ঢাকায় গুলি চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে শেখ মুজিবর রহমানের প্রেস বিজ্ঞপ্তি

Posted on Posted in 2

<2.167.671-673>

শিরোনামসূত্রতারিখ
ঢাকায় গুলি চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে শেখ মুজিবের প্রেস বিজ্ঞপ্তিদ্য পিপল৩১ মার্চ, ১৯৭১

 

গুলি চালানোর তীব্র নিন্দা জানালেন মুজিব – উপনিবেশের মত বাংলাদেশকে আর দাবিয়ে রাখা যাবে না

প্রেস বিবৃতি জারি হয় ২রা মার্চ ১৯৭১ এ

 

 

 

গতকাল  সন্ধ্যায় জারিকৃত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শেখ মুজিবুর রহমান দৃঢ়ভাবে, ফার্মগেট নিরস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যার নিন্দা জানান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এই রকম উদ্ধত কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করতে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে বাঙ্গালিকে আর কোন ভাবে চাপিয়ে রাখা যাবে না এবং তারা আর শোষিত উপনিবেশ বা বাজার হিসেবে নিজেদের ব্যবহার সহ্য করবে না

 

শেখ তার বিবৃতিতে বলেন, নিরস্ত্র ছেলেদের আজ অত্যাচার করা হচ্ছে অন্তত দুইজন মারা গেছে, এবং আরো অনেকে মারাত্মকভাবে আহত তাদেরকে গুলি করা হয়েছে কারণ তারা অন্য বাংলাদেশি মানুষের সাথে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছে সমগ্র বাংলাদেশের অপমানের বিরুদ্ধে আমি দৃঢ়ভাবে নিন্দা করছি এই গুলি করার জন্য এবং মানুষকে এই রকম অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে বলছি, যেন তারা এইরকম উদ্ধত কাজ থেকে বিরত থাকে তাদের এই কথা মনে রাখতে হবে যে, নিরস্ত্র মানুষের উপর গুলিকরা মানে হল গণহত্যা এবং তা মানবতার বিরুদ্ধে একটি অপরাধ তাদেরকে মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশ যদি স্বাধীন হয়, যেটা হবেই, যদি এইরকম হত্যা চলতে থাকে তাহলে তারা আগুনের উত্তাপ থেকে পালাতে পারবে না

 

আমরা, ৭ কোটি বাংলাদেশি মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে, ৩রা মার্চ পশ্চিম পাকিস্থানিদের সাথে সংবিধান তৈরির জন্য প্রস্থুত ছিলাম। যার ফলে পশ্চিম পাকিস্থানের কয়েকজন প্রতিনিধি ইতিমধ্যে ঢাকা এসেছেন। কিন্তু হটাত করে অন্যায়ভাবে কারো মদ্ধস্থিতায় এই মিটিং বন্ধ ঘোষণা করা হল।

 

 

এই মিটিং বন্ধকরা হয়েছে একটি কুচক্রী সংখ্যালঘু গুষ্টির দ্বারা। যারা পশ্চিমা বিশ্বের স্বার্থ রক্ষা কারী এবং তাদের আমলা প্রভুরা এই ঘোষণা দেয় যে, কোন রকম বৈঠক হবে না যদি কিনা তাদের আনুগত্য মানা না হয়।  তারা এমনকি প্রকাশ্যে হুমকি দিল তাদের সাথে ‘মধ্যস্থিতা করার’ জন্য কিন্তু অন্য সব পশ্চিমা মিত্ররা সাহস পেলনা এর বিরধিতা করার জন্য। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রতিনিধিকে অস্বীকার করা হচ্ছে যা সংখ্যালঘু অগণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রক দ্বারা আমাদের মানুষের জন্য অসহনীয় অপমান। 

 

যেহেতু বাংলাদেশের মানুষ একনায়কতন্ত্র বা ভয়ভীতি মেনে নিবে না তারা এখন এটি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মোকাবেলা করতে চাচ্ছে এটা খুবই দুঃখ জনক যে প্লেইন ব্যবহার করার কথা ছিল নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরকে পশ্চিম পাকিস্থান থেকে আনা নেওয়ার কথা তা আজ ব্যবহার করা হচ্ছে সামরিক কাজে যদি এই পদক্ষেপ নেওয়া হয় সাতকোটি বাঙ্গালীকে দমানোর জন্য, গতকাল থেকে মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন চলছে তা বিদ্যমান থাকবে পুরা বাংলাদেশে তা অবশ্যই প্রমাণ করে যে, পৃথিবীতে বাঙ্গালীকে আর দমাইয়া রাখা যাবে না এবং তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হতে তারা আর কোন ভাবেই নিজেদেরকে শোষিত উপনিবেশ বা প্রজা হিসেবে মেনে নিবে না 

 

 

এই ক্রান্তিলগ্নে এটি একটি পবিত্র দায়িত্ব প্রতিটি বাঙ্গালির জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। এমনকি সরকারি কর্মচারীদের, এমন কোন কাজে সরকারকে সাহায্য করবেন না যা তাদের ষড়যন্ত্র করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। 

 

 

এখন এই প্রতিনিধিরা জনগনের ভুটে নির্বাচিত হয়েছে যে শুধুমাত্র বৈধ 

কর্তৃপক্ষ, অতএব, সকল কর্তৃপক্ষকে বলা হচ্ছে এই বেপারটির লিপিবদ্ধ করার জন্য। 

এমতাবস্থায়, একদিনের জন্যেও সামরিক শাসনের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। আমি এমতাবস্থায়, মার্শাল ল তাড়াতাড়ি তুলে নেওয়ার জন্য বলছি, তাৎক্ষনিক এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হোক, এবং সকল ধরনের বাধা দূর করা হোক জনগনের প্রতিনিধিকে ক্ষমতা ছেড়ে দেবার জন্য, যেটা আইনসঙ্গতভাবে তাদের। 

 

আমাদের আন্দোলন চলতে থাকবে যতক্ষণ নিচের দাবিগুলি মানা না হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ বুঝতে পারে তারা শোষণ হতে মুক্ত। 

 

আমি ঘোষনা করছি আমাদের কর্মসূচি যা কার্যকর করতে হবে ৭ মার্চ পর্যন্ত, এবং আমি নিচের নির্দেশনা গুলি আমাদের জনগণকে দিচ্ছি; 

 

(১) প্রদেশ অনুযাই হরতাল পালন করতে হবে প্রতিদিন ৩রা মার্চ ১৯৭১ থেকে ৬ মার্চ ১৯৭১ সকাল ৬ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত। সকল কর্মক্ষেত্রে এমনকি সরকারি অফিস, সচিবালয়, হাই কোর্ট এবং অন্য কোর্ট, আধা সরকারি এবং স্বায়ত্ত শাসিত প্রতিষ্ঠান, পিআইএ, রেলওয়ে এবং অন্য সকল যানবাহন, বেসরকারি এবং সরকারি। সকল কল, কারখানা, শিল্পজাত এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বাজার। এই হরতালের আওতামুক্ত থাকবে এম্বুল্যান্স, সংবাদ গাড়ি, হাসপাতাল, ওষুধের দুকান, বিদ্যুৎ এবং পানি সরবরাহ। সকল মানুষকে বলা হচ্ছে হরতাল শান্তিপূর্ণ এবং নিয়ম করে পালন করতে, এবং নিশ্চিত করতে হবে যেন কোন অবাধ্য কাজ যেমন, লুটপাট, অগ্নিসঃযুগ ইত্যাদি না ঘটে। কিছু মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে গুপ্তচরের বিরুদ্ধে এবং এইটা মনে রাখতে হবে যে সবাই বাংলাদেশে বসবাস করে, এটা কোন বিষয় না যে কে কোথায় জন্মগ্রহন করেছে অথবা কে কোন ভাষায় কথা বলে। আমরা বাঙ্গালিদের জন্য যেমন তেমনি তাদের মানুষের জন্যেও। সম্পত্তি এবং সম্মান আমাদের পবিত্র আস্থা এবং তা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। 

 

(২) ৩রা মার্চ যেটা জাতীয় সংসদে অধিবেশনে বসার কথা ছিল তা জাতীয় শোক দিবস হিসাবে পালন করা হবে। যার ফলশ্রুতিতে আমি একটি মিছিলের নেতৃত্ব দিব পল্টনের মাঠে বিকাল ৪ টায় ছাত্রলীগ এর সাথে মিটিং শেষ হবার সাথে সাথেই। 

 

(৩) যদি রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্রের  ভাইয়েরা আমাদের কর্মসূচি, অথবা বিবৃতি কভার না করতে চায়,  এই সংস্থা কর্মরত সব বাঙালির তাদেরকে সাহায্য করা প্রত্যাখ্যান করা উচিত, সাত কোটি বাংলাদেশির কণ্ঠরোধকারীদের। 

 

(৪) ৭ই মার্চ ১৯৭১ সালে বিকাল ২ ঘটিকার সময় রেসকোর্স মাঠে আমি একটি বিশাল জনসভার আহবান করছি এবং পরবর্তী ঘোষণা ওইখানে জারি করা হবে। 

 

(৫) আমি আমাদের মানুষকে অনুরোধ করতে চাই আমাদের সাধারণ সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য শান্তিপূর্ণ এবং সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে। আমি তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই কোন প্রকার পুলিশি অভিযান যদি নেওয়া হয় আমাদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে এবং তা হবে দালাল দ্বারা প্ররোচিত হয়ে ও গণবিরোধী বাহিনী।