তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থার উপর পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির প্রস্তাব

Posted on Posted in 2

<2.161.656-657>

 

শিরোনামসূত্রতারিখ
তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থার উপর পূর্ব পাকিস্তান কনিউনিস্ট পার্টির প্রস্তাবপূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি২৫ ফেব্রুয়ারী, ১৯৭১

 

রাজনৈতিক প্রস্তাব

নির্বাচনের গণরায় কার্যকরী করার প্রশ্নে আমাদের কর্তব্য

    ১। পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের পর জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অবিলম্বে বসিবে ইহাই সকল জনগণ আশা করিয়াছেন। এবং জনগণ ইহাও আশা করিয়াছেন যে, ঐ অধিবেশনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র রচিত হইবে, পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইবে এবং গণ-প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের হাতে দেশের শাসনভার হস্তান্তরিত হইবে। বিলম্বে হইলেও ৩রা মার্চ পরিষদের যে অধিবেশন আহবান করা হইয়াছে তাহা অনুষ্ঠিত হউক ইহাও জনগণের আশা। এই অধিবেশনে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নূন্যতম ভাবে ৬-দফা ও ১১-দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচিত হউক ইহাও আজ পাকিস্তানের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দাবী।

    ২। কিন্তু জনগণের ঐসব আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে শাসকগোষ্ঠী ও দেশী-বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল যাহারা পূর্বাপর গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের বিরোধিতা করিয়া আসিয়াছে তাহারাই আজ কতকগুলি চক্রান্ত করিতেছে। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির নয়া নেতা পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ভুট্টোর বর্তমান ভূমিকার মাধ্যমে এই চক্রান্ত প্রকাশ পাইতেছে। ভুট্টো নানা প্রকার গণতন্ত্রবিরোধী ও অযৌক্তিক কথা তুলিয়া পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে বিভেদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করিতেছে। ক্ষমতাসীন শাসকচক্রের ভূমিকাও এক্ষেত্রে অনিশ্চিত থাকিয়া যাইতেছে।

    ৩। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসিবে কি বসিবে না, গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র প্রণীত হইবে কি হইবে না, প্রণীত হইলে উহা প্রেসিডেন্টের অনুমোদন লাভ করিবে কি করিবে না এবং জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হইবে কি হইবে না- এই সমস্ত বিষয়ে একটা গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করিতেছে। অন্যদিকে কিছু উগ্র বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী তথাকথিত স্বাধীন পূর্ব বাংলার নামে অবাঙ্গালীবিরোধী জিগির তুলিয়া এবং মওলানা ভাসানী স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের আওয়াজ তুলিয়া জনগণের মনে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণবিরোধী মনোভাব গড়িয়া তুলিয়া অবস্থাকে আরও জটিল ও ঘোরালো করিয়া তুলিতেছে।

    ৪। এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা দাবী করিতেছে যে, জনগণের উপরোক্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন ও নির্বাচনে জনগণের রায়ের মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ঘোষিত ৩রা মার্চ তারিখে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসিতেই হইবে এবং উহার কোরাম পূর্ণ হইলেই ঐ বৈঠককে আইনসিদ্ধ বলিয়া গণ্য করিতে হইবে। জাতীয় পরিষদের এই বৈঠকে গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা হউক। এক্ষেত্রে আমরা দাবী করি যে, পাকিস্তানের জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকৃতি ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি সম্বলিত গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা হউক। এই পরিষদ যে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করিবে প্রেসিডেন্টকে তাহাই অনুমোদন করিতে হইবে এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করিতে হইবে।

    ৫। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীলদের চক্রান্তে পরিষদের অধিবেশন যদি না বসে, যদি শাসনতন্ত্রে প্রণয়ন করিতে না দেওয়া হয়, যদি গৃহীত শাসনতন্ত্রে প্রেসিডেন্ট সম্মতি প্রদান না করেন বা কোন না কোনভাবে গৃহীত শাসনতন্ত্র নস্যাৎ করা হয়, তথা যদি জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও নির্বাচনের গণরায়কে বানচাল করা হয় তাহা হইলে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতির জনগণকে সমগ্রভাবে ও নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনের রায়ের মর্যাদা রক্ষার জন্য তথা গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের দাবী প্রতিষ্ঠানের জন্য সংগ্রামের আহবান জানাইতে হইবে। সারা পাকিস্তানে এই সংগ্রামের ফলে পাকিস্তানের জন্য একটা গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের দাবী অর্জিত হইতে পারে- এরূপ সম্ভাবনা আছে।

    বর্তমানে নির্বাচনের রায়কে কার্যকরী করিতে না দেওয়া হইলে পূর্ব বাংলায় আন্দোলন এই অঞ্চলে একটা পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে যাইতে পারে। পূর্ব বাংলার বুর্জোয়া জাতীয়বাদীরা জনগণের এই সংগ্রামকে অবাঙ্গালী জনগণবিরোধী খাতে প্রবাহিত করিতে প্রয়াসী হইতে পারে।

    এই পরিস্থিতিতে পূর্ব বাংলায় আমাদের কর্তৃব্য হইবে, বাঙ্গালীদের জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি অনুসারে জনগণের এই সংগ্রামে আমাদের শরীক থাকা এবং ঐ নীতির ভিত্তিতে সমস্ত গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করিয়া এই সংগ্রামকে সঠিক গণতান্ত্রিক পথে পরিচালিত করিতে প্রচেষ্টা করা। এই ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার জনগণকে বুঝাইতে হইবে যে, এই সংগ্রাম পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতির জনগণ ও অবাঙ্গালী জনগণের বিরুদ্ধে নয়। বরং ইহা পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের সমশত্রুসাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও একচেটিয়া পুঁজির বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং এই সংগ্রাম সারা পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতির জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অঙ্গ। এই সংগ্রামে আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের সহযোগিতা ও সমর্থন চাই এবং তাহাদের জাতীয় অধিকার ও গণতন্ত্রের সংগ্রাম আমরা সমর্থন করি। এই সংগ্রামের সফলতার জন্য উগ্র বাঙ্গালী জাতীয়বাদের অবাঙ্গালী জনগণ বিরোধী  পাকিস্তানের জনগণ বিরোধী জিগিরের মুখোশও আমাদের খুলিয়া দিতে হইবে।

    পরিশেষে আমাদের অবশ্যই মনে রাখিতে হইবে যে, এই সংগ্রাম জাতীয় গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সম্মুখে রাখিয়া আমাদের প্রচেষ্টা হইবে এবং সংগ্রামকে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও একচেটিয়া পুঁজির তথ্য দেশী-বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীলদের চক্রান্তের বিরুদ্ধে পরিচালিত করা।

    ৬। আমাদের উপরোক্ত বক্তব্য জনসাধারণের সম্মুখে পূর্ণভাবে উপস্থিত করিতে হইবে। *[1]

*এই কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন শ্রী মণি সিংহ।

*এই কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন শ্রী মণি সিংহ।