জলোচ্ছ্বাসের পর কেন্দ্রের ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্টের প্রতি মাওলানা ভাসানীর আহ্বান

Posted on Posted in 2

<2.135.584-586>

শিরোনামসূত্রতারিখ
জলোচ্ছ্বাসের পর কেন্দ্রের ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট মওলানা ভাসানীর আহবানমওলানা ভাসানী (প্রচার পত্র)৩০ নভেম্বর,১৯৭০

 

জনগণের প্রতি মওলানা ভাসানীর ডাকঃ

পূর্ব পাকিস্তানের আজাদী রক্ষা ও মুক্তি-সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পড়ুন

আজ আমি পূর্ব পাকিস্তানের সাত কোটি বাঙালীকে তাহাদের জীবন-মরণ প্রশ্নের বিষয়টি পুনর্বার এবং শেবারের মত দলমত নির্বিশেষে ভাবিয়া দেখিতে আকুল আবেদন জানাইতেছি। বিগত ২৩টি বছরের তো বটেই, এমনকি চলতি ১৯৭০ সালটিকেই শুধু যদি আমরা জাচাই করিয়া দেখি তবে নিঃসন্দেহে একটি চূড়ান্ত সুদ্ধান্তে পৌছাতে পারিব। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট হইতে আমাদের, পূর্ব পাকিস্তানীদের আজাদীর লড়াই নতুনতম এবং শেষ পরজায়ের রূপ লাভ করিবার অপেক্ষায় আছে মাত্র। সেই পর্যায়ে, আর কোন যুক্তি ও শক্তি দ্বারা ধামা চাপা কিংবা দাবাইয়া রাখিবার প্রয়াস সহ্য করা হইবে না। মরণ কামড়ে আর গগনবিদারী হুংকারে নিস্তব্ধতা ভাঙ্গিয়া দিতে হইবে। দুই যুগ ধরিয়া বৈষম্য আর বঞ্চনার যে লড়াই শুরু করিবার প্রচার ও প্রচেষ্টা চলিতেছে তাহারই সকল সংগ্রামী রূপায়ণে, আমাদের জীবনের বিনিময়ে হইলেও, ঝাপাইয়া পড়িতে হইবে। আজ হইতে ১৩ বৎসর পুরবেই ষড়যন্ত্র, অত্যাচার, শোষণ আর বিশ্বাসঘাতকতার নাগপাশ হইতে মুক্তি লাভের জন্য দ্যর্থহীন কন্ঠে “আচ্ছালামু আলায়কুম” বলিয়াছিলাম, হয়তো বঙ্গবাসী সেইদিন নাটকের সব কয়টি অংক বুঝিয়া উঠিতে পারে নাই। আজ আশা করি সচেতন ও শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন কোন বাঙালীকে বুঝাইতে হইবে না যে, মানবতাবর্জিত সম্পর্কের মহড়া চুরান্ত পর্যায়ে উঠিয়াছে। এইবার নেমিসিসের অন্যায়ের সমুচিত শাস্তি বিধানের অপেক্ষায় আমরা আছি। জাহা হইবার তাহাই হইবে।

 

আমরা ভাবিয়াছিলাম ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত জিদ্ধ পাকিস্তানীদের নূতন শপথের সন্ধান দিবে। পূর্ব পাকিস্তানের বেতার, টেলিভিশন এবং সংবাদপত্র গুলি সেই পথ লক্ষ্য করিয়া যাবতীয় সার্ভিস দান করিয়াছিলেন। সরকারও লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়া পুস্তক প্রকাশনার ও দেশী বিদেশী সাহিত্যিক সাংবাদিকদের সফরের আয়োজন করিয়াছিলেন; কিন্তু আজ ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে যে, সরকারের সকল প্রচেষ্টার লক্ষ্যে ছিল পশ্চিম পাকিস্তান, কোন ক্ষেত্রেই সমগ্র পাকিস্তান নহে। এই কারণেই পূর্ব পাকিস্তানের সব প্রয়াস ব্যর্থ হইয়াছে। যুদ্ধ তহবিলে কোটি কোটি টাকা সাহায্য, কওমী গানের আসর, সাংবাদিকের ফিচার, সাহিত্যিকের রচনা সবই ধীকৃত ও উপেক্ষিক্ত হইয়াছে। সবচেয়ে বড় কথা হইল, বরাবরই আমরা কেন্দ্রীয় সরকার ও আমলা অফিসারদের তরফ হইতে যে আচরন পাইয়া আসিতেছিলাম আজ পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিটি রাজনৈতিক নেতা, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এক কথায় সকল মহল হইতেই সেই উপেক্ষা ও উদাসীনতা লাভ করিতেছি। ইহাতেও কি আমাদের চেতনার উদ্রেক হইবে না?

 

অতীতের ইতিহাস না আওড়াইয়া শুধু চলতি সালের ঘটনাবলী বিবেচনা করিয়া দেখিলে আমাদের লক্ষ্য শক্তির সংগ্রামে না পৌঁছাইয়া পারে না। পুনঃ পুনঃ বন্যা ও ঘূর্ণি বাত্যায়ে পূর্ব পাকিস্তান বিধ্বস্ত হইয়াছে এবং এইবার একই বৎসরে আমরা দুইটি বন্যা ও দুইটি ঘূর্ণিঝড়ে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হইয়াছি। প্রথম বারের বন্যায় পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে চারিশত কোটি টাকা মুল্যের ফসল, ঘর-বাড়ী, গবাদী পশু পানিতে ভাসিয়া গিয়াছে। দ্বিতীয় দফা বন্যা আমরা হারাইয়াছি অতিকষ্টে রোপন করা ধান, কলাই, তরিতরকারী ইত্যাদি। গত ২৩শে অক্টোবরের ঘূর্ণিঝড়ের পূর্ব পাকিস্তানের আটটি জেলার ঘর-বাড়ী, গাছ-পালা নির্ণয়াতীত ভাবে ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। আর সর্বশেষ দক্ষিণাঞ্চলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস যে ধ্বংসলীলা ও প্রাণহানি সংঘটিত করিয়াছে এবং বন্যা ও ঘূর্ণিনাত্যার পর পুনঃ পুনঃ কলেরা-মহামারীতে আক্রান্ত হিয়া সহস্র সহস্র লোক অকালে প্রাণ হারাইয়াছে ও হারাইতেছে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকবর্গ, ক্ষমতালোভী নেতৃবর্গ আর উদাসীন শিল্পী, সাহিত্যিক। সাংবাদিকবর্গকে তাহা নাড়া না দিলেও বিশ্বের তিনশত কোটি মানুষের চঞ্চল করিয়া তুলিয়াছে।

সরকার বরাবরের মত এই ধ্বংসলীলা ধামাচাপা দিবার প্রাণপণ চেস্তা করিয়া গেলেও শেষ পর্যন্ত সত্যের বিজয় হইয়াছে। আমি ভাষায় প্রকাশ করিতে পারিনা যে আমাদের এহেন দুর্দিনে সরকার কি ধৃষ্টতা প্রদর্শন করিয়াছে। মানুষের হৃদয় নিঃসৃত ভালবাসা আর প্রজ্ঞা-প্রসূত বিবেওচনার সম্মুখে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিছুই নহে; কিন্তু এই দুইটিরই আভাব আমরা মর্মে মর্মে অনুভব করিয়াছি। সরকার ও পশ্চিম পাকিস্তানীদের নিকট হইতে সেই ভালবাসা ও বিবেচনা পূর্ব পাকিস্তান পায় নাই বলিয়াই যেন প্রাকৃতিক দুর্যোগটি শতগুণ আঘাত হানিয়াছে। ইহার নতিজা সরকারকে ভোগ করিতেই হইবে। একজন মন্ত্রী মারা গেলে বেতার, টেলিভিশন ও অন্যান্য সরকারী প্রচারযন্ত্র কিভাবে মাতম শুরু করে তাহা আমাদের ভালোভাবেই জানা আছে। আর পশ্চিম পাকিস্তানী সরকার নিয়ন্ত্রিত বেতার তেলিভিশনে ১২ লক্ষাধিক লোকের প্রানহানিতে কিরুপ বিশ্বাস ঘাতকতা ও ক্ষমাহীন ধৃষ্টতার পরিচয় দিয়াছে তাহা আজ সাতকোটি বাঙালীকে ভাবেয়া দেখিতে হইবে। লন্ডন, পিকিং, ওয়াশিংটন, তেহরান, আম্মান, সিডনি, টোকিও ও কলিকাতার বেতার যখন বিশ্ববাসীর নিকট সর্বনাশা জলোচ্ছ্বাসের বিশদ বিবরণ তুলিয়া ধরিয়াছে, সাহায্য সামগ্রী পাঠানোর আবেদন জানাইতেছে, তখনও পাকিস্তানের বেতার, টিভি, বিশ্বাসঘাতকতা ও চরম মিথ্যাবাদীর ভূমিকা পালন করিতেছে; তখন তাহাদের আহলাদমাখা অনুষ্ঠানের কমতি হয় নাই; বার লক্ষাধিক রুহের মাগফেরাত কামনা করা হয় নাই। লক্ষ লক্ষ লাশের দাফন কাফনের কর্তব্যের কথা স্বীকার করা হয় নাই। ের চেয়ে আফসোসের বিষয় আর কি হইতে পারে?

আজ তাই আমাদের সম্মুখে কর্মসূচী পরিস্কার হইয়া উঠিয়াছে। সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করিয়াছি। অনেক ত্যাগ স্বীকার করিয়াছি, অনেক কোরবান দিয়াছি। আজ আমাদের হাতে যাহাই অবশিষ্ট আছে সব কিছুই উৎসর্গ করিয়া সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পড়িতে হইবে। এই সংগ্রাম ভাষণ বিবৃতি নয়, প্রত্যক্ষ মোকাবেলা। এই মোকাবেলা আপোষ নিস্পত্তিকল্পে চাপ সৃষ্টি করার সংগ্রাম নয়- পূর্ব পাকিস্তানের সাত কোটি শোষিত নির্যাতিত মানুষের মুক্তির সংগ্রাম। দলমত নির্বিশেষে আজ সবাই আসুন আমরা এক ও অভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করি। এবং ইহারই পরিপ্রেক্ষিতে মিছিল ও জনসভার আয়োজন করুন। তাই মিছিল ও জনসভা অনুষ্ঠান করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের নিকট জরুরী আবেদন করিতেছি।

এইদিন আপনারা আওয়াজ তুলুনঃ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে এবং আমাদের আজাদী রক্ষা করিতেয়ামরা সর্বস্ব কোরবান দিতে সদা প্রস্তুত। সেই সাথে আপনার বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুলুনঃ আমরা স্বাবলম্বী, আত্ম-নির্ভরশীল এবং শৃঙ্খলামুক্ত হইতে চাই। আমরা বিশ্বাসঘাতক আমলাদের শায়েস্তা করিতে চাই।

আমি বিশ্বাস করি মানবতার নামে আজাদীর লড়াইয়ে আমাদের সাফল্য অনিবার্য। সকল প্রাকার বাধা-বিপত্তি ও ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করিয়া আমরা ঈপ্সিত লক্ষ্য পৌছাব আশা করি বিশ্বাসীরও ইহাই বিশ্বাস। কিন্তু এই প্রসঙ্গে আমি একটি হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করিতে চাই- আমাদের দুর্যোগ ও দুর্দিনকে সম্বল করিয়া যাহারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির কোন চাল চালাইতে চায় তাহাদিগকে আমরা বরদাস্ত করিব না। আমাদের প্রয়োজনে যাহারা সাহায্য লইয়া আগাইয়া আসিতেছে তাহাদিগকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই; কিন্তু সেবার নামে কেহ যদি ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আমাদিগকে আটকাইতে চায় তবে তাহাকেও তল্পীতল্পাসহ আমরা তাড়াইতে বাধ্য হইবে।

বাঙালীকে কোন দিন শিকলের বন্ধকে মানিয়া লয় না আর লইবেও না। বিদেশী সৈন্যই হউন, কূটনীতিকই হউন, আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ করিয়া কাজ করিবেন ইহাই আমাদের বিশ্বাস।

বাঙালী জাতির মুক্তি-সংগ্রামে রুখিতে পারে পৃথিবীর এমন কোন শক্তি নাই। সাফল্য আমাদের সুনিশ্চিত।

  • পূর্ব পাকিস্তান- জিন্দাবাদ!
  • জনগণের সংগ্রামী ঐক্য- জিন্দাবাদ!
  • ইঙ্গ মার্কিন দস্যুরা- বাংলা ছাড়!
  • দুর্গত-জনসেবায় আত্মনিয়োগ কর!

 

 

নাছরুম মিনাল্লাহে ফাতহুন কারিব

(জয় আমাদের নিকটবর্তী)

মোঃ আবদুল হামিদ খান ভাসানী

৩০-১১-১৯৭০ইং