ত্রাণ সাহায্য প্রদান ও পররাষ্ট্র সচিব ইউমের বিবৃতি

Posted on Posted in 13
শিরোনামসূত্রতারিখ
ত্রাণ সাহায্য প্রদান ও সামগ্রিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র সচিব হিউম এর বিবৃতি ও এ সংক্রান্ত বিতর্ককমনস সভার কার্যবিবিরণী১১ মে, ১৯৭১

 

১১ মে ১৯৭১ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পূর্ব পাকিস্থানে ত্রাণ সাহায্য প্রদান ও এবিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার ডগলাস হিউম এবং অন্যান্য সাংসদদের মধ্যে কথাপকথন ছিল অনেকটা এরকম-

স্যার ডগলাস হিউমঃ গত বৃহস্পতিবার পাকিস্থানের পরিস্থিতি নিয়ে আমাকে কিছু বলতে বলা হয়েছিল। আমি এখন এবিষয়ে আলোকপাত করছি-

গত অধিবেশনেই পূর্ব পাকিস্থানের পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের সরকারের উদ্বেগ এবং সেখানকার দুর্দশা লাঘবে আমাদের ইচ্ছার কথা প্রকাশ করা হয়েছিল। সাম্রতিক দ্বন্দ্বে পূর্ব পাকিস্থানের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছে। এবছরের শেষের দিকে সেদেশে, বিশেষ করে যেসব এলাকা যা গত বছরের ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত হয়েছিল সেখানে ব্যাপক খাদ্য ঘাতটি দেখা দেবার সম্ভাবনা আছে। । আমি আবারো বলতে চাই যে আমাদের সরকার যে কোন আন্তর্জাতিক ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিতে সব সময়ই প্রস্তুত। এবং আমাদের মনে হয় এধরনের কার্যক্রম জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়াটাই উত্তম।

আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে কথা বলার পর জাতিসংঘের মহাসচিবকে আমরা পরামর্শ দিয়েছি যে সে যেন পাকিস্থান সরকারের কাছে তার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সাহায্য নবায়নের প্রস্তাব দেয়। উ. থান্ট পাকিস্থান সরকারের সাথে সাহায্য পাঠানোর সমস্যা গুলো নিয়ে এখনো কথা বলেনি। তবে সাহায্য পাঠানোর ব্যাপারে যে কোন ধরনের উদ্যোগে পাকিস্থান সরকারের সম্মতি ও সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন। আমরা অবশ্যই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছি।

সাহায্য সহযোগিতা দিতে গেলেও পাকিস্থানের অর্থনীতির কিছু সাধারণ সমস্যা আছে। পাকিস্থান বৈদেশিক মুদ্রা ঘাটতি সহ কিছু ভয়াবহ অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবেলা করে চলেছে। বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে এইড কনসোর্টিয়ামের অধীনে এইসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ভর করছে এখানে নেয়া সিদ্ধান্তের উপরেই।

তবে সব চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ব্যাপক সংখ্যক উদ্বাস্তু যারা ইতিমধ্যে পূর্ব পাকিস্থান থেকে সীমানা অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। ব্রিটিশ চ্যারিটিজের একটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই সাহায্যদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তারা খাদ্য এবং আশ্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি পরিবহণের জন্য সরকারের কাছে সাহায্য চেয়েছে। আমার মনে হয়েছিল যে আমাদের সরকারের তাৎক্ষণিক ভাবে উচিত তাদের কে সাহায্য দেয়া এবং আমি তা ইতিমধ্যে দিয়েছিও। প্রায় ১৮ হাজার পাউন্ডের একটি সম্পূরক বন্দোবস্ত উপযুক্ত সময়ে নেয়া হবে এবং যদি প্রয়োজন পড়ে তো “সিভিল কন্টিনজেন্সি ফান্ড” থেকে অগ্রিম দেবারও ব্যবস্থা করা হবে।

উদ্বাস্তুদের সাহায্যের জন্য জাতিসংঘে ভারতীয় সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের একটি টিম এখন ভারতে কতটুক আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রয়োজন তা মুল্যায়ন করছে। আমি যা আগেই বলেছিলাম, অন্য সমস্যা গুলোর মতই এই সমস্যাটাও আন্তর্জাতিক ভাবে মোকাবেলা করাটাই সব থেকে ভালো হবে।

মি. হিলিঃ আমি নিশ্চিত যে সংসদের উভয় পক্ষের সদস্যগণই এই সমস্যাতে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে একমত হবেন। প্রকৃতপক্ষে শুধু সাহায্য ছাড়াও কিছু সম্ভাব্য বিপদে জাতিসংঘের সরাসরি সম্পৃক্ততাই সব চেয়ে যুক্তিযুক্ত।

তবে ভদ্র মহোদয় হয়তো স্বীকার করবেন যে তার কিছু কথাতে তিনি এই মানবিক বিপর্যয়ের কিছু কারনকে আড়াল করেছেন। এটা কি সত্যি না যে প্রায় ১৫ লক্ষ লোক পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছে যাদের কে খাওয়ানোর জন্য ভারতীয় সরকারের হিসাব মতে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ মিলিয়ন পাউন্ডের সাহায্য দরকার? এটা কি সত্যি না যে পূর্ব পাকিস্থানে এর চেয়ে আরও বেশি সংখ্যক মানুষের সাহায্য দরকার?

পূর্ব পাকিস্থানে এইসব প্রয়োজনে যে সাহায্য যাচ্ছে আপনি কি তাতে সন্তুষ্ট? আপনি কি জানেন যে রেড ক্রসের একটি বিমান চিকিৎসার মালামাল নিয়ে অবতরণের অনুমতি পায়নি? এবং আপনি কি জানেন যে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য সুত্র বলছে বিশাল পরিমাণ ওষুধ সামগ্রীর মজুদ চিটাগাঙে থাকা সত্ত্বেও তা বিতরণের অনুমতি এখনো পাওয়া যায়নি?

আপনি কি মানবেন যে পাকিস্থানকে অর্থনৈতিক সাহায্য দান এই এলাকার মানুষের দুর্দশা দূর করতে খুব কমই সাহায্য করবে যদিনা এই সমস্যার সমাধানে পূর্ব পাকিস্থানের মানুষের ইচ্ছার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি  রাজনৈতিক মিমাংসা নেয়া  না হয়, যে ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ তারা দেখিয়েছিলেন কিছুদিন আগের গণতান্ত্রিক নির্বাচনে?

আমার আগের প্রশ্নে আপনি কথা দিয়েছিলেন আপনি জানাবেন যে শেখ মুজিবুর রহমান কি পাকিস্থানের কারাগারে বিচারের সম্মুখীন হচ্ছেন? আপনি কি মানবেন যে পাকিস্থানকে যদি  অগণতান্ত্রিক নেতৃত্বর হাতে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে পাকিস্থানের ক্ষমতা অন্য কোন শক্তির হাতে চলে যেতে পারে যা কিনা শুধু পাকিস্থানের জন্যই নয়, বরঞ্চ এই উপমহাদেশের জন্যই একটি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে?

স্যার ডগলাস হিউমঃ আপনার মতই বলতে চাই এটা আসলেই একটি অনেক বড় মানবিক বিপর্যয়। যত সংখ্যক উদ্বাস্তু ভারতে আশ্রয় নিয়েছে এবং সম্ভাব্য যে পরিমাণ ত্রাণ এই বছরের শেষের দিকে দরকার হতে পারে তা অনুমান করে সহযেই বলে দেয়া যায় যে এই মানবিক বিপর্যয় কতটা ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে। এই কারনেই জাতিসংঘের এগিয়ে আসাটা খুব জরুরী। সম্ভবত একমাত্র জাতিসংঘই পারে এই সমস্যার সমাধান করতে এবং আমার বিশ্বাস জাতিসংঘ তা করবে।

আপনার রাজনৈতিক মিমাংসা নিয়ে করা প্রশ্নের উত্তরে বলতে পারি এটা অবশ্যই শুধুমাত্র পাকিস্থানের জনগনের জন্যই হতে হবে। বাইরের কেউ তা চাপিয়ে দিতে পারবেনা। আমি আগেই বলেছিলাম, রাজনৈতিক মিমাংসার ব্যাপারে আমরা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছি। এবং সব কিছুর শেষে এইটাই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান। কিন্তু এটা হতে হবে পাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট এবং জনগনের জন্য।

মি হিলিঃ পররাষ্ট্র মন্ত্রী কি আমার প্রশ্নের নির্দিষ্ট করে উত্তর দেবেন? পাকিস্থানে ইতিমধ্যে পৌছে যাওয়া ওষুধপত্র এবং অন্যান্য সাহায্য বিতরণে পূর্ব পাকিস্থান কর্তৃপক্ষ যে অনুমতি দেয়নি এব্যাপারে আপনার কাছে কোন তথ্য আছে কি?

স্যার ডগলাস হিউমঃ রেড ক্রসের একটি চালান পাকিস্থান কর্তৃপক্ষ ঢুকতে দেয়নি। আমাদের যতটুকু মনে হয় যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্য থাকার পরেও তা বিলি করার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে- এক, সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দুই, বর্তমানে এই বিলি করার কাজটি পাকিস্থান আর্মিকেই করতে হবে, যে আর্মি নিজেই এখন একটা বড় সমস্যা। তাই আমার আবেদন হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব একটি গ্রুপের সেখানে যেয়ে কতটুক সাযাজ্য প্রয়োজন এবং কিভাবে খাদ্য জনগনের কাছে পৌঁছান যায় তা নির্ধারণ করা। অন্য সমস্যা গুলো এখন ততটা বড় নয়।

মি. উডহাউজঃ  মাননীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী কি জানেন ব্রিটেনের “চ্যারিটি কমিশনার” একটি নির্দেশ জারি করেছেন যে “পাকিস্থান ফ্লাড রিলিফ ফান্ডের” টাকা বর্তমান দুর্যোগে ব্যবহার করা যাবেনা? যদি এই নিষেধাজ্ঞাটা পুরোটাই কৌশলগত কারনে হয় তাহলে আপনি বলবেন কি এই নিষেধাজ্ঞাটা কিভাবে উঠানো যায়?

স্যার ডগলাস হিউমঃ আমরা এই ব্যাপারটা খতিয়ে দেখেছি। যেসব শর্ত দেয়া হয়েছে তাতে এই নিষেধাজ্ঞাটা উঠানো খুবই কঠিন হবে। আসলে যেসব এলাকা এখন সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় দুর্গত এলাকা এবং আমরা যদি সেখানে খাদ্য নিয়ে যেতে পারি তো সে কাজে যতটুকু টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে তাও বর্তমান দুর্যোগে ব্যবহার করা যেতে পারে।

মি. থরপঃ জাতিসংঘকে ত্রাণ দেয়ার ব্যাপারে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ মনে করাতে মি. পররাষ্ট্রমন্ত্রী আপনাকে স্বাগত জানাই। আপনি কি জানেন যে এখন পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্থান থেকে ভয়াবহ নৃশংসতার খবর আসছে? কমনওয়েলথ বা জাতিসংঘের একটি পর্যবেক্ষক টিম কি সেখানে পাঠানো যায় যা এই উদ্বেগজনক অভিযোগ কে হয় প্রমাণিত করবে না হয় উড়িয়ে দেবে?

স্যার ডগলাস হিউমঃ বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার মনে হয়না যে পর্যবেক্ষকদের পাকিস্থানে যাওয়াটা কোন কাজের কথা হবে। এটা মনে করার কোন কারনই নেই যে তাদের কে পূর্ব পাকিস্থানে ঢুকতে দেয়া হবে। আপনি সম্ভবত জেনে থাকবেন যে ছয়জন আন্তর্জাতিক সাংবাদিক কে এই সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্থানে ঢুকতে দেয়া হয়েছে। তাই সেদেশ থেকে আরও কিছু তথ্য আমরা পাব।

মি. শোরঃ পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি একটা ব্যাপার পরিষ্কার করে বলবেন যে ত্রাণ এবং সাহায্য দানকারীরা কি বর্তমানে পূর্ব পাকিস্থানে অবাধে চলাচল করতে পারছে? পাকিস্থান সরকারের কাছ থেকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গণতন্ত্রের প্রতি সন্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে আপনি কেমন সাড়া পেয়েছেন?

স্যার ডগলাস হিউমঃ পাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট আমাদের বলেছেন যে তাদের একটি রাজনৈতিক মিমাংসার ইচ্ছা আছে এবং তিনি পূর্ব পাকিস্থানের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে চান। আমরা আশা করি যে এমনটিই হবে। পূর্ব পাকিস্থানে এখন সাহায্য শুরু করার সব চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে গত তিন মাসে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া যোগাযোগ ব্যবস্থা। যোগাযোগ ব্যবস্থা যখন আবার ঠিক হবে, সাহায্যও যাওয়া শুরু করবে।