জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের যৌথ সভার উপর লিখিত আওয়ামী লীগের মুখপাত্রের সম্পাদকীয়

Posted on Posted in 4

<৪,২২১,৪৮৭-৪৮৯>

অনুবাদকঃ জেসিকা গুলশান তোড়া

শিরোনাম

 

সূত্র

 

তারিখ

 

২২১। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের যৌথ সভার উপর লিখিত আওয়ামী লীগের মুখপাত্রের সম্পাদকীয়

 

জয় বাংলা

 

১৬ জুলাই, ১৯৭১

 

 

যুক্ত বৈঠকের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

 

চলতি মাসের ৫ই ও ৬ই তারিখে মুজিবনগরে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের যে অধিবেশন হয়ে গেল- তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ইতিমধ্যেই আমাদের জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। শুধু জাতীয় জীবনে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এই বৈঠকে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও তার গণপ্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্রের একটা যথার্থ প্রেক্ষিত তুলে ধরবে তাতে সন্দেহ নেই। এতে রণাঙ্গনে সংগ্রামরত আমাদের বীর মুক্তিবাহিনী ও গেরিলা যোদ্ধাদের মনোবল ও আক্রমণ ক্ষমতা যেমন আরো বাড়বে, তেমনি বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে যেসব বন্ধুরাষ্ট্র অকৃপণভাবে সমর্থন জোগাচ্ছেন, তাদের এই সমর্থনের নৈতিক ভিত্তি আরো দৃঢ় হবে। কারণ, রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধারা যেমন জানেন তাদের সংসদীয় প্রতিনিধিরা ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের পাশেই রয়েছেন, তেমনি বিশ্বের মানবতাবাদী ও শান্তিকামী বন্ধু দেশগুলোও জানবে, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে সকল স্তরের মানুষের ঐক্য অটুট ও অনড় রয়েছে। ভুলভ্রান্তি মানুষ মাত্রেই হয়। বাংলাদেশের মানুষের উপর আকস্মিকভাবে চাপিয়ে দেয়া এই যুদ্ধে প্রাথমিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও ক্ষেত্রবিশেষে ভুলভ্রান্তি ঘটতে পারে। বিপ্লবের ইতিহাসে স্বাধীনতার যুদ্ধে প্রাথমিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এই ধরনের মানবিক ভুলভ্রান্তি সব দেশে সব যুগেই ঘটতে দেখা গেছে। এই ভুলভ্রান্তি বড় কথা নয়। বড় কথা অটুট গণ ঐক্য, জাতীয় ঐক্য এবং শত্রুর উপর আঘাত হানার ক্রমবর্ধমান মনোবল। গত তিনমাসে বাংলাদেশের মানুষ প্রমাণ করেছে, তারা নিরস্ত্র এবং অপ্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাঁচ ডিভিশনের এক বিশাল ও বর্বর দস্যু বাহিনীর বিমান, ট্যাঙ্ক ও গানবোটের ত্রিমুখী আক্রমণের সাফল্যের সঙ্গে প্রতিরোধ করে চলেছে। তাদের বড় অস্ত্র অটুট মনোবল ও দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ঐক্য। বাংলাদেশের একজন মানুষ, তিনি বুদ্ধিজীবি, চাকুরীজীবি, ব্যবসায়ী কিংবা গণপ্রতিনিধি হোন, অথবা ক্ষেতের চাষী ও কারখানার মজুর হোন, নিদেন দিনমজুর হোন, আজ একটিমাত্র লক্ষে তারা সকলেই উদ্দীপিত ও অবিচল, তা হল বাংলাদেশের মুক্তি ও স্বাধীনতা। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের প্যাটার্নে ইয়াহিয়ার সৈন্যদল বাংলাদেশে যে ঘৃণ্য ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করতে চায়, তার শৃংখল ভেঙ্গে মুক্তির উদয়পথে- নতুন মুক্তিসূর্যের প্রত্যাশায়  ভোরের অরুনিমার মত তারা বুকের রক্ত ঢালছে দেশের বীর মুক্তিবাহিনী। এই রক্তদান বৃথা যেতে পারেনা। মুজিবনগরের বৈঠকে সম্মিলিত হয়ে আওয়ামীলীগের সংসদীয় সদস্য ও নেতারা সমস্বরে এ কথাই ঘোষণা করেছেন, বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন। এই ঐতিহাসিক বৈঠকে আরো স্পষ্ট করে তুলল, এই মুক্তিযুদ্ধে জনগণের ও জনপ্রতিনিধিদের ঐক্য কত অকৃত্রিম নিবিড়।

 

ফ্যাসিস্ট আইয়ুবের রাজনৈতিক জারজপুত্র জুয়াড়ি ইয়াহিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন জুয়ার চাল চালতে চেয়েছিলেন। তিনি বিশ্ববাসীকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে তিনি নিষিদ্ধ করেছেন বটে, তবে আওয়ামী লীগের পরিষদ সদস্যদের সদস্যপদ তিনি নট করেন নি, এমন কি গত ডিসেম্বর মাসের নির্বাচনকেও তিনি বানচাল করতে চান না।  সাধু! সাধু! এ না হলে ‘নির্ভেজাল গণতন্ত্রী’ আর কাকে বলে! দুনিয়া দেখুক, ইয়াহিয়া গণতন্ত্রের কত বড় শুভাকাংখী। তিনি জনগণের দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন, কিন্তু দলের সদস্যদের হাতছাড়া  করতে চান না। তিনি নির্বাচন বানচাল করতে চান না, চান নির্বাচনে জনগণের রায় বানচাল করে দিতে। তারপর যারা তার হাতে ন্যাস্ত হবে তাদের দিয়ে একটা পুতুল সরকার গঠন করে নিজেদের ইচ্ছামত এমন একটা শাসনতন্ত্র তৈরী করা, যে শাসনতন্ত্র জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা রচিত এই মর্মে অপপ্রচার চালিয়ে বিশ্ববাসীর চোখে ধুলা দেয়া যাবে এবং অন্যদিকে যে শাসনতন্ত্রে নানা কথার মারপ্যাচে ক্ষমতার চাবিকাঠি রাখা হবে ইয়াহিয়ার বর্বর জঙ্গীচক্রের হাতে, জনগণের অথবা জনপ্রতিনিধিদের হাতে নয়।

 

যে শাসনতন্ত্র হবে আইউবী শাসনতন্ত্রের চাইতেও ধোকাবাজিপূর্ণ। আর এই ইচ্ছা থেকেই ইয়াহিয়া এদ্দিন তথাকথিত রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলেছেন। তার এই রাজনৈতিক সমাধানের বটিকা সেবনের জন্য আইউবের দশ বছরের সেবাদাস ফজলুল কাদের চৌধুরী, সবুর, ওয়াহিদুজ্জামানের মধ্যে যেমন কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে, তেমনি কাড়াকাড়ি লেগেছে আইউব আমলের গোপন সেবাদাস ফরিদ, খাজা, খয়ের, গোলাম আজম প্রমুখ চামুদের মধ্যে। ইয়াহিয়া আশা করেছিলেন এই চামুদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কিছু পরিষদ সদস্যকে ধরে-বেঁধে এনে যুক্ত করে তিনি তার পার্লামেন্ট ও সরকার দাড়া করবেন। এই দুরাশা নিয়েই তিনি যে আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্যদের বাড়িঘর জ্বালিয়েছেন, তাদের পরিবার-পরিজনের উপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছেন, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ১৪ বছর জেলে দিয়েছেন এমন কি তাদের কাউকে কাউকে খুন করেছেন- হঠাৎ সেই পরিষদ সদস্যদের প্রতিই ‘ক্ষমা প্রদর্শন’ ও জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে প্রচারকার্য চালাতে শুরু করেন। কিন্তু সীমান্তে ‘অভ্যর্থনা শিবির’ স্থাপন এবং দালালদের মাধ্যমে অনেক দেনদরবারের পরও দেখা গেছে আওয়ামী লীগের সংসদীয় সদস্যরা কেউ ইয়াহিয়ার বশ হতে কিংবা তার পা-চাটা কুত্তাদের দলে ভিড়তে রাজী নয়। যে দু’একজন সদস্যকে বন্দুকের নল দেখিয়ে ইয়াহিয়া কয়েদ করেছেন, ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে তারা কি করবেন, সে সম্পর্কে ইয়াহিয়া চক্র নাকি নিশ্চিত নন। ফলে এলো ২৮শে জুনের বেতার ঘোষণা। তথাকথিত রাজনৈতিক সমাধানের প্রহসন শিকায় তুলে রেখে ইয়াহিয়া বাধ্য হয়ে বিশ্ববাসীকে তার আসল চেহারা দেখালেন, বললেন, তিনি বিশেষজ্ঞ দ্বারা তৈরী একটা শাসনতন্ত্র দেশকে উপহার দেবেন। অর্থাৎ নিজেই একটা শাসনতন্ত্র তৈরী করবেন। দেশকে শাসনতন্ত্র দেয়ার নামে আইউব যা করেছিলেন, তার রাজনৈতিক জারজপুত্রেরা তার চাইতে বেশি কি করতে পারেন?

 

ইয়াহিয়া-ভুট্টো-টিক্কা চক্রের এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রেরই সমুচিত ও সফল জবাব বর্তমান মাসের গোড়ার দিকে অনুষ্ঠিত আওয়ামীলীগ দলীয় উভয় পরিষদের সদস্যদের যুক্ত বৈঠক। এই বৈঠকে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সাড়ে চার আনা সদস্য অংশগ্রহণ করে একথাই দিবালোকের মত ষ্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আওয়ামী লীগের কিছুসংখ্যক সদস্যকে নিয়ে একটা তথাকথিত রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টায় ইয়াহিয়া সফল হচ্ছেন বা হবেন এই প্রচার সম্পূর্ণ মিথ্যা। ইয়াহিয়ার হাতে দু’চারজন বন্দী সদস্যা ছাড়া কেউ নেই। বাংলাদেশের প্রকৃত গণপ্রতিনিধিরা রয়েছেন মুক্তাঞ্চলে, প্রকৃত বৈধ সরকার রয়েছে মুজিবনগরে। দস্যু ইয়াহিয়ার অধিকৃত বাংলাদেশ অবৈধ দখলদার মাত্র। বাংলাদেশের মাটিতে অবস্থান করা বা বাংলাদেশের মানুষের নামে কথা বলার কোন অধিকার এই খুনী ও তাদের চক্রের নেই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের নামে কথা বলবে, তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে একমাত্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

 

মুজিবনগরে বৈঠক ঐতিহাসিক গুরুত্ব লাভ করে এজন্যই যে, এই বৈঠক বাংলাদেশের মানুষ ও মুক্তিবাহিনীর মনোবল দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশের মানুষ জেনেছে তাদের গণপ্রতিনিধিরা দশ লক্ষাধিক জনতার সামনে ৩রা জানুয়ারী তারিখে শেখ মুজিবরের নেতৃত্বে যে শপথ করেছিল, সে শপথ তারা ভঙ্গ করেনি, বরং অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে। আজ মুক্তিবাহিনী জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের যে পবিত্র দায়িত্ব পালন করছে রণাঙ্গনে, সেই একই দায়িত্ব পালন করছে আওয়ামী লীগের সংসদীয় সদস্যেরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। গণমানুষ ও গণপ্রতিনিধিদের ভূমিকায় আজ আর কোন পার্থক্য নেই। একই প্রতিরোধ-চেতনা ও স্বাধীনতা কামনায় তারা উদবুদ্ধ, অনুপ্রাণিত। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও মুজিবনগর বৈঠকের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রথমতঃ নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের একটা অংশকে ইয়াহিয়া চক্র করে পেয়েছে এবং তাদের যোগসাজগে ইয়াহিয়া বাংলাদেশের হয়ে কথা বলতে পারে এই দাবী ও প্ররোচনায় সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বের শান্তিকামী গণতন্ত্রী ও মানবতাবাদী দেশগুলোর কাছে আজ এটা পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন এবং স্বাধীনতার লক্ষ অর্জনে তারা দৃঢ়সংকল্প।

 

এই অবস্থায় বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত বৈধ সরকার হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারই তাদের সর্বপ্রকার সাহায্য ও সহযোগিতা লাভের দাবীদার। গণপ্রতিনিধিত্বহীন ইয়াহিয়ার গণ-দুশমন চক্র বাংলাদেশে বেআইনী দখলদার, সুতরাং মুজিবনগরের বৈঠকের পর বাংলাদেশ সরকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আরো ত্বরান্বিত হলে এবং বিশ্বের আরো বেশীসংখ্যক রাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তাদের সাহায্য ও মৈত্রীর হাত বাড়াবেন, এ বিষয়ে আমরা সুনিশ্চিত। জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম কখনো ব্যর্থ হয় না। বাংলাদেশের জনগণের মুক্তিসংগ্রামও ব্যর্থ হতে পারে না। স্বাধীনতার রক্ত পতাকা মুক্ত অঞ্চলের ঘরে ঘরে উড়ছে। গণ ঐক্যের অজেয় দুর্গের প্রাকারে বাজছে আসন্ন বিজয়ের দুন্দুতি। পূর্ব দিগন্তে রক্তারুণ উদর ঊষার সুসংবাদ ছড়াচ্ছে। জয় আমাদের অবশ্যম্ভাবী। মুজিবনগরের বৈঠক এই অবশ্যম্ভাবী বিজয় আরো ত্বরান্বিত করবে।

 

-জয় বাংলা