জনৈক অধ্যাপকের কাছে লিখিত ওয়াশিংটনস্থ পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূতের চিঠি

Posted on Posted in 7

৭.২২.৫৪-৫৫

শিরোনামসূত্রতারিখ
২২। জনৈক অধ্যাপকের কাছে লিখিত ওয়াশিংটনস্থ পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূতের চিঠিপাকিস্তান দূতাবাসের দলিলপত্র৩০এপ্রিল,১৯৭১

 

পাকিস্তান দূতাবাস
ওয়াশিংটন ডিসি ২০০০৮
এপ্রিল ৩০,১৯৭১
মাননীয় অধ্যাপক,

আপনার অনুরোধক্রমে আমি আপনাদের সম্মিলিতভাবে স্বাক্ষরিত উদ্বেগ প্রকাশকারী বিবৃতিটি আমার সরকারের নিকট পৌঁছে দিয়েছি। যারা আমার কাছে বিবৃতিটি নিয়ে এসেছিলেন -অধ্যাপক রিগিনস(কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়) এবং অধ্যাপক হুইলার , তাদের সাথে আমি কিছু বিষয় নিয়ে বলেছি যা আমি আপনাকেও জানাতে চাই।

২. রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান এর সাথে ঢাকায় রাজনৈতিক আলোচনায়(যা শুরু হয় ১৫ মার্চ এবং শেষ হয় ২৫ মার্চ) বসার আগেই মার্চ এর ২ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমান তার অনুসারীদের আইন অমান্য করার আদেশ দেন এবং কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারে বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা দেন । এতে এক ধরণের অরাজকতার সৃষ্টি হয়, যা পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা ছাড়া উপায় ছিল না। রাস্তায় টহল দিয়ে বেড়ানো এসব সশস্ত্র দলগুলো লুটতরাজ চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়, এমনকি বাংলা বলতে না পারা নিজ দেশের নাগরিকদেরও খুন করছে। যদিও ওই সময় আলোচনা চলছিল,তারপরও এসব লুটতরাজ এবং খুন কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আওয়ামি লীগের বানানো সমান্তরাল সরকার ব্যবস্থাই মার্চ এর ২ তারিখ থেকে শুরু হওয়া পূর্ব পাকিস্তানের এই অরাজকতা এবং বিশৃংখলার জন্য দায়ী-যা দমন করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।

৩. সেনাবাহিনী তার উপর দেয়া দায়িত্ব সুষ্ঠু ভাবে পালন করেছে, আইনের শাসন পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেছে। আর আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি পরিমাণে বাড়িয়ে বলা হয়েছে,এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা সম্পূর্ণ বানোয়াট। এ সমস্ত প্রতিবেদনসমূহের উৎস একটিই-ভারত, যার প্রায় সবগুলো নিশ্চিতভাবেই বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমি ওয়াশিংটন পোস্টের নয়া দিল্লী প্রতিনিধি Mr. Lee Lescaze এর  ২ এপ্রিল,১৯৭১ এ লিখা প্রতিবেদন থেকে একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরছি,

        “ পূর্ব পাকিস্তানে চলমান অবস্থার প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়ার পিছনে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম যে ভূমিকা পালন করেছে তাতে করে একে আর নিরপেক্ষ বর্ণনাকারী হিসেবে অভিহিত করা যায় না, বরং বলা যায় যায় চলমান ঘটনাবলীর ই একটা অংশ। শেখ মুজিবুর রহমানের পূর্ব বাংলার মানুষের পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক বিজয়ের কথা বলতে যেয়ে একজন ভারতীয় কর্মকর্তা সংবাদপত্রের খবরগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘এটা সাংবাদিকতা ছিল না। এটা ছিল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’।

৪. বর্তমানে পূর্ব পাকিস্তানের সব জায়গাতেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে, যার জন্য রেড ক্রস বা অন্য কোন আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে সরকারের সাহায্য চাওয়ার প্রয়োজন নেই, এছাড়াও সেখানে প্রায় ৭০০ হাজার টন খাদ্য শষ্য এবং প্রচুর ঔষধ পত্র মজুদ রয়েছে যা গত বছরের নভেম্বর এ ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগ এর পর নিয়ে আসা হয়েছিল। উপরন্তু, যখন প্রয়োজন দেখা দিবে তখন আমাদের সরকার বন্ধুভাবাপন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন হতে সাহায্য নেয়ার ব্যাপারে সম্পুর্ণ আন্তরিক।

৫.আপনার মত যারা আমাদের দেশ এর পরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন-এমন প্রত্যেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ত্বের নিকট আলাদাভাবে চিঠি পাঠানোর ইচ্ছা ছিল,যাতে সব কিছুর সবিস্তারিত ব্যাখ্যা থাকবে। কিন্তু বর্তমানে অত্যধিক কাজের চাপে তা বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি আপনার আপত্তি না থাকে, এই চিঠির সাথে আমি আপনাকে আরেকটি চিঠির প্রতিলিপি পাঠাতে চাই,যা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ ডর্ফম্যান এর নিকট পাঠানো হয়েছিল। আশা করি এ থেকে আপনি দেশ এর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আরো ভালো ধারণা পাবেন।

৬. পাকিস্তানের দুই অংশের মানুষ যাতে সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে একসাথে বসবাস করতে পারে এবং নিজের ভবিষ্যৎ গঠনের লক্ষ্যে একসাথে কাজ করতে পারে সেজন্য আমাদের সরকার আঞ্চলিক অখন্ডতা এবং একাত্মতা বজায় রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনি এবং আপনার বিজ্ঞ সহকর্মীগণ আমাদের এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাবেন। আমারা বিশ্বাস করি, শক্তিশালী এবং অখন্ড পাকিস্তান শুধুমাত্র এর দুই অংশের জনগণের স্বার্থরক্ষায় অবদান রাখবে তা নয়, বরং তা সমগ্র দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার শান্তি এবং নিরাপত্তা রক্ষায় সহায়ক হবে।

 

ধন্যবাদান্তে

Sd.(এ. হিলালী)