টিক্কাখানের পৈশাচিক রক্তস্নান

Posted on Posted in 14
শিরোনাম সূত্র তারিখ
৫৫। টিক্কা খানের পৈশাচিক রক্তস্নাননিউজউইক২৮শে জুন, ১৯৭১

 

Ashik Uz Zaman

<১৪, ৫৫, ১১৯-১২১>

 

নিউজউইক, ২৮শে জুন, ১৯৭১

টিক্কা খানের পৈশাচিক রক্তস্নান

 

গত মার্চ মাসে পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই, প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ ইয়াহিয়া খান আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন বাঙালির স্বাধীনতার যুদ্ধকে দমাতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যে নৃশংস আচরণ করছে তার খবর যেন বহির্বিশ্বের কাছে কিছুতেই পৌঁছতে না পারে। বেশীরভাগ বিদেশী সাংবাদিকদের পূর্ব পাকিস্তানে যেতে দেয়া হয়নি, এবং কেবলমাত্র যেসব পশ্চিম পাকিস্তানী সাংবাদিকদের কাছ থেকে “অনুকূল প্রতিবেদন” পাওয়ার আশা আছে শুধুমাত্র তাদেরকে আমন্ত্রন জানানো হয় পূর্ব পাকিস্তানে যেতে এবং তাদের দেশবাসীকে এই বিদ্রোহ সম্বন্ধে জানাতে। অন্তত একটি ক্ষেত্রে, অবশ্য, এই নীতি বিপর্যয় ঘটায়। অ্যান্থনি ম্যাস্কারেনাস, করাচীর একজন সাংবাদিক যিনি লন্ডনের সানডে টাইমসের জন্যও লেখেন, ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করে এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পরেন যে তিনি এবং তার পরিবার পালিয়ে লন্ডন চলে আসেন পুরো প্রতিবেদন প্রকাশ করার জন্য। গত সপ্তাহে, টাইম্‌স পত্রিকায়, ম্যাস্কারেনাস লেখেন যে ঢাকার পাকিস্তানী সামরিক এবং বেসামরিক কতৃপক্ষ তাকে বারবার বলেছে যে সরকার চায় “পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিনতাবাদের সমস্ত হুমকি চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে, এর জন্য যদি ২০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করতে হয় তবুও”। এবং ম্যাস্কারেনাস উপসংহার টানেন যে রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী “ঠিক তাই করছে পৈশাচিক পুঙ্খানুপুঙ্খতার সাথে”।

 

পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের রক্তে স্নান করছে তা দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন সাংবাদিক এবং অন্যান্য যারা ৬০ লক্ষ আতঙ্কিত শরণার্থীর যুদ্ধ চাক্ষুষ করেছেন প্রতিবেশী ভারতে। নিউজউইকের টনি ক্লিফটন সম্প্রতি ভারতের শরণার্থী-ভারাক্রান্ত সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং নিম্নোক্ত প্রতিবেদনটি তারবার্তার মাধ্যমে পাঠানঃ

 

যে কেউ পাকিস্তানের সাথে ভারতের সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবির এবং হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করলে বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে পাঞ্জাবী সেনাবাহিনী যেকোন ধরণের নিষ্ঠুরতায় সক্ষম, আমি শিশুদের দেখেছি যাদেরকে গুলি করা হয়েছে, আমি পুরুষদের দেখেছি চাবকিয়ে যাদের পিঠের চামড়া তুলে ফেলা হয়েছে। আমি দেখেছি মানুষদের যারা আক্ষরিক অর্থে আতঙ্কে বাকশক্তি হারিয়েছে চোখের সামনে নিজের সন্তানকে খুন হতে দেখে অথবা নিজের কন্যাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখে যৌন দাসী হিসেবে। আমার কোনই সন্দেহ নেই যে পূর্ব পাকিস্তানে শত শত “মেই লাই” এবং “লিডিস”-এর মতো ঘটনা ঘটেছে এবং আমি মনে করি, আরো ঘটবে।

 

অন্য কিছুর চেয়েও আমার ব্যক্তিগত অনুভুতি হচ্ছে বিস্ময়ের। আমি এতবেশি লাশ দেখেছি যে আর কোন কিছুই আমাকে এরচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করতে পারবে না। কিন্তু বারবার আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবি, নিজেকে জিজ্ঞেস করি কিভাবে কোনো মানুষ নিজেকে দিয়ে এরকম উন্মত্ত খুনোখুনি করতে পারে।

 

গণহত্যা

 

লাল এবং সবুজ ফুলের ছাপা গোলাপি রঙের ছেঁড়া জামা পড়া একটি লাজুক ছোট্ট মেয়ের কাহিনীটি এক বিশেষ আতঙ্কের। তার দ্বারা কারো কোন বিপদ হওয়ার কথা নয়। তবুও আমার, তার সাথে দেখা হয় কৃষ্ণনগরের এক হাসপাতালে, অন্যান্য রোগীদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে ঘাবড়ানো চেহারা নিয়ে, তার হাত দিয়ে ঘাড়ের দগদগে ক্ষত ঢেকে যেখানে একজন পাকিস্তানে সৈন্য বেয়োনেট দিয়ে তার গলা কেটে দিয়েছে। “আমি ইসমত আরা, মরহুম ইসহাক আলির মেয়ে” আমাকে তার আনুষ্ঠানিক পরিচয় জানায় সে। “আমার বাবা কুষ্টিয়ার একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। আনুমানিক দুই মাস আগে তিনি আমাদের বাড়ি থেকে বের হন এবং উনার দোকানে যান এবং এরপর উনাকে আমি আর দেখিনি। ঐ একই রাতে, আমি বিছানায় যাবার পর, আমি ধমক এবং চিৎকার শুনতে পাই, এবং আমি যখন দেখতে যাই যে কি হচ্ছে, ঐখানে পাঞ্জাবী সেনারা ছিলো”।

 

“আমার চার বোন মরে পড়েছিল মেঝেতে, এবং আমি দেখি যে ওরা আমার মাকে মেরে ফেলেছে। আমি যখন ওখানে যাই ওরা আমার ভাইকে গুলি করে – সে বিজ্ঞানে স্নাতক ছিল। তখন এক সৈন্য আমাকে দেখে ফেলে এবং আমাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে। আমি মেঝেতে পড়ে যাই এবং মৃতের ভান করে থাকি। সৈন্যরা যখন চলে যায় আমি পালিয়ে আসি, এবং একজন আমাকে তার সাইকেলে তুলে নেয় এবং আমাকে এখানে নিয়ে আসা হয়”।

 

হঠাৎ করে, যেন সে আর তার অগ্নিপরীক্ষার অভিজ্ঞতার কথা আর ভাবতে পারছিল না, মেয়েটি ঘর ছেড়ে বের হয়ে যায়। হাসপাতালের চিকিৎসক আমাকে ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন যে যখন মেয়েটিকে হাসপাতালে আনা হয় তখন সে নিজের রক্তেই গোসল হয়ে ছিল, যখন সে অন্য রোগীদের ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে এবং সরাসরি আমার সামনে এসে দাড়ায়। “আমি এখন কি করবো?” সে জানতে চায়। “একসময় আমার পাঁচ বোন এবং এক ভাই এবং বাবা এবং মা ছিল। এখন আমার কেউ নেই। আমি এতিম। আমি কোথায় যেতে পারি? আমার কি হবে এখন?”।

ঘটনার শিকার

 

“তোমার কিছু হবে না” আমি বলি, বোকার মতো। “এখানে তুমি নিরাপদ”। কিন্তু ওর এবং ওর মতো হাজার হাজার বালক এবং বালিকা এবং পুরুষ এবং নারীর ভাগ্যে কি আছে যারা তাদের প্রজ্জলিত গ্রাম থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে যে আগুনের শিখায় প্রতি রাতে পূর্ব পাকিস্তানের আকাশ আমি আলোকিত হয়ে উঠতে দেখি? ত্রিপুরার রাজধানী, আগরতলার হাসপাতাল, সীমান্ত থেকে মাত্র আধা মাইল দূরে, এবং সেটি ইতোমধ্যেই উপচে পড়ছে হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর শিকার দিয়ে। এখানে ৪ বছর বয়সী এক বালক আছে যে পেটের ভেতর বুলেট নিয়েও বেঁচে গেছে এবং এক নারী আছেন যিনি আনমনে বর্ণনা করেন কিভাবে সৈন্যরা তার চোখের সামনে তার দুই বাচ্চাকে হত্যা করে, এবং এরপর তাকে গুলি করে যখন সে তার সবচেয়ে ছোট শিশুটিকে কোলে নিয়ে ছিলো। “গুলিগুলো বাচ্চার পেছন দিয়ে ঢোকে এবং এরপর তাঁর বাম বাহু ভেদ করে যায়”, ডাঃ আর. দত্ত, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক, ব্যাখ্যা করেন “কিন্তু পরে তাঁর জ্ঞ্যান ফিরে আসে এবং তিনি এবং তাঁর বাচ্চাকে নিয়ে সীমান্তে চলে আসেন”। অন্য এক নারী, যার পায়ের উপরের দিকের হাড় গুলিতে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, এক নবজাত শিশুকে কোলে নিয়ে আছেন। গুলিতে আহত হওয়ার পর তিনি এক ধান ক্ষেতে প্রসব করেন সময়ের আগেই। তারপরেও, একহাতে নবজাতক শিশুটিকে আঁকড়ে ধরে এবং অন্যহাতে নিজেকে টেনেহিঁচড়ে, শেষপর্যন্ত তিনি সীমান্তে এসে পৌঁছান। “যদিও আমি এই মানুষগুলোকে চিনি, তারপরেও আমি অবিরতভাবে হতবাক হয়ে ভাবি এরা কতটা কষ্টসহিষ্ণু”, মিঃ দত্ত বলেন। তারপরেও, কেউ কেউ আছে যারা পেরে ওঠে না। আমি মাড়িয়ে এসেছি দুটি, ছোট বালকের উপর দিয়ে যারা মেঝেতে শুয়ে ছিল, বানরের মতো একে অপরকে আঁকড়ে ধরে; “শরণার্থীরা বলে আনুমানিক এক সপ্তাহ আগে ওদের গ্রামটি পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং এই দুইজন ছাড়া আর সবাই মারা যায়”, চিকিৎসকরা জানান। “তিনদিন ধরে ওরা এখানে আছে এবং আমরা ওদের পরিচয় জানিনা। ওরা এতই আতঙ্কিত হয়েছে ঐ দৃশ্য দেখে যে ওরা বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ওরা একে অপরকে আঁকড়ে ধরে ওখানে শুয়ে থাকে। ওদেরকে খাওয়ানোর জন্য কিছু সময়ের জন্যও আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। এটা বলা খুবই কঠিন যে কখন ওরা বাকশক্তি ফিরে পাবে কিংবা স্বাভাবিক জীবনে আবার ফিরে যেতে পারবে”।

 

নিউ জার্সির কংগ্রেসম্যান কর্নেলিয়াস গ্যালাহার, যিনি আগরতলা হাসপাতাল পরিদর্শন করেন, বলেন যে তিনি ভারতে এসেছিলেন এই ভেবে যে নিষ্ঠুরতার কাহিনীগুলো অতিরঞ্জিত। কিন্তু তিনি যখন সত্যি সত্যি আহতদের দেখেন তখন বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, আর যাইহোক, প্রতিবেদনগুলো অনেক হালকাভাবে করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জেনারেল প্যাটনের সাথে ইউরোপে অনেক পদকপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী, গ্যালাহার আমাকে বলেনঃ “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, আমি ফ্রান্সের নিকৃষ্টতম এলাকা দেখেছি, নরম্যান্ডির বধ্যভূমি দেখেছি, কিন্তু আমি কখনই এরকম কিছু দেখিনি। আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে আমাকে চেষ্টা করতে হয়েছে কান্নায় ভেঙে পড়া থেকে বিরত থাকতে”।

ধর্ষণ

 

অন্য বিদেশিরাও, প্রথমে এইসব নিষ্ঠুরতার কথায় সন্দেহ পোষণ করতেন, কিন্তু বিভিন্ন উৎস থেকে একই কাহিনীর অন্তহীন পুনরাবৃত্তি তাদেরকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে। “আমি নিশ্চিত যে সৈনিকেরা বাচ্চাদের বাতাসে ছুঁড়ে দেয় এবং বেয়োনেট দিয়ে গেঁথে নেয়”, যুক্তরাজ্যের নাগরিক জন হেসটিংস বলেন, যিনি একজন মেথোডিষ্ট মিশনারি হিসেবে বিশ বছর বাঙলায় ছিলেন। “আমি নিশ্চিত যে সৈনিকেরা মেয়েদেরকে বারংবার ধর্ষণ করেছে, এরপর দুই পায়ের ফাঁকে বেয়োনেট ঢুকিয়ে তাদেরকে হত্যা করেছে”।

 

এইসব নিষ্ঠুরতা এই ইংগিত দেয় যে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী হয় রক্ত-লিপ্সায় উন্মাদ হয়ে গেছে অথবা, এর সম্ভাব্যতাই বেশি, যে পুরো বাঙালী জনগোষ্ঠীর উপর পূর্ব পরিকল্পিত সন্ত্রাসের নীতি কার্যকর করছে যা কিনা গণহত্যায় রূপ নিচ্ছে। এর স্থপতি বলে মনে হচ্ছে লেঃ জেনারেল টিক্কা খান কে, পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক। অনুমান করা হয়, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কিছুটা জানেন কি ঘটছে, কিন্তু তিনি হয়তো ধারণাও করতে পারেন না যে বাচ্চাদেরকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, মেয়েদেরকে কার্যত দাসী হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে এবং পুরো পরিবারকে একসাথে হত্যা করা হচ্ছে। তিনি সামরিক বাহিনীকে বলেন বিদ্রোহ দমন করতে, এবং টিক্কা খান সেটা করেছে, কার্যকর এবং দয়ামায়াহীন ভাবে। ফলশ্রুতিতে, পূর্ব পাকিস্তান এখনও পাকিস্তানের একটি নামমাত্র অংশ। কিন্তু গত তিন মাসে পশ্চিম অংশ পূর্ব অংশের উপর যে পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছে তাতে এটাই নিশ্চিত হয়েছে যে পাকিস্তান ভেঙে দুটি আলাদা দেশ হওয়া এখন সময়ের ব্যপার মাত্র। এবং এই দেশ দুটি অমোঘভাবে বিচ্ছিন্ন থাকবে – অন্তত ততদিন পর্যন্ত যতদিন না আজকের বিকলাঙ্গ এবং নির্যাতিত শিশুরা বুড়ো হবে এবং মারা যাবে তাদের স্মৃতিসমেত যে কি ঘটেছিল যখন ইয়াহিয়া খান তাদের দেশরক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।