জনগণের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশাবলী

Posted on Posted in 3
                  শিরোনাম                     সূত্র                    তারিখ
জনগণের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের           নির্দেশাবলী  বাংলাদেশ সরকার, প্রচার দপ্তর            ১৪ এপ্রিল, ১৯৭১

 

আল্লাহু আকবর

স্বাধীন বাংলার সংগ্রামী জনগণের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের

নির্দেশাবলী

 

দেশবাসী ভাইবোনেরা,

 

     হানাদার পাকিস্তানী পশুশক্তিকে বাংলাদেশের পবিত্র মাটি থেকে হটিয়ে দেবার ও বাঙ্গালীকে শোষণমুক্ত করে একটি নতুন সুখী-সমৃদ্ধ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলবার দীপ্ত শপথ ও ব্রত নিয়ে বাঙ্গালীর প্রানপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ও নেতৃত্বে গত ১২ই এপ্রিল রাত্রে বাংলাদেশ বেতার থেকে বাংলাদেশ সরকার ঘোষনা করা হয়েছে। এই ঘোষনা পর থেকে মুক্তি সংগ্রাম ঠিক পূর্বের মতই এক সুস্পষ্ট গতিতে চলছে। প্রতিটি বাঙ্গালী আজ নিজ নিজ ঘরে প্রতিরোধের গূর্গ গড়ে তুলে সংকল্পকে দৃঢ় থেকে আরও দৃঢ়তর করে তুলছে। মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্বাসঘাতক জঙ্গী পশু সরকারকে বিনাশ করে বিশ্বের দরবারের আজ মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছে বলে-বাঙ্গালীর যুদ্ধ আজ আরও তীব্রতর; বিশ্বাস আজ অটুট; প্রতিটি বাঙ্গালী আজ সংগ্রাম থেকে অবিচ্ছিন্ন।

 

     বাঙ্গালীর আশা-আকাঙ্কার প্রতিফলনে এ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হয়েছে স্বাধীন বাংলার মহানায়ক বাঙ্গালীর প্রিয় বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর তাঁর সহকারী রয়েছেন ত্যাগী ও শ্রদ্ধেয় নেতৃবৃন্দ।

 

      সৈয়দ নজরুল ইসলাম,উপ-রাষ্ট্রপতি পদে নর্বাচিত। জনাব তাজউদ্দিন আহমদ প্রাধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করবেন এবং দেশরক্ষা দপ্তরের দায়িত্বও অতিরিক্তভাবে তাঁর উপর ন্যস্ত। খোন্দকার মোশতাক আহমদ পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত। স্বাধীন বাংলা সরকারের মন্ত্রী পরিষদে আর যারা রয়েছেন তাঁরা হলেন জনাব মনসুর আলী, জনাব এ, এইচ, এম, কামরুজ্জামান।

 

     জনযুদ্ধের আশু সাফল্য অর্জনের উদ্দেশ্যে সরকারের সম্প্রতি কতগুলো নির্দেশাবলী জারী করেছেন।

 

     পাকিস্তানী শোষকগোষ্ঠী ও তাদের ভাড়াটিয়া হানাদার সৈন্যবাহিনী আজ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি লোকের উপর নগ্ন, পৈশাচিক বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বাঙ্গালীর অপরাধ তারা তারা অবিচারের অবসান চেয়েছে, বাঙ্গালীর অপরাধ তারা তাদের মা-বাপ, ভাইবোন, সন্তান-সন্ততিদের জন্যে অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসার দাবী জানিয়েছে, বাঙ্গালীর  তারা মানুষের মর্যদা নিয়ে মাথা তুলে বাঁচতে চেয়েছে। বাঙ্গালীর অপরাধ আল্লাহতালার সৃষ্ট এ পৃথিবীতে, আল্লাহর নির্দেশমত সম্মানের সাথে শান্তিতে সুখে বাস করতে চেয়েছে। বাঙ্গালীর অপরাধ মহান স্রষ্টার নির্দেশমত অন্যায়, অবিচার, শোষন ও নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে এক সুন্দর ও সুখী সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলবার সংকল্প ঘোষনাকরেছে।

 

মানবতার বিরুদ্ধে হানাদার বাহিনী দানবীয়ে শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাদের সহায় আধুনিক মারণাস্ত্র আর আমাদের সহায় পর করুণাময় সর্বশক্তমান আল্লাহতালার সাহায্য, বাংলাদেশের জনসাধারনের অটুট মনোবল, মুক্তিলাভের দৃঢ় সংকল্প, শত্রুসংহারের অবিচল প্রতিজ্ঞা। 

বাংলাদেশের এ সংগ্রামে দল, মত, শ্রেনী ধর্ম নেই। বাংলার মাটি, পানি, আলো, বাতাসে লালিতপালিত মানুষের আজ একমাত্র পরিচয় আমরা বাঙ্গালী। তাই বাংলার ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-শ্রমিক, ধনিক-বণিক, নারী-পুরুষ সকলকেই মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে সহায়তা করতে হবে, মুক্তি সৈনিকের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। বাংলার মাটি থেকে শত্রুকে উৎখাত করার জন্যে প্রত্যেককেই এগিয়ে যেতে হবে।

 

নির্দেশাবলী

 

     ১। প্রতি শহর/গ্রাম/মহল্লায় এক-একজন অধিনায়ক নির্বাচিত করে সমাজ জীবনে শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে; আরও ঐক্যবন্ধ শক্তিতে শত্রুর সাথে অসহযোগ প্রতিরোধ সংঘাতের দুর্বার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।

     ২। নিজ নিজ এলাকার খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির চাহিদার হিসাব রাখতে হবে আর চাহিদা মেটবার জন্যে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়াবার আর সংগ্রহ করবার চেষ্টা করতে হবে।

     ৩। কালোবাজারি, মুনাফাখোরি, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। আদেশ অমান্য করলে শাস্তিদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

     ৪। দৈনন্দিন জীবনের সংযম ও কৃচ্ছ্রতা চালিয়ে যেতে হবে। সর্বপ্রকার বিলাসিতা ত্যাগ করে জাতির বৃহত্তর কল্যাণে পারস্পরিক মমত্ববোধ ভ্রাতৃত্বের হাতকে দৃঢ়তর করতে হবে। আত্মশক্তির উপর বিশ্বাস রেখে আত্মনির্ভিরশীল বলিষ্ঠ সয়ামজ গড়ে তুলতে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

     ৫। শ্ত্রুকে চিনতে হবে। অবাঙ্গালী সামরিক বেসামরিক শত্রু তো আছেই। তারা কবেশী চিহ্নিত। মারাত্মক হলো ঘরের শত্রু। ধর্মের দোহাই দিয়ে, অখন্ডতার বুলি আওড়িয়ে কালোবাজারি মজুতদারীর বেশে শত্রুর চর সরলপ্রাণ বাঙ্গালীর আশপাশে ঘুরে বেড়ায়। এরা দোস্ত হিসেবে মনে ঠাই পেতে চায়। একবার ওদের খপ্পরে পড়লে আর নিস্তার পাওয়া যাবে না। এ ধরনের লোককে চিনে রাখতে হবে। বিশ্বাসঘাতকতার পথ ছেড়ে দেয়ার জন্যে তাদের বলতে হবে। তবুও যদি তাদের শুভবুদ্ধির  উদয় না হয় তখন উর্ধতন কর্মকর্তার কাছে তাদের নাম-ঠিকানা জানিয়ে দিতে হবে এবং কর্তৃপক্ষ দেশদ্রোহীর নির্ধারিত শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করবেন।

     ৬। গ্রামে গ্রামে রক্ষীবাহিনীড় গড়ে তুলতে হবে। মুক্তিবাহিনীর নিকটতম শিক্ষণশিবিরে রক্ষীবাহিনীর স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা রয়েছে। গ্রামের শাস্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা ছাড়াও এরে প্রয়োজনে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করেছেন।

     ৭। গ্রাম/শহর অথবা মহল্লার নেতারা নিজেদের মধ্যে নির্বচন করে গ্রাম-গ্রামান্তরে যোগাযোগ ও পণ্য বিনিময় ব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধা রক্ষার জন্যে প্রচেষ্টা চালাবেন। এর উপরের স্তরের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থাকবে প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের হাতে।

      ৮। বাংলাদেশের সকল মুক্ত এলাকায় সরকারী, আধাসরকারী, বে-সামরিক কর্মচারীরা স্তরে স্তরে  নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশে কাজ করবেন। শত্রু কবলিত এলাকায় জনপ্রতিনিধিরাই ব্যক্তিবিশেষে অবস্থানুযায়ী ব্যবস্থা করবেন।

      ৯। সকল সামরিক, আধা সামরিক, কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত বাঙ্গালী কর্মচারী অনতিবিলম্বে নিকটতম মুক্তিসেনা শিবিরে যোগ দেবেন এবং কোন অবস্থাতেই শত্রুর সহযোগিতা করবেন না।

    ১০। যোগাযোগ ব্যবস্থার বিশেষভাবে নৌ-চলাচল সংস্থার কর্মচারীরা কোন অবস্থাতেই শত্রুর সাথে সহযোগিতা করবেন না এবং যতদূর সম্ভব যানবাহনাদি নিয়ে মুক্ত এলাকায় চলে আসবেন। 

গুজবে কান দিবেন না। গুজব রটাবেন না। নিজের উপর বিশ্বাস হারেবন না। মনে রাখবেন আপনার এ সংগ্রাম ন্যায়ের সংগ্রাম, সত্যের সংগ্রাম। পশ্চিম পাকিস্তানী দুশমন বাঙ্গালী মুসলমান নারী-পুরষ, বালক-বালিকা কাওকে হত্যা করতে, বাড়ীঘর লুট করতে, জ্বালিয়ে দিতে, এতটুকু দ্বিধা করেনি। মসজিদের মিনারে আজান প্রদানকারী মুয়াজ্জেন, মসজিদে-গৃহে নামাজরত মুসল্লী, দরগাহ মাজারে আশ্রয়প্রার্থী হানাদারদের গুলী থেকে বাঁচেনি। এ সংগ্রাম আমাদের বাঁচার সংগ্রাম। সর্বশক্তিমান আল্লাহত’লার উপর বিশ্বাস রেখে ন্যায়ের সংগ্রামে অবিচল থাকুন।

 

 

স্মরণ করুনঃ আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন

“অতীতের চাইতে ভবিষ্যৎ নিশ্চয়ই সুখকর”

বিশ্বাস রাখুনঃ

“আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় নিকটবর্তী”।

 

 

জয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব!

জয় বাংলা!