ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার অভিযানের ওপর একটি প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ

Posted on Posted in 8

৩। ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার অভিযানের ওপর একটি প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ (৩২৫-৩৩০)

সূত্র – বাংলাদেশের গণহত্যা’ বাংলার বাণী, বিশেষ সংখ্যা, তারিখঃ ১৯৭২

২৫শে মার্চ রাত থেকে ২৭ মার্চ শে রাত
-নাজিমুদ্দীন মানিক

 

পঁচিশে মার্চ উনিশ’শ একাত্তর। রাত সাড়ে ১১টা কি পৌনে ১২টা। বাকি দু’টো লেখা শেষ করতে হবে। তাড়াহুড়ো করে হোটেল থেকে চারটে খেয়ে বেড়িয়েছি মাত্র অবজারভার হাউসের সামনে রাস্তায়। দেখলাম অসংখ্য মানুষের ছুটাছুটি-কেউবা ইট টানছেন, কেউ বা বিরাট বিরাট গাছ কেটে আনছেন-কেউ বা পাশের মোটর মেরামত কারখানার সামনে ফেলে রাখা পুরনো ভাঙ্গা গাড়িগুলো এনে রাস্তায় জড়ো করছেন-সবারই মুখে এক কথা –ব্যারিকেড তৈরি করো, ওদের চলার পথে বাধা সৃষ্টি করো, ওদের আসতে দেবো না আমাদের এ জনপদে। মনে পড়লো বঙ্গবন্ধুর নির্দেশঃ আমি হুকুম দেবার নাও পারি, রাস্তা-ঘাট যা কিছু আছে তোমরা সব বন্ধ করে দেবে। এ নির্দেশ অমান্য করতে পারিনি আমি নিজেও- ওদের সাথে ধরাধরি করে সবে ডিআইটি রাস্তার মুখে রেখেছি একটা গাছ। ওমনিই শোনা গেল গুলির শব্দ। রাস্তার মানুষগুলো কোন মতে আত্নরক্ষা করলো। আমি দৌড়ে চলে এলাম আমাদের পূর্বদেশ অফিসে।

অফিসের বারান্দায় আধাঁরের চাদোয়ার নিচে দাঁড়িয়ে দেখলাম হায়েনাদের একটি কনভয় এসে থমকে দাঁড়িয়েছে-দৈনিক পাকিস্তান (বর্তমানে দৈনিক বাংলা) অফিসের সামনে, কনভয়ের সামনে বিরাট ব্যারিকেড। ওরা ডিঙ্গাতে পারছিল না। তখন-তাই গুলি খাওয়া শুয়োরের মত ঘোঁৎ ঘোঁৎ করছে কনভয়ের বিরাট গাড়ীগুলো। আর গাড়ীর আরোহী পাষান্ডরা গুলি ছুড়ছে ওদের চার পাশে। হায়দার ভাইয়ের ধমক খেয়ে কামরার ভেতরে চলে এলাম। জানালা দিয়ে স্পষ্টতঃ দেখতে পেলাম গাড়ী থেকে নামলো দশ-বারোজন হার্মাদ। অনেক কষ্টে ব্যারিকেড সরিয়ে পথ করে নিলো ওদের কনভয়ের। তারপর টয়েনবি সার্কুলার রোড ধরে চলে গেলো।

টেলিফোন করলাম বেগম বদরুন্নেসা আহমদের বাড়ীতে। কেউ ধরলো না। তারপর আর কাউকে টেলিফোন করতে পারিনি। হার্মাদরা টেলিফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। অফিসের সর্বত্র এক বিক্ষুদ্ধ নীরবতা আর শহরের সর্বত্র অবিরাম বোমাবর্ষণ, ফিল্ডগান, মেশিনগান, স্টেন, এস এল আর, আর চাইনিজ অটোমেটিকের একটানা শব্দ। মাঝে মাঝে কানে ভেসে আসছে গুলী খাওয়া মুমূর্ষু নরনারীর করুণ আর্তনাদ। হায়দার ভাই, সেলিম ভাই, লোহানী ভাই, রফিক, অহিদ, এরশাদ, আতিক, তওফিক, রকিব, সাদেকিন, মজিদ, আনিস, কামাল, আজমল, জিয়া আমরা সবাই হতবাক-কারো মুখে কোন কথা নেই। বোমার একটা ঘন্টা শব্দ শুনছি-আর যেনো মনে হচ্ছে নিজের হৃৎপিন্ডটাকে চিবিয়ে খাচ্ছি। অথচ আমরা তখন অসহায়-করার কারো কিছু নেই তখন।

মনে পড়লো সেদিন সন্ধ্যার কথা। রাত আটটার দিকে শেখ সাহেব ব্রীফ করেছিলেন দেশী সাবাদিকদের এর আগে চাটগাঁ, রংপুর, খুলনা, রাজশাহীতে জল্লাদের হামলার খবরে গর্জে উঠেছিলেন বঙ্গশার্দুল। এক বিবৃতি দিলেন তিনি। বললেন বাংলায় আগুন জ্বলেছ। এ আগুন নেভানোর সাধ্য কারো নেই। আমার মানুষকে নির্বিচারে এভাবে মারতে দেওয়া যাবে না। সাবধান হও জল্লাদ। শেখ সাহেবের বাড়ীতেই খবর পেলাম সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া-ভুট্টো ঢাকার প্রেসিডেন্ট হাউস আর ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে ক্যান্টনমেন্ট গিয়ে টিক্কা, ওমর, পীরজাদা, ফরমান আলী, হামিদ, খাদিম হোসেন রাজা এসবদের নিয়ে মিটিং করছে-সলা পরামর্শে বসেছে। শেখ সাহেবের প্রেস ব্রিফিংয়ের পর সলিম ভাই, আমি আর সেলিম মামা হাঁটতে হাঁটতে এসেছিলাম নিউমার্কেট পর্যন্ত। নিউমার্কেট থেকে একবার সার্জেন্ট জহুরুল হলে গেলাম। কাউকে দেখতে পেলাম না। মন এক বিরাট আশঙ্কায় দুমড়ে-মুচড়ে গেলো। অফিসে এসে একটা লেখা শেষ করছি। তারপর খেতে গিয়ে তো এ কান্ড।

সে রাতে আর কোন কাজ হলো না-কোন পত্রিকা বেরোলা না পরদিন। সারা রাত অফিসে আটকা থাকলাম। জল্লাদরা কারফিউ জারী করেছে। পরদিনও সেই অবস্থা। তবে রাজারবাগে বোমার আওয়াজ কমছে কিছুটা। কিন্তু গুলীর আওয়াজ থামেনি। থামেনি আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার আর্তনাদ। দূরে তিন-চার জায়গায় দেখলাম বিরাট বিরাট কুন্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। বুঝতে পারলাম স্বদেশেও যারা মোহাজির সেসব রিকশাওয়ালা-মুটে-মজুর আর কুলী-কামিনদের বস্তিগুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে জল্লাদের দল।

ছাব্বিশে মার্চ নয়টায় ঢাকা বেতার থেকে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় জনৈক উর্দুভাষী এলাম ফরমাইছেন, টিক্কা ঢাকা শহরে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারী করেছে। আর অনেক নতুন সামরিক আইন জারী করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এর কয়েক মিনিট পরেই তদানীন্তন চতুর্দশ ডিভিশন হেডকোয়ার্টারের সামরিক পাবলিক রিলেশন অফিসার মেজর মোহাম্মদ সাদিক সালিক এক বিরাট পরোয়ানা নিয়ে অফিসে হাজির । ওর দাবী গুলো বাংলায় অনুবাদ করে প্রচার পত্র হিসাবে ছেপে দিতে হবে। সালিকের সাথে স্টেনধারী আরো তিন পাষান্ড। আমরা বললাম এসব ছাপার মালিক আমরা নই। হামিদুল চৌধুরী বা মাহবুবুল হকই পারে। ওরা চলে গেল। কিছুক্ষণ পর মাহবুবুল হককে নিয়ে ফিরে এলো। মাহবুবুল হক ছাপতে রাজী হলো-আমাদেরকে অনুবাদ করে দিতে বললো। আমরা জবাব দিয়েছিলামঃ ক্ষুন্ন পিপাসা আর নিদারুন উদ্বেগে আমরা ক্লান্ত। এখন অনুবাদ করতে পারবো না। মাহবুবুল হক এতে সালিককে কি যেনো বললো। সালিক আমাদের ধমক দিয়ে বললো –জলদী করো না-নেহী তো দেখতা হায়-পেছনের তিন পাষান্ডকে দেখালো। অগত্যা অনুবাদ করে দিলাম। পরে অবশ্য সে অনুবাদের প্রচারপত্র ছাপা হয়নি। এরপর ওরা মাহবুবকে নিয়ে আবার চলে গেলো। আমরা অফিসেই বন্দী রইলাম।

এগারোটার দিকে রফিক কোথা থেকে কয়েকটা পাউরুটি আর বনরুটি জোগাড় করেছিল। সেগুলো দিয়ে কোন মতে কিছুটা ক্ষুধা নিবারণ করলাম। এ সময় দেখি বেতার থেকে বার বার আমার সোনার বাংলা গানটির দু’তিন পঙক্তি বাজানো হচ্ছে।

পঁচিশে মার্চ রাত থেকে সাতাশে মার্চ-সকাল সাড়ে নয়টা পর্যন্ত আটকা পড়েছিলাম সেই পূর্বদেশ অফিসে। সাতাশে মার্চ সকালে ঢাকা বেতার থেকে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় জনৈক উর্দুভাষী ঘোষনা করলো, টিক্কা দুপুর বারোটা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করেছে। যে যার ঘরে ফিরতে পারবেন-পারবেন বারটা পর্যন্ত হাট বাজার করতে। তারপরই আবার স্বগৃহে অন্তরীণের পালা শহরবাসীদের। ঘোষনাটি শোনার পর আমরা অবজারভার ভবনে চার দেওয়ালের ভেতরে আটকা পড়া লোকগুলো বেরুলাম। রাস্তায় হেঁটেই যেতে হবে, কেননা রাস্তায় দখলদার বাহিনীর বিরাট বিরাট লরী আর জীপ ছাড়া অন্য কোন যানবাহন নেই। মহানগরী ঢাকার রাস্তাগুলি সকল রকমের যানবাহন শূন্য। মতিঝিল থেকে রায়ের বাজার পর্যন্ত দীর্ঘ এ মাইলের মধ্যে রাস্তায় একটা রিকশাও আমার চোখে পড়েনি।

রাস্তায় দেখলাম ঘরে ফেরার মানুষগুলোর সে কি উর্ধ্বশ্বাস চলা। কারো দিকে কারো তাকাবার সময়টা পর্যন্ত নেই। সবাই ছুটছে কোনমতে নিজের জানটুকু নিয়ে যেভাবে পারছে পালাচ্ছে। থেকে থেকে পাষান্ডদের লরীগুলো বিরাট দানবীয় শক্তিতে ছুটে চলেছে রাস্তার দু’পাশের মানুষ আর ঘরবাড়ী কাঁপিয়ে।

প্রতিটি গাড়ীর ওপরে পজিশন নিয়ে বসে আছে-চারদিকে তাক করে রেখেছে মেশিনগান, হাল্কা মেশিনগান আর কামানের মুখ। ওদের এহেন সর্তক মহড়া দেখে সেই সদা আতঙ্কিত মনেও হাসি এলো আমার। কার বিরুদ্ধে এমন সর্তকতা? বাংলাদেশের নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাবাহিনীর দাবীদারদের এহেন একতরফা বীরত্ব যদি সেই মুহূর্তে আমার কাছে হাস্যস্পদ বলে মনে হয়, তবে কি।

অবজারভার ভবন থেকে বেরিয়ে দুদিনের উপোসী ক্লান্ত দেহটাকে টেনেহিঁচড়ে যখন ন্যাশনাল কোচিং সেন্টারের সামনে হাজির হলাম, তখন অনেকটা সংজ্ঞা লোপ পাবার অবস্থা। কোচিং সেন্টারের ঠিক সামনেই ফুটপাতের ওপর দেখলাম একটা মানুষের লাশ। গুলীর আঘাতে বুকটা ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। পাশেই পড়ে রয়েছে কিছু নাড়ি-ভুড়ি। নাকে আঙ্গুল এঁটে-চোখ দুটো বন্ধ করে পাশ কাটাতে চাইলাম। কিন্তু পা এগুচ্ছিল না। হাঁটু দুটো কাঁপছে থর থর করে। নার্ভাস হয়ে গেলাম। তবুও এগিয়ে যেতে হলো।

একবার মনে করলাম রাস্তায় নেমে যাই। ফুটপাতে হাঁটতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। কিন্তু পারলাম না। রাস্তার ওপর দিয়ে পশুদের দানবীয় লরীগুলো যেভাবে ছুটছে-যে কোন সময় তার তলায় পিষ্ট হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছুই নয়। বুক সেন্টারের সামনের ফুটপাতে দেখতে পেলাম চাদর মুড়ি দেওয়া আর একটি লাশ। ওর পাশ দিয়ে হেঁটে গেলাম। বাইতুল মোকাররমের মোড়ে রাস্তার ওপর আরো দুটো নাম না জানা বাঙ্গালী বীরের নশ্বর দেহ চোখে পড়লো-চোখে পড়লো জি,পি,ও’র পেছনের গেটে এক ঝুড়ি রক্তাক্ত হৃৎপিন্ড আর নারী-ভুঁড়ি। তবু আমি হেঁটে চলেছি-হেঁটে চলছেন আমার চার পাশের মানুষগুলো। কেননা, আমি এবং আমার চার পাশের মানুষগুলো-আমরা সবাই তখন বাঁচতে চাই। এবং সে জন্যই আমাদের কারো কোন খেয়াল নেই-কারো সাথে কারো কোন কথা নেই। সবাইর চোখেই একটা সন্ত্রস্ত ভাব। সবাই ভীতি বিহ্ববল।

এ লাশগুলো দেখার পর চলার পথে আমার অবচেতন মনে বারবারই দৃশ্যগুলো ফুটে উঠতে লাগলো-মনকে বাধতে চাইলাম-রাস্তায় আর কিছুর দিকে তাকাবো না –কেবল নিজের পদক্ষেপের জায়গাটুকু ছাড়া-কেননা আমার অনুভূতি তখন ভোঁতা হতে শুরু করেছে-প্রচন্ড অন্তর্যাতনায় আমি যেন উদভ্রান্ত। পুরান পল্টন মোড় পেরিয়ে সেক্রেটারিয়েটের ফুটপাতে উঠলাম। ক্যান্টন রেষ্টুরেন্টের বিপরীত দিকের রাস্তায় ডাস্টবিনের পাশে দেখলাম আর একটা বাঙ্গালীর লাশ। হা্তে শোল মাছের একটি কাঁচা মাথা মুষ্টিবদ্ধ। ক্যান্টনওয়ালারা মাছের মাংসটা রেখে মাথাটা ডাষ্টবিনে ফেলে দিল, কোন বুভুক্ষ হতভাগ্য হয়তো বা সেই মাথাটা কাক-কুকুরের সাথে ঝগড়া করে অধিকার করেছিলো-কিন্তু নিয়ে যেতে পারেনি-দখলীকৃত সেই উচ্ছিষ্ট মাথাটা হাতে থাকতেই সে জল্লাদ পাশবিক শক্তির উন্মত্ত শিকার। আর পা চলে না-ইচ্ছে হলো ওখানেই বসে পড়ি।

প্রেসক্লাবের সামনে দিয়ে পেরুতেই একবার ক্লাব প্রাঙ্গণের দিকে তাকালাম-দেখলাম ফয়েজ ভাইয়ের (বর্তমান বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রধান) পুরনো গাড়ীটা পড়ে রয়েছে। ক্লাবের পশ্চিম পাশের বাড়ীর আঙ্গিনা ভর্তি পশুদের ছাউনি-ওপাশে কমিশনার অফিস প্রাঙ্গণে ভর্ত্তি জল্লাদের দল। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। হঠাৎ এক পথচারীর ডাকে সম্বিত ফিরে আবার চলতে শুরু করলাম।

নতুন হাইকোর্ট ভবনের সামনে দিয়ে রমনা পার্কের পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছি আমি-আমি যেন মানুষ নই-দমদেয়া কোন যন্ত্র মাত্র। রমনা রেসকোর্সের পাশে এসে আর রাস্তা দিয়ে হাঁটতে সাহস হলো না-অন্ততঃ মাঠের মধ্য দিয়ে হেঁটে ওদের লরীগুলো যদ্দুর সম্ভব এড়িয়ে চলা যাবে, তাই করলাম। রেসকোর্সের মধ্য দিয়ে হাঁটছি-আর আমার সম্ভ্রম চেতনায় ভাস্বর হয়ে উঠছে-মাত্র আঠারো দিন আগের একটি স্মৃতি। এই সেই রেসকোর্স-যেখানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেনঃ এবারের সংগ্রাম-মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে একটি বিরাট মঞ্চ-সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেছেন বঙ্গবন্ধু-মাঠ ভর্তি লোক, এক জনসমুদ্র। আমি সেই সমুদ্রের মাঝ দিয়ে হাঁটছি-হঠাৎ মনে হলো স্বাধীনতার সংগ্রাম নিশ্চয়ই শুরু হয়ে গেছে। অন্ততঃ বিবিসি থেকে সকালে সে আভাসই দেয়া হয়েছে-বাঙ্গালী মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়েছে-ওরা গোপন বেতার থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা করেছে-বিবিসি তার উদ্ধৃতি দিয়েছে। গোপন বেতার থেকে দাবী করা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু মুক্তিবাহিনীর সাথে আছেন। বঙ্গবন্ধুর খবর শুনে কিছুটা নিশ্চিত হলাম (যদিও পরে তা সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি)।

রেসকোর্স-শাহবাগের মোড় পেরিয়ে কাঁটাবন বস্তির পাশে পৌছিলাম-এ পথে আসতে কতক্ষণ লেগেছিলো বলতে পারবো না। বস্তির পাশের রাস্তার ওপর দেখলাম রক্তমাখা বেশ ক’টি পায়ের ছাপ। রাস্তার ওপর বেশ ক’টি ব্যারিকেড চিহ্ন করতে এসে গুলী খেয়েছে। ক’জন মরলো কে জানে। রক্তমাখা পায়ের ছাপগুলোও বস্তির দিকে এগিয়ে গেছে। আর দশ পায়ের মত সামনে এসে দেখতে পেলাম ফুটপাতে আর রাস্তায় মাঝখানের নর্দমায় একটি রক্তের নহর। রাস্তা থেকে ড্রেনে জমে থাকা রক্তস্রোতে জমাট বেঁধে থক থক করছে-ক’জন বীরবন্ধু সেদিন সেখানটায় আত্নহুতি দিয়ে ছিলেন-কি নাম তাদের –নিজের দেশে মোহাজের এসব বীরদের পৈতৃক ভিটেই বা ছিলো কোথায়?

এই মুমূর্তে আমার আর কোন অনুভূতি নেই-নেই কোন উপলদ্ধিও। আমি হাঁটছি…হাঁটছি নিজের ঘরের পানে-হাঁটছি আমার নিজের এবং আমার আত্নজ-আত্নজাকে বাঁচানো এক স্বার্থপর দুর্দমনীয় মনোবৃত্তি নিয়ে-আর আমার চলার পথের এসব দৃশ্যগুলো কেবল দেখছি আর দেখছি। পুরানো রেল লাইনের (মহসীন হলের পিছনে) ওপারকার বস্তিগুলো ও তখন এক বিরাট ধ্বংসস্তুপ-বস্তির ছোট ছোট ঘরগুলো পুড়ে সুন্দর ছাইয়ের স্তুপে পরিণত হয়েছে। ক’জন ওরা এখানে মরলো-তার হিসাবই বা কে রাখে।

এলিফ্যান্ট রোড আর ল্যাবরেটরী রোডের সংযোগস্থলে দেখলাম বেশ ক’জন পাষন্ড রাস্তায় টহল দিচ্ছে। আমি অনেকটা টহলে টহলে তাদের সামনে দিয়ে পার হচ্ছি। হঠাৎ একটি বিক্ষুদ্ধ কন্ঠে থমকে পেছনে ফিরে চাইলাম। দেখলাম পাকিস্তানী সামরিক পোশাকের আবরণে বন্দি একজন বলছেন স্পষ্ট বাংলায়ঃ শালারা আমরা তো গেছি-তোদের দিনও আর বেশী বাকী নেই। এবার যেতে হবে। বুঝলাম কোন বাঙ্গালী হয়তো নিজেকে বাঁচানোর জন্যই তাদের সাথে টহল দিতে এসেছেন একান্ত অনিচ্ছায়। কথাগুলো বলেছেন, তার কোন পাঞ্জাবী হার্মাদ সহকর্মীকেই। সেই বাঙ্গালী সৈনিকটি আজ আর বেঁচে আছেন কিনা কে জানে।

বিজ্ঞান গবেষণাগারের কাছে এসে শুনলাম পাশের বাড়ীতে দু’টি লাশ রয়েছে। আগের রাতে পাষন্ডরা ওদের হত্যা করেছে-বাড়ীর ভেতর ঢুকেই। এখানেই মিরপুর রোডের ওপর এ পাষান্ড দাঁড়িয়ে মাইক দিয়ে ঘোষনা করছে, কারফিউ বিকেল চারটা পর্যন্ত শিথিল করা হয়েছে। এই ঘোষণায় আমার চলার গতিও কিছুটা শিথিল হলো। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম রায়ের বাজারস্থ আমার বাসার দিকে। প্রায় বারোটায় বাসায় পৌঁছিলাম। বাসায় পৌঁছে নতুন করে আবার আতঙ্কগ্রস্থ হলাম।

সাতাশে মার্চ সকালে কারফিউ শিথিল করার পর রাস্তায় বেরিয়ে দেখলাম, যেন মানুষের মিছিল। হাজার হাজার মানুষ উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালাচ্ছেন শহর থেকে গাঁয়ের দিকে। কেননা তাদের ধারনা জল্লাদ বাহিনী হয়তো বা শহরেই চালাবে তান্ডবলীলা-গ্রাম পর্যন্ত হয়তো পৌঁছুবে না-কিন্তু কালক্রমে ওদের ও ধারণা মিথ্যে বলেই প্রতিপন্ন হয়েছে। ইয়াহিয়া-টিক্কার নরখাদকরা শহরেএ চাইতেই গ্রামেই শেষের দিকে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল-বাংলাদেশের ৬৬ হাজার গ্রামের মধ্যে ৩০ হাজার গ্রাম ওরা পুড়িয়েছে-চালিয়েছে মানব ইতিহাসের সব চাইতে জঘন্য ও ঘৃণ্যতম হত্যাকান্ড।

রায়ের বাজারে নদীর ধারে গিয়ে দেখলাম এক অভূতপূর্ব মর্মান্তিক দৃশ্য। প্রাণভয়ে মানুষ যে কত অসহায়, কত কষ্ট স্বীকার করতে পারে এটা তারই একটা প্রতিচ্ছবি। কাঁধে-ঘাড়ে-হাতে ছোট ছোট বাচ্চা আর পৌঁটলা পুটলীসহ এক কোমর থেকে এক বুক পানি ভেঙ্গে নদী পার হচ্ছে হাজার হাজার নর-নারী। প্রাণ বাঁচানোর আকুল চেষ্টায় ধাবমান অনেকেরই ইজ্জত-আব্রুর দিকে কোন খেয়াল নেই। যে সব গৃহবধুকে সেদিন রাস্তায় এবং নদী পার হবার সময় এমন বিপর্যস্ত অবস্থায় দেখেছি-তাদের অনেকেই কোন দিন সূর্য্য দেখেছেন কি না বলা যায় না। অনভ্যস্ত পদে তাড়াহুড়ো করে পথ চলতে গিয়ে কত মহিলা ও শিশু যে হোঁচট খেয়ে পড়ে পা ভেঙ্গেছেন, কতজনের যে নখ উল্টে গেছে-তার খবরই বা কে রাখে। আমার আত্নীয় সেদিন এমনিভাবে পালাবার সময় আছাড় খেয়ে পড়ে পায়ের নলার হাডডি দু’টো ভেঙ্গেছে-এখনও তিনি হাঁটতে পারছেন না-কোনদিন পারবেন কিনা বলা শক্ত।

বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে বাঙ্গালী হয়ে বাংলাদেশের বুকে বাংলারই মা-বোন আর বাচ্চাদের এ মর্মান্তিক অবস্থা দেখতে পারিনি-পারিনি সহ্য করতে নিজের অক্ষমতার আত্নদহনের জ্বলে মরেছি কেবল। বিকেল চারটা বাজতে না বাজতেই হার্মাদের বিরাট বিরাট লরীগুলো ঐ এলাকার রাস্তা এবং ছোট ছোট জীপগুলো অলি-গলিতে ছুটোছুটি শুরু করলো। আমরা সবাই আবার গৃহে অন্তরীণ হলাম। চারটার কয়েক মিনিটের মধ্যেই নদীর পাড়ের দিকে বেশ কয়েকটা গুলীর আওয়াজ শুনতে পেলাম। পরে জানতে পেরেছিলাম, যে হতভাগীরা জানের ভয়ে শহর ছেড়ে পালাচ্ছিলো-তাদের ওপরই হার্মাদরা নির্বিচারে গুলী চালিয়েছে-কতজন যে সেদিন এখানে সেখানে শহীদ হয়েছেন কেউ তার কোন হিসাব জানে না-কোন দিন কোন ইতিহাসেও হয়তো বা ওদের কথা আর কেউ লিখবে না।

সন্ধ্যায় ঘরে বসে বসে বহু কষ্টে স্বাধীন বাংলা বেতারের খবর ধরতে সক্ষম হলাম। সেই প্রথম শুনতে পেলাম এই বেতারে খরব-শুনতে পেলাম ঘোষকের আনাড়ি কন্ঠে যে, বঙ্গবন্ধু ২৬শে মার্চ ভোরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেছেন এবং তিনি মুক্তিবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে নিরাপদে রয়েছেন। এই কথাটা শুনে আশ্বস্ত হয়েছিলাম-আনন্দিতও হলাম। অবশ্য পরে শেষাক্ত ঘোষনাটি সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি। রাত যতই বাড়তে লাগলো সারা এলাকাজুড়ে জল্লাদদেরও তান্ডবলীলা আরো বাড়তে শুরু করলো। রাত ১১টার দিকে আমার বাসার সামনের গলির মুখে বাসা দু’টোয় ওরা দু’দল ঢুকলো, এ বাসা একটি কুমোরদের। অপরটিতে থাকেন দু’টো রিক্সাওয়ালাদের পরিবার। রিক্সাওয়ালাদের বাসা থেকে এরা দু’জন তরুনীকে ধরে নিয়ে গেলো। মুসলমান ধর্মের ধজ্বাধারী ইয়াহিয়া-টিক্কা-ভুট্টোর হার্মাদ বাহিনীর পাশবিকতার যূপকাষ্ঠে দু’জন বাঙ্গালী নিঃসহায় তরুনীর একমাত্র সম্বল নারীত্ব ভূলন্ঠিত হলো।

কুমোরদের বাসায় ঢুকে ওরা প্রথমে ভাঙলো ওদের ঠাকুর ঘরের দেবী-প্রতিমাগুলো। তারপর ঢুকলো অভ্যন্তরে। বাড়ির ভেতরে ঢুকে ঘর থেকে টেনে বের করলো ১০ থেকে ৬০ বছর বয়সের সকল পুরুষকে। ও বাড়ির একজন বধূ ও একজন মেয়েকে ধর্ষণ করলো তাঁদের স্বামী, মা-বাবা আর শশুর-শাশুড়ির সামনে। এক জল্লাদ ঘুমন্ত একটি বছর দেড়েকের বাচ্চার বুকে ঢুকিয়ে দিলো তার সুতীক্ষ্ণ বেয়োনেট। তারপর বেয়োনেটের আগায় ঝুলিয়ে রাখলো ওর কচি দেহলতাটিকে। চোখের সামনে দেখলাম, সেই অবুঝ শিশুর হাড়গোড়্গুলো ঝুরু ঝুর করে পড়ছে জল্লাদের হাতে ধরা রাইফেলের গা বেয়ে। বেশীক্ষণ আর সহ্য করতে পারি নি। বাসার পেছনের চোরাগলি পথে দাঁড়িয়ে দেখলাম সে দৃশ্য। আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম। আজও ভাবী এসব দেখে কী করে সহ্য করেছি-কেন পাগল হয়ে গেলাম না। কেন আমি মানুষ হয়ে জন্মালাম!

কুমোরদের বাড়ী থেকে বেড়িয়ে আসার সময় হঠাৎ ওরা এসে তমকে দাঁড়ালো ওদের পাতিল পোড়ানোর সেই বিরাট অগ্নি কুন্ডটির সামনে। বাড়ীর সবাইকে বন্দুকের নলের মুখে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করলো ওটা কি? কুমোর কেউ তো উর্দু জানে না বলতেও পারে না তবুও ওরা বর্বর খান সেনাদের বোঝাতে চেষ্টা করলো। এক বর্ণও বাংলা না জানা অথচ বাঙ্গালীর দরদের খান সেনারা তাঁর একটা কথাও বুঝলো না। বুঝতে চাইলো না। শুরু হলো নির্মম মারধর আর বেয়োনেটের খোঁচা। খান সেনারা চিৎকার করে বলতে লাগলো শালালোক ঘর কা আন্দার এতনা বড়া ব্যাঙ্কার বানায়া হ্যায়। কেতনা গালিচ (মুক্তিযোদ্ধা) হ্যায় হিয়া পার। বাতাও কেতনা হ্যায় তেরা ঘরমে। কুমোরেরা যত বলে হুজুর এটা আমাদের পাতিল পোড়ার কুন্ড ততই যেন তাদের নির্মম নির্যাতনের পরিমাণ বাড়তে থাকে। চোখের সামনে স্বামী ও ছটি সন্তানের এমন নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে শেষটায় কুমোর গিন্নী ওদের সর্দার গোছের লোকটির পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। এক লাথিতে তাঁকে কমপক্ষে পাঁচ হাত দূরে ঠেলো ফেলে দিলো সেই নারকীয় জল্লাদটি। তারপর কি মনে করে ঘট ঘট করে বেরিয়ে গেলো ওরা সবাই।

চোরা পথ দিয়ে দৃশ্য দেখছিলাম-আর ওরা যদি আমার বাসায় ঢুকে তবে কি করবো-সেটাই ভেবেছিলাম। বাসায় রয়েছেন আমার ষাট বছরের বুড়ো নানু- একটা মোমবাতি জ্বালায়ে তিনি সন্ধ্যা থেকেই কোরান শরীফ পড়তে শুরু করেছেন আর তাঁর চোখ বেয়ে পড়ছে অশ্রুধারা। আমার চারটি বাচ্চার মধ্যে বড়টি ছাড়া ছোট তিনটির একজনকে নিজে কোলে নিলাম অন্যটিকে ঝিয়ের কোলে এবং তখন মাত্র একুশ দিন বয়স ছোটটিকে ওর মাযের কোলে দিয়ে সেই চোরাপথটিতে দাঁড় করিয়ে রাখলাম। উদ্দ্যেশ্য জল্লাদরা আমার বাসার গেট ভাঙ্গানোর সাথে সাথেই দৌড়ে গিয়ে পিছনের পানি ভর্তি এঁদো পুকুরটিতে নেমে যাবো। অন্ততঃ বেঁচে থাকতে পারি কিনা সে চেষ্টা তো করতে হবে। নানু ঘর ছেড়ে যেতে নারাজ। তিনি বলেনঃ জল্লাদের হাতে যদি এভাবে আমার মরণ থাকে তবে মরব। তোরা আল্লাহর উপর তোয়াক্কা করে পালানোর চেষ্টা কর। তোদের ওরা রাখবে না।

আল্লাহর কি ইচ্ছা-ওরা আর আমাদের বাসার দিকে গেল না তখন। কিন্তু সারারাত ধরে আমরা ওই চোরা পথেই বসে থাকলাম। কেননা কখন ওরা বাসায় ঢুকে পড়ে। এভাবেই রাতটা কেটে গেল।

পরদিন সকালে উঠে ঠিক করে ফেললাম যে রায়ের বাজার এলাকায় আর আমার থাকা উচিত নয়। সাথে সাথে আঠার টাকা দিয়ে দুটো রিকশা ঠিক করে রায়ের বাজার থেকে মতিঝিল কলোনীর দিকে যাত্রা করলাম।

যাবার পথে রায়ের বাজারের মোড়ে দেখলাম একখানা গাড়ি। দুজন বিলাটি সাহেব গাড়িতে। ওরা আমাকে থামালেন। কোথায় যাচ্ছি কেন যাচ্ছি জানতে চাইলেন। রাতের ঘটনা তাদের জানালাম পরে জানতে পারলাম যে এ দুজন বৃটিশ সাংবাদিক। কোন মতে বৃটিশ হাইকমিশনের একখানা গাড়ি যোগাড় করে তাঁরা বেরিয়েছেন, বিধ্বস্ত ঢাকার পথ দেখতে। তাড়াহুড়ো করে ওদের সঠিক পরিচয় জানতে পারিনি। একদিকে পালাচ্ছি আর অন্যদিকে জল্লাদরাঃ তখনো টহল দিচ্ছে।

সাতাশের রাতে তারা রায়ের বাজারের পটারী সেন্টারের দেয়ালের সাথে দাঁড় করিয়ে কয়েকজনকে গুলি করেছে আজও তার কোন হিসাব পাওয়া যায়নি। কোনদিন সে হিসাব পাওয়া যাবে কিনা কে জানে।