‘জনগণের সুস্পষ্ট রায় সত্ত্বেও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট প্রকৃত শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই’

Posted on Posted in 2

<2.139.593-594>

 

শিরোনাম– ‘জনগণের সুস্পষ্ট রায় সত্ত্বেও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট প্রকৃত শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা নাই

সূত্র– ‘হাতিয়ার‘ (পত্রিকা)

তারিখ১৮ ডিসেম্বর,১৯৭০

জনগণের সুস্পষ্ট রায় সত্ত্বেও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট প্রকৃত শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা নাই

আমাদের দেশের ঘুণে ধরা রাষ্ট্রযন্ত্রটি মুষ্টিমেয় একচেটিয়া পুঁজিপতি ধনিক,যাহারা একই সঙ্গে সামন্তবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের ধারক,তাহাদেরই হাতের মুঠোর মধ্যে রহিয়াছে।গত ২৩ বৎসর ধরিয়াই ইহা তাহাদের কব্জার মধ্যে রহিয়াছে।এই রাষ্ট্রযন্ত্র কেবলমাত্র শোষণ,নিপীড়ন ও জুলুমবাজির যন্ত্র,যাহা ঐ মুষ্টিমেয় ধনিকদের স্বার্থরক্ষার জন্যই ব্যবহৃত হইয়া আসিতেছে। ইহা দেশের উভয় অংশের ছাত্র,শ্রমিক,কৃষক,মধ্যবিত্ত জাতীয় ধনিকের অর্থাৎ জনসাধারণের কোন অংশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র এবং অন্ন,বস্ত্র,শিক্ষা,স্বাস্থ্য-বাসস্থান সমস্যার এতটুকু সমাধান করিতেও অক্ষম,বরং দিনে দিনে এই সমস্যাগুলি বাড়াইয়া তোলাই ইহার একমাত্র বৈশিষ্ট্য।

সম্প্রতি দেশের শাসনতন্ত্র তৈরির জন্য আইনগত কাঠামোর আওতায় গণপরিষদের ৯ টি আসন বাদে সব কয়টি আসনের নির্বাচন হইয়া গিয়াছে এবং বাকি আসনগুলির নির্বাচনও জানুয়ারীর ১৭ তারিখে সম্পন্ন হইবে।মুষ্টিমেয় একচেটিয়া ধনিকের কেনা গোলাম জেনারেল ইয়াহিয়ার স্বৈরচারী মিলিটারী সরকার চায় বর্তমান ঘুণে ধরা রাষ্ট্রযন্ত্রটি অক্ষুন্ন থাকুক,কারণ ইহা তাহার প্রভুদের স্বার্থ রক্ষার যন্ত্র এবং সেই চিন্তা করিয়া গণবিরোধী মিলিটারী সরকার জোড় করিয়া আইনগত কাঠামো আদেশ চাপাইয়া দিয়া নির্বাচন করাইয়া লইয়াছে।গণপরিষদ যদি আইনগত কাঠামো আদেশ মানিয়া লইয়া শাসনতন্ত্র তৈরি করে তাহা হইলে বর্তমান ঘুণে ধরা রাষ্ট্রযন্ত্রটিই বহাল থাকিবে।

মিলিটারী হর্তা-কর্তা-বিধাতাদের ঐরূপ খায়েশ থাকা সত্ত্বেও জনসাধারণ নির্বাচনে অন্য প্রকার রায় দিয়া দিয়াছে এবং নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী আওয়ামী লীগ ও পিপলস পার্টি এবং সেই সঙ্গে জেনারেল ইয়াহিয়ার সরকার শাসনতন্ত্র তৈরির প্রশ্নে মহাবিপাকে পড়িয়া গিয়াছে।বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্র বহাল রাখার জন্য ১৯৫৬ সালে এবং ১৯৬২ সালে জোড় করিয়া দুইবার দুইটি শাসনতন্ত্র চাপাইয়া দেওয়ার প্রচেষ্টা যে জনসাধারণ ব্যর্থ করিয়া দিয়াছে,তাহাদের উপর পুণরায় অনুরূপ কোন শাসনতন্ত্র চপাইয়া দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো সম্ভব হইবে কিনা উহা লইয়া তাহারা মহা ভাবনায় পড়িয়া গিয়াছে। বিশেষ করিয়া আজ যখন ১৯৭০ সালের জনসাধারণের চেতনা একটি গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এবং স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের আকাঙ্ক্ষাও তাহাদের অত্যন্ত তীব্র,তখন একই রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা বাঙালী,সিন্ধী,পাঞ্জাবী,পাঠান ,বেলুচ- দেশের এই পাঁচটি ভাষাভাষী জাতি এবং বিভিন্ন উপজাতীর উপর শোষণ-নিপীড়ন চালানো যে অত্যন্ত দুরূহ ইহা তাহারা হাড়ে হাড়ে টের পাইতেছে।ভুট্টো সাহেব অবশ্য ‘দেশের সংহতি ,ঐক্য এবং অখন্ডতার বিনিময়ে শাসনতন্ত্র তৈরী হইতে পারেনা’ বলিয়া অভিমত দিয়া বসিয়াছেন এবং শেখ সাহেবও তাঁহার ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানের সঙ্গে নতুন করিয়া ‘জয় পাকিস্তান’ যুক্ত করিয়াছেন,তথাপি ‘সংহতি’র বাতিল শ্লোগানে যে জনসাধারণ আর সায় দিবে না ইহা একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। জনপ্রিয়তার সুযোগে ঐ দুই নেতা জনগণকে আর ধোঁকা দিয়া বশে রাখিতে পারিবেন না।

আইন পরিষদের আধিবেশন বলিতে এখনও স্পষ্টতঃ মাস দুয়েক দেরী। ইহার ,মধ্যে স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা জনসাধারণের মধ্যে যাহাতে আরও তীব্র হইয়া না উঠিতে পারে,মিলিটারী শাসকগোষ্ঠী তজ্জন্য চিরাচরিত কায়দায় দেশের সংবাদপত্র সমূহের টুঁটি টিপিয়া ধরিতেছে এবং তাহা অত্যন্ত গোপনে। কেন্দ্রীয় তথ্য বিভাগ ‘স্বাধীন পূর্ব বাংলা’ , ‘স্বাধীন বাংলা’ বা ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ এমনকি ‘সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তান ‘ কথাগুলি যাহাতে উচ্চারিত না হয় তজ্জন্য সংবাদপত্রগুলির প্রতি গোপনে নির্দেশ জারি করিয়াছে। এই নির্দেশ ‘প্রেস নোট’ আকারে জারি করিলে উলটা ফল ফলিতে পারে,এইরূপ আশঙ্কাও তাহাদের রহিয়াছে।

ইহা হইতে স্পষ্টতঃ অনুমান করা চলে যে,জেনারেল ইয়াহিয়া নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট শাসনক্ষমতা হস্তান্তরের তখনই ব্যবস্থা করিবে,যখন বর্তমান ঘুণে ধরা রাষ্ট্রযন্ত্রটি বহাল রাখার মত করিয়াই একটি শাসনতন্ত্র প্রণীত হইবে। এবং তাহাই যদি হয় তাহা হইলে শাসনক্ষমতা হস্তান্তরিত হইলে জনপ্রতিনিধিরা কায়েমী শোষকগোষ্ঠীর ক্রীড়ানক হিসাবেই কাজ করিবে।

১৯৬৮-৬৯ সালে ১১-দফার গণঅভুত্থ্যান ঘটাইয়া জনসাধারণ যে রাষ্ট্রযন্ত্রটি অচল করিয়া দিয়াছিল ও ভাঙ্গিয়া চুরমার করিয়া দিতেছিল,মার্শাল ল’র শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করিয়া কায়েমী শাসকগোষ্ঠী সেই রাষ্ট্রযন্ত্রকেই আবার জোড়া তালি দিয়া চালু করিয়া রাখিয়াছে। এইবার নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় উহা বাতিল করা গেল না দেখিয়া দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতি বিশেষ করিয়া পূর্ব বাংলার জনসাধারণের নিশ্চিতভাবেই আরেক নবতর গণঅভ্যুত্থান ঘটাইয়া উহাকে উৎখাত করিয়া আকাঙ্ক্ষিত ১১-দফাভিত্তিক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করিবেই।