জনাব আইয়ুব খাঁর জবাবে হাজী মোহাম্মদ দানেশ

Posted on Posted in 2

<2.42.230-235>
জনাব আইয়ুব খা’র জবাবে হাজী মোহাম্মদ দানেশ
সূত্রঃ পুর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির পুস্তিকা
তারিখঃ অক্টোবর ১৯৬৯

 

এক নায়কত্বের অবসান হোক

গণতন্ত্রের জয় হোক

হাজী মোহাম্মদ দানিশ

সাধারন সম্পাদক

পূর্ব বাংলা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি

প্রেসিডেন্ট পদের জন্য কনভেশন লীগ মনোনীত প্রার্থী জনাব মোহাম্মদ আইয়ুব খা এর পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচনী অভিযানে প্রদত্ত বক্তৃতাসমুহে তার শাসন আমলের অনেক গুণগান বয়ান করিয়া গনমনে নানা বিভ্রান্তির চেষ্টা করিতেছেন।

জনাব আইয়ুব খা ব্রিটিশ আমলে সৈন্য বাহীনি তে যোগ দিয়ে তার কর্ম জীবন শুরু করিয়াছিলেন। পাক-ভারত উপমহাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দেশের জনগন যখন বিদেশী শাসকদের পুলিশ ও সেনা বাহিনীর গুলিতে নিজের বুকের রক্ত ঢালিয়া দিতেছিলেন,

তখন জনার আইয়ুব খা ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর একজন সেনা অফিসার হিসেবে নিষ্ঠার সহিত ঐ বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের সেবা করিয়াছিলেন। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার কোন অবদান নাই; বরং তখন তিনি ছিলেন একান্ত ব্রিটিশ অনুগত।

বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী দেখা যায় যে, স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশের রাস্ট্রীয় নেতারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এবং সামরিক বাহিনী হইতে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা শিক্ষিত ও পদলেহনকারী অফিসারদের অপসারন করিয়া সে স্থলে নতুন দেশপ্রেমিক ব্যক্তিগনকে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। আমাদের দেশে সে ব্যবস্থা গৃহীত হইলে আজিকার অনেক বড় বড় রাষ্ট্র-নেতা স্বাধীনতা প্রপ্তির পরই দেশ বিরোধী বলিয়া সমাজের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হইত। কিন্তু আমাদের দেশে স্বাধীনতা পাওয়ার পরেও পুরাতন আমলাতন্ত্র অটুট রাখা হয়। সামরিক বাহিনীতেও কোন রদবদল করা হয় নাই।

সেই সূত্রে জনাব আইয়ুব খাও স্বাধীনতার পরও সামরিক বাহিনীর একটি উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ও পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পর পরই পাকিস্তানের জি.ও.সি হিসেবে নিযুক্ত হন। এই পদ হইতে তিনি পরে পাকিস্তানের সেনাভিনীর অধিনায়কের পদে অধিষ্টিত হন।

এই পদে বহান থাকাকালে তিন তিনবার তাহার চাকুরীর মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। মরহুম খাজা নাজিমুদ্দিন তাহার মৃত্যুর কয়েক দিন পূর্বে লাহোরে বলিয়াছিলেন যে তাহার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে জনাব আইয়ুব খা তাহার (জনাব আইয়ুব খা’র) চাকুরীর মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য তদ্বির করিয়াছিলেন। খাজা নাজিমুদ্দিন উহাতে অস্বীকৃতি জানাইলে জনার আইয়ুব খা তদানন্তীন গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের শরণাপন্ন হন। ইহার কিছুদিন পরেই গোলাম মোহাম্মদ মরহুম খাজা নাজিমুদ্দিন কে শাসনতন্ত্র বিরোধী উপায়ে প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ থেকে অপসারণ করেন। অপরদিকে জনাব আইয়ুব খার চাকুরীর মেয়াদ বৃদ্ধি পায়।

‘এবডোর’ অধীনে মরহুম শহীদ সোহরাওয়াদীর তথাকথিত ‘বিচারের’ সময় তাহার বিরুদ্ধে অফিসারদের পদোন্নতি সম্পরকে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ‘অপব্যবহারের’ ‘অভিযোগ’ আনা হয় তখন তিনি বলিয়াছিলেন যে, অফিসারদের চাকুরীর সম্পর্কে তিনি যে হুকুম দিয়াছিলেন তার ভিতরে একটি হুকুম সম্পর্কেই ঐ কথা উঠিতে পারে। সে হুকুম হইল সেনাবাহিনীর জনাব আইয়ুব খা’র চাকুরীর মেয়াদ বৃদ্ধির হুকুম। তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইস্কান্দার মির্জা।

দেখা যায় যে গোলাম মোহাম্মদ ও ইস্কান্দার মির্জা যখন পাকিস্তান রাষ্টের মালিক হইয়া বসিয়াছিলেন তখনই বারবার জনাব আইয়ুব খা’র চাকুরীর মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক গগণের ঐ দুইটি অশুভ গ্রন্থেও জনাব আইয়ুব খা’র বন্ধুত্বের আরও প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিলো ১৯৫৫ সালে যখন গোলাম মোহাম্মদ গায়ের জোরে তদানীন্তন গণ-পরিষদ ভাঙ্গিয়া দিয়া তার কুখ্যত ‘ট্যালেন্ট মন্ত্রীসভা’ গঠন করেন। তিনি তাহার ভিতর জনাব আইয়ুব খাকে আনিয়া তাঁহাকে দেশরক্ষামন্ত্রী পদে বহাল করেন। সেনাধিনায়ক আইয়ুব খা সেই প্রথম পাকিস্তানের রাজনৈতিক গগণে আবির্ভূত হন।

প্রকাশ যে, গোলাম মোহাম্মদ যখন ‘অসুস্থতা’বশতঃ পাকিস্তানের জেনারেলের দায়িত্ব পালনে অক্ষম হইয়া পড়েন তখন ট্যালেন্ট মন্ত্রীসভার বৈঠকে জনাব আইয়ুব খাই গোলাম মোহাম্মদের স্থলে ইস্কান্দার মির্জার নাম প্রস্তাব করেন। জনাব আইয়ুব খা নাকি সেই মন্ত্রীসভার বৈঠকে স্পষ্টভাবে বলিয়াছিলেন ‘Army wants General Iskandar Mirza to be the head of the state’ ( সেনাবাহিনীর ইচ্ছা যে, জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা রাষ্ট্রের প্রধান হউন)। কেহ নাকি ইহার প্রতিবাদ করেন নাই বরং জনাব আইয়ুব খার সমর্থনে ইস্কান্দার মির্জার মত ব্যক্তি পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল পদে বসিতে পারিলেন।

ইহার পর ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে ঐ ইস্কান্দার মির্জার নেতৃত্বেই সেনাধিনায়ক জনাব আইয়ুব খা ও তার সহচরগণ পাকিস্তানে সামরিক শাসন কায়েম করেন এবং বহু কষ্টে রচিত ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র টুকরা টুকরা করে ফেলেন।

ইহার মাত্র ২০ দিন পর জনাব আইয়ুব খা ইস্কান্দার মির্জাকেই দূর করিয়া দেন এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিনায়ক হয়ে বসেন।

এইভাবে, ব্রিটিশ  আমলের সামরিক অফিসারের পদ হইতে জনাব আইয়ুব খা ব্রিটিশ শিক্ষিত আমলা কুখ্যাত গোলাম মোহাম্মদ-ইস্কান্দার মির্জার চক্রের সাথে বন্ধুত্বের পথে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে আরোহণ করেন।

 

 

ভুতের মুখে রাম নাম

সেই জনাব আইয়ুব খা আজ আবার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হইয়া ‘গনতন্ত্রের কত কথাই না বলিতেছেন!

তিনি বলিতেছেন যে, তাহার ‘বুনিয়াদী গনতন্ত্র’ নাকি গনতন্ত্রের ইতিহাসে ‘অভিনব অবদান’ তিনি নিজে ভোটের জন্য জনগনের দুয়ারে উপস্থিত হইয়াছেন। বিরোধী পক্ষকে ‘অবাধে’ নির্বাচনের অভিযান চালাইতে দিতেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

 

 কিন্তু ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে যে ‘বিল্পব’ তিনি করিয়াছিলেন সেই ‘বিপ্লবের’ প্রথম কাজই ছিল গনতন্ত্রকে জবেহ করা। সামরিক শাসন জারির প্রথম ঘোষনাতেই আইনের শাসন উচ্ছেদ করিয়া সামরিক আইনে দেশ শাসন করার কথা ঘোষণা করা হয়। সেই ঘোষণাতে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করিয়া, সংবাদপত্রের কন্ঠরোধ করিয়া, বাকস্বাধীনতা হরণ করিয়া, জনগনের সভা-মিছিল করিবার  অধিকার পদদলিত করিয়া এক নিমিষে সারা দেশে সামরিক সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। মওলানা ভাসানী, খান আবদুল গাফফার খানের মত দেশবরেণ্য নেতৃবৃন্দসহ শত শত দেশপ্রেমিককে কারাগারে বিনা বিচারে আটক করা হয়, বহু কর্মীর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয় এবং তাহাদের আত্নগোপনে বাধ্য করিয়া তাহাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। সেই সামরিক সময়ের সময় ন্যাপ কর্মী  হাসান নাসেরকে লাহর দুর্গে প্রান দিতে হয়। বহু কর্মীকে সরকারের ‘আইন’ ভঙ্গ করার অপরাধে চাবুক মারা হয়।

তখন বাড়ি-ঘর ‘পরিষ্কার’ না রাখার জন্য শহরে ও গ্রামে বহু নিরপরাধ নাগরিককে পুলিশের হাতে অপমান সহ্য করিতে হইয়াছে। অনেককে জরিমানা দিতে হইয়াছে। জামার অস্তিন গুটাইয়া চলার অপরাধে বহু যুবককে আমলা পুলিশের হাতে লাঞ্চনা ভোগ করিতে হইয়াছে। রাস্তার ডাইনে না চলিয়া হঠাত চিরচরিত অভ্যাস অনুযায়ী বাম পাশ দিয়ে চলিতে গিয়া বহু নিরীহ পথচারীকে পুলিশের ব্যাটনের গুতা খাইতে হইয়াছে।

সামরিক সন্ত্রাসের সেই সময়ে গনতন্ত্র ও সায়ত্বশাসন দাবী করিবার জন্য সাবেক বেলুচিস্তানে শত শত কর্মীকে বন্দি শিবিরে আটক করিয়া তাহাদের উপর নাৎসিসুলভ অত্যাচার চালানো হইয়াছে। ঐ অঞ্চলের জনগনের উপর আকাশ হইতে বোমা ফেলা হইয়াছে। সাবেক সীমান্ত প্রদেশের শত শত নেতা ও কর্মীকে বেত্রদন্ড দেয়া হইইয়াছে, তাহাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হইয়াছে এবং ঢাকা নগরীর জনতার শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর বেপরোয়া লাঠি ও কাদুনে গ্যাস চালানো হইয়াছে।

জনাব আইয়ুব খা আজ ভোটের জন্য ‘গনতন্ত্রের যত কথাই বলুন, বহু দেশপ্রেমিকের পারিবারিক জীবনের ধ্বংস, বহু দেশপ্রেমিক কর্মী ও রাজবন্দীর পরিবারবর্গেও উপবাস, বহু কর্মীর পিঠে বেত্রাঘাতের চিহ্ন, হাসান নাসিরের মায়ের চোখের পানি প্রভৃতি জনাব আইয়ুব খার সামরিক শাসনের সীমাহীন বর্বরতার জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করিতেছে।  সে সময়কার বর্বরতার সব কাহীনি বর্ণনা করতে গেলে মহাভারত রচিত হইয়া যাইবে।

সুদীর্ঘ সাড়ে তিন বছর কাল ধরিয়া পাকিস্তানের জনগন ঐ বর্বরতার অধীনে নিষ্পেষিত হয়েছেন। যদি আরো অধিককাল ঐ সামরিক শাসন রাখা সম্ভব হইত, তাহা হইলে জনাব আইয়ুব খা তাহাও করিতেন। কিন্তু সামরিক জুলুমের বিরুদ্ধে দেশের জনগন যেভাবে বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছিলেন, এবং বিদেশে, এমনকি বর্তমান শাসকবৃন্দের ‘পীঠস্থান’ খোদ আমেরিকাতেও ইহার যে সমালোচনা হইতেছিল তাহা উপেক্ষা করিয়া তখন সামরিক শাসন বেশিদিন চালু রাখা সম্ভব ছিল না। তাই, বাধ্য হইয়া জনাব আইয়ুব খা’ ১৯৬২ সালে এক তথাকথিত ‘শাসনতন্ত্র’ জারি করেন।

১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে জনগনকে ‘ভোটাধিকার ও প্রত্যক্ষ নির্বাচন’ পার্লামেন্টারি শাসন, মৌলিক অধিকারসমূহের স্বীকৃতি ইত্যাদি কতকগুলো অধিকার দেওয়া হইয়াছিল।

কিন্তু জনাব আইয়ুব খার শাসনতন্ত্রে জনগনের সেই ভোটাধিকার কাড়িয়া নেওয়া হইয়াছে।আইন সভাগুলির কার্যতঃ কোন অধিকার নাই । পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতির স্বায়ত্তশাসন অস্বীকৃতি হইয়াছে। এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা স্থাপন করিয়া দেশ শাসনের সমস্ত ভার দেওয়া হইয়াছে প্রেসিডেন্টের হাতে। ইহার গাল্ভরা নাম দেওয়া হইয়াছে প্রেসিডেন্সিয়াল শাসন। প্রকৃতপক্ষে এই শাসনতন্ত্রের আড়ালে স্বৈরাচারী একনায়কত্ব কায়েম রহিয়াছে।

তাছাড়া দল গঠনের উপর নানা প্রকার বিধিনিষেধ জারি হইয়াছে  এবং বিভিন্নভাবে সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা খর্ব করা হইতেছে। এখনো বহু দেশপ্রেমিক কর্মীকে পায়ই গ্রেফতার করা হইতেছে, এখনো অনেক কর্মী ও নেতার উপর হুলিয়া ঝুলিয়া আছে, এখনও জনগনের শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর পুলিশের লাঠি ও কাঁদুনে গ্যাস চালানো হইতেছে এবং শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ ধর্মঘট ভাঙ্গিবার জন্য গুন্ডা লেলাইয়া দিয়া বহু শ্রমিককে হতাহত করা হইতেছে। বস্তুতঃ জনাব আইয়ুব খা’র ‘শাসনতন্ত্রের’ জামানতেও গনতন্ত্রকেও গলাটিপিয়া হত্যা করা হইতেছে।

তীব্র দমননীতির এই পরিবেশে এবং জনাব আইয়ুব খা’র একনায়কত্বমূলক শাসনতন্ত্রের অধীনে যে নির্বাচন অধিষ্ঠিত হইতেছে তাহা এই গনবিরোধী সরকারের গণতন্ত্রের চিহ্ন বলিয়া গৃহীত হইতেও পারে না। আজ মিস জিন্নাহর নির্বাচনী অভিযানে দমননীতি প্রয়োগ করা হইতেছে না বলিয়া এই সরকারের ‘গণতন্ত্র প্রীতি’ জাহির কুরার ও কোন কারণ নাই। কারণ, কায়েদে আজমের ভগিনীর নির্বাচনী অভিযানে দমননীতি দ্বারা বাধা দেওয়ার দুঃসাহস এই দেশে কাহারো থাকিতে পারে না। ওটা নিয়া জনাব আইয়ুব খা’র বড়াই না করাই ভাল। 

তাছাড়া আজ নির্বাচনী অভিযানে সরকার সরাসরি দমননীতি প্রয়োগ করিতেছে না বলিয়া এই সরকারের পূর্বেকার বর্বরতা ও হিংস্র দমননীতি জনগন ভুলিতে পারে না। রাতারাতি সরকারের গন-বিরোধী চরিত্র পরিবর্তিত হইতে পারে না।

সর্বোপরি এই নির্বাচনী ব্যবস্থায় যেগুলি আসল নির্বাচন, সেই প্রেসিডেন্ট ও আইন সভাগুলির নির্বাচনে জনগনের কাছে কোন ভোট নাই। খাজনা-ট্যাক্স দেওয়ার বেলায় জনগণ, কিন্তু ভোটের বেলায় শুন্য। সেই ভোটের অধিকারী সারা দেশে শুধু ৮০ হাজার ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’।

‘মৌলিক গণতন্ত্রী’ সংস্থা গ্রামের ও শহরের উন্নয়ন কাজের জন্য স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানরুপে কাজ করুক ইহা সবাই চায়। কেহই ইহাকে বিলোপ করিতে চায় না। কিন্তু দেশের দশকোটি লোকের ভিতর শুধু ঐ ৮০ হাজার ‘মৌলিক গণতন্ত্রীকে’ প্রেসিডেন্ট ও আইনসভাগুলির নির্বাচনের অধিকার দান করিয়া জনাব আইয়ুব খা এই নির্বাচনকে একটা প্রহসনে পরিণত করিয়াছেন এবং গনতন্ত্রের মূলেই কুঠারাঘাত করিয়াছেন।

এহেন জনাব আইয়ুব খা’র মুখে গণতন্ত্রের কথা ‘ভুতের মুখে রাম নামের’ মত শুনাইতেছে।

 

কবরের স্থিতিশীলতা

জনাব আইয়ুব খান দেশের রাজনৈতিক নেতাদের ও পার্লামেন্টারী শাসনব্যবস্থাকে লোক চোখে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য নজির দেখাইতেছেন যে, পূর্বে পার্লামেন্টারী শাসনের আমলে রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতার কাড়াকাড়ি করিয়া দেশে এক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করিয়া দেশকে জাহান্নামে পাঠাইতেছিলেন। তিনি উহা হইতে দেশকে রক্ষা করিয়াছেন। এবং তাহার শাসনতন্ত্রে প্রেসিডেন্সিয়াল শাসন চালু করিয়া দেশে স্থিতিশীলতা আনয়ন করিয়াছেন।

কিন্তু আসল সত্য হইলো যে, আমাদের দেশে প্রকৃত পার্লামেন্টারী প্রবর্তিতই হয় নাই। ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে ঐ পার্লামেন্টারী শাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল মাত্র। ইহা বাস্তবায়িত করার জন্য যখন দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বজনীন ভোটে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হইতেছিল তখনই ইস্কান্দর মীর্জার নেতৃত্বে জনাব আইয়ুব খাঁ প্রমুখ সামরিক নেতারা দেশে সামরিক আইন কায়েম করিয়া সে নির্বাচনকে অনুষ্ঠিত হতে দেন নাই।

আইয়ুব ভ্রাতা বাহাদুর খাঁ ভভ জাতীয় পরিষদে একথাও বলিয়াছিলেন যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরাও ঐ সামরিক শাসন জারিতে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। কাজেই সত্য ঘটনা বলিতে গেলে বলিতে হয় যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীগণ এবং ইস্কান্দর মীর্জা ও আইয়ুব খাঁ প্রমুখ পার্লামেন্টারী ব্যবস্থা জন্মের পূর্বেই উহাকে হত্যা করিয়াছেন।

যদি ধরিয়া লওয়া যায় যে, পাকিস্তানের জন্মের পর হইতে বৃটিশের যে শাসনতন্ত্র অনুযায়ী (১৯৩৫ সালের শাসনতন্ত্র) দেশ শাসিত হইতেছিল তাহাতে মূলতঃ পার্লামেন্টারী ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তাহা হইলেও দেখা যায় যে, ঐ পার্লামেন্টারী শাসনব্যবস্থা অনুযায়ী মুসলীম লীগ দল একটানা ভাবে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করিয়াছে। তখন উহাকে কেহ অকেজো বা দেশের স্থিতিশীলতা পক্ষে হানিকর বলিয়া মনে করেন নাই। 

তবে ইহা অনস্বীকার্য যে, ১৯৫৩ সালে একবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীত্বে এবং ১৯৫৪ সনে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় ও যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা গঠনের পর হইতে দেশের বিভিন্ন মন্ত্রীত্বে বারবার পরিবর্তন হইয়াছে। কিন্তু ঐ সব ঘটনার জন্য দায়ী কাহারা ?

সকলেই জানেন যে, ১৯৫৩ সনে ওয়াশিংটনের পরামর্শে গোলাম মোহাম্মদ চক্র খাজা নাজিমুদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ হইতে অপসারণ করেন এবং বগুড়ার মোহাম্মদ আলীকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসাইয়া দেন। ঐ গোলাম মোহাম্মদ – ইস্কান্দার মীর্জা চক্রই ১৯৫৪ সনে মার্কিনী রাষ্ট্রদূত হিলড্রেথের পরামর্শে পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে পদচ্যুত করে ; ঐ গণবিরোধী চক্রই বগুড়ার মোহাম্মদ আলীকে সরাইয়া চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে প্রধানমন্ত্রিত্বের গদীতে বসায়। ঐ গণবিরোধী চক্রই সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভাকে পদচ্যুত করিয়া চুন্দ্রীগড় মন্ত্রিসভা গঠন করে ; ঐ গণবিরোধী চক্রই পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার পতন ঘটায় ; ঐ গণবিরোধী চক্রই পূর্ব পাকিস্তানের আইন সভায় মারামারি বাধাইতে মন্ত্রিসভার পতন ঘটায় ; ঐ গণবিরোধী চক্রই পূর্ব পাকিস্তানের আইন সভায় মারামারি বাধাইতে ও মরহুম শাহেদ আলীর হত্যার উস্কানি দেয় ; এবং পরিশেষ সামরিক শাসন কায়েম করে। ইহা সত্য যে, কতিপয় রাজনৈতিক নেতা গদীর লোভে বা গদী রক্ষার জন্য ঐ গণবিরোধী চক্রের উস্কানিতে ও প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়াছিলেন । সেই রাজনৈতিক নেতাদের দেশবাসী তীব্র ভাবে নিন্দা করে। কিন্তু মন্ত্রিত্বের ঐসব ভাঙ্গাগড়ার প্রধান দায়িত্ব তাহাদের ছিল না। কিন্তু মন্ত্রিত্বের সব ভাঙ্গাগড়ার আসল হোতা ছিল দেশের কায়েমী স্বার্থবাদীদের মুখপাত্র। ঐ গোলাম মোহাম্মদ- ইস্কান্দার চক্র এবং মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদীরা।জনাব আইয়ুব খাঁ কি উহাদের ঐসব কু কর্মে তাঁহার সহযোগিতা অস্বীকার করতে পারেন? তিনি নিজেও কি ঐ সব কু-কর্মে উহাদের সাথে জড়িত ছিলেন না?

যাহা হউক, ১৯৫৩ সন হইতে পাকিস্তানে মন্ত্রিসভার বার বার পরিবর্তনের আসল তথ্য ইহাই প্রমাণ করে যে, পার্লামেন্টারী শাসন ব্যবস্থার ফলে ঐ সব ঘটনা ঘটে নাই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পরিবর্তনগুলি শুধু ১৯৫৮ সনে চুন্দ্রীগড় মন্ত্রিসভার পরিবর্তে নূন মন্ত্রিসভার গঠন ব্যতীত আর কোন পরিবর্তন পার্লামেন্টারী পদ্ধতিতে, পার্লামেন্টে ভোটাভুটির ফলে সাধিত হয় নাই। ঐ সমস্ত পরিবর্তন ঘটিয়াছে পর্দার আড়ালে উপরতলার চক্রান্তের ফলে। ইহার জন্য পার্লামেন্টারী শাসন ব্যবস্থা দায়ী হইতে পারে না। বরং উপরতলার ঐ চক্রান্ত ভাঙ্গার এবং দেশে স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ ছিল সাধারন নির্বাচন করিয়া জনগণের ভোটে নির্বাচিত আইনসভার হাতে সার্বভৌম ক্ষমতা অর্পণ করা। নূন মন্ত্রিসভার আমলে দেশ সেই পথেই যাইতেছিল। কিন্তু, সামরিক শাসন জারি করিয়া জনাব আইয়ুব খাঁ-ই সে পথ রুদ্ধ করিয়াছেন। তিনিই দেশের সত্যিকার স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে দেন নাই।

আজ যে ‘স্থিতিশীল’ শাসনের বড়াই তিনি করিতেছেন, সেই ‘স্থিতিশীলতার’ প্রকৃত অর্থ কী? যদি তিনি বলিতে চান যে, গত ছয় বৎসরে তাঁহার রাজত্বের কোন পরিবর্তন হয় নাই বলিয়া উহা ‘স্থিতিশীল’, তাহা হইলে বলিয়ে হয় স্পেনের ফ্র্যাংকোর এবং পর্তুগালের সালাজারের সরকার আজ দুনিয়াতে সবচাইতে ‘স্থিতিশীল’ সরকার। কারণ গত প্রায় ৩০ বৎসরেও ফ্র্যাংকোর এবং সালাজারের রাজত্বের পরিবর্তন হয় নাই। কিন্তু দুনিয়ার জনগণ ফ্র্যাংকোর ও সালাজারের সরকারকে জঘন্য মানবতাবিরোধী নিরঙ্কুশ একনায়কত্ব বলিয়া নিন্দা করে ও ঘৃণা করে।

জনাব আইয়ুব খাঁর স্থিতিশীল এবং প্রেসিডেন্সিয়াল শাসন ও নিরঙ্কুশ একনায়কত্বের শাসন ব্যতীত আর কিছুই নহে। জনগণের উপর হিংস্র দমন নীতির স্টীম রোলার চালাইয়া এবং জনগণকে ভোটের অধিকার,ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রভৃতি মৌলিক অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়া জনাব আইয়ুব খাঁ’র স্থিতিশীল এবং প্রেসিডেন্সিয়াল শাসন প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। এই ‘স্থিতিশীলতা’ হইল মানুষের কবরের ‘স্থিতিশীলতা’ ।

 

সামরিক শক্তির জোড়ে ক্ষমতা দখল করিয়া পরে জনগণকে সমস্ত অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়া গদীতে টিকিয়া থাকিলেই উহাকে ‘স্থিতিশীল’ সরকার বলিয়া অভিহিত করা যায় না। ‘স্থিতিশীল’ সরকারের আসল ভিত্তিই হইল দেশের জনগণের সমর্থন। যখন কোন দেশের জনগণ নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছায় ও নিজেদের ভোটে কোন সরকার গঠন করে তখনই সে দেশের সরকার সত্যিকারের ‘স্থিতিশীলতা’ লাভ করে।

আমাদের দেশে এরূপ স্থিতিশীল সরকার গঠনের জন্য আজ জনাব আইয়ুব খাঁ’র প্রেসিডেন্সিয়াল শাসন তথা একনায়কত্বের অবসান করিয়া পার্লামেন্টারী শাসন প্রবর্তিত করিয়া জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সরকার গঠনের ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছে।

পূর্বে বহু মন্ত্রিসভার নাটকীয় পরিবর্তন প্রভৃতি দেখিয়া অনেকের হয়ত এরূপ আশংকা হইতে পারে যে,পার্লামেন্টারী শাসন ব্যবস্থা চালু হইলে আবার ঐসব ঘটনা ঘটিবে।

কিন্তু গত সংখ্যার আলোচনাতেই ইহা দেখান হইয়াছে যে, পার্লামেন্টারী শাসন ব্যবস্থার জন্য ঐসব ঘটনা ঘটে নাই। ঐ ঘটনার মূল কারণ ছিল গণবিরোধী শক্তিগুলির চক্রান্ত।

আমাদের দেশে পার্লামেন্টারী শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হইলে বিভিন্ন মত ও আদর্শের অনুসারী দলসমূহের ভিতর ক্ষমতা দখলের জন্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলিতে পারে এবং চলিবেও। বিভিন্ন সময়ে সরকারের পরিবর্তনও হইতে পারে।

কিন্তু ইহাতে দেশের কোন ক্ষতি হইবার কথা নয়।কারণ বিভিন্ন দল ক্ষমতার জন্য যত কিছুই করুক না কেন, পার্লামেন্টারী ব্যবস্থা চালু থাকিলে বিভিন্ন দলকে পরিশেষে ভোটের জন্য জনতার দুয়ারে উপস্থিত হইতে হইবে।জনগণই তখন বিচার করিবেন কোন দল ভাল কোন দল মন্দ এবং এই বিচার করিয়াই জনগণ বিভিন্ন দলের পক্ষে ও বিপক্ষে ভোট দিবেন। যে দল জনগণের অধিকাংশের ভোট পাইয়া আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করিবে সেই দল সরকার গঠন করিবে।এই পন্থা হইল সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক।ইহাতে দেশের অনিষ্ট হইতে পারেনা।বরং বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক শিক্ষা হইবে, জনগণের রাজনৈতিক চেতনা বাড়িবে এবং দেশে ‘চক্রান্তের রাজনীতির’ বদলে একটা সুস্থ রাজনৈতিক জীবন গড়িয়া উঠিবে। দেশের প্রগতির জন্য ইহা অবশ্য প্রয়োজন।

ঐ পন্থায় সরকার পরিবর্তিত হইলেও দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভাঙ্গে না। কেননা,যে কোন দলই সরকার গঠন করুক,উহাকে দেশের জনগণের সমর্থন ও ভোট নিয়া ইহা করিতে হইবে। ইহার ফলে দরকার পরিবর্তিত হইলেও,নতুন সরকারও স্থিতিশীল হইয়া দেশ শাসন করে। ইহার দৃষ্টান্ত আমরা দেখিতে পাইতেছি বৃটেনে।

তাছাড়া,ইহাও উপলব্ধি করা দরকার যে আজ ‘স্থিতিশীলতার’ নাম করিয়া জনাব আইয়ুন খাঁ যে প্রেসিডেন্সিয়াল শাসন প্রবর্তন করিয়াছেন উহার মূল কথা হইল এক নায়কত্ব। সহজ কথা উহা হইল একের শাসন।

 

পার্লামেন্টারী প্রথায় যে শাসন চালু হইবে উহার সার্বভৌম ক্ষমতা থাকিবে জনগণের ভোটে নির্বাচিত আইনসভার হাতে। ইহা হইল গণতন্ত্র। সহজ কথায় ইহা হইল দলের শাসন।

এই দুই শাসন ব্যবস্থার ভিতর কোনটি দেশের পক্ষে ভাল- একনায়কত্ব না গণতন্ত্র? একের শাসন না দলের শাসন? ইহা জনগণকে বিচার করিতে হইবে।

 

আইয়ুবীউন্নয়নেরচেহারা

জনাব আইয়ুব খাঁ শাসনের আমলে দেশের নানাবিধ ‘উন্নয়ন’ করা হইয়াছে বলিয়া রেডিও,সরকারী দলের সংবাদপত্র ও বক্তৃতামঞ্চ হইতে অহরহ প্রচার করা হইতেছে।

স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর হইতে দেশে শিল্পের অগ্রগতি হইয়াছে এবং কলকারখানার সংখ্যা ও উৎপাদন বৃদ্ধি পাইয়াছে। গত ১৭ বৎসরেই ইহা ঘটিয়াছে। ইহা বিশেষ কোন সরকারের কৃতিত্ব নহে। তবে এই সঙ্গে ইহাও

 

 

 

 

<2.42.236-240>

স্মরণ রাখা দরকার যে, গত ১৭ বছরে দেশে শিল্পের যে  অগ্রগতি সম্ভব ছিল তাহা হয় নাই। আজও ইস্পাত শিল্প ও যন্ত্র নির্মাণ শিল্প গড়িয়া উঠে নাই। দেশের মূল সম্পদ এখনও আসে কৃষি হতে। আজও দেশ অনগ্রসর কৃষি প্রধান দেশই রহিয়াছে।

 

ইহা ছাড়া, শুধু সারা দেশের কলকারখানার সংখ্যা দ্বারা পাকিস্তানের মত দেশের উন্নয়নের পরিমাপ করা চলে না। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্থানে- দেশের এই উভয় অংশে এবং পশ্চিম পাকিস্থানের বিভিন্ন অঞ্চলেও একই পর্যায়ে উন্নয়নকার্য চলিতেছে কিনা তাহা একটি প্রধান বিচার্য বিষয়।

 

এই দিক দিয়া বিচার করিলে দেখা যায় যে যদিও পূর্ব পাকিস্থান সবচেয়ে বেশী বৈদিশিক মূদ্রা আহরণ করে তথাপি উহার অধিকাংশ পূর্ব পাকিস্থানের উন্নয়নের জন্য ব্যয়িত না হইয়া উহার সিংহভাগ ব্যয় করা হয় আদমজী, দাউদ , সায়গল , গান্ধারা প্রমুখ মুষ্টমেয় বড় ধনিকের স্বার্থে। পূর্ব পাকিস্থানের উন্নয়ন পরিকল্পনা রচনা ও পরিচালনার দায়িত্ব  এখানে গণনির্বাচিত সরকারে হাতে না দিয়ে উহা রাখা হইয়াছে সদূর রাওয়ালপিন্ডিতে – বড় ধনিকগোষ্ঠির পেটোয়া একটি চক্রের হাতে। তদুপরি, পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প , ব্যংক, ব্যবসা প্রভৃতির উপর অবাধ অধিকার আদমজী, দাউদ, সায়গল ,গান্ধারা প্রমুখ মুষ্টিমেয় বড় ধনিকের হাতে তুলিয়া দেওয়া হইয়ছে। এ সবের ফলে পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন কাজ অবহেলিত । অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভিতর বৈষম্য বিরাজ করিতেছে।

 

পশ্চিম পাকিস্তানের কতকগুলি অঞ্চল বিশেষতঃ সাবেক বেলুচিস্তান ও সিন্ধু সম্পর্কেও একই কথা খাটে।

 

বস্তুতঃ আইয়ুব সরকার উন্নয়নের নামে আদমজী, দাউদ , সায়গল , গান্ধারা প্রমুখ মুষ্টিমেয় বড় ধনিকের স্বার্থ রক্ষায় যে নীতি অনুরসণ করিতেছে, তাহার ফলে দেশে এক বৈষম্যমুলক ও অসম অর্থনীতি গড়িয়া উঠিয়াছে। ইহার পরিমান হইবে মারাত্নক।

 

দ্বিতীয়তঃ দেশর উন্নয়নের প্রধান নিরিখ হইল জনগণের জীবন ধারনের উন্নয়ন। এদিক দিয়া বিচার  করিলেও দেখা যায় যে, আগমজী দাউদ , সায়গল , গান্ধারা প্রমুখ সামান্য কয়েকটি ধনিক পরিবার শ্রমিকদিগকে শোষণ করিয়া বছরে কোটি কোটি টাকা মুনাফা করিতেছে। ইহাদের মুনাফার হার হইল শতকরা ২০০-৩০০ ভাগ, যা সভ্য দুনিয়ার কোন দেশেই নাই, কোন কোন কোম্পানী- যেমন গান্ধারা ইন্ড্রাস্ট্রিজ গত ৪/৫ বছরে  কোটি কোটি টাকার মালিক হইয়াছে। অপরদিকে সমস্ত কল-কারখানা যাঁহাদের শ্রমে চালু থাকে, সেই শ্রমিকের শ্রেণী থাকে উপবাস।

 

মুষ্টিমেয় বৃহৎ ব্যবসায়ী বাজরের কারসাজি দ্বারা জিনিসপত্রের দাম ক্রমাগত বাড়াইতেছে। এই ফটকাবাজ দ্বারা ইহারা কোটি কোটি টাকার লাভ করে। অপরদিকে নিত্যব্যবহার্য  জিনিসপত্রর দাম আকাশচুম্বী হওয়ার ফলে জনগণের ঘরে ঘরে হাহাকার পড়িয়া গিয়াছে।

 

ভূমি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে গণবিরোধী আইয়ুব সরকার পূর্ব  পাকিস্তানের বড় বড়  জোতদারদের জমির সিলিং  ১০০ বিঘা হইতে বৃদ্ধি করিয়া ৩৭৫ বিঘায় স্থির করিয়াছে। অপরদিকে, কৃষকদের ভিতর শতকরা ৭৬ জন হইল ভূমিহীন ও গরীব । পশ্চিম পাকিস্তানে বড় বড় ভূস্বামীদের জমির সিলিং ১৫০০ বিঘায় স্থির করা হইয়াছে। পক্ষান্তরে, সেখানে শতকরা প্রায় ৮০ জন ভূমিহীন ও গরীব । সারা পাকিস্তানে কৃষকদের উপর খাজনা ও ট্যাক্স বহুগুণ বৃদ্ধি করা হইয়াছে।

 

ভূমি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে গণবিরোধী সরকারের এইসব নীতি ও কাজের ফলে আমাদের দেশের কৃষকগণ ,যাহারা জনসংখ্যার প্রায় ৮০ ভাগ, তাহারা অভাব , উপবাস ও অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবিয়া আছেন।

 

ইহা হইল আইয়ুবী “উন্নয়নের” আসল চেহেরা । গ্রামের ওয়ার্কাস প্রোগ্রাম হইয়াছে দুর্নীতির এক আখড়া। ওয়ার্কস প্রোগ্রামের টাকা আসে পি,এল ৪৮০ দ্বারা অনুযায়ী প্রদত্ত আমেরিকার দেওয়া গম বিক্রী হইতে। 

মার্কিনীদের এই টাকা ঢালা হইতেছে গ্রামে গ্রামে। ইহাতে গ্রামের রাস্তা ঘাটের উন্নয়ন যতটুকু হয় তার চেয়ে অনক বেশী উন্নতি হয় কতকগুলি দুর্নীতিপরায়ণ লোকের। এই দুর্নীতিপরায়ণ লোকগুলিই হইতেছে গ্রামে গ্রামে আইয়ুব সরকারের সমর্থক। প্রকৃতপক্ষে, ওয়ার্কস গ্রোগ্রামের টাকা ছড়াইয়া দুর্নীতির মাধ্যেমে সরকার গ্রামে গ্রামে তাহার সমর্থক একদল টাউট সৃষ্টি করিয়াছে। দেশ আজ দুর্নীতিতে ভরিয়া গিয়াছে।

 

বস্তুতঃ আইয়ুব সরকারের উন্নয়নের বদৌলতে সারা পাকিস্তানে আজ আদমজী, দাউদ সায়গন প্রমুখ গুটিকয়েক ধনিক পরিবারের শোষণের সাম্রাজ্য গড়িয়া উঠিতেছে। বড় বড় ভূস্বমীরা অবাধে কৃষকদের শোষণ করিতেছে, ব্যবসায় মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের অবাধ কর্তৃত্ব কয়েম হইয়াছে এবং গ্রামে গ্রামে দুর্নীতিপরায়ন টাউটদের  রাজত্ব চলিতেছে। পক্ষান্তরে শ্রমিমি, কৃষক ও জনগণ দিন যাপন করেন অভাবে ও উপবাসে।

 

বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের শোষণ

 

এহেন আইয়ুব সরকার বৈদেশিক নীতি নিয়াও আবার গর্ব করে পাকিস্তানের বৈদেশিক নীতিতে গত তিন চার বৎসরের ভিতর কয়েকটি পবির্তন ঘটিয়াছে। ইহার প্রধান কারণ হইল দুনিয়ার রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন এবং দেশের অভ্যন্তরে মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে জনগণের বিক্ষোভ। দুনিয়ার রাজনীতিতে মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদীরা যেভাবে মার খাইতেছে এবং ভারতের অস্ত্র সাহয্য ও অন্যান্য অভিজ্ঞতায় পাকিস্তানের জনগণ যেভাবে মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে বিক্ষুদ্ধ হইয়াছে , তাহাতে পাকিস্তানের কোন সরকারের পক্ষেই আর পূর্বের মত নির্লজ্জভাবে মার্কনদের সঙ্গে সহযোগিতা করা সম্ভব নহে। পাকিস্তানের বৈদিশিক নীতির পরিবর্তনগুলির মূল কারণ হইল কতকগুলি ঘটনা প্রবাহ । যাহার ভিতর আইয়ুব সরকারের কেরামতি নগণ্য।

 

জনাব আইয়ুব খাঁ আজ যদি সত্যি সত্যিই বৈদিশিক নীতির পরিবর্তন কামনা করেন, তাহা হইলে তিনি কেন “সিটো” ও “সেন্টো” বাতিল করিতেছেন না? মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদীদের সহিত অনুষ্ঠিত অন্যান্য অসম দ্বিপক্ষীয় সামরিক চুক্তি গুলিও তিনি নাকচ করিতেছেন না কেন?

 

মার্কিনীদের সহিত সামরিক চুক্তিসমূহ অনুষ্ঠানের ইতিহাস যাঁহারা অবগত আছেন, তাহারা জানেন যে, পাকিস্তানর যে চারজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বার বার আমেরিকা গয়ে মার্কিনীদের সামরিক ও অর্থ সাহয্য ভিক্ষা করিয়াছন, তাহাদের ভিতর তদানীন্তন সেনাধ্যক্ষ জনাব আইয়ুব খাঁ ছিলেন অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। ১৯৫১-৫৩ সনে গোলাম আযম, ইস্কান্দার মির্জা, জনাব আইয়ুব খাঁ প্রমুখরা বার বার মার্কিনী মুল্লুখে গিয়া ঐসব চুক্তি রচনার জন্য দেন-দরবার করিয়াছেন । ঐ সব চুক্তির আসন রচিয়তা তাহারা ।

 

যেসব চু্ক্তি রচনাতে জনাব আইয়ুব খাঁ অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করিয়াছিলেন, সেই সব চুক্তি তিনি স্বেচ্ছায় বাতিল করবেন, সে আশা করা বৃথা।

 

আইয়ুব সরকারের আমলে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে মার্কিনী পুজিঁর শোষণও বিন্দু মাত্র কমে নাই বরং মার্কিনী পুজিঁর অনুপ্রবেশ ক্রমাগত বড়িয়া চলিতেছে এবং বর্তমানে মার্কিনী ঋনের পরিমান ১০০০ কোটি  টাকার ঊর্দ্ধে উঠিয়াছে। দু এক বৎসরের মধ্যেই ইহার সুদ হিসাবে বৎসর প্রায় ৫০ কোটি টাকার বৈদিশিক মুদ্রা খরচ করিতে হইবে। দেশটাই যেন মর্কিনী ঋণের নিকট বাঁধা পড়িয়া গিয়াছে।

 

দেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন হইতে যে বৃটিশ পজিঁ নিয়োজিত ছিল তাহা এখনও রহিয়োছে। অন্যান্য সাম্রজ্যবাদী পুজিও নতুন করিয়া অনুপ্রবেশ করিতেছে। ইহারাও দেশের সম্পদ শোষণ করিয়া নিতেছে।

যুক্তফ্রন্টের বিরুদ্ধে গণবিরোধীদের আক্রমণ

 

পূর্ব পকিস্তানের গণমানসে বিভ্রান্ত সৃস্ট জন্য প্রেসিডেন্ট পদের কনভেনশন লীগ মনোনীত প্রার্থী জনাব আইয়ূব কাঁ তাঁহার বক্তৃতায় বলিয়াছেন যে, ১৯৫৪ সনের “যুক্তফ্রন্ট” যেমন নেতদের কোন্দল’ ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল , সম্মিলিত বিরোধী দলের’ অবস্থাও তাহা হইবে।

জনাব আইয়ুব কাঁ এ বক্তব্য দ্বারা সত্য ঘটনাকে বিকৃত করিতেছেন মাত্র। ইহা অনস্বীকার্য যে, একটি পর্যায়ে যুক্তফ্রন্টের বিভিন্ন অঙ্গ দলগুলি নেতৃত্বের ভিতর নানরুপ বিরোধও দেখা দিয়াছিল। ‘যুক্তফ্রন্টে ভাঙ্গনও ধরিয়াছিল । ক্নিতু যুক্তফ্যন্টরে বিজয়ের পর হইতে শুরু করিয়া র্পর্বাপর সব ঘটনা গোপন রাখিয়া শুধু ঐ বিভেদের কথা উল্লেখ করা সত্যের বিকৃতি মাত্র।

  ১৯৫৪ সনের নির্বাচনে র্পর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ দল যখন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে পাঁচকোটি অধিবাসী একবাক্যে ‘যুক্তফ্রন্ট’ ও উহার ২১ দফা কর্মসূটি সমর্থন করিয়া প্রদেশের শাসনভার ‘যুক্তফ্রন্টর’ হাতে তুলিয়া দেয়, তখনই কেন্দ্রীয় শাসক মহলে বিষম দুশ্চিন্তার উদ্রেক হয়।  দুনিয়ার সামনে ইহা স্পষ্ট হইয়া গিয়াছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ দলের কোন পাত্তাই নাই। অপরদিকে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ট লোক বাস করে। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় লীগ মন্তসভার পদত্যাগ ও ইহার পুনর্গঠনই ছিল একমাত্র গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। কিংবা অন্ততঃ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় পূর্ব পাকিস্তানের যে সব লীগ নেতা অধিষ্ঠিত ছিলেন, তাঁহাদের পদত্যাগ অপরিহার্য ছিল। পূর্ব পাকিস্তান হইতে সেই দাবীও উঠিয়ছিল।

কিন্তু কেন্দ্রীয় শাসকবর্গ বিশেষ করিয়া তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ও তাঁহার সাঙ্গপাঙ্গরা গণতান্ত্রিক রীতিনীতি বা জনমতের কোন তোয়াক্কা করেন নাই। গণসমর্থন হীন মুসলিম লীগ দলই কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন রহিয়া গেল।পূর্ব পাকিস্তানের লীগ নেতারাও উহা হইতে পদতাগ করিলেন না । গণতন্ত্রের এই চরম খেলাপ ও পূর্ব পাকিস্তানের লীগ নেতাদের যেন তেন প্রকারের ক্সমতার গদী আঁকড়াইয়া থাকার নির্লজ্জ অভিলাষকে ‘যুক্তিসঙ্গত’ বলিয়া জাতির করার জন্য বড় বড় ধনিকের মুখপাত্র গুলি তার স্বারে চীৎকারে করিতে লাগিল যে, যেহেতু পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচন একটা প্রাদেশিক নির্বাচন মাত্রসেই হেতু ইহার ফলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসবার রদবদলে কোন প্রয়োজন নাই। মর্কিনী সাম্রাজ্যবাদীরা ও ইহার সমর্থনে আগাইয়া আসিয়ছিল। পকিস্তনে তদানীন্তন মার্কিনী রাষ্ট্রদূত মিঃ হিলড্রেথও কূটনৈতিক শীলতা বিসর্জন দিয়া এবং আমাদের দেশের আভ্যন্তরীন বঅপারে নাক গলাইয়া প্রকশ্যে ঘোষণা করেন যে, পূর্ব পকিস্তানের নির্বাচনের ফলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রসবায় রদবদলে প্রয়োজন নাই।

এই সব ঘটনা হইতে বুঝা যায় যে, মার্কিনী সাম্রজ্যাবাদ এবং তাহাদের সহয়োগী দেশের বৃহৎ চত্রের স্বার্থে, পরামর্শে ও সমর্থনে জনগণের রায় উপেক্সা করিয়া কেন্দ্রে মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভাকে বহাল রাখা হইয়াছিল। কিন্তু ইহাতেও সমস্যার সমাধান হইল না। কেননা পূর্ব পকিস্তানে ইতিমধ্যে ‘যুক্তফ্রন্ট’ মন্ত্রিসভা কায়েম হইয়াছিল। এই মন্ত্রিসবা ২১ দফা কর্মসূচী পূরণে ওয়াদাবদ্ধ ছিরৈন। যুক্তফ্রন্টের নবনির্বাচিত আইন পরিষদ সদস্যদের অদিকসংখ্যক এক প্রকাশ্য বিবৃতি মারফত পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি (তখন এরুপ চুক্তি অনুষ্ঠানের আলাচনা চলিতেছিল) অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও জানাইয়াছিলেন। কাজেই পূর্ব পকিস্তানে যুক্তপ্যন্ট মন্ত্রিসবাকে পদচ্যুত করা বিদেশী-দেশী কায়েমী স্বর্থবাদীদের পক্ষে জরুরী প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছিল।

শুরু হইল পর্দার আড়ালে ষড়যন্ত্র। মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদীদের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র নিউইর্য়ক টাইমস এর করাচীস্থ ভাড়াটিয়া সংবাদদাতা কালাহান এক আজগুবী খবর পরিবেশন কলি যে, পূর্ব পাকিস্তান যুক্তফ্রন্ট।

মন্ত্রিসভার মূখ্যমন্ত্রী জনাব ফজলুল হক তাঁহার (কালাহনের) সহিত এক সাক্ষাৎকারে বলিয়াছেন যে, পতিনি পূর্ব পাকিস্তানেরও পশ্চিম বঙ্গের একত্রীকরণ কামনা করেন।

সাম্রাজ্যবাদের ভাড়াটিয়া কালাহানের পরিবেশিত ঐ মিথ্যা খবরকে সম্বল করিয়া কেন্দ্রীয় শাসকচক্র যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে “গাদ্দারের” মন্ত্রিসভা বলিয়া উহার বিরুদ্ধে সারা দেশব্যাপী এক বিরাট প্রচার অভিযান শুরু করিল। ইহার সঙ্গে সঙ্গেই সংঘটিত হইল আদমজী মিলে বাঙ্গালী ও অবাঙ্গালী শ্রমিকদের ভিতর রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা। ঐ দাঙ্গার সহিত জড়িত কয়েকটি মামলায় ইহা প্রমানিত হইয়ছিল যে, আদমজী মিলের কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী সুপরিকল্পিতভাবে ঐ দাঙ্গা বাধাইয়াছিল। করাচীর নির্দেশেই ঐ দাঙ্গা সংঘটিত হইয়াছিল।

ঐ দাঙ্গার অব্যবহিত পরেই আইন ও শৃঙ্খলার অজুহাতে গণনির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে কেন্দ্রের নির্দেশে গদিচ্যুত করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানে জারি হয় ৯২ (ক) ধারার সন্ত্রাস এবং পূর্ব পাকিস্তান শাসনের একচ্ছত্র অধিকার দেওয়া হয় ইস্কান্দার মীর্জার হাতে। গোলাম মোহাম্মদ তখন পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল, জনাব আইয়ুব খাঁ তখন পাকিন্তান সেনাবাহিনীর অধিনায়ক এবং মার্কিনীদের পরম সুহৃদ, বগুড়ার মোহাম্মদ আলী তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এইসব উজ্জ্বল রত্নের সমাবেশের পটভূমিকাতেই গণবিরোধীদের আক্রমণে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকেও ভাঙ্গা হয়। ইহাই যুক্তফ্রন্ট ভাঙ্গনের প্রথম পর্ব। উল্লেখযোগ্য যে, যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার পদচ্যুতির কয়েকদিন পরেই প্রথম পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

 

বিভেদের ষড়যন্ত্রের জাল

যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার অপসারণেও কেন্দ্রীয় শাসকবর্গের সমস্যার সমাধান হইল না। মন্ত্রিসভা গদীতে না থাকিলেও পূব পাকিস্তানের জনগণের অটুট সমর্থন রহিয়া গেলো ‘যুক্তফ্রন্টের’ পিছনে। এখানে প্রশাসনিক বিভাগ কেন্দ্রীয় শাসকবর্গের হতে থাকিলেও জনগণের ভিতর তাহদের কোন সমর্থনই ছিল না। ইহাই ছিল কেন্দ্রীয় শাসকবর্গের বিষয় সমস্যা। কেননা, করাচী হইতে সহস্র মাইল দূরে অবস্থিত সাড়ে পাঁচ কোটি লোকের বাসভূমি পূর্ব পাকিস্তানকে এরুপভাবে শাসন করা যায় না। তাই ‘যুক্তফ্রন্টের’ বিভিন্ন অঙ্গদলের নেতাদের মন্ত্রিত্বের গদী দ্বারা প্রলুব্ধ করিয়া তাঁহাদের হাত করার জন্য এক গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হইল।

উপরতলার ষড়যন্ত্রের উপযোগী ক্ষেত্রেও তখন বিরাজ করিতেছিল। পূর্ব পাকিস্তান তখন ব্যাপক সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত। হাজার হাজার গণতান্ত্রিক কর্মী ও নেতা তখন কারারুদ্ধ, সভা সমিতি করার অধিকার হইতে জনগণ বঞ্চিত। রাজনৈতিক দলগুলি স্বাধনিভাবে কাজ করিতে পারিতেছিল না। এই শ্বাসরু্দ্ধকরা পরিস্থিতিতে গোলাম মোহাম্মদ- ইস্কান্দার চত্রের দূতগণ দেশে ও বিদেশে যুক্তফ্রন্ট নেতাদের দুয়ারে ধর্না দিয়া আলাদা আলাদাভাবে তাঁহাদেরকে মন্ত্রিত্ব গ্রহনের জন্য আমন্ত্রন জানাইতে লাগিল। যে নেতাদের একদা ‘গাদ্দার’ বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছিল, সেই নেতাদের নিকট শাসকবর্গের গোপন দূত আনাগোনা করিতে লাগিল।

 

‘যক্তিফ্রন্টের’ অনেক নেতা তখনই ঐ ফাদেঁ পা দিয়াছিল। মন্ত্রিত্বের গদীর জন্য তাহারা অনেকে গোলাম মোহাম্মদ ইস্কান্দার চক্রের সাথে আপোস করিয়াছিলেন। তাঁহাদের ঐ দুর্বলতা, ঐ নীতি বিগর্হিত কাজ হাজার বার নিন্দনীয়। কিন্তু ইহা বাস্তব সত্য যে, মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদীদের পরামর্শে ও সাহয্যে এবাং দেশীয় কায়েমী স্বার্থবাদীদের স্বার্থে গোলাম মেহাম্মদ ইস্কান্দার চক্র শুধু পশশক্তিবলে গণনির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে পদচ্যুত করিয়া যে ভাঙ্গনের পালা শুরু করিয়াছিল এবং যুক্তফ্রন্টের ঐক্য চুরমার করিয়া দেওয়ার জন্য ঐ গণবিরোধী চক্র ষড়যন্ত্রের যে জাল বিস্তার করিয়াছিল এবং যুক্তফ্রন্টের অনেক নেতা উহার শিকারে পরিণত হইয়াছিল। যুক্তফ্রন্ট ভাঙ্গনের প্রধান দায়িত্ব ছিল মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদের অনুগত এবং দেশের কায়েমী স্বার্থবাদীদের মুখপাত্র এ গণরিরোধী চত্রের । জনাব আইয়ুব খাঁ আজ অস্বীকার করিতে পারিবেন না যে, তিনিও ঐ চক্রের অন্যতম মধ্য মণিরুপে কাজ করিয়াছিল। যুক্তফ্রন্ট ভাঙ্গনের কাজে তাহার হাত ও কলংঙ্খিত

 

 

                                       গণতন্ত্রই অগ্রগতির পথ

১৯৫৪ সনে গণবিরোধীরা চক্রান্ত করিয়া যেভাবে যুক্তফ্রন্টে ভাঙ্গন ধরাইয়াছিল, তাহার পুনরাবৃত্তি যাহাহে ঘটিতে না পারে, সেই জন্যই আজ সম্মিলিত বিরোধীদলের পক্ষ হইতে পূর্ব গণতন্ত্র এবং জনগণের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পালামেন্টারী মাসনের দাবী উথাপিত হইয়াছে। যুক্তফ্রন্ট ভাঙ্গননের যে বাস্তব কারণসমূহের কতা উপরে বলা হইয়াছে, তাহাতে বুঝা যায় যে, তকন যদি গণবিরোধীদের চক্রান্তের রাজনীতরি বদরে দেশ সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনৈতকি পদ্ধতি চালু করা যাইত, তাহা হইলে যু্ক্তফ্রন্টে ঐ ভাঙ্গন আসিত না। যুক্তফ্যন্ট নেতাদের ভিতর দলাদলিও হইলেও মন্ত্রিত্ব লাভর জন্য তাহাদেঁর উপরতলার গণবিরোধী চত্রের শরনাপন্ন না হইয়া জনগণের দুয়োরে উপস্থিত হইয়া গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাহার চেষ্টা করিতে হইত। কিন্তু, গোলাম মোহাম্মদ ইসকান্দার চক্র তখন ঐ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকেই হত্যা করিয়অছিল। গোলাম মোহাম্মদ ইস্কান্দার মীর্জা যাহা শুরু করিয়া গিয়াছিল, জনাব আইয়ুব খাঁ তাহার পরিসমাপ্তি ঘটাইয়েছন ১৯৫৮ সনের অক্টোবর মাসে সামরিক শাসন জারির মাধ্যেমে।

সেই অবস্থা হইতে আজ গণতন্ত্রকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার জন্য সম্মিলিত বিরোধীদল নির্বাচনী সংগ্রামে নামিয়অছে। যদি বিরোধী দলের এই প্রচেষ্টা সফল হয়, যদি জনগণের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পার্লামেন্টারী ব্যবসতা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, তাহা হইল তখন সম্মিলিত বিরোধী দলের অঙ্গদলগুলি নিজেদের ভিতর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দিতা করিলেও , সেই অবস্থায়,যে সরকারই গঠিত হউক, তাহকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হইতে হইবে। ইহার ফলে দেশের কোন অমঙ্গল হওয়া তো দূরে থাকুক দেশে সুস্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতি গড়িয়া উঠিবে। বস্তুতঃ আধুনিক পার্লামেন্টারি গণতান্ত্রিক শাসনের মুল কতাই হইল বিভিন্ন কর্মসূচী নিয়া বিভিন্ন রাজনেতিক দলের ভিতর প্রতিদ্বন্দিতা এবং জনগণের ভোটে যে কোন দরে সরকার গঠিত হওয়া । কাজেই পার্লামেন্টারী শাসনের অধীনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেও থাকিবে, ঐ দলগুলির ভিতর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দিতাও থাকিবে।

সম্মিলিত বিরোধীদল ঐরুপ শাসন ব্যবস্থা কায়েম করিয়া জনগণের হতে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিতে চায়। এরুপ গনতান্ত্রিকপরিবেশেই দেমৈর সত্যিকারের অগ্রগতি হইতে পারে। ইহাতে আবার ১৯৫৪ সনের মত নোংরা দলাদলি হইবে- এরুপ কোন কতা আসিতে পার না। তখন আসিবে নীতি ও কর্মসূচির ভিত্তিতে সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দিতা যা ভালমন্দ বিচার হইবে জনগণের সুউচ্চ দরবারে।

 

সম্মিলিত বিরোধীদলকে জনসমক্ষে হেয় বলিয়া প্রতিপন্ন করার জন্য জনাব আইয়ুব খাঁ আরও বলিয়াছেন যে, ১৯৫৪ সনের ‘যু্ক্তফ্রন্টের’ নের্তৃত্ব ছিল মরহুম ‘ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী ন্যায় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান নেতাদের হাতে আজ ইহাদের তুলনায় ‘সম্মিলিত বিরোধীদলের বর্তমান নেতারা বামন মাত্র।

           ব্যাক্তির প্রশ্ন নহেপ্রশ্ন আদর্শের

 

জনাব আইয়ুব খাঁর কথার কোন ঠিকই নাই। কোন কোন স্থানে তিনি যুক্তফ্রন্টের সব নেতাদের কসিয়া গালি দিতেছেন, আবর সুযোগ বুঝিয়া তাঁহাদের প্রশংসা করিতেছেন। ইহার নাম চরম সুবিধা বাদ।

যাহা হউক, মরহুম শেরে বাংলা ও সোহারাওয়ার্দীর তুলনায় রাজনৈতিক বিচক্ষণতা প্রভৃতি দিক দিয়া আজিকার সম্মিলিত বিরোধীদলের নেতৃত্ব দুর্বল না সবল সে প্রশ্ন একানে প্রধান নয়। জনাব আইয়ুব খাঁর জানা দরকার যে, মরহুম শেরে বাংলা ও সোহারাওয়ার্দী সারা জীবন গণতন্ত্রের যে আর্দশের জন্য কাজ করিয়া গিয়াছেন, সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই আজ সম্মিলিত বিরোধীদলের নেতৃত্ব একনায়কত্বের বিরুদ্ধে।

দাঁড়াইয়াছেন। এখানে প্রশ্ন ব্যক্তির নহে এখানে প্রশ্ন হইল আদর্শ ও কর্মসূচীর, জনগণের নিকটও ব্যক্তির চাইতে আদর্শ ও কর্মসূচীর প্রশ্নই বড় প্রশ্ন। তাই দেখা যাইতেছে যে, মরহুম ফজলুল হোক, সোহরাওয়ার্দী প্রমুখের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘যুক্তফ্রন্ট’ এর আহ্বানে জনগণ যেরূপ সাড়া দিয়েছিলেন, আজও ‘সম্মিলিত বিরোধী দলের’ আহ্বানে জনগণ সাড়া দিয়েছেন।

সম্মিলিত বিরোধী দলের সপক্ষে গণজাগরণ দেখিয়া জনাব আইয়ুব খাঁ একেবারে বে-সামাল হইয়া পড়িয়াছেন। অন্য কোন পথ না পাইয়া তিনি এখ ‘সম্মিলিত বিরোধীদল’ জয়ী হইলে আবার সামরিক শাসন জারির হুমকি পর্যন্ত প্রদর্শন করিতেছেন।

কিন্তু দেশের জনগণ জানেন যে, কঠোর সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়াই গণতন্ত্রের সংগ্রাম জয়ী হইবে। কোন হুমকি জনগণকে গণতন্ত্রের সংগ্রাম হইতে বিচ্যুত করিতে পারিবে না।

                                      সম্মিলিত বিরোধী দলের দাবী

জনাব আইয়ুব খাঁর একনায়কত্বের অধীনে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হইয়াছে, ভোটাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা কাড়িয়া নেওয়া হইয়াছে। জাতিসমূহের স্বায়ত্তশাসন পদদলিত হইয়াছে এবং দেশপ্রেমিক কর্মীগণ কারাগারে পচিতেছেন। এই একনায়কত্বের অধীনে মার্কিনী ও অন্যান্য কায়েমী স্বার্থবাদীদের শোষণের রাজত্ব গড়িয়া উঠিয়াছে। এই একনায়কত্বের অধীনে মার্কিনী ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি দেশের ধন-সম্পদ লুট করিয়া নিয়া যাইতেছে এবং আমাদের দেশ এখনও সিটো ও সেন্টোর অন্তর্ভুক্ত রহিয়াছে।

এই একনায়কত্বের অধীনে সুবিধা হইয়াছে শুধু দেশী ও বিদেশী শোষকদের। জনগণের ভাগ্যে জুটিয়াছে শুধু জুলুম, নিপীড়ন, অনটন ও উপবাস। স্বাধীন দেশের নাগরিক হইয়াও দেশের জনগণ জনাব আইয়ুব খাঁর শাসনে সব অধিকার হারাইয়াছে।

এই অসহ্য অবস্থার প্রতিকারের জন্য নির্বাচনে ‘সম্মিলিত বিরোধীদল’ একনায়কত্বের অবসান ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবী জোর গলায় উত্থাপিত করিয়াছে। ‘ সম্মিলিত বিরোধীদল’ আরও দাবী করিয়াছে যে, (১) জনগণের ভোটাধিকার ও প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতে পার্লামেন্টারি শাসন প্রবর্তিত হোক; (২) জনগণের পূর্ণ ব্যক্তিস্বাধীনতা স্বীকৃত হোক; (৩) সকল রাজবন্দীদের মুক্তি দেওয়া হোক; (৪) সমস্ত দমনমূলক আইন নাকচ করা হোক; (৫) খাজনা-ট্যাক্স কমানো হোক এবং (৬) দুর্নীতি উচ্ছেদ করা হোক, ইত্যাদি। ‘ সম্মিলিত বিরোধী দল’ এর পক্ষ হইতে দেশবরেণ্য মিস ফাতেমা জিন্নাহ্ আজ প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থী হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থিত হইয়াছেন।

‘ সম্মিলিত বিরোধীদল’ এর মূলকথাই হইল যে, দেশের প্রগতির জন্য আজ সর্বপ্রথম প্রয়োজন হইল জুলুমবাজ একনায়কত্বের অবসান করা এবং পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়া জনগণের হৃত অধিকারগুলি ফিরাইয়া দেওয়া এবং জনগণের হাতে দেশের সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া। ‘সম্মিলিত বিরোধীদল’ জনগণের এই মৌলিক অধিকারের দাবীই উত্থাপন করিয়াছে।

তাই দেশের জনগণের নিকট আমাদের আবেদন-

* একনায়কত্ব অবসানের জন্য,
* গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য,
* আপনাদের অধিকারগুলি ফিরিয়া পাইবার জন্য,
* আপনাদের দুর্দশা লাঘব করিবার জন্য মিস জিন্নাহকে জয়যুক্ত করুন।