জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার প্রেক্ষিতে দেশব্যাপী ধর্মঘটের আহবানসহ শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণা।

Posted on Posted in 2

<2.164.664>

 

 

 

শিরোনামসূত্রতারিখ
জাতীয় পরিষদ অধিবেশন  স্হগিত ঘোষনার  প্রেক্ষিতে দেশব্যাপি  ধর্মঘটের আহবান সহ শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষনাদি পিপল২ মার্চ,১৯৭১

 

 

মুজিব কর্তৃক বাঙালীর  বন্ধনমুক্তির  আহবান

সংসদীয় দলের বৈঠক পরবর্তী  সংবাদ  সম্মেলন, হোটেল পূর্বানী, মার্চ ১৯৭১

 

জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্হগিতের ঘোষণা আসার পর হোটেল পূর্বানীতে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের ঠিক পরপর আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন  যে ৭০ মিলিয়ন বাঙালীর মুক্তির জন্য তিনি যেকোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত আছেন।

 

তিনি আরো বলেন যে ২৩ বছরের ঔপনিবেশিক আচরন থেকে মুক্তি পেতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন।

 

শেখ মুজিব বলেন: “শুধুমাত্র একটি সংখ্যালঘু দলের অমতের কারনে সংবিধান প্রণয়ন বাধাগ্রস্হ হয়েছে এবং সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য মুলতুবি ঘোষনা করা হয়েছে। আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত দূর্ভাগ্যজনক। আমরা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধি এবং আমরা এই ঘটনার প্রতিবাদ করছি। ”

 

শেখ মুজিবুর রহমান পরবর্তী ৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষনা করেন। আজ  ঢাকায় সারাদিনব্যাপি ধর্মঘট এবং পূর্বঘোষিত সংসদ অধিবেশনের  দিন ৩ মার্চ সারাদেশে ধর্মঘট  আহবান করা হয়। ৭ ই রেসকোর্স ময়দানে একটি জনসভা হবে এবং সেখান থেকে আওয়ামী লীগ প্রধান পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষনা করবেন। শেখ মুজিব হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “ষড়যন্ত্রকারীরা না থামলে আমরা নতুন ইতিহাস গড়ে দেখাব।” দৃঢ় কন্ঠে তিনি ঘোষনা করেন:

 

“আমরা যোকোন পরিণতির জন্য প্রস্তুত।আমি অনেকবার বলেছি যে এই দেশে একটা ষড়যন্ত্র চলছে। দেশে সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাদের সেবা করার জন্য জনগন আমাদের নির্বাচিত করেছে, তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের পক্ষে পরিষ্কার জনরায় থাকা সত্বেও ষড়যন্ত্র তার শিকড় বিস্তার করে চলেছে।

 

জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠই বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত এবং ভুট্টো আর কাইয়ুমের দল বাদে পশ্চিম পাকিস্তানের অন্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় আমরা সহজেই সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করতে পারব। আমরা জনগনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারিনা, জনগন আমাদের উপর যে আস্হা স্হাপন করেছে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারিনা। লক্ষে না পৌছান পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব। আপনারা জানেন যে দেশে সামরিক শাসন চলছে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের যেসব সাংসদ অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে আসতে চান, পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান তাদের হুমকি দিয়ে বলেছেন পূর্ব পাকিস্তানে আসলে তাদের জীবন সংশয়ের মুখে পড়বে। মিঃ ভুট্টো আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। আইন-কানুন কি শুধু গরীব বাঙালীদের জন্য প্রযোজ্য?”

<2.164.665>

 

শেখ মুজিব আরো যোগ করেন, “আমরা সবার সহযোগিতা চাই এবং আমরা বার বার বলেছি যে তাদের সংসদে আসা উচিত। সেখানে একটানা পাঁচ দিন আমরা সাংবিধানিক কাঠামো রচনা করব এবং পরের পাঁচ দিন সেটা নিয়ে আলোচনা করব। গনতান্ত্রিক নিয়মে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই গ্রহন করা উচিত। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সবসময় সংখ্যালঘু দলকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। আমি প্রস্তাব করেছিলাম ফেব্রুয়ারীর ১৫ তারিখ সংসদ অধিবেশন শুরু করতে, কিন্তু সংখ্যালঘু দলের ইচ্ছা অনুযায়ী মার্চের প্রথম সপ্তাহে অধিবেশন আহবান করা হয়।”

 

 

“এসব চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই না, এই দেশে যেটা দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে চলে আসছে। এই চক্রান্ত এখনো চলছে এবং এর মাধ্যমে বাংলার ৭ কোটি মানুষকে শোষন করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাকে একটা ঔপনেবেশিক বাজার বানিয়ে রাখা। আমরা সাম্য এবং ন্যায়বিচারের জন্য যুদ্ধ করছি এবং লক্ষ অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করেই যাব।”

 

একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষনা করবেন কিনা এই প্রশ্ন করা হলে শেখ মুজিব উত্তর দেন, “অপেক্ষা করুন”। সংসদ অধিবেশন স্হগিত করার পূর্বে তার সাথে আলোচনা করা হয়েছিল কিনা একজন সংবাদকর্মী তাঁকে এই প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দেন , “না।”।

 

রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পুলিশদের নিরস্ত্রীকরণ করা নিয়ে আরেক সাংবাদিক প্রশ্ন করলে শেখ মুজিব এই ব্যাপারে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং এই সংক্রান্ত কোন তথ্য থাকলে সংবাদমাধ্যমকে তা প্রকাশ করার অনুরোধ করেন।

 

দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন তাঁরা যেকোন পরিস্হিতির জন্য তৈরি ছিলেন। অতীতেও তাঁরা অনেকবার গ্রেফতার হয়েছেন। তিনি আরো যোগ করেন, “জনগন আমাদের সাথে আছে। ভাল কিছু হবে এই আশা আমরা করছি, কিন্তু আমরা চরম পরিস্হিতির জন্যও প্রস্তুত আছি।”

 

সংবাদ মাধ্যমের উপর চাপিয়ে দেয়া নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ করবেন কিনা এই প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিব বলেন,”মানুষের স্বাধীনতা হরন করে আমি এরকম সবকিছুরই বিরোধিতা করি।”

 

তিনি সংবাদ মাধ্যমকে অবহিত করেন যে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দল শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম করে যাবার সিদ্ধান্ত পুনব্যক্ত করেছে এবং জনগনের অধিকার আদায়ের জন্য যেকোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত আছে। তিনি খোলাখুলিভাবে ঘোষনা করেন যে বাংলাদেশের জনগনের শৃঙ্খল মোচনের জন্য কোন ত্যাগই যথেষ্ঠ নয়। তিনি আরো জানান যে সাম্প্রতিক পরিস্হিতি নিয়ে তিনি মাওলানা ভাসানি, মোঃ নুরুল আমিন, আতাউর রহমান খান, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ এবং অন্যান নেতাদের সাথে যত দ্রুত সম্ভব আলোচনা করবেন।

 

বাংলাদেশে বসবাসরত অবাঙালীদের ভাগ্যে কি আছে এই প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, “তারা এই মাটির সন্তান, এই মাটি তাদের নিজেদের মনে করা উচিত এবং তাদের এখানকার মানুষদের সংগ্রামে যোগ দিতে হবে।”

 

পশ্চিম পাকিস্তানি জনগনের করণীয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে শেখ মুজিব বলেন, “তাদেরও পরিস্হিতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত এবং এই ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ করা উচিত।”

 

আলোচনাকালে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন যে ভুট্টো সব সময়ই অবিবেচকের মত আচরণ করছেন। আইয়ুব খানের ডাকা গোল টেবিল বৈঠকে অংশ নিতে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।ভুট্টো প্রথমে সাধারন নির্বাচনে আসতে চাননি, পরবর্তীকালে মত পরিবর্তন করে নির্বাচনে অংশ নেন। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে যোগ দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানান এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে বাদ দিয়ে পক্ষপাতমূলকভাবে ভুট্টোর মতকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। শেখ মুজিব বলেন, “আমার জনগন ছয় দফার পক্ষে রায় দিয়েছে এবং ছয় দফা আর এগারো দফার ভিত্তিতে আমরা সংবিধান প্রণয়ন করব।”