জনতার আদালত

Posted on Posted in 5

জনতার আদালত

১৩ নভেম্বর, ১৯৭১

কুঁকড়্যাঃ       শুন রাসুবু আমি খুব ভালো করা বুঝ্যা লিয়্যাছি, আমাধের দুষমুন আমাধেরই শায়েস্তা কইরতে হবে। তুমি যে একটু আগে বুলল্যা, দানেশ

মিয়ার ব্যাটা রাজাকারে ভর্তি হয়া ধরাখে সরা জ্ঞান করছে-তা ঠিক। আইজক্যাল ওই খালি লুটপাটই কইরছে না, আরো ম্যালা কিছু

আছে।

রাসুঃ   আরে খুলে না বললে কি আর আমি জানিনে। দানেশ মিয়ার ছেলে রহিম তো পাণ্ডা, ওর সাথে যোগ দিয়েছে মোমিন বেপারীর শালা

আর কালু মিস্তিরীর ভাই। সেদিন দেখো না বলা নাই কওয়া নাই, একদল মিলে এসে আমার গাছের ডাবগুলো পেড়ে নিয়ে গেল, কি

না ওদের কে অফিসার এসেছে, সে খাবে। শোন কথা, বেটারা যেন সব বাপের সম্পত্তি পেয়েছে। তা কে বলতে যাবে বল আমার

বোনের ছেলেটা গিয়ে জিজ্ঞেসে করেছে, তাতেই রাগ কতো, এই মারে কি সেই মারে।

কুঁকড়্যাঃ       তুমার ডাব খায়্যাছে। আমার একদিন জাল দিয়া মাছ মার‍্যা লিয়্যা গিয়্যাছে। আমি ছিল্যাম না, না হোলে সেদিন আর জান লিয়্যা যাত্যে

দিতাম না। আমিও তক্কে তক্কে আছি, আর একদিন পাল্যে হয়।

রাসুঃ   আরে শুধু ফল পাকুড় গেলে তো কথাই ছিল না। ওদের জ্বালাতে আজকাল বো- বিটারই কি ঘাট-ঘাটালীতে যাওয়ার জো আছে। সেদিন

আমেনা বুবুর বড়ো মেয়েটাকে পানি নিয়ে আসার সময় ধরে, সে যা-তা, আমেনা বুবু যখোন গিয়ে বলল- হ্যাঁরে রহিম, এক পাড়ার

ছেলেমেয়ে, আমার বাশেরা কি তোর বোন নারে। তো সে হারামজাদা কথায় তো কান দিলই না, যা-তা বলতে শুরু করলো মনে হয়

নোড়া দিয়ে ওর মুখ ভেঙ্গে দিই।

কুঁকড়্যাঃ       আমিও শুন্যাছি আবার হইচই হ্যয়াছিল বুল্যা নাকি রহিম আমেনা বুবুকে শাসিয়্যা গেছে বাশেরাকে চুরি করা লিয়্যা যাবে বুল্যা। শুন কথা,

দিন দিন হচ্ছে কি? আমাধের সহ্যের বাহেরে চল্যা গেলছে, মোড়ল ভাই আসুক, তুমরাও সবাই আছ, আজই ওদেরকে ডাকা আন্যা

আমরাই ওদের বিচার করব। তুমরা সবাই মোড়ল ভাইকে বুলব্যা। আইজই য্যানে একটা ব্যবস্থা করে।

মোড়লঃ        কি ব্যাপার, কুঁকড়্যাকে একটু উত্তেজিত মনে হচ্ছে যেন। নোতুন কিছু ঘটেছে নাকি?

রাসুঃ   এইতো মোড়ল ভাই এসেছে। বল কুকড়্যা ভাই, একটু গুছিয়ে বলো তো।

কুঁকড়্যাঃ       আমি খুব রাগ্যা গেছলি, আমি সাজিয়্যা বুলতে পারবো না, তুমি বুল।

মোড়লঃ        কি হয়েছে রাসু বুবু?

রাসুঃ   কি হয়েছে তা আমি বলব আর তুমি জানবে? তোমার কি নিজে থেকেই খবর রাখা উচিত ছিল না মোড়ল ভাই। থাকগে যা বলি শোন।

এই যে দানেশ মিয়ার ছেলে রহিম, গুণ্ডাপাণ্ডার দল নিয়ে রাজাকারে নাম লিখিয়ে গোটা গ্রামটাকে একেবারে তছনছ করে দিচ্ছে, এর

তোমরা কোন বিহিত ব্যবস্থা করবে, না আমাদেরকে দেশ-গাঁ ছেড়ে চলে যেতে হবে।

মোড়লঃ        তোমরা কি বলতে চাও, আমি এসব কোন খবর রাখি না, না কোন চেষ্টা করছি না। নিজে কদিন রাস্তায়-হাটে ডেকে সাবধান করে

দিয়েছি এরপরও যদি তাদের অত্যাচার বন্ধ না হয় বা রাজাকারের দল থেকে নাম না কাটায় তখোন বাধ্য হয়েই মুক্তিবাহিনীর লিষ্টে

ওদের নাম তুলে দিতে হবে।

কুঁকড়্যাঃ       যদ্দিন সে ব্যবস্থা না হয়, তদ্দিন কি আমরা সহ্য করবো ভাবাছো মোড়ল ভাই। এতো বাঢ়া বাঢ়্যাচ্ছে ওরা যে আইজকাল কান্ঠা ঘটাতে

বৌ-বিটীর হাঁটাচলা বন্ধ হবার যো হয়্যাছে। কেউ কিছু বুললেই ভয় দেখায়। আইজকাল ত পকেটে ছুটু বন্ধুক লিয়্যাই ব্যাড়াই।

রাসুঃ   হ্যাঁ, বাপেদের কাছ থেকে বন্ধুক পেয়েছে ত, গুলি-বারুদের হিসেব নাই। আরে মানুষ না হয় দুর্বল, খোদা কি দেখছে না, তোদের বংশ

নির্বংশ হয়ে যাবে, ধ্বংস হয়ে যাবি তোরা।

কুঁকড়্যাঃ       বাদ দ্যাও বুবু ওসব কথা, মোড়ল ভাই। আমি এখুনই যায়্যা ডাকা আনছি ওদেরকে। হয় তুমি এখুন ওদের বিচার কইরব্যা না হলে কিন্তু

খুন খারাবী হয়্যা গেলে আমার দোষ দিতে পাইরব্যা না, হ্যাঁ।

মোড়োলঃ আরে, কুকড়্যা ভাই, মাথা গরম করো না, শোন শোন…

কুঁকড়্যাঃ       শুনাশুনির কিছু নাই। মাথা আমার ঠাণ্ডাই আছে। আমি কিছু বুইলবো না, যা বোলার তুমিই বুলো, আমি খালি ডাকা আনছি, বুইঝল্যা-

আমি চননু । (একটু বিরতি)

মোড়লঃ        রাসু বুবু তুমি একটু বসো, আমি আর দু’চারটে মুরুীকে ডেকে আনি, হাজার হলেও গ্রাম্য পঞ্চায়েতের ব্যাপার, সবারই থাকা উচিত।

আর, এইত নিয়ামত চাচা এসে গেছে, বসো চাচা বসো, পেছনে ওই অন্ধকারের দিকে কে বসে আছে। আবেদ ভাই নাকি-আঃ হা,

পেছনে কেন, সামনে এসে বসোনা, এসো হ্যাঁ-হ্যাঁ, বসো ওখানেই বসো, আরে ডাক্তার সাহেবকে আড়াল করে দিয়ো না, একটু গুছিয়ে বসো।

রাসুঃ   আচ্ছা মোড়ল ভাই দানেশ মিয়াকে একটু ডেকে নিলে হতো না, ছেলের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে দানেশ ভাইয়েরও কিছু জেনে রাখা

ভাল। পরে আবার না বলে যে, আমরাই অন্যাই করেছি।

মোড়লঃ        এতো রাগা তোমরা রেগেছ রাসু বুবু, যে, মানুষ পর্যন্ত চিনতে পারছ না, সামনের সারির ওই বামদিকে ওটা কে বসে আছে দানেশ ভাই

না, লজ্জায় এতোক্ষণ কথা বলেনি বুঝলে। দেশ ও দশের এই দুদিনে কারো ছেলে যদি শত্রুর সাথে পাঞ্জা মিলিয়ে এমন সব জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়, তবে স্বভাবতই সে বাপের মুখ লজ্জায় বন্ধ হয়ে যায়।

রাসুঃ   আচ্ছা মোড়ল ভাই, এই যে পাকিস্তানের মিলিটারিদের অমানুষিক অত্যচার, লুট, গ্রাম পোড়ানো, খুন আর ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি করা-

আর দেশেরই কিছু লোকের ওদের দিকে হয়ে ওদেরকে সহযোগিতা করা, এর কি কোন ব্যবস্থা নাই? কিছু একটু বলো না- এরকম সময়ে আমাদের কি করা উচিত?

মোড়লঃ        হ্যাঁ, আমি তোমাদের সবাইকে এ সম্পর্কে কিছু বলতে চাই, দেখ-পশ্চিম পাকিস্তানীরা আমাদের শক্র তারা শুধু শোষণ করার জন্য

আমাদেরকে জুলুম করে ওদের গোলাম করে রাখতে চায়। ওদের মেরে নিঃশেষ করে দেশকে স্বাধীন করার দায়িত্ব নিয়েছে আমাদের

মুক্তিবাহিনী। রীতিমত যুদ্ধ হচ্ছে এবং শুনলে অবাক হবে, খোদা সহায় আছেন বলেই, সব জায়গাতেই পাকিস্তানী সৈন্যরা মার খাচ্ছে

আর পিছু হটছে। আমাদের কাজ হলো- সব রকমে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে অসহযোগিতা করা এবং এমন কিছু না করা, যাতে

আমাদের  দেশের পয়শা পশ্চিম-পাকিস্তানে চলে যায় ।

রাসুঃ   তা কি করে সম্ভব? ওরা আমাদের ধার ধরছে থোরাই? যা ইচ্ছে হচ্ছে তাই ত করছে।

মোড়লঃ        খুব সম্ভব। ওদের মনোবল এতো ভেঙ্গে গেছে, যে, আজকাল কোন জায়গায় আর নিজেরা এগোচ্ছে না। আমাদেরই ভাই-ছেলে দিয়ে

তৈরী করা রাজাকার আল-বদর বাহিনীকে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের ছেলেরা যাতে ওদের কাজ না করে, সেদিকে তীক্ষ দৃষ্টি রাখতে

হবে। তারপর-ওদের যোগাযোগ ব্যবস্থা, যতো ক্ষতিই হোক, একেবারে বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। কোন অবস্থাতেই আমাদের পশ্চিম

পাকিস্তানী পণ্য ক্রয় করা চলবে না। আমরা যারা দেশে যুদ্ধরত আমাদের ভাইদের কাজ এগিয়ে যাবে।

কুঁকড়্যাঃ       এই যে মোড়ল ভাই। তোমার আসামীরা। সবাইকে নিয়্যা আস্যাছি। যা বোলার তুমি বোলো।

মোড়লঃ        এই যে রহিম, বাদশা মিয়া, শাকের ভাই, বসো, সব বসো।

রাসুঃ   এঃ আদর করে আবার বসতে বলা হচ্ছে। ওরা ভদ্রলোকের মধ্যে বসার যোগ্য?

মোড়লঃ        থাম রাসু বুবু আমন করে কাউকে বলতে নেই। দোষ থাক গুণ থাক, ওরা আমাদেরই গাঁয়ের ছেলে। আমাদেরই ভাই-ভাইপো। আমরা

মানুষের কাজের সমালোচনা করতে পারি, কাজকে ঘৃণা করতি পারি- মানুষকে নয়।

কুঁকড়্যাঃ       তুমার ওই ব্যবহারেই ত ওরা অতো আস্কারা পায়্যাছে। হুঁঃ কথায় আছে-ছেল্যাক থাবা, বুঢ়াক বাবা, তা না ভাই-সোনা কর‍্যা কর‍্যা… মোড়লঃ      তুমি থাম কুঁকড়্যা ভাই। শোন রহিম, তোমরাও শোন বাদশা ভাই। তোমরা রাজাকার হয়েছ ভাল কথা, যদিও আমাদের সেটুকুই বরদাস্ত

করা উচিত নয়। অন্যান্য স্থানের রাজাকাররা শুধু নামেই রাজাকার, তারা কাজ করছে। আমাদের তোমরা তাতো করছই না, উল্টে

তোমাদের এমন কোন নোংরা কাজ নাই যা তোমরা করেনি। আর এই সভা যে শাস্তি তোমাদের দেবে তা তোমাদের মাথা পেতে নিতে

হবে। কারণ, গ্রামবাসীরা তোমাদের অত্যাচারে জর্জরিত। তোমাদের বিচার করার পূর্ণ অধিকার তাদের আছে।

(সমস্বরে কয়েকজনে)

সমস্বরেঃ               আমরা ওদের মুখ দেখতে চাই না। ওদের গ্রাম থেকে বের করা হোক। ওদের যোগ্য শাস্তি দেয়া হোক।

কুঁকড়্যাঃ               মাইরের বদল মাইর। ওরা আমাদের অনেক জ্বালিয়েছে, আমরা তার বদলা মার‍্যা লিবো।

মোড়লঃ                দেখছ তা রহিম, তোমাদের বিষয়ে মানুষ কতো উত্তেজিত। যাহোক, ভুলভ্রান্তি মানুষেরই হয়। এবার যদি তোমরা কথা

দাও যে আর কখনও অন্যায় করবে না আর উপস্থিত সবার কাছে ক্ষমা চাও…..

কুঁকড়্যাঃ               ওসব বুঝিন্যা। এই বুটারা- পাঞ্জাবীরা তোধের বাপ। দেশের লোক ভাল লাগে না। এই দেখ শাস্তি কি দিই। (লাঠির শব্দ) (উঃ

হু-হু-রে, আঃ ওরে বাবারে)

মোড়লঃ                থাম কুঁকড়া ভাই। এবারের মতো ওদেরকে ক্ষমা করা হলো । তবে জানিয়ে রাখি, মুক্তিবাহিনীর তালিকায় তোমাদের নাম

দেয়া আছে, ওরা তোমাদের গতিবিধির ওপর পূর্ণ দৃষ্টি রেখেছে। সাবধান না হলে ভবিষ্যতে মারা পড়বে বলে দিলাম।

কুঁকড়্যাঃ               হ্যাঁ- তেড়িবেড়ি কইরব্যা তো মইরব্যা।

(আনোয়ারুল আবেদীন রচিত)