দক্ষিণ এশিয়ার বিপর্যয় এড়ানোর পন্থা

Posted on Posted in 14
শিরোনামসূত্রতারিখ
১০২। দক্ষিন এশিয়ার বিপর্যয় এড়ানোর পন্থানিউজ উইক২৫ অক্টোবর, ১৯৭১

 

 

Aabir M. Ahmed

<১৪, ১০২, ২৪০২৪২>

 

নিউজ উইক, ২৫ অক্টোবর, ১৯৭১

দক্ষিন এশিয়ার বিপর্যয় এড়ানোর পন্থা
– উইলিয়াম পি. বান্ডি

 

পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের সন্ত্রাসী আধিপত্যের ভয়াবহতা এবং এর ফলে ভারতে সৃষ্ট শরণার্থী অবস্থা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রচন্ড রকম ছিলো। সম্ভবত আমি ছাড়া অন্যদের জন্য, এটা সেখানকার ভবিষ্যতের কথা সত্যিকার অর্থে গভীরভাবে ভাবাচ্ছে। তবে এমন চিন্তাভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। আগামী তিন মাস খুবই সংকটাপূর্ণ হবেঃ সত্য বলতে, তাদের হয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে এই আতংক নিয়ন্ত্রনে আসবে কি না এবং এর চেয়েও বড় আতংক ভারত-পাকিস্তান সম্মুখযুদ্ধ ঠেকানো যাবে কি না।

 

কিন্তু, কি অর্থে সংকটপূর্ণ? এবং আমরা কি করছি ? আমরা অর্থাৎ বিশ্বের জাতিগুলো, প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র ?

 

ন্যূনতম লক্ষ্য এখন সুস্পষ্ট। শরণার্থী পরিস্থিতির ইতি টানবে এবং যথাসময়ে শরণার্থীদের ফেরত পাঠাবে- এমন একটি রাজনৈতিক অবস্থাই শুধুমাত্র পারে পূর্ব বাংলার সমস্ত জনগনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে। বাস্তবিক বা নীতিগত যেভাবেই বলা হোক না কেন, এটা বলতে বোঝায় অন্ততপক্ষে শেখ মুজিবুর রহমানকে ফিরিয়ে আনা এবং পশ্চিম পাকিস্তানি নেতা, মিলিটারি কিংবা সাধারন নাগরিক এর ধারনার চেয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে আরও বেশী মাত্রায় স্বায়ত্তশাসন এর অনুমোদন দেওয়া । আপাতদৃষ্টিতে এটা যথাসময়ে একটি স্বাধীন বাংলাদেশকে বোঝায়, কিন্তু এখন এক বারেই এর চেষ্টা করা হলে তা নতুন আরেকটি রক্তগঙ্গার সূচনা করবে, এখন তাদের ভাবাবেগের যেমন উত্তপ্ত অবস্থা এমন সময় কেউ চূড়ান্ত পরিণতির জন্য আন্দোলন শুরু করতে পারে না।  সময় এবং পাকিস্তান সরকার, ভারত ও পূর্ব বাংলার আওয়ামীলীগ নেতা- এই তিন গোষ্ঠীর ওপর চাপ কমাটাই এখন মূখ্য বিষয়।

 

ক্রমবর্ধমান চাপঃ

যাই হোক,  সঙ্কটের বিষয় এটাই যে তিনটি মূখ্য গোষ্ঠীর জন্যই এখন বিরুদ্ধ সময় চলমান এবং কমে আসার পরিবর্তে চাপ বেড়েই চলেছে। মুজিবুর রহমানের ট্রায়াল চলার সাথে সাথে, অন্তত আরও তিনটি বিষয় অগ্নিতপ্ত হয়ে আছে এবং চলছে, সংকটপূর্ণ তিন মাসে এর যে কোনোটিই কোনোটিরই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। একটি হলো পূর্ব বাংলায় খাদ্য বন্টন। দ্বিতীয়ত,  ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, মুক্তিবাহিনী বা স্বাধীনতা যোদ্ধা,  ভারত-সমর্থিত গেরিলা যুদ্ধের কার্যক্রম ।

 

তৃতীয়টি হচ্ছে, ৮ থেকে ১২ মাস ধরে চলমান পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা, যা বৈদেশিক সাহায্যের ওপর প্রচন্ডভাবে নির্ভরশীল। এসব কিছু ছাড়াও, শেষ পর্যন্ত যা সবচেয়ে ভীতিজনক হুমকী হয়ে দাঁড়াবে তা হলো ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর এই সংকটের প্রভাব। শেষ মার্চ মাসে মিসেস গান্ধীর নির্বাচন বিজয় ছিলো সম্মস্যা সমাধানে ভারতে জন্য শেষ সুযোগ। এবং অবিভক্ত ভারতের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে ভারতের এই অগ্রগতি পুনরারম্ভ করা অপরিহার্য।

 

বাংলার এমন অবস্থায় সৃষ্ট চারটি সমস্যাকে আমরা ক্রমান্বয়ে সাজাই। অপর্যাপ্ত খাদ্য যোগান- যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া পরিমানের প্রায় অর্ধেক খাদ্য এখন পূর্ব বাংলায় পৌছাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে বন্টন/বিতরণ, এবং জনগনকে খাদ্য সরবরাহের চেয়ে রাজনীতি গুরুত্ব পাবে কি না, হয়ত পশ্চিম  পাকিস্তানি মিলিটারি দ্বারা যারা বিরূপ আচরন করছে অথবা কিংবা গেরিলাদের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। দেরিতে হলেও সম্ভবত, বহির্বিশ্বের দেশগুলো ঠিক কাজটিই করেছে এবং কেউই এই প্রার্থনা করতে পারছে না যে ডিসেম্বরের শেষে নতুন ফসল আসবার পূর্ব পর্যন্ত দূর্ভিক্ষ এড়ানো সম্ভব হবে।

 

 

গেরিলা হুমকীঃ

 

গেরিলা যুদ্ধের জন্যও একই কথা সত্য। কিন্তু গেরিলাদের জন্য ভারতের সহায়তা এবং এর ফলবশত জাতিসংঘ পর্যবেক্ষকদের এর শরণার্থী শিবিরের ব্যাপারে জোর অস্বীকৃতি কূটনীতির বোধগম্য অংশ যারা মাধ্যমে মিসেস গান্ধী এখনো পর্যন্ত সাহসিকতার সাথে সম্মুখ যুদ্ধের চাপ প্রতিহত করেছেন।

 

সমস্যায় থেকেও আনন্দ করা এবং তা কাজে লাগানো- এর মতো এখানে অপরের দূর্দশায় নিজের আনন্দ খোঁজার মতোই একটি বিষয় আছে, যে যখন ভারত ১৯৬২ এবং ১৯৬৩ সালে চীন দ্বারা অবরূদ্ধ ছিলো, তখন ভারতীয়রা নিজেরাও পাকিস্তানের উপর ক্ষুদ্ধ ছিলো। উপরন্তু, ওই সংঘাতের পূর্বে ভারতে সীমান্ত কার্যকলাপ নিয়ে লেখা নেভিল ম্যাক্সওয়েলের অসাধারণ বইটির পাঠকেরা জানেন যে ভারতীয় সামরিক এবং আধা-সামরিক কর্মকান্ড একই সাথে কঠিন ও অত্যন্ত গোপনীয় এবং  অন্য মানুষদের মতোই, তাদের নিজস্ব প্রেরণা ধারণ করে। মিসেস গান্ধীর হয়ত গেরিলাদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রনের মতো এমন কিছু নেই, ঠিক এই কারনবশত গেরিলারা পর্যায়ক্রমিকভাবে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে শুধু তাইই নয়, এবং অংশত তাদের নিয়ন্ত্রনে রাখাও সম্ভব হবে না। 

 

এভাবেই পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি সিংহভাগই বহির্বিশ্বের সাহায্যের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। যদি, শুধুমাত্র যদি পাকিস্তান এবং ভারত উভয় কর্তৃপক্ষই সংবরনশীল আচরন করে, পরিস্থিতি হয়ত কিছুটা সহনীয় মাত্রায় থাকবে।

 

সত্যিকার প্রশ্নটা হলো, সংবরনশীল আচরন করতে উভয় দেশকেই বাইরের দেশগুলো সাহায্য করতে পারে কি না। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে, ২৫ মার্চের আগের ছোট-মাত্রার সামরিক সরবরাহগুলো বন্ধ না করে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা সুবিধা ধরে রাখতে পারে। কিন্তু ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে চড়া মাশুল গুনতে হচ্ছে, এবং পাকিস্তানের আচরণ নিয়ন্ত্রন করতে আমেরিকার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। (সংজ্ঞানুযায়ী অবশ্যই তা সম্ভব নয়)।

    

আলোচিত বিষয় হলো, বছরের প্রথম ভাগের পরে, যখন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সরবরাহ কমে আসবে, তখন পশ্চিম পাকিস্তানে আর্থিক সাহায্য পাঠানো চলমান থাকবে কি না। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের একইসাথেক করণীয় দুটি বিষয় আছে- একা একা কাজ করবার অবস্থা থেকে সরে আসা যা প্রকাশ পেয়ে গেছে এবং সামরিক সহায়তার বদলে আর্থিকভাবে পাকিস্তানের উপর বাইরে থেকে সুবিধা ধরে রাখার জন্য চেস্টা চালানো। পাকিস্তানের সাহায্যের মাধ্যম হতে পারে বিশ্বব্যাংক এবং সামরিক সরবরাহ বন্ধের জন্য প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব অনুযায়ী আসন্ন কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞা গ্রহন করা। কিন্তু একই সময়ে, শুধুমাত্র নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সাহায্য অনুমোদন করতে ব্যাংক এর কাজে, প্রেসিডেন্টকে এর আনুষঙ্গিক আর্থিক সাহায্য নিষেধাজ্ঞাকে বাতিল করতে হবে (যেভাবে বিলটি অনুমোদন করে)। সম্ভবত এতোসব কিছুর ক্ষুদ্রতম উদ্দেশ্য হচ্ছে ফাঁদে পড়া পাকিস্তান সরকারের উপর কিছু সুবিধাজনক নিয়ন্ত্রন নিয়ে আসা; বৃহৎটি হলো দুটি মারাত্মক ভুল- পূর্ব বাংলায় আতঙ্ক এবং শরণার্থী শিবির- যৌক্তিকতা প্রমান ছাড়াই তৃতীয়টিঃ পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থনৈতিক ধ্বস।

 

সংকটের আর্থিক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পশ্চিম পাকিস্তানের আর্থিক সাহায্যের উপর এমন নতুন নিষেধাজ্ঞা চললে তা হবে এখন পর্যন্ত ভারতের উপর প্রয়োগকৃত এর চেয়েও বড় চাপ। এবছর শরণার্থীদের জন্য ভারতের খরচ হবে প্রাপ্ত মোট বৈদেশিক সাহায্যের চেয়েও বেশি; অবশ্যই এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হবে আন্তর্জাতিক অংশীদারীর অতিরিক্ত বৈদেশিক সাহায্যের মাধ্যমে  যা অন্ততপক্ষে ৫০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার পরিমান হবে। এটি ব্যতিত, এমন কি ভারতও যুক্তিযুক্তভাবে এবং হয়তবা এমনকি দীর্ঘদিন টিকে থাকার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।

 

এখানের সর্বত্রই আমি কিছুই ক্ষমতার প্রেক্ষাপট থেকে বলিনি। যখন সোভিয়েত রাশিয়া সংবরণশীল আচরন করছে তখন হয় চীন অপেক্ষা করছে চরমপন্থি বাংলার ভাঙা অংশগুলো দখল করতে। ভারত-চীন যুদ্ধের ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, যাদের মূল উদ্দেশ্য ভারতকে অবিভক্ত রাখা এবং পাকিস্তানকে তাদের জনগণের আকাঙ্ক্ষানুযায়ী অবস্থায় রাখা, তাদের বদলে দক্ষিন এশিয়ার সংঘাত কিভাবে এই সমস্যার একপক্ষীয় সুবিধাবাদীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে।      

 

চূড়ান্ত বিকল্পঃ

 

মূল গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো জনগন, এবং অধিকাংশ পরিস্থিতিতে আরও পরিস্কার ভাবে বলতে, খুবই কঠিন এবং সম্ভবত প্রায় অসম্ভব, শান্তি প্রতিষ্ঠা শুরু হয় জনগনের থেকে। বিশেষত, কংগ্রেসকে অবশ্যই ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের শরণার্থীদের জন্য ২৫০ মিলিয়ন ইউএস ডলারের আটকে থাকা সম্পূরক সাহায্য দ্রুত ছাড় দিতে হবে। এরপর, যেমনটা প্রথমেই করা উচিত ছিলো, প্রথমত ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর মাধ্যমে সমস্যাটি একটি নতুন ও বৃহৎ মাত্রায় আন্তর্জাতিকীকরণ, এবং পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অধিকতর বৃহৎ গঠনমূলক অংশীদারীত্বকে অন্তর্ভুক্তকরণ। যদি এটি আকাশ-কুসুম কল্পনা হয়, তাহলে প্রায় আক্ষরিকভাবে বিকল্প হলো, দক্ষিন এশিয়ার ধ্বংস। সব যুক্তিতর্কের শেষে আমার আনত সিদ্ধান্ত এটাই যে ১৯৪৫ সালের পরে এটাই বিশ্বের দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ সঙ্কট।

 

চিঠি পূর্ব পাকিস্তানঃ

 

সম্পাদক বরাবর ‘বাংলায় বিপর্যয়’ (আগস্ট ২৩) শিরোনামের ৪টি চিঠি এই ইঙ্গিত দেয় যে, আপনাদের দোসরা আগস্টের প্রচ্ছদ শিরোনামের মাধ্যমে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত  ভ্রান্ত ধারনার সৃষ্টি হচ্ছে।

‘গনহত্যা উপেক্ষা করা’ কিংবা পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক সাহায্য সরবরাহে ‘কৃপণ’ হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করা ভুল এবং অন্যায্য। অনেকবারই, পূর্ব পাকিস্তানের দুঃখজনক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং  মহাসচিব উ থান্টের আহবানে ভারতের শরণার্থী এবং পূর্ব পাকিস্তানের অভাবগ্রস্ত জনগনের জন্য ত্রাণব্যবস্থায় জরূরী ভিত্তিতে সাড়া দিয়েছে।  এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মানবিক সাহায্যে এক চতুর্থাংশ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যা অন্যান্য সব রাষ্ট্রের মোট প্রদেয় সাহায্যের চেয়েও অনেক বেশী এবং কর্তৃপক্ষ কংগ্রেসের কাছে আরও এক চতুর্থাংশ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে।

 

এটি ভুল, যেমনটা একটি চিঠিতে বলা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছেঃ সামরিক খাতে আমরা পাকিস্তানকে কোনো সহায়তা দেইনি।