জেনেভাস্থ মানবাধিকার কমিশনের কাছে প্রেরিত বাংলাদেশে পাকবাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত কতিপয় ব্যক্তির চিঠি

Posted on Posted in 8

সূত্র – বাংলাদেশ সরকার, মুজিবনগর

তারিখঃ জুন-আগষ্ট, ১৯৭১

জেনেভাস্থ মানবাধিকার কমিশনের কাছে প্রেরিত বাংলাদেশে পাকবাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত কতিপয় ব্যক্তির চিঠি (অনুবাদ)

(চিঠিঃ ১)

একাত্তরের ২৬ মার্চ রাতের হত্যাযজ্ঞের কথা উল্লেখ করে জনৈক আবদুল করিম একাত্তরের ৮ই জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

পাকিস্তানি সেনারা ঐদিন রাত আনুমানিক ১০ টার দিকে ঢাকার মালিবাগে তার বাসায় হামলা করে।

বাসায় ঢুকেই তাঁর বাবাকে জিজ্ঞাসা করে, তুমি কি বাঙালি? তার বৃদ্ধ বাবা উত্তর দেয়, হ্যাঁ। তখন সেনারা সরাসরি তাঁর উপরে গুলি চালায়।

পরে তার ভাইকেও একই প্রশ্ন করা হয়, উত্তর একই হওয়ায় তাকেও গুলি করা হয়।

যখন আবদুল করিমকেও এই প্রশ্ন করা হলো, তখন আবদুল করিম চালাকির সাথে উত্তর দেন যে, সে কেবল একজন অতিথি। তারপর পাক সেনারা তাকে জিজ্ঞাসা করে, সে কি হিন্দু? জবাবে করিম বলেন যে, সে একজন মুসলিম এবং পশ্চিম পাকিস্তানে থাকেন।

পরে পাকিস্তানি সেনারা তাকে ছেড়ে দিয়ে ঘর ছেড়ে চলে যায়।

(চিঠিঃ২)

জনৈক এ, বি এম কায়সার আহমেদ একাত্তরের ১০ ই জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, তাঁর বাড়ি ছিল কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দিতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাণ বাঁচাতে তিনি ভারতের আগরতলায় পালিয়ে যান। তাঁর ভাষ্যেঃ

“পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা ও নৃশংসতা ছিল তুলনাহীন। ঢাকা থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ, তালতলা, মুন্সিগঞ্জ, সিরাজদিঘা ও গজারিয়া পুলিশ স্টেশনে তারা অত্যাচারের অসংখ্য চিহ্ন রেখে যায়। রাতের অন্ধকারে তারা অগুনতি নিরীহ মানুষ হত্যা করে। কেবলমাত্র গজারিয়াতেই তারা ৮ শতাধিক নারী,পুরুষ ও শিশু হত্যা করে।সেই সাথে টাকা,গয়না ও মূল্যবান সবকিছু লুট করে নেয়।

প্রকাশ্য দিবালোকে তারা ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সী মহিলা ও মেয়েদের বন্দি করে, কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেধে মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে যেত। সেখান থেকে তাদের পশ্চিম পাকিস্তানে চালান করে দেয়া হত।
কায়সার আহমেদ নিজে হাত বাঁধা অবস্থনায় শতাধিক যুবকের লাশ নারায়নগঞ্জের গোদাইলে অবস্থিত বার্মা ইস্টার্ন কোম্পানি ও ইএসএসও কোম্পানির বারান্দায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে এই লাশগুলো নদীতে ফেলে দেয়া হতো।
এলাকার কিশোরী থেকে ষাট বছর বয়সী কোন মহিলাকেই ছাড় দেয়া হত না। তাদের ধর্ষন ও হত্যার পর ফেলে দেয়া হত। একই ধরনের বর্বরতা তারা নারায়ণগঞ্জ টার্মিনাল জেটি ও ফতুল্লাতেও চালায়।

ইয়াহিয়া সরকার ১২ থেকে ৩০ বছরের সবাইকে সেনা ক্যাম্প থেকে আইডেন্টিটি কার্ড নেয়ার জন্য আদেশ জারি করে। কিন্ত দুর্ভাগ্যবশত তাদের কেউই আর কখনো ফিরে আসে নি। তাঁদের ভাগ্যে কি ঘটেছিল তা সহজেই অনুমেয়।

যখন মুক্তিকামী যোদ্ধারা উল্টা আক্রমন শুরু করল,পাক সেনারা তখন কেবল নিরীহ গ্রামবাসীদের মেরেই ক্ষান্ত হল না। তাদের কবল থেকে দুধের শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ, কেউই ছাড় পেল না। গ্রামের পর গ্রাম তারা জ্বালিয়ে দিতে লাগল।

৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে সব ধরনের কর প্রদান বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ফলে পাকিস্তান সরকার অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। শুধু তাই নয়, ঘোষনা প্রদান করল যে, ১৫ই মে ১৯৭১ এর মাঝে যারা সমস্ত কর পরিশোধ করবে না, তাঁদের স্থাবর অস্থাবর সব ধরণের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।

এদিকে টিক্কা খানের মদদে বিশ্বাসঘাতক বিহারীরা নিরীহ বাঙ্গালিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ল। তাদের ঘরবাড়ি লুট ও অগ্নিসংযোগ করা হল। মেয়েদের জোরপূর্বক অপহরণ ও ধর্ষন করা হল। তাদের অপরাধ সকল মাত্রা ছাড়িয়ে গেল।

তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যুবক ছেলেদের ধরে আনতো। তাঁদের হাত পা বেঁধে, শরীরে জখম করে দেহের সমস্ত রক্ত বের করে ফেলতো এবং লাশগুলোকে জলে ভাসিয়ে দিতো।

(চিঠিঃ৩)

মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লা জেলার কোতোয়ালি থানার অন্তর্গত বিজয়পুর হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন ফজলুল হক। বাসা বাঞ্ছারামপুর। তিনি একাত্তরের ১১ই জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,
১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে পাক সেনারা বিজয়পুরে অবস্থিত বাগমারা হাই স্কুল ও কায়েদে আজম হাই স্কুলে আক্রমণ করে।
তারা স্কুলের সব দরজা- জানালা, ল্যাবের সব যন্ত্রপাতি, আসবাব পত্র, অফিস সংক্রান্ত কাগজপত্র সবকিছু ধ্বংস করে। পরবর্তীতে তারা মীরাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়েও একই ভাবে হামলা করে এবং পুরো স্কুলঘর জ্বালিয়ে দেয়। পাক সেনারা আলেকদিয়া গ্রাম থেকে দুইজন ছাত্রকে ধরে নিয়ে যায়। যারা আর কখনো ফিরে আসে নি।

মে মাসের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানি সৈন্যরা বরুরা নামক গ্রাম থেকে দুইজন কমবয়সী মেয়েকে জিপে তুলে নিয়ে লালমাই হয়ে কুমিল্লার পথে যাত্রা করে এবং ধর্মপুর নামক গ্রামের পাশে তাদের একজনকে তারা খোলা রাস্তায় ধর্ষন করে।

লালমাইয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি ঘাটি ছিল। সেখানে তারা ইচ্ছামত লোক ধরে আনত এবং খেয়ালখুশিমত তাদের হত্যা করত। সেখান থেকে ভাগ্যগুনে বেচে ফিরে আসা কয়েকজন তাকে এই তথ্যগুলো জানায়।

যাদেরকে হত্যা করা হত,তাদের লাশ লালমাই পাহাড়ের ভিতর অবস্থিত সি এন্ড বি ডাকবাংলোর পাশের একটি গর্তে ফেলা হত। অপহরণকৃত মহিলা ও মেয়েদের জন্য তাদের আলাদা আলাদা তাবু ছিল, যেখানে পাকিস্তানিরা তাদের যৌনলালসার নিবৃত্তি করত। সেখান থেকে একজন লোক পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। যাকে বলা হয়েছিল একটি মেয়ের লাশ ফেলে দিয়ে আসার জন্য। মেয়েটিকে পর্যায়ক্রমে অসংখ্যবার ধর্ষন ও অত্যাচার করে হত্যা করা হয়েছিল।

চিঠি লেখাকালে লেখক পালিয়ে আগরতলা গিয়ে তদকালীন এম্পি প্রফেসর খুরশিদ আলমের সাথে আগরতলায় অবস্থান করছিলেন।

(চিঠিঃ ৪)

তাজুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩য় বর্ষে পড়তেন। থাকতেন সলিমুল্লাহ হলে। তিনি একাত্তরের ১৭ই জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

পাকসেনারা যখন আধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে আক্রমণ শুরু করে, তখন সলিমুল্লাহ হলের ছাত্রদেরকেই সবচেয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এর এক সপ্তাহ আগেই পাক সেনারা ডাকসুর সাংস্কৃতিক পরিষদের সেক্রেটারি ইকবাল আহমেদ ও তার ছোট ভাইকে গ্রেফতার করে। যাদের খোঁজ আর কখনোই পাওয়া যায় নি। গজারিয়ায় পাকিস্তানি সেনারা অসংখ্য নিরপরাধ ও নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে। উনি ভয়ে ইন্ডিয়া পালানোর কথা ভাবছিলেন এবং এই চিঠিটি ওখান থেকে পোস্ট করার চিন্তা করছিলেন।
ছাত্র কমিউনিটির একজন হিসাবে তিনি এ সময় এই ঘটনার বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকরী প্রতিরোধের দাবি জানান।

(চিঠিঃ ৫)

জনাব নুরুল আমিন থাকতেন টি এন্ড টি কলোনিতে (মগবাজার, ওয়ার্লেস)। তিনি একাত্তরের ২২ শে জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,
যখন ঢাকা শহরজুড়ে পূর্নমাত্রায় মিলিটারি অপারেশন শুরু হয়, তখন বাইরের জেলা থেকে অবাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানি বিহারিরা দলে দলে ঢাকায় এসে লুটতরাজ শুরু করে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাও ফরমান এর নির্দেশে তারা একের পর এক হিন্দু বাড়ি দখল ও লুট করতে লাগল। অবাঙ্গালি পুলিশ সদস্যরা প্রতিনিয়ত বাঙ্গালিদের উপর অত্যাচার করতে লাগল। রাতের বেলা পাক সেনারা যাত্রাবাড়ি ও গোপীবাগ এলাকা ঘিরে ফেলে, ঘর থেকে যুবক ছেলেদের ধরে নিয়ে যায়। যাদের আর কখনোই দেখা যায় নি। রাজারবাগে পাক সেনারা সিভিল ড্রেসে টহল দিত, যদিও তাদের সাথে অস্ত্র থাকত। তারা বাড়িতে ঢুকে ঢুকে ধর্ষন করত। একই সপ্তাহে তারা নরসিংদীতেও এভাবে আক্রমন চালায়।

অবাঙ্গালি পুলিশ সদস্যরা নিউ মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় মেয়েদের উত্ত্যাক্ত করত এবং জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যেত।

(চিঠিঃ ৬)

একুশ বছর বয়েসি আবদুল কাদের ঢাকা বিষ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। তার পিতার নাম ছিল মৌলভি আলী। পৈতৃক নিবাস কালিগঞ্জ থানার চরসিন্দুর উপজেলার চালনা গ্রামে। তিনি একাত্তরের ২৩ শে জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

একাত্তরের মার্চের ২৫ তারিখ তিনি মালিবাগে অবস্থান করছিলেন। আনুমানিক রাত ১২ টার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অত্যাধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রাজারবাগ পুলিস লাইন আক্রমণ করে।
পরদিন রাজারবাগ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি অসংখ্য মৃতদেহ এখানে সেখানে বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে থাকতে দেখেন। কিছু পাকা দালান ও পুলিস সদস্যদের থাকার জন্য টিনশেড ঘরগুলো আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। ২৬ তারিখে উনি ইকবার হল, এস এম হল, জগন্নাথ হল ও রোকেয়া হল পরিদর্শনে যান। দেখেন যে, ছাত্রদেরকে মেরে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছে এবং তাদের বইপত্র মাঠে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে।
জগন্নাথ হলকে প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস করা হয় এবং অসংখ্য ছাত্রকে হত্যা করা হয়। রোকেয়া হলের নিচ তালায় তারা অগ্নিসংযোগ করে। সবগুলো শহীদ মিনার ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে একটি নির্মাণাধীন জামে মসজিদ তারা ধ্বংস করে।

পাক সেনারা নরসিংদী বাজার শেল, মর্টার ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে প্রায় সম্পূর্ন ধ্বংস করে ফেলে। স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় এলাকার প্রতিটি হিন্দু বাড়িতে হত্যা,ধর্ষন ও লুটতরাজ চালায়। এলাকার সব স্কুল, কলেজ ও শহীদ মিনারের ক্ষতি করে।

পাশ্ববর্তী গ্রামগুলোতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রদের খোজ করতে থাকে এবং পাওয়া মাত্রই হত্যা করে। যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে ধর্ষন করা হত। তারা নরসিংদী, ঘোড়াশাল, ও পলাশে সেনা ক্যাম্প স্থাপন করে। যুবকদের ধরে এনে তাদের শরীর কেটে দিত এবং মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত রক্ত ঝরাতো। পুরুলিয়া, জিনারদি ও কৌশল্যা গ্রামের সকল বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং হিন্দু মুসলমান মিলিয়ে প্রায় ৪০০/৫০০ মানুষ হত্যা করা হয়। রায়পুরা হাইস্কুল সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং শহীদ মিনার ভেঙে হত্যা করা হয়।

ছাত্র, হিন্দু, আওয়ামীলীগ এর সদস্য ও মহিলারা ছিল তাদের প্রথম টার্গেট।

বিহারীরা মুসলিম লীগের অনুসারীদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে। জামায়াতে ইসলামের প্রফেসর ইউসুফ আলী এবং মাহতাব উদ্দিন সংঘটনের সদস্যদের অস্ত্র শিক্ষা দিতেন এবং তাদের দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করেন।

এই লোকেরা গত নির্বাচনে তাদের শোচনীয় পরাজয়ের বদলা নিতে থাকে এবং পাক সেনারা তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে তাদের ব্যবহার করতে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনী অত্যন্ত সুকৌশলে এদেশের বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী নির্মূল করতে থাকে।

(চিঠিঃ ৭)

রনেন্দ্র দাস ছিলেন নোয়াখালী সদর পুলিসের সাব-ইনস্পেক্টর। থাকতেন মাইজদির সরকারি বাস ভবনে। পাকিস্তানিরা আক্রমণ শুরু করলে তিনি লক্ষ্মীপুরের বড়তলীতে আশ্রয় নেন। তিনি একাত্তরের ৩ রা জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,
মে মাসের ৭ তারিখে পাকি সেনারা তার মেয়ের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সহ আরো অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়। তারা ধান ক্ষেতে নির্বিচারে গুলি করে কৃষকদের হত্যা করে। একই দিনে তারা ২১ টি হিন্দু-মুসলিম বাড়ি পুড়িয়ে দেয় এবং ৩২ জন মানুষ হত্যা করে।
৯ তারিখে পাক সেনারা এক ধোপার বাড়িতে আক্রমণ করে এবং তিনজনকে গুলি করে হত্যা করে।একই দিনে তারা মান্দারি বাজারের নিরঞ্জন ব্যানার্জি ও এডভোকেট মোহাম্মদ উল্লাহর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এবং বারেক মাঝি নামের একজনকে হত্যা করে। একই দিনে তারা একজন ঝাড়ুদারকে হত্যা করে যখন তারা শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমান পায় যে সেই ঝাড়ুদার হিন্দু।

৭ তারিখে পাক সেনারা বড়তলী গ্রামে প্রবেশ করে এবং চারজন মুসলিম মহিলাকে ধর্ষণ করে।

(চিঠিঃ ৮)

সুপল চন্দ্র দাস থাকতেন ঢাকার তেজগাঁওয়ে। তিনি একাত্তরের ১০ই জুন হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

১৯৭১ এর মে মাসের ১১ তারিখ তিনজন সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনা তার প্রতিবেশি জনাব কাদেরর বাড়িতে প্রবেশ করে এবং তার মেয়েকে টেনে হিচড়ে নিয়ে আসে। মেয়ের চিৎকার শুনে তিনি মেয়েকে বাঁচাতে চেষ্টা করেন এবং একজন আর্মির হাত জাপটে ধরেন। পাক সেনারা তাকেও টেনে হিচড়ে বাইরে নিয়ে আসে এবং বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে আহত করে। পরে তার মেয়ের সম্ভ্রমহানি করে ফেলে দিয়ে চলে আসে তারা।

গোলাম আজম নামক শান্তি কমিটির এক সদস্য আর্মি অথরিটির কাছে এই বিষয়ে নালিশ করে। তবে তাতে কোন লাভ হয় নাই।
এছাড়া সেনারা দোকান থেকে কোন মূল্য পরিশোধ ব্যতিরেকেই পণ্য নিয়ে যেত।

লুলা আউয়াল এবং শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আছে এই মর্মে পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে তেজগা থানার বইরা গ্রামে আমন্ত্রন করে। পাক সেনারা গ্রামের নমশুদ্র পাড়ায় আক্রমণ চালায় এবং ৫০০-৬০০ মানুষ হত্যা করে। তারা তখন পথচারীদের কাছ থেকেও বিভিন্ন মূল্যবান জিনিস লুট করে।

(চিঠিঃ ৯)

শ্রী গোপাল কৃষ্ণ গুহের লেখা চিঠি। যুদ্ধকালীন ২২ জুনে লেখা। পিতাঃ মনোরঞ্জন গুহ, নয়ামাটি, নারায়নগঞ্জ। তিনি হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে এই চিঠিটি পাঠিয়েছলেন।

এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৯ বছর বয়সী শ্রী গোপাল কৃষ্ণ গুহ ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের বিএসসি পরীক্ষার্থী। ১৯৭১ এর ২৭ শে মার্চ পাকিস্তানি সেনারা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে আক্রমন করে। সামনে যা পায় তাঁরা তাই ধ্বংস করে দিতে থাকে। অন্যান্য অনেকের মত নারায়নগঞ্জের নিজ বাড়ি ছেড়ে গোপচরে চলে আসেন গোপাল। পাকিদের এলোপাথারি গোলাবর্ষণে দু’জন মেয়ে গোপচর মাঠে মরে পরে ছিল। তিনি ধলেশ্বরী নদী পার হবার সময় দেখতে পান, আহত সহ অনেক মানুষ নারায়ণগঞ্জ থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন। অবশেষে তিনি নিজ পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পান। এর তিনদিন পর প্রচন্ড ঝুঁকির মাঝেও তিনি নারায়নগঞ্জ শহরে আসেন। তাঁদের বাড়িটি বইসহ লুট করা হয়েছিল। পাশের অনেক বাড়িঘর পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়। নারায়নগঞ্জের আওয়ামীলীগ এর কেন্দ্রীয় অফিসটিকেও সম্পূর্নরূপে ধ্বংস করে ফেলা হয়। অসংখ্য মৃতদেহ রেললাইন এর উপর পরে থাকতে দেখা যায়। পালপারা ও দেবগ্রামের বেশিরভাগ বাড়িঘর এর ক্ষতিসাধন করা হয়। বাবুরাইলে সেনাদের বিক্ষিপ্ত গোলাগুলিতে বেশ কজন নিহত হয়। শ্রীনগর পুলিশ স্টেশনের প্রতিটি হিন্দু বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং ওইসময় উপস্থিত সকল হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের হত্যা করা হয়।

পাক সেনারা আওয়ামীলীগ এর কর্মী সন্দেহ হলেই প্রতিটি ব্যক্তিকে গ্রেফতার ও হত্যা করতো।

পাকসেনারা সিংপাড়ার ডাক্তার যোগেশ ও তার আশেপাশের কয়েকটি বাড়িতে লুটপাট চালায়। তারা তার ডিসপেনসারিও লুট করে নেয়।

এইরকম অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাজজ্ঞের বিরুদ্ধে অতিসত্ত্বর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জেনেভাস্থ হিউম্যান রাইটস কমিশনের নিকট তিনি দাবি জানান।

(চিঠিঃ ১০)

১০ নং চিঠিটা দীপালি রাণি সরকারের। তিনি একাত্তরের ২৪ শে জুলাই হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডে একটা চিঠি পাঠান। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,

“আমি ঢাকার শাহজাহানপুর এর রেলওয়ে কলোনিতে ( 4/B-L) নং বাসায় স্বামী অমল কান্তি সরকারের সাথে থাকতাম। এপ্রিলের একেবারে শুরুর দিকে, কোন এক সকালে আনুমানিক সকাল ৮ টা থেকে ৯ টার মধ্যে আমার স্বামী বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। আমি আমার প্রতিবেশী জনাব ইদ্রিস সাহেবের বাসায় গিয়েছিলাম। তখন পাক সেনারা আমাদের বাসা লুট করে। সকাল ১০ টা বেজে গেলেও আমার স্বামী ফিরে আসেন নাই। ইদ্রিস সাহেব পরে আমাকে ইন্ডিয়ার বর্ডারে যাবার ব্যবস্থা করে দেন।

জুনের শেষের দিকে পাক সেনারা জিপে করে ডেমরা থানা ঘেরাও করে। সেখানে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়,গুলি করে মানুষ হত্যা করা হয় এবং হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের যুবতী মেয়ে এবং মহিলাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের আর কখনোই দেখা যায় নি। পাক সেনারা মেয়েদের ধরে নিয়ে ডেমরার একটি বিল্ডিং এ বন্দি করে রাখতো। সদরঘাট এলাকায় পাক সেনারা ৭ জনকে হত্যা করে ও অনেক বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে।“

(চিঠিঃ ১১)

১১ নং চিঠিটি স্বপন কুমার সাহার। যুদ্ধকালীন ১৮ ই জুনে লেখা। চিঠিটি হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে লেখা। এখানে তিনি উল্লেখ করেন যে,
“আমি ঢাকার নরসিংদীর একজন স্থায়ী বাসিন্দা ছিলাম। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ নরসিংদীতে বিমান থেকে বোমা হামলা করা হলে আমি ইন্ডিয়ার আগতলায় চলে আসি এবং আগরতলার নাজিপুকুরপার এলাকার গৌরাঙ্গ চন্দ্র সাহার বাড়িতে আশ্রয় গ্রহন করি।

মার্চের ২৮ ও ২৯ তারিখে বোমা হামলার ফলে পুরো নরসিংদী বাজার পুরে ছাই হয়ে যায়। নিহত হয় প্রায় ১০০ মানুষ। পাকবাহিনীর এমন আক্রমনে আমরা পাচ মাইল দূরে একটি জায়গায় আশ্রয় নেই। কিন্ত সেখান থেকেও চলে যেতে হয়, কারন সবখানে পাক সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট কিছু বাহিনী( রাজাকার) ছিল, যারা সব ধরনের অপরাধ করতো। কিছুদিন পর আমরা বাজিদপুর আসি এবং একই কারনে সেখান থেকেও চলে আসতে হয়। হালাজিলা আসার পর পাকবাহিনীর আক্রমনে ৫ জন নিহত হয়। আমরা একটি পাট ক্ষেতে লুকিয়ে জীবন রক্ষা করি। বাজিদপুর থেকে প্রায় ৩৫ জন মেয়েকে পাক সেনাবাহিনী তুলে নিয়ে যায়। এই অভাগীদের কাউকেই আর কখনো দেখা যায় নি।

এখানে বলে রাখা ভালো, ঘটনার সময় আমি নরসিংদী কলেজের ছাত্র ছিলাম। আমার বয়স ছিল ২২ বছর এবং প্রায় সকল স্থানেই ঘটনাপ্রবাহ ছিল প্রায় একই রকমের।“

(চিঠিঃ ১২)

১২ নং চিঠিটি কলিমউদ্দিন মিয়ার। যুদ্ধকালীন ৪ঠা আগস্টে হিউম্যান রাইটস কমিশন, সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে লেখা। বয়স ৩৫ বছর। থাকতেন ঢাকার জিনজিরায়। পিতাঃ সলিম আলী। উনার ভাষ্যেঃ

“বুড়িগঙ্গা নদীর অপর পাড়ে ছিল আমাদের বাড়ি। এপ্রিলের দুই তারিখে গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনার ভারী শেল নিক্ষেপ করতে লাগলো। প্রান বাঁচাতে অনেকেই নদী পার হয়ে পালিয়ে যেতে লাগল। বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও সন্তান থাকায় আমি যেতে পারলাম না। আর্মি আসার আগেই সবাইকে পালিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে দেয়া গেল না। ছয়জন আর্মি বাসায় ঢুকল,বিনা বাক্যব্যায়ে মা ও বাচ্চাদের হত্যা করল এবং আমার স্ত্রী আমিনা বিবিকে তুলে নিয়ে গেল আমি বাইরে জিনিসপত্র গোছগাছে ব্যস্ত ছিলাম। তাই পাক সেনারা আমায় দেখতে পায় নি। পুরো ঘটনাটি ঘটতে সময় নিল মাত্র ২/৩ মিনিট। আমি জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম,তারা আমার স্ত্রী কে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।