জাতীয় মুজাহিদ সংঘ কর্তৃক প্রকাশিত “স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের রূপরেখা”

Posted on Posted in 2

<2.142.598-602>

 

শিরোনামজাতীয় মুজাহিদ সংঘ কর্তৃক প্রকাশিতস্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের রূপরেখা

সূত্রজাতীয় মুজাহিদ সংঘ কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তিকা

তারিখ জানুয়ারী,১৯৭১

আমরা যা কিছু সপেছি তোমায়,স্বদেশ আমারঃ স্বদেশ আমার স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের রূপরেখা 

                                                      সূচনা

সুদীর্ঘ ২৩ (তেইশ) বৎসর ধরিয়া পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্রাজ্যবাদীগণ আমাদের বঞ্ছনা ও লাঞ্ছনার একশেষ করেছে।কিন্তু কেন এমন করছে?তাদের খপ্পর থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায় এবং মুক্তির পরেই বা কী করতে হবে? আর জবাব পেতে হলে আমাদের খুঁজে দেখতে হবে- কেন পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল? ইহার সৃষ্টির পরে কেন নানা জটিলতার পরিস্থিতির উদ্ভব হইল? পরিস্থিতিগুলি কী কী? ইহার মোকাবিলায় আমাদের রাজনীতিকরা কী কী করেছে এবং ইহারই প্রতিকার বা কী?

আমরা একে কে এসব বিষয়ের উপর যতদূর সম্ভব সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো।

                                                    পাকিস্তান সৃষ্টির কারণ

যুগের পর যুগ ধরে,রোমান এবং পাসরিকদের চেয়ে অধিক বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার পরও প্রায় হাজার বৎসর পূর্বে,পাক-ভারতের হিন্দু রাজন্যবর্গ বহিরাগত আরবী মুসলমানদের নিকট ধীরে ধীরে পরাজয়বরণ আরম্ভ করেন। পরাজিতদের অনেকেই পাহাড়ে-পর্বতে লুকিয়ে লুকিয়ে,স্বুতন্ত্রভাবে,প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকেন। আরবদের পরে নানা জাতের মুসলমানেরা পাক ভারতকে শাসন করে। মুসলিম শাসনামলের শেষের দিকে মহর্ষি আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর,হিন্দু সমরশক্তি অনেকটা প্রতিষ্ঠা লাভ করে।আশ্চুর্য্যের বিষয় সুদীর্ঘ মুসলিম শাসনামলে পাক-ভারতের একটি লোকও,মুসলিম সমরশক্তির ভয়ে ভীত হয়ে,ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি।বরং মুসলমান সুফী-দরবেশের মাহাত্ম্যের প্রভাবে,এদেশের অগণিত লোক ইসলামের সুশীতল ছায়ায় অংশ গ্রহণ করে।অধিকন্তু প্রায় হাজার বৎসর এদেশে বসবাস করার পর,বহিরাগত স্বল্পসংখ্যক মুসলমানদের প্রায় সকলেই তাদের অতীত ভুলে গিয়ে,এদেশের স্থায়ী অধিবাসীরে রূপান্তরিত হয়।

আরব দেশের মুসলমানেরা যে রকম আরব পৌত্তলিকদের বংশধর,ইরান তথা পারস্যের মুসলমানেরা যে রকম অগ্নিপূজকদের বংশধর,মিশরের মুসলমানেরা যে রকম ফেরাউন ও ইহুদিদের বংশধর,তদ্রূপ আমরা পাক ভারতের মুসলমানেরা এবং বিশেষ করিয়া বাংলাভাষী মুসলমানেরাও পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যজাতী হিন্দুদের আলোকপ্রাপ্ত বংশধর।পুঁথিসাহিত্য এবং কিংবদন্তী হতে জানা যায়,পৃথিবীর প্রথম নর আদম তথা মনু এবং তাঁর সাথী হাওয়া,বাংলাদেশের স্বরন্দীপ ও তার আশেপাশেই আবির্ভূত হন। পৃথিবীর লক্ষকোটি বৎসরের আবর্তন,বিবর্তন ও কম্পনের ফলে যে দ্বীপ ধ্বদে গিয়ে বর্তমানে ক্ষুদ্রাকৃতি সন্দীপে পরিণত হয়েছে। এদিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়,মানব সৃষ্টির আদিকাল থেকে,পাক-ভারতের লোকেরা এবং বিশেষ করে বাংলাভাষীরা একত্রে বসবাস করে আসছে।

আদমের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে,পাক-ভারতে আবির্ভূত অসংখ্য নবীর শিক্ষানুযায়ী আদিযুগে অন্যান্য ধর্মের ন্যায় হিন্দু ধর্ম ও একটি একেশ্বরবাদী এবং সাম্যবাদী ধর্ম ছিল।কিন্তু হিন্দু রাজা-মহারাজা ও সামন্তবর্গ তাদের সৃষ্ট কায়েমী স্বার্থকে রক্ষার জন্য হিন্দু ধর্মেও পৌত্তলিকতা ও হৃদয়বিদারী জাতিভেদ প্রথা ঢুকিয়ে দেয়।ধীরে ধীরে তাহার ঐশ্বরিক ধর্মটিকে,পরধর্ম সংহারকারী একটি গোড়া ও রক্ষণশীল ধর্মে পরিণত করে।যার ফলে পাক-ভারত থেকে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম প্রায় লোপ পায়। যার প্রভাবে এখানকার ধর্মান্তরিত মুসলমানেরা রাতারাতি তাদের হিন্দু ভ্রাতৃবর্গের চিরশত্রুতে পরিণত হয়। কেবল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার অপরাধে হিন্দু আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের লক্ষকোটি বৎসরের রক্তমাংসের সম্পর্ক এক নিমিষে ঘুচে যায়। কায়েমী স্বার্থের ধ্বজাধারী হিন্দুগণ,স্থানীয় ধর্মান্তরিত কোটি কোটি মুসলমানকেও বহিরাগত মুসলমানদের পর্যায়ে ফেলে,পাক-ভারতের সকল মুসলমানকে খেজুর তলায় তাড়ানোর অথবা সমূলে ধ্বংস করে দেওয়ার প্রকাশ্য দাবী উঠতে থাকে। এই ভাবেই তাহারা বহিরাগত মুসলমানদের নিকট অতিতে পরাজিত হওয়ার গ্লানি মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর হয়।

ইংরেজদের হাতে পাক-ভারতের মুসলিম রাজশক্তির পতনের পর হিন্দু কায়েমী স্বার্থবাদী গণের মুসলমান ধ্বংস করার সুযোগ আরও বৃদ্ধি পায়। তাহারা প্রাপ্ত সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে থাকে।হিন্দু-মুসলিম উদারপন্থী নেতা ও মণিষীদের, হিন্দু- মুসলমান মিলনের বাণীর প্রতি বর্ণিত কায়েমী স্বার্থবাদীগণ বৃদ্ধাংগুষ্ঠি প্রদর্শন করে।ইংরেজ বেনিয়াদের সঙ্গে একজোট হয়ে হিন্দু কায়েমী স্বার্থবাদীগণ পাক-ভারতের প্রায় সকল জমিদারী-জোতদারী,ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকুরি-বাকুরি ; তাহাদের নিজেদের কুক্ষিগত করে ফেলে। তাহারা পাক-ভারতের মুসলমান এবং বিশেষ করে বাংলার মুসলমানগণকে অচ্ছ্যুৎ চাষা-ভূষার জাতীতে পরিণত করে।

প্রতিবেশী হিন্দু কায়েমী স্বার্থবাদীদের অত্যাচা,অবিচার,অবমাননাকর ব্যবহার ও নির্মম শোষণে জর্জরিত হতে হতে এখানকার মুসলমান অধিবাসীগণ মরিয়া হয়ে উঠে।তাহারা হাড়ে হাড়ে,মজ্জায় অনুভব করতে থাকে পূর্বের সূর্য যেমন পশ্চিমে উদয় হওয়া সম্ভব নহে- পাক- ভারতের দুটি জাতি,হিন্দু ও মুসলমানের মিলনও সেরূপ সম্ভব নহে। তদুপরি হিন্দু ও মুসলমানের চাল-চলন,রীতি-নীতি,আচার-ব্যবহার ভিন্নমুখী।তাই মুসলমানেরা নিজেদের অস্তিত্ব এবং বিশেষ করে,তাহাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় ধর্ম ইসলামকে রক্ষার জন্য পাক-ভারতের মুসলীম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলি নিয়ে,পৃথক দুইটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করর দাবী করে  – পাক-ভারতের পূর্বাঞ্চল তথা বাংলা ও আসাম নিয়ে যাহার একটি হওয়ার কথা ছিল বর্তমান পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে যাহার আরেকটি হওয়ার কথা ছিল , ইতিহাসে ইহাই লাহোর প্রস্তাব নামে খ্যাত।

এই লাহোর প্রস্তাবের উপর ভিত্তি করেই,পাক-ভারতের মুসলমানেরা এবং বিশেষ করে বাংলা ও আসামের মুসলমানেরা তীব্র আন্দোলন আরম্ভ করে দেয়। অজস্র রক্ত ক্ষয় হয়। শেষ পর্যন্ত,১৯৪৭ ইংরেজীর ১৪ আগস্ট পাক-ভারতের বুক চিরে বর্তমান পাকিস্তান জন্মলাভ করে। আমাদের হিন্দু ভ্রাতৃবর্গ,পাকিস্তানের চেয়ে ৫ (পাঁচ) গুণ বৃহৎ হিন্দুস্থান,তাহাদের নিজেদের অংশ প্রাপ্ত হন।সুতরাং আমাদের হিন্দু ভাইদেরও অসন্তুষ্ট থাকার কোন কারণ নাই।বরং লোক সংখ্যার অনুপাত হিসাবে মুসলমানদেরই অসন্তুষ্ট হওয়ার কথা।

লক্ষ লক্ষ মুসলমানের ক্ষতির রক্তে স্নাত হয়ে,পৃথিবীর বুকে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হলে কি হবে? জন্মের পরপরই হাতে নানা জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।আমরা এখন এই জটিলতা সৃষ্টির কারন নিয়ে আলোচনা করব।

                                                      জটিলতা কেন

দুঃখের বিষয় উমাইয়া সাম্রাজ্যবাদীগণ যেভাবে ইসলামের সাম্যবাদী নীতিগুলোকে এবং ইসলামি গণপ্রতিনিধিত্বকে (খেলাফতকে) আঁতুড়ঘরেই গলা টিপে মেরে ফেলেছিল ; অবিকল সেইভাবে পশ্চিমাঞ্চলের কতিপয় তথাকথিত মুসলমান নেতা,পুজিপতি এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের নিয়ে গঠিত একটি সাম্রাজ্যবাদীচক্র পাক-ভারতের গঠিতব্য ইসলাম রাষ্ট্র দুটির রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে ইসলামকে নির্বাসন দেয়ার পাকাপাকি ব্যবস্থা,রাষ্ট্রদ্বয়ের জন্মের পূর্বেই করে রেখেছিল। বর্ণিত সাম্রাজ্যবাদীদের পূর্ব-পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফলস্বরূপ, পুরাপুরি দুটি প্রদেশের পরিবর্তে বাংলার পূর্বাংশ এবং আসামের দক্ষিণাংশ তথা সিলেট জেলা নিয়ে বর্তমান পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হয়।তাহারা বাঙালী পূর্ব মুসলমানদের ভাবাবেগের সুযোগ গ্রহণ করতঃ শোষণের সবিধার্থে,পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে দুটি রাষ্ট্র গঠন করার পরিবর্তে,উভয় অঞ্চলের সমবায়ে মাত্র একটি রাষ্ট্র গঠন করে।কারণ,যেভাবেই হউক, পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বলগ্নে পাক-ভারতের মুসলমানদের নেতৃত্ব , তাহাদের মুঠোর মধ্যে ছিল।ফলে ইসলামের নামে অর্জিত রাষ্ট্রটির জন্মের পর থেকেই,তাহার রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে ইসলাম উধাও হয়ে যায়।অন্যায়-অনাচার,অত্যাচার-অবিচার,দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি রাষ্ট্রটির নিত্যকার ঘটনায় পর্যবেশিত হয়। মুসলমানদের ইসলাম সাম্যবাদী রাষ্ট্র গঠন করার দীর্ঘদিনের স্বপ্নটি অচিরেই ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়।

১৯৪০ ইংরেজির লাহোর প্রস্তাবের মর্ম অনুযায়ী দুটি পৃথক ইসলামী রাষ্ট্র গঠন না করতেই,পাকিস্তানের জন্মের পর নানা জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।এখন আমরা তাহার উপরই আলোকপাত করব।

পাকিস্তানের পরিস্থিতি

লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী দুটি পৃথক ইসলামি রাষ্ট্র গঠন না করায়,পাকিস্তানের জন্মের পর প্রধাণত,পূর্ব পাকিস্তানে মোট দুধরণের পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।তাহার,একটি হল (ক) পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্রাজ্যবাদীগণ কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানীদের উপর একচেটিয়া শাসন,শোষণ ও নির্যাতন। অপরটি হল (খ) ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানী তথাকথিত মুসলমান সাম্রাজ্যবাদীগণ কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানীদের উপর অবিরাম পীড়নের ফল স্বরূপ এখানকার একশ্রেণীর মুসলমানের আদর্শিক মৃত্যু।

() পশ্চিমাদের পীড়ন

তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার জেরার সময় প্রকাশ পেয়েছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে বাঙালী সৈন্যের অনুপাত ৪% (শতকরা চার জন মাত্র)- প্রতি ৬০ (ষাট) জন সামরিক অফিসারের মধ্যে বাঙালী মাত্র ১ জন।১৯৬৮ পর্যন্ত কেন্দ্রের ২০ (বিশ) জন সেক্রেটারীর মধ্যে একজনও পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী ছিলেন না।পরিকল্পনা কমিশনের নিয়ন্ত্রণ আজ পর্যন্ত কোন বাঙালী অফিসার পাননি।কেন্দ্রীয় সরকারের প্রায় সকল বিভাগের চূড়ায় এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের ও অনেক বিভাগের চূড়ায় অথবা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে আছে নিশ্চয়ই কোন পশ্চিম পাকিস্তানী অথবা বাঙালী নামধারী কোন মোহাজের। পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষতি করার ব্যাপারে সে সকল মোহাজেরদের প্রায় সকলেই পশ্চিম পাকিস্তানীদের চেয়েও একধাপ আগে চলে। বাজে এবং গুরুত্বহীন পদগুলোতে নিয়োজিত পূর্ব পাকিস্তানীগণকে মিলিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বেসামরিক চাকুরীতে গড়ে বাঙ্গালীর অনুপাত ১১% (শতকরা এগারো জন ) মাত্র। এই এগারোজনের মধ্যে বর্ধিত মোহাজেরগণকেও ধরা হয়েছে।এদিকে লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বাঙালী বেকার ঘুরছে। পশ্চিমাদের শয়তানীর জন্য চাকুরী পায় না। ইংরেজীর ১৯৬৫ সালে লাহোর যুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে যে, বাঙ্গালীরা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। এতদসত্ত্বেও কোটি কোটি বাঙ্গালীকে সামরিক বাহিনীতে ভর্তি না করে,ঐ যুদ্ধের পর পরই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অগণিত লোক সামরিক বাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছে। চাকুরী এই বৈষম্যের দরুন পশ্চিমারা শুধু আমাদের উপর কর্তৃত্বই করেছে না,বরং কেন্দ্রীয় বাজেটের চাকুরী খাতের ৯০ (নব্বই ভাগই) প্রতি বৎসর পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাচ্ছে।

উপরোক্ত সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের দরুন পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্রাজ্যবাদীগণ নিরাপত্তা আইন,দেশরক্ষা আইন এবং সামরিক আইন জাতীয় বাঙ্গালী-পীড়ন আইন কথায় কথায় জারি করে দেয়। হাজার হাজার সচেতন বাঙ্গালীকে জেলে পুরে দেয়। প্রয়োজন দেখা দিলে,তাহারা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মত মিথ্যা বাঙালী পীড়ন মামলা সাজাতেও পিছপা হয় না।সাম্রাজ্যবাদীদের তর্জনীর সংকেত অনুযায়ী কাজ না হলে,তাহারা নিজেরাও নানা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দিয়ে কর্মরত মন্ত্রীসভাকে ভেঙে দেয়।ইচ্ছা হলে সামরিক শাসন জারী করে দেশের বৈধ শাসনতন্ত্রকে পর্যন্ত আস্তাকুড়ে ফেলে দেয়।

 

ঘৃণিত সাম্রাজ্যবাদীগণ পূর্ব পাকিস্তানকে শুধু একচেটিয়া ভাবে শাসন করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা গত ২৩ (তেইশ) বৎসর পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণেরও একশেষ করেছে। দ্বার রক্ষী বংশজ সাম্রাজ্যবাদীগণ বলতে গেলে পূর্ব পাকিস্তানের টাকা দিয়েই মরুভূমিসম পশ্চিম পাকিস্তানকে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা উর্বর ভূমিতে রূপান্তরিত করে ফেলেছে। আর এদিকে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা সোনার বাংলা কে মহাশ্মশানে পরিণত করেছে। পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্বৃত্ত গম, পূর্ব পাকিস্তানে বিক্রী করার উদ্দেশ্যেই তাহারা পরিকল্পনা বহির্ভূত মাত্র ২০০০ (দু হাজার) কোটি টাকা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাণান্তকারী বন্যা সমস্যার সমাধান করছে না,এবং পটুয়াখালীর রূপসা হতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা পর্যন্ত ১০০ মাইল দীর্ঘ প্রলয়ংকারী গরকীরোধকারী সামুদ্রিক বাঁধ (ব্রেকওয়াটার),মাত্র এক হাজার কোটি টাকা দিয়ে নির্মাণ করছে না কারণ বন্যা সমস্যার ও গরকী সমস্যার সমাধান হলে,পূর্ব পাকিস্তানও উদ্বৃত্ত এলাকায় পরিণত হবে। এলোপাতাড়ি কাজ দ্বারা যাতে বন্যা সমস্যা বৃদ্ধিপায়,তদ্দরুন বন্যা সমস্যা সমাধানের নাম নিয়ে তাহারা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ইদানিং বাৎসরিক মাত্র ত্রিশ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।তাহাও ঠিকমত পৌছে কিনা তাহার কোন নিশ্চয়তা নাই। সাদ্দাদের বেহেশতসম রাজধানী করাচী থাকা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানীগণকে ভুখা-নাঙ্গা-বেকার রেখে, দুষ্ট সাম্রাজ্যবাদীগণ পরিকল্পনা বহির্ভূত অজস্র টাকা দিয়ে বিলাসবহুল ও অপ্রয়োজনীয় রাজধানী ইসলামাবাদের কাজ সাত তাড়াতাড়ি করে যাচ্ছে। ভাবখানা এই লুটের মাল পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে গেলে আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাবে।

জলাবদ্ধতা,লবণাক্ততা,সিন্ধু উপত্যকার পুণরূদ্ধার ইত্যাদির জন্য আজ পর্যন্ত বর্ণিত সাম্রাজ্যবাদীগণ পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে,পরিকল্পনা তবে না হয় তওবা করে,আবার ; বৃহত্তর শক্তিশালী এবং ধর্মনিরপেক্ষ অখন্ড ভারতই গঠন করা যাবে। কিন্তু মহামান্য নাগরিকদের কিলের ভয়ে, ধর্মনিরপেক্ষাওয়ালারা আবার সে কথা বলার সাহস পাচ্ছেনা। একদল ধর্মনিরপেক্ষওয়ালারা আবার পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্রাজ্যবাদীদের ইশারায় পাকিস্তানকে বর্তমান আকারে আলাদা রেখেই ইহাকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। আগেই বলা হয়েছে, তাতে পূর্ব পাকিস্তানকে নির্বিচারে শোষণ করতে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের বিরাট সুবিধা হয়- খাটি ইসলামী রাষ্ট্র হলে তাহারা আর পূর্ব পাকিস্তানকে যদিচ্ছা শোষণ করতে পারবে না।শোষণটা রয়ে-সয়ে করতে হবে। এখন ইহা নিশ্চয়ই পরিষ্কার হয়েছে যে, ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করতে হলে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা হওয়া উচিত।

পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানগন আজ এক যুগসন্ধিক্ষণে উপস্থিত। অবস্থাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে, কেবল পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্রাজ্যবাদীগণই নহে, তৎসহ আরও কয়েকটি পরস্পর বিরোধী বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি পূর্ব পাকিস্তানকে তাদের আন্তর্জাতিক দাবার ঘুঁটিতে পরিণত করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাই এখানকার মুসলমানগণকে আজ অত্যন্ত হিসাব করে পা ফেলতে হবে। পা একটুখানি ফসকালেই গভীর খাদে পতিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা বিদ্যমান।পাক-ভারতের হিন্দু কায়েমী স্বার্থবাদীরা অত্যাচার করত বলে আমরা মুসলমানেরা দুটি স্বতন্ত্র ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিলাম। আমাদের সে স্বপ্নকে ব্যর্থ করে দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্রাজ্যবাদীগণ আমাদের উপর অত্যাচার করছে বলে,আমরা আবার হিন্দু-ভারতের দাসত্ব অথবা ধর্মনিরপেক্ষ আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের দাসত্ব অথবা ধর্মবিরোধী কম্যুনিস্ট সাম্রাজ্যবাদীদের দাসত্ব মেনে নিতে পারি না।

কেহ যদি বিধর্মীদের প্রতি উদার ব্যবহার বা গণতন্ত্র শিখতে চান, তবে তাহার সন্ধান মহান ইসলাম ধর্মের মধ্যেই পাবেন। এতদসত্ত্বেও বিধর্মীদের প্রতি উদার ব্যবহার শিক্ষা অথবা গণতন্ত্র শিক্ষার জন্য কেহ যদি ভারতের দিকে অথবা ইউরোপ ও আমেরিকার দিকে ধাবিত হন, তাহলে বুঝতে হবে তাহার উদ্দেশ্যে উদারতার বা গণতন্ত্র শিক্ষা করা নহে বরং ঐ সকল দেশের গোলামী তাহার একমাত্র উদ্দেশ্য। অনুরূপভাবে, কেহ যদি সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চান তবে তাহার ব্যবস্থাও ইসলামের মধ্যেই পাবেন। অজস্র সাম্যবাদী বিষয় সহ পবিত্র ইসলাম শিক্ষা দেয়- দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ আল্লার,মানুষ মানুষের প্রভু হতে পারেনা ; এক মানুষ অপর মানুষের পূজা পেতে পারেনা ; সে মাওসেতুংই হউন অথবা কোসিগিনই হউন অথবা নিক্সনই হউন অথবা যে কোন শক্তিধরই হউক না কেন। পবিত্র কোরানের মর্ম মতে,সকল মানুষ সমান। এতদসত্ত্বেও কেহ যদি সাম্যবাদ শিক্ষার জন্য উত্তর অথবা উত্তর-পশ্চিম দিকে ধাবিত হন,তাহলে বুঝতে হবে তাহার উদ্দেশ্যও সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা নহে বরং ঐ দিককার দেশগুলির দাসত্ব করাই তাহার একমাত্র উদ্দেশ্য।

তাই বলছি ধর্মনিরপেক্ষ পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্রাজ্যবাদীগণ আমাদের উপর অত্যাচার করছে বলে,আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে ইসলাম ধর্মকে পরিত্যাগ করার কোন প্রশ্নই ওঠে না।আমরা পূর্ব পাকিস্তানী মুসলমানেরা এক হয়ে সংখ্যালঘু পশ্চিম পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বহিষ্কার করে দিলেই সকল লেঠা চুকে যাবে। বাঁশও থাকবে না,বাশিও আর বাজবে না।

আদর্শিক মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করতে গেলে,আর এক শ্রেণীর মুসলমান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাদের ধারণা ইসলাবাদ,মক্কা,কায়রো ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ জায়গার মধ্যেই ইসলাম সীমাবদ্ধ।ইহা অত্যন্ত ভুল ধারণা। ইসলাম কোন বিশেষ জায়গায় অথবা কোন বিশেষ ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নহে। বরং পবিত্র কোরান এবং হাদীছের মধ্যেই ইসলাম সীমাবদ্ধ। পবিত্র কোরান হাদিছেন অনেক রকমের বাংলা অনুবাদ ও ব্যাখ্যা আজকাল পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে পাওয়া যায়।

এখন যারা না বুঝে, অনবরত প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে ইসলামবিরোধী প্রচার অথবা কাজ করে যাচ্ছেন, তাহাদের নিকট যাহারা ইসলাম সম্বন্ধে উদাসীন রয়েছেন তাহাদের নিকট এবং সকল ঈমানদার মুসলমানের নিকট আমাদের আকুল আবেদন- আসুন আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা করতঃ ইহাকে একটি শক্তিশালী ইসলামী সাম্যবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করি। দুনিয়ার বুকে ইসলামের বিজয়কেতন উচিয়ে ধরি। আমাদের জন্মভূমিকে আদর্শিক মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করি। দুনিয়ার সর্বহারা মুসলমানগণকে তাদের নিজ নিজ দেশের সাম্রাজ্যবাদীদের খপ্পড় থেকে উদ্ধার করে একটি ইসলামী জাতিসংঘ গঠন করি। তৎপর দুনিয়ার অন্যান্য ধর্মের সর্বহারাগণকেও সাম্রাজ্যবাদীদের বিরূদ্ধে তাদের নিজ নিজ মুক্তি সংগ্রামে সাহায্য করি।

                                              রাজনীতিকদের ভাঁওতাবাজি

একটু গভীর ভাবে চিন্তা করুন। দেখতে পাবেন পাকিস্তানের জন্মের পর থেকেই সরকারী,বিরোধী,ধর্মপক্ষ, ধর্মনিরপেক্ষ,প্রগতিবাদী, দুগতিবাদী অর্থাৎ এক কথায় বড় বড় রাজনৈতিক দলের প্রায় সব কতটিকেই পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্রাজ্যবাদীগণ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। রাজনৈতিক দল গুলির প্রায় সব কয়টিই জেনে অথবা না জেনে, ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় জনসাধারণকে ধোঁকা দিয়ে এতদিন যাবৎ ঘৃণিত সাম্রাজ্যবাদীদেরই পায়রবী করে আসছে। তাই দেখা যায় নানান জাতের দফার ছড়াছড়ি। যেমন- ২১ দফা,১৪ দফা,১১ দফা, ৮ দফা, ৭ দফা 

৬-দফা ইত্যাদি। সকল নেতাই জানেন আলাদা হওয়া ব্যতীত মুক্তি নেই। তবুও উজির-নাজির হওয়ার আশায় এ সকল দফা দেন।

আশ্চর্য্যের বিষয় যারাই এই সকল দফা দেন, রাজনৈতিক জীবনের দূরের কথা- ব্যক্তিগত জীবনেও তাদের প্রায় সকলেই এ সকল দফার পালনযোগ্য দফাগুলির একটিও পালন করেন না; বরং বিরোধিতা করেন। ছোট্ট একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে উঠবে। সকলেই জানেন বাংলাভাষা  আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে বাংলা বান্ধবরূপী তথাকথিত অনেক নেতাই অন্যান্য দফাসহ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিশেবে চালু করার ওয়াদা তথা দফা দিয়ে মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছিলেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, পশ্চিম সাম্রাজ্যবাদীগণকে খুশী রাখার জন্যই মন্ত্রী হওয়ার পরে আর তারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিশেবে চালু করেন নাই। যা করতে একটি পাই-পয়সাও খরচ হতো না। বেইমান রাজনীতিকরা বলে বেড়ায়, বাংলা নাকি রাষ্ট্রভাষা হিশেবে চালু হয়ে গেছে। এটা একটি ডাহা মিথ্যা কথা। অনেকেই জানেন না যে, ঢাকা হাইকোর্টে বাংলায় আরজি লেখার অপরাধে আজ প্রায় ৪. (সাড়ে চারি) বৎসর যাবৎ ঢাকা হাইকোর্টে আমার ওকালতি বন্ধ আছে। এর বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে বাংলায় লিখিত আরজি মারফৎ মামলা চলতে থাকার অপরাধে সুপ্রীমকোর্টও আজ ৩. (সাড়ে তিন) বৎসর যাবৎ আমার ঐ মামলার শুনানী দিচ্ছে না। আ’মরি রাষ্ট্রভাষা। সাম্রাজ্যবাদীর পদলেহনকারী, বেহায়া এবং ধোঁকাবাজ নেতাগুলো তাদের দলীয় কাজের অনেক কিছুই এখন পর্যন্তও ইংরেজীতেই করে। তারা ২১-শে ফেব্রুয়ারির শহিদ দিবসে পর্যন্ত ইংরেজীতে বিবৃতি দেওয়ার আস্পর্ধা রাখে। ছেলেপেলেগণকে ইংরেজী-মাধ্যম, স্কুল- কলেজে পড়ায়। পশ্চিমা প্রভুদের সংঙ্গে দেখা হলেই তথাকথিত নেতাগণ সুবোধ ক্রীতদাসের মতো গড়গড় করে ইংরেজী অথবা উর্দুতে কথা বলতে থাকে। বাংলায় কথা বলতে তাদের শরমের উদ্রেক হয়!! নেতা আর কাকে বলে!!

 

<2.142.604-605>

আজকাল দেখা যায় ৬ দফাই বাজার মাত করে ফেলেছে। কিন্তু ৬ দফা একটি স্ববিরোধী, জগাখিচুরি দফাসমষ্টি। ইহা যেভাবে রচিত তাহাতে একটি কনফেডারেশন হয়। ফেডারেশন হয় না। পরিতাপের বিষয়, যারা এই দফাগুলোর উদ্যোক্তা তারা আবার কনফেডারেশন চায় না। ইহাকেই বলে কলির লীলা। যাহা হউক, বর্তমানে ৬ দফার উদ্যোক্তারা যে বিষয়ের উপর জোর দিচ্ছে তাহা হলো, তারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে অর্থ পাচার বন্ধ করণ বিষয়ক।  আমরা জানিনা, আদমজি, দাউদ, ইস্পাহানী, ইউসুফ হারুন সহ বহু অবাঙ্গালি পূঁজিপতিদের শিল্প-বাণিজ্য, আমদানী-রপ্তানীর ব্যবসা, ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স ইত্যাদি বিনা ক্ষতিপূরণে জাত্যায়ন না করলে কিভাবে পূঁজিবাজার বাজার বন্ধ হবে? অবাঙ্গালি পূঁজিপতিদের সঞ্চিত লভ্যাংশ তথা বর্ধিত পূঁজি ঘুষ খেয়ে খেয়ে তথাকথিত বাঙ্গালি নামধারী মন্ত্রী অথবা আমলারাই পূর্ব পাকিস্তানের বাহিরে পাচার করে দেবে। ঘুষ ছাড়াও ৬ দফার ৫(৪) নং দফা অনুসারে পূর্ব পাকিস্তানী পণ্য পশ্চিম পাকিস্তান পাঠিয়ে পূঁজি পাচার করা যাবে। সেই পণ্য পরে বিদেশে রপ্তানী করে নগদ টাকায় রুপান্তরিত করা যাবে। ইহা ব্যাতিত নিন্মমূল্যে চালান (আন্ডার ইনভয়েসিং) এবং আরো অন্য উপায়ে বাহিরে পূঁজি পাচার করা যায় যাহা বুঝতে গেলে আমাদের দেশের অনেক রাজনীতিকের মগজেই হাতুরি ঠুকতে হবে। ৬ দফার সবচেয়ে মারাত্মক ত্রুটি হলো, ইহাতে উভয় অঞ্চলে বিদ্যমান অনৈতিক বৈষম্য, চাকুরির বৈষম্য এবং বিষের করে সামরিক চাকরির বৈষম্য দূর করার ব্যাপারে কোনো কর্মসূচী নাই।  সকলেই জানেন সামরিক চাকরির বৈষম্যই হলো সকল অনাচারের মূল। “দেশের সংহতির স্বার্থে সামরিক বাহিনীতে বাঙ্গালির অনুপাত ৫৬℅ করার নিমিত্তে শাসনতন্ত্র পাশ করার পরের দিন সামরিক বাহিনীতে কর্মরত পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসার ও সৈন্যদের অর্ধেককে বাধ্যতামূলক বিদায় দেওয়া হবে এবং তদস্থলে খাঁটি পূর্ব পাকিস্তানীদের নিয়োগ করা হবে” -বলে যদি শাসনতন্ত্রে মৌলিক অধিকারের আওতা বহির্ভূত একটি দফা যোগ না করা হয় একশত বছর পরেও সামরিক চাকরির বৈষম্য দূর হবে না। অন্যান্য চাকরির বৈষম্য দূর করার জন্যও অনুরূপ ব্যবস্থার প্রয়োজন। ন্যাশনাল গার্ড থেকে সামরিক বাহিনীতে নেওয়া প্রায় পঞ্চাশ হাজার বাঙ্গালিকে মাত্র একদিনের নোটিশে বিদায় করা হয়েছিলো। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সাবেক বাড়তি ব্যয় আদায় করার ব্যাপারে ৬ দফার নীরবতা রহস্যজনক। অধিকন্তু ইয়াহিয়া খানের অাইন কাঠামো মেনে নেওয়ার পর ৬ দফার জিগির অর্থহীন হয়ে পড়েছে।

কোনো কোনো নেতা বলছেন, শাসনতন্ত্র পাশ হয়ে গেলে গণতন্ত্রের মাধ্যমে সকল বৈষম্য, সকল অনাচার হুরহুর করে দূর হয়ে যাবে। এর আগেও দুইটা শাসনতন্ত্র ছিলো। উভয় শাসনতন্ত্রেই অাঞ্চলিক বৈষম্য ও চাকুরির বৈষম্য দূর করার মিঠা বুলি ছিলো। কিন্তু তাতে চিড়া ভিজেনি। বৈষম্য দূর হওয়ার পরিবর্তে বরং বেড়েছে। পূর্বেই বলা হয়েছে, প্রয়োজনবোধে ঘৃণিত সম্রাজ্যবাদীগণ রাইফেলের সহায়তায় দেশের শাসনতন্ত্রকেও আস্তাকুড়ে ফেলে দেয়।  তাই ভবিষ্যতে যত বেশি করে শাসনতন্ত্র পাশ হবে এবং নির্বাচন হতে থাকবে বৈষম্যের পরিমাণও সেই অনুপাতে বাড়তে থাকবে। কারণ সম্যাজ্যবাদী নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের প্রায় সকলকেই টাকা দিয়ে খরিদ করে ফেলে যাতে জনপ্রতিনিধগণ সম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থে কাজ করে। দৈবক্রমে গণপ্রতিনিধিগণ সম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করতে চাইলে তাহারা যেকোনো গন্ডগোল অথবা রায়ট লাগিয়ে সামরিক শাসন জারি করে দেয়। তথাকথিত রাজনীতিকরা মন্ত্রী হতে চায়, অর্থ চায়, প্রতিপত্তি চায়। দেশের মঙ্গল চায় না। তাই তথাকথিত রাজনীতিকদের উপর নির্ভর করে হাজার বৎসর নির্বাচন করলেও এবং শত শত শাসনতন্ত্র পাশ করলেও উভয় অঞ্চলের বৈষম্য দূর হবে না। অধিকন্তু যে সকল রাজনীতিক পশ্চিম পাকিস্তানী সম্রাজ্যবাদীদের টাকা দিয়ে নির্বাচন করে তাহারা পূর্ব পাকিস্তানের অমঙ্গল বৈ মঙ্গল করতে পারে না। কারণ  পেটে খেলে পিঠে সয়।

আমরা সুদীর্ঘ ২৩ বৎসর যাবৎ নানা জাতের শাসনের লীলা খেলা দেখেছি। পারিষদিক গণতন্ত্র দেখেছি। সামরিক শাসন দেখেছি। একনায়কতন্ত্র দেখেছি। নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র তথা মৌলিক গণতন্ত্রও দেখেছি। আমাদের পোড়া কপাল। কোনো প্রকার শাসনেই পূর্ব পাকিস্তানের উপর শোষণ বন্ধ হয় নাই। চাকরির বৈষম্য দূর হয় নাই। অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়তেই থাকে। অফিস আদালতে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা তথা বাঙ্গালির মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় নাই।

১৯৬৯ এর স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন মারফত ভোটাধিকার আদায় করা হয়। ঐ সময় অন্যান্য লোকজন সহ জনৈক তথাকথিত নেতাকেও ফাঁসির মঞ্চ থেকে ছিনিয়ে আনা হয়। আশ্চর্যের বিষয় ঐ অকৃতজ্ঞ নেতাই এখন দাবী করছেন যে, তিনি নাকি হাজতে থেকে দৈববলে ভোটাধিকার আদায় করেছেন। তার দাবী যদি সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় তাহলে বলতে হয় কিছুদিন পরপর সম্রাজ্যবাদী শয়তানগুলি বেয়নেটের খোঁচায় খোঁচায় ভোটাধিকার নষ্ট করে দিতে থাকলে আমরা কি চিরকাল ধরে পৌনঃপুনিকভাবে ভোটাধিকার আদায়ের কাছে ব্যাপৃত থাকবো?

উত্তর অঞ্চলের বৈষম্য দূর করার ব্যাপারে ক্ষমতালিপসু রাজনীতিকদের কথা বাদ দিলেও দেখা যায় দুই জাতের রাজনীতিক দুধরনের যুক্তি দিচ্ছে। কমিউনিস্ট তথা সমাজতন্ত্রীরা বলছে সমাজতন্ত্র চালু হলেই উভয় অঞ্চলের বৈষম্য দূর হয়ে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে দুধের নহর বইবে। মোল্লারা বলছে- উভয় অঞ্চল নিয়ে একটি মাত্র খাঁটি ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করলেই সকল বালা-মছিবত দূর হয়ে যাবে। উভয় তরফের যুক্তি আংশিক সত্য বটে। উভয় নীতির যে কোনো একটি প্রতিষ্ঠিত হলে পূর্ব পাকিস্তানে কিছুটা সাময়িক সমৃদ্ধি আসবে। কিন্তু তাতে বৈষম্য দূর হবে না। কারণ বর্তমান পশ্চিম পাকিস্তান একটি শিল্পভিত্তিক দেশ এবং পূর্ব পাকিস্তান একটি কৃষিভিত্তিক দেশ। তাই উভয় অঞ্চল একসাথে থাকলে অর্থ-বিজ্ঞানের “বাড়ন্ত এবং পড়ন্ত উৎপাদন” (ইনক্রিজিং এন্ড ডিমিনিশিং রিটার্ণ) নীতি অনুযায়ী আঞ্চলিক বৈষম্য কমার পরিবর্তে অনন্তকাল পর্যন্ত বাড়তেই থাকবে। তদুপরি কথিত ইসলামী রাষ্ট্র অথবা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র যাহাই হউক না কেনো, নেতৃত্বটা উভয় ব্যবস্থাতেই ঘুরে ফিরে পশ্চিম পাকিস্তানী সম্রাজ্যবাদীদের হাতেই থেকে যাচ্ছে। কারণ সম্রাজ্যবাদীদের নিয়োজিত লোকজনই বর্তমান উভয় তরফের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

৫) একমাত্র প্রতিবাদ

উপরে বর্ণিত আলোচনায় ইহা পরিস্কারভাবে ফুটে উঠেছে যে, অর্থবিজ্ঞানের নীতি অনুসারে পশ্চিম পাকিস্তান চিরদিনই পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করবে। পূর্ব পাকিস্তানের দাবীর কথা উঠলেই পশ্চিম পাকিস্তানী সম্রাজ্যবাদীগণ ছল ছাতুরী, গড়ি মিসি ও টালবাহানা করে চিরদিনই ইহা ধামাচাপা দেবে এবং এখন ঘায়েল অন্য দিকে করবে। সুতরাং আমাদের পূর্ব পাকিস্তানীদের বাঁচার একমাত্র পথ হলো ৬ দফার প্রথম দফায় বর্ণিত লাহোর প্রস্তাবের মর্ম হতে সকল দেনা পাওনা পরিস্কার করতঃ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করে ইহাকে নিয়ে একটি পৃথক স্বাধীন ও সার্বভৌম ইসলামী সাম্যবাদী রাষ্ট্র গঠন করা। কোরান ও সুন্নার উপর ভিত্তি করে যে রাষ্ট্রের আদর্শ রসূল করিমের সময় হতে আরম্ভ করে ওমর বিন খাত্তাব পর্যন্ত চালু খেলাফতের আদর্শের অনুরূপ হবে। যে রাষ্ট্রের বড় বড় সকল সম্পত্তি তথা বড় বড় শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য, খনি, খামার ইত্যাদি বিনা ক্ষতিপূরণে জাত্যায়ন করা হবে অর্থাৎ গণতহবিলে(বায়তুল মাল) নিয়ে আসা হবে। যেখানে কোনো পরিবার গাড়ি বাড়ি ইত্যাদি ব্যবহারের জিনিস একটার বেশি থাকবে না। যেখানে কেহ ব্যবহারের জিনিস ভাড়া দিয়ে খেতে পারবে না। যেখানে কর্মচারীদের বেতনের তারতম্য অথবা নাগরিকদের আয়ের তারতম্য ১:৫ এর বেশি অর্থাৎ এক গুণ থেকে পাঁচ গুণের বেশী হবে না এবং  কোনো নাগরিকের আয় পাঁচগুণের অধিক হলে তা গণতহবিলে নিয়ে আসা হবে। সেখানে সঙ্গতিবিহীন বেহাল নাগরিকগণকে কোনো কাজ দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বেকার ভাতা দেওয়া হবে। যেখানে কোনো বিদেশী ইজমের প্রচার নিষিদ্ধ হবে।

<2.124.606-607>

    যে রাষ্ট্রে  কেবল মুসলমানদের সার্বজনীন ভোটে নিদির্ষ্ট মেয়াদ অন্তর নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিও (খলিফা), কেবল মুসলমানদের সার্বজনীন ভোটে নির্দিষ্ট মেয়াদ অন্তর নির্বাচিত গণপরিষদ এবং বিচার বিভাগের মধ্যে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতার ভারসাম্য এমন ভাবে রাখা হবে যাতে একটি আরেকটিকে ডিঙ্গাতে না পাড়ে। যেখানে কোন প্রার্থী নির্বাচনী প্রচার করতে পারবে না। রাষ্ট্র থেকে সকলের জন্য সমান প্রচারের ব্যবস্থা করা হবে এবং প্রার্থীসংখ্যা কমানোর জন্য জামানোত বাজেয়াপ্ত বা অন্য কোন রকম ব্যবস্থা থাকবে। পদের গুরুত্ব যত বেশী হবে, ব্যবস্থাও তত কড়া হবে। যে রাষ্ট্রে অমুসলিম সংখ্যালঘুদের সার্বজনীন ভোটে নির্বাচিত একটি পৃথক পরিষদ থাকবে। কেবল সংখ্যালঘুদের ধর্মসংক্রান্ত কোন আইন পাশা করতে হলে সরকার এই পরিষদের মতামত মেনে চলবে।

    অমুসলিমদের ভোটাধিকার নাই দেখে দেখে অনেকে হয়তো আতকে উঠবেন। ইহাতে আতকে উঠার কোন কিছুই নাই। শুধু ইসলামী রাষ্ট্রই অমুসলিমদের ভোটাধিকার খর্ব করে না। আধুনিক কম্যুনিষ্ট ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্রগুলিও অকম্যুনিষ্টদের ভোটাধিকার খর্ব করেছে। আদর্শবাদী রাষ্ট্রের নিয়মই তাই। কম্যুনিষ্ট ধর্ম গতহণ অথবা মান্য না করলে, তাদেরকে সোজাসুজি পরপারে যাবার ব্যবস্থাওকরে। কম্যুনিষ্ট রাশিয়া এই কারণেই তাদের দেশের অন্যান্য জাতের অসংখ্য লোকের সঙ্গে লাখে লাখে মুসলমানকেও মেরে ফেলেছে। এই একই কারণে কম্যুনিষ্ট চীণ, তাদের দেশের অন্যান্য জাতের অসংখ্য লোকের সঙ্গে ৬ কোটি মুসলামানের মধ্যে প্রায় ৫ (পাঁচ) কোটিকেই লাপাত্তা করে দিয়েছে। কম্যুনিষ্ট, তথা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে, অতীতের পুঁজিবাদী অথবা পুঁজিবাদের সমর্তগকদের ভোটাধিকার নাই। সর্বহারাগণ ভোটাধিকার দিলেও ভোটাধিকার প্রয়োগ করার ক্ষমতা, সর্বহারাগণের হাতে দেওয়া হয় নাই। ভোটাধিকার প্রয়োগ করার ক্ষমতা অর্জনের জন্য কোন সর্বহারা, নির্বাচন মারফৎ গণপ্রতিনিধি হ’তে চাইলে তাহা সে পারবে না, যদি না সে কম্যুনিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে অর্থাৎ কম্যুনিষ্ট পারররটির সদস্য হয়। কিন্তু কম্যুনিষ্ট তথা সমাজতন্ত্রী নামধারী স্বার্থপর, ভন্ড ও ক্ষমতালোভী মূর্খগুলো জেনেও জানে না যে সর্বহারা সকল বিধানেই সর্বহারা। সে কম্যুনিষ্ট ধরম বা অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করলে অথবা না করলে, মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ বা মাওবাদ মানলে অথবা না মানলেও সর্বহারাই থেকে যায়। পুঁজিবাদ যেমন কোন বিশেষ ধর্ম গ্রহণ করা অথবা না করার নির্ভর করে না- সেইভাবে সর্বহারা গরীবও কম্যুনিষ্ট ধর্ম বা অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করা অথবা না করার উপর নির্ভর করে না, বরং একটি লোকের অর্থনৈতিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। এখন দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর কোন কম্যুনিষ্ট তথা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই রাষ্ট্রের মোট লোকসংখ্যার শতকরা ৪ (চার) অথবা ৫ (পাঁচ) ভাগের বেশী লোক কম্যুনিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে নাই অর্থাৎ মগজ ধোলাই করতঃ কম্যুনিষ্ট পার্টির সদস্য হয় নাই। ফলে, আদর্শবাদী কম্যুনিষ্ট তথা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে শতকরা চার অথবা পাঁচভাগ কম্যুনিষ্ট মতাবলম্বী তথা খোদাবিরোধী ব্যতীত বাকী শতকরা ৯৫ (পঁচানব্বই অথবা ৯৬ ছিয়ানব্বই) ভাগ সর্বহারার ভোটাধিকার প্রয়োগ করার জন্য গণপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার ব্যবস্থা তথা কার্যকরী ভোটাধিকার নাই। অনুরূপভাবে, আদর্শহীন পুঁজিবাদী দেশেও ৯৫% ভাগ দরিদ্র জনসাধারণের অর্থাভাব হেতু গণপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার ক্ষমতা তথা কার্যকরী ভোটাধিকার নাই।

    আদর্শবাদী বা ধর্মবাদী রাষ্ট্রে ভিন্ন আদর্শের অনুসারীগণকেই কৌশলগত (টেকনিকেল) কারণেও ভোটাধিকার দেওয়া যায় না। কারণ ভিন্ন আদর্শের লোকজনকে ভোটাধিকার দিলে পর আদর্শবাদী রাষ্ট্রটির রাষ্ট্রীয় আদর্শের অস্তিত্বই থাকে নাঃ ধ্বংস হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানে ইহার দু’বার পরীক্ষা হয়ে গেছে, তাহার একটি স্বতন্ত্র নির্বাচনের মাধ্যমে, অপরটি যুক্তনির্বাচনের মাধ্যমে। স্বতন্ত্র নির্বাচনের সময় দেখা গেছে পূর্ব পাকিস্তান পরিষদে অমুসলিমদের আসন সংখ্যা নির্দিষ্ট থাকে। তাহারা সংখ্যালঘু বিধায় সংখ্যাগুরু মুসলমানদের ভয়ে, তাদের মধ্যে দৃঢ় ঐক্য বজায় থাকে। তাই তাহারা সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ, নির্দিষ্ট সংখ্যক আসনের অধিকারী থাকায়; বিভক্ত, ক্ষমতালপসু এবং নিজেদের আদর্শ সম্বন্ধে উদাসীন সংখ্যাগুরু মুসলমানগণকে কান ধরে ঘুরাতে থাকে। লোভী ও বিভক্ত মুসলমাণগণ সংখ্যালঘু অমুসলিমদের ইচ্ছানুযায়ী অনেক কিছু করতে বাধ্য হয়। যাহা অনেক সময় ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। এই জিনিষটা টের পেয়ে, দূরদর্শী মুসল্মান রাজনীতিকগণ যুক্ত নির্বাচনের ববস্থা করেন। তাতে সাধারণতঃ মুসলমান সদস্যগণই নির্বাচিত হয়। কিন্তু তার আদর্শিক ফলাফল উলটো হয়রছ্র। অর্থাৎ মুসলমানগণ নির্বাচনের সময়ে আর তাদের এলাকায় প্রাণখুলে ইসলামী আদর্শের কথা প্রচার করতে পারে না। ভয়, তাহলে সংখ্যালঘু অমুসলিমদের ভোট একটিও পাবে না। যে সকল ভোটের সংখ্যা নেহায়েৎ কম নহে। বরং অমুসলিম ভোটারগণের মনোরঞ্জনের জন্য, কে কত বেশী পরিমাণে ইসলামী আদর্শের জলাঞ্জলী দেবে এবং কে কত বেশী ধর্মনিরপেক্ষতা দেখাবে, তা নিয়ে মুসলমান প্রতিদ্বন্দীদের মধ্যে প্রোতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। ফল স্বরূপ দেখা যায় যে, ইসলাম আদর্শের জন্য পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল, ধর্মনিরপেক্ষতার ঠেলায় সেই ইসলামী আদর্শই আজ ধ্বংসের মুখে।

    পূর্বেই বলেছি, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি হলো সর্বভারতীয় কংগ্রেসের রাজনীতি অথবা আমেরিকা এবং ইউরোপীয় দেশে প্রচলিত রাজনীতি এই জাতের রাজনীতি হলো পুঁজিবাদীর তরহা আধুনিক সাম্রাজ্যবাদীদের বাহন। কম্যুনিষ্ট রাষ্ট্র ব্যতীত, আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ অথবা হিব্দুস্তানী সম্প্রসারণবাদ অথবা পৃথিবীর অন্য যে কোন ধর্মনিরপেক্ষ দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র গঠন করেঃ যে ধরনের রাজনীতি অনায়াসেই করা যায়। মুসলমান নামের খোলসধারী পুঁজিপতিদের সুবিধার জন্য এইটুকু পাকিস্তান, আলাদা করে রাখার প্রয়োজন পড়ে না। অখন্ড ভারত হতে অনায়াসেই, সমর্থ মুসলমানগণ হজব্রত সম্পন্ন করতে পারতঃ কিন্তু পাকিস্তান থেকে হজব্রত সম্পন্ন করতে হলে, বৎসরের পর বৎসর পারমটের জন্য বসে থাকতে হয়। অখন্ড ভারতের মুসলমানগণ বিনা বাধায় ব্যক্তিগতভাবে বা জমাতের সংগে তাদের নামাজ-রোজা আদায় করত পারতো। শুধু আদায়েই নহে-নামাজের সময় ঢাক-ঢোল-কর্তাল বাজালে, হিন্দুদের সংগে খুনাখুনি হয়ে যেত। বর্তমানে হিন্দুস্তানে এখনও তাই হয়। পাকিস্তানের শহরগুলিতে ধরমনিরপেক্ষ মুসলমানদের মাইকের আওয়াজের ঠেলায় এবং রেডিও পাকিস্তানের প্রোগ্রামের ঠেলায় পাকিস্তান-তথাকথিত ইসলামী রাষ্ট্রের মুছল্লিগণ সমাজ পড়তে পর্যন্ত অসুবিধা ভোহ করে। হিন্দুস্তানে যাহা অচল-ইসলাম ধর্মে কঠোরভাবে নিষীদ্ধ সেই মদের ব্যবসায় আজ পাকিস্তান সচল। নারী ব্যবসার দিক দিয়ে পাকিস্তান সকলের শীর্ষস্থান দখল করছে। লাখে লাখে মুসলমানমতো এই জাতের ইসলামী রাষ্ট্র অথবা অতীতের অখন্ড ভারতের অনুরূপ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠন করার জন্য তাদের নিজেদের জান-মাল-ইজ্জত-আবরু পর্যন্ত কুরবান দিয়েছিল। যাহা হউক অতীতে, পাক-ভারতের পূর্বাঞ্চল নিয়ে একটি ইসলামী সাম্যবাদী রাষ্ট্র গঠন করার পক্ষে অন্যান্যদের সংগে বাংলা ও আসামের মুসলমানগণও দ্ব্যররথহীনভাবে রায় দিয়েছিল এবং প্রয়োজন হলে এখনও দেবে। তাই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন এখনও অবান্তর।

    এখন আমাদের পূর্বরতী রূপ্রেখা অনুযায়ী, রাষ্ট্র গঠন করার নিমিত্ত আলাদা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে সকল পূরব পাকিস্তানীর উচিত, পশ্চিম পাকিস্তানীদের তৈরী অথবা এখানকার অবাংগালীদের তৈরী সকল প্রকা দ্রব্য বর্জন করা এবং পশিমাদের ব্যাঙ্ক, বীমা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি বয়কট করা।

    অধিকন্তু পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, চালচলন রীরিবীতি ইত্যাদি দু’রকমের এবং দুই অঞ্চলের মাঝখানে বাধাস্বরূপ প্রায় ১৫০০ (পনেরশত) মাইলজুড়ে একটি শত্রুভাবাপন্ন দেশ অবস্থিত। তাই অতিদূ’রের এই দুটি সংলগ্ন অঞ্চল অঞ্চল নিয়ে একটি দেশ কোন মতেই ভারসাম্য বজায় রেখে টিকে থাকতে পারবে না। এর সুবিশাপ্রাপ্ত অংশ সবসময় অপর অংশকে দাবিয়ে রাখবে। আল্লাহর দুনিয়াতে এই আজগুবি ধরনের স্বাধীন দেশ আর একটিও নাই। এসব কথা চিন্তা করেই আমাদের মুরব্বীগণ ১৯৪০ ইংরেজীতে লাহোরে বসে ঠিক করেছিলেন, দুটি অঞ্চল নিয়ে পৃথক দু’টি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করা হবে। পূর্বেই বলা হয়েছে, কতিপয় পশ্চিমা নেতার চক্রান্তে তাহা বাস্তবায়িত হয় নাই।

    একটি দেশ বা পরিবার দু’ভাবে আলাদা হয়। তার একটি হল যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে। অপরটি হলো শান্তিপূর্ণভাবে। যুদ্ধবিগ্রহ একটি অদ্ভুত জিনিস। কোথায় কিভাবে সংঘটিত হয়, বলা যায় না। নেপোলিয়ানের

 

 

<2.142.608-611>

আল্পস অতিক্রমের কথা কেউ কোনদিন কল্পনাও করেনি। ম্যাজিনো লাইনের পিছনে জারমান ছত্রী বশিনী নামার বিষয়ে সরাসীরা স্বপ্নেও ভাবেনি। মিশরের রাডার চুরির কাহিনী, সমগ্র পৃথিবীর গাঁজাখোরগণকেও টেক্কা দিয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা যদি মনে করে থাকে আলাদা হওয়ার জন্য যুদ্ধ হলে তাহা পূর্ব পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তাদের গায়ে আঁচড় লাগবে না; তবে তাহা তাদের ভুল ধারণস। আলাদা হওয়ার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানেও যুদ্ধ হতে পারে। অহাবী আন্দোলনের সময় দেখা গেছে, বাংগালী মুজাহিদগণ সীমান্তের দুর্গম এলাকায় পর্যন্ত গমন করে সেখানেও বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে।

    উহা হউক শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা হওয়াই আলাদা হওয়ার উত্তম পন্থা। ইহাতে কোন পক্ষই বাড়তি ক্ষতির সম্মুখীন হয় না। হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই আলাদা হয়ে গেছে। এমনকি তিক্ততা কমিয়ে সদভাব রক্ষার জন্য সহোদর ভাইয়েরাও শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা হয়। তাই ইসলামের বৃহত্তর সঙ্ঘতির স্বার্থে, সকল দেনা পাওনা পরিশোধ করে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের এখন আপোষে আলাদা হয়ে যাওয়াই মুলতির ও শক্তি ব্রিদ্ধির একমাত্র পথ। কারণ কলহরত বৃহৎ পরিবারের চেয়ে সঙ্ঘত ছোট্ট পরিবারই অধিক শক্তিশালী।

    কেহ লেহ বলতে পারেন, পশ্চিম পাকিস্তানের সাহায্য ব্যতীত আমরা টিকতে পারব না। ইহা ভুল। কারণ ১৯৬৫ ইংরেজীর যুদ্ধের সময় দেখা গেছে পশ্চম পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তানকে আসাহায্য করবে কি, তাহারা তাহাদের নিজেদের দেশ পশ্চিম পাকিস্তানকেই রক্ষা করতে পারে না। বরং ঐ যুদ্ধের সময় পশ্চিম পাকিস্তানকে রক্ষা করেছে বাংগালী বৈমানিক আলম ও অন্যান্য বাংগালী সৈন্যের অতুলনীয় সাহস, শৌর্য এবং বীর্য্য। ফলে, যুদ্ধের পর পর বাংগালীর বীরত্বের স্বীকৃতি স্বরুপ, মুগ্ধ দু’জন পশ্চিম পাকিস্তানী দু’টি যশোগাথা রচনা করে। ঐ যুদ্ধের সময়ে হিন্দুস্তানী সৈন্যগণ, লাহোরের দিকে প্রায় দশ মেইল পাকিস্তানের ভিতরে ঢুকে যেখানে খুটা গেড়েছিল, তাদেরকে তাদের সেই অবস্থান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের বাহাদুর সৈন্যরা এক ইঞ্চিও পিছু হটাতে পারে নি। তাই বাধ্য হয়ে তাস্খন্দ চুক্তি করে। এখন বুঝে দেখুন যাহারা নিজেদের দেশ রক্ষা করতে পারে না, তাহারা কিভাবে ১৫০০ (পনেরশত) মেইল শত্রুদেশ ডিঙ্গিয়র আমাদেরকে সাহায্য করবে?

    গত ১২/১১/৭০ইং তারিখের ঘূর্ণি ও গরকীতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় ১০ লক্ষ লোক প্রাণ হারায় এবং আরো প্রায় ২৫ (পঁচিশ) লক্ষ লোক অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সারা দুনিয়ার লোক দুর্গত বনি আদমের সাহায্যের জন্য পাগলের ন্যায় ছুটে আসে। ৬,০০০ (ছয় হাজার) মেইল দূর আমেরিকা তার হেলিকপ্টার পাঠায়। রাশিয়া, চীনা, জাপান, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশ কম্বেশী অনুরুপ দূরত্ব থ্বক্ব বেহিসাব সাহায্য এবং বিমান ও জাহাজাদি পাঠায়। পূর্ব পাকিস্তানের এই দুর্যোগকে ইরান তার জাতীয় বলে ঘোষণা করতঃ ইরানী বিমান দিয়ে ঢাকা ও ইরানের মধ্যে আকাশ সেতু রচনা করে। ছোটোখাটো ঐ কেয়ামতের সময়ও দেখা গেছে, পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্রাজ্যবাদীগণ, পূর্ব পাকিস্তানের টাকায় ক্রীত শত শত বিমান ও হেলিকপ্টার নিয়ে চুপটি মেরে পশ্চিম পাকিস্তানে বসে থাকে। বেহিসাব বিদেশী সাহায্য দ্রব্য যখন পূর্ব পাকিস্তানে স্তূপীকৃত হয়ে যায়, তখন তাহার ভাগ-বাটোয়ারার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্রাজ্যবাদীগণ, তাহাদের প্রতিভূ ইয়াহিয়া খান ও অন্যান্য কতিপয় কেন্দ্রীয় কর্মচারীকে পূর্ব পাকিস্তানে প্রেরণ করে।

    উপরোক্ত দু’টি ঘটনায় এখন ইহা দিবালোকের মত পরিষ্কার হয়ে গেল যে, পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্রাজ্যবাদীগণ, পূরব পাকিস্তানকে যুদ্ধের সময় সাহায্য করা দূরে থাক শান্তির সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের ধ্বংসরুপী প্রলয়ঙ্করী বিপদের দিনে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনা। নেমখারামগুলো, কেন্দ্রে সঞ্চিত পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ এবং যানবাহনাদি দিয়ে পর্যন্ত্য পূর্ব পাকিস্তানীকে সাহায্য করতে প’বাড়ায় না। বরং পূর্ব পাকিস্তানের বিপদকে অতিরঞ্জিত করছে বলে, তাহারা বিশ্ববাসীকে অপবাদ দেয়। নেমখারাম কি আর গাছে ধরে? এই জাতের নেমখারামদের থেকে যত শীঘ্র আলাদা হওয়া যায় ততই মঙ্গল। এখন সকল পূর্ব পাকিস্তানীর উচিৎ শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা হওয়ার জন্য আন্দোলন আরম্ভ করা। উক্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন যদি মোগল বাগানবাড়ীর অধিবাসী এবং তাহার আশেপাশের অধিবাসীরা সাড়া না দেয়, তবে আইন বিজ্ঞানের শেষ বিধান (সেংশন) অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই উভয় অঞ্চলের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাবে। যাতে উভয় পক্ষেরই সমূহ ক্ষতি হবে।

    একদল ভন্ড প্রগতিবাদী আছেন, যারা আফ্রো-এশিয়ার সর্বহারার সংগ্রাম নিয়ে এতই ব্যস্ত যে, পূর্ব পাকিস্তানদের সর্বহারাদের কথা চিন্তা করার সময়ই পান না। তারা ধুয়া তুলবেন পশ্চিম পাকিস্তানের জনসাধারণ তো কোন অপরাধ করে নাই। তবে আলাদা হবে কেন? এক শ্রেণির মোল্লারাও হয়ত এই জাতের প্রশ্ন উঠাবেন। তার একমাত্র উত্তর, একটা দেশের নেতৃত্ব নেতারাই দেয়ঃ জনসাধারণ নহে। ভিয়েতনামীদের বিরুদ্ধে যে সকল আমেরিকান সৈন্য যুদ্ধ করছে, তারাও সর্বহারা। কিন্তু তারা নির্বিবাদে তাদের পুঁজিবাদী নেতাদের হুকুম মেনে, ভিয়েতনামী সর্বহারাগণকে কতল করে যাচ্ছে। সর্বহারাদের মঙ্গলকামী চীন ও রাশিয়া পরস্পর সুসংলগ্ন দুটি সমাজতান্ত্রিক দেশ। তবুও উভয়ে কেটি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পরিবর্তে, নিজ নিজ দেশের নেতাদের নেতৃত্বে দিবারাত্রি কলহ করে চলেছে। একই ভাষা, একই জাতোয়তা, একই ধর্ম তথা একই আল্লা-রাসুলের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও মধ্য-প্রাচ্যের আরব রাষ্ট্রগুলোর নিজ নিজ দেশীর নেতাদের নেতৃত্বে অহরহ কলহ করে চলেছে।

    অনেকে হয়তো বলবেন, আমাদের খনিজ দ্রব্য নেই। আমরা চলব কি করে? ইহাও ভূল ধারণা। একটা দেশের শক্তি তার খনিজ দ্রব্যের উপর নির্ভর করে না। বরং তার অর্থনীতির উপর নির্ভর করে। জাপানেও খনিজ দ্রব্য নাই। কিন্ত জাপান একটি বিশ্বশক্তি। এদিক দিয়ে জাপান ও পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি একই ধরনের অর্থাৎ খনিজদ্রব্য বিহীন অর্থনীতি। হাতে পয়সা থাকলে, খনিজ দ্রব্য কেন? এটম বোমা পর্যন্ত খজরিদ করা যায়।

    আশা করি সকলেই ইহা বুঝতে পেরেছেন যে, সাকুল্য দেনা-পাওনা পরিষ্কার করে, আপোষে আলাদা হয়ে যাওয়ার মধ্যেই পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের সমৃদ্ধি, মুক্তি এবং ইসলামের বৃহত্তম সংহতি নিহিত।

০                ০               ০               ০

    আমরা আমাদের মুজাহিদ সংঘের তরফ থেকে গত ২০শে মাঘ, ১৩৭৫ বাংলা, মোতাবেক ৫ই ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯ ইংরেজী হতে দ্ব্যররথহীনভাবে এই আলাদা হওয়ার আন্দোলন আরম্ভ করি। আন্দোলনের অংশ হিসাবে- ‘আলাদা হওয়াই মুক্তির পথ’ নামে একটি পুস্তিকা লিখা হয়। যাহা সরকার সম্পূর্ণ বেয়াইনিভাবে বায়েজাপ্ত করেছে এবং সরকারপক্ষ হেরে যাবে বলে, ঐ বাজেয়াপ্তির বিরুদ্ধে দায়েরকৃত আপীলের শুনানী দুচ্ছে না। আমরা এই আন্দোলনের পরের ধাপে গত ২৪শে ফালগু, ১৩৭৬ বাংলা, মোতাবেক ৮ইমার্চ, ১৯৭০ ইং তারিখে আমাদের সংঘের তরফ থেকে, ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক তথা বাহাদুর শাহ পার্কে একটি জনসভার আয়োজন করি। ঐ জনসভায়ও আমরা দ্বররথ্যহীনভাবে আলাদা হওয়ার তথা স্বাধীন পূরররব পাকিস্তান গঠন করার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করি। যার ফলে সংঘের আহবায়ককে সামরিক কতৃপক্ষ অয়ারেন্ট মারফৎ ডেকে পাঠায়। সাক্ষাৎ হলে পরে আহবায়কের সংগে অভদ্র আচরণ করে। তাহাকে ভয় দেখায়। নানাভাবে ভয় দেখিয়ে ইংলিশ-উর্দুতে কথা বলানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যররথ হয়। সংঘের আহবায়ককে ভীতসন্ত্রস্ত করতে অপরাগ হওয়ায় মুখ রক্ষার খাতিরে তাহাকে কেবল অয়ার্নিং দিয়েই সামরিক কর্তিপক্ষ দেয়। আশ্চর্যের বিষয় আহবায়কের নির্ভীক আচরণ দেখে, সামরিক কতৃপক্ষ আর স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান প্রসঙ্গ নিয়ে ঘাটাঘাটি করার সাহস পায় নাই। বরং অন্যান্যবিষয় নিয়ে সারাক্ষণ আলোচনা করে।

    যাহা হউক আমাদের জনসভার প্রায় ৮ (আট) মাস পরে ৪/১১/৭০ইং তারিখে ভাসানী সাহেব আরো ঘোষণা করেছেন,

    ১৯৭১ ইংরেজীর জানুয়ারী মাসের ৯ তারিখে তিনি এই মর্মে একটি সর্বদলীয় পরিষদ গঠন করবেন। ঐ পরিপ্রেক্ষিতে সকলের নিকট আমাদের আবেদন-পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা তথ্য স্বাধীন করার পর যদি ইহাকে, আমাদের রূপ-রেখা অনুযায়ী একটি ইসলামী সাম্যবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার দাবীর প্রতি ভাসানীর গঠিতব্য সর্বদলীয় পরিষদ সমর্থন জানায় তবে ঐ পরিষদের সহিত সকলের সহযোগিতা করা উচিৎ। অন্যথায় উহার সহিত সকল বাংগালী মুসলমানের বিরোধিতা করা উচিৎ। উপরন্ত, পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করতঃ ইহাকে একটি ইসলামী সাম্যবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য যাহারা নিজেদের জানমাল পর্যন্ত কুরবান করতে প্রস্তুত আমরা তাদের সকলকে মুজাহিদ সংঘের পতাকাতলে সমবেত হওয়ার জন্য সাদর আহবান জানাচ্ছি। তৎসহ আমাদের এই মহান সংগ্রামে আমরা পৃথিবীর সকল মুক্তিকামী মানুষের সাহায্য ও সহযোগিতা চাচ্ছি।

উপসংহার

    আমার এই আলাদা হওয়ার দাবী উঠানোর পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্রাজ্যবাদীদের বেশী এজেন্টরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা পঞ্চমুখে তাদের সাবেকি প্রচার শুরু করেছে। তারা চলছেঃ এই দাবী উঠানোর সময় এখনো আসেনি। পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হলে টিকতে পারবে না। ৯৮% (শতকরা আটানব্বই) ভাগে না হলে কি হবে ১০০% (শতকরা একশত ভাগ) স্বায়ত্তশাসন আসলে পর পূর্ব পাকিস্তানে সোনা ফেলবে। আলাদা হওয়ার প্রয়োজন পড়বে না, ইত্যাদি ইত্যাদি।

    আমি বলি, পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হলে, শুধু টিকেই থাকবে না বরং পৃথিবীর মধ্যে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আমাদের লোকসংখ্যা ৭(সাত কোটি)। দুনিয়াতে ত্রাস সঞ্চারকারী জার্মানদে সংখ্যাও মাত্র সাত কোটি। প্রায় সমগ্র এক সময়কার শাসক, ইংল্যান্ডবাসীদের সংখ্যা মাত্র ৫ (পাঁচ) কোটি। অধিকন্তু, ইংল্যান্ড তার খ্যাদ্য-দ্রব্যের ৩৫% (শতকরা পঁয়ত্রিশ ভাগের) এর বেশী নিজের দেশে উৎপাদন করতে পারে নাঃ বাকী ৭৫% (শতকরা পঁচাত্তর ভাগ) খাদ্যদ্রব্য বিদেশ থেকে আমদানি করে সুখে স্বাচ্ছন্দে টিকে আছে। পূর্ব পাকিস্তানের আয়তন ৫৪,৫০১ বর্গমাইল এবং লোকসংখ্যা প্রায় সাত কোটি। নেপালের আয়তন ৫৪, ৩৬২ বর্গমাইল। লোকসংখ্যা ৯০ (নব্বই) লক্ষ। ভুটানের আয়তন ১৯,৩০৫ বর্গমাইল। লোকসংখ্যা মাত্র সাত লক্ষ। তবুও নেপাল ও ভুটান দুই বিরাট প্রতিবেশী চীন এবং ভারতের মাঝখানে, সুউচ্চ আকাশের উচ্চতাকে ভেদ করে, গর্বভরে তাদের স্বাধীন পতাকা উড্ডীন রেখেছে। সিংহলের আয়তন ২৫,৩৩২ বর্গমাইল এবং লোকসংখ্যা ৯৪ (চুরানব্বই) লক্ষ। অর্থাৎ সিংহল, পূর্ব পাকিস্তানের অর্ধেকের চেয়েও কম আয়তনের এবং পূর্ব পাকিস্তানের লোকসংখ্যার প্রায় এক সপ্তমাংশ লোকের অধিকারী হয়ে, হিন্দুস্তানের চক্ষুশূল হিসাবে ভারত মহাসাগরের মধ্যমণি কলম্বোর উচ্চাকাশে তার স্বাধীন পতাকা গর্বভরে উচিয়ে রেখেছে। মাত্র ২৫ (পঁচিশ) লক্ষ পধিবাসী এবং ৮,০০০ (আট হাজার) বর্গমাইল আয়তন বিশিষ্ট ইস্রাইল রাষ্ট্র, তাহার চেয়ে ৫০ (পঞ্চাশ) গুণ শক্তিশালী ১২ (বার) কোটি আরবকে নাকান ভুবানি খাওয়াচ্ছে। এবং বিরাট সিনাই এলাকা জবর-দখল করে রেখেছে। মাত্র ২২৪ (দু’শত চব্বিশ) বর্গমাইল আয়ত্ন ও ষোল লক্ষ অধিবাসীর গর্ব হিসাবে, ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের সংগমস্থলে, সিঙ্গাপুরের স্বাধীন পতাকা উচ্চাকাশের উচ্চতাকে অবজ্ঞা করছে।

    পিপীলিকাসম যে সকল দক্ষিণ ভিয়েতনামী পর্বত প্রমাণ আমেরিকানগুলিকে কলাগাছের মত কেটে যাচ্ছে তাদের দেশও আয়তনের দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে খুব বড় নহে এবং তা’দের লোকসংখ্যা দেড় কোটি। দেশপ্রেমিক ভিয়েতনামীরা শুধু ৫ (পাঁচ) লক্ষ আমেরিকান সৈন্যের সঙ্গেই লড়াই করছে না; তৎসঙ্গে তাদের নিজেদের দেশের আরও পাঁচ লক্ষ দালাল সৈন্যের সঙ্গেও বীরত্বের সহিত লড়াই করে যাচ্ছে।

    এতদসত্বেও পৃথিবীর আদি ও সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান জাতি পূর্ব পকিস্তানীরা, তাদের স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারবে না কেন? নিশ্চই পারবে। আমি বলছি, আলাদা হলে অতি শোঘ্রই আমরা পৃথিবীর মধ্যে একটি শক্তিশালী জাতির মর্যাদা পাবো। এবং অচিরেই আমরা সমগ্র পৃথিবীর শ্রদ্ধা কুড়াবো।  

 

অতএব সবে মিলে বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুলুন :-

 

স্বাধীন পূৃর্ব পাকিস্তান -জিন্দাবাদ।

ইসলামী সাম্যবাদ -জিন্দাবাদ।

পশ্চিম পাকিস্তানের দ্রব্য -বর্জন করুন।

পশ্চিমা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান -বয়কট করুন।

উর্দু – ইংলিশ -ধ্বংস হউক।     

পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্রাজ্যবাদ -ধ্বংস হউক।

বিশ্বের মুসলিম, সর্বহারা এক হও, এক হও।

 

বিশ্বাস করুন।বাংলা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষা! বাংগালী মুসলমান পৃথিবীর   সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা!! ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা পৃথিবীর  সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা!!

 

 

স্বাধীন পূৃর্ব পাকিস্তানের জন্য আমাদের প্রস্তাবিত

 জাতীয় সংগীত

 

স্বা -ধীন  পূ -রব পা -কি -সতা -ন,

স্বা -ধীন  পূ -রব পা -কি -সতা -ন,

স্বা -ধীন  পূ -রব পা -কি -সতা -ন!

ভী -মেরও ভীতি ওহে ব্যাঘ্র -ভূমি -,

আ -কাশ  যুদ্ধে অগ্রগামী –

নৌ -সিংহ -দের তীর্থ ভূমি -,

তব তরে জা -ন মাল কুরবা -নঃ

স্বা -ধীন   পূ -রব পা -কি -সতা -ন,

শি -ক্ষক, শি -লপী জ্ঞান -জীবি সে – রা,

কৃ -ষক, শ্রমজীবী পৃথিবীর বা -ড়া,

হ’-কার, তাঁ -তী মিলি সবে মো -রা,

পূঁজিবা -দ ভেংগে করি খান খা -নঃ

স্বা -ধীন  পূ -রব পা -কি -সতা -ন…।

 

সাম্য ও শানতির মোরা দিশারী -,

লা -শরীক আ্লার মোর পূজারী -,

তওহীদী ঝানডা হস্তে ধরি -,

 

বেইমা -ন দেখে দেখে মারি গরদা -নঃ

স্বা -ধীন  পূ -রব পা -কি -সতা -ন

 

প্রকাশক- মোঃ খলিলুর রহমান, কাঁঠাল বাগান, ঢাকা।
(সামছ উদ্দিন, আহবায়ক- জাতীয় মুজাহিদ সংঘ, ১৬-ডি, ছোট কাটারা ঘাট রোড, ঢাকা-১১। ১৬-৯-৭৭ বাং, মূল্য ৫০ টাকা)