা মুৎসুদ্দি পূঁজির প্রতিভু পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত এককেন্দ্রিক স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীই আজ সারাদেশের মানুষের দুঃখ, দুর্দশা, অভাব-অনটন, বুভুক্ষা ও মৃত্যুর জয়ন দায়ী। পাকিস্তানের জন্মের প্রথম দিনটি হইতে এই শাসকগোষ্ঠী দেশের মোট জনসমষ্টির শতকরা ৮০ জন কৃষকের উপর চালাইয়া যাইতেছে নির্মম শোষণ আর নির্যাতন। সামন্তবাদী ভূমি ব্যবস্থার দরুণ কৃষক তার সর্বস্ব খোয়াইয়া দিনের পর দিন পথের ভিখারীতে পরিণত হইতেছে। বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে তার বহুকষ্টে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য হইতে যে বঞ্চিত। পানির দামে শ্রমিকের শ্রমশক্তি কিনিয়া লইয়া উহার উপর গড়িয়া তুলিয়াছে মুনাফার পাহাড়। অপরদিকে এই দুই দেশীয় শোষকের সহযোগিতায় সাম্রাজ্যবাদ বিশেষ করিয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অসম বাণিজ্যিক চুক্তি ও কঠোর শর্তযুক্ত ঋণ ও বৈদেশিক সাহায্যের বেড়াজালে সারাদেশকে আবদ্ধ করিয়া সারাদেশের অর্থনৈতিক চাবিকাঠি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে লইয়া গিয়াছে। ইহাদেরই স্বার্থে আজ পূর্ব বাংলার কৃষকের জীবনের সবচাইতে বড় অভিশাপ বন্যা সমস্যার কোন সমাধান হইতেছে না। ফলে আমাদের দেশ আজ চিরন্তন খাদ্য ঘাটতির আবাসভূমিতে পরিণত হইয়াছে। পরিণত হইয়াছে তাহাদের উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য রপ্তানীর বাজারে। অন্যদিকে তাহাদের বিশ্বব্যাপী আগ্রাসী যুদ্ধনীতিকে বাস্তবায়িত করার জন্য পূর্ব বাংলাকে কেন্দ্র করিয়া একটির পর একটি ষড়যন্ত্র করিয়া চলিতেছে। তাহাদের এই ষড়যন্ত্রের নতুন সহযোগী হইয়াছে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ। সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল ও তাহার সহযোগী এদেশের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার বুকের উপর যে আধা-উপনিবেশিক, আধা-সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার জোয়াল চাপাইয়া রাখিয়াছে তাহাই জন্ম দিয়াছে আজকের দিনের এই মহাসংকট। 

 

 

সমাজ জীবনের এই মহাসংকটই পূর্ব বাংলাকে আজ অগ্নিগর্ভ করিয়া তুলিয়াছে- যাহার স্বার্থক বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছিলো ১৯৬৮-৬৯ সালের প্রচণ্ড গণঅভ্যুথ্থানে। আর এই গণঅভ্যুথ্থান সমগ্র আন্দোলনকে উন্নীত করিয়াছে এক নতুন বিপ্লব স্তরে। যেখানে মানুষ শান্তিপূর্ণ পথের সকল মোহকে ত্যাগ করিয়া তুলিয়াছে বিপ্লবী শক্তি প্রয়োগের পতাকাকে। জনতার আক্রমণে পর্যদস্ত শাসকগোষ্ঠী সেদিন মরিয়া হইয়া শেষ অস্ত্র নিক্ষেপ করে। চাপাইয়া দেয় দেয় সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর। কিন্ত গণ-আন্দোলনের তীব্রতা ব্যাহত হইলেও বিপ্লবী অবস্থা আজো বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয় নাই। জনতার বিপ্লবী মেজাজ আজো বিদ্যমান। আজো এই দেশের বীর জনতা সংগ্রামের উত্তাল তরঙ্গাঘাতে শাসকগোষ্ঠীকে প্রতি মুহূর্তে নাস্তানুবাদ বানাইয়া ছাড়িতেছে। এই সেদিনও খুলনা জেলার বালি ও সিমেন্ট জেলার হাওর করাইয়ের বিপ্লবী কৃষক-জনতা জোতদার মহাজনের বিরুদ্ধে যে মহান লড়াইয়ের নজির স্থাপন করিয়াছে। খুলনা ও ঢাকার শ্যামপুর-পোস্তগোলায় শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বীর শ্রমিক শ্রেণি যে দুধর্ষ আক্রমণ চালাইয়াছে, নিজের রক্ত ও শত্রুর রক্তে তাহারা যেভাবে অবগাহন করিয়াছে, তাহাতে জনতার বিপ্লবী চেতনা নির্ভুলভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। দিকে দিকে আজ তাহারা প্রজ্জ্বোলিত করিয়াছে প্রতিরোধ আর প্রতি আক্রমণের বহ্নিশিখা। শুরু করিয়াছে শ্রেণি সংঘর্ষের সশস্ত্র বিপ্লবী প্রক্রিয়া। জনযুদ্ধের মহান পথে শোষক শ্রেণির  বলপূর্বক উচ্ছেদে যাহার মহান পরিসমাপ্তি।

ভীতসন্ত্রস্ত্ত শাসকগোষ্ঠীও আজ তাই কেবল পাশবিক নিপীড়ন যথেষ্ঠ নয় বুঝিয়া, পাশাপাশি তুলিয়া ধরিয়াছে ঝুটা নির্বাচনের টোপ। ভোট ও মন্ত্রীত্বের লড়াইয়ের মধ্যে নিক্ষেপ করিয়া শ্রমিক-কৃষক, মেহনতী জনতার বিপ্লবী চেতনাকে ভোঁতা করিয়া দেওয়া ও আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করিয়া শোষণের ইমারতকে রক্ষা করাই তাহাদের আসল উদ্দেশ্য আর শাসক শ্রেণির এই নির্বাচনী ষড়যন্ত্রে শামিল হইয়াছে জনতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা শোষক শ্রেণির রঙ-বেরঙের দালালরা- তথাকথিত “জনদরদী” রাজনৈতিক দলসমূহ ও তাহাদের নেতৃবিন্দু। বাঙালি জাতীয়তা, শ্রমিক কৃষকের মুক্তি, এমনকি “বিপ্লবী” বলির আড়ালে জনতাকে তাহারা ক্ষমতা ভাগাভাগির বাহন হিশেবে ব্যবহার করিতে চাহিতেছে।

বন্ধুগণ, আজ এমন একটি রাজনৈতিক পটভূমিতে আপনারা উপস্থিত হইয়াছেন- আপনাদের দাবী আদায়ের এবং শঅষণ হইতে মুক্তি পাইবার অনেক আশা বুকে লইয়া। কিন্ত আজ বুঝিতে হইবে সত্যিকার মুক্তির পথ কোনটি এবং দাবি পূরণ হইবে কোন পথে। ভোটের মাধ্যমে? জনসভার মাধ্যমে? শহরে আসিয়া এমন শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মিছিল করিয়া? স্মারকলিপি প্রদান বা শাসকগোষ্ঠির কাছে দেন-দরবার করিয়া তাহাদের করুণা দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া? না। এই পথ ধসে পড়া শোষণের ইমারতকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে না, তাহার উপর সংস্কারের প্রলেপ লাগাইয়া নতুন মোহই সৃষ্টি করলে কেবল। আজ একটি মাত্র পথই খোলা আছে। সেই পথ সশস্ত্র বিপ্লবের পথ। শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক, মেহনতী জনতার বিপ্লবী লড়াইয়ের পথ। আর এই লড়াই শুরু হইবে গ্রামে কৃষকের মুক্তির পতাকাকে দৃঢ়ভাবে আকড়াইয়া ধরিয়া। শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে গ্রাম এলাকায় কৃষকের শ্রেণি সংগ্রামকে বিপ্লবী জন-যুদ্ধে পরিণত করিয়া, সেখানে কৃষকের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করিয়া, সশস্ত্র ঘাটি এলাকা তৈরী করিয়া শহরসমূহ অবরোধ এবং সর্বশেষ সারা পূর্ব বাংলার বুক হইতে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজির এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা উচ্ছেদ করিয়া জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের মাধ্যমেই আসিবে পূর্ব বাংলার শ্রমিক-কৃষক মেহনতী জনতার মুক্তি। আর কৃষি বিপ্লবের এই প্রক্রিয়াকে সম্পন্ন করিবার জন্য তাহারই পাশাপাশি শহরে গড়িয়া তুলিতে হইবে শ্রমিক-ছাত্র-মেহনতী জনতার বিপ্লবী গণঅভ্যুথ্থান- আঘাতের পর আঘাতের মাধ্যমে যাহা শত্রুশক্তিকে ব্যতিব্যস্ত রাখিবে, বিপর্যস্ত্ত করিবে।

সমবেত কৃষক-শ্রমিক-জনতা, পূর্ব বাংলার বুক হইতে শোষণ অবসানের এই বিপ্লবী পথে আগাইয়া আসিবার জন্য আপনাদের আমরা আহবান জানাই। শান্তিপূর্ণ পথ, নিয়মতান্ত্রিকতার নির্জীব পথকে পরিহার করিয়া সশস্ত্র সংগ্রামের পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরুন। শাসকগোষ্ঠী ও সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের নির্বাচনী ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করিয়া গ্রাম বাংলায় গড়িয়া তুলুন তীব্র শ্রেণি সংগ্রাম, সৃষ্টি করুন সশস্ত্র সংঘর্ষেও শত শত অগ্নিকণা, যাহা অতি দ্রুত রূপান্তরিত হইবে দেশজোড়া এক প্রচণ্ড দাবানলে। সমূলে উৎখাত করিবে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও বৃহৎ পুঁজির এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা- পূর্ব বাংলার বুকে প্রতিষ্ঠিত করবে শোষণহীন এক নতুন রাষ্ট্র- জনতার রাষ্ট্র, জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজের পক্ষ হইতে আমরা এক বজ্রকঠোর শপথ গ্রহণ করিতেছি যে, পূর্ব বাংলার অত্যাসন্ন বিপ্লবের ইতিহাস আমাদের উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করিয়াছে, বুকের তাজা রুধির ঢালিয়া দিয়া আমরা সেই সেই দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে পালন করিবো। সমাজ পরিবর্তনের এই মহান সংগ্রামে পূর্ব বাংলার শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র মেহনতী জনতার এই মিলিত অভিযান জয়যুক্ত হবেই।

 

পূর্ব বাংলার বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন